শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা (প্রথম অধ্যায়)

 

শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা

( প্রথম অধ্যায় )

 

উৎসর্গ

দাদু – ঁবৈদ্যনাথ সাহা

কর্ত্তামা – ঁযমুনা রানী সাহা

 

 


 

 

শ্রীমদ্ভগবদগীতার প্রথম অধ্যায় পুরোপুরি সাহিত্য। এখানে অনেক রথী মহারথীর নাম আছে যাদের সম্পর্কে জানতে পারলে শ্রী গীতা পাঠ অনেকটা সহজ হয় । আমি চেষ্টা করেছি এই সব রথী মহারথী ও অধীরথীদের চরিত্র গুলো বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে । আমি এর রচয়িতা নয় বলা যায় আমি সংকলিত অথবা সংগ্রহ করেছি আপনার ও আমার জানার জন্য ।

 

আপনার জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধির জন্য আমার সংগ্রহ আপনার কাজে লাগবে বলে আমি আশা করি । পরবর্তীতে আমি চেষ্টা করব শ্রী গীতার বিভূতিযোগের সব চরিত্রগুলো সংগ্রহ করে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করার ।

 

আপনাদের আশির্বাদ আমার পথ চলার পথের শক্তি ।

 


নারায়ন চন্দ্র সাহা ((MSS,MBA))

সভাপতি

বি আর পি সার্বজনীন পূজা মন্দির

ভাষানটেক , ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন । 


শ্রীমদ্ভগবদগীতা র প্রথম অধ্যায়ের  শ্লোকের ব্যাখ্যাঃ

মহাভারতের ভীষ্ম পর্বের ২৫ থেকে ৪২ তম অধ্যায় শ্রী গীতা হিসাবে পঠিত হয় । এই ১৮ অধ্যায়ে মোট ৭০০ টি শ্লোক , তিনটি ষটক রয়েছে । প্রত্যেক ষটকে ৬ টি ক রে অধ্যায় । শ্রী গীতার চারটি চরিত্র । 

১) ধৃতরাষ্ট্র

২) সঞ্জয় 

৩) অর্জুন 

৪) শ্রী কৃষ্ণ 

এখানে ধৃতরাষ্ট্রের একটি শ্লোক , সঞ্জয় এর ৪০টি শ্লোক অর্জুনের ৮৫টি  শ্লোক ও শ্রী কৃষ্ণের ৫৭৪টি শ্লোক আছে । 

তিনটি ষটক যথাক্রমে 

১) কর্ম ষটক

২) ভক্তি ষটক

৩) জ্ঞান ষটক 

গীতার বিষয়বস্তু কৃষ্ণ ও পাণ্ডব রাজকুমার অর্জুনের কথোপকথন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু ঠিক আগে শত্রুপক্ষে আত্মীয়, বন্ধু ও গুরুকে দেখে অর্জুন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। এই সময় কৃষ্ণ তাকে ক্ষত্রিয় যোদ্ধার ধর্ম স্মরণ করিয়ে দিয়ে এবং বিভিন্ন প্রকার যোগশাস্ত্র ও বৈদান্তিক দর্শন ব্যাখ্যা করে তাকে যুদ্ধে যেতে উৎসাহিত করেন। তাই গীতাকে বলা হয় মানব ধর্মতত্ত্বের সংক্ষিপ্ত পাঠ এবং হিন্দুদের জীবনচর্যার ব্যবহারিক পথনির্দেশিকা।

গীতাকে মোক্ষশাস্ত্র নামেও অভিহিত করা হয়।

অষ্টাদশ শতকের পূর্বপর্যন্ত গীতা মহাভারতের অংশ হতে পৃথক ছিলনা। তবে শঙ্করাচার্য ৭৮৮-৮২০ খ্রিস্টাব্দের মাঝে গীতার ভাষ্য রচনা করেন। ১৮৭৫ সালের পূর্বপর্যন্ত বিভিন্ন মতের আরও ৫০জন গীতার ভাষ্য ও অনুবাদ করেন। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রথম ভাগে কম্পানির অর্থায়নে চার্লস উইলকিন্স মহাভারতের ভীষ্ম পর্বের, ২৫তম অধ্যায় হতে ৪২তম অধ্যায় পর্যন্ত ১৮টি অধ্যায়কে আলাদা করে ‘Dialogues of Kreeshna and Arjoon in Eighteen Lectures with Notes’ নামে প্রথম ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করেন৷

গীতা ৭০০টি শ্লোক নিয়ে ১৮টি অধ্যায়ে বিভক্ত।

অধ্যায়অধ্যায়ের নামশ্লোক
অর্জুন বিষাদ যোগ৪৭
সাংখ্য যোগ৭২
কর্ম যোগ৪৩
জ্ঞান-কর্ম-সন্ন্যাস যোগ৪২
কর্ম-সন্ন্যাস যোগ২৯
আত্ম-সংযম যোগ৪৭
জ্ঞান-বিজ্ঞান যোগ৩০
অক্ষর-পরব্রহ্ম যোগ২৮
রাজ-বিদ্যা-রাজ-গুহ্য যোগ৩৪
১০বিভূতি যোগ৪২
১১বিশ্বরূপ-দর্শন যোগ৫৫
১২ভক্তি যোগ২০
১৩ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ-বিভাগ যোগ৩৪
১৪গুণত্রয়-বিভাগ যোগ২৭
১৫পুরুষোত্তম যোগ২০
১৬দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগ২৪
১৭শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ যোগ২৮
১৮মোক্ষ-সন্ন্যাস যোগ৭৮
সর্বমোট৭০০
একে সপ্তশতী ও বলা হয়।

গীতাকে গীতোপনিষদ বলা হয়। অর্থাৎ, গীতা উপনিষদ্‌ বা বৈদান্তিক সাহিত্যের অন্তর্গত। "উপনিষদ্‌" নামধারী ধর্মগ্রন্থগুলো শ্রুতিশাস্ত্রের অন্তর্গত হলেও, মহাভারতের অংশ বলে গীতা স্মৃতিশাস্ত্রের অন্তর্গত।আবার উপনিষদের শিক্ষার সারবস্তু গীতায় সংকলিত হয়েছে বলে একে বলা হয় "উপনিষদ্‌সমূহের উপনিষদ্‌"।

ভগবদ্গীতার গীতা অর্থ "গান।" ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও পণ্ডিতগণ ভগবদ শব্দটিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তদনুসারে, ভগবদ্গীতাকে আধ্যাত্মিক দর্শনসমূহের পণ্ডিতগণ "ভগবান বা ঈশ্বরের বাণী" "প্রভুর বাণী" "ঐশ্বরিক গীতিকা" বলে ব্যাখ্যা করেন,  কেউ বা "স্বর্গীয় গীত" বলে থাকেন৷

ভগবদ্গীতাকে ঈশ্বর গীতাঅনন্ত গীতাহরি গীতাব্যাস গীতা বা গীতাও বলা হয়।

যেহেতু বেদব্যাস মহাভারত রচনা করেছিলেন বলে মনে করা হয়, সেহেতু মহাভারতের অংশরূপে গীতাও তার দ্বারাই রচিত বলে ধারণা করা হয়। ভগবদ্গীতার রচনাকাল সম্বন্ধে অনেক রকম মতামত রয়েছে। ঐতিহাসিকেরা এই গ্রন্থের রচনাকাল হিসেবে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত যে কোন সময়ের মধ্যে হতে পারে বলে অনুমান করেছেন। অধ্যাপক জিনিন ফাউলারের মতে এই গ্রন্থের রচনাকাল খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী বলে মনে করলেও, গীতা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ কাশীনাথ উপাধ্যায় মহাভারত, ব্রহ্ম সূত্র ও অন্যান্য গ্রন্থ পর্যালোচনা করে প্রমাণ যে, গীতা খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে রচিত হয়েছিল।


আসুন আমরা শ্রী গীতার প্রথম অথ্যায়ের প্রথম শ্লোক নিয়ে আলোচনা শুরু করি ।


শ্লোক: ১:
ধৃতরাষ্ট্র উবাচ
ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ ।
মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয় ॥১॥

ধর্মক্ষেত্রে, কুরুক্ষেত্রে, সমবেতাঃ, যুযুৎসবঃ,
মামকাঃ, পাণ্ডবাঃ, চ, এব, কিম্, অকুর্বত, সঞ্জয় ॥১॥

এখানে ধৃতরাষ্ট্র অজ্ঞানরুপ এবং সংযমরূপ হলেন সঞ্জয়। অজ্ঞান মানে অন্তরালে থাকে। অজ্ঞানাবৃত মন ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ; কিন্তু সংযমরূপ সঞ্জয়ের মাধ্যমে তিনি দেখেন শোনেন। ধৃতরাষ্ট্র জানেন যে, পরমাত্মাই একমাত্র সত্য, পুনশ্চ যতক্ষণ এর থেকে উৎপন্ন মোহরূপ দুর্যোধন জীবিত থাকে, ততক্ষণ এর দৃষ্টি সর্বদা কৌরবগণের উপরেই থাকে অর্থাৎ বিকারের উপরেই থাকে।

শরীর একটি ক্ষেত্র তা আগেই বলা হয়েছে। যখন হৃদয় -দেশে দৈবী সম্পত্তির বাহুল্য ঘটে, তখন এই শরীর ধর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়। 'কুরু' অর্থ কর- এই শব্দ আদেশাত্মক। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন - " প্রকৃতিজাত তিনটি গুণের বশীভূত হয়েই মানুষ কর্ম করে। " সে ক্ষণমাত্রও কর্ম না করে থাকতে পারে না, গুণত্রয় তাকে দিয়ে করিয়ে নেয়৷ ঘুমন্ত অবস্থাতেও কর্ম বন্ধ হয় না, সেটিও সুস্থ দেহের আবশ্যক খোরাক মাত্র। এই তিনগুণ মানুষনে দেবতা থেকে শুরু করে কীটপর্যন্ত দেহের বন্ধনেই আবদ্ধ করে। যতক্ষণ প্রকৃতি প্রকৃতিজাত গুণ জীবিত, ততক্ষণ ' কুরু' সক্রিয় থাকবে। অতএব, জন্ম-মৃত্যুময় এই ক্ষেত্র, বিকারযুক্ত এই ক্ষেত্রই 'কুরুক্ষেত্র' এবং পরমধর্ম পরমাত্মাতে প্রবেশ করতে পারে যে পুণ্যময় প্রবৃত্তিসমূহ, সেই পুণ্যময় প্রবৃত্তি সমূহের (পান্ডবের) ক্ষেত্রই 'ধর্মক্ষেত্র'

তত্বদর্শী মহাপুরুষের শরণাগত হলে শরীরের প্রবৃত্তিসমূহের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়, একেই ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞের সংঘর্ষ প্রকৃত যুদ্ধ বলা হয়। ইতিহাসের পাতা বিশ্বযুদ্ধের কাহিনীতে পরিপূর্ণ, কিন্তু সেই সব যুদ্ধে যাঁরা বিজয়ী হয়েছেন তাঁরা প্রকৃত বিজয়ী নয়, কারণ এর মধ্যে প্রতিহিংসা ছিলো। প্রকৃতিকে শান্ত করে প্রকৃতির উর্ধে সত্ত্বার দিগদর্শন করা এবং তাতে প্রবেশ করাই প্রকৃত বিজয়। এই হল শাশ্বত বিজয়, যার পশ্চাতে পরাজয় নেই। একেই বলে মুক্তি, যার পর জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন নেই।

এইভাবে অজ্ঞানে আবৃত প্রত্যেক মন সংযমের দ্বারা জানতে পারে যে ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞের যুদ্ধের পরিণাম কি হয়? যার যেমন সংযমবৃদ্ধি হয়, তেমনি তাঁর দৃষ্টি খুলতে থাকে।

দ্বিতীয় শ্লোকে বলা হয়েছে," রাজা দুর্যোধন ব্যূহরচনাযুক্ত পান্ডবগণের সেনাকে দেখে দ্রোণাচার্যের নিকট গিয়ে জানালেন-"

এখানে দ্বৈতের আচরণই 'দ্রোণাচার্য' যখন অনুভন হয় যে পরমাত্মা থেকে আমরা পৃথক (একেই বলে দ্বৈতবোধ) তখনই তাঁকে লাভ করার জন্য ব্যাকুলতা জেগে ওঠে, তখনই আমরা গুরুর খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। দুই প্রবৃত্তির মধ্যে একেই প্রাথমিক গুরু বলা যেতে পারে। মানে দ্রোনাচার্য প্রাথমিক গুরু এবং পরে সদগুরু যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, যিনি যোগের পূর্ণস্থিতি প্রাপ্ত মহাপুরুষ৷

মোহরূপ হলো দুর্যোধন।। মোহই সকল ব্যাধির মূল রাজা। দুর্যোধন - দুর অর্থাৎ দূষিত, যো ধন অর্থাৎ সেই ধন। আত্মিক সম্পত্তিই স্থির সম্পত্তি। তাতে যে আবিলতা সৃষ্টি করে, তা মোহ। এই মোহ প্রকৃতির দিকে আকৃষ্ট করে।


কে ধৃতরাষ্ট্র?

মহাভীষঃ

একদা রাজর্ষি (যিনি রাজা হয়েও ঋষি) মহাভিষ নামে এক রাজা স্বর্গলাভ করেছিলেন। একবার স্বর্গ সভায় তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বহু দেব-দেবীদের মাঝে গঙ্গাও ছিলেন। প্রবল বায়ুপ্রবাহে গঙ্গার সূক্ষ্ম বসন তখন খুলে যায়। এতে তিনি নিরাভরণা হয়ে গেলে সকলে দৃষ্টি সংযত করলেও রাজা মহাভিষ অসংকোচ দৃষ্টিতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে রইলেন। গঙ্গাও সেসময় তার প্রতি কিছুটা আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তবে এই বিষয়টা ব্রহ্মার ভালো লাগেনি। তাই তিনি মহাভিষকে স্বর্গচ্যুতির অভিশাপ দিলেন। রাজার কাতর অনুনয়ের পর ব্রহ্মদেব তাকে মর্ত্যলোকে কিছুকাল বাস করে পরে পুনরায় স্বর্গে প্রবেশের অধিকার দিলেন। রাজা মহাভিষ তখন কুরুবংশীয় রাজা “প্রতীপ”-এর পুত্র হিসেবে জন্মের জন্য সংকল্প করলেন (‘শান্তনু’ নামে)। রাজা প্রতীপ নিজেও একজন রাজর্ষি ছিলেন।
প্রতীপ রাজাঃ

পুরাণ অনুসারে, প্রতীপ ছিলেন ভীমসেনের প্রপৌত্র এবং দিলীপের পুত্র। তবে, মহাভারত অনুসারে, তিনি ছিলেন রাজা ভীমসেন এবং কৈকেয়দের রাজকন্যা সুকুমারীর পুত্র। তিনি শিবি গোত্রের সুনন্দাকে বিয়ে করেন, যার থেকে তিনি দেবাপি, বাহ্লীক এবং শান্তনুর জন্ম দেন।
প্রতীপ রাজার সংগে গঙ্গার সঙ্গে সাক্ষাৎঃ
==========================
একবার, রাজা প্রতীপ যখন গঙ্গা নদীর তীরে ধ্যান করছিলেন এবং সূর্যের আরাধনা করছিলেন, তখন সত্যলোকে ব্রহ্মার কাছ থেকে অভিশাপ পেয়ে দেবী গঙ্গা আবির্ভূত হন। গঙ্গা এসে প্রতীপের ডান কোলে বসলেন, যার ফলে তাঁর ধ্যান ভেঙে গেল। তিনি প্রতীপকে বিয়ে করার জন্য অনুরোধ করেন। প্রতীপ বললেন যে যেহেতু গঙ্গা তার ডান কোলে বসেছিল, যা কন্যা বা পুত্রবধূর স্থান, তাই প্রতীপ একটি পুত্রের জন্ম না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপেক্ষায় থাকতে হবে। তাই, তিনি গঙ্গাকে প্রস্তাব দেন যে তিনি তাঁর ছেলেকে বিয়ে করতে পারেন এবং তাঁর পুত্রবধূ হতে পারেন। এই সময়ে, প্রতীপ এবং তার স্ত্রী তখনও সন্তানহীন ছিলেন, কিন্তু তারা কিছু তপস্যা করার পরে, তারা দেবাপি, বাহ্লীক এবং শান্তনু নামে তিনটি পুত্রের জন্ম দেয়। কনিষ্ঠ পুত্র শান্তনু হস্তিনাপুর রাজ্যের উত্তরাধিকারী হন। শান্তনু পরে গঙ্গাকে বিয়ে করেন এবং দেবব্রতের পিতা হন, যিনি ভীষ্ম নামে সুপরিচিত।
গংগা দেবীঃ

গঙ্গার জন্মকাহিনি বিষয়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলির মধ্যে মতদ্বৈততা দৃষ্ট হয়। একটি কাহিনি অনুযায়ী ব্রহ্মার কমণ্ডলু এক নারীমূর্তির স্বরূপ প্রাপ্ত হয়। ইনিই গঙ্গা। বৈষ্ণব মতানুসারে, ব্রহ্মা তার কমণ্ডলুর জল নিয়ে সশ্রদ্ধ চিত্তে বিষ্ণুর পদ ধৌত করেছিলেন। সেই থেকেই গঙ্গার জন্ম। তৃতীয় একটি মত অনুযায়ী, গঙ্গা পর্বতরাজ হিমালয় ও তার পত্নী মেনকার কন্যা এবং পার্বতীর ভগিনী। তবে প্রতিটি মতেই একথা স্বীকৃত যে ব্রহ্মা গঙ্গাকে পবিত্র করে তাকে স্বর্গে উত্তীর্ণ করেন।
অষ্টবসুঃ

অষ্টবসু হলেন আটজন গণদেবতা। দক্ষের কন্যা ও ধর্মদেবের স্ত্রী বসুর গর্ভে তাদের জন্ম। কিছু পুরাণ ও রামায়ণ মতে অষ্টবসুদের বর্ণনা করা হয়েছে কশ্যপ ও অদিতির সন্তান এবং মহাভারতে মনু বা ব্রহ্মা প্রজাপতির সন্তান হিসেবে। তারা হলেন আটজন মৌলিক দেবতা প্রকৃতির দিকগুলি (পঞ্চভূত) প্রতিনিধিত্ব করে এবং মহাজাগতিক প্রাকৃতিক ঘটনা (সূর্য, চাঁদ ও তারা) প্রতিনিধিত্ব করে। বসু নামের অর্থ হল 'উজ্জ্বল' বা 'ধন দানকারী'। তারা তেত্রিশ দেবতার মধ্যে আটজন।
এই অষ্টবসুদের নামের ক্ষেত্রেও মহাভারতের সাথে রামায়ণের অমিল রয়েছে। তবে এখানে শুধু মহাভারতে উল্লেখিত নামগুলো দেয়া হলো : ১।। অনল (অগ্নির প্রতিনিধিত্বকারী), ২।। অনিল (বায়ুর প্রতিনিধিত্বকারী), ৩।। সোম (চন্দ্রের প্রতিনিধিত্বকারী), ৪।। অহস (অন্তরীক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী), ৫।। ধর বা পৃথু (পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বকারী), ৬।। ধ্রুব (নক্ষত্রসমূহের প্রতিনিধিত্বকারী), ৭।। প্রত্যুষ (ঊষালগ্নের প্রতিনিধিত্বকারী) এবং ৮।। প্রভাষ বা দ্যু (দ্যুলোকের বা আকাশের প্রতিনিধিত্বকারী)। এদেরকে আবার আটটি দিকেরও (মানে পূর্ব, পশ্চিম ইত্যাদি দিকের) দেবত্ব আরোপ করা হয়েছে।
একসময় অষ্টবসুরা তাদের স্ত্রীদের নিয়ে সুমেরু পর্বতে অবস্থিত ঋষি বশিষ্ঠের আশ্রমে ভ্রমণ করতে গিয়েছিলেন। ঋষি বশিষ্ঠের নন্দিনী নামক একটি কামধেনু ছিলো (কামধেনু মানে হলো জাদুকরী ক্ষমতাসম্পন্ন এক গাভী)। এটি মন্ত্রবলে যেকোনো কামনা পূরণ করতে পারতো বলে এর নাম কামধেনু। অনেকটা আলাদীনের চেরাগের দৈত্যের মতো! ঋষি বশিষ্ঠ এটার সাহায্যে অষ্টবসুদের সহজেই সমাদর করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু প্রভাষ পত্নীর এটার উপর দারুণ লোভ হলো। রাত্রে প্রভাষকে তার পত্নী এই গাভীটি চুরি করতে রাজি করালেন। তখন আশ্রমের সকলে নিদ্রা গেলে প্রভাষ, বিশেষ করে তার ভাই পৃথুর সহায়ক ভূমিকায়, গাভীটি চুরি করে নিয়ে পালিয়ে যেতে লাগলেন। এমনি সময়ে তিনি ও তার ভাই এবং তাদের পত্নীসহ চোরাই মাল নিয়ে ঋষি বশিষ্ঠের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে যান। ক্রুদ্ধ বশিষ্ঠ তখন তাদের অভিশাপ দিলেন, প্রত্যেককেই দেবত্ব খুইয়ে মর্ত্যলোকে বাস করতে হবে। পরে অষ্টবসুদের অনুরোধে ঋষি বশিষ্ঠ প্রভাষ ব্যতীত সকলের শাস্তি কমিয়ে দেন। তিনি তাদেরকে বলেন যে, প্রভাষ ব্যতীত সকলেই জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরই স্বর্গে ফিরে যেতে পারবেন। তবে প্রভাষকে চৌর্য কর্মের মূল হোতা হিসেবে মর্ত্যে দীর্ঘ জীবন থাকতে হবে। চিন্তিত বসুরা তখন উদ্ধারের জন্য দেবী গঙ্গার তপস্যায় মগ্ন হলেন।
এদিকে দেবী গঙ্গা তপস্যারত বসুদের কাছে গেলে তারা তাকে গঙ্গা এবং প্রতীপ পুত্র শান্তনুর সন্তান হিসেবে প্রসব করে জলে বিসর্জিত করার জন্য অনুরোধ করেন। জবাবে গঙ্গা তাদের বলেন, তাই হবে, কিন্তু তাদের যেন একটি পুত্র জীবিত থাকে। নতুবা তার সাথে শান্তনুর সঙ্গম ব্যর্থ হবে বলে আশংকা প্রকাশ করেন। বসুরা তখন সমাধান হিসেবে তাদের প্রত্যেকের নিজ বীর্যের অষ্টাংশ দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তারা এরপর গঙ্গাকে বললেন, এতে করে সেই জন্মানো পুত্র (ভীষ্ম) বলবান হবে, তবে তার সন্তান হবে না। গঙ্গা এভাবে অষ্টবসুদের বীর্যে সন্তান ধারণ করেছিলেন বলে ভীষ্মের অপর নাম হল ‘গাঙ্গেয়’, মানে গঙ্গাপুত্র। গঙ্গা অষ্টবসুদের প্রার্থনায় সম্মতি দিয়ে মহাভিষের কথা ভাবতে ভাবতে মর্ত্যে গমন করেন।
প্রতীপ পুত্র শান্তনুর রাজ্যাভিষেকঃ

যৌবন লাভ করার পর প্রতীপ তাকে সিংহাসনে অভিষেক করিয়ে বললেন, “তুমি গঙ্গা তীরে যেয়ো। সেখানে এক রূপবতী কন্যা পাবে। তাকে তুমি বিবাহ করো, তবে তার পরিচয় জানতে চেয়ো না এবং তার কার্যে বাধা দিও না”। এই বলে তিনি তপস্যা করতে সপত্নীক বনে চলে যান।
শান্তনু ও গঙ্গার বিবাহ এবং ভীষ্মের জন্মঃ

শান্তনু পিতার কথামতো গঙ্গাতীরে যান। সেখানে রূপসী দেবী গঙ্গাকে সাধারণ মানবী মনে করে তাকে প্রণয় নিবেদন করলে গঙ্গা শর্ত সাপেক্ষে রাজি হলেন। যদি রাজা তার পরিচয় জানতে না চান এবং তার কার্যে বাধা না দেন, তবে তিনি তাকে বিবাহ করবেন। তবে বাধা পেলে তাকে ত্যাগ করবেন। পিতার কথা স্মরণ করে শান্তনু রাজি হন।
কিছুকাল পরে যথাক্রমে তাদের আটটি সন্তান হলো। এদের সাতজনকেই গঙ্গাদেবী জলে নিক্ষেপ করেন। শান্তনু মনে মনে ক্রুদ্ধ হলেও গঙ্গার তাকে পরিত্যাগের কথা ভেবে নীরব থাকলেন। তবে অষ্টম পুত্রের ক্ষেত্রে আর না পেরে বাদ সাধলেন। গঙ্গাও তখন বললেন, “ঠিক আছে রাজা, আমি একে জলে নিক্ষেপ করবো না। তবে তোমার সাথে আমার থাকাও শেষ হলো”। এরপর পূর্বের স্বরূপে ফিরে শান্তনুকে অষ্টবসুর কাহিনী বললেন। তারপর সদ্যজাত শিশুটিকে নিয়ে অন্তর্হিত হলেন। শান্তনু তখন বিষণ্ণ মনে রাজপ্রাসাদে ফিরে যান।

দেবব্রতের ভীষ্ম হয়ে ওঠার কাহিনীঃ

মহারাজ শান্তনু ও গঙ্গার পুত্র ‘দেবব্রত’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ঋষি বশিষ্ঠের কাছে শাস্ত্র শিক্ষা এবং পরশুরামের (বিষ্ণুর এক অবতার) কাছে অস্ত্র শিক্ষা অধ্যয়ন করলেন। পরে যুবক বয়সে উত্তীর্ণ হলে গঙ্গা তাকে তার পিতা শান্তনুর নিকট ফিরিয়ে দেন। রাজা তাকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করেন। একসময় শান্তনু ‘সত্যবতী’ নামের এক ধীবররাজার কন্যার প্রেমে পড়েন (উনারও একটা লম্বা ইতিহাস আছে! মহাভারতের রচয়িতা নামে খ্যাত মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস এরই ঔরসজাত সন্তান, পরাশর মুনির সাথে কুমারী অবস্থায় নদীতে নৌকা মাঝে মিলিত হয়ে এই সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন)। সত্যবতীকে বিয়ে করতে চাইলে সত্যবতীর পিতা রাজা শান্তনুর কাছে রাণী এবং শুধু তার কন্যার পুত্রদেরই রাজ্যাধিকার চান। শান্তনু তাতে সম্মত না হয়ে বিষণ্ণ মনে প্রাসাদে ফেরত আসেন। নিজের পিতাকে বিষণ্ণ দেখে এবং অমাত্যদের কাছে এর কারণ শুনে তিনি ধীবররাজের কাছে ছুটে গিয়ে ধীবরকন্যা সত্যবতীকে তার পিতার জন্য চাইলেন। নিজে প্রতিজ্ঞা করলেন যে, তিনি রাজ্যভোগ ও বিবাহ করবেন না এবং নিঃসন্তান থাকবেন। এছাড়াও নিঃস্বার্থ এবং নিরাসক্ত হয়ে কুরুরাজ্যের আমৃত্যু সেবা করবেন। তার এরূপ দৃঢ় সংকল্পের কারণে তার পিতা শান্তনু খুশি হলেন এবং তাকে ভীষ্ম নাম ও ইচ্ছামৃত্যুর বর দিলেন। সেই থেকেই দেবব্রতের নাম পাল্টে গিয়ে তিনি ভীষ্ম নামে পরিচিত হলেন। ভীষ্ম নিজেকে কুরুবংশের অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

কাশীরাজের তিন কন্যা অপহরণঃ

বিয়ের পর শান্তনু ও সত্যবতী দম্পতির দুই পুত্র হলো, চিত্রাঙ্গদ এবং বিচিত্রবীর্য। এদের যৌবন লাভের পূর্বেই শান্তনুর মৃত্যু হয়। চিত্রাঙ্গদ যুবক বয়সে চিত্রাঙ্গদ নামেরই এক গন্ধর্বের সাথে যুদ্ধে নিহত হলে অপ্রাপ্তবয়স্ক বিচিত্রবীর্যকে ক্ষমতায় বসানো হয়। বিচিত্রবীর্য বড় হলে তার বিয়ের পাত্রীর জন্যে ভীষ্ম কাশীরাজের কন্যাদের স্বয়ংবর সভায় যান। কিছুটা বৃদ্ধ ভীষ্মকে দেখে উপস্থিত অন্য রাজা আর সভাসদরা উপহাস করলে ক্রোধান্বিত ভীষ্ম তাদের সামনে কাশীরাজের তিন কন্যা অম্বা, অম্বিকা এবং অম্বালিকাকে বলপূর্বক অপহরণ করেন। এই সময়ে অম্বার প্রেমিক শাল্বরাজ বাধা দিতে গেলে ভীষ্ম তাকে হত্যা করেন (মতান্তরে তাকে আহত করে ছেড়ে দেন)। পরে অম্বা তার প্রেমের কথা ভীষ্মকে জানালে তাকে সসম্মানে যেতে দেন।
অনেকে মনে করেন, এই সময়ে ভীষ্ম ও অম্বা পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। ভীষ্ম আর অম্বার এই কল্পিত প্রেম কাহিনী নিয়ে আলাদা বহু ভারতীয় সাহিত্য রচিত হয়েছে। তবে মূল মহাভারতে অম্বার প্রেমিক শাল্বরাজ অম্বাকে পরপুরুষ ছুঁয়েছে অভিযোগে পরিত্যাগ করে। আবার আরেক সংস্করণে প্রেমিককে অযথা হত্যার জন্য ভীষ্মের উপর অম্বা তীব্র রকমের ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, যেটি পরে দ্বন্দ্বে গিয়ে গড়ায়। বাকি দু’জন, অম্বিকা ও অম্বালিকার সাথে ভীষ্ম রাজা বিচিত্রবীর্যের বিয়ে দেন। বিচিত্রবীর্য দুই সুন্দরী পত্নী পেয়েই কামাসক্ত হয়ে পড়েন। এর সাত বছর পর কোনো উত্তরাধিকারী না রেখেই যক্ষ্মারোগে বিচিত্রবীর্য মারা যান।
অম্বা ও ভীষ্মের দ্বন্দ্বঃ

এদিকে সর্বদিকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অম্বা ভীষ্মকে তাকে বিবাহ করতে বললে ভীষ্ম তা করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অম্বা ভগবান পরশুরামকে ভীষ্মের বিরুদ্ধে যথাবিহিত করার আহ্বান করলে পরশুরাম তাকে নিয়ে ভীষ্মের কাছে উপস্থিত হয়ে দু’টি বিহিত করার আদেশ দিলেন: ১. অম্বাকে বিবাহ, কিংবা ২. যুদ্ধের আহ্বান। ভীষ্ম তার চিরকুমার থাকার প্রতিজ্ঞার জন্য বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিলেন না। সেজন্য গুরু-শিষ্য বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের যুদ্ধে কেউই কাউকে হারাতে পারলেন না। পরে দেবতারা উপস্থিত হয়ে তাদের যুদ্ধে নিরস্ত করলেন।
তখন অম্বা দেবতাদের কাছে পরজন্মে ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হতে চেয়ে বর চাইলে দেবতারা তা পূরণ করেন। অম্বা তখনি নিজেই নিজের চিতা সাজিয়ে তাতে দেহত্যাগ করেন। অম্বা পরবর্তীতে পাঞ্চালরাজা দ্রুপদের প্রথম কন্যা সন্তান হিসেবে জন্ম নেন। দ্রুপদ প্রথমে তার নারী পরিচয় গোপন রাখতে নাম রাখেন শিখণ্ডী। ঘটনাক্রমে তার সাথে দর্শানরাজ হিরণ্যবর্মার কন্যার সাথে বিয়ে হয় এবং সেই কন্যার কাছ থেকে শিখণ্ডীর আসল রূপ সর্বত্র প্রকাশ পেয়ে যায়। লোকে শিখণ্ডীকে “শিখণ্ডিনী” নামে ডাকতে আরম্ভ করে। এসব কথা দর্শানরাজের কানে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হন। ক্রুদ্ধ হিরন্যবর্মা পাঞ্চালের রাজা দ্রুপদকে যুদ্ধের আহ্বান করেন। দ্রুপদের বিপত্তিতে কষ্ট পেয়ে তাদের পুত্র রূপী কন্যা শিখণ্ডিনী গভীর বনে আত্মহননের উদ্দেশ্যে চলে যান। সেখানে স্বর্গের কোষাধ্যক্ষ কুবের দেবতার সঙ্গী এক যক্ষের সাথে শিখণ্ডিনীর সাক্ষাৎ হয়। সেই যক্ষই তার পুরুষত্ব শিখণ্ডিনীর সাথে অদলবদল করে শিখণ্ডিনীকে পুরুষ বানিয়ে দেয়। এসব তথ্য ভীষ্ম গুপ্তচর মারফৎ বিভিন্ন সময়ে জানতে পারেন এবং মনে মনে শিখণ্ডীকে বধের সংকল্প ত্যাগ করেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, ভীষ্ম রূপান্তরকামী, নারী ও দুর্বলের ওপর প্রহার না করার এবং তাদের সামনে অস্ত্র পরিত্যাগ করার শপথ করেছিলেন। এভাবেই দেবতাদের কথা সফল হয়েছিলো।
কুরুবংশ রক্ষাঃ

বিচিত্রবীর্য ও চিত্রাঙ্গদের কোন উত্তরাধিকারী না রেখে যাওয়ায় কুরুবংশ সংকটে পড়ে। এদিকে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার দরুন তিনিও সন্তান উৎপাদন করতে পারবেন না। এই সময়ে তিনি তার সৎ মাতা সত্যবতীর সাথে শলা-পরামর্শপূর্বক তার পুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মুনিকে বিচিত্রবীর্যের দুই স্ত্রীর গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্য ডেকে আনেন। তিনি ধীবরকন্যার সন্তান হওয়ায় তার শরীরে মাছের মতো গন্ধ ছিলো। আর সন্ন্যাসীর সাজপোশাকে থাকতেন বিধায় বিচিত্রবীর্যের দুই রাণী তাকে পছন্দ করলেন না। তবে ভীষ্ম আর সত্যবতীর জোরাজুরিতে তারা উভয়েই একবার একবার করে বেদব্যাসের সাথে মিলিত হন। অম্বিকা অপছন্দের মিলনের সময়ে ঘৃণাবশত চোখ মুদে ছিলেন, তাই বেদব্যাস তাকে অন্ধ পুত্র জন্ম দেয়ার অভিশাপ দেন। আর অম্বালিকা বেদব্যাসের সন্ন্যাসীর সাজ দেখে ভয়ে পাংশুটে চেহারা হয়ে গিয়েছিলেন। তাই বেদব্যাসের অভিশাপে তার পাণ্ডুবর্ণ পুত্র জন্ম হবে বলে জানলেন। এভাবেই বেদব্যাসের ঔরসে এক রাণীর গর্ভে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র, অপর রাণীর গর্ভে পাণ্ডুর জন্ম হয়। অন্ধ পুত্র জন্মের কারণে অম্বিকার শাশুড়ি সত্যবতী রজঃস্বলা হলে পুনর্বার তাকে বেদব্যাসের কাছে যেতে বলেন। তখন রাণী তার এক শূদ্র দাসীকে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। সেই দাসীর গর্ভে মহামতি বিদুরের জন্ম হয়। এমনভাবেই ভীষ্ম কুরুবংশকে এক অনিবার্য পতনের হাত থেকে উদ্ধার করেন।
ধৃতরাষ্ট্রে পূর্বজন্মঃ

ধৃতরাষ্ট্র তার পূর্ব জন্মে একজন ক্ষত্রিয় রাজা ছিলেন। আর তখনকার দিনে কিছু ক্ষত্রিয়রা হরিণের মাংসসহ অন্য পশু-পাখির মাংসও ভক্ষন করতো। একদিন রাজা হরিণ শিকারে জঙ্গলে যান এবং তিনি হঠাৎ একটি হরিণ দেখতে পান। হরিণটিকে ধরার জন্য তিনি হরিণটির পেছনে ছুটতে লাগলেন একবার হরিনটি সামনে আসে আবার আড়ালে চলে যায়। এক ধরনের মায়ার দ্বারা হরিনটি তাকে আকৃষ্ট করতে লাগলেন।' এভাবে হরিনটির পেছনে ছুটতে ছুটতে তিনি গভীর জঙ্গলে পৌঁছে যান এবং তখন সূর্য ডুবে যায়। ফলে রাজা আর প্রাসাদে যেতে পারলেন না। তাই বাধ্য হয়ে তিনি জঙ্গলেই একটি গাছের নিচে আশ্রয় নেন। তিনি গাছের ডালপালা ভেঙে গাছটির নিচে আগুন জ্বালালেন। রাজা খুবই ক্ষুধার্ত ছিলেন আর মনে মনে খাবাবের চিন্তা করছিলেন। তিনি যেই গাছটির নিচে বসে ছিলেন সেই গাছটির ওপরে ছিল এক পাখির বাসা। পাখির বাসাটিতে ছিল মা পাখি,বাবা পাখি আর তাদের একশো ছানা। বাবা পাখিটি মা পাখিকে বলতে লাগলো রাজা খুবই ক্ষুধার্ত আমাদের উচিত রাজাকে খাওয়ানো। বাবা পাখিটি বললো আমি আগুনে ঝাপ দিই আমার পালকগুলো পুড়ে যাবে এবং আমি ঝলসে যাবো তখন রাজা আমাকে খেতে পারবে। মা পাখিটি বললো তুমি মরে গেলে ছানাদের অনেক কষ্ট হবে তার চেয়ে বরং আমিই ঝাপ দিই। এক পর্যায়ে কথা কাটাকাটি হতে হতে হঠাৎ মা পাখিটি গাছ থেকে পড়ে যায় এবং সে ঝলসে যায়। পরে রাজা তার তীর দিয়ে আগুন থেকে পাখিটিকে উঠিয়ে খায়। খাবার পর রাজার ক্ষিধে আরও বেড়ে যায় রাজা তখন গাছের ওপরে তাকায় এবং দেখতে পায় গাছের ওপরে আরও পাখি আছে। তিনি তখন গাছ বেয়ে ওপরে উঠে বাবা পাখি আর তার ছানাগুলো নামায়। রাজা তার তীর দিয়ে ছানাগুলোর একচোখ দিয়ে ঢোকায় আর অন্যচোখ দিয়ে বের করে তীরে গাথে। এভাবে সে সবগুলো ছানাকে ঝলসে খায়। আর তার এই কৃতকর্মের জন্যই তিনি পরের জন্মে জন্মান্ধ হয়ে জন্ম গ্রহণ করেন এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাকে শত পুত্রের মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়।
প্রথমতঃ
ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ । এই ধরনের মানুষ রাজা হতে পারেনা যদিও তিনি বড় সন্তান । কিন্তু তিনি ছিলেন অত্যন্ত বলশালী ও ভালো যোদ্ধা । মানুষ হিসাবে খুব খারাপ ছিলেন এইটা পুরোপুরি বলা যাবেনা । শুধু অন্ধত্বের কারনে তিনি রাজা হতে পারেন নাই এইটা তিনি মেনে নিতে পেরেছিলেন না ।
তার পরিবর্তে রাজা হয়েছিলেন ছোট ভ্রাতা পান্ডু । তিনি বেশীদিন বাঁচেন নাই । আবার সেই সময় তিনি তথা পান্ডু নিঃসন্তান ছিলেন – ফলে বাধ্যহয়েই ধৃতরাষ্ট্রকে রাজা হতে হয় ।
তখনকার সময় নিয়োগ সন্তান ও কানীন সন্তান প্রথা ছিলো । যদি পিতা সন্তান উৎপাদন করতে অপারগ হোন অথবা স্বামী সন্তান হওয়া পূর্বেই মারা যান তখন বংশ রক্ষার জন্য পারিবারিক সম্মতির মাধ্যমে অন্যপুরুষের সংগে রাত্রিযাপন করা যায় অথবা কোন ব্রাক্ষ্মণের সংগে রাত্রি যাপন করা যায় এবং তার কারনে যেই সন্তান পৃথিবীতে আসতো তাকে বলা হয় নিয়োগ সন্তান । ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন নিয়োগ সন্তান । আবার কুমারী নারী , ব্রাক্ষ্মনের সংস্পর্শে এসে সন্তান গ্রহণ করেন , তাদের বলা হয় কানীন । যেমন কর্ণ ও ব্যাসদেব ।
পান্ডুর প্রথম স্ত্রী কুন্তী স্বামীর বিয়োগে ব্রাক্ষ্মনের সংস্পর্শে এসে সন্তান উৎপাদন করেন । তার প্রথম সন্তানের নাম যুধিষ্টির ।
ধৃতরাষ্ট্রের স্ত্রী গান্ধারীও গর্ভবতী হোন , কিন্তু তাঁর সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় ২ বছর পরে । তাদের প্রথম সন্তানের নাম দুর্যধন ।
যেহেতু যুধিষ্ঠির বড় সুতরাং তিনি হস্তিনাপুরের পরবর্তীরাজা হবেন এইটা আইন । কিন্তু দুর্যধন রাজা হতে চায় এবং ধৃতরাষ্ট্রে এতে সমর্থন থাকে যা মনের দিক থেকেও তার অন্ধত্বের প্রকাশ ঘটে । আর সেখান থেকেই শুরু মহাভারতে যুদ্ধ । যা ধৃতরাষ্ট্র চাইলে এড়ানো যেতো ।
প্রকাশ্যদরবারে দ্রৌপদির বস্ত্রহরণকে তিনি সমর্থন করেন । যা কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না । কারন দ্রৌপদি তার ছোট ভাই পান্ডুর সন্তানে বধু । যাকে কুলবধু বলা হয়ে থাকে। স্ত্রী অপমান কোন ধর্মেই সমর্থন করেনা । যা ধৃতরাষ্ট্র বন্ধ করতে পারতেন ।
তার স্ত্রী গান্ধারী বিধবা ছিলেন একথা না বলার কারনে তিনি গান্ধারীর পিতা গান্ধাররাজ সহ তার শতপুত্রকে ধরে নিয়ে এসে অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করেন । সেখানে তিনি ১০১ টি চালের দানা দিতেন তাদের খাদ্য হিসাবে। গান্ধার রাজ সহ অন্যান্য ভাই ঠিক করেছিলেন এভাবে চললে তারা সবাই মারা যাবেন তাই তারা ঠিক করেন শুধু একটি ভাইকে এই ১০১ টি চাল খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখবেন আর সবাই মারা যাবেন । যাতে ঐ জীবত ভাই এই কুরুবংশের ধ্বংসের কারণ হন । সেই একমাত্র ভাই হলেন শকুনী । যিনি গান্ধারীর ভাই । ধৃতরাষ্ট্রের শ্যালক ও দুর্যধনের মামা । যার প্রবল প্রভাব ছিলো ধৃতরাষ্ট্র ও ভাগনেদের প্রতি ।
"মহাভারত" মহাকাব্য অনুসারে রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কিছু ত্রুটি কী?

"মহাভারত" মহাকাব্যে কৌরবদের পিতা রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে একটি ত্রুটিপূর্ণ চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তার প্রধান কিছু ত্রুটি হল:
অন্ধত্ব: ধৃতরাষ্ট্র জন্মেছিলেন অন্ধ, রাজা কিন্তু তিনি তার পুত্র দুর্যোধনের প্রতি তার ভালবাসায় অন্ধও হয়েছিলেন। তিনি সত্য দেখতে অক্ষম ছিলেন, এমনকি যখন এটি তার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল, এবং প্রায়শই যুক্তির পরিবর্তে তার আবেগের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতেন।
পক্ষপাতিত্ব: ধৃতরাষ্ট্রের তার জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্যোধনের প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব ছিল, যার কারণে তিনি দুর্যোধনের অন্যায়কে উপেক্ষা করতেন এবং তাকে তার অন্যান্য পুত্র ও ভাগ্নেদের উপর পক্ষপাত করেছিলেন। এই পক্ষপাতিত্ব পরিবারে ফাটল সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়।
তার পুত্রদের উপর নিয়ন্ত্রণের অভাব: ধৃতরাষ্ট্র তার পুত্রদের শাসন করতে ব্যর্থ হন যখন তারা খারাপ আচরণ করে বা সহিংস কাজ করে। তিনি দুর্যোধনকে তার চাচাতো ভাই পান্ডবদের সাথে দুর্ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন, যা শুধুমাত্র দুই পরিবারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান শত্রুতাকে উস্কে দিয়েছিল।
ক্ষমতার প্রতি আসক্তি: ধৃতরাষ্ট্র হস্তিনাপুর রাজ্যের উপর তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বজায় রাখতে মগ্ন ছিলেন। তিনি তার ছেলেদের বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজকে সমর্থন করা এবং তার জনগণের কল্যাণকে উপেক্ষা করা সহ সিংহাসন ধরে রাখার জন্য যা কিছু করা দরকার তা করতে ইচ্ছুক ছিলেন।
বুদ্ধির অভাব: রাজা হিসেবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বুদ্ধির অভাব ছিল ধৃতরাষ্ট্রের। তিনি তার উপদেষ্টাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা তার রাজ্যের জন্য ক্ষতিকর ছিল।
ঈর্ষা: ধৃতরাষ্ট্র পান্ডবদের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন, বিশেষ করে তার ভাগ্নে যুধিষ্ঠিরের প্রতি, যিনি একজন জ্ঞানী এবং গুণী রাজপুত্র ছিলেন সকলের কাছে প্রিয়। এই ঈর্ষা তার পাণ্ডবদের ক্ষতি করার জন্য দুর্যোধনের পরিকল্পনাকে সমর্থন করে।
নিষ্ক্রিয়তা: ধৃতরাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে পাণ্ডব ও কৌরবদের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। তার পুত্র দুর্যোধন যখন অন্যায় করছিল তখন তিনি হস্তক্ষেপ করতে ব্যর্থ হন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে দেন।
সামগ্রিকভাবে, ধৃতরাষ্ট্রের ত্রুটিগুলি তার পরিবারের পতন এবং মহাভারতের মর্মান্তিক ঘটনার জন্য অবদান রাখে।
ধৃতরাষ্ট্র কি মহাভারতের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল?

