অন্যধর্মের মানুষ সনাতন মন্দিরে প্রবেশ প্রসংগেঃ-

 অন্যধর্মের মানুষ সনাতন মন্দিরে প্রবেশ প্রসংগেঃ-

‘ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্র পল্লীতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’
উপরের এই উক্তিটি খুব বেশী পুরাতন নয় । ১৯৩০/৪০ সালের ঘটনা । তখনও মানুষ বিশ্বাস করতো ভগবান থাকেন বড়লোক তথা উচ্চশ্রেনীর কাছে । গরীব মানুষদের কেউ নেই । মন্দিরে তো গরীব মানুষ বা সমাজের নীচু শ্রেনীর মানুষ প্রবেশ করতেই পারতনা। সেই জায়গা থেকে বর্তমান জায়গায় আসতে অনেক অনেক কাঠখড়ি পোড়াতে হয়েছে । অনেক লোককে অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে , এই ভগবানকে সাধারনের মধ্যে বিলিয়ে দিতে এবং মন্দির যে সবার তা বোঝাতে। এখনও কিছু কিছু মন্দির কঠোর নিয়ম কানুনের মধ্যে আবদ্ধ ।
বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি হওয়া উচিত জনমুখী । জনগণই তো ভগবান । জনতা জনার্দন । সব ধর্মের মানুষ আসুক না , সমস্যা কোথায়?
এই যে আমরা বৌদ্ধ মন্দিরে যাই , কৈ সেখানেতো আমাদের বাধা দেওয়া হয়না , আমরা তো চার্চেও যাই , কৈ সেখানেতো আমাদের বলা হয়না , আপনি এখানে প্রবেশ করতে পারবেন না ।
তবে হ্যাঁ তারা কিছু নিয়ম কানুনের ব্যবস্থা করেছে , যার কারনে আপনি মুল মন্দিরে বা প্রার্থনালয়ে প্রবেশ করলে , তাদের মত করে চলতে বা বলতে হবে। এইটাই স্বাভাবিক।
আমরাও সেরকম করতে পারি। কিন্তু অন্যধর্মের মানুষ আমার মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবেনা , এইটা কেন জানি আমার কাছে সংকীর্ণতা বলে মনে হয় ।
দেখুন সমাজের বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের কার্যকলাপে ধর্মের কোন ক্ষতি হয়নি , হবেও না । মুল সমস্যা হলো আমরা মাঝে মাঝেই ধর্ম প্রতিষ্ঠান গুলোকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলি , নিজের ব্যাক্তিস্বার্থে ব্যবহার করি। বাংলাদেশের বেশীভাগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ব্যাক্তিগত স্বার্থ দ্বারা আক্রান্ত। সব ধর্মের ক্ষেত্রেই বলছি । আমি যেহেতু আমার ধর্মকে পুঁজি করে বা আমার মন্দিরকে পুঁজি করে টাকা বানাতে চাচ্ছি , সেই সুযোগটা গ্রহন করছে অন্যধর্মের মানুষ এমনকি নিজ ধর্মের অন্যগোষ্ঠার মানুষও ।তুমি খেলে আমি খেতে পারবনা কেন ? গোড়ায় গলদ ।
আপনি ধর্মপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক মার্কেট বানিয়ে , প্রথমে একট দাম ধরে নিজেরা নিজেরা নিয়ে নিচ্ছেন , তারপর বেশী টাকা দিয়ে অন্যের কাছে বিক্রী করে সরে পরছেন । প্রণামী বাক্সের টাকা নিয়ে দুর্ণীতি , এতো পুরানো কেচ্ছা। আমি এরকম ঘটনাও দেখেছি , মন্দিরের জমি , আপনি বলছেন আমাকে দিয়ে দেন , আমি বিঘা হারে ৮ মন ধান দেবো । আপনি জমিটি নিয়ে আবার অন্যকে ১২ মন হারে চাষাবাদ করতে দিয়ে দিচ্ছেন । এই সব ঘটনা ঘটার কারনে , নিজ ধর্মের অন্য গোষ্ঠী বা অন্য ধর্মের মানুষ সেই সুযোগ নিতে চাচ্ছে ?
বেশীর ভাগ মন্দিরে বছরে এক বার বা দুইবার বড় অনুষ্ঠান হয় । আর সেই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হয় । মেলা হয় , ইত্যাদি ইত্যাদি। আর সেখানে একটা বিশাল বাণিজ্য হয় । যা স্থানীয় কমিটি বা এলাকা প্রভাবশালী মানুষজন নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় । এখানে মুলধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পেলেও যৎসামান্য। আর এই ব্যবসা, মেলা কে নিয়ন্ত্রন করবে , সেটা নিয়ে শুরু হয়ে অনেক রকম গন্ডোগোল । আর সবাই ধর্মের দোহায় দেয় ।
আর মুল অন্তর্যামী , অলক্ষ্যে হাসেন । কবিগুরুর সেই বিখ্যাত কবিতার মত
"রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।
পথ ভাবে আমি দেব রথ ভাবে আমি,
মূর্তি ভাবে আমি দেব—হাসে অন্তর্যামী।"
তোমরা নিজেদের স্বার্থ নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ঝাটি করছো , আর মানুষকে বলছ , আমার ধর্মের প্রতি আঘাত এসেছে। ভগবান তো হাসবেনই ।
আগে নিজেকে ঠিক করুন , তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। সৎ মানুষ , সৎ প্রতিষ্ঠান , সৎ সংগঠনের সংগে কেউ আগ বাড়িয়ে লাগতে চায়না । কারণ সৎকে এখোনো সবাই ভয় পায় ।

Comments

Popular posts from this blog

শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা (প্রথম অধ্যায়)

শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা ( দশম অধ্যায় )

অকালবোধন ও রাজা রামচন্দ্র