হ্যাঁ ধৃতরাষ্ট্র অবশ্যই ছিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনকে (তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র) পাণ্ডবদের এই সমস্ত খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতেন। ধৃতশ্র তার পুত্রের অহংকার বিসর্জন দিয়ে মহাভারতের যুদ্ধ এড়াতে পারতেন। কিন্তু তিনি তার ছেলের ভালোবাসায় আবদ্ধ ছিলেন এবং যার কারণে তিনি তার ছেলেকে আটকাতে পারেন না। দুর্যোধন সর্বদা পরবর্তী রাজা হতে চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি জানতেন যে যুধিষ্ঠির (পান্ডবদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ) সিংহাসনের জন্য এগিয়ে ছিলেন, তাই দুর্যোধন পাণ্ডবদের থেকে ঈর্ষান্বিত হতে শুরু করেছিলেন।
এমনকি ধৃতরাষ্ট্রও চান তার ছেলে পরবর্তী রাজা হোক। তিনি জানেন যে আপনি যোগ্য একজন হয়েও রাজা হতে না পারলে কেমন লাগে। ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন পাণ্ডুর বড় ভাই কিন্তু তিনি অন্ধ হওয়ায় (রাজা হওয়ার জন্য শারীরিকভাবে উপযুক্ত ছিলেন না) তিনি রাজা হতে পারেননি। পাণ্ডু সিংহাসন ত্যাগ করলে ধৃতরাষ্ট্র সিংহাসন পেয়েছিলেন এবং তিনি সর্বদা জানতেন যে তাকে পাণ্ডুর জ্যেষ্ঠ পুত্রের (অর্থাৎ যুধিষ্ঠির) কাছে সিংহাসন হস্তান্তর করতে হবে। তাই ধৃতরাষ্ট্রের জীবনের অভিজ্ঞতাও ছিল দুর্যোধনের ভুল জেনেও দুর্যোধনকে থামাতে না পারার অন্যতম কারণ।
এছাড়াও পিতার ভালবাসা একটি শক্তিশালী ভালবাসা "প্রত্যেক পিতা তাদের সন্তানদের সেরা দিতে চান"। ধৃতরাষ্ট্র তার পুত্রকে পরবর্তী রাজা হতে চাওয়া তার দৃষ্টিতে ভুল ছিল না কিন্তু দুর্যোধন যেভাবে তা সম্পন্ন করতে গিয়েছিলেন তা ভুল ছিল। পাণ্ডবদের প্রতি দুর্যোধনের হিংসার মধ্যে ধৃতরাষ্ট্রেরও ঈর্ষার অনুপাত ছিল। সংক্ষেপে পিতার ভালবাসা ধৃতরাষ্ট্রকে ভুল পথে দাঁড় করিয়েছিল এবং তার সমস্ত পুত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল।
ভারতের মার্ভেলস অ্যান্ড মিস্ট্রিজের লেখক আপডেটেড 4 y
সম্পর্কিত
ধৃতরাষ্ট্রের ভালো দিকগুলো কী কী?

প্রশ্নটি দেখতে সহজ, কিন্তু এর উত্তরটি বরং জটিল, কারণ এটি একটি কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ, যদিও দুষ্ট নয়, মানব মনোবিজ্ঞানের পরীক্ষা করে। নিম্নলিখিতটি বিস্তৃতভাবে মহাভারতের অন্যতম সম্মানিত আধুনিক ভাষ্যকার ভিএস সুকথাঙ্করের একটি সুনির্দিষ্ট এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে:
অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র একজন সাধারণ ব্যক্তিত্ব - সম্পূর্ণ ভালও নয়, সম্পূর্ণ মন্দও নয়। তার বেদনাদায়ক পাপ শুধু এই যে, তার সমস্ত দুর্দান্ত শারীরিক শক্তির জন্য, মানসিকভাবে সে দুর্বল এবং অস্থির, ভাল এবং মন্দের মধ্যে ক্রমাগত দোদুল্যমান। তার ভাল আবেগ আছে, কিন্তু তারা সবচেয়ে দুর্বল। তিনি জানেন, এবং অনুভব করেন যে পাণ্ডবদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে, যাদের তিনি নিজেই পরিবারের অভিভাবক। কিন্তু তিনি সর্বদা তার ভ্রান্ত পুত্রদের দুষ্টু কাজ এবং দুষ্টতাকে সমর্থন এবং ব্যাখ্যা করতে প্রবণ হন। যেহেতু তার নিজের নিষ্ক্রিয়তার অশুভ পরিণতি তার সামনে বড় আকার ধারণ করছে, সে ক্ষীণভাবে নিয়তি এবং পৌরুষের উপর দৈবের অস্পষ্ট আধিপত্যের উপর দোষ চাপিয়ে দোষী বিবেককে সহজ করার চেষ্টা করে ।
প্রাথমিকভাবে, যখন তার ভাইয়ের এতিম শিশুদের তার দায়িত্বে আনা হয়, তখন তিনি তাদের প্রতি স্নেহশীল এবং সদয় হন। কিন্তু সেই মেজাজ বেশিদিন স্থায়ী হয় না, কারণ তিনি সিংহাসনের উত্তরসূরি হিসেবে ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় নবাগতদেরকে তার ছেলেদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ধৃতরাষ্ট্র নামে একটি সূক্ষ্ম শ্লেষ রয়েছে , যার অর্থ হল ' যে রাজ্য দখল করেছে '। তাৎপর্যপূর্ণভাবে আবার, তার অন্ধত্বও সূক্ষ্মভাবে প্রতীকী, যতটা শারীরিক ততটা মানসিক। তিনি নিজের জন্য উপলব্ধি করতে এবং বিচার করতে অক্ষম এবং ক্রমাগত তার চারপাশের লোকদের প্রভাবের অধীনে চলে যান। কিন্তু তার প্রধান ধারণা হল তার নিজের নিরাপত্তা এবং যেকোনো মূল্যে তার ছেলেদের স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়া। অবিভক্ত সার্বভৌমত্বের প্রতি তাদের সন্দেহজনক দাবী রক্ষা করার জন্য, তিনি পান্ডবদের পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য দুর্যোধনের পরিকল্পনায় পড়েন। কিন্তু তিনি সত্যিই শোকাহত যে তারা পুড়িয়ে মারা হয়েছিল এবং পরে স্বস্তি পেয়েছিলেন এবং খুশি হন যে তারা রক্ষা পেয়েছে এবং প্যাঁচাল রাজকুমারীকে বিয়ে করেছে। অবিলম্বে যদিও তিনি আবার দুর্যোধনের স্ব-পরিষেবা পরিকল্পনার মন্ত্রের আওতায় পড়েন, কিন্তু ভীষ্ম ও দ্রোণের ঋষি পরামর্শে টেনে নেন এবং পাণ্ডবদের পুনর্বহাল করেন। কিন্তু বিদুরের সদর্থক উপদেশকে উপেক্ষা করে, দুর্ভাগ্যজনক পাশা-খেলার পর্বে সে তার পৈতৃক দুর্বলতার কাছে আত্মসমর্পণ করে। তিনি নিয়তিকে দোষারোপ করেন, কিন্তু তার বিবেকের ছাড় হিসাবে, হিংসা ও লোভের পরিণতি সম্পর্কে দুর্যোধনকে মৃদু ভর্ৎসনা করেন, তবুও আর কিছুই করেন না। পাণ্ডবদের জন্য খেলাটি বিপর্যয়করভাবে শেষ হয়, যখন ধৃতরষ্ট্র বিবেকের যন্ত্রণা ভোগ করে এবং দুর্যোধনের উপর তিরস্কার করে, যুধিষ্ঠিরকে আশীর্বাদ করে এবং তাকে মুক্ত করে। এর পরপরই তিনি আবারও দুর্যোধনের পরিকল্পনায় সম্মত হন নির্দোষ যুধিষ্ঠিরকে পাশা দেওয়ার দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জে প্রতারণা করার এবং তার ভাগ্নেদের তেরো বছরের জন্য নির্বাসনে পাঠানোর কঠোর শর্তে সম্মত হন। আবার তাদের চলে যাওয়ার পর সে ভয় ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ে। তার মানসিক পেন্ডুলাম কি সঠিক এবং অন্যটি উচ্চারিত কোনটি ভুলের দিকে সামান্য দুলছে, কুরুক্ষেত্রে চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি পর্যন্ত এইভাবে চলে।
শ্রী কৃষ্ণ প্রেম তার ভগবদ-গীতার বইতে উল্লেখ করেছেন, দুর্বল কুরু রাজা অভিজ্ঞতামূলক অহং, নিম্ন এবং ক্ষণস্থায়ী ব্যক্তিত্ব, অহংবোধ এবং মূর্খ মোহ দ্বারা অন্ধ হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। গীতা (3.27) অহঙ্কার-বিমুহাত্মার বর্ণনাকারী তার চরিত্রের সাথে মানানসই, যা সম্পূর্ণ মন্দ না হয়েও তার দুর্বল মানবিক দুর্বলতা দ্বারা মন্দ শক্তিকে সাহায্য করে।
সংস্কৃতে ধৃতরাষ্ট্র মানে কি?
=================
শব্দের দুটি অংশ ধৃত-রাষ্ট্র। তাদের অর্থ হল 'অধিষ্ঠিত বা সমর্থিত' এবং 'জাতি বা অঞ্চল'।
সুতরাং কেউ "অধিষ্ঠিত জাতি" এর মোট অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারে তবে এটি উদ্দেশ্যমূলক অর্থ নয়।
সম্মিলিত শব্দটি জাতির রাজার নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। (তিনি মহাভারতে কৌরবদের পিতা ছিলেন।)
অভিপ্রেত অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে "একজন যিনি জাতিকে একত্রিত করেছিলেন"।

কুরুক্ষেত্র কেন ধর্মক্ষেত্র ?
====================
ধর্মক্ষেত্র / তীর্থক্ষেত্র। ধর্মের সংসার- পবিত্র সংসার জীবন যাপন।
==============================================
মহাকবি কালিদাস তাঁর মেঘদূত কাব্যে বলছেন কুরুক্ষেত্র ও ব্রহ্মাবর্ত একই । এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন ব্রহ্মাবর্ত কি ?
বেদ মতে সরস্বতী ও দৃষদ্বতী নদীর মধ্যে অবস্থিত ভূমিকে বলা হয় ব্রহ্মাাবর্ত বা ব্রাক্ষ্মণের অঞ্চল ।
মনুস্মৃতিতে দৃষদ্বতী ও সরস্বতী নদী ব্রহ্মাবর্ত বৈদিক নগরের সীমানা সংজ্ঞায়িত করেছে বলে বিবরণ পাওয়া যায়ঃ
"সরস্বতী ও দৃষদ্বতী এই দুই প্রশস্ত দেবনদীর মধ্যস্থলে যে সকল দেবনির্মিত দেশ অর্থাৎ প্রশস্ত দেশ আছে, তাদেরকে ব্ৰহ্মাবৰ্ত বলে।"
মনুস্মৃতি অনুসারে, ব্রহ্মাবর্ত থেকে স্থান এবং এর বাসিন্দাদের বিশুদ্ধতা আরও হ্রাস পেয়েছে। আর্য (সম্ভ্রান্ত) লোকেরা "ভাল" এলাকায় বসবাস করে বলে বিশ্বাস করা হত এবং সেখান থেকে দূরত্ব বাড়লে জনসংখ্যার মধ্যে ম্লেচ্ছ (বর্বর) লোকের অনুপাত বেড়ে যায়। এটি ব্রহ্মাবর্ত কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাওয়ায় বিশুদ্ধতা হ্রাসের এককেন্দ্রিক বৃত্তের একটি সিরিজ বোঝায়।
দৃষদ্বতী শব্দের অর্থ পরিষ্কার জলের অধিকারিনী । ঋগ্বেদ মতে, বৈদিক জনগণ আধ্যাত্মিক কার্যক্রমের জন্য দৃষদ্বতীকে পছন্দ করতো।
সরস্বতী" শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ এভাবেও হতে পারে - সরসু+অতি সেক্ষেত্রে শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় "যা প্রচুর জল ধারণ করে ।
এটিকে এমন স্থান হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে যেখানে "ভাল" মানুষ জন্মগ্রহণ করে। নামটি "পবিত্র ভূমি", "দেবতার আবাস", এবং "সৃষ্টির দৃশ্য" ইত্যাদি ইত্যাদি ।
সংস্কৃতের অধ্যাপক প্যাট্রিক অলিভেলের করা মনুস্মৃতির অনুবাদ বলেছে:
===========================================
দেবতাদের দ্বারা সৃষ্ট এবং ঐশ্বরিক নদী সরস্বতী ও দ্রীষবতীর মধ্যে অবস্থিত ভূমিকে বলা হয় 'ব্রহ্মাবর্ত' - ব্রাহ্মণের অঞ্চল। সেই ভূখণ্ডের সামাজিক শ্রেণী ও মধ্যবর্তী শ্রেণীর মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে আচরণ করা হয় তাকে বলা হয় 'ভালো মানুষের আচরণ'। কুরুক্ষেত্র এবং মৎস্য, পাঞ্চাল ও শূরসেনদের ভূমি 'ব্রাহ্মণ দ্রষ্টার দেশ' গঠন করে, যা ব্রহ্মবর্তের সীমানা। পৃথিবীর সকল মানুষের উচিত সেই দেশে জন্মগ্রহণকারী ব্রাহ্মণের কাছ থেকে তাদের নিজ নিজ চর্চা শেখা উচিত।
মনুস্মৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সরস্বতী কুরু প্রদেশের উত্তর সীমারেখা তৈরি করলেও, দৃষদ্বতী কুরু প্রদেশের দক্ষিণে ও ব্রহ্মাবর্তের উত্তরে প্রবাহিত হয়েছিল। মহাভারত অনুসারে , কুরু প্রদেশের দক্ষিণ সীমানায় ছিল গুরু দ্রোণের আশ্রম (বর্তমানে গুরগাঁও এক প্রান্তে ও রোহতক ও ঝজ্জরের অপর প্রান্তে অবস্থিত;) এই শহরের দক্ষিণ দিকে দৃষদ্বতী প্রবাহিত হতো।
কুরুক্ষেত্র
======
হিন্দু পৌরাণিক মহাকাব্য মহাভারতে বর্ণিত কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধক্ষেত্র বিশেষ। মহাভারতে মতে ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সন্ধিতে পরশুরাম এই তীর্থক্ষেত্রটি তৈরি করেছিলেন। তখন এর নাম ছিল সমন্তপঞ্চক। জাবাল উপনিষদ ও শতপথ ব্রাহ্মণে একে দেবতাদের যজ্ঞস্থান নামে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ভরতবংশীয় রাজা কুরুর নামানুসারে এই স্থানের নাম কুরুক্ষেত্র বা কুরুজাঙ্গাল হয়। বর্তমানে ভারতের হরিয়ানা প্রদেশের একটি জেলা। এই স্থানটি ধর্মক্ষেত্র নামে পরিচিত ছিল।
সমন্তপঞ্চকের ইতিহাসঃ
===============
মহাভারতের আদি পর্বের দ্বিতীয় অধ্যায়ে, নৈমিষারণ্যে মহর্ষিদের কাছে এই তীর্থ সম্পর্কে বর্ণনা করেন।
ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে বিষ্ণুর তিন অবতারের দ্বিতীয় অবতার হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন পরশুরাম। কার্তবীর্যের পুত্ররা তাঁর পিতা জমদগ্নীকে হত্যা করেছে, এই সংবাদ পাওয়ার পর পরশুরাম ক্ষত্রিয় নিধন করার উদ্যোগ নেন। মহাভারতের মতে তিনি একুশবার পৃথিবীকে নিঃক্ষৎত্রিয় করেন। এই সময় ক্ষত্রিয়দের রক্ত দিয়ে পাঁচটি হ্রদ তৈরি করেন। পরে সেই হ্রদের রক্ পিতৃলোকের তর্পণ করেছিলেন। এরপর ঋচীক প্রভৃতি পিতৃগণ এসে এই কাজের প্রশংসা করেন এবং বর প্রার্থনা করতে বলেন। উত্তরে পরশুরাম বলেন যে, "হে পিতৃগণ! যদি প্রসন্ন হইয়া ইচ্ছানুরূপ বর প্রদানে অনুগ্রহ করেন, তাহা হইলে ক্রোধে অধীর হইয়া ক্ষৎত্রিয়বংশ ধ্বংস করিয়া যে পাপরাশি সঞ্চয় করিয়াছি, সেই সকল পাপ হইতে যাহাতে মুক্ত হই এবং এই শোণিতময় পঞ্চহ্রদ অদ্যাবধি পৃথিবীতে তীর্থস্থান বলিয়া যাহাতে প্রখ্যাত হয়, এরূপ বর প্রদান করুন।' পিতৃগণ সেই বর প্রদান করে, ক্ষত্রিয়দের হত্যা বন্ধ করার কথা বলে যান। এরপর পরশুরাম ক্ষত্রিয়নিধন বন্ধ করে দেন।
আবারঃ
=====
সন্ন্যাস গ্রহণ করে কুরু এখানে তপস্যা করে স্থানটি পবিত্র ধর্মক্ষেত্রে পরিণত করেন । কুরুর যজ্ঞকালে সরস্বতী নদী , ওঘবতী নদী - রূপে এসে এই জমি ভিজিয়ে দিয়ে যান । যজ্ঞের পর এখানে হাল চালনা করে কুরু বরলাভ করেন যে , এখানে যাঁরা প্রাণত্যাগ করবেন তাঁরা স্বর্গে যাবেন । কুরু এখানে সব সময়েই হাল চালনা করতেন । কৌতূহলী ইন্দ্র মানুষের স্বর্গলাভের এই সহজ-পন্থা রোধ করার জন্য কুরুর কাছে এসে হাল চালনা করতে বারণ করলে উভয়ের মধ্যে শর্ত হয় , এখানে উপবাস করে কিংবা যুদ্ধ করে মারা গেলে মানুষ এমনকি পশুরাও স্বর্গে যাবে । কুরুক্ষেত্রে ইক্ষুমতী নদীতীরে তক্ষক বাস করতেন । কুরুক্ষেত্রে শান্তনুর পুত্র চিত্রাঙ্গদ নিহত হন । দৈত্যপতি সুন্দ ও উপসুন্দ কুরুক্ষেত্রে বাস করতেন । প্রাচীনতম রাজা মান্ধাতা এই কুরুক্ষেত্রেই পূণ্যযজ্ঞ করেছিলেন । মহান মুদগল মুণিরও বসতি ছিল এই কুরুক্ষেত্র ।
আবারঃ
====
শতপথ ব্রাহ্মণে আছে, “দেবাঃ হ বৈ সত্রং নিষেদুরগ্নিরিন্দ্রঃ সোমো মখো বিষ্ণুর্বিশ্বেদেবা অন্যত্রেবাশ্বিভ্যাম্। তেষাং কুরুক্ষেত্রং দেবযজনমাস। তস্মাদাহুঃ কুরুক্ষেত্রং দেবযজনম্।” অর্থাৎ দেবতারা এইখানে যজ্ঞ করিয়াছিলেন, এজন্য ইহাকে ‘দেবতাদিগের যজ্ঞস্থান’ বলে।
নিচে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর ভাষ্যটি হুবুহু তুলে ধরা হলো—
====================================
কুরুক্ষেত্র একটি চক্র বা জনপদ। ঐ চক্র এখনকার স্থানেশ্বর বা থানেশ্বর নগরের দক্ষিণবর্তী। আম্বালা নগর হইতে উহা ১৫ ক্রোশ দক্ষিণ। পানিপাট হইতে উহা ২০ ক্রোশ উত্তর। কুরুক্ষেত্র ও পানিপাট ভারতবর্ষের যুদ্ধক্ষেত্র, ভারতের ভাগ্য অনেক বার ঐ ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি পাইয়াছে। “ক্ষেত্র” নাম শুনিয়া ভরসা করি, কেহ একখানি মাঠ বুঝিবেন না। কুরুক্ষেত্র প্রাচীন কালেই পঞ্চ যোজন দৈর্ঘ্যে এবং পঞ্চ যোজন প্রন্থে। এই জন্য উহাকে সমন্তপঞ্চক বলা যাইত। চক্রের সীমা এখন আরও বাড়িয়া গিয়াছে।
কুরু নামে এক জন চন্দ্রবংশীয় রাজা ছিলেন। তাঁহা হইতেই এই চক্রের নাম কুরুক্ষেত্র হইয়াছে। তিনি দুর্য্যোধনাদির ও পাণ্ডবদিগের পূর্ব্বপুরুষ; এজন্য দুর্য্যোধনাদিকে কৌরব বলা হয়, এবং কখন কখন পাণ্ডবদিগকেও বলা হয়। তিনি এই স্থানে তপস্যা করিয়া বর লাভ করিয়াছিলেন, এই জন্য ইহার নাম কুরুক্ষেত্র। মহাভারতে কথিত হইয়াছে যে, তাঁহার তপস্যার কারণেই উহা পুণ্যতীর্থ। ফলে চিরকালই কুরুক্ষেত্র পুণ্যক্ষেত্র বা ধর্মক্ষেত্র বলিয়া প্রসিদ্ধ।
বি দ্রঃ যোজন প্রাচীন ভারতের দূরত্বের একক। রামায়ণ অনুসারে পুষ্পক রথে চড়ে রাবণ ও লাফ দিয়ে হনুমান শত যোজন বিস্তৃত সাগর পার হয়ে লঙ্কায় পৌঁছেছিল। গুপী গাইন বাঘা বাইন চলচ্চিত্রে ষুণ্ডি থেকে হল্লা রাজ্যের দূরত্ব ছিলো ২০ যোজন।
বিষ্ণুপুরাণ এর ষষ্ঠ খন্ডের প্রথম অধ্যয়ে বলা হয়েছে-
১০ পরমাণু= ১ পরাসুক্ষ্ম; ১০ পরাসুক্ষ্ম= ১ ত্রসরেনু; ১০ ত্রসরেনু= ১ মহীরজ; ১০ মহীরজ= ১ বালাগ্র; ১০ বালাগ্র= ১ লিক্ষা; ১০ লিক্ষা = ১ যুক; ১০ যুক= ১ যবোদর; ১০ যবোদর= ১ যব; ১০ যব = ১ অঙ্গুলি(প্রায় ৩/৪ ইঞ্চি); ৬ অঙ্গুলি= ১ পদ; ২ পদ = ১ বিতস্তি; ২ বিতস্তি = ১ হস্ত; ৪ হস্ত = ১ ধনু; (১ দন্দ অথবা পৌরুষ অথবা নারীকা= ৬ ফুট; ১হস্ত=১.৫ফুট); ২০০০ ধনু= ১ গব্যুতি = ১২০০০ ফুট; ৪ গব্যুতি= ১ যোজন= ৯.০৯ মাইল
মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ এখানে হয়েছিলো । এইটা আমরা সবাই জানি। যারা এখানে মারা গিয়েছিলো তারা সবাই (দুর্যধন সহ ) স্বর্গে অবস্থান করছে ।
এরকম বিভিন্ন কারনে কুরুক্ষেত্র সবার কাছে ধর্মক্ষেত্র বলা হয় ।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কীভাবে আমাদের মন শরীরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ?

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বললেই আমাদের মনে ভেসে উঠে এক ভীষণ যুদ্ধ। অর্জুনের তীর, ভীমের গদা, শ্রী কৃষ্ণের সুদর্শন চক্র, দিব্য রথ এমন আরো অনেক অনেক ঘটনা প্রবাহ। আবার ধর্মের সাথে যুদ্ধের ই বা কী সম্পর্ক! অবশ্যই সম্পর্ক আছে। অধর্মের বিনাসের জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন হয়। কুরুক্ষেত্রে যে যুদ্ধ দেখানো হয়েছে তাও অধর্মের বিরুদ্ধে। সেখানে সত্যেরই জয় হয়েছিলো৷ তাই তা ছিলো ধর্মযুদ্ধ। এই যুদ্ধ আমাদের শরীর ও মনে অনবরত চলছে। শরীর ও মনে আবার যুদ্ধ কিরকম!

গীতায় বলা হয়েছে , "ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রমিত্যভিধীয়তে"- অর্থাৎ , কৌন্তেয়! এই দেহটায় ক্ষেত্র এর মধ্যে ভাল-মন্দ কর্মরূপ যে বীজবপন করা হয়, তা সংস্কাররুপে অঙ্কুরিত হতে থাকে। দশটি ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহংকার পাঁচটি বিকার এবং সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এই তিনটি গুণের বিকার হল এই ক্ষেত্রে বিস্তার। প্রকৃতিজাত এই ত্রিগুণদ্বারা অভিভূত হয়ে মানুষ কর্ম করে। মানুষ ক্ষণকালও কর্ম না করে থাকতে পারে না। " পুনরপি জনম্ পুনরমি মরণম্ জননী জঠরে শয়নম্ ।" জন্ম জন্মান্তর ধরে এই ক্রিয়াই তো চলছে। এটাই কুরুক্ষেত্র। গুরুর শরণাগত হয়ে যখন কোমো সাধক সঠিক পথে চলে পরমধর্ম পরমাত্মার দিকে অগ্রসর হয়, তখন এই ক্ষেত্রই ধর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়৷ তাই এই দেহটাই ক্ষেত্র।

এই শরীরের অন্তরালে অন্তঃকরণের দুইটি পুরাতন প্রবৃত্তি বিদ্যমান, সে দুটি হল - দৈবী সম্পদ্ ও আসুরী সম্পদ্। দৈবী সম্পদে আছেন পুণ্যরূপ পান্ডু এবং কর্তব্যরূপ কুন্তী। পুণ্য জাগ্রত হবার আগে মানুষ কর্তব্য ভেবে যা কিছু করে, নিজের বুদ্ধি অনুসারে সে কর্তব্যই করে, কিন্তু তার দ্বারা কর্তব্য পালন হয় না- কারণ পুণ্য ছাড়া কর্তব্য কি তা বোঝা সহজ নয়। কুন্তী পান্ডুর সঙ্গে সম্বন্ধ হওয়ার হওয়ার পূর্বে সূর্যের বর পেয়ে যাকে অর্জন করেছিলেন, তিনি ছিলেন "কর্ণ"। আজীবন তিনি কুন্তীর পুত্রদের সাথে যুদ্ধই করেছিলেন৷ পান্ডবদের দুর্ধর্ষ শত্রু যদি কেউ থেকে থাকেন, তিনি হলেন কর্ণ। বিজাতীয় কর্মই হল " কর্ণ", যা বন্ধনের কারণ, যার থেকে পরম্পরাগত গোঁড়ামীর চিত্রণ হয়।

মস্তিষ্ক পূর্ণ জাগ্রত হলে ধর্মরূপ যুধিষ্ঠির, অনুরাগরূপ অর্জুন, ভাবরূপ ভীম, নিয়মরূপ নকুল, সৎসঙ্গরূপ সহদেব, সাত্বিকতারূপ সাত্যকি, কায়াতে সামর্থ্যরূপ কাশিরাজ, কর্তব্যদ্বারা জগতে বিজয়রূপ কুন্তীভোজ ইত্যাদি ইষ্টোন্মুখ মানসিক প্রবৃত্তিরূপ উৎকর্ষ হয়। যারা গণনায় সাত অক্ষৌহিনী। 'অক্ষ' দৃষ্টিকেই বলা হয়। সত্যময় দৃষ্টিকোণ দিয়ে যার গঠন হয়, তাকেই বলে দৈবীসম্পদ্। পরমধর্ম পরমাত্মাপর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয় এই সাতটি সোপান, 'সাতটি ভূমিকা', কোনো অন্য গণনা নয়। বস্তুত এই প্রবৃত্তিসমূহ অনন্ত। তাই বলা হয়েছে সাত অক্ষৌহিনী৷

অন্যদিকে কুরুক্ষেত্র, ' যাতে দশটি ইন্দ্রিয় ও একটি মন মিলিত হয়ে সেনার সংখ্যা দাড়িয়েছে এগারো অক্ষৌহিনী। মন ও ইন্দ্রিয়গম্য দৃষ্টিকোণ দিয়ে যার গঠন হয়, তাকে বলা হয়ে থাকে আসুরী সম্পদ্। তার মধ্যে আছে অজ্ঞানরূপ ধৃতরাষ্ট্র, যে সব সত্য জেনেও অন্ধ। তার সহচারিণী গান্ধারী - ইন্দ্রিয়ের আধারযুক্ত প্রবৃত্তি। তার সঙ্গে আছে মোহরূপ ' দুর্যোধন', দুর্বুদ্ধিরূপ 'দুঃশাসন', বিজাতীয় কর্মরূপ কর্ণ, ভ্রমরূপ ভীষ্ম, দ্বৈতের আচরণরূপ দ্রোণাচার্য, আসক্তিরুপ অশ্বত্থামা, বিকল্পরূপ বিকর্ণ, অপূর্ণ সাধনে কৃপার আচরণরূপ কৃপাচার্য, আর আছেন বিদূর যাঁর অজ্ঞানের মধ্যে থাকা সত্বেও তাঁর দৃষ্টি পান্ডবদেরও উপরে ছিলো, পুণ্য থেকে প্রবাহিত প্রবৃত্তির উপর ছিলো, কারণ আত্মা পরমাত্মারই শুদ্ধ অংশ। এই প্রকার আসুরিক সম্পদ্ ও অনন্ত। ক্ষেত্র একটাই, এই দেহটা ; এর মধ্যে যুদ্ধে ইচ্ছুক প্রবৃত্তি দুইটি - একটি প্রকৃতিতে বিশ্বাস এনে দেয় ও অন্যটি পরমপুরুষ পরমাত্মাতে বিশ্বাস ও প্রবেশ দেয়। তত্বদর্শী মহাপুরষের সংরক্ষণে সাধন করলে ক্রমশঃ দৈবী সম্পদের উৎকর্ষ ও আসুরিক সম্পদের সর্বথা শমন হয়। মনে যখন কোনো বিকার থাকেনা তখন মন নিরুদ্ধ হয় শেষে এই নিরুদ্ধ মনেরও সম্পূর্ণ রূপে বিলয় হয়। এই অবস্থায় দৈবী সম্পদের আর কোনো প্রয়োজন থাকে না৷ বিশ্বরূও দর্শনের সময় অর্জুন দেখেছিলেন যে, কৌরব পক্ষের পরে পান্ডব পক্ষের যোদ্ধাও যোগেশ্বরের মুখ-গহ্বরে সমাহিত হচ্ছেন। অর্থাৎ, সাধনার অন্তিম স্তরে দৈবী সম্পদ্ ও বিলয় হয় এবং সনাতন -শাশ্বত সত্য পরিণাম দৃষ্টিগোচর হয়।


সমবেতা = সমবেত 
যুযুৎসবঃ = যুদ্ধ করার মানসে
মামকাঃ = আমার পুত্র তথা ধৃতরাষ্টের পুত্র 

ধৃতরাষ্ট্রের মোট জীবিত সন্তান ১০১ টি এবং কন্যা ১ টি । 
ধৃতরাষ্ট্র গান্ধার রাজ্য আক্রমণ করে রাজকন্যা গান্ধারী ও তার ১০ জন সৎ বোন সত্যব্রতা, সত্যসেনা,সুদেষ্ণা,সংহিতা, শম্বঠা, সুশ্রবা, তেজশ্রবা,নিকৃতি, শুভা ও দশর্ণাকে বিবাহ করেন।গান্ধারী নিজে চোখ ঢেকে রাখতেন তার স্বামীর জন্য। ধৃতরাষ্ট্রর ঔরসে গান্ধারী গর্ভবতী হন আর দুই বৎসর পর এক মাংসপিন্ড প্রসব করেন যার থেকে ১০০ পুত্র ও কন্যা দুঃশলার জন্ম হয়। গান্ধারী যখন দুই বছর যাবৎ গর্ভবতী ছিলেন তখন কোনো সন্তান জন্ম না নেওয়ার ভয়ে ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীর প্রধান দাসী সুঘদা বা সৌবালির সাথে মিলিত হন।সুঘদার গর্ভে যুযুৎসু নামে একটি পুত্র জন্মে।এছাড়াও ধৃতরাষ্ট্র তার মামা কাশীরাজ সেনাবিন্দুর কন্যাকেও বিবাহ করেন।কাশির রাজকন্যা একটি মৃত পুত্রের জন্ম দিয়ে মারা যান।এই পুত্রটি ধৃতরাষ্ট্র কাশ্য অর্থাৎ কাশির ধৃতরাষ্ট্র নামে পরিচিত।

পাণ্ডবাশ্চৈব = পাণ্ডুর পুত্র  

আসুন আমরা পাণ্ডু সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি । 

শান্তনুর কনিষ্ঠ পুত্র বিচিত্রবীর্যের মৃত্যু হয় নিঃসন্তান অবস্থায়। হস্তিনাপুর রাজহীন দেখে রাজমাতা সত্যবতী তার জ্যেষ্ঠতম পুত্র, ব্যাসদেবকে আহ্বান করেন তার দুটি পুত্রবধূ অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে নিয়োগ প্রথায় দুটি সন্তান উৎপন্ন করতে। ব্যাসদেবের মন্ত্রবলে অম্বালিকার গর্ভসঞ্চার হলে, তিনি একটি পাণ্ডুবর্ণ সন্তানের জন্ম দেন। এই সন্তানের নাম হয় পাণ্ডু। পাণ্ডুর নামের অর্থ ফ্যাকাশে।

তিনি তীরন্দাজি, রাজনীতি, প্রশাসন এবং ধর্ম বিষয়ে ভীষ্মের কাছে শিক্ষা নেন। তিনি ছিলেন একজন দুর্দান্ত তীরন্দাজ এবং মহারথী (যোদ্ধা)।অম্বিকার গর্ভের সন্তান ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হওয়ার ফলে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর পাণ্ডু রাজা হন। তিনি যথেষ্ট প্রজাবৎসল ছিলেন। তার বিবাহ হয় কুন্তীভোজের পালিতা কন্যা, তথা বসুদেবের বোন কুন্তীর সাথে। পরবর্তীকালে মদ্রদেশের রাজকন্যা মাদ্রীর সাথে তার বিবাহ হয়।ভীষ্ম এই বিবাহের প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি পরবর্তীকালে সিন্ধু রাজ্যকাশীঅঙ্গত্রিগর্ভ রাজ্যকলিঙ্গমগধের অঞ্চলগুলি জয় করেছিলেন । এভাবে তিনি সমস্ত রাজাদের উপরে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর সাম্রাজ্যের পরিধি আরও বাড়িয়ে তোলেন।

কিন্দমের অভিশাপ

বিয়ের পর মৃগয়ার সময়ে তিনি ভুলবশত দুটি মিলনরত হরিণকে বিদ্ধ করেন। সেটি ছিল আসলে ঋষি কিন্দম ও তার স্ত্রী, যারা সন্তান উৎপন্ন করতে মিলিত হয়েছিলেন। কিন্দম অভিশাপ দেন যে পাণ্ডুও স্ত্রীসম্ভোগকালে মৃত্যুবরণ করবেন

রাজ্যত্যাগ

ঋষি অভিশাপে বিচলিত হয়ে প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য তিনি তাঁর রাজ্য ধৃতরাষ্ট্র এর হাতে দিয়েছিলেন এবং বনে নির্বাসনে যান। সেখানে তিনি স্ত্রীদের সাথে তপস্বীর মত জীবনযাপন করতেন।

পুত্রদের জন্ম

অভিশাপের ফলে পাণ্ডুর সন্তানলাভের পথ বন্ধ হয়ে গেলে কুন্তী দুর্বাসমুনির থেকে প্রাপ্ত বিশেষ দিব্যমন্ত্রর সাহায্যে ধর্ম দেবতাকে আহ্বান করে তার ঔরসে যুধিষ্ঠিরকে জন্ম দেন। এইভাবে কুন্তী বায়ুর মাধ্যমে ভীম, ও ইন্দ্র দেবের মাধ্যমে অর্জুনকে জন্ম দেন। মাদ্রীও একই মন্ত্রের বলে অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে আহবান করে নকুল ও সহদেবকে জন্ম দেন।এরাই পঞ্চপাণ্ডব।কিছু মতানুসারে একবার মাদ্রী লুকিয়ে দেবী সরস্বতীকে আহ্বান করেন।কিন্তু যেহেতু দেবী সরস্বতী একজন নারী তিনি বরদান দেন কোনো পুরুষের সাথে সঙ্গম করলে মাদ্রি গর্ভবতী হবেন এবং সরস্বতীর মতো একটি কন্যার জন্ম দেবেন।যখন পাণ্ডু জোর করে মদ্রীর সাথে সঙ্গম করেন তখন মাদ্রী গর্ভবতী হয়ে পড়েন।এরপর মাদ্রী যখন সহমরণের জন্যে চিতায় উঠেন তার চিতার উপরে একটি কন্যার জন্ম হয়।সরস্বতীর কন্যা হওয়ায় নাম রাখা হয় শাশ্বতী।ইনি কীর্তিকা বা শঙ্কুবতী নামেও পরিচিত।

মৃত্যু

এরপর একদিন বসন্তকালে মাদ্রীকে দেখে মোহিত হয়ে তিনি অভিশাপের কথা ভুলে যান । মোহের বশে মাদ্রীর সাথে সম্ভোগ করতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়।নিজেকে স্বামীহন্তা ভেবে নিজের সন্তানদের ভার কুন্তীর হাতে দিয়ে মাদ্রীও তাঁর পতির সাথে সহমরণে যান।


কিমকুর্বত সঞ্জয় = তারপর কি করল ? 

স্বাভাবিক প্রশ্ন কে এই সঞ্জয় ?

সঞ্জয় ( সংস্কৃত অর্থ "বিজয়") বা সঞ্জয় গাভালগন প্রাচীন ভারতীয় হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতের একটি চিত্র । সঞ্জয় হলেন অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের উপদেষ্টা , কুরু রাজ্যের শাসক এবং কৌরবদের পিতা , সেইসাথে তাঁর সারথি হিসেবে কাজ করছেন। সঞ্জয় ঋষি ব্যাসের শিষ্য । তিনি ব্যাস দ্বারা প্রদত্ত দিব্য দৃষ্টি (ঐশ্বরিক দৃষ্টি), তার মনের মধ্যে দূরবর্তী ঘটনাগুলি পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতার দান করেছেন বলে কথিত আছে । তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ঘটনা বর্ণনা করেন , যার মধ্যে ভগবদ্গীতায় বর্ণিত ঘটনাগুলিও রয়েছে । 

মহাভারতে ভূমিকা

একজন বার্তাবাহক হিসেবে

ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়কে পাণ্ডবদের বার্তাবাহক, শিল্পী দাউদ, রজমনামার ফোলিও হওয়ার জন্য ডেকে পাঠান।

এই মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সঞ্জয় কৌরবদের দূত হয়ে যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়েছিলেন তাদের পক্ষে আলোচনা করার জন্য। 

ঐশ্বরিক দৃষ্টির দান

একটি ঐশ্বরিক দৃষ্টি থাকা শুধুমাত্র একটি সূক্ষ্ম দৃষ্টি ("সঞ্জয়ের উপহার") থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে ব্যক্তি একটি সূক্ষ্ম দৃষ্টির অধিকারী সে তার মনের মধ্যে অদৃশ্য জিনিসগুলির প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়, যেখানে ঐশ্বরিক দৃষ্টিতে, এটি মনের মধ্যে না হয়ে, এটি ব্যক্তিগতভাবে দেখার মতো। এছাড়াও, শব্দগুলি শারীরিক কান দিয়ে শোনা যায় এবং চিন্তার স্রোত হিসাবে নয়। 

মহাভারত যুদ্ধের বর্ণনাকারী হিসেবে

সঞ্জয় যখন হস্তিনাপুরে ছিলেন, তখন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনার ধারাবাহিকতা তাঁর কাছে খুব স্পষ্ট ছিল ("সঞ্জয়ের উপহার")। তিনি চোখ দিয়ে দেখলেন যেন তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন। সঞ্জয় দেখলেন: ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডবরা সেখানে সমবেত হয়েছেন, কান দিয়ে শুনেছেন দুর্যোধনের কথা, পিতামহ ভীষ্মের প্রচণ্ড যুদ্ধ-কান্না, কুরুদের ধ্বংসের ঘোষণাকারী পঞ্চজন্যের প্রবল ধ্বনি এবং কৃষ্ণ ও অর্জুনের মধ্যে সংলাপ। গীতার আমদানি ("সঞ্জয়ের উপহার")। 

সঞ্জয়ের স্পষ্টতই একজন গড় ব্যক্তির চেয়ে একটি সুবিধা রয়েছে কারণ তিনি এমন কিছু শুনতে পেতেন যা এমনকি গড় ব্যক্তিকে ভয় দেখায়। তিনি "ঋষি ব্যাস কর্তৃক প্রদত্ত দূরত্বে ঘটনা" ("সঞ্জয়, সারথি") দেখতে পেয়েছিলেন বলে তাকে প্রতিভাধর বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। মহাভারত যুদ্ধের প্রাক্কালে, গীতার কথা বলা হয়েছিল, "আমরা গীতার প্রথম শ্লোকে দেখতে পাই, রাজা ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়ের কাছ থেকে যুদ্ধ সম্পর্কে তথ্য চেয়েছিলেন যিনি ঐশ্বরিক দৃষ্টির দান পেয়েছিলেন" ("সঞ্জয়ের উপহার")।

ধৃতরাষ্ট্রের উপদেষ্টা হিসেবে সঞ্জয়ের কাজ ততটা কঠিন ছিল না। যতক্ষণ না তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে তাঁর "যুদ্ধের বিভিন্ন সময়ে ভীমের হাতে শতাধিক পুত্রের মৃত্যুর খবর জানান এবং দুঃখী রাজাকে তাঁর অন্ধকার সময়ে সান্ত্বনা দেন" ("ব্যাস")। সঞ্জয় কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রতিটি ঘটনা বলেন। সঞ্জয় এর বিভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন: পৃথিবী, অন্যান্য গ্রহ, এবং ভারতীয় উপমহাদেশের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং (প্রাচীন) শত শত রাজ্য, উপজাতি, প্রদেশ, শহর, শহর, গ্রাম, নদী, পর্বত এবং বনের একটি বিস্তৃত তালিকা দেয়। ভারতীয় উপমহাদেশ (ভারত বর্ষ)।

তিনি প্রতিটি পক্ষের দ্বারা প্রতিটি দিনে গৃহীত সামরিক গঠন, প্রতিটি বীরের মৃত্যু এবং প্রতিটি যুদ্ধ-দৌড়ের বিবরণ ("ব্যাস") সম্পর্কেও ব্যাখ্যা করেছেন। সঞ্জয় যুদ্ধের ঘটনাবলী এবং তার মতামতের বর্ণনায় অত্যন্ত স্পষ্টবাদী হিসেবে পরিচিত এবং তিনি কৃষ্ণ ও অর্জুনের ("সঞ্জয়, সারথি") হাতে কৌরবদের ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণীও করেছিলেন। সঞ্জয় ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের সৎ উপদেষ্টা।

প্রতীকবাদ

সঞ্জয় একজন গুণী চরিত্র যিনি "স্বজ্ঞাত জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে, যা দীর্ঘ এবং কঠিন আধ্যাত্মিক অনুশীলন থেকে উদ্ভূত হয়, সত্ত্ব এবং অভ্যন্তরীণ জাগরণের প্রাধান্য" (V, "ভগবদ্গীতায় প্রতীকবাদ")। স্বর্গীয় অনুগ্রহ অর্জনের জন্য তিনি অর্জুনের মতো সৌভাগ্যবান না হওয়া সত্ত্বেও, তিনি এখনও ভগবান কৃষ্ণের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হন কারণ তিনি তার দেহ এবং মনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারদর্শী ছিলেন (V, "ভগবদ্গীতায় প্রতীকবাদ")। তিনি সচেতনতার অনুভূতির প্রতিনিধিত্ব করেন কারণ তিনি যুদ্ধে ঘটে যাওয়া সমস্ত বিবরণ প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হন। সঞ্জয় বুঝতে পেরেছিলেন যখন "অর্জুন তার ধনুক এবং তীর ফেলে দিয়েছিলেন এবং রথের আসনে বসেছিলেন, তার মন দুঃখে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল" । যুদ্ধ থেকে ক্লান্ত হয়ে অর্জুনকে তার শারীরিক চেহারার অতীত দেখে, সঞ্জয় মন এবং শরীরে তার দক্ষতা প্রদর্শন করে কারণ তিনি অর্জুনকে দুঃখিত হিসাবে দেখতে পেরেছিলেন। 


আমাদের ভারত ও মহাভারত সম্পর্কে একটি ধারনা থাকা উচিত ।

ভারত ও মহাভারত এর অর্থ কি ?
===================
ভারত বলতে আমরা যেটা বুঝি সেটা হলো ভারতবর্ষ বা ভারত উপমহাদেশে । ভারত শব্দটির অর্থ কি বা এইটা কোথা থেকে এলো ?
ভারত নামটির উৎপত্তি হয়েছে হিন্দু পৌরাণিক রাজা ভরতের নামানুসারে। কথিত আছে এই অঞ্চল বা বর্ষ (সংস্কৃত বর্ষ শব্দটির অর্থ ভূখণ্ড ।) রাজা ভরতকে দান করা হয়েছিল বলে এর নাম ভারতবর্ষ।
পুরাণে ‘দক্ষিণে সমুদ্র এবং উত্তরে তুষার আবাস’-এর মধ্যবর্তী ভূমিকে ভারত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অনেকের মতে, কিংবদন্তী রাজা ভরতের নাম থেকে ‘ভারত’ শব্দটির উদ্ভব ঘটেছে। দুষ্মন্ত এবং শকুন্তলার পুত্র ভরতকে, ঋগ্বৈদিক যুগের মানুষের পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়।
তবে, সমাজ বিজ্ঞানী ক্যাথরিন ক্লেমেন্টিন-ওঝার মতে, ভারত কোনও রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক সত্তা নয়। এটি আসলে একটি ধর্মীয় এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সত্তা।
আবার ভারত, এ নামটি বিভিন্ন প্রাচীন সংস্কৃত পুরাণ থেকে এসেছে। যেমন, বায়ু পুরাণে নামটি পাওয়া যায়। ভারত মূলত দেবতা ‘অগ্নি’র একটি নাম। ঋগ্বেদে ভারতী হিসেবে এখানকার অধিবাসীদের, বিশেষ করে যারা দশ-রাজার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, বুঝানো হয়েছে। মহাভারতে ভরতের রাজ্যকে বলা হয় ভারতবর্ষ। ভগবত পুরাণে ভারত শব্দটি জাত ভারতের নাম থেকে এসেছে বলে বর্ণিত।
ভারতবর্ষের আর এক নাম আর্যদেশ ।
=======================
প্রথমত,
ইউরোপীয় পণ্ডিতগণের মতে এবং বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যমতে, আর্যগণ ছিল একদল কৃষিকর্মকারী যাযাবর জাতি। এরা ককেশীয় শ্রেণীভুক্ত আফ্রিকান জাতি যারা খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৭৫হাজার বছর পূর্বে আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে সারা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিশেষত তারা তাদের পশুচারণের জন্য বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতো। এরই ধারাবাহিকতায় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫হাজার বছর পূর্বে এরা বর্তমানের ইরান অঞ্চলে আসে। কথিত আছে, তাদেরই একটি দল কোন এককালে ভারতবর্ষে আগমন করে এবং বসতি গড়ে। মূলত তাদের হাত ধরেই সিন্ধু সভ্যতা গড়ে ওঠে এবং বিকশিত হয়। এরূপে আর্যগণ ভারতবর্ষে বসতি শুরু করলে এর নামকরণ হয় আর্যদেশ।
দ্বিতীয়ত,
সংস্কৃত ভাষায় লিখিত শ্লোক তথা পৌরাণিক গ্রন্থসমূহতে আর্যদের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে আর্য বলতে জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান লোকদের বোঝানো হয়েছে। আবার কারও মতে, আর্য শব্দের অর্থ ঈশ্বরের পুত্র। ঈশ্বরের অনেক পুত্রদের মধ্যে যে পিতার আজ্ঞাবহ, অনুগত, ও জ্ঞানশীল সে আর্য নামে অভিহিত হতো। এই ধারণা অনুয়ায়ী ভারতবর্ষে বসবাসকারী লোকদের ঈশ্বরের পুত্র তথা অত্যন্ত জ্ঞানী মনে করা হয়। ভারতবর্ষে এই শ্রেণীর লোকদের বসবাস হওয়ায় তা আর্যদেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ভারতবর্ষের আর এক নাম জম্বুদ্বীপ ।
======================
জম্বুদ্বীপ
পুরাতন লিপি থেকে জানা যায় যে ভারতবর্ষ নামটির পরিচিতির পূর্বে ভারত, জম্বুদ্বীপ নামেই পরিচিত ছিল। সূর্যসিধান্তের লেখায় পাওয়া জম্বুদ্বীপ।আক্ষরিক অর্থ ধরলে এর মানে হল জাম গাছে ভরা দ্বীপ কিন্তু সনাতন সৃষ্টিতত্ব (মানে হিন্দু বৌদ্ধ কিংবা জৈন) অনুযায়ী জম্বুদ্বীপ মানে হল “সাধারণ মানুষের বাসস্থান”। দার্শনিকভাবে এটা ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নাম হতে পারত। পুরাণ অনুযায়ী এই জায়গা নয়টি পর্বত ও আটটি বর্ষ নিয়ে তৈরি। বৌদ্ধ লিপি মহাবংশ অনুযায়ী অশোকপুত্র মাহিন্দা (পরে যার নাম হয় মহেন্দ্র) অনুরাধাপুরের (সিংহল) অধিপতি দেবনমপিয় তিস্যের কাছে নিজেকে জম্বুদ্বীপ থেকে আসছেন বলেই জানিয়েছিলেন।
==================
ভা মানে তেজ, তেজ, বুদ্ধিমত্তা।
ভাথি মানে আলো নিক্ষেপ করা। বিভাথির অর্থ হল উজ্জ্বল হওয়া।
তারপর, ভাস্কর নামে - যিনি 'সৃষ্টি করেন'/কার 'আলো'/'ভা' - অর্থাৎ সূর্য।
অথবা ভারতীতে - একজন যিনি সম্পূর্ণরূপে তেজ এবং বুদ্ধিমত্তা বা 'সম্পূর্ণ সাদা উজ্জ্বল আলো' বা সত্ত্ব শক্তি ভারতী, বা দেবী সরস্বতী - বুদ্ধিমত্তা, আধ্যাত্মিক উজ্জ্বলতা এবং জ্ঞানের দেবী।
তাই মহান কবি যিনি তাঁর মধ্যে প্রচুর প্রাকৃতিক 'সরস্বতী শক্তি' প্রদর্শন করেছিলেন, তাকে যথাযথভাবে সুব্রমণ্য ভারতী বলা হয়েছিল!
আদি শঙ্করাচার্যের দশনামী সম্প্রদায়ে, শৃঙ্গেরি পিধামে (কর্নাটক) নিযুক্ত স্বামীজিদের প্রায়ই তাদের সন্ন্যাস নামের সাথে 'ভারতী তীর্থ' যুক্ত থাকে। 'ভারতী তীর্থ' যেমন 'আত্মজ্ঞানের দেবীর ঐশ্বরিক জলে পবিত্র করা হয়েছে'।
ভারতী মানে ভরত বা ভরত কন্যা। তাই ভারত তার বিখ্যাত শাসক ভরত থেকে এবং বুদ্ধি বা আত্মজ্ঞানের দেশ ভারতী থেকে এর নাম ভারত পেয়েছে।
ভারতীর অন্য অর্থ হল "বাকপটুতা" এবং মহাসরস্বতী (মহাদেবীর সত্ত্ব-রূপ) নামগুলির মধ্যে একটি।
ভারতীর অর্থ ;- সরস্বতীর নামগুলির মধ্যে একটি, হিন্দুদের বাক, বাগ্মিতা এবং সকল প্রকার জ্ঞানের দেবী।
==================
ভারত এর
ভা অর্থ - তেজ, বুদ্ধিমত্তা।
ভা - উজ্জ্বল হওয়া, উজ্জ্বল বা উজ্জ্বল হওয়া
ভা-আলো/দীপ্তি । { প্রতিভাতে ভা আছে । ভা এখানে জ্ঞানের আলো ।}
রত - দখল করা বা নিযুক্ত করা, সক্রিয়ভাবে অভিপ্রায়।
তা হলে শব্দগত অর্থ যেখানে বাসকারী মানুষ জ্ঞান অন্বেষনে নিযুক্ত সেই জায়গাটা হলো ভারত । আর জ্ঞানের সমাহার যেখানে তাই মহাভারত । মহাভারতে এক লক্ষ শ্লোক ও দীর্ঘ গদ্যাংশ রয়েছে। এই মহাকাব্যের শব্দসংখ্যা প্রায় আঠারো লক্ষ। মহান যে দেশ তাই ভারত । মহাজ্ঞানের সমাহার যেখানে তাই মহাভারত ।

ধৃতরাষ্ট্রের একশত ১টি সন্তান ও কন্যা দুঃশলা সম্পর্কে কিছু ধারনাঃ

গান্ধারী এবং ধৃতরাষ্ট্রের একশজন পুত্র গুলির নাম – 

১. দুর্যোধন ২. যুযুতসুরাজ ৩. দুঃশাসন ৪. দুঃসহ ৫. দুঃসল ৬. জলসনদ্ধ ৭. সম ৮. সহ ৯ বিন্দ ১০. অনুবিন্দ  ১১. দুর্ধর্ষ ১২. সুবাহু ১৩. দূষপ্রধর্ষণ ১৪. দুমর্শন ১৫. দুর্মুখ ১৬. দূষকর্ণ ১৭. কর্ণ ১৮. বীবিংসতী ১৯. বিকর্ণ ২০. শল ২১. সত্ত্ব ২২. সুলোচন ২৩. চিত্র

২৪. ঊপচিত্র ২৫. চিত্রাক্ষ ২৬. চারুচিত্র ২৭. শরাসন ২৮. দুর্মদ ২৯. দুরবিগহ ৩০. বিবিতসু ৩১. বিকটানন ৩২. ঊর্ণনাভ ৩৩. সুনাভ ৩৪. নন্দ ৩৫. উপনন্দ ৩৬. চিত্রবান ৩৭. চিত্রবর্মা ৩৮. সুবর্মা ৩৯. দুরবিমচন ৪০. অয়বাহু ৪১. চিত্রাঙ্গ

৪২. চিত্রকুণ্ডল ৪৩. মহাবহু ৪৪. ভীমবেগ ৪৫. ভীমবাল ৪৬. বলাকি ৪৭. বলবর্ধন ৪৮. ঊগ্রাউধ ৪৯. শূরসেন ৫০. কুন্ডধার ৫১. মহোদয় ৫২. চিত্রাঊধ ৫৩. নিষঙ্গী ৫৪. পাশী ৫৫. বিন্দরক ৫৬. দীরবর্মা ৫৭. দীরক্ষেত্র ৫৮. সমকীর্তি ৫৯. অনুদর

৬০. দীরসনদ্ধ ৬১. সত্যসনদ্ধ ৬২. জরাসনদ্ধ ৬৩. সদ ৬৪. সুবাক ৬৫. অগ্রশ্রবাঃ ৬৬. অগ্রসেন ৬৭. দূস্পরাজয় ৬৮. অপরাজিত ৬৯. কুণ্ড শায়ী ৭০. বিশালক্ষ ৭১. দুরাধর ৭২. দৃঢ় হস্ত ৭৩. সুহস্ত ৭৪. বতবেগ ৭৫. সুবরচা ৭৬. আদিত্যকেতু ৭৭. বহাসি ৭৮. নাগদত্য ৭৯. অগ্রজায়ু

৮০. কবচী ৮১. ক্রথ্ন ৮২. কুন্ত ৮৩. ধনুর্ধর ৮৪. উগ্র ৮৫. ভিমরথ ৮৬. বিরবাহু ৮৭. আলোলুপ ৮৮. অভয় ৮৯. অনঅধৃষ্য ৯০. কুণ্ডভেদী ৯১. বিরাধী ৯২. দীর্ঘলোচন ৯৩. প্রমথ ৯৪. প্রমথি ৯৫. দীর্ঘরমা ৯৬. দীর্ঘওবাহু ৯৭. ব্যুঢ়রু ৯৮. কনকধজ ৯৯. কুন্ডশি ১০০. বিরজা।

গান্ধারী এবং ধৃতরাষ্ট্রের একজন কন্যা সন্তান ছিল – তার নাম দুঃশলা

গান্ধারী এবং বৈশ্য দাসীর পুত্রঃ যুযুৎসু ।

দুর্যোধন

 সংস্কৃত শব্দ "দু"/"দুহ" থেকে তৈরি হয়েছে যার অর্থ "কঠিন" এবং "যোধন" যার অর্থ "লড়াই"/"যুদ্ধ"। সুতরাং দুর্যোধন আসলে এমন একজনকে বোঝায় যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ/পরাজয় বা যুদ্ধ করা অত্যন্ত কঠিন ।

দুর্যোধন বা দূর্যোধন হলেন মহাভারতের একটি চরিত্র। তিনি কৌরব পক্ষের যুবরাজ ছিলেন। তার পিতার নাম ধৃতরাষ্ট্র এবং মাতার নাম গান্ধারী তিনি ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান এবং দুঃশাসনের বড় ভাই।

জন্ম

ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে গান্ধারীর গর্ভে জন্ম হয়েছিল দুর্যোধনের। গান্ধার-রাজ সুবলের একমাত্র মেয়ে গান্ধারী ভগবান মহাদেব-এর কৃপা পেলে মহাদেব তাকে একশ'পুত্র পাবার বর বা আশির্বাদ দেন। তবে সময় গান্ধারীর মনে মেয়ে সন্তান পাবার আশা ছিল। তাই দুর্যোধনসহ তাদের ১০০ জন ভাই-এর সাথে দুঃশলা নামের একমাত্র বোনের জন্ম হয়।

যখন গান্ধারীর গর্ভাবস্থা একটি অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তখন তার শাশুড়ি অম্বিকা এবং অম্বালিকা তার উপর খুব বিরক্ত হন। পান্ডু এবং কুন্তী এর আগে একটি পুত্রের জন্ম দেন যার নাম তারা যুধিষ্ঠির রাখেন। তাই হতাশায় সে তার গর্ভকে মারধর করে। এর ফলে তার গর্ভ থেকে ধূসর রঙের মাংসের একটি শক্ত ভর বের হতে থাকে। তিনি ব্যাসকে অনুরোধ করেছিলেন , মহান ঋষি যিনি তাকে "শত পুত্র প্রপ্তিরস্থু" (সংস্কৃতে "একশত পুত্রের আশীর্বাদ") হিসাবে আশীর্বাদ করেছিলেন, তার কথাগুলিকে মুক্ত করার জন্য। ব্যাস মাংসের বলটিকে একশত এক সমান টুকরোতে ভাগ করে দুধের পাত্রে রেখেছিলেন , যা সিলমোহর করে দুই বছর ধরে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। দ্বিতীয় বছরের শেষে, প্রথম পাত্রটি খোলা হয়েছিল, এবং দুর্যোধনের আবির্ভাব হয়েছিল।

দুর্যোধন এবং ভীম একই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ভীম দিবাভাগে এবং দুর্যোধন রাত্রিভাগে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের সময় দুর্যোধন গাধার মতো গর্জন করেছিলেন। একই সাথে কাক, শৃগালশকুন, হায়েনা প্রভৃতি পশুপাখি অমঙ্গলসূচক শব্দে উচ্চস্বরে চিৎকার করতে শুরু করল। বিভিন্ন লক্ষণ বিবেচনা করে বিদুর  অন্যান্য ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা তাকে কুরু বংশের ধ্বংসের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেন। অনেকে তার পিতাকে এই কুলক্ষণযুক্ত পুত্রকে ত্যাগ করার পরামর্শ দেন। পুত্রস্নেহে অন্ধ হয়ে তিনি তাতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। তাই শেষ পর্যন্ত দুর্যোধন রাজপরিবারেই প্রতিপালিত হন।

তার প্রথম প্রধান স্ত্রী ছিলেন কলিঙ্গরাজ চিত্রাঙ্গদা পর্বতনন্দিনীর কন্যা ভানুমতি।ভানুমতির গর্ভে লক্ষণকুমার লক্ষণা নামে যমজ পুত্র কন্যা হয়। প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা ভগদত্তের কন্যা শ্রাবনী গর্ভে মোট তিনটি পুত্র দুটি কন্যার জন্ম হয়,যাদের মধ্যে পদ্মকুমার সবার বড় ছিলেন।মদ্ররাজ শল্য এবং অবন্তিনির কন্যা সবিধার গর্ভে কালকেতু নামে একটি পুত্র লক্ষী নামে একটি কন্যা হয়। ত্রিলোকপুরের রাজা বসন্তরাজ বৈশালীর কন্যা ময়ূরীর গর্ভে একটি কন্যার জন্ম হয়।এছাড়াও এক অজ্ঞাতনামা ব্যাধকন্যা কে তিনি উপপত্নী বানিয়েছিলেন।

পাশা চক্রান্ত, আর দ্রৌপদীর অপমান

সম্পাদনা
দ্রৌপদীকে একটি পচেসি খেলার সামনে উপস্থাপন করা হয়।

ইন্দ্রপ্রস্থের সমৃদ্ধি ও খ্যাতির প্রতি দুর্যোধনের ঈর্ষা এবং পাণ্ডবদের দ্বারা অপমানিত হওয়ার কারণে তিনি ক্রোধান্বিত হয়েছিলেন এবং তিনি পাণ্ডবদের নিক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন । তার ইচ্ছাকে সমর্থন করার জন্য, শকুনি যুধিষ্ঠিরকে পাকিদা বা পাশার খেলায় পরাজিত করে তার রাজ্য এবং সম্পদ লুট করার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন , যাতে শকুনি হারাতে পারেননি কারণ তার কাছে পাশা ছিল যা সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে না পেরে, কূটনীতির কারণে, যুধিষ্ঠির তার সমগ্র রাজ্য, তার সম্পদ, তার চার ভাই এমনকি তার স্ত্রীকেও জুয়া খেলায়, একটিকে অন্যকে দাড়ি দিয়ে পুনরুদ্ধার করার জন্য। যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে হারানোর পর, কর্ণের পরামর্শে, দুর্যোধন তার ভাই দুশাসনকে তাকে দরবারে টেনে আনতে উত্সাহিত করেছিলেন কারণ সে এখন তার সম্পত্তি। দুষণা দ্রৌপদীর চুল টেনে দরবারে নিয়ে গেল। কর্ণ দুর্যোধনকে দ্রৌপদীকে তার বাম উরুতে বসতে বললেন, এইভাবে দুর্যোধন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাকে অপমান করার জন্য বাম ঊরু দেখালেন এবং চাপ দিলেন। দ্রৌপদী প্রত্যাখ্যান করেন এবং দুর্যোধন দুশাশনকে তার বস্ত্র খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ভাইয়ের আদেশ মেনে দুঃশান হেসে দ্রৌপদীর শাড়ি টানতে লাগলেন। দুর্যোধন, কর্ণ, শকুনি এবং অন্যান্য কৌরব ( বিকর্ণ, বিদুর ছাড়া )ও হাসতে লাগলেন। তবে কৃষ্ণের কৃপায় দ্রৌপদীর পোশাকের পরিমাণ একই ছিল। 

এই কর্মের কারণে ভীম প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি দুর্যোধনের উরু ভেঙ্গে দেবেন।

ক্রুদ্ধ দ্রৌপদী কুরু বংশকে অভিশাপ দিতে যাচ্ছিলেন , গান্ধারী হস্তক্ষেপ করলেন। পাণ্ডবদের, তাদের মিত্রদের এবং ইতিহাসের প্রতিশোধের ভয়ে, ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারী যুধিষ্ঠিরের সমস্ত ক্ষতিকে উল্টে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরে (হয় দুর্যোধন তার পিতাকে পাণ্ডবদেরকে আবার খেলতে বাধ্য করার জন্য বা শকুনির দুষ্ট কৌশলের মাধ্যমে) খেলার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। পাশার এই খেলার জন্য শকুনি শর্ত দেন যে হারলে, যুধিষ্ঠির এবং তার ভাইদের তাদের রাজ্য পুনরুদ্ধার করার আগে তেরো বছর বনবাসে এবং এক বছর অগ্য়তাবাস (সম্ভবত ছদ্মবেশে অন্যদের কাছে অজানা) কাটাতে হবে। ত্রয়োদশ বছর ছদ্মবেশে পার করতে হবে, নইলে নির্বাসনের মেয়াদ পুনরাবৃত্তি হবে। পাণ্ডবরা হেরে বনবাস শুরু করে।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ

দুর্যোধনই ছিলেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মূল কারণ। তিনি কৃষ্ণের মাধ্যমে যুধিষ্ঠিরের পাঠানো শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। কৃষ্ণ শেষ পর্যন্ত পাণ্ডবদের জন্য পাঁচটি গ্রাম চেয়ে যুদ্ধ বন্ধ করার পরামর্শ দেন কিন্তু দুর্যোধনের এক বক্তব্য ছিল, যে যুদ্ধ ব্যতীত সূচের অগ্রভাগে যত ভূমি ধরে তাও তিনি পাণ্ডবদের দেবেন না।

অতঃপর যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। দুর্যোধনের পক্ষে এগারো অক্ষৌহিনী এবং পাণ্ডবদের পক্ষে সাত অক্ষৌহিনী সেনা যোগদান করে। কৃষ্ণ তার চার অক্ষৌহিনী নারায়ণী সেনা দুর্যোধনকে দিয়ে দেন। কারণ কৃষ্ণের শর্ত ছিল যে তিনি যে পক্ষে যাবেন, সেনাদের তার বিপরীত পক্ষে প্রদান করবেন। দুর্যোধন সৈন্য নেন, এবং অর্জুন কৃষ্ণকে নিজের পক্ষে আসবার নিমন্ত্রণ দেন।

যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত দুর্যোধন পরাজিত হন। এবং ভীমের সাথে গদা যুদ্ধে ভীম তার উরু ভঙ্গ করেন। কারণ পাশা খেলার সময় তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি দুর্যোধনের উরু ভঙ্গ করবেন।

পরের দিন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। যখন উপকূল পরিষ্কার ছিল, অশ্বত্থামা , কৃপাচার্য এবং কৃতবর্মা , লড়াই প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং দুর্যোধনের সম্মান হরণ করতে বাধা দিতে চাননি , দুর্যোধনের ভাঙা দেহের কাছে আসেন। অশ্বত্থামা দুর্যোধনকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি পাণ্ডব এবং তাদের সহযোগীদের যমের আবাসে প্রেরণ করবেন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর অনুমতির অনুরোধ করবেন।

উপপাণ্ডব এবং পাঞ্চালদের শেষ অবশিষ্টাংশকে হত্যা করার পর, অশ্বত্থামা দুর্যোধনের কাছে ফিরে আসেন। তিনি দুর্যোধনকে তার তরবারির রক্ত ​​দেখালেন যা উপপাণ্ডবদের ছিল, শুনে দুর্যোধন শান্তভাবে প্রতিশোধে সন্তুষ্ট হয়ে তার শরীর ছেড়ে চলে গেলেন। দুর্যোধনের মৃত্যুর সাথে সাথে, সঞ্জয় তার ঐশ্বরিক দৃষ্টিশক্তি হারান, যা তিনি দুর্যোধনের পিতা ধৃতরাষ্ট্রকে আপডেট করার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। এটি যুদ্ধের উপসংহারের প্রতীক।

পাণ্ডবরা অবসর গ্রহণের পর, শুধুমাত্র যুধিষ্ঠির জীবিত স্বর্গে পৌঁছেছিলেন। সেখানে তিনি দুর্যোধনকে দেখেন, যা তাকে হতবাক করে দেয়। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলে, নারদ উত্তর দেন যে দুর্যোধন তার ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেছেন।

গদা-যুদ্ধ

সম্পাদনা

দুর্যোধন ও ভীমের মধ্যে দ্বন্দ্ব। 

যুদ্ধের অষ্টাদশ দিনে, অশ্বত্থামা , কৃপা এবং কৃতবর্মাকে নিজের সৈন্যদল নিয়ে দুর্যোধন একটি হ্রদে ধ্যান করতে যান। অবশেষে যখন পাণ্ডব এবং কৃষ্ণ তাকে খুঁজে পেলেন, দুর্যোধন তাদের বলেছিলেন যে তিনি তাদের রাজ্য উপহার দিতে চান এবং বনে অবসর নিতে চান। যুধিষ্ঠির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তাকে বলেছিলেন যে হস্তিনাপুর দুর্যোধনের উপহার নয়। পরিবর্তে, তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে দুর্যোধন পাণ্ডব ভাইদের মধ্যে যেকোনও একজনকে তার পছন্দের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করার জন্য বেছে নিতে পারেন, যুদ্ধের বিজয়ী যুদ্ধের বিজয়ী।

যুধিষ্ঠির, অর্জুন , নকুল বা সহদেবের উপর গদা দিয়ে তার প্রস্তাবিত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও , দুর্যোধন তার নিমেষ ভীমকে বেছে নিয়েছিলেন । ভীমের শারীরিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, তার নৈপুণ্যের প্রতি নিষ্ঠার কারণে দুর্যোধনের আরও ভাল কৌশল ছিল। বলরামের দুই শিষ্যের মধ্যে দীর্ঘ ও নৃশংস যুদ্ধের পর, দুর্যোধন ভীমকে ক্লান্ত করতে শুরু করেন এবং ভীমকে প্রায় অজ্ঞান করে দেন।

এই সময়ে, লড়াই পর্যবেক্ষণ করে, কৃষ্ণ ভীমকে ডাকলেন এবং বারবার তাঁর উরুতে হাত দিয়ে তালি দিয়ে সংকেত দিলেন। উদ্দেশ্য হিসাবে, ভীমকে সেই শপথের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যা তিনি পাশার খেলার পরে দুর্যোধনের উরু পিষে নিয়েছিলেন। ভীম বিজয়ী হয়ে দুর্যোধনকে তার গদা দিয়ে আক্রমণ করেন এবং তার উরুতে আঘাত করেন এবং দুর্যোধনকে মারাত্মকভাবে আহত করেন। ভীম কর্তৃক অপমানজনকভাবে লাথি মারার পর, দুর্যোধন বিলাপ করেছিলেন যে তাকে অন্যায় উপায়ে হত্যা করা হয়েছিল, কারণ একটি গদা লড়াইয়ে কোমরের নীচে আক্রমণ করা অবৈধ ছিল।

লঙ্ঘনে ক্ষুব্ধ হয়ে কৃষ্ণের ভাই বলরাম আক্রমণ করার জন্য অস্ত্র তুলেছিলেন। কৃষ্ণ বলরামকে দুর্যোধনের মন্দ কাজের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এবং তিনি যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করার জন্য তাকে তিরস্কার করেছিলেন। 


দুর্যোধনকে কেউ কেউ ধৃতরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফসল এবং রূপক অর্থে তার "অন্ধত্ব" হিসেবে দেখেন। তিনি একজন ক্ষত্রিয় হিসাবে তার কর্তব্য পালনের জন্যও প্রশংসিত হন এবং এমনকি তার শেষ যুদ্ধেও সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন। তিনি অন্যান্য সমস্ত পাণ্ডবদের চেয়ে যুদ্ধে ভীমের মুখোমুখি হতে বেছে নেন , যাদের সাথে গদা যুদ্ধে তার একটি সুবিধা রয়েছে। গদাতে তার দক্ষতাও প্রশংসিত হয়; অনেক গল্প তাকে যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ গদা-যোদ্ধা বলে অভিহিত করে।

কর্ণের সঙ্গে সম্পর্ক

সম্পাদনা

মার্শাল প্রদর্শনীতে যেখানে কৌরব এবং পাণ্ডব রাজকুমাররা তাদের গুরুজন, তাদের গুরু দ্রোণ এবং সেই রাজ্যের লোকদের সামনে তাদের দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন , সেখানে কর্ণ উপস্থিত হয়েছিলেন এবং একজন অবিশ্বাস্য অর্জুনকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন , যাকে রাজকুমারদের মধ্যে সেরা বলে মনে করা হয়। কিন্তু কর্ণকে থামানো হয়েছিল যখন কৃপা তাকে তার বংশ নির্ণয় করতে বলেছিল, কারণ এটি অসম প্রতিযোগিতার জন্য অনুপযুক্ত হবে। কর্ণ ক্ষত্রিয় না হয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল। [ ৫ ]

দুর্যোধন অবিলম্বে কর্ণকে রক্ষা করেছিলেন, যুক্তি দিয়েছিলেন যে এটি দক্ষতা এবং সাহসিকতা, এবং জন্ম নয়, যা একজন যোদ্ধাকে সংজ্ঞায়িত করে। ধৃতরাষ্ট্র কর্তৃক তাকে প্রদত্ত বর ব্যবহার করে দুর্যোধন কর্ণকে অঙ্গের রাজা করেন যাতে তাকে অর্জুনের সমতুল্য বলে গণ্য করা হয়। [ 6 ] কর্ণ দুর্যোধনের প্রতি আনুগত্য ও বন্ধুত্বের অঙ্গীকার করেছিলেন। তাদের কেউই জানত না যে কর্ণ আসলে কুন্তীর জ্যেষ্ঠ পুত্র, পান্ডুর সাথে তার বিয়ের আগে (সূর্যদেবতা) সূর্যের জন্ম ।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে , কর্ণ ছিলেন দুর্যোধনের সর্বশ্রেষ্ঠ চ্যাম্পিয়ন এবং পঞ্চদশ দিন থেকে সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । দুর্যোধন আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে কর্ণ অর্জুনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং তার চার ভাইকে পরাজিত করবেন। কর্ণ যখন নিহত হন, তখন দুর্যোধন তার মৃত্যুতে তীব্রভাবে শোক প্রকাশ করেন, এমনকি তার নিজের ভাইদের মৃত্যুর চেয়েও অসহায় ছিলেন। কর্ণের পরিচয় যখন তাঁর কাছে প্রকাশ করা হয়, তখন কর্ণের প্রতি দুর্যোধনের ভালবাসা বেড়ে যায় এবং বলা হয় তিনিই ছিলেন, পাণ্ডবরা নন, যিনি কর্ণের শেষকৃত্য করেছিলেন। কৃষ্ণ নিশ্চিত করেছেন যে কর্ণের উপর তার সর্বোচ্চ অধিকার রয়েছে, কারণ তারা একে অপরকে সত্যিকারের ভালবাসত এবং সমর্থন করেছিল।


আধুনিক উপাসনালয়ে দুর্যোধনঃ





সম্পাদনা

মহাভারতের দুর্যোধন ভিলেন না ট্রাজিক হিরো ?

===============================
যেখানে পঞ্চপাণ্ডব পাশা খেলতে গিয়ে তাদের গৃহলক্ষী স্ত্রীকে পর্যন্ত বাজী ধরেছিলেন আবার পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে অর্জুন একাধিক বিয়েও করেছিলেন । সেখানে দুর্যোধনের এক স্ত্রী ছিলেন ভানুমতী। এই ভানুমতী কলিঙ্গরাজ চিত্রাঙ্গদের মেয়ে। স্বয়ম্বর সভা থেকে দুর্যোধন এক রকম ছিনিয়েই নিয়ে এসেছিলেন তাঁকে। কারণ ভানুমতী দুর্যোধনের গলায় মালা না দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
স্বয়ম্বর থেকে ভানুমতীকে অপহরণ করে নিয়ে আসার পিছনে দুর্যোধনের যুক্তি ছিল পিতামহ ভীষ্মও অম্বা-অম্বিকা-অম্বালিকাকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছিলেন। অপহরণ করে বিয়ে করা সেই আমলে সিদ্ধ । দুর্যোধন কে আক্রমণ করার মত সাহস কেউ দেখাতে পারেন নাই ।
কিন্তু ভানুমতীকে বিয়ে করার পরে দুর্যোধন আর কখনও বিয়ে করেননি। এই ব্যাপারে নাকি ভানুমতীকে দুর্যোধন প্রতিশ্রূতি দিয়েছিলেন যে তিনি তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন এবং দুর্যোধনও সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন। হয়তো সেই কারণেই দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের মতো গর্হিত কাজ তিনি দুঃশাসনকে দিয়ে করিয়েছিলেন। নিজে কিন্তু দ্রৌপদীকে একবারও স্পর্শ করেননি।
মহাভারতের গল্পে গান্ধারীর বর্ণনা অনুযায়ী ভানুমতীর সঙ্গে অত্যন্ত সুন্দর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল দুর্যোধনের। শোনা যায়, দুর্যোধন নাকি মাঝেমধ্যে ভানুমতীর সঙ্গে কুস্তিও অভ্যাস করতেন। মহাভারতের এই ভিলেন সারাক্ষণ পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যেতেন কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত সরল। অন্তঃপুরে এক স্ত্রী এবং দুই ছেলেমেয়ে নিয়েই সুখী ছিলেন তিনি।
'যার সঙ্গে যুদ্ধ করা দুষ্কর/কঠিন' তিনিই দুর্যোধন । দুর্যোধনের আর একটি নাম আছে যা তার পিতা মাতা কতৃক দেও সেই নামটি হলো সুয়োধন । বাংলাতে সুযোধন ও বলা হয়ে থাকে । এটা তার অতি আদরের নাম। এই নামটির প্রতি উনার খুব দুর্বলতা ছিল।সুযোধন শব্দের অর্থ 'সুদক্ষ যোদ্ধা'।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষে , রাত্রি ভোর হবার আগে দুর্যোধনের পরিজন এলেন শেষ দর্শনে। মাতা গান্ধারীকে দেখে দুর্যোধন বললেন, তোমার জন্যেই বোধহয় আমি অপেক্ষায় ছিলাম মা। তোমার পায়ের ধুলো আমার মাথায় দিয়ে এবার পাপীপুত্রের জননী হবার কলঙ্ক থেকে মুক্ত হও তুমি। আর পাপিষ্ঠকে যদি মার্জনা করতে পারো তাহলে আশীর্বাদ কোরো, আগামী জন্মে আবার যেন তোমায় মা বলে ডাকার সৌভাগ্য হয়।
পুত্রের দুরবস্থায় আজীবন ধর্মাচারিণীরও হৃদয় টলেছিল। বন্ধনমুক্ত চক্ষে জ্বলে উঠেছিল প্রতিশোধের আগুন। মায়ের অগ্নিসম প্রতিজ্ঞা রোধ করে মুমূর্ষু দুর্যোধন চিৎকার করে বলে উঠলেন, না মা না, তুমি পাণ্ডবদের অভিশাপ দিও না। ওরা যে তাহলে ধ্বংশ হয়ে যাবে। আমার আর কোন দ্বিধা নেই। আমাকে শেষ যাত্রার অনুমতি দাও। আর দেখো সে যাত্রা যেন পাণ্ডবদের সমাধির উপর দিয়ে না যায়।
অন্তিমলগ্নে তিনি অন্তর থেকে মার্জনা করেছিলেন পাণ্ডবদের। তাই তাঁর স্থান হয়েছিল মানবাকাঙ্খিত অমৃতলোকে।
উনাকে পঞ্চপাণ্ডব খুঁজেই পেতোনা , যদি না সর্বকালদর্শী ভগবান শ্রী কৃষ্ণ , তার এই গোপন নামটি ধরে না ডাকতে বলতেন । পঞ্চ পাণ্ডব যখন সুযোধন সুযোধন বলে ডাকা শুরু করলেন , তখন তিনি আর নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারলেন না । কারণ এই নামটি ধরে তার মা তাকে ডাকতেন । বড় আদরের নাম। এই নাম কে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দুর্যোধনের ছিলোনা । তাই তিনি ধরা দিলেন পঞ্চ পান্ডবের কাছে। এই রকম কাপুরুষচিত খল ব্যবহারের জন্য দুর্যোধন অবশ্য কৃষ্ণকে অনেক কটু কথাও বলেছিলেন ।
গদা যুদ্ধে দুর্যোধন পৃথিবী সেরা । একথা নিজে স্বীকার করেছেন তার গুরুদেব বলরাম। সেখানেও চালাকীর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
যুধিষ্ঠির দুর্যোধনকে বললেন যে, দুর্যোধন পাঁচ পাণ্ডবের যে কোনো একজনকে যুদ্ধের জন্য বেছে নিতে পারেন। নিজের বিজয় সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী যুধিষ্ঠির ফস করে এও বলে বসলেন যে, দুর্যোধন যদি এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে বিজয়ী হন, তবে তিনিই হবেন হস্তিনাপুর ও ইন্দ্রপ্রস্থের শাসক।
দুর্যোধন ইচ্ছে করলে যুধিষ্ঠির, অর্জুন, নকুল বিংবা সহদেবকে গদাযুদ্ধে আহ্বান করতে পারতেন, কারণ এদের কেউই গদাযুদ্ধে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন না। ফলে দুর্যোধন তাঁদের সহজেই পরাজিত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে গদাযুদ্ধ নিপুণ ভীমকে আহ্বান করলেন। ভীম এবং দুর্যোধনের মধ্যে গদাযুদ্ধ শুরু হলো। এ পর্যন্ত কুরুক্ষেত্রে তাঁরা দু'জন লড়েছিলেন তীর-ধনুক নিয়ে। এবার প্রথম তাঁদের গদাযুদ্ধ হলো।
যুদ্ধের প্রথমদিকে দু'জন সমান সমান হলেও পরে দেখা গেল যে, দুর্যোধন ভীমের চেয়ে গদাযুদ্ধে বেশি দক্ষ। এর ফলাফল হলো এই যে, ভীমকে দুর্যোধন আচ্ছামতো দুরমুশ করতে লাগলেন, অর্থাৎ মনের সাধ মিটিয়ে পেটালেন। পাণ্ডবেরা এবার আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। শেষটায় তীরে এসে তরী না ডুবে যায়! তো তাঁরা যথারীতি কৃষ্ণের সহায়তা চাইলেন।
কৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুন ভীমকে দুর্যোধনের ঊরুতে আঘাত করার জন্য ইশারা করলেন। সে মোতাবেক ভীম দুর্যোধনের ঊরুতে আঘাত করলেন এবং দুর্যোধন মারাত্মকভাবে আহত হলেন। অথচ গদাযুদ্ধে কোমরের নিচের অংশে আঘাত করা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এভাবে ছলের মাধ্যমে জয়লাভ করে আনন্দে আত্মহারা ভীম মারাত্মক আহত দুর্যোধনের মাথায় পা দিয়ে আঘাত করলেন। গদাযুদ্ধের সময় দুর্যোধন ও ভীমের গদাযুদ্ধের প্রশিক্ষক বলরামও উপস্থিত ছিলেন। তিনি দুর্যোধনকে এভাবে অন্যায়ভাবে পরাজিত হতে দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে ভীমকে হত্যা করার জন্য অগ্রসর হলেন। কৃষ্ণ বহু কষ্টে তাঁকে ঠেকালেন। বলরাম তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে চলে গেলেন, কিন্তু যাওয়ার আগে দুর্যোধনকে আশীর্বাদ করে গেলেন এই বলে যে, দুর্যোধন একজন নীতিপরায়ণ যোদ্ধা হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন। আর ভীমকে তিনি অভিশাপ দিলেন এই বলে যে, ভীম আজীবন প্রতারক যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত হবেন।
যুদ্ধের শেষে সেই শ্মশানভূমির একাকীত্বে অশক্ত শরীরে দুর্যোধন যাপন করেছিলেন জীবনের শেষ ত্রিশ ঘন্টা। তাঁর জঙ্ঘাস্থি ছিল স্থানচ্যুত, সে যন্ত্রণা তিনি কতক্ষণ ভোগ করেছিলেন জানা নেই, তারপর তাঁর নিম্নাঙ্গ নিশ্চই অবশ হয়ে গেছিল। চলৎশক্তিহীন অসহায় মুমূর্ষু মানুষটি সেই দুর্জয় শীতেও আকণ্ঠ পিপাসায় একটু জলের জন্য হাহাকার করেছিলেন। কেউ শোনেনি। বহু ক্লেশের মধ্য দিয়ে দুর্যোধন জেনেছিলেন জীবনের মর্ম। মৃত্যুর সাথে সংঘর্ষে তাঁর জীবনীশক্তির যখন আর প্রায় কিছু অবশিষ্ট নেই, তখন এলেন অশ্বত্থামা। প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় দুর্যোধন শুনলেন গুরুপুত্রের ভীষণ প্রতিজ্ঞা। আর্তকণ্ঠে নিষেধ করলেন তিনি, না, অশ্বত্থামা… না…। তাঁর অত্যুচ্চ অহংকারের হর্ম্য তখন চুরমার হয়ে ধুলোয় মিশেছে। পান্ডবদের সাথে বৈরীতা হয়েছে অন্তর্হিত। তাঁর ক্ষীণ কণ্ঠের আর্তি অশ্বত্থাম…ার কানে যায় নি। প্রহরকালের মধ্যে তিনি এনে হাজির করেছেন দৌপদীর পাঁচ কিশোরপুত্রের ছিন্নমুন্ড। নীরন্ধ্র অন্ধকারেও দুর্যোধন তা স্পর্শ করেই আর্তনাদ করে উঠলেন, একি করলে গুরুপুত্র? ওরা যে আমার উত্তরপুরুষ!
বলা হয়ে থাকে দুর্যোধন কলির অবতার । পূর্ব জন্মে এরা দৈত্য দানব ছিলেন । আর এরা স্বাভাবিক ভাবেই ভগবান শিবের ভক্ত।
দুর্যোধনের শারীরিক গঠন সম্পর্কে বলা হয়, দৈত্য ও দানবদের অনুরোধে মহাদেব নিজে বজ্র দিয়ে দুর্যোধনের শরীরের ঊর্ধাংশ তৈরি করেছিলেন। আর দুর্যোধনের শরীরের নিম্নাংশ তৈরি করেছিলেন মহাদেবের স্ত্রী। কিন্তু বজ্রের পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করেছিলেন ফুল। ফলে দুর্যোধনের শরীরের ঊর্ধাংশ ছিল অত্যন্ত শক্ত, কিন্তু নিম্নাংশ ছিল অত্যন্ত কোমল।
মা গান্ধারী উদ্যোগ নিয়েছিলেন সন্তানের এই কোমল অংশ দুর্ভেদ্য করে দেবেন । কি ভাবে ?
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে পুত্র দুর্যোধনকে তাঁর সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে আসতে বলেছিলেন গান্ধারী | বিস্মিত হলেও মায়ের আদেশের দ্বিরুক্তি করেননি দুর্যোধন | কিন্তু লজ্জায় পুরো উলঙ্গ হতে পারেননি | জন্মদাত্রীর সামনে তিনি যান কৌপীন পরে |
পুত্র এসেছে জেনে গান্ধারী চোখের বাঁধন খোলেন | জীবনে ওই একবারই | পুত্রকে কৌপীন পরিহিত দেখে ব্যথিত হলেন গান্ধারী | কারণ তিনি পুত্রকে ডেকেছিলেন তাঁর দেহকে দুর্ভেদ্যদেহে পরিণত করবেন বলে | এতটাই শক্তি ছিল তাঁর দৃষ্টিতে | কিন্তু শর্ত ছিল, একবারই মাত্র এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন তিনি | এবং যাঁর উপর প্রয়োগ করবেন তাঁকে বস্ত্রহীন হয়ে থাকতে হবে | দুর্যোধন কৌপীন পরিহিত হয়ে থাকায় দেহের ওই এক চিলতে অংশ দুর্ভেদ্য হল না |
আমরা ছোট বেলা টেপরেকর্ডার একটা নাটক শুনতাম। নাটকটির নাম ছিল মাতা গান্ধারী। ভারতীয় নাটক। সেখানে শুনেছিলাম , যখন দুর্যোধনের ভুলে তার উরু দুর্ভেদ্য হলোনা তখন দুর্যোধন মাতার কাছে প্রতিকার জানতে চেয়েছিলেন । মাতা বলেছিলেন , যদি কোন সতী নারীকে সম্পুর্ণ বিবস্ত্র করে মাতৃ জ্ঞানে তোর উরুতে বসাতে পারিস , তবে তোর উরু পাথরের মত শক্ত তথা দুর্ভেদ্য হয়ে যাবে। তাইতো দুর্যোধন , সতী নারী দ্রৌপদীকে বিবস্ত্র করে তার উরুতে বসাতে চেয়েছিলেন । ( তবে বর্তমানে আমার কাছে এই কাহিনীর রেফারেন্স নেই ) ।
পান্ডবকুলের চতুর্থ ও পঞ্চম ভাই নকুল ও সহদেব। তাদের মাতার নিজের ভাই মদ্ররাজ মহাবীর শল্য । সেই শল্য কিন্তু পান্ডবদের দলে ছিলেন না । তিনি ছিলেন দুর্যোধন তথা কৌরবদের দলে । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ১৮ তম দিনের কৌরবদের সেনাপতি ছিলেন পাণ্ডবদের মামা শল্য ।
অতিথি-পরায়ণতা, রাজনীতিজ্ঞান, বন্ধু-বৎসলতা, প্রজাপালন ক্ষমতা ইত্যাদি গুণে তিনি ছিলেন গুনান্বিত । বলা যায় পাণ্ডবদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ । কপট দ্যূতে পাণ্ডবদের সর্বস্য হরণ করেছেন, তাঁদের বনবাসে পাঠিয়েছেন, যা রাজনীতিরই অংশ । আবার এই দুর্যোধনই কর্ণের এক লজ্জাকর মুহূর্তে এগিয়ে এসে তাঁর সঙ্গে আজীবন সখ্যতায় নিজেকে বেঁধেছেন, দক্ষতার সঙ্গে রাজকার্য চালিয়ে প্রজাদের মনোরঞ্জন করেছেন এবং অসংখ্য নৃপতিদের সঙ্গে আমৃত্যু মিত্রতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। লক্ষ করা যায় তৎকালীন ভারতের বেশীর ভাগ রাজ্যের অধিপতি দুর্যোধনের পক্ষে ছিলেন । একথা বলা মনে হয় বেশী হবেনা , করুক্ষেত্রে যুদ্ধে তৎকালীন সমস্ত বীর ব্রাহ্মন মহারথীদের তিনি তার দিকে রাখতে পেরেছিলেন । যেমন মহারথী কৃপাচার্য , দ্রেুানাচার্য , অশ্বত্থামা সহ আরও অনেকে অনেক রথীদের ।
শুধু অতিরিক্ত অহংকার , লোভ , হিংসা আর পাণ্ডব বিদ্বেষ সহ ভাগ ভাগিকে ঠকানোর প্রবণতা না থাকলে তিনি হতেন ইতিহাসে এক গৌরব করার মত নায়ক ।

দুঃশলা

 

দুঃশলা (সংস্কৃত:  প্রতিবর্ণীকৃত) ছিলেন হস্তিনাপুরের রাজকুমারী, এবং হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে রাজা ধৃতরাষ্ট্র  রাণী গান্ধারীর একমাত্র কন্যা।তিনি তার কৌরব ভ্রাতাগণ এবং তার পৈতৃক সৎ ভাই যুযুৎসুর জন্মের পরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সিন্ধুর রাজা জয়দ্রথের সাথে তার বিয়ে হয়। সে তার মায়ের মতোই খুব সুন্দর ছিল। সবচেয়ে পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের একমাত্র রাজকন্যা হওয়ার কারণে, তিনি রাজপরিবারের সকল সদস্যদের বিশেষ করে তার বড় ভাই দুর্যোধনের খুব প্রিয় ছিলেন।[][] দুঃশলার পুত্রের নাম সুরথ এবং মেয়ের নাম ছিল রোশনি।

কিংবদন্তি

জয়দ্রথ যখন দ্রৌপদীকে অপহরণ শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হন, তখন কিছু পাণ্ডব তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দুঃশলাকে বিধবা হতে বাধা দেওয়ার জন্য যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে, তারা তাকে ছেড়ে দেন, কেবল তার মস্তক মুণ্ডন করে দেন। পরবর্তীতে, জয়দ্রথ তার জিঘাংসা মেটানোর জন্য কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অর্জুনের পুত্র অভিমন্যুকে হত্যা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু অর্জুন কৃষ্ণের সহায়তায় তার শিরচ্ছেদ করেন।

পরেঅশ্বমেধ যজ্ঞের সময়, পাণ্ডবদের ঘোড়া সিন্ধুতে এসেছিল, যা তখন শাসিত হচ্ছিল দুঃশলা পুত্র সুরথ কর্তৃক। অর্জুনের সাথে লড়াই করার সম্ভাবনা দেখে আতঙ্কিত সুরথ আত্মহত্যা করে দুঃশলা যুদ্ধক্ষেত্রে আসে, এবং সুরথের শিশু পুত্রকে নিয়ে কাঁদছিল, যা অর্জুনের হৃদয় ভেঙে দেয়। অর্জুন শিশুটিকে সিন্ধুর রাজা ঘোষণা করলেন ।

দুঃশাসন

দুঃশাসন মহাকাব্য মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র। আক্ষরিক অর্থে, দুঃশাসন অর্থ যাকে শাসন করা কষ্টসাধ্য। দুঃশাসন মহাভারতের অন্যতম বিরোধী চরিত্র তিনি কৌরব রাজপুত্রদের মধ্যে দ্বিতীয় এবং হস্তিনাপুরের যুবরাজ জ্যেষ্ঠ কৌরব দুর্যোধনের অনুজ এবং প্রধান সহযোগী। তাঁর পিতা-মাতা হলেন যথাক্রমে ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারী ত্রিগর্তের রাজকন্যা চন্দ্রমুখীকে তিনি বিবাহ করেন।তিনি ত্রিলোকাপুরার শ্বেতাকে এবং লতাকেও বিয়ে করেছিলেন। তিনি নির্জারার সাথে যুদ্ধ করেন এবং তিনি তার স্ত্রী হন। তার বোন দিবিজাও তার স্ত্রী ছিলেন। তার পুত্রের নাম দ্রুমসেন। দুঃশাসনের ঈর্ষাপরায়ণতা এবং নীচ মানসিকতা মহাভারতে তার পতন ডেকে আনে।

নামব্যুৎপত্তি

দুঃশাসন শব্দটি সংস্কৃত শব্দ "দুঃ" কঠিন, কষ্টকর এবং "শাসন" অর্থ শাসন করা। অর্থাৎদুঃশাসন অর্থ "যাকে শাসন করা দুঃসাধ্য" 

জন্ম ক্রমবৃদ্ধি

গান্ধারী ব্যাসদেবের সেবা করায় তিনি বর দিয়েছিলেন গান্ধারী শতপুত্রের জননী হবেন। যথাকালে গান্ধারী গর্ভবতী হলেন কিন্তু কুড়ি মাস চলে গেলেও তার প্রসব হল না।এদিকে কুন্তীর পুত্রলাভের খবর পেয়ে গান্ধারী অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে ধৃতরাষ্ট্রকে না জানিয়ে লোহার মুগুর দিয়ে নিজের গর্ভপাত করেন। এর ফলে তার গর্ভ হতে এক লৌহকঠিন মাংসপিণ্ড নির্গত হল। গান্ধারী দাসীদের তা নষ্ট করার হুকুম দিতে যাচ্ছিলেন এমন সময় ব্যাসদেব এসে তাকে নিষেধ করলেন। তিনি ভ্রুণকে শীতল জলে ভিজিয়ে শত ভাগে ভাগ করেন এবং তা ঘৃতপূর্ণ কলসে রাখেন। একবছর পর দুর্যোধন এবং একবছর এক মাসের মধ্যে দুঃশাসন, দুঃসহবিকর্ণ প্রভৃতি শতপুত্র  দুঃশলা নামে একটি কন্যার জন্ম হল। দুঃশাসন তার বড়ভাই দুর্যোধনের অনুগত ছিলেন এবং দুর্যোধনের সকল অপকর্মের সহযোগী ছিলেন। দুর্যোধন এবং মামা শকুনির সাথে মিলে পাণ্ডবদেরকে হত্যার নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।

কুরুসভায় দ্রৌপদীর নিগ্রহ

দুঃশাসন কর্তৃক দ্রৌপদীর নিগ্রহ

শকুনির সাথে পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির সর্বস্বান্ত হওয়ার পর নিজের ভাইদের এবং নিজেকে পণ করে হেরে যান। এরপর তিনি তাদের ধর্মপত্নী দ্রৌপদীকে পণ করে তাকেও হারান। দুঃশাসন দ্রৌপদীকে তার অন্তঃপুর থেকে কেশ ধরে সভায় টেনে আনেন এবং কর্ণের আদেশে  তাকে বিবস্ত্রা করার চেষ্টা করেন। এসময় দ্রৌপদী শ্রীকৃষ্ণকে আহ্বান করতে থাকেন। কৃষ্ণ ধর্মের অবতার নিয়ে বস্ত্ররূপে দ্রৌপদীকে আবৃত করতে থাকেন। দুঃশাসনের আকর্ষণেও তা শেষ হয় না। সভায় এই ভাবে স্ত্রীকে অপমানিত হতে দেখে ভীম প্রতিজ্ঞা করেন যে যুদ্ধভূমিতে তিনি দুঃশাসনের বক্ষ বিদারণ করে তার রক্তপান করবেন।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ এবং মৃত্যু

দুঃশাসন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং অনেক যোদ্ধার সাথে যুদ্ধ করেন।

যুদ্ধের প্রথম দিনে দুঃশাসনই প্রথম তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। তিনি নকুল এবং পরে যুধিষ্ঠিরের সাথে ভয়ানক যুদ্ধ করেন এবং তাদের কাছে পরাজিত হন।

যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে, দুঃশাসন নকুলের দেহরক্ষীকে হত্যা করেন। ক্রুদ্ধ নকুল তলোয়ার যুদ্ধে দুঃশাসনকে পরাজিত করে প্রায় হত্যা করতে যাচ্ছিলেন, তবে, তখন নকুলের, ভীমের প্রতিজ্ঞা অর্থাৎ ভীম কর্তৃক দুঃশাসনকে বধ করার কথা স্মরণে এলে, নকুল, দুঃশাসনকে ছেড়ে দেন।

যুদ্ধের দশম দিনেভীষ্মকে রক্ষা করার জন্য দুঃশাসনশিখণ্ডীকে আক্রমণ করেন এবং আহত করেন। যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে, দুঃশাসন ছিলেন শক্তিশালী সপ্তরথীদের অন্যতম যারা অন্যায় যুদ্ধে অভিমন্যুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। ঐদিনের যুদ্ধে অভিমন্যু প্রচণ্ডভাবে দুঃশাসনকে আহত করেছিল। পরে, দুঃশাসনপুত্র দ্রুমসেন অভিমন্যুকে হত্যা করে।

১৪তম দিনে, দুঃশাসনঅর্জুনকে আক্রমণ করেন এবং জয়দ্রথের কাছে পৌঁছতে না দেওয়ার জন্য বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু, একটি ছোট তীর-ধনুকের দ্বন্দ্বে অর্জুনের কাছে দুঃশাসন পরাজিত হন। রাত্রিকালীন যুদ্ধের সময়, দুঃশাসন বিরাটের দেহরক্ষীদের পরাজিত করে হত্যা করেন।

ভীম, দুঃশাসনের বুক বিদীর্ণ করে এবং বুকের রক্ত পান করছে।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ১৬তম দিনে, দুঃশাসন মগধের মন্ত্রী বৃহন্তকে হত্যা করেন। পরবর্তীতেভীম এবং দুঃশাসনের সাথে গদা যুদ্ধ হয়। ভীম, তাকে পরাজিত করেন। যখন, দুঃশাসন যুদ্ধে অসমর্থ এবং আহত হলে ভীম দুঃশাসনের উভয় হাত উপড়ে ফেলেন। তারপর ভীম, তার (দুঃশাসনের) বর্ম এবং রক্ষাকবচ খুলে ফেলে এবং খালি হাতে বুক চিড়ে দুঃশাসনকে হত্যা করে। পুরো মহাভারত কাব্যে, দুঃশাসনের মৃত্যু সবচেয়ে নৃশংস মৃত্যু। প্রতিজ্ঞা অনুসারে, ভীম দুঃশাসনের বুকের রক্ত পান করে। এই নৃশংস দৃশ্যের প্রত্যক্ষকারী সব সৈন্য, ভীমকে দানব মনে করে এবং অনেকে তা দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সমস্ত কৌরব সমর্থক এবং সহকারী যোদ্ধা এই দৃশ্য দেখে অত্যন্ত বিমর্ষ হয়। ভীম দুঃশাসনের রক্ত ​​সংগ্রহ করেন এবং দ্রৌপদীর খোলা চুল ধুয়ে দেন। কারণ, কুরু রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করেছিল দুঃশাসন। তখন, দ্রৌপদী প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি শুধু দুঃশাসনের বুকের রক্ত দিয়ে চুল ধুয়ে চুলের খোঁপা বাঁধবেন। না হলে, কখনো চুলের খোঁপা বাঁধবেন না।

যুযুৎসু (মহাভারত)

যুযুৎসু মহাকাব্য মহাভারতের একটি চরিত্র। যুযুৎসু ধৃতরাষ্ট্রের এবং গান্ধারীর পরিচারিকা (পরবর্তী বর্ণনা অনুযায়ী সুগধার) পুত্র। তিনি গান্ধারীর শত পুত্র- দুর্যোধন এবং বাকি কৌরব ভ্রাতৃগণ এবং তাদের বোন দুঃশলার সৎ ভ্রাতা। এমনকি, তিনি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর ধৃতরাষ্ট্রের একমাত্র জীবিত পুত্র। যুযুৎসই ধৃতরাষ্ট্রের একমাত্র পুত্র যিনি পাণ্ডবদের পক্ষের হয়ে কৌরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।

নামব্যুৎপত্তি

যুযুৎসু শব্দটি ‘যুধ’ থেকে এসেছে যার অর্থ যুদ্ধ, লড়াই। যুযুৎসু শব্দের পূর্ণ অর্থ হল, যিনি যুদ্ধ করতে ইচ্ছা করেন। নিচে মহাভারতে উল্লেখিত যুযুৎসু এর আরো নামগুলো হলো- 

  • ধার্তরাষ্ট্র - ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র,
  • কৌরব্য - কুরু বংশধর,
  • বৈশ্যাপুত্র - বৈশ্যা নারীর পুত্র,
  • করণ - ক্ষত্রিয় পুরুষের ঔরসে বৈশ্যা নারীর গর্ভজাত সন্তান।

জন্ম

যুযুৎসু মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে সুগধার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। দুর্যোধন এবং ভীমের পরে এবং দুঃশাসনের ও অন্যান্য ৯৮ জন কৌরব ভাইদের এবং দুঃশলার আগে জন্মগ্রহণ করেন। অতএবধৃতরাষ্ট্রের সর্বমোট ১০২ জন সন্তান (১০১ জন পুত্র এবং ১ জন কন্যা)। 

কৌরব শিবিরে ধার্মিক

যুযুৎসু বৈশ্যা পরিচারিকার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন, তবুও তিনি ধার্মিক এবং ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। তুলনামূলক, নীচগর্ভে জন্মগ্রহণ করেও, তিনি কখনো ধর্মের পথ হতে বিচ্যুত হন নি। ধর্মের পথে থাকার জন্য তিনি তার পারিবারিক বন্ধন ত্যাগ করেছিলেন।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রারম্ভে, যুদ্ধক্ষেত্রে যুধিষ্ঠির একটি ঘোষণা করেন যে- শঙ্খ বাজানোর পূর্বে, যিনি ধর্মের ও ন্যায়ের জন্য যুদ্ধে পক্ষ পরিবর্তন করতে চান, তিনি এইমুহুর্তে তা করতে পারেন।। এই ঘোষণা শুনে, তখন যুযুৎসু কৌরবপক্ষ ত্যাগ করে ধর্ম ও ন্যায়ের জন্য পাণ্ডব শিবিরে যোগদান করেন।

এছাড়াও, যুযুৎসু পান্ডবদেরকে, দুর্যোধনের ধূর্ত পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করে ভীম-এর জীবন রক্ষা করেছিলেন, যার মধ্যে বিষাক্ত জল পরিবেশনের কথা অন্তর্ভুক্ত ছিল। যুযুৎসু এবং বিকর্ণ উভয়েই দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র এবং খারাপ দুরভিসন্ধিকে ঘৃণা করতেন। তথাপি, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় বিকর্ণ ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসার কারণে কৌরব পক্ষ ছেড়ে যান নি এবং যুদ্ধে ভীমের হাতে নিহত হন। [৫] কিন্তু যুযুৎসু ধর্ম রক্ষার জন্য কৌরব শিবির ত্যাগ করে পাণ্ডব শিবিরে যোগ দেন এবং পাণ্ডবদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেন। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম মহারথী। (মহারথী হলেন এমন ব্যক্তি, যিনি একসাথে ৭,২০,০০০ সৈন্যের সাথে যুদ্ধ করতে সমর্থ।) যুদ্ধ শেষে কৌরবপক্ষের যে ১১ জন যোদ্ধা বেঁচেছিলেন তাদের মধ্যে যুযুৎসু অন্যতম। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তিনি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধের সপ্তম দিনে, কুলগুরু কৃপাচার্যের সাথে তাঁর প্রচণ্ড তলোয়ার লড়াই হয় এবং তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হন। তবে তিনি বেঁচে যান। ষোড়শতম দিনে, যুযুৎসু শকুনির পুত্র উলুকের সাথে যুদ্ধ করেন এবং তাকে আহত করেন। আহত হয়ে উলুক পালিয়ে যাওয়ার কারণে তাকে তিনি হত্যা করতে পারেন নি। 

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষে

শ্রীকৃষ্ণের দেহত্যাগের পর পাণ্ডবগণ পৃথিবী থেকে মহাপ্রস্থানের সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন, মহারাজ যুধিষ্ঠির, যুযুৎসুকে হস্তিনাপুরের তত্ত্বাধায়কের দায়িত্ব দিয়ে ছোট পরীক্ষিতকে হস্তিনাপুরের রাজা নিযুক্ত করেন। 


ভানুমতী (মহাভারত)

ভানুমতী  হলেন ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চরিত্র  দুর্যোধন এবং কলির অবতার এর সহধর্মিনী।

মহাভারতে ভানুমতীর তিনবার উল্লেখ আছে। শান্তি পর্বে দুর্যোধন রাজা চিত্রাঙ্গদের কন্যাকে তার স্বয়ম্বর সভা থেকে কর্ণের সাহায্যে অপহরণ করেন।পরে স্ত্রী-পর্বে তার শ্বাশুড়ি গান্ধারী তার বিবরণ দেন।

গ্রন্থের বিবরণ

মহাভারতে ভানুমতীর সরাসরি কোনো উল্লেখ নেই। শাল্য পর্বে দুর্যোধন তার পুত্র লক্ষ্মণ কুমারের মায়ের দুর্গতি নিয়ে আক্ষেপ করেন। স্ত্রী পর্বে দুর্যোধনের মা গান্ধারী তার পুত্রবধুর বিবরণ দেন। শান্তি পর্বে ঋষি নারদ দুর্যোধনের সাথে কর্ণের বন্ধুত্বের একটি গল্পের উল্লেখ করেন। যেখানে কলিঙ্গরাজ চিত্রাঙ্গদের মেয়েকে তার স্বয়ম্বর থেকে অপহরণ করতে তার বন্ধুকে সাহায্য করেন কর্ণ। যেহেতু এই মহাকাব্যের কোথাও দুর্যোধনের স্ত্রীর নামের উল্লেখ নেই, তার নামটি এসেছে বিভিন্ন লোককাহিনী থেকে।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর গান্ধারী কৃষ্ণকে এভাবে তার পুত্রবধুর বর্ণনা দেন।

দেখো, আবার, আমার ছেলের মৃত্যুর চেয়েও বেদনাদায়ক এই দৃশ্য, নিহত বীরদের পাশে এই ফর্সা নারীরা কাঁদছে! দেখো, হে কৃষ্ণ, লক্ষ্মণার মা, সেই বৃহৎ নিতম্বের রমণী, তার পরিচ্ছদ বিক্ষিপ্ত, দুর্যোধনের সেই প্রিয় পত্নী, সোনার যজ্ঞবেদির মতো। নিঃসন্দেহে, মহান বুদ্ধিমত্তার এই মেয়েটি, তার পরাক্রমশালী সশস্ত্র স্বামী পূর্বে জীবিত থাকাকালীন, তার স্বামীর সুদর্শন বাহুর আলিঙ্গনে খেলাধুলা করত! কেন, সত্যিই, যুদ্ধে নিহত আমার ছেলে ও নাতিদের দেখে আমার এই হৃদয় শত টুকরো হয়ে যায় না? হায়, সেই নির্দোষ ভদ্রমহিলা এখন গন্ধ নিচ্ছেন তার ছেলের (মাথার) রক্তাক্ত সেই দেহ। এখন আবার সেই ফর্সা উরুর ভদ্রমহিলা তার ফর্সা হাত দিয়ে ধীরে ধীরে দুর্যোধনের শরীর বুলিয়ে দিচ্ছেন। এই সে তার স্বামীর জন্য এবং এই সে তার ছেলের জন্য শোকাচ্ছন্ন হয়। এই সে তার স্বামীর দিকে তাকায়, আরেকবার তার ছেলের দিকে। দেখ, হে মাধব, তার মাথায় হাত দিয়ে আঘাত করে, সে তার বীর পতি, কুরুদের রাজার বক্ষে পতিত হয়। পদ্মের পুষ্পদণ্ডের মতো বর্ণের অধিকারিণী, তিনি এখনও পদ্মের মতো সুন্দরী দেখতে। হতভাগ্য রাজকন্যা এই তার ছেলের মুখ এবং এই তার স্বামীর মুখে হাত বুলায়।

গান্ধারী, কিশোরী মোহন গাঙ্গুলী অনূদিত

 দুর্যোধনের সাথে বিবাহ

মহাভারতের শান্তি পর্বে দুর্যোধনের বিবাহের উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবঋষি নারদ রাজা চিত্রাঙ্গদের মেয়ের স্বয়ম্বরের গল্পটি বলেন। গ্রন্থে কোথাও তার নামের উল্লেখ নেই, তবে বলা হয়েছে তিনি ফর্সা এবং সুন্দরী।

দুর্যোধন কলিঙ্গরাজ চিত্রাঙ্গদের কন্যার স্বয়ম্বরে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। নিমন্ত্রণ পেয়ে দুর্যোধন তার বন্ধু কর্ণকে সাথে নিয়ে রাজাপুর নগরে যান। অন্যান্য রাজরাজরা যেমন শিশুপালজরাসন্ধভীষ্মক, বক্র, কপটারোমন, নীলরুক্মী, শৃঙ্গ, অশোক, শতধনবান প্রভৃতি সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর রাজকুমারী তার সহচরী এবং দেহরক্ষীদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে হাতে মালা নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন। যখন তাকে অংশগ্রহণকারীদের নাম এবং তাদের বংশ সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছিল, তখন তিনি দুর্যোধনের কাছ থেকে চলে গেলেন। দুর্যোধন তার এই প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং ইতোমধ্যেই রাজকন্যার দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে, তাকে এবং কর্ণকে দ্বন্দ্বে আহবান করে তার রথে তুলে নিয়ে যান। কর্ণ তার বন্ধুকে রক্ষা করার জন্য বাকি প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে সফলভাবে যুদ্ধ করেন। কর্ণ সহজেই পশ্চাদ্ধাবনকারী রাজাদের পরাজিত করেন এবং অন্যান্য রাজকীয় যোদ্ধারা কর্ণের যুদ্ধের পরাক্রম দেখে তাদের বাসনা ত্যাগ করেন। হস্তিনাপুর পৌঁছে দুর্যোধন তার এই অপহরণের বৈধতা দিতে তার প্রপিতামহ ভীষ্ম কর্তৃক তার সৎ ভাই বিচিত্রবীর্যের জন্য কাশীর তিন কন্যার অপহরণের উদাহরণ টানেন। অবশেষে ভানুমতী বিয়েতে তার মত দেন এবং দুর্যোধনের সাথে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়।

ভানুমতী, সুন্দর বর্ণের কুমারী, কে তার স্বয়ম্বর থেকে দূর্যোধন তার সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু কর্ণের সাহায‍্যে তার (ভানুমতী) প্রত্যাখ্যানের উত্তেজনার বশে তাকে অপহরণ করেন।

 

ভানুমতি অর্জুনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন কিন্তু পরিস্থিতির কারনে দুর্যোধনকে বিয়ে করেছিলেন। দুর্যোধন তাঁর জামাতা হওয়ায় শল্য কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরব পক্ষকে সমর্থন করেছিলেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হলে , এই দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ভানুমতি অর্জুনের সংগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন । তবে অনেকই এটাকে কল্পনা বলেছেন । তবে কর্ণের সংগে তার বিশেষ বন্ধুত্ব ছিলো যা অনেকেইে প্রেম বলতে চান ।তবে কর্ণ একমাত্র বৃষালীকেই ভালোবাসতেন ।

কারো কারো মতেঃ 

মহাভারতের সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা নারী ।
মহাভারতে কম আলোচিত চরিত্র । কিন্তু তার অবদান কম নয় ।
আমরা সবাই জানি , মাতা গান্ধারী স্পষ্টবাদী ছিলেন । অন্যায়কে তিনি কখনো প্রশ্রয় দেন নাই । দুর্য্যোধনের স্ত্রী ভানুমতি । তিনি ছিলেন অনিন্দ সুন্দরী । চিত্রাঙ্গদার কন্যা , মাতা ছিলেন কলিঙ্গ রাজকন্যা । সৌন্দর্য্য , বুদ্ধি ও কুটনৈতিক জ্ঞানে তিনি সম সমায়িক কালে দ্রৌপদির পরের অবস্থানে ছিলেন । তার কুটনৈতিক প্রজ্ঞা এত বেশী ছিলো , যে একবার বলরাম কতৃক হস্তিনাপুর আক্রান্ত হয়েছিলো , তখন তার কুটনৈতিক সমাধান করেছিলেন ভানুমতি । দুষ্ট দুর্য্যোধনের অগাধ আস্থা ছিলো স্ত্রী ভানুমতির উপর। তবে ভানুমতি ছিলেন সে সময়ের সবথেকে শ্রেষ্ঠ গৌরাঙ্গী নারী । এবিষয়ে কারো কোন সন্দেহ নেই । ভানুমতির উপর দুর্য্যেোধনের আস্থা ও ভালোবাসা ছিলো প্রশ্নাতীত । ভানুমতিও সব ভুলে স্বামীকে চরম ভালবাসতেন । বলা হয়ে থাকে সে সময়ের শ্রেষ্ঠ দাম্পত্য জুটি ছিলো দুর্য্যেোধন ও ভানুমতির । যা মাতা গান্ধারীর মুখেও শোনা গেছে।
ভগবান শ্রী কৃষ্ণ সব সময় ভালো মানুষদের সহায়তা করেন। তাতো আমরা জানি । তার উপর দ্রৌপদী ছিলেন তার অন্যতম সখী । এই যে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের কথা আমরা শুনি এবং সেখানে দেখি ভগবান শ্রী কৃষ্ণ উপর থেকে শাড়ী প্রদান করে দ্রৌপদীর লজ্বা নিবারণ করছেন । এটাতো অনেকটা কাল্পনিক । ঘটনাটা যদি এরকম হয় , মাতা গান্ধারী ও স্ত্রী ভানুমতির প্ররোচনায় সেদিন হাজার হাজার কুরুকুল রমনী , রাজসভায় এই অন্যায়ের প্রতিবাদে তাদের শাড়ী দ্রৌপদিকে সম্প্রদান করেছিলো । যা পেছন থেকে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ নিয়ন্ত্রন করছিলো । ব্যাপারটা মনে হয় এরকমই ছিলো । নারীর বিপদে সবার আগে তো নারীরাই এগিয়ে আসবে।

যুদ্ধ শেষে ভানুমতি এই দুই পরিবারে মধ্যে সারা জীবনের বিরোধ নিষ্পোত্তির জন্যে , অর্জুনকে স্বামী হিসাবে বরণ করে নিয়েছিলেন । যা অসম্ভব ছিলো , কিন্তু এই অসাধ্যকে সাধ্যের মধ্যে এনে ভানুমতি তার প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন । ভানুমতির কথা মত যদি দুর্য্যেোধন চলতেন , তবে মহাভারতের যুদ্ধ হতোনা ।


চিত্রাঙ্গদাঃ

==========
মহাভারতে আমরা দুইজন চিত্রাঙ্গদ ও একজন চিত্রাঙ্গদা পাই ।
১)রাজা শান্তনু ও তাঁর স্ত্রী সত্যবতীর প্রথম পুত্র চিত্রাঙ্গদ।
২) গন্ধর্বরাজ চিত্রাঙ্গদ ।
৩)মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা।
শান্তনুর পর ইনিই হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসেন। চিত্রাঙ্গদ অত্যন্ত বলশালী ছিলেন। দেবতা,অসুর,গন্ধর্ব – কাউকেই তিনি ভয় পেতেন না। একদিন গন্ধর্বরাজ চিত্রাঙ্গদ এসে ওঁকে বললেন, ওঁর নাম আর গন্ধর্বরাজের নাম এক হতে পারে না। হয় উনি নতুন নাম নিন,অথবা গন্ধর্বরাজের সঙ্গে যুদ্ধ করুন। কুরুক্ষেত্রে সরস্বতী নদীর তীরে এক ঘোর যুদ্ধে কুরুনন্দন চিত্রাঙ্গদ নিহত হলেন।
কবিগুরুর চিত্রাঙ্গদাঃ
===========
আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী।
নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী।
পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে, সে নহি নহি,
হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে, সে নহি নহি।
যদি পার্শ্বে রাখ মোরে, সঙ্কটে সম্পদে,
সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে সহায় হতে,
পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে।
আজ শুধু করি নিবেদন—
আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী।।
মহাভারতের চিত্রাঙ্গদাঃ ( মোহন গায়েন )
======================
আমি চিত্রাঙ্গদা,আমি চিত্রবাহন কন্যা
নহি রূপবতী,নহি মোহময়ী,পুরুষ-হৃদয়-বিদারিণী অনন্যা |
কিছু নাহি চাহি আমি , তব সন্নিকটে
ভিখারিণী ভেবে, নাহি করো হেলা
যদি কভু পড়ে মনে ,মুদ্রিত করিও মোরে,তব স্মৃতিপটে |
যদি ভুল করি কভু ,ক্ষমা কোরো মোরে,ভাবি তব অর্ধাঙ্গিনী
নহি কারও সেবাদাসী আমি,নহি বন্দিনী
পুনরায় করি নিবেদন
তব প্রেম পিয়াসী আমি,
চিত্রাঙ্গদা ,আমি রাজেন্দ্র নন্দিনী ||
অর্জুন ||ধন্য আমি,ভার্যা রূপে পাইয়াছি তোমা |
দর্পচূর্ণ হল মোর, করো মোরে ক্ষমা |
মহাভারতের চিত্রঙ্গদাঃ-

মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা। মণিপুর রাজের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে শিব বর দিয়েছিলেন যে তাঁর বংশে কেবল পুত্রই জন্মাবে। কিন্তু তা সত্বেও যখন রাজকূলে চিত্রাঙ্গদার জন্ম হল রাজা তাকে পুত্ররূপেই পালন করলেন।
রাজকন্যা অভ্যাস করলেন ধনুর্বিদ্যা, শিক্ষা করলেন যুদ্ধবিদ্যা, রাজদণ্ডনীতি।
নারদের উপদেশ অনুসারে পাণ্ডবরা দ্রৌপদী সম্পর্কে দাম্পত্য নিয়ম বন্ধন করেন – দ্রৌপদী এক এক ভ্রাতার কাছে এক বছর এক কাল থাকবেন ,সেই সময় অন্য কোনো ভ্রাতা সেই গৃহে প্রবেশ করতে পারবেন না। যিনি এই নিয়ম লঙ্ঘন করবেন ,তাকে বারো বছরের জন্য বনবাস যেতে হবে
ঘটনাচক্রে এক ব্রাহ্মণের গোধন রক্ষা করার জন্য অস্ত্র আনতে অর্জুন যুধিষ্ঠির ও কৃষ্ণার শয়ন-গৃহে ঢুকতে বাধ্য হলেন। যুধিষ্ঠির এতে নিয়ম ভঙ্গ হয় নি বললেও, অর্জুন বনবাসে চলে যান।
মণিপুরের রাজা চিত্রবাহনের দুহিতা চিত্রাঙ্গদা। অর্জুন যখন মনিপুরে পৌঁছন তিনি চিত্রাঙ্গদাকে কোনো ভাবে দেখতে পেয়ে তার পাণি -গ্রহণের ইচ্ছা তার পিতার কাছে প্রকাশ করেন। তিনি নিজের পরিচয় সেখানে দেন “ধনঞ্জয় “.
চিত্রাঙ্গদার পিতা বলেন মহাদেবের বরে তাদের বংশে শুধুমাত্র পুত্রসন্তান জন্মে এসেছে এতকাল ,কিন্তু এই প্রথম কন্যা সন্তান জন্মেছে যার নাম চিত্রাঙ্গদা। বংশ রক্ষা সেই করবে। চিত্রবাহন চিত্রাঙ্গদা ও অর্জুনের বিবাহে সন্মত হয়েছিলেন এই শর্তে যে, চিত্রাঙ্গদার পুত্র মাতামহদের বংশ রক্ষা করবে।
অর্জুন শপথ করে চিত্রাঙ্গদাকে বিবাহ করেন , এবং চিত্রাঙ্গদার গর্ভে পুত্র জন্মালে তাকে তিনি আলিঙ্গন করে বিদায় নেন।
চিত্রাঙ্গদার পুত্র বভ্রুবাহন পিতার সুযোগ্য সন্তান হয়েছিলেন। অশ্বমেধ-যজ্ঞের সময়ে অশ্ব নিয়ে অর্জুন যখন যুদ্ধার্থে এলেন – তখন বভ্রুমাহন তাঁকে ভক্তিভরে অভ্যর্থনা করায়, অর্জুন তাঁকে তিরস্কার করেন। এই সময়ে বিমাতা উলুপী এসে নিজের পরিচয় দিয়ে বভ্রুবাহনকে অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদেশ দেন। বিমাতার আদেশ পেয়ে বভ্রুবাহন যুদ্ধে অর্জুনকে পরাজিত করেন এবং ওঁর বাণে অর্জুন ভূমিতে লুটিয়ে পরেন। বভ্রুবাহন নিজেও মুর্ছিত হন। মাতা চিত্রাঙ্গদা এসে অর্জুনের অবস্থা দেখে উলুপীকে তিরস্কার করলেন। উলুপী সঞ্জীবণ-মণি দিয়ে অর্জুনকে সুস্থ করে অর্জুনের প্রতি বসুগণের নরকবাসের অভিশাপ এবং বভ্রুবাহনের জয়ে সেই অভিশাপ থেকে মুক্ত হবার কথা সবাইকে বললেন।

অর্জুনের আমন্ত্রণে সপুত্র চিত্রাঙ্গদা উলুপীর সঙ্গে হস্তিনায় গিয়েছিলেন। বভ্রুবাহন মণিপুরে ফিরে এলেও চিত্রাঙ্গদা পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থানে যাত্রা পর্যন্ত হস্তিনাপুরেই থাকেন। তারপর আবার মণিপুরে পুত্রের কাছে ফিরে আসেন।


এবার আমরা পঞ্চপান্ডব বা পান্ডবাশ্চৈব তথা পান্ডুুর পাচঁ পুত্র সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব । তার আগে আমাদের জানতে হবে কুন্তী ও মাদ্রীর চরিত্র ।

মহাভারতের কুন্তীঃ

==============
“লোকে সৎস্বভাব দ্বারা যেরূপ মান্য হইতে পারে, ধন বা বিদ্যার দ্বারা তদ্রূপ হইতে পারে না।” কথাটি বলেছিলেন মাতা কুন্তী , শ্রী কৃষ্ণকে মহাভারতের উদ্যোগ পর্ব্বে ।
—“আমি পুত্ৰগণের নির্ব্বাসন, প্ৰব্ৰজ্যা, অজ্ঞাতবাস ও রাজ্যাপহরণ প্রভৃতি নানাবিধ দুঃখে অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছি। দুৰ্য্যোধন আমাকে ও আমার পুত্রগণকে এই চতুর্দ্দশ বৎসর অপমান করিতেছে; ইহা অপেক্ষা দুঃখের বিষয় আর কি আছে? কিন্তু ইহা কথিত আছে যে, দুঃখ ভোগ করিলে পাপক্ষয় হয়, পরে পুণ্য ফল সুখ সম্ভোগ হইয়া থাকে; অতএব আমরা এক্ষণে দুঃখ ভোগ করিয়া পাপক্ষয় করিতেছি; পশ্চাৎ সুখ সম্ভোগ করিব; তাহার সন্দেহ নাই।”
এরকম আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক জ্ঞান সম্পন্না নারী মাতা কুন্তি শুধু মহাভারতের প্রধান নারী চরিত্রই নয়, তিনি সে যুগে নারীদের পরিস্থিতির একটি উদাহরণও বটে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হৃদয়েও এই চরিত্রটি স্পর্শ করেছিল । তাই তিনি লিখলেনঃ ” কর্ণ-কুন্তীর সংবাদ “
সেখান থেকে কিছু কথাঃ
কর্ণ।
পুণ্য জাহ্নবীর তীরে সন্ধ্যাসবিতার
বন্দনায় আছি রত। কর্ণ নাম যার
অধিরথসূতপুত্র, রাধাগর্ভজাত
সেই আমি-- কহো মোরে তুমি কে গো মাতঃ!
কুন্তী।
বৎস, তোর জীবনের প্রথম প্রভাতে
পরিচয় করায়েছি তোরে বিশ্ব-সাথে
সেই আমি, আসিয়াছি ছাড়ি সর্ব লাজ
তোরে দিতে আপনার পরিচয় আজ।
যদুবংশীয় রাজা আর্যক শূরের আপন পিসতুতো ভাই ছিলেন ভোজবংশীয় রাজা কুন্তিভোজ। কুন্তিভোজ এবং শূর ছিলেন পরস্পরের বন্ধু। রাজা কুন্তিভোজের কোনও সন্তান না থাকায় শূর তাকে প্রতিজ্ঞা করেন যে শূরের প্রথম সন্তানটিই তিনি কুন্তিভোজকে দান করবেন। শূরের প্রথম সন্তান জন্মায় একটি মেয়ে- পৃথা। প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী রাজা তাকে তুলে দেন কুন্তিভোজের হাতে। কুন্তিভোজ পরম আহ্লাদে তার এই নতুন পাওয়া মেয়েটিকে মানুষ করতে থাকেন। কুন্তিভোজের নাম থেকেই পৃথার নাম হয় কুন্তী।কুন্তী কৃষ্ণের জনক বাসুদেবের বোন ছিলেন এবং কৃষ্ণের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভাগ করেছিলেন।
একবার দুর্বাসা মুনি কুন্তীর অতিথি হয়ে এলে, কুন্তী সেবা দ্বারা তাঁকে সন্তুষ্ট করেন। এরপর দুর্বাসা কুন্তীকে এমন একটি মন্ত্র দান করেন যে, যার দ্বারা ইনি যে দেবতাকে স্মরণ করবেন, সেই দেবতাই এসে কুন্তীকে সংগম দ্বারা পরিতৃপ্ত করে পুত্র দান করবেন। কৌতুহলবশতঃ কুমারী অবস্থাতেই একবার ইনি সূর্য দেবতাকে ডেকে বসেন এবং সূর্যদেবের সাথে মিলনের ফলে ইনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন। যথা সময়ে ইনি একটি পুত্র সন্তান লাভ করলে, লোকলজ্জার ভয়ে সেই পুত্রকে একটি পাত্রে রেখে জলে ভাসিয়ে দেন। এই মহাভারতে পুত্রই কর্ণ নামে খ্যাতি লাভ করেন।
পরবর্তী কালে রাজা কুন্তিভোজ এঁর জন্য স্বয়ংবরা সভার আয়োজন করেন। এই সভায় কুন্তী পাণ্ডুর গলায় মালা দেন। উল্লেখ্য এ ছাড়া পাণ্ডু পরে আরও একটি বিবাহ করেছিলেন। পাণ্ডুর এই স্ত্রীর নাম ছিল মাদ্রী। বিবাহের একমাস পর পাণ্ডু দিগ্বিজয়ে বের হন এবং বিভিন্ন দেশ জয় করেন। এর কিছুদিন পর ইনি কুন্তী ও মাদ্রীকে সাথে নিয়ে হিমালয়-এর [পর্বতমালা] দক্ষিণ দিকের অরণ্যময় অংশে যান। একদিন কিন্দম মুনি হরিণের রূপ ধরে, ওই বনে এক হরিণীর সাথে সঙ্গমে রত হন। সেই সময় পাণ্ডু সঙ্গমরত হরিণযুগলকে বাণ দ্বারা বিদ্ধ করেন। এর ফলে হরিণরূপী কিন্দম মুনি নিহত হন। মৃত্যুর পূর্বে কিন্দম পাণ্ডুকে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে, কোনো নারীর সাথে সঙ্গমে রত হলে, পাণ্ডু মৃত্যুবরণ করবেন।
এই অভিশাপের কারণে, মাদ্রী এবং কুন্তী উভয়ই স্বামী-সংসর্গ থেকে বঞ্চিত হন। নিঃসন্তান দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, পাণ্ডুর অনুরোধে কুন্তী তিনজন দেবতার সাথে মিলিত হন এবং তিনটি সন্তান লাভ করেন। কুন্তী প্রথমে ধর্মকে আহ্বান করে শতশৃঙ্গ পর্বতে মিলিত হন। এই মিলনের ফলে কুন্তীর দ্বিতীয় পুত্র এবং প্রথম পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের জন্ম হয়। এরপর পাণ্ডুর অনুরোধে কুন্তী যথাক্রমে বায়ু (পবন) ও ইন্দ্রের সাথে মিলিত হন। এই মিলনের ফলে তিনি আরও দুটি পুত্র লাভ করেন। এঁরা হলেন যথাক্রমে ভীম ও অর্জুন। এরপর মাদ্রী সপত্নীর মতো সন্তান কামনা করলে, পাণ্ডুর অনুরোধে কুন্তী এই মন্ত্রটি একবারের জন্য মাদ্রীকে দান করেন। ফলে মাদ্রী, অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের ঔরসে নকুল ও সহদেব নামে দুটি সন্তান লাভ করে। এই পাঁচটি সন্তান পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ পুত্র হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ বলে এই পাঁচপুত্রকে পঞ্চপাণ্ডব বলা হতো।
এর কিছুদিন পর একদিন পাণ্ডু অত্যন্ত কামার্ত অবস্থায় মাদ্রীর সাথে মিলিত হন। এবং সঙ্গমরত অবস্থায় ইনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে কুন্তী এসে সকল বিষয় অবগত হয়ে স্বামীর সাথে সহমৃতা হতে চান। কিন্তু মাদ্রী সকল দোষ নিজের মনে করে নিজেই সহমৃতা হওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। ইনি তাঁর দুই পুত্র নকুল ও সহদেবকে কুন্তীর হাতে সমর্পণ করে সহমৃতা হন।
রাজধানীতে ফিরে তিনি সন্তানদের নিয়ে ধৃতরাষ্ট্রের আশ্রয়ে থাকা শুরু করেন। এই সময় পঞ্চপাণ্ডব ধৃতরাষ্ট্রের একশত সন্তানের সাথে দ্রোণাচর্যের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেন।
পাণ্ডবদের শক্তিবৃদ্ধি দেখে দুর্যোধন যখন পঞ্চপাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার জন্য জতুগৃহে প্রেরণ করেন, তখন কুন্তী এঁদের সাথে ছিলেন। কিন্তু বিদুরের সহায়তায় এঁরা রক্ষা পান। বিদুরের প্রেরিত নৌকা যোগে এরা নদী পার হয়ে এক জঙ্গলে আশ্রয় নেন। এই সময় ক্লান্ত হয়ে সকলে ঘুমিয়ে পড়লে ভীম একা সকলকে পাহারা দেন। এইখানকার হিড়িম্ব নামক এক রাক্ষস এদের মাংস খাওয়ার জন্য তাঁর বোন হিড়িম্বাকে পাঠান। কিন্তু হিড়িম্বা ভীমের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হিড়িম্বের অভিসন্ধির কথা বলে দেন। বোনের বিলম্ব দেখে হিড়িম্ব নিজে এলে, ভীম তাঁকে হত্যা করেন। পরে কুন্তীর অনুমতি নিয়ে হিড়িম্বাকে বিবাহ করেন। এরপর সন্তানদের সাথে কুন্তী একচক্রা নগরীতে এক ব্রাহ্মণ পরিবারের আশ্রয়ে উঠে আসেন। এই নগরীতে বক নামক রাক্ষস প্রতিদিন নগরীর একজন করে মানুষ ভক্ষণ করতো। পাণ্ডবরা যেদিন ব্রাহ্মণের ঘরে আশ্রয় নেন, সেদিনই উক্ত ব্রাহ্মণকে রাক্ষসের আহার করার কথা ছিল। কুন্তী উক্ত ব্রাহ্মণের পরিবর্তে রাক্ষসের কাছে ভীমকে পাঠান। ভীম উক্ত রাক্ষসকে হত্যা করে একচক্রাবাসীদেরকে রাক্ষসদের হাত থেকে রক্ষা করেন।
এই নগরীতে থাকাকালীন সময়ে পাণ্ডবরা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর-সভার কথা জানতে পারেন। উক্ত সভায় অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রৌপদীকে লাভ করলে- সভায় আহুত অন্যান্যরা পাণ্ডবদের আক্রমণ করে। পাণ্ডবরা যুদ্ধে সকলকে পরাজিত করে দ্রৌপদীকে সাথে নিয়ে কুন্তী'র কাছে আসেন। দ্রৌপদীকে নিয়ে পঞ্চপাণ্ডব যখন ঘরে ফেরেন, তখন কুন্তীর ঘরের মধ্যে ছিলেন। পঞ্চপাণ্ডব তাঁদের মাকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তাঁরা একটি অপূর্ব সামগ্রী ভিক্ষা করে এনেছেন। কুন্তী না দেখেই বলেন,- তোমরা সকলে মিলে সেই জিনিস ভোগ কর। এরপর দ্রৌপদীকে দেখে ইনি বিব্রত হয়ে পড়েন। পরে ব্যাসের বিধান মতে- পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদীকে বিবাহ করেন।
এর কিছুদিন পর ধৃতরাষ্ট্র পঞ্চপাণ্ডব, দ্রৌপদী এবং কুন্তীকে হস্তিনাপুরে নিয়ে আসেন। পাণ্ডবরা ইন্দ্রপ্রস্থ নগর প্রতিষ্ঠা করে পৃথক রাজত্ব করতে থাকেন। শকুনীর কপট পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির হেরে গিয়ে ১২ বত্সর বনবাস ও ১ বত্সর অজ্ঞাতবাসের শাস্তি হিসাবে রাজধানী ত্যাগ করলে- কুন্তী বিদুরের কাছে আশ্রয় নেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পূর্বে কৃষ্ণ হস্তিনাপুরে এসে কুন্তীর সাথে দেখা করেন। এই সময় কুন্তী কৃষ্ণের মারফত পঞ্চপাণ্ডবদেরকে ক্ষত্রিয়ের ন্যায় যুদ্ধ করে রাজ্য উদ্ধার করতে আদেশ দেন।
বীরের কন্যাই বীর-ভাব প্রকাশ করেন। কুন্তী বলিলেন—“হে কেশব! তুমি বৃকোদর ও ধনঞ্জয়কে কহিবে যে, ক্ষত্রিয় কন্যা যে নিমিত্ত গর্ভ ধারণ করে, তাহার সময় সমুপস্থিত হইয়াছে; অতএব যদি তোমরা এই সময়ে বিপরীতাচরণ কর, তাহা হইলে অতি ঘৃণাকর কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করা হইবে। তাহারা নৃশংসের ন্যায় কাৰ্য্য করিলে আমি তাহাদিগকে চিরকালের নিমিত্ত পরিত্যাগ করিব; সময় ক্রমে প্রাণ পৰ্য্যন্ত পরিত্যাগ করিতে হয়”
যুদ্ধ শেষে রাজ্যলাভের পর যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। এই যজ্ঞশেষে কুন্তী ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর সাথে শতযূপ আশ্রমে গমন করেন। এখানে মাসে একবার আহার গ্রহণ করে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। এই সময় বনের দাবানলে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর সাথে ইনি মৃত্যুবরণ করেন।
সবকিছুই নিয়তি এটা সত্য। তারপরেও দুর্বাসা মুনী যে আশির্বাদ বা বর দিয়েছিল তা প্রয়োজ্য একজন পরিণত মেয়ের জন্য । কুমারী অল্পবয়সী নারী না বুঝেই দ্বাদশ আদিত্যের শ্রেষ্ঠ আদিত্য সূর্যদেবতাকে আহবান করেছিলো । এখন মুনীর বর , খন্ডানোর সাহস দেবতারও নেই । তাই হয়ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও সূর্য দেবতা কুন্তীর সংগে অবগাহন করেছিলেন । কুমারী কুন্তী মাতা হয়ে গেলেন , না বুঝেই । একে লোকনিন্দার ভয় তার উপর কুমারী অবস্থায় সন্তান কি ভাবে মানুষ করবেন , তার চেয়ে নিজের সন্তানকে নদীতে ভাসিয়ে দিলেন । যাকে বলে মাতৃত্বের এক ধরনের বিসর্জন । একই সংগে দু্ই ধরনের দুঃখ বা শোক সইতে হলো ।
রাজবধু হলেন ঠিকই । কিন্তু বেশীদিন সুখ সইলোনা । স্বামীর ভুলে , সতীন মাদ্রির ভুলে তাকে স্বামীও হারাতে হলো , মাদ্রিকে হারাতে হলো । নিজের তিন সন্তান সহ সতীনের দুই সন্তানকে নিজের পুত্র হিসাবে বড় করে তোলার মত মহৎ কার্য করেছেন । সৎ মায়ের সংগাই বদল করে দিয়েছিলেন এই মহিয়ষী নারী । সব ভাইকে সমান ভাগে ভাগ করতে শিখিয়েছিলেন নারী । সন্তানদের নিয়ে শ্বশুড় বাড়ীতে ফিরে এলেন । ছেলেদের মানুষ করলেন । যুধিষ্টিরের রাজ্যাভিষেক হলো । কিন্তু রাজমাতা হওয়া হলোনা । ধৃতরাষ্টের কুট চালে তাঁর ইন্দ্রপ্রস্থে যাওয়া হলোনা , হস্তিনাপুরে থেকে যেতে হলো । যে সন্তান ছাড়া একদিনও থাকেন নাই । সন্তানরাও মা ছাড়া চলেন নাই । তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেলো । শকুনির কুট চালে তাঁর পুত্রবধূকে রাজসভায় লাঞ্ছিত হতে দেখলেন কৌরব দ্বারা । কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে নিজের দুই পুত্র এর মধ্যে যুদ্ধ দেখতে হলো (অর্জুন ও কর্ণ ) । মা হয়ে কুমারী বয়সের লজ্বার কথা সন্তানদের বলতে হলো প্রয়োজনে। এক সন্তানের মৃত্যুর বিনিময়ে আর এক সন্তানকে বাঁচানোর প্রয়াস।
অর্জুনকে বাঁচাইতে কর্ণের
কবজকুন্ডল দান রূপে চাহিল।
দানবীর কর্ন নিজের রক্ষাকবচ
কুন্তী কে স্বাদরে দান দিল।
অর্জুন, কর্ন উভয়ই কুন্তীর সন্তান,
অগ্রজ কে ত্যাগিয়া অনুজকে
রক্ষা করিলেন।
এই নারী কোন দিন সুখের মুখ দেখেননি।
সমাজের নিয়ম... সংসারের নিয়ম... সব নিয়ম রক্ষা করেছেন।
বিনা দোষে মাতা কুন্তি দোষের ভাগি হয়েছিলেন।
কুন্তি এমন এক ভারতীয় নারী যার চোখের জল কেউ মোছাতে পারেনি।
কুন্তি এমন একজন মাতা যিনি বহু চেষ্টার পরেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ থামাতে পারেননি। কিন্তু সব থেকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি হয়েছিলেন তখন যখন তিনি জানতে পারলেন যে কর্ণ তাঁরই সেই পরিত্যক্ত সন্তান। হাজার প্রচেষ্টা করার পরেও কর্ণ- অর্জুন যুদ্ধ তিনি আটকাতে পারেননি, ফলে অর্জুনের হাতে নিহত হন কর্ণ।
কুন্তি এমন একজন নারী যার জন্য যুধিষ্ঠির সমগ্র নারী জাতিকে অভিশাপ দেন যে তারা কোন দিন কোন কিছু লুকোতে পারবেন না।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর পাণ্ডবরা সবার মৃতদেহ সত্কারের সময় কুন্তী তাঁদের কাছে কর্ণের জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করে তাঁর উদ্দেশ্যেও তর্পণ করতে অনুরোধ করেন। এতে যুধিষ্ঠির ক্ষিপ্ত হয়ে অভিশাপ দেন যে- স্ত্রী জাতি কোন বিষয়ই গোপন রাখতে পারবে না।
কুন্তি এমন এক নারী যিনি নিজের প্রিয় নাতিদের মৃত্যু দেখেছিলেন।
শেষ করি কবিগুরু কথা দিয়েই ।
কুন্তী।
এসেছি তোমারে নিতে।
কর্ণ।
কোথা লবে মোরে!
কুন্তী।
তৃষিত বক্ষের মাঝে-- লব মাতৃক্রোড়ে।
কর্ণ।
না জীবিত কর্ণকে মাতৃক্রোড়ে লওয়া সম্ভব হয়নি । মৃত সন্তানকে নিতে হয়েছিল এই চিরদুঃখীনি মাতাকে ।

মাদ্রী

মাদ্রী

মাদ্রী (সংস্কৃত: माद्री) হলেন হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতের অন্যতম নারীচরিত্র। তিনি হলেন মদ্রদেশের রাজকন্যা এবং হস্তিনাপুরের রাজা পাণ্ডুর দ্বিতীয়া স্ত্রী। তিনি কনিষ্ঠ পাণ্ডবদ্বয় তথা যমজ ভাই নকুল ও সহদেবের গর্ভধারিনী বা মাতা। তার ভাই হলেন মদ্রদেশের যুবরাজ এবং পরবর্তীতে রাজা শল্য। তার আসল নাম মাধুরী।মাদ্রী শব্দের অর্থ হলো মদ্র দেশের রাজকন্যা, অথবা মদ্রকুমারী

কুন্তীর সাথে তার বিয়ের পরে পাণ্ডু মদ্ররাজের কনিষ্ঠ কন্যা মাদ্রীকে বিয়ে করেছিলেন। পাণ্ডু ও মাদ্রীর কোন সন্তান ছিল না। ফলস্বরূপ, সপত্নী কুন্তীর কাছ থেকে ঋষি দুর্বাসাপ্রদত্ত পুত্রেষ্টিমন্ত্র অল্পসময়ের জন্য চেয়ে নিয়ে তিনি অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে পুত্রদান নিমিত্তে আহ্বান করেন। তাদের আশীর্বাদে দুই পুত্র (কনিষ্ঠ পাণ্ডবনকুল ও সহদেবের জন্ম হয়। কিছু মতানুসারে তিনি সরস্বতীর বরে শাশ্বতী নামে একটি কন্যার জন্ম দিয়েছিলেন।

নকুল ও সহদেবের জন্মের পর পাণ্ডু একদা বনে মাদ্রীকে দেখে কামার্ত হয়ে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হন। এই সঙ্গমের ফলে পাণ্ডুর মৃত্যু হয়। নিজেকে স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী ভেবে মাদ্রী তাঁর পুত্রদের কুন্তীর দায়িত্বে রেখে সতী (স্বামীর চিতায় স্বেচ্ছায় সহমরণে যাওয়া) হন।


প্রথম পান্ডব যুধিষ্ঠিরঃ

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে
 
পঞ্চপাণ্ডবদের একজন। অন্যান্য পাণ্ডবদের মতেই ইনিও ছিলেন পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ পুত্র। এঁর প্রকৃত পিতা ধর্ম। মায়ের নাম কুন্তী (কুন্তীর দ্বিতীয় পুত্র)। উল্লেখ্য, কুন্তীর প্রথম পুত্র ছিলেন কর্ণ (সূর্য-এর ঔরসে জাত)

 

একবার একটি বনে, কিন্দম মুনি হরিণের রূপ ধারণ করে একটি হরিণীর সাথে সঙ্গম করছিলেন। ওই বনে পাণ্ডু মৃগয়া গিয়ে সঙ্গমরত হরিণের উপর শর নিক্ষেপ করে হত্যা করেন। মৃত্যুর আগে মুনি স্বমূর্তি ধারণ করে, পাণ্ডুকে অভিশাপ দিয়ে বলেন

'মৃগভ্রমেই আমার উপর শরনিক্ষেপ করিয়াছ, এ নিমিত্ত তোমার ব্রহ্মহত্যার পাপ হইবে না, কিন্তু সঙ্গমসময়ে আমাকে বধ করাতে তোমার যে পাপ হইয়াছে, তাহার ফল অবশ্যই তোমাকে ভোগ করিতে হইবে। তুমি যে সময়ে স্ত্রীসংসর্গ করিবে, সেই সময়ে তোমার মৃত্যু হইবে। তুমি যে পত্নীর সইত সংসর্গ করিয়া কালগ্রাসে পতিত হইবে, তিনি ভক্তিভাবে তোমার সহগামিনী হইবেন। হে রাজন! তুমি যেমন সুখের সময়ে আমাকে দুঃখ দিলে, সেইরূপ তোমাকেও সুখকালে দুঃখ পাইতে হইবে।' [মহাভারত, আদিপর্ব: অষ্টাদশাধিকশততম অধ্যায়। পাণ্ডুর প্রতি মৃগরূপী মুনির শাপ]

এই অভিশাপের কারণেমাদ্রী এবং কুন্তী উভয়ই স্বামী-সংসর্গ থেকে বঞ্চিত হন। পরে কুন্তী সন্তান কামনায় পাণ্ডুর অনুরোধে তিন দেবতার সাথে মিলিত হন এবং তিনটি সন্তান লাভ করেন। কুন্তী প্রথম আহ্বান করেছিলেন ধর্ম দেবতাকে। ধর্মের সাথে মিলিত হলে, যুধিষ্ঠিরের জন্ম হয়। যুধি (যুদ্ধে) স্থির থাকতেন বলে, তাঁর নাম হয়েছিল যুধিষ্ঠির

পাণ্ডুর মৃত্যুর পর কুন্তী নিজের তিনটি পুত্র ও মাদ্রীর দুটি পুত্র নিয়ে হস্তিনাপুরে ধৃতরাষ্ট্র-এর আশ্রয়ে আসেন। এই সময় পঞ্চপাণ্ডব ও ধৃতরাষ্ট্রের একশত সন্তান দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষা লাভ করেন

যুধিষ্ঠির রথ চালনায় বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। প্রাপ্তবয়স্ক হলে বংশের বড় সন্তান হিসাবে ধৃতরাষ্ট্র (পাণ্ডুর ভাই) তাঁকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করেন। এতে ধৃতরাষ্ট্র-এর পুত্ররা বিশেষ করে দুর্যোধন ঈর্ষান্বিত হয়ে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে থাকেন। কিন্তু পাণ্ডবদের মধ্যে ভীম ও অর্জুন দুর্যোধনের  একশত ভাইয়ের চেয়ে শক্তিশালী ও অপরাজেয় উঠলেদুর্যোধন  কৌশলে কুন্তীসহ পঞ্চপাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার জন্য জতুগৃহে পাঠান

জতুগৃহের পথে যাত্রাকালে বিদুর সাঙ্কেতিক ভাষায় যুধিষ্ঠিরকে দুর্যোধনের দুরভিসন্ধি জানিয়ে দেন। পরে কৌশলে জতুগৃহ থেকে এঁরা রক্ষা পান এবং নৌকা যোগে নদী পার হয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করেন। অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে জঙ্গলে সকলে ঘুমিয়ে পড়লে দ্বিতীয়    পাণ্ডব ভীম একা সকলকে পাহারা দেন। এই সময় তিনি হিড়িম্ব নামক এক রাক্ষসকে হত্যা করে পাণ্ডবদের রক্ষা করেন। পরে  যুধিষ্ঠির ও কুন্তীর অনুগ্রহে ভীমের সাথে হিড়িম্বার বিবাহ হয়।

 

এরপর যুধিষ্ঠির সবাইকে নিয়ে একচক্রা নগরীর একটি ব্রাহ্মণ পরিবারের আশ্রয়ে উঠে আসেন। এখানে ভীম বক নামক রাক্ষসকে হত্যা করেন। এই নগরীতে থাকাকালীন সময়ে পাণ্ডবরা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর-সভার কথা জানতে পারেন। এই স্বয়ংবর সভা দেখার জন্য পাণ্ডবরা রওনা হন। পথে গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণের সাথে অর্জুনের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে অর্জুন অঙ্গারপর্ণকে পরাজিত করে বন্দী করেন। এরপর অঙ্গারপর্ণের স্ত্রী কুম্ভীনসী যুধিষ্ঠিরের কাছে স্বামীর মুক্তির আবেদন করেন। যুধিষ্ঠিরের আদেশে অর্জুন তাঁকে ছেড়ে দেন। 
   
 

স্বয়ংবর সভায় অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রৌপদীকে লাভ করলে, সভায় আহুত অন্যান্যরা পাণ্ডবদের আক্রমণ করে। পাণ্ডবরা যুদ্ধে সকলকে পরাজিত করে দ্রৌপদীকে সাথে নিয়ে কুন্তীর কাছে আসেন। দ্রৌপদীকে নিয়ে পঞ্চপাণ্ডব যখন ঘরে ফেরেনতখন কুন্তী ঘরের মধ্যে ছিলেন। পঞ্চপাণ্ডব তাঁদের মাকে উদ্দেশ্য করে বলেন যেতাঁরা একটি অপূর্ব সামগ্রী ভিক্ষা করে এনেছেন। কুন্তী না দেখেই বলেনতোমরা সকলে মিলে সেই জিনিস ভোগ কর। এরপর দ্রৌপদীে দেখে ইনি বিব্রত হয়ে পড়েন। পরে কৃষ্ণ-দ্বৈপায়নের (বেদব্যাস)-এর  বিধান মতে- পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদী বিবাহ করেন। 
 

উল্লেখ্য দ্রৌপদী গর্ভে যুধিষ্ঠিরের প্রতিবিন্ধ্য নামক পুত্র জন্মে। এছাড়া তিনি গোবাসনের কন্যা দেবিকার স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত হয়ে দেবিকাকে লাভ করেন। এঁর গর্ভে বৌধেয় নামক এক পুত্র জন্মে নারদের পরামর্শে যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেন। মগধরাজ জরাসন্ধ এই যজ্ঞের বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন জেনে- কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন মগধ রাজ্যে যান। এখানে ভীম জরাসন্ধকে হত্যা করেন
 

এরপর ধৃতরাষ্ট্র নিজ উদ্যোগে পঞ্চপাণ্ডবদ্রৌপদী এবং কুন্তীকে হস্তিনাপুরে নিয়ে আসেন। পাণ্ডবরা ফিরে এসে ইন্দ্রপ্রস্থ নগর প্রতিষ্ঠা করে পৃথক রাজ্য স্থাপন করেন এবং যুধিষ্ঠির রাজা হন। রাজসূয় যজ্ঞের অর্থ আহরণের জন্য পাণ্ডবরা দিগ্বিজয়ে বের হন। যথাসময়ে এঁরা দিগ্বিজয় শেষে ফিরে এলে যুধিষ্ঠির রাজসূয়ো যজ্ঞ সম্পন্ন করেন

দ্রৌপদী নিয়ে যাতে ভ্রাতৃবিরোধ না ঘটে, সে কারণে নারদ নিয়ম করে দেন যেএকটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যদ্রৌপদী একজন মাত্র পাণ্ডবের অধীনে থাকবেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অধিকারপ্রাপ্ত পাণ্ডব ব্যতীত অন্য কোন পাণ্ডব দ্রৌপদীকে গ্রহণ করলে বা দ্রৌপদীর সাথে অধিকারপ্রাপ্ত পাণ্ডবের বিহারকালে অন্য পাণ্ডব দর্শন করলে, তাঁকে ১২ বৎসর বনবাসী থাকতে হবে। ঘটনাক্রমে- একবার এক ব্রাহ্মণকে সাহায্য করার জন্যঅর্জুন অস্ত্রাগারে প্রবেশ করলে, সেখানে যুধিষ্ঠিরের সাথে দ্রৌপদীকে এক শয্যায় দেখতে পান। এই কারণে অর্জুন ১২ বৎসর বনবাসের জন্য গৃহত্যাগ করেন। ১২ বৎসর পরে ভাইদের সাথে মিলিত হন।


দুর্যোধন যজ্ঞানুষ্ঠানে এসে পাণ্ডবদের ঐশ্বর্যে ঈর্ষান্বিত হন এবং পাণ্ডবদের ক্ষতি করার জন্য শকুনি'র (দুর্যোধনের মামা) পরামর্শ নেন। শকুনির পরামর্শে দুর্যোধন  যুধিষ্ঠিরকে পাশা খেলায় নিমন্ত্রণ করেন। যুধিষ্ঠির উক্ত খেলায় রাজী হলে, শকুনি কপট পাশাতে যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করেন। এই খেলায় যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীসহ রাজ্যপাট হারান। দুর্যোধনের নির্দেশে দুঃশাসন রজস্বঃলা দ্রৌপদীর চুল ধরে সভায় আনেন। কর্ণের  পরামর্শে প্রকাশ্য সভায় দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করা শুরু করলেদ্রৌপদীর কাতর আহ্বানে কৃষ্ণ অলৌকিকভাবে তাঁকে অশেষ কাপড় দ্বারা আবৃত করে রাখেন। পরে ধৃতরাষ্ট্র সকলকে মুক্তি দেন। দুর্যোধন ও শকুনি'র পরামর্শে ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে পুনরায় পাশা খেলায় অনুমোদন দান করেন। এবার যুধিষ্ঠির হেরে গিয়ে ১২ বৎসর বনবাস ও ১ বৎসর অজ্ঞাতবাসের শাস্তি পান

এরপর পাণ্ডবরা রাজ্য ত্যাগ করে বনবাসের পথে গেলে দ্রৌপদী তাঁদের সাথে যান। এই যাত্রায় এঁরা প্রথমে কাম্যক বনে আসেনপরে দ্বৈতবনে এসে সরস্বতী নদীর তীরে আশ্রম নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকেন। এই সময় দ্রৌপদী ও ভীম প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের জন্য যুধিষ্ঠিরকে উত্তেজিত করতে থাকলে, ইনি প্রতিজ্ঞায় অটল থাকেন। এই সময় অস্ত্র সংগ্রহের জন্য অর্জুন দেবালোকে যাত্রা করেন। এরপর যুধিষ্ঠির অন্যান্যদের নিয়ে নৈমিষারাণ্যপ্রয়াগবদরিকাশ্রমভৃগুতীর্থগঙ্গাসাগরসঙ্গমমহেন্দ্রপর্বতপ্রভাসতীর্থ প্রভৃতি বহু তীর্থস্থান ভ্রমণ করেন
 

বনবাসের একাদশ বৎসরে যমুনার উৎপত্তিস্থানের নিকটস্থ বিশাখযূপ বনে পাণ্ডবদের বসবাসকালে, একদিন ভীম মৃগয়ায় বের হন। সেখানে অগস্ত্য-শাপে অজগররূপী নহুষ ভীমকে বেষ্ঠন করে আহার করতে উদ্যত হন। যুধিষ্ঠির বিভিন্ন দুর্লক্ষণ দেখে ভীমর খোঁজে বের হয়েঅজগররূপী নহুষের কাছে উপস্থিত হন। যুধিষ্ঠির নহুষের কাছে ভীমের মুক্তি দাবী করলেনহুষ যুধিষ্ঠিরের কাছে কিছু প্রশ্নের উত্তর চেয়ে বলেন যেপ্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলেই তবে ভীমকে মুক্তি দেবেন। এরপর যুধিষ্ঠির নহুষের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে ভীমকে উদ্ধার করেন। এই সময় নহুষ অভিশাপ মুক্ত হন
 

পাণ্ডবরা দ্বৈতবনে অবস্থানকালে দুর্যোধন মৃগয়ার অছিলায় পাণ্ডবদের দুর্দশা দেখতে এসে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের দ্বারা নিগৃহীত হলে পাণ্ডবরা তাঁকে রক্ষা করেন। এই সময় আত্মগ্লানিতে দুর্যোধন প্রায়োপবেশন করেন। এরপর কাম্যকবনে পাণ্ডবরা ফিরে এসে বসবাস করতে থাকে। একদিন পাণ্ডবদের অনুপস্থিতিতে জয়দ্রথ  দ্রৌপদীকে হরণ করেন। পাণ্ডবরা পরে জয়দ্রথকে ধরে এনে লাঞ্ছিত করতে থাকলে যুধিষ্ঠির তাঁকে রক্ষা করেন। কিন্তু ভীম তাঁর মাথায় অর্ধাস্ত্র বাণদ্বারা পঞ্চচূড়া তৈরি করে পাণ্ডবদের দাসরূপে বেড়াতে আদেশ করেন। এরপরও যুধিষ্ঠির তাঁকে মুক্তি দেন
 

বনবাসের দ্বাদশবর্ষে যুধিষ্ঠিরকে পরীক্ষা করার জন্য ধর্মদেবতা হরিণরূপে এক ব্রাহ্মণের অরণি-মন্থ চুরি করেন। ব্রাহ্মণ তাঁর অগ্নিহোত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় যুধিষ্ঠিরের শরণাপন্ন হন। এরপর পঞ্চপাণ্ডব উক্ত হরিণের অনুসরণ করেন। হরিণরূপী ধর্ম অদৃশ্য হলেযুধিষ্ঠির প্রার্থী ব্রাহ্মণের বিমুখ হওয়ার আশঙ্কায় অত্যন্ত দুঃখিত হন। দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে যুধিষ্ঠির নকুলকে নিকটস্থ সরোবর থেকে জল সংগ্রহের আদেশ দেন। নকুল উক্ত সরোবর থেকে জল সংগ্রহ করতে গেলে ধর্ম, বকরূপে আকাশ থেকে তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জল সংগ্রহ করতে বললেন। নকুল তা অগ্রাহ্য করে অগ্রসর হলে ভূপতিত হন। এরপর যুধিষ্ঠির অন্যান্য ভাইদের পাঠালেন। প্রত্যেকেই ধর্মকে অগ্রাহ্য করে জল সংগ্রহ করতে গেলে ভূপতিত হন। এরপর যুধিষ্ঠির নিজেই সরোবরে উপস্থিত হয়ে চার ভাইয়ের অবস্থা দেখলেন। ধর্ম তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জল সংগ্রহ করতে বলেন। যুধিষ্ঠির সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলে ধর্ম তাঁকে যে কোন এক ভাইয়ের জীবন ভিক্ষা দিতে ইচ্ছা করলেন। উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেন যেকুন্তী ও মাদ্রীর অন্তত একটি করে সন্তান বেঁচে থাকুক। ধর্ম তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে অপর চার পাণ্ডবের জীবনদান করলেন। এরপর ধর্ম বর প্রার্থনা করতে বললে, যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণের অরণি-মন্থ ফিরে চাইলেন। ধর্ম অরণি-মন্থ ফিরিয়ে দিয়ে অন্য বর প্রার্থনা করতে বললেন। এরপর অজ্ঞাতবাসকালে তাদের যেন কেউ চিনতে না পারে এই বর প্রার্থনা করলে, ধর্ম সেই বর দান করে প্রস্থান করেন। এরপর ধর্ম পাণ্ডবদের বিরাট রাজ্যে বাস করার উপদেশ দিয়ে প্রস্থান করেন

যুধিষ্ঠির 
বিরাটরাজের সভায় কঙ্ক নামে দ্যুতনিপুণ ব্রাহ্মণ হিসাবে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সৌরন্ধ্রীরূপী দ্রৌপদীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কীচক তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেদ্রৌপদী তা প্রত্যাখান করেন। এরপর কীচকের বারবার অনুরোধে সুদেষ্ণা (কীচকের বোন) মদ আনার অছিলায়, দ্রৌপদীকে কীচকের ঘরে পাঠান। কীচক দ্রৌপদীকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেদ্রৌপদী তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বিরাটের রাজসভায় উপস্থিত হন। এরপর কীচক রাজসভায় এসে সর্বসমক্ষে দ্রৌপদীর চুল ধরে তাকে লাথি মারেন। বিরাট-সভায় কীচক প্রকাশ্যে দ্রৌপদীকে লাথি মারলে, আত্মপরিচয় প্রকাশের আশঙ্কায় ভীমকে প্রতিশোধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বলেন। পরে দ্রৌপদীর অনুরোধে ভীম কীচককে হত্যা করেছিলেন।

পাণ্ডবদের এই অজ্ঞাতবাসের শেষাংশে 
দুর্যোধন বিরাটরাজের গোধন হরণ করলে যুধিষ্ঠিরের ইঙ্গিতে বৃহন্নলারূপী অর্জুন কৌরব-সৈন্যদের পরাস্ত করে গোধন উদ্ধার করেন অজ্ঞাতবাস শেষে যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের কাছে রাজ্য ফিরে চান। দুর্যোধন তাতে অসম্মত হলে, সঞ্জয় পাঁচ ভাইয়ের জন্য পাঁচটি গ্রাম প্রার্থনা করেন। যুদ্ধ পরিহার করার জন্য কৃষ্ণকে দুর্যোধনের কাছে পাঠান। সকল প্রস্তাবই দুর্যোধন অগ্রাহ্য করেন। এরপর যুধিষ্ঠির দুঃখিত হয়ে যুদ্ধের ব্যাপক আয়োজন সম্পন্ন করেন

 

যুদ্ধের আরম্ভে যুধিষ্ঠির রথ থেকে নেমে ভীষ্মদ্রোণাচার্যশল্য প্রমুখ গুরুজনদের প্রণাম করে আশীর্বাদ ভিক্ষা করেন। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র যুযুৎসু পাণ্ডব পক্ষে যোগ দিতে ইচ্ছা করলে যুধিষ্ঠির সম্মতি দেন

যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে অভিমন্যু চক্রব্যূহ ভেদ করার ইচ্ছা করলে, যুধিষ্ঠির তাঁকে বাধা দেনপরে নিরুপায় হয়ে অভিমন্যুকে অনুমতি দেন। উল্লেখ্য উক্ত যুদ্ধে অভিমন্যু নিহত হন

দ্রোণকে যুদ্ধে নিরস্ত করার জন্য কৃষ্ণ এবং ভীমের প্ররোচনায় যুধিষ্ঠির 'অশ্বত্থামা হতঃ-ইতি গজঃএই মিথ্যা উচ্চারণ করেন। যুধিষ্ঠিরের এই বাক্যে দ্রোণ তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা'র মৃত্যু হয়েছে মনে করে অস্ত্রত্যাগ করেন। উল্লেখ্য অশ্বত্থামা নামক হাতির মৃত্যু হয়েছে এই সংবাদটাই যুধিষ্ঠির মিথ্যার আশ্রয়ে উচ্চারণ করেন। এই মিথ্যাচারের জন্য তাঁর রথ কিছুটা ভূমির দিকে নেমে যায়

যুদ্ধের সপ্তদশ দিনে যুধিষ্ঠির 
কর্ণের কাছে পরাজিত ও লাঞ্ছিত হয়ে শিবিরে পলায়ন করেন। এই সময় অর্জুন উপস্থিত হয়ে কর্ণকে হত্যা করতে ব্যর্থ হলে যুধিষ্ঠির তাঁকে তিরস্কার করে গাণ্ডিব ত্যাগ করতে বলেন। এতে অর্জুন ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে যুধিষ্ঠিরকে হত্যা করতে উদ্যত হলে কৃষ্ণ তাঁকে নিবারণ করেন। পরে অবশ্য কর্ণকে অর্জুনই হত্যা করেছিলেন

যুদ্ধের অষ্টাদশ দিনে যুধিষ্ঠির 
শল্যকে হত্যা করেন। যুদ্ধের শেষে দুর্যোধনের দ্বৈপায়ন হ্রদে আত্মগোপন করলে, যুধিষ্ঠির তাঁকে তীক্ষ্ণবাক্যে উত্তেজিত করেন। পরে ভীমের সাথে দুর্যোধনের গদা যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ভীম অন্যায়ভাবে দুর্যোধনের উরু ভেঙে দেন। যুদ্ধের শেষে ক্রুদ্ধ গান্ধারী যুদ্ধক্ষেত্রে এলে ইনি তাঁর ক্রোধ প্রশমিত করার জন্য গান্ধারীর পায়ে ধরেন। এ সময় গান্ধারী বস্ত্রাবরণের আড়াল থেকে শুধুমাত্র যুধিষ্ঠিরের নখগুলি দেখতে পান। ফলে যুধিষ্ঠিরের নখগুলো বিকৃত হয়ে যায়
 

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর পাণ্ডবরা সবার মৃতদেহ সৎকারের সময় কুন্তী তাঁদের কাছে কর্ণের জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করে তাঁর উদ্দেশ্যেও তর্পণ করতে অনুরোধ করেন। এতে যুধিষ্ঠির ক্ষিপ্ত হয়ে অভিশাপ দেন যে, স্ত্রী জাতি কোন বিষয়ই গোপন রাখতে পারবে না
 

যুদ্ধ শেষে যুধিষ্ঠিরের রাজ্যাভিষেক হয়। এই সময় যুধিষ্ঠির আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুর জন্য অনুতপ্ত হয়ে রাজপদ ত্যাগ করতে উদ্যত হন। কিন্তু কৃষ্ণ, কৃষ্ণ-দ্বৈপায়নঅনুনয় করে তাঁকে রাজ্য গ্রহণে সম্মত করান। রাজ্যগ্রহণের পর ইনি শরশয্যাশায়ী ভীষ্মের কাছে উপস্থিত হন। ভীষ্ম তাঁকে বহু পরামর্শ দিয়ে দেহত্যাগ করেন। এরপর ইনি আত্মীয়-স্বজন হত্যাজনীত অপরাধ থেকে উদ্ধারের জন্য ব্যাসদেবের পরামর্শে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। এরপর যুধিষ্ঠির ৩৬ বৎসর রাজত্ব করেন। এই সময় ইনি ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর সেবা করার ব্যবস্থা করেন
 

যদুবংশ ধ্বংসের পর ইনি অভিমন্যুর পুত্র পরীক্ষিৎ-কে রাজ্যে অভিষিক্ত করেন এবং যুযুৎসু'র উপর রাজ্যের ভার অর্পণ করে চার ভাই ও দ্রৌপদীসহ মহাপ্রস্থানের প্রস্তুতি নেন। এই সময় তাঁদের সাথে ধর্মদেবতা কুকুররূপে সঙ্গ নেন। পথিমধ্যে চার ভাই ও দ্রৌপদীর পতন ঘটে। এরপর একমাত্র কুকুরকে সঙ্গী করে ইনি স্বর্গদ্বারে উপস্থিত হন। কিন্তু ইন্দ্র যুধিষ্ঠিরকে বলেন যে, তিনি কুকুরসহ স্বর্গে প্রবেশ করতে দিবেন না। উত্তরে ইনি বলেন যেপ্রভুভক্ত কুকুর ছাড়া স্বর্গে প্রবেশ করলে, তা নির্দয়তা হবে। সুতরাং কুকুর ছাড়া তিনি স্বর্গে প্রবেশ করবেন না। এরপর ধর্ম কুকুরের রূপ পরিত্যাগ করে যুধিষ্ঠিরকে বলেন যে, যুধিষ্ঠির তোমার সমান স্বর্গে কেউ নেই


স্বর্গে প্রবেশ করে তিনি তাঁর ভাইদের দেখতে চান
। দেবদূতরা তাঁকে নরকে নিয়ে যান। সেখানে ভাইদের দেখতে পেয়ে স্বর্গে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানালেইন্দ্র তাঁকে বলেন যে, যুধিষ্ঠির অশ্বত্থামার মৃত্যু সংবাদ দিয়ে দ্রোণাচার্যের সাথে প্রতারণা করেন বলে,  তাঁকে কৌশলে নরক দর্শন করান হয়েছে। এরপর যুধিষ্ঠির পাণ্ডবদের নিয়ে স্বর্গে প্রবেশ করেন


 দ্বিতীয় পান্ডব ভীমঃ


হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে এই নামে তিনটি চরিত্র রয়েছে। এঁরা হলেন

. পুরূরবার পুত্র
. ইনি ছিলেন বিদর্ভরাজ ও দয়মন্তীর পিতা। ইনি বহুদিন নিঃসন্তান ছিলেন বলে অত্যন্ত দুঃখিত ছিলেন। একবার দমন নামে এক ঋষি তাঁর কাছে এলে- ইনি পুত্রলাভের আশায় মহর্ষির কাছে তাঁর স্ত্রীকে পাঠান। ফলে ইনি তিনটি ক্ষেত্রজ পুত্র ও একটি ক্ষেত্রজ কন্যা লাভ করেন। পুত্র তিনটির নাম ছিল দমদান্ত ও দমন। কন্যার নাম ছিল দয়মন্তী

. পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ পুত্র। পাণ্ডুর অনুমতিক্রমে তাঁর স্ত্রী কুন্তী পবনদেবের সাথে মিলিত হলে- ভীমের জন্ম হয়। ইনি ছিলেন কুন্তীর তৃতীয় পুত্র এবং পাণ্ডুর দ্বিতীয় ক্ষেত্রজ পুত্র। 

ইনি দৈহিক আকৃতিতে ছিলেন বিশাল এবং শক্তি ছিল অপরিমিত। এঁর কোন দাড়ি না থাকায় কর্ণ এঁকে মাকুন্দ বলে পরিহাস করতেন। এর গায়ের রং ছিল কাঁচা সোনার মত। ইনি ছিলেন বিশাল কাঁধের অধিকারীউন্নতবক্ষ ও অযুত হাতীর শক্তির সমান বলশালী। ইনি অতিরিক্ত ভোজনপটু ছিলেন বলেবৃকোদর নামপ্রাপ্ত হন। বাকী চার পাণ্ডব এবং ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সাথে দ্রোণাচার্যের কাছে ইনি অস্ত্র শিক্ষা করেন। এরপর ইনি বলরামের কাছে বিশেষভাবে গদাযুদ্ধ শেখেন। ফলে ইনি অবিলম্বে গদা যুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। ছোটবেলায় শারীরীক শক্তির কারণে কৌরবদের একশত ভাইকে সবসময় নিপীড়িত করতেন। বিপদের সময় দ্রৌপদী এবং ভীম এঁর উপরই সবচেয়ে বেশী নির্ভর করতেন
 

শৈশবে দুর্যোধন তাঁকে হত্যা করার জন্য প্রমাণকোটি নামক স্থানে একটি জলক্রীড়ার জন্য স্থান নির্বাচন করেন। পরে সকলকে ডেকে উক্ত স্থানে জলক্রীড়া করার সময় বিষ মিশ্রিত পিঠা খাওয়ান এবং লতা দিয়ে হাত পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেন। এই অবস্থায় ইনি নাগলোকে পৌঁছুলেনাগদের দংশনে তাঁর শরীরস্থ বিষের ক্ষয় হয়। জ্ঞান লাভ করে ইনি নাগদের হত্যা করতে থাকেন। পরে নাগরাজ তাঁকে নিজের দৌহিত্র কুন্তীভোজের দৌহিত্র বলে চিনতে পেরে ভীমকে আলিঙ্গন করেন এবং রসায়ন পান করান। ইনি মোট আটটি রসায়ন-কুণ্ডু পান করে আট দিন ঘুমিয়ে কাটান। আটদিন ধরে ইনি রসায়ন হজম করে অযুত হাতির বল লাভ করেন। পরে নাগদের সহায়তায় ইনি ঘরে ফিরে আসেন
 

দুর্যোধন জুতগৃহে অন্যান্য পাণ্ডবদের সাথে এঁকেও পুড়িয়ে মারার উদ্যোগ নেন। পরে বিদুরের সহায়তায় অন্যান্যদের সাথে ইনিও রক্ষা পান। ভীম সুরঙ্গপথে সকলকে অন্যত্র পাঠিয়ে নিজেই জতুগৃহে অগ্নিসংযোগ করে সকলকে সাথে নিয়ে গঙ্গাতীরে উপস্থিত হন এবং সেখান থেকে বিদুরের প্রেরিত নৌকায় করে গঙ্গা পার হয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করেন।    দেখুন : জতুগৃহ

এখানে সকলে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ভীম একা সকলকে পাহারা দেন। এই বনে হিড়িম্ব নামক এক রাক্ষস বাস করতো। হিড়িম্ব এদের মাংস খাওয়ার জন্য তাঁর বোন হিড়িম্বাকে পাঠায়। কিন্তু হিড়িম্বা ভীমের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সুন্দরী নারীরূপ ধরে ভীমের সামনে আসেন এবং হিড়িম্বের অভিসন্ধির কথা বলে দেন। ইনি ভীমের কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেন। বোনের বিলম্ব দেখে হিড়িম্ব নিজে এলেভীম তাঁকে হত্যা করেন এবং হিড়িম্বাকে বিবাহ করেন


এরপর পাণ্ডবেরা একচক্রা নামক নগরে এসে এক ব্রাহ্মণের ঘরে আশ্রয় নেন
। এই নগরীতে বক নামক রাক্ষস প্রতিদিন নগরীর একজন করে মানুষ ভক্ষণ করতো। পাণ্ডবরা যেদিন ব্রাহ্মণের ঘরে আশ্রয় নেনসেদিনই উক্ত ব্রাহ্মণ রাক্ষসের খাবার হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কুন্তী উক্ত ব্রাহ্মণের পরিবর্তে রাক্ষসের কাছে ভীমকে পাঠান। ভীম উক্ত রাক্ষসকে হত্যা করে একচক্রাবাসীদেরকে রাক্ষসদের হাত থেকে রক্ষা করেন। দেখুন : বক
 

এই নগরীতে থাকাকালীন সময়ে পাণ্ডবরা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর-সভার কথা জানতে পারেন। উক্ত সভায় অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রৌপদীকে লাভ করলে- সভায় আহুত অন্যান্যরা পাণ্ডবদের আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে মূল কৃতিত্ব দেখান অর্জুন ও ভীম। পাণ্ডবরা যুদ্ধে সকলকে পরাজিত করে দ্রৌপদীকে সাথে নিয়ে কুন্তী'র কাছে আসেন। দ্রৌপদীকে নিয়ে পঞ্চপাণ্ডব যখন ঘরে ফেরেনতখন কুন্তী ঘরের মধ্যে ছিলেন। পঞ্চপাণ্ডব তাঁদের মাকে উদ্দেশ্য করে বলেন যেতাঁরা একটি অপূর্ব সামগ্রী ভিক্ষা করে এনেছেন। কুন্তী না দেখেই বলেন,- তোমরা সকলে মিলে সেই জিনিস ভোগ কর। এরপর দ্রৌপদীকে দেখে ইনি বিব্রত হয়ে পড়েন। পরে ব্যাসদেবের বিধান মতে- পঞ্চপাণ্ডবের সাথে দ্রৌপদী বিবাহ করেন 
 

এরপর পাণ্ডবেরা ইন্দ্রপ্রস্থে রাজধানী স্থাপন করে রাজত্ব শুরু করলেযুধিষ্ঠির রাজা হন। নারদের পরামর্শে যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেন। মগধরাজ জরাসন্ধ এই যজ্ঞের বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন জেনে কৃষ্ণ ভীম ও অর্জুনকে সাথে নিয়ে মগধ রাজ্যে উপস্থিত হন। কৃষ্ণভীম ও অর্জুন স্নাতক ব্রাহ্মণবেশে জরাসন্ধের সম্মূখে আসেন। জরাসন্ধ এই তিনজনের হাতে অস্ত্রব্যবহারের চিহ্ন দেখে প্রকৃত পরিচয় জানতে ইচ্ছা করলেকৃষ্ণ তাঁদের প্রকৃত পরিচয় দেন। এরপর জরাসন্ধের সাথে ভীমের মল্লযুদ্ধ হয়। ভীম একাধিকবার জরাসন্ধকে পরাজিত করে শরীর বিছিন্ন করেনকিন্তু অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে উক্তশরীর জোড়া লেগে জরাসন্ধ জীবিত হয়ে উঠতে থাকেন। এরপর কৃষ্ণের ইশারায় ভীম বিচ্ছিন্ন হওয়া দেহকে মিলিত হওয়ায় বাধা সৃষ্টি করলে- জরাসন্ধের প্রকৃত মৃত্যু ঘটে। রাজসূয় যজ্ঞের অর্থ আহরণের জন্য পাণ্ডবরা দিগ্বিজয়ে বের হলে ভীম পূব দিকে যাত্রা করেন। এই যাত্রায় ইনি পাঞ্চালবিদেহদশার্ণচেদিকোশলঅযোধ্যা প্রভৃতি দেশ জয় করে ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে আসেন
 

হস্তিনাপুরে দুর্যোধনের দ্যুতসভায় শকুনির কাছে যুধিষ্ঠির পরাজিত হলে- সভামধ্যে দুঃশাসন দ্রৌপদীকে অপমান করলেভীম দুঃশাসনের বক্ষরক্ত পান করার প্রতিজ্ঞা করেন। সভামধ্যে দ্রৌপদীকে অপমান করার জন্য দুর্যোধন বাম উরু প্রদর্শন করলেভীম দুর্যোধনের উরুভঙ্গের প্রতিজ্ঞা করেন। বনযাত্রাকালে ইনি দুর্যোধনের রক্তপান ও কৌরবভ্রাতাদের হত্যা করবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেন
 

কাম্যকবনে বসবাসকালে বকরাক্ষসের ভাই কির্মীর প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে পাণ্ডবদের আক্রমণ করলেভীম তাকেও হত্যা করেন। দ্বৈতবনে বসবাসকালে ভীম কপটতার দ্বারা যুদ্ধজয়ের পরামর্শ দিতে গেলে- যুধিষ্ঠিরের যুক্তির কাছে ইনি পরাজিত হন। বদরিকাশ্রমের কাছে বসবাসকালেগঙ্গায় সুগন্ধী পদ্মফুল ভেসে যেতে দেখে দ্রৌপদী উক্ত পদ্মসংগ্রহের জন্য ভীমকে অনুরোধ করেন। ভীম উক্ত পদ্ম সংগ্রহের জন্য অগ্রসর হয়ে গন্ধমাদন পর্বতে উপস্থিত হন। সেখানে তাঁর অগ্রজ হনুমানের সাথে দেখা হয়। পদ্ম সংগ্রহের জন্য ভুল করে মানুষের অগম্য স্বর্গপথে ভীম রওনা দিলেহনুমান রুগ্ন বানরের বেশে তাঁর পথরোধ করে বসেন। ভীম হনুমানকে পথ ছেড়ে দিতে বললেহনুমান তাতে রাজী হলেন না। ভীম তাঁর অগ্রজকে চিনতে না পেরে আস্ফালন করতে থাকলেহনুমান তাঁর লেজ বিছিয়ে দিয়ে বললেনতুমি এই লেজ সরিয়ে তোমার গন্তব্যে যাও। এরপর ভীম বহু চেষ্টা করেও উক্ত লেজ সরাতে অক্ষম হলেহনুমান তাঁর পরিচয় দেন। এরপর ভীম তাঁর অগ্রজের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেসমুদ্র লঙ্ঘনের পূর্বে হনুমানের রূপ কেমন ছিল তা দেখার জন্য আবেদন জানান। এই সময় হনুমান তাঁর বিন্ধ্যপর্বতের মতো বিশাল রূপ দেখান। এরপর হনুমান পদ্মবনের প্রকৃত পথ দেখান। উল্লেখ্য কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি আড়ালে থেকে ভীমকে সাহায্য করেছিলেন। এরপর হনুমানের দেখানো পথ ধরে ইনি কুবের ভবনের নিকটস্থ একটি জলাশয় থেকে কুবেরের অনুচরদের পরাজিত করে উক্ত পদ্ম সংগ্রহ করেন
 

জটাসুর নামক এক রাক্ষস পাণ্ডবদের সাথে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে বাস করতেন। একদিন ভীম মৃগয়ায় গেলেএই রাক্ষস যুধিষ্ঠিরনকুলসহদেব ও দ্রৌপদীকে অপহরণ করে। ভীম ফিরে এসে প্রকৃত বিষয় অবগত হয়ে এই অসুরকে হত্যা করেন। অর্জুন স্বর্গে অস্ত্রশিক্ষার জন্য গেলেতাঁর ফিরে আসার প্রতীক্ষায় কৈলাসপর্বতের কাছে পাণ্ডবরা যখন প্রতীক্ষা করছিলেনতখন দ্রৌপদীর প্ররোচনায় ভীম কুবেরের অনুচর রাক্ষসদেরকে সেখান থেকে বিতারিত করেন। এই সময় কুবেরের বন্ধু মণিমান ভীমের হাতে নিহত হন। বনবাসের একাদশ বত্সরে যমুনার উত্পত্তিস্থানের নিকটস্থ বিশাখযূপ বনে পাণ্ডবেরা বসবাসকালে একদিন ভীম মৃগয়ায় বের হন। সেখানে অগস্ত্য-শাপে অজগররূপী নহুষ ভীমকে বেষ্ঠন করে ভক্ষণ করতে উদ্যত হন। যুধিষ্ঠির বিভিন্ন দুর্লক্ষণ দেখে ভীমের খোঁজে বের হয়েঅজগররূপী নহুষের কাছে উপস্থিত হন। যুধিষ্ঠির নহুষের কাছে ভীমের মুক্তি দাবী করলেনহুষ যুধিষ্ঠিরের কাছে কিছু প্রশ্নের উত্তর দাবী করে বলেন যেপ্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলেই ভীমকে মুক্তি দেবেন। এরপর যুধিষ্ঠির নহুষের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে ভীমকে উদ্ধার করেন
 

কাম্যকবনে পাণ্ডবরা ফিরে এসে বসবাস করা কালে পাণ্ডবদের অনুপস্থিতে জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে হরণ করেন। পাণ্ডবরা জয়দ্রথকে ধরে এনে লাঞ্ছিত করতে থাকলে যুধিষ্ঠির তাঁকে রক্ষা করেন। কিন্তু ভীম তাঁর মাথায় অর্ধাস্ত্র বাণদ্বারা পঞ্চচূড়া তৈরি করে পাণ্ডবদের দাসরূপে বেড়াতে আদেশ করেন। এরপরও যুধিষ্ঠির তাঁকে মুক্তি দেন
 

পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসকালে ভীম বল্লভ নামে বিরাটের রন্ধনশালার অধ্যক্ষ হন। এখানে থাকা অবস্থায় ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে আয়োজিত উত্সবে জীমূত নামক মহামল্ল ও অন্যান্য বহু মল্লযোদ্ধাকে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করেন। বিরাটের শ্যালক দ্রৌপদীকে ভোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে সভামধ্যে অপমান করলেদ্রৌপদী ভীমকে বিষয়টি জানান। পরে ভীমের পরামর্শে দ্রৌপদী কীচককে রাত্রিবেলায় নাট্যশালায় আমন্ত্রণ জানান। কীচক দ্রৌপদীকে পাবার জন্য রাত্রিবেলায় নাট্যশালায় এলে ভীমের হাতে নিহত হন। কীচকের মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাবার সময় কীচকের ভাইয়েরা দ্রৌপদীকেও বন্দী করে শ্মশানে নিয়ে যান। ভীম ছদ্মবেশে তাঁদের সাথে গিয়ে সকলকে হত্যা করে দ্রৌপদীকে উদ্ধার করেন। এরপর সুশর্মা দুর্যোধনের সহায়তায় বিরাটরাজকে পরাজিত ও বন্দী করে তাঁর সকল গবাদি পশু হরণ করেন। পরে যুধিষ্ঠিরের আদেশে ভীম সুশর্মাকে পরাজিত ও বন্দী করে বিরাটরাজকে উদ্ধার করেন। অবশ্য এই যুদ্ধে মূখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন অর্জুন। দেখুন : অর্জুন
 

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভীম একা ধৃতরাষ্ট্রের একশত পুত্রকে হত্যা করেছিলেন। পাণ্ডবরা ভীমকে সামনে রেখে যুদ্ধ শুরু করেন। ইনি প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে ভীষ্মের সাথে যুদ্ধ করেন। দ্বিতীয় দিনে ইনি ক্রমান্বয়ে শক্রদেবভানুমানশ্রুতায়ুসত্যসত্যদেবকেতুমানসহ বহু কৌরব সৈন্যকে হত্যা করেন। চতুর্দশ ও পঞ্চম দিনে দ্রোণাচার্যের সাথে বীরত্বব্যঞ্জক যুদ্ধ করেন। যুদ্ধের সপ্তদশ দিনে ইনি দুঃশাসনকে হত্যা করে প্রতিজ্ঞা স্বরূপ তার বক্ষ চিরে রক্তপান করেন। এই দিনেই ইনি কর্ণের কাছে পরাজিত হন। কিন্তু কর্ণ কুন্তীর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে অর্জুন ছাড়া অন্য কোন পাণ্ডবকে হত্যা করবেন না। সেই কারণে ইনি ভীমকে মুক্তি দেন

যুদ্ধের অষ্টাদশ দিনে দুর্যোধনের সকল সৈন্য নিহত হলে- দুর্যোধন পালিয়ে দ্বৈপায়ন হ্রদে যান। মায়া দ্বারা জলের স্তম্ভ তৈরি করে সেখানে লুকিয়ে থাকেন। এই সময় দুর্যোধনের পক্ষের তিন সেনাপ্রধান অশ্বত্থামাকৃপাচার্য ও কৃতবর্মা যুদ্ধের পরামর্শ করতে এলে- তিনি পরদিনের জন্য এই আলোচনা স্থগিত রাখতে বলেন। এই আলোচনা কয়েকজন শিকারী শুনে পাণ্ডবদের কাছে এসে দুর্যোধনের অবস্থানের কথা জানান। পাণ্ডবরা সেখানে এলেভীমের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। উল্লেখ্য ইনি ভীমকে হত্যা করার জন্য তের বত্সর এক লৌহ মূর্তির উপর গদা প্রহার অভ্যাস করেছিলেন। সরস্বতী নদীর দক্ষিণ প্রান্তে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। গদা যুদ্ধে ভীম অত্যন্ত বলশালী হলেও দুর্যোধন অত্যন্ত কৌশলী ছিলেন। কৃষ্ণের ইঙ্গিতে ভীম অন্যায়ভাবে দুর্যোধনের উরুতে আঘাত করে তা ভেঙে দেন। উল্লেখ্য গদা যুদ্ধে কটি দেশের নিম্নে আঘাত করা অন্যায় বলে বিবেচিত হত। উরু ভঙ্গের পর ভীম দুর্যোধনের মস্তক বাম পা দ্বারা নিস্পিষ্ট করেন। এই অন্যায় যুদ্ধ দেখে উপস্থিত বলরাম ভীমকে হত্যা করতে অগ্রসর হলেকৃষ্ণ তাঁকে  শান্ত করেন। দুর্যোধন এই অন্যায় যুদ্ধের জন্য কৃষ্ণকে তিরস্কার করেন
 

পাণ্ডবেরা মৃতপ্রায় দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করে চলে গেলেসেখানে কৃপাচার্যকৃতবর্মা ও অশ্বত্থামা আসেন। এরপর দুর্যোধন অশ্বত্থামাকে সেনাপতি হিসাবে নিয়োগ করেন এবং ভীমের ছিন্নমুণ্ডু আনার নির্দেশ দেন। এই অশ্বত্থামা বাকি দুজনকে দ্বার রক্ষায় রেখে পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ করে ঘুমন্ত সকলকেই হত্যা করেন। এই সময় পঞ্চপাণ্ডব কৃষ্ণ ও সাত্যকি অনত্র্য থাকায় তাঁরা রক্ষা পান। অশ্বত্থামা দুর্যোধনকে এই সংবাদ প্রেরণ করলে আনন্দ চিত্তে প্রাণত্যাগ করেন। এই হত্যাকাণ্ডে অন্যান্য পাণ্ডববীরদের সাথে দ্রৌপদীর সকল সন্তান মৃত্যুবরণ করে। এই কারণে দ্রৌপদী অশ্বত্থামাকে হত্যা করে তার মাথার মণি এনে দেওয়ার জন্য ভীমকে অনুরোধ করেন। অর্জুন ও কৃষ্ণ অশ্বত্থামাকে পরাজিত করলেভীম অশ্বত্থামার মাথার মণি এনে দ্রৌপদীকে দেন। যুদ্ধ শেষে যুধিষ্ঠির ভীমকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করেন

ভীম গোপনে ধৃতরাষ্ট্রকে অপমান করলেধৃতরাষ্ট্র বনবাসী হন। ময়দানব বিন্দু সরোবর থেকে বৃষপর্বা গদা এনে ভীমকে উপহার দিয়েছিলেন। মহাপ্রস্থানের পথে দ্রৌপদীসহদেবনকুলও অর্জুনের পরে এর পতন ঘটে। অতিভোজন ও আত্ম-প্রশংসার কারণে এঁর পতন ঘটেছিল
 

এঁর তিনজন স্ত্রীর নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন দ্রৌপদীবলন্ধরা ও হিড়িম্বা। এঁদের গর্ভে তাঁর তিনটি পুত্র জন্মগ্রহণ করেছিল। এরা হলেন- সুতসোম- দ্রৌপদীর গর্ভজাত, সর্বগ-বলন্ধরার গর্ভজাত, ঘটোত্কচ-হিড়িম্বার গর্ভজাত।


ভীমসে

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে
 
 
১. পরীক্ষিতের ঔরসে সুযশার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন
। এঁর স্ত্রীর নাম ছিল কুমারী। এঁদের পুত্রের নাম ছিল প্রতীশ্রবা। 
২. দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীমের অপর নাম ভীমসেন।
 


ভীমা

দুর্গা দেবীর অপর নাম। দুর্গা হিমাচলে ভীষণ রূপ ধারণ করেরাক্ষসদের হত্যা করে মুনিদের রক্ষা করেন। এই কারণে দুর্গাকে ভীমা নামে অভিহিত করা হয়


তৃতীয় পান্ডব অর্জুনঃ


হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে
 এই নামে একাধিক চরিত্র পাওয়া যায়। যেমন

. মাহিষ্মতী পুরীতে অর্জুন নামক একজন রাজা ছিলেন। এঁর পিতার নাম ছিল কৃর্তবীর্য। এই কারণে ইনি কার্তবীর্য বা কার্তবীর্যার্জুন নামে পরিচিত ছিলেন

. মহাভারতের অন্যতম চরিত্র। এঁর অপরাপর নাম অরিমর্দনকপিকেতনকপিধ্বজকিরীটীকৃষ্ণসখকৃষ্ণসারথিকৌন্তেয়গাণ্ডিবধন্বাগাণ্ডিবীগুড়াকেশচিত্রযোধীজিষ্ণুতৃতীয় পাণ্ডবধনঞ্জয়পার্থ, ফল্গুন, ফাল্গুনিবিজয়বীভৎসুশব্দবেধীশব্দভেদীশুভ্রশ্বেতবাহশ্বেতবাহনসব্যসাচী

পাণ্ডু নামক রাজা কিমিন্দম মুনির অভিশাপের (যে কোন নারীর সাথে সঙ্গম করতে গেলে পাণ্ডু মৃত্যুবরণ করবেন) কারণে স্ত্রীসংগম থেকে বিরত থাকেন। এই কারণে ইনি তাঁর স্ত্রীদ্বয়ের গর্ভে সন্তান লাভ করতে পারলেন না। এরপর ইনি তাঁর স্ত্রী কুন্তী'কে ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের জন্য অন্য পুরুষকে গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। কুন্তী সন্তান কামনায় তিনবার তিনজন দেবতাকে আহ্বান করেছিলেন। শেষবারে তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে আহ্বান করেন। এর ফলে ইন্দ্রের ঔরসে তিনি অর্জুনকে জন্ম দেন।  উল্লেখ্য এঁর পূর্বে একই ভাবে কুন্তী পাণ্ডুর অনুরোধে আরও দুটি সন্তান লাভ করেছিলেন। এরা হলেন- ধর্মের ঔরসে যুধিষ্ঠির ও পবনের ঔরসে ভীম। সেই কারণে অর্জুন তৃতীয় পাণ্ডব নামে পরিচিত হয়ে থাকেন। অবশ্য তবে তারও আগে অবিবাহিতা অবস্থায় সূর্যের ঔরসে কুন্তীর গর্ভে জন্মেছিল কর্ণ। কিন্তু তখন তিনি পাণ্ডুর স্ত্রী ছিলেন না বলে- কর্ণ পাণ্ডব হিসাবে স্বীকৃতি পান নি।

অর্জুন প্রথমে কৃপাচার্যের কাছেপরে দ্রৌণাচার্যের কাছে অন্যান্য পাণ্ডব ও ধৃতরাষ্ট্রের সন্তানদের সাথে অস্ত্রবিদ্যা ও যুদ্ধনীতি শিক্ষা করেন। ইনি দ্রৌণাচার্যের সকল শিষ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কথিত আছে দ্রৌণাচার্য তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা এবং অর্জুনকে বিশেষ যত্নের সাথে অস্ত্রশিক্ষা দান করছিলেন। ধনুর্বিদ্যায় সমকালীন সকল বীরদের মধ্যে ইনি শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কৌরবসভায় অস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শনকালে দ্রৌণাচার্য সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে ব্রহ্মশির নামক অমোঘ অস্ত্র দান করেন। গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণকে পরাজিত করে- তাঁর কাছ থেকে তিনি চাক্ষুষী বিদ্যা (যার প্রভাবে যে কোন অদৃশ্য বস্তুকে দেখা সম্ভব হতো) লাভ করেন

দ্রুপদ-কন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরসভায় অন্যান্য পাণ্ডবদের সাথে ছদ্মবেশে ইনি উপস্থিত হন। এই সভায় একমাত্র তিনিই চক্রমধ্য-মৎস্যকে বিদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে সূত্রে ইনি দ্রৌপদীকে লাভ করেন। কিন্তু মাতৃ-আজ্ঞায় পঞ্চপাণ্ডব একত্রে তাঁকে বিবাহ করেন। দ্রৌপদীকে নিয়ে যাতে ভ্রাতৃবিরোধ না ঘটে, সে কারণে- নারদ নিয়ম করে দেন যেএকটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যদ্রৌপদী একজন মাত্র পাণ্ডবের স্ত্রী হিসাবে থাকবেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অধীকারপ্রাপ্ত পাণ্ডব ব্যতীত অন্য কোন পাণ্ডব দ্রৌপদীকে গ্রহণ করলে বা দ্রৌপদীর সাথে অধিকারপ্রাপ্ত পাণ্ডবের বিহারকালে অন্য পাণ্ডব দর্শন করলে- তাঁকে ১২ বৎসর বনবাসী থাকতে হবে। ঘটনাক্রমে একবার এক ব্রাহ্মণকে সাহায্য করার জন্য- অর্জুন অস্ত্রাগারে প্রবেশ করলে- সেখানে যুধিষ্ঠিরের সাথে দ্রৌপদীকে এক শয্যায় দেখতে পান। এই কারণে ইনি ১২ বৎসর বনবাসের জন্য গৃহত্যাগ করেন। বনবাসকালে ইনি বিভিন্নস্থানে ভ্রমণ করে বেড়ান। এই সময়ে ইনি পরশুরামের সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তাঁর কাছ থেকে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করেন। এই ভ্রমণকালে ইনি নাগকন্যা উলূপী ও মণিপুর-রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদাকে বিবাহ করেন। তাঁর ঔরসে উলূপীর গর্ভে ইরাবান এবং চিত্রাঙ্গদার গর্ভে বভ্রুবাহনের জন্ম হয়। 

এরপর অর্জুন দক্ষিণসাগরের দিকে যাত্রা করেন, পঞ্চতীর্থকে কুমীরমুক্ত করেন। উল্লেখ্য এই তীর্থে অভিশপ্ত অপ্সরা বর্গা ও তাঁর চার সখী কুমিররূপে থাকতেন। অর্জুনের স্পর্শে তাঁরা অভিশাপমুক্ত হন। এরপর অর্জুন দ্বারকায় এলে শ্রীকৃষ্ণের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়। সেখানে শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে ও সহায়তায় তাঁর বোন সুভদ্রাকে হরণ করে অর্জুন বিবাহ করেন। সুভদ্রার গর্ভে তাঁর অভিমন্যু নামে একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে। ১২ বৎসর পর পুনরায় পাণ্ডবদের সাথে ইনি মিলিত হন। এই সময় দ্রৌপদীর সাথে মিলিত হলে, শ্রুতকর্মা নামক একটি পুত্রসন্তান জন্মে

এই সময় একদিন অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ যমুনাতীরে ভ্রমণ করার সময় অগ্নি এসে খাণ্ডববন দগ্ধ করার জন্য অর্জুনের সাহায্য প্রার্থনা করেন। অর্জুন তাকে সাহায্য করতে রাজি হলেন। কিন্তু একই সাথে জানালেন যেউক্ত বন দগ্ধ করতে গেলে দেবতাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। এবং আরও বললেন যেদেবতাদের সাথে যুদ্ধ করতে গেলে যে ধরনের অস্ত্র প্রয়োজন, সে ধরনের অস্ত্র তাঁর কাছে নেই। অগ্নিদেব তখন তাঁর সখা বরুণকে অনুরোধ করে তাঁর কাছ থেকে গাণ্ডীবধনুঅক্ষয় তূণীদ্বয় ও কপিধ্বজা রথ এনে দিলেন। এই সকল অস্ত্রের সাহায্যে কৃষ্ণ ও অর্জুন দেবতাদের পরাস্ত করেন। পরে শর নিক্ষেপে অর্জুন খাণ্ডববন দগ্ধ করেন। 
                                                                                     [২২৩-২৪ অধ্যায়। আদিপর্ব। মহাভারত] 

এরপর অক্ষক্রীড়ায় যুধিষ্ঠির রাজ্যচ্যুত হলেঅন্যান্য ভাইদের সাথে ইনি ১৩ বৎসরের জন্য বনবাসে যান। এই সময়ে কিরাতবেশী মহাদেব-র সাথে তাঁর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে অর্জুনকে পাশুপাত অস্ত্র প্রদান করেন। এরপর ইন্দ্রবরুণকুবের ও যমের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তাঁদের শ্রেষ্ঠ অস্ত্রসমূহ লাভ করেন। এরপর তাঁর পিতা ইন্দ্র তাঁকে স্বর্গে নিয়ে যান। সেখানে ইনি গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছে নৃত্যগীতি শিক্ষা করেন। স্বর্গবাসকালে উর্বশী তাঁকে প্রেম নিবেদন করলে- ইনি তাঁকে মাতৃজ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করেন। এই কারণেউর্বশী তাঁকে এক বৎসর নপুংসক অবস্থায় অতিবাহিত হওয়ার অভিশাপ দেন। এরপর ইনি ইন্দ্রের কাছে অস্ত্রশিক্ষা সমাপ্ত করেন। শিক্ষা শেষে ইনি গুরুদক্ষিণা বাবদ- ইন্দ্রের শত্রু নিবাতকবচ নামক তিন কোটি দানবকে তাদের সমুদ্র মধ্যস্থ দুর্গসহ ধ্বংস করেন এবং পৌলম ও কালকেয় অসুরদের বিনাশ করেন। এই কারণে ইন্দ্র সন্তুষ্ট হয়ে- তাঁকে অভেদ্য দিব্যকবচহিরণ্ময়ী মালাদেবদত্ত শঙ্খদিব্যকিরীটদিব্যবস্ত্র ও ভরণ উপহার দেন। পাঁচ বৎসর ইন্দ্রলোকে থাকার পর ইনি বনে এসে ভাইদের সাথে যোগ দেন। 

এরপর দ্বৈতবনে থাকাকালে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন দুর্যোধনকে বন্দী করেন। এই কারণে চিত্রসেনের সাথে অর্জুনের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে অর্জুন চিত্রসেনকে পরাজিত করে  দুর্যোধনকে উদ্ধার করেন

সিন্ধুরাজ দ্রৌপদীকে হরণ করলেঅর্জুন ও ভীম মিলে তাঁকে শাস্তি দেন। এরপর এঁরা মৎস্যরাজ বিরাট-ভবনে উপস্থিত হন। সেখানে উর্বশীর শাপে অর্জুন নপংশুক হয়ে বৃহন্নলা নাম ধারণ করেন। এই বেশে বিরাট-কন্যা উত্তরাকে ইনি নৃত্যগীত শেখানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে এক বৎসর অতিবাহিত করেন। পাণ্ডবদের এই অজ্ঞাতবাসের শেষাংশে দুর্যোধন বিরাটরাজের গোধন হরণ করলে বৃহন্নলারূপী অর্জুন কৌরব-সৈন্যদের পরাস্ত করে গোধন উদ্ধার করেন। যুদ্ধ শেষে বিরাটরাজ অর্জুনের সাথে উত্তরার বিবাহ ঠিক করেন। কিন্তু শিষ্যা কন্যার মত বলে ইনি নিজ পুত্র অভিমন্যুর সাথে উত্তরার বিবাহ দেন।  

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি কৃষ্ণকে উপদেষ্টা ও তাঁর রথের সারথি হিসাবে লাভ করেন। এরপর অর্জুন স্বজনবধে বিমুখ হলে- কৃষ্ণ তাঁকে উপদেশ দিয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেন। এই উপদেশসমূহের সংকলনই হলো- শ্রীমদ্ভগভদ্গীতা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি অসংখ্য কৌরব-সৈন্যকে হত্যা করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দশম দিনে এঁর শরাঘাতে ভীষ্ম শরশয্যা গ্রহণ করে- ইচ্ছামৃত্য গ্রহণ করেন। এছাড়া যুদ্ধের দ্বাদশ দিনে ভগদত্তকেচতুর্দশ দিনে অভিমন্যু বধের প্রতিজ্ঞা স্বরূপ জয়দ্রুতকেপঞ্চদশ দিনে দ্রোণাচার্যকেষোড়শ দিনে মগধরাজ দণ্ডধারকে ও সপ্তদশ দিনে কর্ণকে হত্যা করেন

যুদ্ধজয়ের পর যুধিষ্ঠির অশ্বমেধযজ্ঞের আয়োজন করেন। যজ্ঞের অশ্ব রক্ষার জন্য অর্জুন যাত্রা করে ত্রিগর্তপ্রাগ্‌জ্যোতিষপুর ও সিন্ধুদেশ জয় করেন। মণিপুরে নিজপুত্র বভ্রুবাহনের সাথে যুদ্ধে ইনি প্রাণ হারালে অর্জুনের স্ত্রী নাগকন্যা উলূপী নাগলোক থেকে সঞ্জীবনী এনে তাঁকে জীবিত করে তোলেন। এরপর ইনি অশ্বসহ স্বরাজ্যে ফিরে সেন। এরপর শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু ও যাদবকুলের বিনাশের সংবাদ পেয়ে ইনি দ্বারকায় যান। অর্জুন সেখানকার নারীদের নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে আসার সময়- পথে আভীর দস্যুরা যাদব-নারীদের লুণ্ঠন করে। কৃষ্ণের মৃত্যু ও নিজ দৈবশক্তি হানির ফলে ইনি দস্যুদের বাধা দিতে পারেন নাই

পাণ্ডবরা অর্জুনের পৌত্র (অভিমন্যুর পুত্র) পরীক্ষিত্কে রাজা করে মহাপ্রস্থানে গমন করেন। পথে লোহিত সাগরের তীরে অগ্নিদেবের অনুরোধে অর্জুন গাণ্ডীবধনু ও অক্ষয় তূণ দুটি পরিত্যাগ করেন। হিমালয় পার হয়ে মহাস্থানের পথে যেতে যেতে- দ্রৌপদীসহদেবনকুলের পতনের পর অর্জুনের মৃত্যু হয়। ভীমের প্রশ্নে উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেনঅর্জুন একদিনে শত্রু-সৈন্য বিনষ্ট করবার প্রতিজ্ঞা করে তা রক্ষা করতে অসমর্থ হয়েছিলেন এবং অন্যান্য ধনুর্ধরদের অবজ্ঞা করতেন বলেই এঁর পতন হয়েছে

চতুর্থ পাণ্ডব নকুল


হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে ইনি চতুর্থ পাণ্ডব নামে পরিচিত। এর অপর সহোদর ছিলেন সহদেব। অপর পাণ্ডবদের মতো ইনিও পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ পুত্র ছিলেন। পাণ্ডু-পত্নী মাদ্রীর গর্ভে ও অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের (দেবতা) ঔরসে এঁর জন্ম হয়েছিল। সুদর্শন অশ্বিনীকুমারের ঔরসে এবং সুদর্শনা মাদ্রীর গর্ভে জাত এই পুত্রদ্বয় অসাধারণ রূপবান ছিলেন। পাণ্ডুর মৃত্যুর পর এঁদের মা মাদ্রী স্বামীর সাথে চিতায় সহমরণে গেলে- এঁরা বিমাতা কুন্তীর কাছে লালিত পালিত হন

শৈশবে ইনি অন্যান্য কুরুসন্তানদের সাথে দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষা করেন। ইনি অসি যুদ্ধে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। অর্জুন কর্তৃক অর্জিত দ্রৌপদীর ইনি চতুর্থ স্বামী। দ্রৌপদীর গর্ভে এঁর শতানিক নামক পুত্র জন্মেছিল। এছাড়া ইনি চেদিরাজকন্যা করেণুমতীকেও বিবাহ করেছিলেন। এঁর গর্ভে নিরমিত্র নামক এক পুত্র জন্মেছিল। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞকালে ইনি পশ্চিমদিকে যাত্রা করে দশার্ণমালবত্রিগর্ত ও পঞ্চনদ প্রভৃতি দেশ জয় করেছিলেন

দ্যূতক্রীড়ায় যুধিষ্ঠির পরাজিত হলে অপর পাণ্ডবদের সাথে ইনিও বনবাসে যান। ঘোষযাত্রাকালে গন্ধর্বদের হাতে দুর্যোধন বন্দী হলে- ভীমঅর্জুন ও সহদেবের সাথে ইনিও যুদ্ধ করেন। হরিণরূপী-ধর্ম এক ব্রাহ্মণের অরণি-মন্থ হরণ করলে- তা উদ্ধারের জন্য অপর পাণ্ডবের সাথে ইনিও যান। এক্ষেত্রে পাণ্ডবেরা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে- ইনি নিকটস্থ সরোবরে জল আনতে গেলে- ধর্ম আকাশ থেকে তাঁকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন। এই প্রশ্নে উত্তর না দিয়ে ইনি জল আনতে গেলে- ইনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। উল্লেখ্য জল আনতে গিয়ে ভীমঅর্জুন ও সহদেবেরও একই পরিণতি হলে- যুধিষ্ঠির ধর্মের সকল প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিয়ে ধর্মকে সন্তুষ্ট করেন। পরে ধর্ম সকল মৃত ভাইয়ের মধ্য থেকে একজনকে মাত্র প্রাণ দেবেন এরূপ শর্ত দিলে- যুধিষ্ঠির বৈমাত্রেয় ভাই বলে নকুলের জীবন চেয়ে ছিলেন

মত্স্যরাজ বিরাটের প্রাসাদে অজ্ঞাতবাসকালে ইনি যুধিষ্ঠিরের অশ্বরক্ষক ও অশ্বচিকিত্সক পরিচয় দেন এবং 'গ্রন্থিকনামে বিরাটের অশ্বের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত হন। দ্যূত সভায় দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণকালে ইনি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি বহু কৌরব-সৈন্য বিনাশ করেন। যুদ্ধের ষোড়শ দিনে ইনি কর্ণের কাছে পরাজিত ও লাঞ্ছিত হন। কুন্তির কাছে কৃত প্রতিজ্ঞা অনুসারে কর্ণ (সূর্যের ঔরসজাত কুন্তির প্রথম পুত্র) নকুলকে প্রাণভিক্ষা দেন। অশ্বত্থামা কর্তৃক দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র নিহত হলে ইনি উপপ্লব্য থেকে দ্রৌপদীকে নিয়ে আসেন। অশ্বত্থামার মণি হরণকালে নকুল ভীমের সারথি হয়েছিলেন। যুদ্ধশেষে মহাপ্রস্থানের পথে যাবার সময় দ্রৌপদী ও সহদেবের পর সুমেরু শিখরে এঁর পতন ঘটেছিল। ইনি নিজেকে সর্বাপেক্ষা রূপবান হিসাবে মনে করতেন। এই গর্বের কারণে ইনি সশরীরে স্বর্গে যেতে পারেননি

মহাভারতে পঞ্চম পাণ্ডব সহদেবঃ

সহদেবের রথের পতাকায় একটি রৌপ্য হংসের প্রতীক ছিল।
মহাভারতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ মানেই ভীষ্মদেব , যুধিষ্টির, ভীম, অর্জুন , দুর্যোধন , কর্ণ ও শ্রী কৃষ্ণ । এই সব মহারথী ও অধিরথীদের দাপটে পান্ডু ও মাদ্রী পুত্র সহদেবের চরিত্র কেমন জানি চাপা পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা।
অথচ সহদেব ছিলেন পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে একমাত্র পান্ডব যিনি পিতার বাধ্য ছিলেন । যেমন মৃত্যুশয্যায় মহারাজ পাণ্ড‌ু তাঁর শেষ ইচ্ছে ব্যক্ত করেছিলেন । তিনি বলেন যে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পাঁচ পুত্র যেন তাঁর শরীরের কিছুটা করে অংশ ভক্ষণ করে। রোগশয্যায় থাকা পিতার এই শেষ ইচ্ছে কিন্তু যুধিষ্ঠিররা পালন করতে পারেননি। পাণ্ড‌ুর মৃত্যুর পর তাঁর শরীরের অংশ ভক্ষণ করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিন্তু পাণ্ডুর এই শেষ ইচ্ছের মর্যাদা রেখেছিলেন একমাত্র সহদেব। কনিষ্ঠ পাণ্ডব সহদেব ছিলেন পিতার সবচেয়ে বাধ্য পুত্র। তিনি সকলের চোখ এড়িয়ে পিতার হাতের কড়ে আঙুলের কিছুটা অংশ খেয়ে ফেলেন।
আসলে জ্ঞানী ও স্থিতধি পাণ্ড‌ু চেয়েছিলেন যাতে তাঁর সন্তানেরাও তাঁর মতো জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। তাই তাঁর শরীরের কিছুটা করে অংশ সন্তানদের খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। বাকি চার পাণ্ডব মেনে না নিলেও সেই নির্দেশ পালন করে সহদেব পরিণত হন এক ত্রিকালজ্ঞ জ্ঞানী পুরুষে। সহদেব বর্তমানের পাশাপাশি ভূত ও ভবিষ্যত্ দেখতে পেতেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগেও এই যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন।
হংস জ্ঞানের প্রতীক । এখন আমরা নিশ্চয় বুঝতে পারছি , কেন তাঁর রথের পতাকায় একটি রৌপ্য হংসের প্রতীক ছিল । সহদেব তার ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ছিলেন। যুধিষ্ঠির তাকে দেবগুরু বৃহস্পতির থেকেও অধিক বুদ্ধিমান বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া সহদেব ও নকুল ছিলেন ভাল জ্যোতিষী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ঘটনা তিনি আগেই জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল, সেই ঘটনার কথা কাউকে বললে তার মাথা খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। সহদেব যুদ্ধ পরিকল্পনাতেও বেশ দক্ষ ছিলেন।
শারীরিক সৌন্দর্যে নকুল ও সহদেব ছিলেন শ্রেষ্ঠ । নকুল এবং সহদেব তাদের শারীরিক সৌন্দর্য্যের জন্য কখনো কখনো দেবতা হিসাবেও পরিচিত ছিলেন।
ইনি অন্যান্য কৌরব এবং পাণ্ডবদের সাথে দ্রোণাচার্য-এর কাছে অস্ত্র শিক্ষা করেন। ইনি অসি যুদ্ধে অদ্ধিতীয় ছিলেন। এছাড়া ইনি গো-তত্ত্বে বিশেষ জ্ঞানী ছিলেন। শকুনি'র কাছে দূত ক্রীড়ায় যুধিষ্ঠির পরাজিত হয়ে তিনি অন্যান্য পাণ্ডবদের সাথে তিনি বনবাসে। যাত্রাকালে তিনি শকুনিকে হত্যা করার প্রতিজ্ঞা করেন। কুরুক্ষেত্রের অষ্টাদশ দিনে তিনি শকুনি ও তাঁর পুত্র উলূককে ভল্লের আঘাতে শিরোশ্ছেদ করেন।
তিনি দ্রৌপদীর পঞ্চম স্বামী ছিলেন। এর ঔরসে দ্রৌপদীর গর্ভে শ্রতসেন নামক একটি পুত্র জন্মে। এছাড়া ইনি মদ্রাধিপতির কন্যা বিজয়াকে স্বয়ংবর সভা থেকে জয় করে বিবাহ করেন। বিজয়ার গর্ভে তাঁর সুহোত্র নামক এক পুত্র জন্মে।কর্ণ সুহোত্রকে বধ করেছিলেন। এছাড়া ইনি জরাসন্ধের কন্যা ও যদুবংশীয় ভানুর কন্যা ভানুমতীকে বিবাহ করেন। অজ্ঞাতবাসকালে বিরাটরাজের দরবার তাঁর নাম ছিল জয়দ্বল। ইনি এখানে গোশালার অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন।
দ্রৌপদীর উক্তি থেকে জানা যায়, কনিষ্ঠ পাণ্ডব সহদেব তার অন্যান্য ভ্রাতাদের মতো যুদ্ধে ভয়ংকর এবং নৈতিকতা সম্পর্কে সদা সচেতন। তিনি ছিলেন অসিচালনায় দক্ষ এবং “নায়কোচিত, বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ও সদা ভয়ংকর। প্রাজ্ঞদের সভায় বুদ্ধি ও বাকবৈদগ্ধে তাঁর সমতুল্য কেউ ছিল না।”
আরও মনে করা হয় যে, সহদেব হলেন দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের অবতার। ভীষ্ম ও বিদুরের মতো তিনি সেই অল্প কয়েকজন ব্যক্তি যাঁরা কৃষ্ণের সমসাময়িক ছিলেন এবং কৃষ্ণকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বলে বুঝতে পেরেছিলেন। অনেক রাজা কৃষ্ণকে আগে সম্মান প্রদর্শন করতে অস্বীকৃত হলে, তিনিই কৃষ্ণের অগ্রপূজা করেন।
ভাগবত পুরাণ অনুসারে, সহদেব কৃষ্ণের সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্তদের অন্যতম। কৃষ্ণ একবার সহদেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যুদ্ধ থামানোর জন্য কি করা যায়। সহদেব বলেছিলেন, কৃষ্ণকে বেঁধে বন্দী করে সকল পাণ্ডব ও দুর্যোধনকে বনে পাঠিয়ে এবং কর্ণকে রাজা করে যুদ্ধ থামানো যায়। কৃষ্ণ তাকে বেঁধে ফেলতে বললে, সহদেব তাকে শিশু রূপে ধ্যান করেন এবং বেঁধে ফেলেন। সহদেবের ধ্যানে সৃষ্ট বন্ধনাবস্থায় কৃষ্ণ নড়াচড়ার ক্ষমতা হারালে তিনি সহদেবকে দিব্যদৃষ্টি দিয়ে আশীর্বাদ করেন এবং সহদেব তার বন্ধন খুলে দেন।
পঞ্চম পাণ্ডব সহদেব জ্যোতিষ বিদ্যায় পারঙ্গম ছিলেন। তিনি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হিসেবে সিদ্ধিলাভ করেন। এ কারণে দুর্যোধন এবং শকুনি সহদেবের কাছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রকৃত সময় জানতে চান। দুর্যোধন তাঁদের পরম শত্রু জেনেও সহদেব সততার সঙ্গে তাঁকে সেই ক্ষণটি আগাম জানিয়ে দেন। কিন্তু সহদেব তাঁর ভ্রাতাদেরকেই এই তথ্য জানাতে পারেননি। কারণ তাঁকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল— তিনি যদি স্পষ্টভাষায় ভবিষ্যকথন করেন, তাঁর মৃত্যু হবে। কৃষ্ণের পরামর্শে সহদেব প্রশ্নের আকারে ভবিষ্যৎ ব্যক্ত করতেন।
ইন্দ্রপ্রস্থের সম্রাট হওয়ার পর প্রথম পাণ্ডব যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞের সময় সহদেবকে দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলি জয় করতে পাঠান। তাকে দাক্ষিণাত্যে পাঠানোর কারণ ছিল, ভীষ্ম বলেছিলেন দাক্ষিণাত্যের রাজারা অসিযুদ্ধে বিশেষ দক্ষ এবং সহদেব নিজে ছিলেন অসিযুদ্ধে পারদর্শী।
মহাভারতে ইন্দ্রপ্রস্থের দক্ষিণে একাধিক রাজ্য জয়ের উল্লেখ আছে। এগুলির মধ্যে কয়েকটি হল:

শৌরসেন রাজ্য
পাণ্ড্য রাজবংশ
মৎস্য রাজ্য, রাজা দণ্ডবক্র ও সুকুমার, সুমিত্র সহ অন্যান্য মৎস্য ও পটচর রাজবৃন্দ।
বিভীষণ, লঙ্কার রাজা, রাবণের ভ্রাতা। তিনি সহদেবকে মনিমাণিক্য, চন্দনকাঠ, গহনা, বহুমূল্য বস্ত্র ও মূল্যবান মুক্তা দিয়েছিলেন।
কিষ্কিন্ধায় বানররাজ মৈন্দ ও দৈবিদ একটি সপ্তদিবসীয় যুদ্ধে পরাজিত হন।
নীলের রাজধানী মাহীষ্মতী। এই নগরী ছিল অগ্নির আশীর্বাদধন্য। তাই যুদ্ধের সময় একটি বিশাল অগ্নিবলয় শহরটিকে ঘিরে ছিল। পরে সহদেব অগ্নিস্তুতি করে এই শহর জয় করেন।
বিদর্ভের রাজা রুকমি ও ভোজকট অঞ্চল।
নিষাদ রাজ্য , গোশৃঙ্গ পর্বত ও রাজা শ্রীনিমঠ।
কুন্তীভোজের রাজ্য নবরাষ্ট্র।
চরমনবতী নদীর তীরে রাজা জম্বক।
বেন্ব নদীর তীরবর্তী অঞ্চল।
নর্মদা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল।
অবন্তী, রাজা বিন্দ ও অনুবিন্দ, ভোজকট নগরী।
কোশল রাজ।
ত্রিপুরা রাজ
সৌরাষ্ট্র রাজ।
সুর্পরক রাজ্য, তলকট, ও দণ্ডক।
সমুদ্রোপকূলবর্তী ম্লেচ্ছ উপজাতি, নিষাদ, নরখাদক, কর্ণপ্রবর্ণক ও মলমুখ।
সুরাভিপাটনাম, তাম্রদ্বীপ ও রমক পর্বত।
তিমিঙ্গিল পর্বত ও কেরক দৈত্য।
সঞ্চয়ন্তী নুরী, পাষণ্ডক, করহাটক, পৌণ্ড্র, দ্রাবিড়, উড্রকেরল, অন্ধ্র, তলবন, কলিঙ্গ ও উষ্ট্রকার্ণিক, সেক ও যব।
পৌরব।

কর্ণ


হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে সূর্যদেবতার ঔরসে ও কুন্তী দেবীর গর্ভে এঁর জন্ম হয়েছিল। একবার মহর্ষি দুর্বাসা কুন্তীর গৃহে অতিথি হিসাবে আসেন। কুন্তীর অতিথি সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে- দুর্বাসা কুন্তীকে একটি মন্ত্র দান করেন। এই মন্ত্রের দ্বারা ইনি যে দেবতাকে স্মরণ করবেনসেই দেবতাই এসে কুন্তীকে সংগম দ্বারা পরিতৃপ্ত করে পুত্র দান করবেন। কৌতুহলবশতঃ কুমারী অবস্থাতেই একবার কুন্তী সূর্য দেবতাকে ডেকে বসেন এবং সূর্যদেবের সাথে মিলনের ফলে ইনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন। যথা সময়ে ইনি একটি পুত্র সন্তান লাভ করলেলোকলজ্জার ভয়ে সেই পুত্রকে একটি পাত্রে রেখে জলে ভাসিয়ে দেন। এই পুত্রের নামই কর্ণ। সূতবংশীয় অধিরথ ও তাঁর স্ত্রী রাধা কর্ণকে জল থেকে উদ্ধার করে প্রতিপালন করেন। রাধার পুত্র হিসাবে কেউ কেউ তাঁকে রাধেয় নামে ডাকতো। এই দম্পতি কর্ণের নাম রেখেছিলেন বসুষেণ। 

ইনি অন্যান্য দেশের রাজপুত্রদের সাথে দ্রোণাচার্যের অস্ত্রশিক্ষা করেন। অস্ত্রশিক্ষা শেষে ইনি অর্জুনের সকল অস্ত্রকৌশল দেখান এবং অর্জুনকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আহ্বান করেন। কর্ণের পরিচয় অজ্ঞাত থাকায় অর্জুন এই আহ্বানে সাড়া দেন নাই। কর্ণের এরূপ বীরত্বের পরিচয় পেয়ে দুর্যোধন তাঁর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে অঙ্গরাজ্যের রাজপদে অভিষিক্ত করেন। এরপর দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় ইনি লক্ষ্যভেদের চেষ্টা করলে দ্রৌপদী ঘোষণা দেন যেসূতপুত্রের গলায় মালা দেবেন না। সে কারণে ইনি এই প্রতিযোগিতা থেকে বিরত থাকেন। অর্জুন লক্ষ্যভেদে দ্রৌপদী লাভ করলে অন্যান্য রাজন্যবর্গের সাথে ইনি পাণ্ডবদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং অর্জুনের কাছে পরাস্ত হন। ইনি দ্রোণাচার্যের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র বিদ্যা শিখতে চাইলেসূতপুত্র বলে দ্রোণাচার্য তাঁকে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন

এরপর ইনি পরশুরামের কাছে গিয়ে ব্রাহ্মণ পরিচয়ে এই বিদ্যালাভ করেন। একদিন পরশুরাম এঁর কোলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলেন। এমন সময় অলর্ক নামক একটি কীট কর্ণের উরু বিদীর্ণ করে। গুরুর ঘুম ভেঙে যাবার ভয়ে ইনি যন্ত্রণা সহ্য করতে থাকলেন। একসময় পরশুরাম ঘুম ভেঙে উঠে সকল বিষয় দেখে এবং কর্ণের কষ্ট সহিষ্ণুতা লক্ষ্য করে তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানতে চাইলেন। অবশেষে কর্ণ ব্রাহ্মণ নয় জেনে এবং গুরুকে প্রতারণা করার জন্য অভিশাপ দিয়ে বললেন যেকপট উপায়ে ব্রহ্মাস্ত্র লাভের জন্য, কার্যকালে কর্ণ এই অস্ত্রের কথা ভুলে যাবেন। আর একবার ইনি এক ব্রাহ্মণের হোম ধেনু হত্যা করার জন্যউক্ত  ব্রাহ্মণ তাঁকে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে, যুদ্ধকালে এঁর মহাভয় উপস্থিত হবেপৃথিবী তাঁর রথের চাকা গ্রাস করবে এবং কোন এক বিশেষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করতে সচেষ্ট হলে তাঁর হাতেই কর্ণের মৃত্যু হবে।  

পরশুরামের কাছে অস্ত্রশিক্ষা সমাপ্ত করে ইনি কলিঙ্গরাজের কন্যার স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত হন। সেখানে কলিঙ্গরাজ জরাসন্ধের সাথে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে জরাসন্ধ সন্তুষ্ট হয়ে কর্ণকে মালিনীনগর দান করেন। কর্ণ দুর্যোধনের পরামর্শদাতাদের অন্যতম ছিলেন। পাণ্ডবদের জতুগৃহ দাহে ইনি পরামর্শ দিয়েছিলেন। পাণ্ডবদের বনবাসকালীন সময়ে দ্বৈতবনে অবস্থানের সময় শকুনি ও কর্ণের পরামর্শে দুর্যোধন পাণ্ডবদের দুর্দশা দেখতে যান। সেখানে গন্ধর্বরাজের কাছে দুর্যোধন পরাজিত ও বন্দী হলে কর্ণ তাদের উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন। অবশেষে অর্জুন তাদের রক্ষা করেছিলেন। দুর্যোধনের বৈষ্ণবযজ্ঞকালে ইনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যেঅর্জুনকে হত্যা না করা পর্যন্ত পাদ-প্রক্ষালন বা জল গ্রহণ করবেন না। আসুরব্রত অবলম্বন করে ইনি আবার প্রতিজ্ঞা করেন যে অর্জুন নিহত না হওয়া পর্যন্তএঁর কাছে কেউ কোন কিছু প্রার্থনা করলে তাকে তিনি বিমুখ করবেন না।  

কর্ণের দানশীলতা পরীক্ষা করার জন্য কৃষ্ণ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে এসে আহার করার জন্য তাঁর ছেলে বৃষকেতুর মাংস চান। কর্ণ তাঁর পুত্রকে হত্যা করে কৃষ্ণকে আহার করতে দেন। কৃষ্ণ কর্ণের এই ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে এই সন্তানের জীবন দান করেন। এই ব্রত পালনের সময় অর্জুনের পিতা ইন্দ্র ব্রাহ্মণবেশ ধারণ করিয়া অর্জুনের জন্য তাঁর কুণ্ডলদ্বয় ও কবচ প্রার্থনা করেন। কর্ণের পিতা সূর্য এ বিষয়ে কর্ণকে পূর্বেই সতর্ক করে দিলেও সত্য রক্ষার্থে কর্ণ তা ইন্দ্রকে দান করেন। তবে সূর্যের পরামর্শে অর্জুনকে হত্যা করার জন্য ইন্দ্রের কাছ থেকে একাগ্নি বাণ প্রার্থনা করেন। ইন্দ্র এই অস্ত্র একবার মাত্র ব্যবহারের সূযোগ দেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চতুর্দশ দিবসে কর্ণ ঘটোৎকচ বধে এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলেন।   

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে কৃষ্ণ তাঁর জন্ম পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন যে- পাণ্ডবদের সে অগ্রজ। সুতরাং সে কারণে কর্ণের উচিৎ এই যুদ্ধ পরিহার করে পাণ্ডবদের সাথে ভাই হিসাবে মিলে যাওয়া। কর্ণ এই  প্রস্তাবে রাজি হলে- অগ্রজ হিসাবে যুধিষ্ঠীরের পরিবর্তে কর্ণই রাজা হতেন। কর্ণ রাজি হননি বেশ কয়েকটি কারণে-
। কুন্তি তাঁকে পরিত্যাগ করলে যাঁরা তাঁকে পিতামাতা হিসাবে পরিচয় দিয়েছিলেনতাঁদের সে পরিচয়েই পরিচিত থাকতে চেয়েছিলেন
। দুর্যোধন তাঁকে রাজ্যদান করে সম্মান দিয়েছিলেন এবং তাঁর ভরসাতেই দুর্যোধন এই যুদ্ধে অগ্রসর হয়েছেন। সুতরাং কর্ণ সেখান থেকে ফিরে দুর্যোধনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবেন না। যুধিষ্ঠির যাতে এই ঘটনা জানতে না পারে সেরূপ অনুরোধ করে কৃষ্ণকে জানান যে- যুধিষ্ঠির জানলে তিনি অগ্রজ হিসাবে কর্ণকে রাজ্যদান করবেনআর সে রাজ্য কর্ণ দুর্যোধনকে দান করবেন

কর্ণের মাতাপিতা (কুন্তী ও সূর্য) কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু কর্ণ তা অগ্রাহ্য করেছিলেন। তবে প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন অর্জুন ছাড়া অন্য কোন পাণ্ডবকে তিনি হত্যা করবেন না। যুদ্ধের প্রারম্ভে ভীষ্ম কবচ-কুণ্ডল হীন কর্ণকে নীচ ও গর্বিত বলেছিলেন এবং পশুরাম কর্তৃক অভিশপ্ত বলে ভীষ্ম তাঁকে অবজ্ঞা করেছিলেন। সেই কারণে ইনি প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন যে ভীষ্ম জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় অস্ত্র ধারণ করবেন না। ভীষ্ম শরশয্যায় অবস্থানকালে কর্ণকে তাঁর জন্মবৃত্তান্ত অবগত করিয়ে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে নিষেধ করলে- কর্ণ দুর্যোধনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে বলে তা অগ্রাহ্য করেন। 

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে কর্ণ অপর ছয়জন মহারথের সাথে মিলিত হয়ে অর্জুন-পুত্র অভিমন্যুকে হত্যা করতে সাহায্য করেন। যুদ্ধের চতুর্দশ দিনে অর্জুনের জন্য রক্ষিত ইন্দ্র-প্রদত্ত একাঘ্নী বাণ নিক্ষেপে ইনি ঘটোত্কচকে হত্যা করেন।  যুদ্ধের ষোড়শ দিনে দ্রোণের মৃত্যুর পর ইনি কৌরব-সেনাপতি পদে অভিষিক্ত হন। অর্জুন ছাড়া অপর পাণ্ডবেরা তাঁর কাছে পরাজিত হলেও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হবে বলে- কাউকেই ইনি হত্যা করেননি। পরশুরাম ও ব্রাহ্মণের অভিশাপের কারণে ইনি হীনবল অবস্থায়অর্জুন অঞ্জলিক বাণে কর্ণের শিরশ্ছেদ করেন। 

কর্ণের স্ত্রীর নাম ছিল পদ্মাবতী। তাঁর তিনজন সন্তানের নাম জানা যায়। এরাঁ হলেন -বৃষসেনবৃষকেতুচিত্রসেন ইনি অঙ্গরাজ্যের অধিপতি ছিলেন বলে- এঁর অন্যান্য নাম ছিল- অঙ্গরাজঅঙ্গাধিপঅঙ্গাধিপতিঅঙ্গাধীশঅঙ্গাধীশ্বর। সূর্যের পুত্র হিসাবে তাঁর নাম ছিল- অরুণাত্মজঅর্কতনয়অর্কনন্দনঅর্কপুত্রঅর্কসূতঅর্কসূনু। 


মহাভারতের ট্রাজিক নায়ক কর্ণের পূর্বজন্মঃ


সুন্দর গ্রীবা (গলদেশ, ঘাড় ) আছে যার তার নাম সুগ্রীব। রামায়নে সুগ্রীব আসলে মানুষ ছিলেন । হতে পারে অনার্য । রামায়ণের অনেক জায়গায় আর্য ও অনার্যে মেল বন্ধন লক্ষ্য করা যায় । সুগ্রীবের বড় ভাই ছিলেন বালী । তিনি ছিলেন রাজা । যুদ্ধের কৌশলে ন্যায় অন্যায় বলে কিছু নেই । তারপরেও নীতি শাস্ত্রে ন্যায় অন্যায় সব সময় সর্ব পরিস্থিতে থাকে। বালীকে অন্যায় ভাবে বধ করা হয়েছিল । আর এই কারণে সুগ্রীব অভিশপ্ত হয়েছিল। তাই পরজন্মে তাকে অসুর কুলে জন্মগ্রহণ করতে হয়েছিল ।
সনাতন ধর্ম বিশ্বাসীরা বিশ্বাস করেন পূর্বজন্ম ও পরজন্ম । পাপ পূর্ণের হিসাব এক জন্মে নাও পরিশোধ হতে পারে । যেহেতু আত্মা অবিনশ্বর । তাই পরজন্মেও তার ফলাফল নির্ধারিত হতে পারে। আবার জন্মজন্মান্তর লেগে যেতে পারে আত্মার পরিশুদ্ধতার জন্য । শ্রী গীতায় বলা হয়েছে ,
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নবানি গৃহাতি নরোহপরানি !
তথা শরীরানি বিহায় জীর্ণান্য-
ন্যানি সংযাতি নবানি দেহী .
(গীতা.. ২/২২)
সরলার্থ.. মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মা ও তেমন জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারন করে ।
মহাভারতের কর্ণের বেলায় তাই হয়েছিল ।
রামায়ণ যুগের বানর রাজ সুগ্রীবের নাম নিশ্চয়ই সবাই শুনেছেন? সুগ্রীব ছিল সূর্যদেবের পুত্র! আর তার ভাই মহাশক্তিধর বালি আবার ছিল দেবতাদের রাজা ইন্দ্রের পুত্র! (অনেকটা অর্জুন ও কর্ণের মত)! বালি এতই শক্তিধর ছিল যে, একদিন সন্ধ্যকৃত্য করার সময় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় রাক্ষস রাজ্ রাবণ বালির উপর আক্রমণ করে বসে! কিন্তু বালি ধ্যানমগ্ন থেকেই নিজের লেজ দিয়ে রাবণ কে ধরে এনে নিজে বগলের নিজে ঢুকিয়ে রাখে!
সুগ্রীব তার সেই মহাশক্তিধর ভাই বালিকে বধ করতে ছল রচনা করেছিল! ঐ ছল রচনার রেশ ধরেই সুগ্রীব অভিশাপগ্রস্ত হয়েছিল এবং রামায়ণ যুগ শেষ হওয়ার পর ও মহাভারত যুগ শুরুর আগে সে এক রাক্ষস হয়ে জন্ম নিয়েছিল! নাম ছিল দম্ভোদভব; পূর্ব জন্মে সূর্যপুত্র সুগ্রীব পরজন্মে ছিল সূর্যের পরম ভক্ত; এবং কঠোর আরাধনা করে সে সূর্যদেব কে প্ৰসন্ন করে উনার কাছ থেকে এক সহস্র কবচের এক মহাশক্তিশালী সুরক্ষা প্রাপ্ত করেছিল! সেই কবচ গুলোর বিশেষত্ব ছিল এই যে, কাউকে সহস্র কবচের এক একটি ভেদ করতে হলে তাকে প্রতিবার এক হাজার বছর তপস্যার করে আসতে হবে এবং একটা কবচ কাটার পর যে কাটবে তার জীবনী শক্তি শেষ হয়ে সে মৃত্যু বরণ করবে! সেই এক হাজার কবচ প্রাপ্তির পর দম্ভোদব রাক্ষস সহস্র কবচ নামে পরিচিত হয়ে উঠল! আর এমন বজ্র কঠিন সহস্র কবচের সুরক্ষা পেয়ে সে মহা অত্যাচারী হয়ে উঠল এবং এক সময় সে দেবতাদের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিল!
সেই সময় মহাদেবের পরামর্শে ভগবান বিষ্ণু দুই অংশ হয়ে ব্রহ্মমার মানসপুত্র ধর্ম ও মূর্তির ঘরে জমজ শিশু রূপে জন্ম নিলেন! তাদের নাম হল নর ও নারায়ণ!
হিমালয়ে কেদার নামক পর্বতশৃঙ্গটি মহাদেবের অত্যন্ত প্রিয় এবং বহুকাল আগে থেকেই মহাদেবের আশীর্বাদ ছিল যে, এখানে যদি কেউ একদিন ধ্যান করে সেটা হবে এক হাজার দিন ধ্যানের সমান! একটা সময় নর ও নারায়ণ সেই কেদারশৃঙ্গে গিয়ে মহাদেবের শিষ্যত্ব বরণ করেন এবং মহাদেব কর্তৃক মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের জ্ঞান লাভ করে ধ্যানে লীন হয়ে গেলেন! এই ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বহুকাল কেটে গেল! এক সময় রাক্ষস সহস্র কবচের নিকট সংবাদ পৌঁছল যে, নর ও নারায়ন নামক দুই ঋষি বহুকাল যাবৎ হিমালয়ের একটু পর্বতে ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে; এবং তারা এতটাই শক্তি সঞ্চিত করেছে যে, তাদের মন্ত্র উচ্চারণের ত্যাজ পুরো পর্বতমালা কম্পিত হচ্ছে!
সহস্র কবচ খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল এবং একদিন সে নর ও নারায়ণের উপর আক্রমণ করে বসল! নর ও নারায়ন একজন একজন করে পর্যায়ক্রমে দম্ভোদবের সাথে যুদ্ধ করতে লাগলেন এবং একটা একটা করে কবচ কাটতে লাগলেন এবং প্রতিবার কবচ কাটার যখন তাদের জীবনী শক্তি শেষ হয়ে যায় তখন একজন আরেক জন কে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রবলে বাঁচিয়ে তুলেন! এভাবে যখন ৯৯৯ টি কবচ কাটা পড়ল, তখন রাক্ষস সহস্র কবচ পালিয়ে সূর্য দেবের আশ্রয়ে চলে গেল! এবং সূর্যদেব তাকে নর ও নারায়নের হাত থেকে রক্ষা করতে তার অবশিষ্ট একটি কবচ সহ দেবী কুন্তীর গর্বে স্থাপন করে দেন! এবং কুন্তীর সেই পুত্রই হচ্ছে কর্ণ..!
শরীরং যদবাপ্নোতি যচ্চাপ্যুৎক্রামতীশ্বরঃ
গৃহীত্বৈতানি সংযাতি বায়ুর্গন্ধানিবাশয়াৎ।।শ্রী গীতা ১৫/ ৮।।
অনুবাদঃ বায়ু যেমন ফুলের গন্ধ নিয়ে অন্যত্র গমন করে, তেমনই এই জড় জগতে দেহের ঈশ্বর জীব এক শরীর থেকে অন্য শরীরে তার জীবনের বিভিন্ন ধারণাগুলি নিয়ে যায়।
স্বভাব যায়না মরলে ।
কর্ণের কিন্তু দম্ভ ছিল যা তিনি পূর্ব জন্ম থেকে পেয়েছিলেন ।

মহাভারতের “ দ্রৌপদী “

স্বরোদয় শাস্ত্র অনুযায়ী ( " Phonetical Scriptures" : " The sound of one's own breath " ) ' দ ' = স্থিতি, ' র ' = সূর্য বা প্রকাশ, ' ঔ ' = চন্দ্র, ' প ' = লয়, ' দ '= স্থিতি এবং ' ঈ ' = বিষ্ণু। সূর্যের তেজ প্রভা এবং চন্দ্রের কমনীয় জ্যোতি যার দ্বারা স্হিত এবং যার মধ্যে লয় পায় সেই বিষ্ণুতে স্থিতি হল দ্রৌপদীর অর্থাত্ তিনিই হলেন পরম বৈষ্ণবী শক্তি, তিনিই কুলকুণ্ডলিনী শক্তি , তাই তিনি সতী রুপে মান্যতা পেয়েছেন।
দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামী তবুও তিনি সতী দেবী রূপে পূজিতা। ব্রহ্মের ধর্ম সত্ , চিত্ ও আনন্দ ( ভারতীয় আস্তিক দর্শন অনুসারে)। সত্ শব্দের অর্থ চিরস্থায়ী। সত্ - এর স্ত্রী লিঙ্গ হল সতী। নরদেহ পঞ্চতত্ত্বের সমন্বয় - ক্ষিতি, অপ্ , তেজ, মরুত্ ও ব্যোম। এই পঞ্চতত্ত্ব হল পঞ্চপাণ্ডব। ব্যোম তত্ত্ব হলেন যুধিষ্ঠির, তাই তিনি সর্গারোহণ করেন, মরুত্ ভীম, তেজ অর্জুন, অপ্ নকুল এবং ক্ষিতি সহদেব। কুলকুণ্ডলিনী শক্তি হলেন দ্রৌপদী। এই কুলকুণ্ডলিনী শক্তিতে প্রাণবন্ত হয়ে পঞ্চপাণ্ডব ( পঞ্চভূত) চিত্ত স্বরূপ কুরুক্ষেত্রে ( চেতন-মন) যুদ্ধ করছেন। কাম রিপু দুর্যোধন, দ্রণ জেদ, ভীষ্ম সংশয়, আকাঙ্ক্ষা কর্ণ, ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ মন ( অচেতন মন), সংযম সঞ্জয়, লোভ দুঃশাসন, ক্রোধ জয়দ্রত, শকুনি হিংসা, মোহ অশ্বত্থামা, কুন্তী মায়া, বিদুর ভক্তি, আত্মা অর্জুন এবং পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ (সারথী)।
দ্রৌপদীর জীবনি বিশ্লেষণ করার পূর্বে দ্রুণাচার্য ও দ্রুপদ রাজা সম্পর্কে কিছু জানা প্রয়োজন।
দ্রুপদ রাজা ও দ্রোনাচার্যঃ
============
ঋষি ভরদ্বাজ পুত্র দ্রোন । প‌ষৎ রাজার পুত্রের নাম দ্রুপদ। দ্রোন আর দ্রুপদ সমবয়সী। দুই বালক ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে লেখা পড়া, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা শিখতে লাগলেন। রাজা পৃষৎ ভরদ্বাজের বন্ধু। দ্রোন আর দ্রুপদের মধ্যে ও সুন্দর বন্ধত্ব গড়ে উঠল। কিন্তু রাজন অসম বন্ধুত্ব স্থায়ী হয় না। আর দুনিয়ায় বন্ধুত্ব একটা শব্দ মাত্র। প্রভুত্বই সার কথা। এই জগতে সম্পর্ক একটাই তুমি প্রভু আমি ভৃত্য, অথবা আমি প্রভু তুমি ভৃত্য। রাজা পৃষতের মৃত্যু হয় দ্রুপদ উত্তর পাঞ্চালের রাজা হলেন। আর ভরদ্বাজ স্বর্গে গলেন। বিদ্বান তাপস দ্রোন হলেন আশ্রমিক। একজন সিংহাসনে, আর একজন কুশাসনে।দ্রোনের জীবন পথ আর তার বাল্য বন্ধুর জীবন পথ ভিন্ন। সময় চলছে দিন, মাস, বছর, বছরের পর বছর।দ্রোন শরদ্বানের কন্যা কৃপীকে বিবাহ করলেন। এই বার তিনি সংসারি হলেন। দ্রোন মহেন্দ্রপর্বতে পরশুরামের কাছে গেলেন। তাকে সন্তুষ্ট করে বললেন, "হে ভার্গব, আপনি সমস্ত অস্ত্র ও শস্ত্র প্রয়োগ এবং সংহার বিদ্যা আমাকে দান করুন।" পরশুরাম বললেন, তথাস্তু। দ্রোন হলেন অদ্বিতীয় আচার্য। এই আনন্দ সংবাদ কাকে জানাবেন? প্রিয় সখা দ্রুপদকে। দ্রুপদ রাজা হয়েছেন, সখা হিসেবে তাকে তো অভিনন্দন জানান উচিত। দ্রুপদের সভায় গিয়ে দ্রোন বললেন, বন্ধু চিনতে পারছ? আমি তোমার বাল্য সখা দ্রোন। এ কি কোন কটু কথা। দ্রুপদের কি হল কে জানে। চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে গেল। ভুরু কুঁচকে কর্কশ কন্ঠে বললেন, কে তুমি? তোমার বুদ্ধি সুদ্ধি, কান্ড জ্ঞান আছে বলে মনে হয় না৷ কারণ তুমি প্রথমেই আমাকে সখা বলে পরিচয় দিয়েছ। নির্বোধ। আমি রাজা, তোমার মতো শ্রহীন দরিদ্রের আমি সখা হতে যাব কোন দুঃখে। তোমার সঙ্গে বাল্যকালে যে সখ্য ছিল, উহা কেবল খেলার ও পড়ার স্বার্থের জন্য। শোন ব্রাহ্মণ, দরিদ্র কখনো ধনীর, মূর্খ কখনো পন্ডিতের, ক্লীব কখনো বীরের সখা হতে পারে না। মানুষের অহংকারই শত্রু তার বীজ, এই বীজ থেকে মাথা তুলবে একটি ধ্বংস বৃক্ষ, ভূমি হবে করুক্ষেত্র। ভেতরে জ্বলছে আগুন। বুকে বাজছে দামামা প্রতিশোধ। কিভাবে প্রতিশোধ নেবেন এই ব্রাহ্মণ। কৃপাচার্যের গৃহে আশ্রিত। উপার্জন শূন্য। ব্রাহ্মণের চিরাচরিত বৃত্তি অবলম্বনে দারিদ্র্য ঘুচবে না, সেই কারণেই অস্ত্রবিদ্যা আয়ত্ত করে ক্ষত্রিয় হতে চাই লেন। ভীষ্ম সসম্মানে তাকে রাজপ্রাসাদে বরন করে নিলেন। রাজ পুত্রদের অস্ত্রবিদ্যা যুদ্ধবিদ্যা দান করবেন। অভাব কিছু রইল না। কিন্তু অন্তরের জ্বালা! স্ত্রীর সামনে বন্ধু দ্রুপদের কাটা কাটা কথা দুহাত বিস্তারিত করে বাল্য বন্ধুকে আলিঙ্গন করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু হয় নি। আচার্য দ্রোন তার ছাত্র রাজপুত্রদের বললেন, হে নিষ্পাপ শিষ্যবৃন্দ, আমার একটি বিশেষ আকাঙ্ক্ষার কথা আজ তোমাদের জানাই। তোমাদের অস্ত্রশিক্ষা সম্পূর্ণ হলে আমার সেই আকাঙ্খা পূরণ করতে হবে। তোমাদের মধ্যে কে কে সমর্থ উঠে দাড়াও। এই ভাবে সমস্ত শিষ্যদের ডেকে বললেন আমার শিক্ষা শেষ। এই বার গুরুদক্ষিণা। কী দেবে আমাকে? আমি বলছি তোমরা পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ কে যুদ্ধে পরাজিত করে বন্দি করে আমার কাছে নিয়ে এসো। এই আমাকে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ দক্ষিণা। অনেক দিন ধরে আমার অন্তরে একটা আগুন জ্বলছে। তখন কুমারগণ সকলেই রথে চড়িয়া দ্রোনের সহিত দ্রুত গতিতে রাজ্যের দিকে ধাবিত হইলেন। দ্রোণাচার্য শিষ্যদের নিয়ে যুদ্ধে চলছেন।বাহিনীতে রয়েছেন দূর্যোধন, কর্ণ, যুযুৎসু, দুঃশাসন, বিকর্ণ, জলসন্ধ, পঞ্চপান্ডব। দ্রুপদ আর তার মন্ত্রীদের বন্দী করে দ্রোণাচার্যের কাছে আনা হল। অস্ত্রধারী দ্রোণাচার্য এই ক্ষণ টির অপেক্ষায় ছিলেন। এসো, এসো রাজা এসো! কোথায় তোমার সিংহাসন! রাজমুকুট, রাজছত্র, অমাত্য বিমাত্য! রাজভূষণের এ কী অবস্থা! নিশ্চয়ই তুমি আমার বন্ধু নও! বন্ধু ভেবে আমাকে আলিঙ্গনের চেষ্টা করো না। তুমি এখন রাজ্যহারা ভিখারী। রাজার বন্ধু কি ভিখারী হতে পারে? পাঞ্চালের রাজা এখন আমি ভরদ্বাজ গোত্রীয় ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্য। না না আমি তোমাকে প্রানে বধ করবো না কারণ আমি যে ব্রাহ্মণ, ক্ষমাই ব্রাহ্মণের ধর্ম। তাছাড়া, তুমি যে আমার বাল্যবন্ধু! সে কথা আমি ভুলি কেমন করে। তবে আমি তোমাকে একটি কথা বলছি শোনো? এই যে গঙ্গা নদী দেখতে পারছো না ওই নদীর দক্ষিণ দিকে রাজা তুমি।আর উত্তর দিকে রাজা আমি, এই কথা শুনে দ্রুপদ রাজি হয়ে গেলেন। মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছেন আমাকে একটি মহাশক্তিশালী পুত্র চাই তবেই এই দ্রোণাচার্য কে পরাজিত করতে পারবো।
দ্রোণকে পরাজিত করার জন্য দ্রুপদ এর পর যজ্ঞ করে যজ্ঞাগ্নি থেকে এক বলশালী পুত্র ও যজ্ঞবেদী থেকে অতীব সুদর্শনা এক কন্যা লাভ করেন। পুত্রের নাম দেন ধৃষ্টদ্যুম্ন, আর কন্যার নাম দেন কৃষ্ণা (অপর নাম দ্রৌপদী – যিনি পরে পঞ্চপাণ্ডবের ভার্যা হন)। ধৃষ্টদ্যুম্ন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দ্রোণের শিরশ্ছেদ করেন, যদিও তার পূর্বেই যোগবলে দ্রোণের প্রয়াণ হয়েছিল। দ্রুপদের জ্যেষ্ঠ পুত্র, শিখণ্ডী (ইনি পূর্বজন্মে কাশীরাজ কন্যা অম্বা ছিলেন) স্ত্রীরূপে জন্ম নিয়ে পরে পুরুষত্ব পান। এই শিখণ্ডীকে সামনে রেখেই অর্জুন ভীষ্মকে শরশয্যায় শায়িত করতে পেরেছিলেন। দ্রুপদ পাণ্ডবদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করেন। যোদ্ধা হিসেবে দ্রুপদের সুনাম ছিল। ভীষ্ম ওঁকে মহারথ বলে জ্ঞান করতেন। যুদ্ধের পঞ্চদশ দিবসে দ্রোণের ভল্লের আঘাতে ওঁর মৃত্যু হয়।
কৃষ্ণা (দ্রৌপদী, যাজ্ঞসেনী)ঃ
=============== পাঞ্চাল রাজ দ্রুপদের কন্যা ও পঞ্চ পাণ্ডবের পত্নী। দ্রৌপদী পাঁচ সন্তানের জন্ম দেন (এঁরা সবাই পূর্বজন্মে বিশ্ব-নামধারী দেবতা ছিলেন) – প্রতিবিন্ধ্য (যুধিষ্ঠিরের), সুতসোম(ভীমের), শ্রুতকীর্তি (অর্জুনের),শতানীক (নকুলের) এবং শ্রুতসেন (সহদেবের)। রাজা দ্রুপদ (যজ্ঞসেন) বাল্যবন্ধু দ্রোণের কাছে অপমানিত হয়ে দ্রোণ-বধের নিমিত্তে পুত্রার্থে যে যজ্ঞ করেন, সেই যজ্ঞাগ্নি থেকে প্রথমে পুত্র (ধৃষ্টদ্যুম্ন) ও পরে যজ্ঞবেদী থেকে এক কন্যা (কৃষ্ণা) উত্থিত হন। কৃষ্ণার আবির্ভাব-কালে দৈববানী হয়েছিল যে, সর্বনারীর শ্রেষ্ঠা এই কৃষ্ণা থেকে ক্ষত্রিয় ক্ষয় ও কুরুবংশের মহাভয় উপস্থিত হবে। যজ্ঞের আচার্য ব্রহ্মর্ষি যাজের আশীর্বাদে ধৃষ্টদ্যুম্ন কৃষ্ণা দ্রুপদ ও তাঁর মহিষী পার্ষতীকে পিতা ও মাতা বলে জানলেন। দ্রুপদের ইচ্ছা ছিল তৃতীয় পাণ্ডব ধনুর্বীর অর্জুনের সঙ্গে কৃষ্ণার বিবাহ হোক। কিন্তু সেই ইচ্ছা প্রকাশ না করে তিনি একটি ধনু তৈরী করালেন যে, অসাধারণ ধনুর্বীর না হলে কেউ তাতে গুণ পরাতে পারবেন না। তারপর ভূমি থেকে অনেক উঁচুতে এমন ভাবে একটি লক্ষ্য স্থাপন করলেন যাকে বিদ্ধ করতে একটি ক্ষুদ্র ছিদ্রের মধ্য দিয়ে বাণ চালনা করতে হবে। এইবার কৃষ্ণার স্বয়ংবর সভার আয়োজন করে তিনি ঘোষণা করলেন, যে ঐ ধনুর্বাণ ব্যবহার করে লক্ষ্যভেদ করতে পারবেন, তাঁকেই কৃষ্ণা বরমাল্য দেবেন। দ্রুপদ আশা করেছিলেন যে অর্জুন ব্যতীত কেউই এই কার্যে সক্ষম হবেন না। সমবেত রাজারা একে একে উঠে ধনুতে গুণ পরাতে গিয়ে পর্যুদস্ত হলেন। তখন কর্ণ উঠে এসে সহজেই ধনুতে গুণ পরিয়ে শরসন্ধান করলেন। তাই দেখে কৃষ্ণা বলে উঠলেন যে, তিনি সূতজাতীয়কে বরণ করবেন না। অপমানিত কর্ণ সূর্যের দিকে তাকিয়ে একটু কঠিন হাস্যে ধনুর্বাণ ত্যাগ করলেন। আরও কয়েকজন রাজার নিষ্ফল চেষ্টার পর ব্রাহ্মণবেশী অর্জুন (পঞ্চপাণ্ডব তখন মাতা কুন্তিকে নিয়ে বারণাবত থেকে পালিয়ে এসে ব্রাহ্মণের বেশ ধরে আত্মগোপন করে আছেন) উঠে এসে মহাদেব ও কৃষ্ণকে স্মরণ করে বাণযোজনা করে লক্ষ্যভেদ করলেন আর কৃষ্ণাও স্মিতমুখে সেই ব্রাহ্মণবেশী বীরের গলায় বরমাল্য পরিয়ে দিলেন। ভীম ও অর্জুন কৃষ্ণাকে নিয়ে এসে মাতা কুন্তিকে বললেন যে,তাঁরা ভিক্ষা এনেছেন। কুন্তি ঘরের ভেতরে। কি আনা হয়েছে না দেখে বললেন, সকলে একসঙ্গে মিলে ভোগ কর। অর্জুন মাতৃবাক্য লঙঘণ করতে রাজি হলেন না। তখন পাণ্ডবরা স্থির করলেন কৃষ্ণা সবারই পত্নী হবেন। পঞ্চপাণ্ডবকে কন্যা দান করতে দ্রুপদ দ্বিধাগ্রস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাসদেব এসে তাঁকে বললেন যে, ইন্দ্র ও তাঁর পূর্ববর্তী চার ইন্দ্রকে তাঁদের দর্পের জন্য মহাদেব মনুষ্য হয়ে জন্মাতে বলেছেন আর এক লোকবাঞ্ছিতা রমনীকে তাঁদের ভার্যা করার জন্য আদেশ দিয়েছেন। সেই শ্রীরূপিণী রমণীটি পূর্বে ছিলেন এক ঋষিকন্যা, যাঁকে মহাদেব পঞ্চপতি পাবার বর দিয়েছিলেন। পঞ্চপাণ্ডব হলেন সেই শাপগ্রস্থ পঞ্চ ইন্দ্রের অংশ, যাঁদের ধর্ম, বায়ু, ইন্দ্র ও অশ্বিনীকুমারদ্বয় মানুষীর গর্ভে উৎপাদন করেছেন, আর কৃষ্ণা হলেন সেই ঋষিকন্যা। মহাদেবের ইচ্ছাতেই কৃষ্ণা পঞ্চপাণ্ডবের পত্নী হবেন। এরপর আর কোনও বাধা রইলো না। এর কিছুদিন পর পাণ্ডবরা ধৃতরাষ্ট্রের নির্দেশে অর্ধরাজ্য লাভ করে ইন্দ্রপ্রস্থে বসবাস শুরু করলেন। দ্রৌপদীকে নিয়ে ভ্রাতাদের মধ্যে যাতে কোনও বিরোধ না হয় তারজন্য পাণ্ডবরা নিজেদের মধ্যে স্থির করলেন যে, দ্রৌপদীর সঙ্গে যিনি বাস যখন বাস করবেন, তখন তিনি ব্যতীত অন্য কেহ শয়নগৃহে প্রবেশ করবেন না। যদি করেন, তাহলে তাঁকে বার বৎসর বনবাসে গিয়ে ব্রহ্মচর্য পালন করতে হবে। এক ব্রহ্মণের গোধন রক্ষা করার জন্য অর্জুনকে এই নিয়ম ভঙ্গ করতে হয়েছিল। যুধিষ্ঠিরের বারণ সত্বেও অর্জুন বনবাসে গেলেন। পঞ্চ স্বামীকে ভলোবাসলেও অর্জুনই ছিলেন দ্রৌপদীর প্রিয়তম (কাম্যক বনে বনবাস কালে অর্জুন যখন তপস্যার জন্য হিমালয়ে গিয়েছিলেন, তখন অকপটেই কৃষ্ণা যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন যে, পাণ্ডবশ্রেষ্ঠকে দেখতে না পেয়ে, এই বনভূমি তাঁর আর ভালো লাগছে না)। তাই অর্জুন যখন বারো বৎসর পরে তাঁর নতুন ভার্যা সুভদ্রাকে নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে দ্রৌপদীর সঙ্গে দেখা করতে এলেন, তখন অভিমানিনী দ্রৌপদী বলতে শোনা যায়, নতুন বন্ধন হলে পুরনো বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। অর্জুন সুভদ্রার কাছে গিয়েই থাকুন। দ্রৌপদীর অভিমান ভঙ্গ করতে অর্জুনকে বেগ পেতে হয়েছিল। পঞ্চপাণ্ডবের মত বীররা তাঁর স্বামী হলেও কৃষ্ণাকে সারা জীবন বহু অপমান সহ্য করতে হয়েছে। পণদ্যূতে হেরে যুধিষ্ঠির ভ্রাতা সহ কৃষ্ণার স্বাধীনতা হারিয়েছেন। ফলে দুরাত্মা দুর্যোধন দ্রৌপদীকে কেশ আকর্ষণ করে সভায় নিয়ে এসে দাসী বলে সম্বোধন করেছেন। তাঁর বস্ত্র পর্যন্ত হরণ করার চেষ্টা করেছেন। ধর্মপরায়ণ পতিদের কাছে কোনও সাহায্য না পেয়ে দ্রৌপদী কৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়েছেন। যোগবলে সুদূরে থাকা সত্বেও কৃষ্ণ তাঁকে চরম লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। পণদ্যুতে দ্বিতীয়বার পরাজিত হয়ে পাণ্ডবরা যখন বনবাস করছেন, তখন কৃষ্ণ ওঁদের দেখতে এসেছিলেন। দ্রৌপদী তখন সভাগৃহে তাঁর চরম লাঞ্ছনার কথা শুনিয়ে কৃষ্ণকে অনেক অনুযোগ করে বলেছেন যে, চারটি কারণে কৃষ্ণ যেন ওঁকে নিত্য রক্ষা করেন। প্রথমত, কৃষ্ণের সঙ্গে ওঁর সম্বন্ধ (তিনি কৃষ্ণের ভ্রাতৃবধূ – তিন পাণ্ডবভ্রাতা কৃষ্ণের পিসীমাতার পুত্র); দ্বিতীয়ত, ওঁর পবিত্রতা (উনি যজ্ঞবেদী সম্ভূতা); তৃতীয়ত, ওঁর সখ্যতা (তিনি কৃষ্ণের অনুগতা সখী); এবং চতুর্থত কৃষ্ণের শক্তিমত্বা। পঞ্চপাণ্ডব মহাবীর হওয়া সত্বেও রক্ষক হিসেবে কৃষ্ণকে তাঁর দরকার হয়েছে। সাধারণত বিপদে আপদে ভীমই ছিলেন দ্রৌপদীর ভরসা। ভীমও দ্রৌপদীকে রক্ষা করতে সবসময়েই তৎপরতা দেখিয়েছেন। কৌরব সভায় দ্রৌপদীর অপমান প্রত্যক্ষ করে ভয়ানক প্রতিজ্ঞা, দ্রৌপদী-হরণ প্রচেষ্টার জন্য জয়দ্রথকে অমানুষিক প্রহার, দ্রৌপদীর ওপর বলপ্রয়োগের জন্য পাপিষ্ঠ কীচককে বধ, কীচকের স্বজন কর্তৃক কীচকের সঙ্গে দ্রৌপদীকে দাহ করার অপচেষ্টা নষ্ট করা, ইত্যাদি ব্যাপারে ভীমকেই সচেষ্ট দেখা যায়। দ্রৌপদী তাঁর তেজস্বিতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। অজ্ঞাতবাস শেষ হবার পর কৌরবদের সঙ্গে শান্তিস্থাপনের আগ্রহে যখন যুধিষ্ঠির, অর্জুন, এমন কি ভীমসেন পর্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করছেন, তখন দ্রৌপদী কৃষ্ণকে বলছেন যে, রাজ্যার্ধ না দিলে কখনোই সন্ধির প্রস্তাব যেন না করা হয়। সবাই কি ওঁর লাঞ্ছনার কথা ভুলে গেছেন? তারপর নিজের উন্মুক্ত কেশগুচ্ছ কৃষ্ণের সামনে তুলে ধরে বলেছেন যে, কৃষ্ণ যেন মনে রাখেন – দুঃশাসন এই কেশগুচ্ছ স্পর্শ করেছে! তারপর ভীমার্জুনকে উদ্দেশ্য করেই কৃষ্ণকে বলেছেন যে, ভীমার্জুন যদি যুদ্ধ করতে না চান, তাহলে ওঁর বৃদ্ধ পিতা ওঁর ভ্রাতাদের এবং ওঁর পাঁচ পুত্র ও অভিমন্যুকে সাথে নিয়ে যুদ্ধ করবেন। দ্রৌপদীর এই তেজোস্বিতা পাণ্ডবদের, বিশেষ অরে ভীমকে যেরকম উদ্দীপ্ত করেছে, কৌরবদের সেই রকম ভীতি উৎপাদন করেছে। মহাযুদ্ধের শেষে গভীর রাত্রে অশ্বত্থমা পাণ্ডবশিবিরে ঢুকে দ্রৌপদীর ভ্রাতা ও পুত্রদের হত্যা করেছেন যেনে দ্রৌপদী শোকে দুঃখে বিহবল হয়েছেন। বলেছেন অশ্বত্থমা নিহত না হলে অনাহারে প্রাণত্যাগ করবেন। যুধিষ্ঠির যখন ওঁকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করেছেন, তখন তিনি ভীমকে বলেছেন অশ্বত্থমাকে বধ করে ওঁর মস্তকের সহজাত মণি এনে যুধিষ্ঠিরকে দিতে। ভীম তখন অশ্বত্থমার খোঁজে গেছেন। যুধিষ্ঠির যখন যুদ্ধজয় করেও বিষাদগ্রস্থ হয়ে বনবাসের কথা ভাবছেন, তখন দ্রৌপদী যুধিষ্ঠিরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর এই চিন্তা ক্ষত্রিয়জনোচিত নয়। পুত্রদের হারিয়েও দ্রৌপদী বাঁচতে চাইছেন, তাহলে যুধিষ্ঠিরের এই অবস্থা কেন। ধর্মপথে যুধিষ্ঠির পৃথিবী শাসন করুন। মহাপ্রস্থানের পথে মহাশৈল মেরুর কাছে এসে কৃষ্ণাই প্রথমে পতিত হলেন। ভীমের প্রশ্নের উত্তরে যুধিষ্ঠির বললেন যে, অর্জুনের প্রতি দ্রৌপদীর পক্ষপাত ছিল। সেই দোষেই ওঁর পতন ঘটল। সেই দোষ সত্বেও দ্রৌপদীকে হিন্দুদের প্রাতঃস্মরণীয়া পঞ্চনারীর (কুন্তি, দ্রৌপদী, তারা, মন্দোদরী ও অহল্যা) অন্যতমা বলে গণ্য করা হয়।
পাঞ্চালী-সংক্রান্ত ১০টি স্বল্প-আলোচিত তথ্য।
১ ‘নারদ পুরাণ’ এবং ‘বায়ু পুরাণ’ অনুযায়ী, দ্রৌপদী একাধারে ধর্ম-পত্নী দেবী শ্যামলা, বায়ু-পত্নী দেবী ভারতী এবং ইন্দ্র-পত্নী দেবী শচী, অশ্বীনিকুনারদ্বয়ের পত্নি ঊষা এবং শিব-পত্নী পার্বতীর অবতার।
২ বিগত জন্মে তিনি ছিলেন রাবণকে অভিসম্পাত-প্রদানকারী বেদবতী। তার পরের জন্মে তিনি সীতা। তাঁরই তৃতীয় ও চতুর্থ জন্ম দময়ন্তী এবং তাঁর কন্যা নলযানী। পঞ্চম জন্মে তিনি দ্রৌপদী।
৩ দ্রৌপদীর বহু নাম। পাঞ্চাল রাজপুত্রী দ্রৌপদী পাঞ্চালী নীমেই সমাধিক পরিচিতা। তিনি যজ্ঞকুণ্ড-জাতা। সেকারণে তাঁরা নাম যাজ্ঞসেনী। অজ্ঞাতবাস পর্বে তাঁর নাম ছিল সৈরিন্ধ্রী।
৪ পূর্বজন্মে দ্রৌপদী ১৪টি গুণসম্পন্ন স্বামীর জন্য তপস্যা করেন। শিব তাঁকে সেই মতো বরদানও করেন। কিন্তু একটি মানুষের মধ্যে এতগুলি গুণ থাকা সম্ভব নয়। তখন শিব তাঁকে জানান, পাঁচজন মানুযের মধ্যে এমন গুণের সমাহার ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে তাঁকে পঞ্চস্বামী বরণ করতে হতে পারে।
৫ দ্রৌপদী যজ্ঞকুণ্ড-জাতা। কুণ্ড থেকে তিনি পূর্ণযৌবনা অবস্থাতেই উঠে আসেন।
৬ দক্ষিণ ভারতে দ্রৌপদীকে দেবী কালিকার অবতার মনে করা হয়। তিনি দুষ্ট রাজাদের সংহারকল্পে আবির্ভূতা হন।
৭ মহাভারতের ভাষ্যকারদের অনেকেই এ কথা বলেছেন যে, পঞ্চস্বামীর প্রতি তাঁর সমান প্রেম ছিল না। অর্জুনই ছিলেন তাঁর প্রকৃত প্রেমিক।
৮ দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে দুর্যোধন অংশগ্রহণ করেননি। কারণ তিনি তাঁর পত্নী ভানুমতীকে কথা দিয়েছিলেন, তিনি আর বিবাহ করবেন না।
৯ কৃষ্ণের স্ত্রী সত্যভামার কাছে দ্রৌপদী স্বীকার করেছেন, পাঁচজন স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখতে তাঁকে কতগুলো কঠিন নিয়ম মেনে চলতে হয়। দ্রৌপদী অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, বাস্তববাদী নারী। তিনি তাঁর প্রতি অন্যায় আচরণের জন্যে প্রতিশোধ চাইতেন, মুখ বুজে সহ্য করতেন না অবিচার। প্রতি স্বামীর সঙ্গে দ্রৌপদীর একটি করে পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাঁর পাঁচটি পুত্রকেই ঘুমন্ত অবস্থায় বধ করে অশ্বত্থামা। অশ্বত্থামার মা একজন ধর্মপ্রাণ নারী ও গুরু। সেই বিবেচনায় এবং পাঁচ পুত্রকে হারিয়ে নিজের শোকাতুর অবস্থা অনুধাবন করে সকলের পরামর্শ ও উপদেশ অগ্রাহ্য করে অশ্বত্থামাকে তিনি ক্ষমা করে দেন। দ্রৌপদী চান না তাঁর মতো করে আরেকটি মা এমন প্রচন্ড শোকে পান্ডুর হোক।
১০ মহাভারতে দ্রৌপদীর বর্ণনা :-
কুমারী চাপি পাঞ্চালী বেদীমধ্যাৎ সমুত্থিতা ।
সুভগা দর্শনীয়াঙ্গী স্বসিতায়তলোচনা ।।৪৪।।
শ্যামা পদ্মপলাশাক্ষী নীলকুঞ্চিতমূর্ধজা ।
তাম্রতুঙ্গনখী সুভ্রূশ্চারুপীনপয়োধরা ।।৪৫।।
মানুষং বিগ্রহং কৃত্বা সাক্ষাদমরবর্ণিনী ।
নীলোৎপলসমগন্ধ যস্যাঃ ক্রোশাৎ প্রবায়তি ।।৪৬।।
যা বিভর্তি পরং রূপং যস্যা নাস্ত্যুপমা ভুবি ।
দেবদানবযক্ষাণামীপ্সিতাং দেবরূপিণীম ।।৪৭।।
যার অর্থ : তখন যজ্ঞবেদী থেকে এক কুমারীও উৎপন্ন হলেন যিনি পাঞ্চালী নামে পরিচিতা হলেন । তিনি সৌভাগ্যশালিনী, সুদর্শনা এবং কৃষ্ণ আয়তচক্ষুযুক্তা । তিনি শ্যামাঙ্গী, পদ্মপলাশাক্ষী, কুঞ্চিত ঘনকালো কেশবতী এবং তাম্রবর্ণ নখ, সুন্দর ভ্রূ ও স্তনযুক্তা । তিনি মানুষের শরীরে সাক্ষাৎ দেবী । তাঁর নীলপদ্মের ন্যায় অঙ্গসৌরভ একক্রোশ দূরেও অনুভূত হয় । তিনি পরম সুন্দর রুপধারিণী এবং সমগ্র বিশ্বে তুলনাহীনা । এই দেবরূপিনী কন্যা দেব, দানব ও যক্ষেরও আকাঙ্ক্ষিত ।
মহাভারতের দ্রৌপদী চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি বহুগুণান্বীতা মহিলা হওয়া সত্ত্বেও তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে এমন কিছু ভুল করেছিলেন যার মাশুল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গুনতে হয়ে ছিল তাকে। সামাজিক নিয়মের বেড়াজাল থেকে এই বিদুষী নারীটিও রক্ষা পাননি।
স্বয়ম্বর সভায় কর্ণের প্রতি তার আচরণ অমানবিকতার পরিচয়বাহক।এই ত্রুটির জন্য এক মায়ের দুই সন্তান দৃঢ়চেতা হয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হওয়ার হিংসায় মেতে ওঠে, এই দ্বেষের আগুন দ্রৌপদীকে আমৃত্যু দহনজ্বালা দেয়। আবার ময়দানব নির্মিত, স্ফটিক খচিত ইন্দ্রপ্রস্থে দুর্যোধনের প্রথম পদার্পণেই পা পিছলে যাওয়া দেখে হেসে ফেলা। পরবর্তী কালে এর চেয়ে অনেক বেশি অপমান তাঁকে ফিরে পেতে হয়েছিল। যেখানে আমরা দেখি, দুঃশাসন তাঁকে বল প্রয়োগে তাঁর বস্ত্র ধরে টেনে এনে ছিল রাজসভায় ও সেখানে বিবস্ত্রা নারীর শরীরী বিভঙ্গ উপভোগ করেছিল এক পাল মেরুদন্ডহীন পুরুষ।
মহাকাব্য ‘মহাভারত’-এর মূল ঘটনাগুলিই ঘটতা না তিনি না থাকলে। এক অর্থে ভারতকথার ‘মুল চরিত্র’ তিনিই। এমন এক নারী, যাঁকে পাওয়ার জন্য পুরুষ যে কোনও কাজ করতে প্রস্তুত।
পরিশেষে সেই সময়ের নৈতিকতার সংজ্ঞা বা ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, অন্যান্য মানবিক মূল্যবোধের বেলায়, যেমন - সত্য কথা বলা, অন্যের ক্ষতি না করা, চুরি না করা, যুদ্ধকালীন সময়ে ন্যায়-নীতি-ধর্মের অনুশাসন-অনুযায়ী শত্রুবিনাশ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর যতটা জোর দেওয়া হয়েছে, নরনারীর প্রেম ও যৌনতাবিষয়ক আচরণের ব্যাপারটিতে ততটা নিয়মতান্ত্রিকতা বা স্পর্শকাতরতা দেখা যায়নি। বিশেষ করে পুরুষদের বেলায়। তবে নারীর কৌমার্য ও সতীত্বকে তখনো যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হতো।
আজো কোনো কোনো মানুষ বিশ্বাস করে, পৌরাণিক পঞ্চবতী বা পঞ্চকন্যার নাম উচ্চারণ করলে সকল পাপ দূর হয়ে যায়। জীবদ্দশায় তাদের মহত্ত্ব ও নানাবিধ গুণাবলির জন্যে প্রাচ্যের ‘পঞ্চকন্যা’ বলে প্রসিদ্ধ যে-পাঁচজন পুরাণের নারীর কথা লোকে এখনো স্মরণ করে, তারা হলেন - অহল্যা, কুন্তি, দ্রৌপদী, তারা ও মন্দোদরী।
" অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তথা
পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং মহাপাতক নাশনম্।। "
অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা ও মন্দোদরী - এই পঞ্চকন্যাকে নিত্য স্মরণ করলে মহাপাপগুলি দূরীভূত হয়।
সর্বোপরি মহাভারতের অসাধারণ নারী চরিত্র দ্রৌপদীর জন্ম ও কর্ম বৃত্তান্ত জানলে এটাই প্রতিপন্ন হয় যে, অগ্নি যেমন কোনো কিছুর দ্বারাই অপবিত্র হয় না। তেমনি অগ্নি থেকে উত্থিত যজ্ঞসেনী দ্রৌপদী অগ্নির ন্যায় পবিত্র। তিনি এ জগতের সাধারণ কোনো নারী নন যা পূর্বের আলোচনায় প্রমাণিত হয়েছে। তাই পঞ্চপান্ডবকে দ্রৌপদীর পতিরূপে বরণ করা কখনোই অধর্ম নয়।

গান্ধারী
 

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে, এই নামে দুটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র পাওয়া যায়। যেমন

. ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের গান্ধার রাজ্যের রাজা সুবলের কন্যা। এঁর প্রকৃত নাম জানা যায় না। ইনি পিতার নামে- সুবলকন্যা এবং তাঁর জন্মস্থান গান্ধারের নামানুসারে ইনি গান্ধারী নামে পরিচিত ছিলেন। মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষায় তাঁর মন পরিপূর্ণ ছিল। ইনি কুমারী অবস্থায় মহাদেবের কাছে শতপুত্র লাভের বর চেয়েছিলেন
 

ভীষ্ম এঁর সাথে ধৃতরাষ্ট্রের বিবাহের জন্য গান্ধাররাজের কাছে প্রস্তাব পাঠালে, গান্ধাররাজ তাঁর পুত্র শকুনি'র সাথে সালঙ্কৃতা অবস্থায় গান্ধারীকে হস্তিনাপুরীতে পাঠান। এবং এখানেই তাঁর সাথে ধৃতরাষ্ট্রের বিবাহ হয়। স্বামীর অন্ধত্বের কারণে গান্ধারী চোখে সব সময় এক খণ্ড কাপড় বেঁধে রাখতেন। বেদব্যাস একদিন ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে হস্তিনাপুরীতে এলেগান্ধারী যথোচিত সেবা যত্ন করে ঋষিকে তুষ্ট করেন। পরিতুষ্ট বেদব্যাস তাঁকে বর দিতে ইচ্ছা করলে, ইনি তাঁর কাছে শতপুত্র লাভের বর প্রার্থনা করে তা লাভ করেন
 

গর্ভবতী হওয়ার পর দুই বৎসরেও তাঁর সন্তান প্রসব না হওয়ায় এবং পাণ্ডুর প্রথম পুত্র যুধিষ্ঠিরের জন্ম হওয়ায়ইনি ঈর্ষায় নিজের উদরে আঘাত করতে থাকেন। ফলে ইনি একটি লৌহকঠিন মাংশপিণ্ড প্রসব করেন। ইনি ক্ষোভে দুঃখে এই মাংসপিণ্ড ফেলে দিতে উদ্যোগী হলেব্যাসদেব সেখানে উপস্থিত হয়ে তাঁকে এই কর্ম থেকে নিবৃত করেন। পরে ব্যাসবেদের পরামর্শে ইনিএকশতটি ঘৃতপূর্ণ কুণ্ড স্থাপন করেশীতল জলে এই মাংস খণ্ডটি ধৌত করেন। ফলে এই মাংস খণ্ডটি একশত এক ভাগে বিভক্ত হয়। পরে আরো একটি ঘৃতকুণ্ড স্থাপন করে এই ১০১টি খণ্ড রেখে দিলেন। এক বত্সর পর এই মাংস পিণ্ড হতে প্রথমে দুর্যোধন ও এক বত্সর এক মাসের মধ্যে অন্যান্য ১০০টি পুত্র ও একটি কন্যার জন্ম হয়
 

ইনি অত্যন্ত ধর্মশীলা ছিলেন। প্রকাশ্য সভার মধ্যে দুর্যোধন দ্রৌপদীকে অপমান করলে দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করার জন্য ইনি ধৃতরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেন। অন্যায় আচরণের জন্য ইনি দুর্যোধন ও দুঃশাসনকে কখনও ক্ষমা করেন নি। ইনি পণ-মুক্ত পাণ্ডবদের অর্ধরাজ্য দান করে সন্ধিস্থাপনের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আগে দুর্যোধন এঁর কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে গেলে- ইনি বলেন যে- যেখানে ধর্ম সেখানেই জয়। যুদ্ধের শেষে মাতৃস্নেহে আকুল হয়ে তাঁর পুত্রদের জন্য ক্রন্দন করেছেন এবং পাণ্ডবদের অভিশাপ দিতে অগ্রসর হয়েছেন। পরে ব্যাসদেবের অনুরোধে ইনি তাঁর ক্রোধ দমন করেন। গান্ধারী সক্রোধে যুধিষ্ঠিরের কাছে এলেযুধিষ্ঠির তাঁর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেন। এই সময় যুধিষ্ঠিরের শরীর কাপড়ে ঢাকা ছিল। গান্ধারী ক্রোধের সাথে যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকালে ইনি শুধু যুধিষ্ঠিরের পায়ের আঙুলের নখ দেখতে পান। গান্ধারীর তীব্র দৃষ্টিতে যুধিষ্ঠিরের পায়ের নখ বিকৃত হয়ে যায়। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কৃষ্ণ যুদ্ধ থামানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করে নি বলে ইনি কৃষ্ণকে অভিশাপ দেন। এই অভিশাপের ফলে বনের মধ্যে কৃষ্ণ নিকৃষ্টভাবে নিহত হন
 

পাণ্ডবদের রাজ্যলাভের পর পনের বত্সর ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী পাণ্ডবদের আশ্রয়ে ছিলেন। এরপর এঁরা বাণপ্রস্থ অবলম্বন করে গঙ্গাতীরে রাজর্ষি শতযূপের আশ্রমে যান। এখানে আশ্রম নির্মাণ করে অন্যান্য সকলের সাথে বসবাস করতে থাকেন। বনবাসকালে ইনি শুধুমাত্র জলপান করে তপস্যা করতেন। বাণপ্রস্থের তৃতীয় বত্সরে ইনি সবার সাথে অরণ্যে প্রবেশ করেন। উক্ত বনে দাবানলের সৃষ্টি হলে ধৃতরাষ্ট্রকুন্তী সহ ইনি মৃত্যুবরণ করেন

 

. ইনি ছিলেন ভরতবংশীয় অজমীঢ়ের স্ত্রী। 


শ্লোক: 2:
সঞ্জয় উবাচ
দৃষ্ট্বা তু পাণ্ডবানীকং ব্যূঢ়ং দুর্যোধনস্তদা
আচার্যমুপসঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীৎ॥২॥

অনুবাদসঞ্জয় বললেন- হে রাজন্ ! পাণ্ডবদের সৈন্যসজ্জা দর্শন করে রাজা দুর্যোধন দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে বললেন-

আমরা এই শ্লোকে সঞ্জয়কে পেলাম যার সম্পর্কে আমরা পূর্বে জেনেছি। এখন আমরা পেলাম নতুন চরিত্র দ্রোনাচার্য । আসুন তার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি ।

দ্রোণাচার্য

দ্রোণঃ এছাড়াও দ্রোণাচার্য  নামে পরিচিত, হলেন মহাকাব্য মহাভারতে বর্ণিত অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।

মহাকাব্যে বর্ণিত হয়েছে, তিনি হলেন কৌরব এবং পাণ্ডবদের রাজ অস্ত্রগুরু। তিনি হস্তিনাপুরের রাজার মুখ্য উপদেষ্টা এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাযোদ্ধাও বটে। আরো উল্লেখিত হয়েছে, তিনি অসুরদের গুরু শুক্রাচার্যের এবং মহাবলীর বন্ধু। তিনি ঋষি ভরদ্বাজের পুত্র এবং ঋষি অগ্নিরসের বংশজ। এই অস্ত্রগুরু মহাভারতের যুগের আধুনিক সামরিক কলাকৌশল, ব্যুহ রচনা, দিব্যাস্ত্র প্রভৃতিতে খুবই দক্ষ ছিলেন। তিনি ভয়ংকর দিব্যাস্ত্র ব্রহ্মাস্ত্রের ব্যবহারও জানতেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তিনি একাদশ দিন থেকে পঞ্চদশ দিন পর্যন্ত কৌরব সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধ করেন। আচার্যবর যুদ্ধের ১১শ দিনে, ১২শ দিনে, ১৪শ দিনে ও ১৪শ রাত্রিতে মোট ৪ বার মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে বন্দি করতে চেয়েছিলেন এবং প্রতিবারই ব্যর্থ হন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পঞ্চদশ দিনে, তিনি যখন যুদ্ধক্ষেত্রে সমাধিমগ্ন ছিলেন তখন পাণ্ডব সেনাপতি ধৃষ্টদ্যুম্ন, তাঁকে বধ করেন। [১] বলা হয়ে থাকে, দ্রোণ হলেন দেবগুরু বৃহস্পতির অবতার। তিনি একাধারে পাণ্ডবদের, কৌরবদের, ধৃষ্টদ্যুম্ন, জয়দ্রথ এবং নিজপুত্র অশ্বত্থামার গুরু।

বিবরণ

ঋষি ভরদ্বাজ একদিন হতির্ধান নামক স্থানে গঙ্গা স্নানে গেছেন। আর এমনি যোগাযোগ রূপযৌবন সম্পন্না মদদৃপ্তা আপ্সরা ঘৃতাচি সেই সময় সেই খানে স্নান করছিল। ক্ষরস্রোতে তার অঙ্গবস্ত্র ভেসে গেল। জলে দাঁড়িয়ে নগ্ন সুন্দরী। মুনি সেই দৃশ্য দেখে নিজেকে সামলাতে পারলেন না। বীর্য স্ফলিত হল। তিনি জানতেন তাঁর তার বীর্যের অমোঘত্ব। তিনি সেই শক্তিকে একটি কলসে রক্ষা করলেন। পরে দেখা গেল সেই কলসের মধ্যে একটি পুত্র সন্তান জন্মেছে। যার গর্ভধারিনী একটি কলস। দ্রোন শব্দের একটি অর্থ হল কলস। প‌ষৎ রাজার পুত্রের নাম দ্রুপদ। দ্রোন আর দ্রুপদ সমবয়সী। দুই বালক ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে লেখা পড়া, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা শিখতে লাগলেন। রাজা পৃষৎ ভরদ্বাজের বন্ধু। দ্রোন আর দ্রুপদের মধ্যে ও সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। কিন্তু রাজন অসম বন্ধুত্ব স্থায়ী হয় না। আর দুনিয়ায় বন্ধুত্ব একটা শব্দ মাত্র। প্রভুত্বই সার কথা। এই জগতে সম্পর্ক একটাই তুমি প্রভু আমি ভৃত্য, অথবা আমি প্রভু তুমি ভৃত্য। রাজা পৃষতের মৃত্যু হয় দ্রুপদ উত্তর পাঞ্চালের রাজা হলেন। আর ভরদ্বাজ স্বর্গে গলেন। বিদ্বান তাপস দ্রোন হলেন আশ্রমিক। একজন সিংহাসনে, আর একজন কুশাসনে।দ্রোনের জীবন পথ আর তার বাল্য বন্ধুর জীবন পথ ভিন্ন। সময় চলছে দিন, মাস, বছর, বছরের পর বছর।দ্রোন শরদ্বানের কন্যা কৃপীকে বিবাহ করলেন। এই বার তিনি সংসারি হলেন। দ্রোন মহেন্দ্রপর্বতে পরশুরামের কাছে গেলেন। তাকে সন্তুষ্ট করে বললেন, "হে ভার্গব, আপনি সমস্ত অস্ত্র ও শস্ত্র প্রয়োগ এবং সংহার বিদ্যা আমাকে দান করুন।" পরশুরাম বললেন, তথাস্তু। দ্রোন হলেন অদ্বিতীয় আচার্য। এই আনন্দ সংবাদ কাকে জানাবেন? প্রিয় সখা দ্রুপদকে। দ্রুপদ রাজা হয়েছেন, সখা হিসেবে তাকে তো অভিনন্দন জানান উচিত। দ্রুপদের সভায় গিয়ে দ্রোন বললেন, বন্ধু চিনতে পারছ? আমি তোমার বাল্য সখা দ্রোন। এ কি কোন কটু কথা। দ্রুপদের কি হল কে জানে। চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে গেল। ভুরু কুঁচকে কর্কশ কন্ঠে বললেন, কে তুমি? তোমার বুদ্ধি সুদ্ধি, কাণ্ড জ্ঞান আছে বলে মনে হয় না৷ কারণ তুমি প্রথমেই আমাকে সখা বলে পরিচয় দিয়েছ। নির্বোধ। আমি রাজা, তোমার মতো শ্রহীন দরিদ্রের আমি সখা হতে যাব কোন দুঃখে। তোমার সঙ্গে বাল্যকালে যে সখ্য ছিল, উহা কেবল খেলার ও পড়ার স্বার্থের জন্য। শোন ব্রাহ্মণ, দরিদ্র কখনো ধনীর, মূর্খ কখনো পন্ডিতের, ক্লীব কখনো বীরের সখা হতে পারে না। মানুষের অহংকারই শত্রু তার বীজ, এই বীজ থেকে মাথা তুলবে একটি ধ্বংস বৃক্ষ, ভূমি হবে করুক্ষেত্র। ভেতরে জ্বলছে আগুন। বুকে বাজছে দামামা প্রতিশোধ। কীভাবে নেবেন এই ব্রাহ্মণ। কৃপাচার্যের গৃহে আশ্রিত। উপার্জন শূন্য। ব্রাহ্মণের চিরাচরিত বৃত্তি অবলম্বনে দারিদ্র্য ঘুচবে না, সেই কারণেই অস্ত্রবিদ্যা আয়ত্ত করে ক্ষত্রিয় হতে চাই লেন। ভীষ্ম সসম্মানে তাকে রাজপ্রাসাদে বরন করে নিলেন। রাজ পুত্রদের অস্ত্রবিদ্যা যুদ্ধবিদ্যা দান করবেন। অভাব কিছু রইল না। কিন্তু অন্তরের জ্বালা! স্ত্রীর সামনে বন্ধু দ্রুপদের কাটা কাটা কথা দুহাত বিস্তারিত করে বাল্য বন্ধুকে আলিঙ্গন করতে গিয়ে ছিলেন, কিন্তু হয় নি। আচার্য দ্রোন তার ছাত্র রাজপুত্রদের বললেন, হে নিষ্পাপ শিষ্যবৃন্দ, আমার একটি বিশেষ আকাঙ্ক্ষার কথা আজ তোমাদের জানাই। তোমাদের অস্ত্রশিক্ষা সম্পূর্ণ হলে আমার সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে। তোমাদের মধ্যে কে কে সমর্থ উঠে দাড়াও। এই ভাবে সমস্ত শিষ্যদের ডেকে বললেন আমার শিক্ষা শেষ। এই বার গুরুদক্ষিণা। কী দেবে আমাকে? আমি বলছি তোমরা পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ কে যুদ্ধে পরাজিত করে বন্দি করে আমার কাছে নিয়ে এসো। এই আমাকে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ দক্ষিণা। অনেক দিন ধরে আমার অন্তরে একটা আগুন জ্বলছে। তখন কুমারগণ সকলেই রথে চড়িয়া দ্রোনের সহিত দ্রুত গতিতে রাজ্যের দিকে ধাবিত হইলেন। দ্রোণাচার্য শিষ্যদের নিয়ে যুদ্ধে চলছেন।বাহিনীতে রয়েছেন দূর্যোধন, কর্ণ, যুযুৎসু, দুঃশাসন, বিকর্ণ, জলসন্ধ, পঞ্চপান্ডব। দ্রুপদ আর তার মন্ত্রীদের বন্দী করে দ্রোণাচার্যের কাছে আনা হল। অস্ত্রধারী দ্রোণাচার্য এই ক্ষণ টির অপেক্ষায় ছিলেন। এসো, এসো রাজা এসো! কোথায় তোমার সিংহাসন! রাজমুকুট, রাজছত্র, অমাত্য বিমাত্য! রাজভূষণের এ কী অবস্থা! নিশ্চয়ই তুমি আমার বন্ধু নও! বন্ধু ভেবে আমাকে আলিঙ্গনের চেষ্টা করো না। তুমি এখন রাজ্যহারা ভিখারী। রাজার বন্ধু কি ভিখারী হতে পারে? পাঞ্চালের রাজা এখন আমি ভরদ্বাজ গোত্রীয় ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্য। না না আমি তোমাকে প্রানে বধ করবো না কারণ আমি যে ব্রাহ্মণ, ক্ষমাই ব্রাহ্মণের ধর্ম। তাছাড়া, তুমি যে আমার বাল্যবন্ধু! সে কথা আমি ভুলি কেমন করে। তবে আমি তোমাকে একটি কথা বলছি শোনো? এই যে গঙ্গা নদী দেখতে পারছো না ওই নদীর দক্ষিণ দিকে রাজা তুমি।আর উত্তর দিকে রাজা আমি, এই কথা শুনে দ্রুপদ রাজি হয়ে গেলেন। মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছেন আমাকে একটি মহাশক্তিশালী পুত্র চাই তবেই এই দ্রোণাচার্য কে পরাজিত করতে পারবো।

জন্ম

একদা মহর্ষি ভরদ্বাজ গঙ্গায় স্নানের সময় অপ্সরা ঘৃতাচী কে দেখে উত্তেজিত ও কামার্ত হন

এবং তাঁর বীর্যপাত হয়। তিনি সেই বীর্য এক কলসে সংরক্ষণ করেন। সেই কলস থেকে দ্রোণের জন্ম হয়।

বিয়ে

দ্রোণ শরদ্বানের কন্যা এবং কৃপাচার্য এর ভগিনী কৃপী কে বিয়ে করেন। অশ্বত্থামা নামে তাঁদের এক পুত্র জন্মায়।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দ্রোণ কৌরব পক্ষে যুদ্ধ করেন। ভীষ্ম এর শরশয্যা গ্রহণের পর তিনি কৌরবপক্ষের সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ৫ দিন কৌরবপক্ষের সেনাপতি ছিলেন।

মৃত্যু

দ্রোণাচার্য যুদ্ধে অপরাজেয় হয়ে উঠলে তাঁকে আটকাতে কৃষ্ণ পাণ্ডবদের বুদ্ধি দেন অশ্বত্থামা এর মিথ্যা মৃত্যুসংবাদ দ্রোণের নিকট প্রচার করতে। বাস্তবে অশ্বত্থামা অমর ছিলেন। দ্রোণ

শুনতে পেলেন। 'ইতি গজ' বললেন খুব মৃদু স্বরে,দ্রোণাচার্য সেটা শুনতে পেলেন না।পুত্রের
প্রথমে এই সংবাদ বিশ্বাস করেন নি। কিন্তু চির সত্যবাদী যুধিষ্ঠির কৌশলে বললেন, "অশ্বত্থামা হত, (ইতি গজঃ)"।'অশ্বত্থামা হত'-এ কথা বললেন জোরে, দ্রোণ সেটাই মৃত্যুসংবাদ শ্রবণ করে দ্রোণ পুত্রশোকে কাতর হয়ে অস্ত্রত্যাগ করেন। অশ্বত্থামা নামক একটি হাতিকে বধ করেন ভীম। যুধিষ্ঠির সেই সংবাদ অর্ধসত্য রূপে বিবৃত করেছিলেন। সেই সময় দ্রুপদ রাজার পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণের শিরশ্ছেদ করেন।

মহাভারতের কৃপাচার্য

কৃপাচার্য , হিন্দু ধর্মগ্রন্থের এক চরিত্র। মহাকাব্য মহাভারত অনুসারে, তিনি কুরু রাজ্যের পরিষদ সদস্য এবং পাণ্ডব ও কৌরব রাজকুমারদের কুলগুরু ছিলেন।

 

যোদ্ধা-ঋষি শরদ্বানের বংশ থেকে জন্মগ্রহণকারী, কৃপ ও তার বোন কৃপীকে কুরু রাজ্যের রাজা শান্তনু দত্তক নিয়েছিলেন।[২][৩][১] কৃপ তার জন্মদাতা দ্বারা প্রশিক্ষিত হয়েছিল এবং তার মতো মহান তীরন্দাজ হয়েছিলেন।[৪] পরবর্তীতে মহাকাব্যে, তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন এবং যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া কৌরবদের কয়েকজনের অন্যতম।[১][৫]

 

মহাভারতে, কৃপ গৌতম (গৌতমের বংশধর), শারদ্বত (শরদ্বানের পুত্র), শারদ্বন (শরদ্বানের পুত্র) এবং ভরতাচার্য (ভরতের বংশধরদের শিক্ষক) সহ আরও অনেক নামে পরিচিত।

 

কৃপকে চিরঞ্জীবী (অমর ব্যক্তি যা কলিযুগের শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন) হিসাবে বিবেচনা করা হয়, কিছু গ্রন্থ অনুসারে, তিনি পরবর্তী মন্বন্তরে ( হিন্দু সৃষ্টিতত্ত্বের চক্রাকার সময়কাল ) সপ্তর্ষিদের একজন হয়ে উঠবেন।

 

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী জীবনকাল

 

কৃপ (উপরে বামে) শিখণ্ডির সাথে যুদ্ধরত।

পাণ্ডব এবং কৌরবদের মধ্যে সংঘটিত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৃপাচার্য, দুর্যোধনকে সমর্থন করেন এবং কৌরব পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করেন। মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে উল্লিখিত হয়েছে যে, কৌরবদের সেনাপতি পিতামহ ভীষ্ম, কৃপাচার্যকে মহারথী এবং মহাযোদ্ধা ঘোষণা করেন।[৪] কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৃপাচার্য পাণ্ডবপক্ষের বহু যোদ্ধার সাথে যুদ্ধ করেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বৃহক্ষেত্র, চেকিতান, সাত্যকি, সহদেব, অর্জুন, ভীম, ধৃষ্টকেতু প্রমুখ যোদ্ধা। এছাড়া, তিনি শিখণ্ডীকে পরাজিত করেন এবং অভিমন্যুর দেহরক্ষী সুকেতুকে ও কলিঙ্গ যুবরাজকে বধ করেন।

 

শল্য পর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, কৃপাচার্য, কর্ণকে পাণ্ডবদের সাথে শান্তিস্থাপন করার জন্য উপদেশ দেন, কিন্তু কর্ণ তা মেনে নেন নি। যুদ্ধের ১৮তম দিনে পাণ্ডবদের হাতে কৌরবপক্ষ পরাজিত হয় এবং গদাযুদ্ধে ভীমের হাতে দুর্যোধন নিহত হন। ঐদিন রাতে, পাণ্ডবগণ যখন শিবিরে ছিলেন না, তখন কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা মিলে ঘুমন্ত পাণ্ডবপুত্রদের ও অন্যান্য পাণ্ডবপক্ষের যোদ্ধাদের নৃশংসভাবে হত্যা করেন এবং পাণ্ডব শিবিরে অগ্নিসংযোগ করেন।

 

স্ত্রী পর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, কৃপাচার্য শত কৌরবের পিতা-মাতা ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী এর কাছে ফিরে আসেন এবং যুদ্ধের পরিসমাপ্তির কথা জানান। মহাভারতের আশ্রমবাসিক পর্বে উক্ত হয়েছে যে, ধৃতরাষ্ট্র বনবাসে যাওয়ার সময় কৃপাচার্যও তাদের সাথে বনবাসে যেতে চাইলেন। কিন্তু, ধৃতরাষ্ট্র তাকে বনবাসে যেতে নিষেধ করেন। তিনি হস্তিনাপুরের নতুন রাজা যুধিষ্ঠিরকে অনুরোধ করেন যে, কৃপাচার্যকে যুধিষ্ঠির যেন কুরুরাজ্যে রাখেন। পাণ্ডবগণ মহাপ্রস্থানে গমন করলে, 'কৃপাচার্য' পাণ্ডবদের উত্তরসূরী ও অর্জুনের পৌত্র পরীক্ষিতের গুরু হন। বিশ্বাস করা হয় যে, তার দায়িত্ব সম্পন্ন হওয়ার পর কৃপাচার্য তপস্যার করার জন্য বনে গমন করেন এবং সেখানে তার জীবনের শেষ সময় অতিবাহিত করেন।


শ্লোক: 3:
পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমূম্ ।
ব্যূঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা ॥৩॥


অনুবাদ : হে আচার্য ! পাণ্ডবদের মহান সৈন্যবল দর্শন করুন, যা আপনার অত্যন্ত বুদ্ধিমান শিষ্য দ্রুপদের পুত্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যূহের আকারে রচনা করেছেন।


দ্রপদ সম্পর্কে আমরা কিছুটা ধারনা আমরা দ্রৌপদির চরিত্র বিশ্লেষন করেছি । আসুন আমরা দ্রপদ পুত্র সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি । তিনি হলে ধৃষ্টদুম্ন ।

ধৃষ্টদ্যুম্ন


ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রুপদ কর্তৃক আয়োজিত একটি যজ্ঞ (অগ্নি-বলি) থেকে জন্মগ্রহণ করেন , যিনি তার শত্রু দ্রোণকে হত্যা করতে সক্ষম একটি পুত্র চেয়েছিলেন । পাণ্ডব রাজপুত্র অর্জুন - ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে - বিবাহে দ্রৌপদীর হাত জিতলে, ধৃষ্টদ্যুম্ন তার পরিচয় বুঝতে পেরেছিলেন । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে , ধৃষ্টদ্যুম্ন পাণ্ডবদের সাথে যোগ দেন এবং পাণ্ডব বাহিনীর সর্বোচ্চ সেনাপতি হন। যুদ্ধের পনেরতম দিনে, তিনি দ্রোণের শিরশ্ছেদ করেন, তার জন্মের মিশনটি পূরণ করেন।

জন্ম

ধৃষ্টদ্যুম্ন, দ্রৌপদীর সাথে, একটি " অয়োনিজা " হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা একটি মহিলার গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেনি। [  তাঁর জন্ম মহাকাব্যের আদি পর্বে বর্ণিত হয়েছে । কিংবদন্তি অনুসারে, দ্রুপদ একবার তার বাল্যবন্ধু দ্রোণকে তার দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে অপমান করেছিলেন এবং এটি তাদের মধ্যে ঘৃণার জন্ম দেয়। দ্রোণ তখন পাণ্ডব ভাইদের শিক্ষক হন এবং তারা দ্রুপদকে পরাজিত ও বন্দী করেন। যদিও তাদের অতীত বন্ধুত্বের কারণে দ্রোণ দ্রুপদের জীবন রক্ষা করেছিলেন, তিনি জোর করে পাঁচালের অর্ধেক নিয়েছিলেন । তার পরাজয়ের দ্বারা অপমানিত, দ্রুপদ প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যেহেতু তার সন্তান বা সহযোগীদের কেউই দ্রোণকে পরাজিত করার মতো শক্তিশালী ছিল না, তাই তিনি একটি শক্তিশালী পুত্র লাভের জন্য একটি যজ্ঞ (অগ্নি-বলি) করার সিদ্ধান্ত নেন।

দ্রুপদ ঋষি উপযজ ও যজকে প্রধান পুরোহিত নিযুক্ত করেন এবং যজ্ঞ পরিচালিত হয়। এটি সম্পন্ন হওয়ার

পর, ঋষিরা দ্রুপদ রাণীকে একটি পুত্র সন্তানের জন্য নৈবেদ্য ভক্ষণ করার নির্দেশ দেন। যাইহোক, রানী তার মুখে জাফরানের সুগন্ধি দিয়েছিলেন এবং তাদের স্নান করে মুখ ধোয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। অপেক্ষা করতে না পেরে ঋষিরা যজ্ঞবেদিতে নৈবেদ্য ঢেলে দেন, যার ফলে একটি যৌবনের উদ্ভব হয়। তিনি একটি অগ্নিবর্ণ ছিল, তার মাথায় একটি মুকুট এবং তার শরীরে বর্ম পরা ছিল এবং তার হাতে একটি তলোয়ার, একটি ধনুক এবং কিছু তীর ছিল। এরপর তিনি একটি রথে গেলেন এবং তাকে দেখে পাঁচালের লোকেরা আনন্দিত হল। [ তার জন্মের পরপরই, একটি ঐশ্বরিক কণ্ঠ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল:

দ্রোণ বিনাশের জন্যই এই রাজপুত্রের জন্ম হয়েছে। তিনি পাঞ্চালদের সমস্ত ভয় দূর করে তাদের খ্যাতি

ছড়িয়ে দেবেন। তিনি রাজার দুঃখও দূর করবেন।

এর পরেই অগ্নি থেকে এক সুন্দরী কন্যার আবির্ভাব ঘটে। ঋষিরা যুবকের নাম রাখেন ধৃষ্টদ্যুম্ন, এবং কন্যার

নাম রাখা হয় কৃষ্ণা, যা তার পৃষ্ঠপোষক নাম দ্রৌপদী দ্বারা বেশি পরিচিত ।


কিছুক্ষণ পর দ্রোণ ধৃষ্টদ্যুম্নের কথা শুনে তাঁকে তাঁর রাজ্যে আমন্ত্রণ জানান। যদিও দ্রোণ ধৃষ্টদ্যুম্নের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে জানতেন, তবুও তিনি আনন্দের সাথে তাকে ছাত্র হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাকে উন্নত সামরিক কলা শিখিয়েছিলেন। এটি তাকে খুব শক্তিশালী যোদ্ধা করে তুলেছিল, আকাশের অস্ত্র সম্পর্কে অত্যন্ত জ্ঞানী। ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণের তত্ত্বাবধানে মহারথী হয়েছিলেন।

দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর

ধৃষ্টদ্যুম্ন তার বোন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর আয়োজন করেছিলেন এবং এর নিয়মগুলি রাজা ও রাজকুমারদের বলেছিলেন।

যখন একজন যুবক ব্রাহ্মণ দ্রৌপদীকে সমস্ত রাজপুত্র এবং অভিজাতদের সামনে জিতেছিলেন, তখন ধৃষ্টদ্যুম্ন গোপনে ব্রাহ্মণ এবং তার বোনকে অনুসরণ করেছিলেন, শুধুমাত্র আবিষ্কার করতে যে ব্রাহ্মণ আসলে অর্জুন ছিলেন , পাঁচ পান্ডব ভাইয়ের একজন।

বিয়ে ও সন্তান

ধৃষ্টদ্যুম্নের একাধিক স্ত্রী ছিল। তার চার পুত্র ছিল- ক্ষত্রধর্মন,  ক্ষত্রবর্মণ, ক্ষত্রঞ্জয়,  এবং ধৃষ্টকেতু।  প্রথম তিনজন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দ্রোণের হাতে নিহতহন, যেখানে ধৃষ্টকেতু কর্ণের হাতে নিহত হন ।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ

কৌরবদের বিরুদ্ধে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ধৃষ্টদ্যুম্ন পাণ্ডব বাহিনীর সেনাপতি (সেনাপতি) নিযুক্ত হন । যুদ্ধের

শেষ পর্যন্ত তিনি তার অবস্থান বজায় রেখেছিলেন।

দ্রোণ হত্যা

যুদ্ধের ১৫তম দিনে দ্রোণ দ্রুপদকে হত্যা করেন। পাণ্ডবরা দ্রোণের একমাত্র দুর্বলতা, তার পুত্র

অশ্বত্থামাকে পুঁজি করার জন্য একটি চক্রান্ত করেছিল । পাণ্ডব ভীম অশ্বত্থামা নামে একটি হাতিকে বধ করেছিলেন। পাণ্ডবরা অশ্বত্থামার মৃত্যুর গুজব ছড়ায়। ভয়ঙ্কর সংবাদ শুনে, দ্রোণ অবিশ্বাসে জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের কাছে গেলেন, যিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে অশ্বত্থামাকে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু বিড়বিড় করলেন যে এটি অশ্বত্থামা নামের হাতি ছিল; তার উত্তরের শেষাংশ পাণ্ডব যোদ্ধাদের শঙ্খ দ্বারা আবৃত ছিল। পুত্রের মৃত্যু হয়েছে ভেবে দ্রোণ মর্মাহত ও হৃদয়বিদারক হলেন। তিনি অস্ত্র সমর্পণ করে বসেন। দ্রোণ ধ্যান করতে শুরু করলেন, এবং তার আত্মা অশ্বত্থামার আত্মার সন্ধানে তার দেহ ছেড়ে দিল। ধৃষ্টদ্যুম্ন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তার তলোয়ার নিয়ে দ্রোণের শিরচ্ছেদ করে তাকে হত্যা করেন।

মৃত্যু

যুদ্ধের 18 তম রাতে, অশ্বত্থামা রাতে পাণ্ডব শিবির আক্রমণ করেন এবং ধৃষ্টদ্যুম্নকে আহত করেন।

ধৃষ্টদ্যুম্ন একটি সম্মানজনক মৃত্যুর জন্য ভিক্ষা করে, হাতে তলোয়ার নিয়ে মারা যেতে বলে, অশ্বত্থামা তাকে উপেক্ষা করেন, শিরচ্ছেদ করার পরিবর্তে তাকে পিটিয়ে হত্যা করতে এগিয়ে যান, কিন্তু তার দেহ অদৃশ্য হয়ে যায়।


শ্লোক: 4:
অত্র শূরা মহেষ্বাসা ভীমার্জুনসমা যুধি ।
যুযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথঃ ॥৪॥

অনুবাদসেই সমস্ত সেনাদের মধ্যে অনেকে ভীম অর্জুনের মতো বীর ধনুর্ধারী রয়েছেন এবং যুযুধান, বিরাট দ্রুপদের মতো মহাযোদ্ধা রয়েছেন।

ভীম ও অর্জুন সম্পর্কে আমরা জেনেছি । এখানে আমরা  পেলাম যুযুধান ও বিরাট রাজা ।

বিরাটরাজ
ইনি মৎস্যদেশের রাজা ছিলেন বলে, মৎস্যরাজ নামে পরিচিত ছিলেন এঁর স্ত্রীর নাম ছিল সুদেষ্ণাভাইয়ের নাম ছিল শতানীক এবং শ্যালকের নাম ছিল কীচক সুদেষ্ণা গর্ভে তিন পুত্র এক কন্যা জন্মগ্রহণ করে পুত্রদের নাম ছিল- শঙ্খশ্বেত ভূমিঞ্জয় (উত্তর) এবং কন্যার নাম ছিল উত্তরা ইনি কুবেরের মত ধনী ছিলেন এঁর সম্পদের ভিতর উল্লেখযোগ্য ছিল তাঁর গবাদি পশু পাণ্ডবেরা অজ্ঞাতবাসের সময় এঁর রাজদরবারে ছদ্মনামে ছদ্মবেশে আশ্রয় নেন এই সময়ে পাণ্ডবরা যে ছদ্মনামে ছদ্মবেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যে সকল ছদ্মবেশে এবং ছদ্মনামে পাণ্ডবরা তাঁর দরবারে ছিলেন, তা হলো
                    যুধিষ্ঠির : ছদ্মনাম কঙ্কছদ্মবেশ- দ্যুতনিপুণ সভাসদ 
                    ভীম : ছদ্মনাম বল্লভছদ্মবেশ- পাচক
                    অর্জুন : ছদ্মনাম বৃহন্নলাছদ্মবেশ- বিরাটরাজ কন্যা উত্তরার সঙ্গীতশিক্ষক
                    নকুল : ছদ্মনাম তন্তিপালছদ্মবেশ- গোশালার অধ্যক্ষ
                    সহদেব : ছদ্মনাম গ্রন্থিকছদ্মবেশ- অশ্বশালার অধ্যক্ষ
                    দ্রৌপদী : ছদ্মনাম সৌরন্ধ্রীছদ্মবেশ- রানী সুদেষ্ণার পরিচারিকা

কীচক দ্রৌপদীকে কামনা করে ব্যর্থ হয়ে প্রকাশ্যে দ্রৌপদীকে অপমান করেন এর প্রতিশোধ হিসাবে ভীম তাঁকে হত্যা করেন একবার বিরাটরাজ তাঁর এই শ্যালক কীচকের সহায়তায় ত্রিগর্তরাজ সুশর্মাকে পরাজিত করে তাঁর রাজ্য অধিকার করেছিলেন রাজ্যভ্রষ্ট হয়ে সুশর্মা দুর্যোধনের আশ্রয় নেন কীচকের মৃত্যু সংবাদ পেয়েসুশর্মা দুর্যোধনের সৈন্যের সাহায্যে বিরাটরাজ্যের দক্ষিণাংশ আক্রমণ করেন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বিরাট সুশর্মা' হাতে পরাজিত বন্দী হন এরপর যুধিষ্ঠিরের আদেশে ভীম সুশর্মা' বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন যুদ্ধে ভীম সুশর্মাকে পরাজিত করে বন্দী করে নিয়ে আসেন এবং সেই সাথে বিরাটকে উদ্ধার করেন এই সময় দুর্যোধনকর্ণভীষ্মদ্রোণ প্রমুখের নেতৃত্বে বিরাটরাজ্যের উত্তরাংশ আক্রমণ করে সমস্ত গো-সম্পদ অধিকার করেন এই আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য বিরাটপুত্র উত্তরবৃহন্নলারূপী অর্জুনকে রথের সারথি করে যুদ্ধযাত্রা করেন কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল কৌরববাহিনী দেখে উত্তর পলায়নের চেষ্টা করলে- অর্জুন তাঁকে থামিয়ে উত্তরাকে সারথি বানিয়ে নিজেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হন অর্জুন এই যুদ্ধে কৌরববাহিনীকে পরাজিত করে গো-সম্পদ উদ্ধার করেন যুদ্ধজয়ের সংবাদ শুনে বিরাট তাঁর পুত্রের বিষয়ে অহঙ্কার প্রকাশ করলে- যুধিষ্ঠির বলেন যেসারথি বৃহন্নলা' (অর্জুন) জন্যই যুদ্ধজয় হয়েছে যুধিষ্ঠিরের এই কথা শুনে বিরাট অহঙ্কার করে বলেন যে- নপুংশক ভীষ্ম দ্রোণের মত বীরকে পরাজিত করতে পারে না এই সময় বিরাট তাঁর হাতের পাশ দ্বারা যুধিষ্ঠিরের মুখে আঘাত করে রক্তপাত ঘটান অর্জুন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে,- বিনাযুদ্ধে যুধিষ্ঠিরের কেউ রক্তপাত ঘটালে- তিনি তাঁকে হত্যা করবেন এই জন্য যুধিষ্ঠির এই ঘটনা অর্জুনের কাছ থেকে গোপন করেন পরে উত্তরের কাছে সকল বিষয় অবগত হয়ে বিরাট যুধিষ্ঠিরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন অজ্ঞাতবাসকালের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণেপাণ্ডবরা বিরাটের কাছে আত্মপ্রকাশ করেন বিরাট তাঁর কন্যা উত্তরার সাথে অর্জুনের বিবাহের প্রস্তাব দিলে- নিজ কন্যাস্থানীয়া বিবেচনা করে অর্জুন তাঁর পুত্র অভিমন্যুর সাথে উত্তরার বিবাহ দেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি পাণ্ডবদের পক্ষে যোগ দেন যুদ্ধের পঞ্চদশ দিনে ইনি দ্রোণাচার্যের হাতে নিহত হন

সাত্যকি বা যুযুধান (সংস্কৃতবেশি পরিচিত সাত্যকি নামে )

মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের একজন প্রধান বীর।যদু বংশীয় সত্যকের পুত্র শিনির পৌত্র।ওঁর জন্মদত্ত নাম ছিল যুযুধান। সাত্যকি অর্জুনের কাছে অস্ত্রশিক্ষা করেন।ভীষ্ম তাকে অধিরথ (শ্রেষ্ঠ শ্রেণীর যোদ্ধা) হিসেবে গণনা করেছিলেন। সাত্যকি ছিলেন কৃষ্ণের অনুগত। পাণ্ডব পক্ষে তিনি যোগ দেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সাত্যকি ভুরিশ্রবার সঙ্গে দ্বৈরথ যুদ্ধে বিপদগ্রস্থ হন। ভুরিশ্রবা যখন সাত্যকির শিরশ্ছেদ করবার জন্য অসি তুলেছেন,তখন অর্জুন ভুরিশ্রবার বাহু দ্বিখণ্ডিত করেন।

এই অন্যায় আচরণের জন্য ভুরিশ্রবা অর্জুনকে ভর্ৎসনা করে যখন যোগযুক্তহয়ে দেহত্যাগ করছেন, তখন সাত্যকি ভুরিশ্রবার শিরশ্ছেদ করেন। যুদ্ধে শাল্বরাজ সাত্যকির হাতে নিহত হন। ভুরিশ্রবার পিতা সোমদত্তকেও সাত্যকি বধ করেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পঁয়ত্রিশ বছর বাদে যখন যদুবংশীয় বীররা পানমত্ত হয়ে পরস্পরের সঙ্গে হানাহানি করছেন, তখন সাত্যকির সঙ্গেকৃতবর্মার বচসা শুরু হয়। নিদ্রিত পাণ্ডব পাঞ্চাল বীরদের হত্যাকাণ্ডে কৃতবর্মা অশ্বত্থামার সহকারী ছিলেন বলে সাত্যকি ওঁকে তিরস্কার করেন। কৃতবর্মা সাত্যকির অন্যায় ভাবে ভুরিশ্রবা-বধের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। বচসা চরমে উঠলে সাত্যকি অসি দিয়ে কৃতবর্মার শিরশ্ছেদ করেন। তাই দেখে ভোজ অন্ধকবংশীয়গণ সাত্যকিকে আক্রমণ করাতে কৃষ্ণ রুক্মিনীর পুত্র প্রদ্যুম্ন সাত্যকিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। শেষে দুজনেই নিহত হলেন।

শ্লোক: 5:
ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশিরাজশ্চ বীর্যবান্ ।
পুরুজিৎ কুন্তিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ ॥৫

অনুবাদসেখানে ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, কাশিরাজ, পুরুজিৎ, কুন্তিভোজ শৈব্যের মতো অত্যন্ত বলবান যোদ্ধারাও রয়েছেন।

ধৃষ্টকেতু :

চেদীর রাজা শিশুপালের এক পুত্র, যিনি পাণ্ডবদের সাথে বন্ধুত্ব করেছিলেন এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের জন্য তাদের একটি অক্ষৌহিনী সৈন্যবাহিনী সরবরাহ করেছিলেন। তিনি দ্রোণ কর্তৃক নিহত হন। যুদ্ধের পর তার বোন নকুলকে বিয়ে করেন। তাকে পৃথিবীতে অবতারিত স্বর্গীয় বিশ্বদেবদের একজন বলা হয় ।

চেকিতান:  মহাভারতের একটি চরিত্র ।  ইনি একজন যদু-বৃষ্ণিবংশীয় রাজা। ইনি বসুদেবের ভগিনী শ্রুতকীর্তি ও কেকয়রাজ ধৃষ্টকেতুর তৃতীয়পুত্র।তার অন্যান্য ভাইরা হলেন সন্তরদন,বৃদ্ধক্ষত্র, যুদ্ধমুষ্টি o সুমুষ্টিক। তার বোন ভদ্রা শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী।দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় চেকিতান উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি মহাভারত যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই পাণ্ডব সেনাবাহিনীর অন্যতম বীর ছিলেন। ইন্দ্রপ্রস্থে দানবরাজ ময় নির্মিত সভাস্থলে যুধিষ্ঠিরের প্রবেশের সময় যে সব নৃপতিগণ তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁদের মধ্যে চেকিতান একজন। চেকিতান রাজসূয় যজ্ঞ উপলক্ষ্যে যুধিষ্ঠিরকে একটি তূণীর উপহার দেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুধিষ্ঠির পাঞ্চাল রাজপুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নকে পাণ্ডবদের সেনাপতি নির্বাচন করেন। এরপর ধৃষ্টদ্যুম্ন পাণ্ডব পক্ষীয় যােদ্ধাদের মধ্যে কে কোন কৌরব যােদ্ধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন স্থির করে দেন। ধৃষ্টদ্যুম্নএ সময় চেকিতানকে সােমদত্তের পুত্র শলের সঙ্গে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন।

যুদ্ধের ১৮তম দিনে, দুর্যোধন তাঁকে বধ করেন।


কাশিরাজ হল মহাভারতে উল্লিখিত একটি নাম এবং মানুষ এবং স্থানের জন্য ব্যবহৃত অনেকগুলি সঠিক নামের মধ্যে একটিকে প্রতিনিধিত্ব করে। কাশীরাজ ছিলেন কাশীর রাজা এবং অম্বা, অম্বিকা এবং অম্বালিকার পিতা , যারা ভীষ্মের সৎ ভাই বিচিত্রবীর্যের সাথে বিবাহিত ছিলেন।

কুন্তী রাজ্য ছিল কুন্তি-ভোজের রাজ্যভোজ-যাদবদের মধ্যে অন্যতম প্রধান রাজা ।

কুন্তী , পাণ্ডবদের মা এবং কুরু রাজা পাণ্ডুর প্রথম স্ত্রী , ছিলেন কুন্তীভোজের দত্তক কন্যা। তার দেওয়া নাম ছিল পৃথা এবং তিনি বাসুদেব কৃষ্ণের পিতা বাসুদেবের বোন ছিলেন । কুন্তী রাজ্য অবন্তী রাজ্যের প্রতিবেশী ছিল ।এটি সম্ভবত অবন্তীর উত্তরে ছিল।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ

কুন্তীরা যুদ্ধে অসামান্য পরাক্রমের অধিকারী, প্রচন্ড শক্তি ও প্রবল পরাক্রমের অধিকারী, ভীষ্মের দ্বারা

তাদের সমস্ত আত্মীয় ও উপদেষ্টাদের সাথে যুদ্ধে নিহত হয়েছিল 

পুরুজিৎ

(পুরুজিত)। - একজন রাজা যিনি ছিলেন কুন্তীভোজের পুত্র এবং পাণ্ডবদের মা কুন্তীর ভাই । কুন্তিভোজ নামে তার এক ভাই ছিল। মহাযুদ্ধে তিনি কৌরব বাহিনীর দুর্মুখের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।

 শৈব্যঃ

শিবি (ওরফে সিবি, শিবি, সিভি) একটি রাজ্য হিসাবে এবং প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতে একজনসরাজার নাম হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে । শিবি নামে একজন রাজা ছিলেন যিনিশিবি নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন বা তাঁর নামে রাজ্যের নামকরণ করা যেতে পারে। শিবি (ওরফে সিবি, শৈব্য) রাজা তাঁর সত্যবাদিতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তার সত্যবাদিতা এবং সহানুভূতি সম্পর্কে কিংবদন্তিটি নিম্নরূপ: রাজা শিবি একটি ঘুঘুকে রক্ষা করেছিলেন যাকে একটি বাজপাখি তাড়া করেছিল (যা ঘুঘুটিকে দুপুরের খাবার হিসাবে খেতে চেয়েছিল), এবং বাজপাখির বিকল্প খাবার হিসাবে তার উরু থেকে মাংস দিয়েছিল। মহাভারতের যুদ্ধে শৈব্য পাণ্ডবদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন ।

শ্লোকঃ ৬

যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান্
সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ॥৬॥

অনুবাদসেখানে রয়েছেন অত্যন্ত বলবান যুধামন্যু, প্রবল পরাক্রমশালী উত্তমৌজা, সুভদ্রার পুত্র এবং দ্রৌপদীর পুত্রগণ। এই সব যোদ্ধারা সকলেই এক-একজন মহারথী।


এখানে আমরা পেলাম – যুধামন্য , উত্তমৌজা , সুভদ্রার পুত্র ও দ্রৌপদির পুত্র ।


উত্তমৌজ এবং যুধামন্যু

উত্তমৌজ এবং যুধামন্যু হল হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে বৈশিষ্ট্যযুক্ত পাঞ্চাল রাজ্যের দুই ভাই । মহাকাব্যের কিছু সংস্করণে, তারা পাঞ্চালরাজা দ্রুপদ এর পুত্র এবং এইভাবে দ্রৌপদীর ভাই । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় , তারা অর্জুনের দেহরক্ষী হয়ে দুর্যোধনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল ।

মহাভারতে উত্তমৌজএবং তার ভাই যুধামন্যুর নাম উল্লেখ আছে। তারা অশুমান এবং আর্যমান নামে আদিত্যদের অবতার।

একবার,উত্তমৌজ এবং তার ভাই যুধামন্যু যখন দুর্যোধন বিশজন মহান এবং গুরুত্বপূর্ণ সারথির (

মহারাথীদের ) একটি তালিকা দিচ্ছিলেন যারা পাণ্ডবদের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছিলেন মহাভারত অনুসারে , তারা ছিলেন রাজকীয় ভাই ও রাজকুমার। পাঁচালদের গোষ্ঠী । তৎকালীন দক্ষিণ পাঞ্চালের রাজার নাম ছিল দ্রুপদ । মহাভারতের বিভিন্ন স্থানে তাদের ভূমিকা ও কর্তব্যের উল্লেখ আছে। দুজনেই প্রথমে অর্জুনের দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন । যুধামন্যুকে অর্জুনের রথের বাম চাকার রক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল, এবং উত্তমৌজকে ডান চাকার রক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। পরে তাদের পিছন দিকে রথ রক্ষা করতে বলা হয়।

অর্জুনের সাথে সাক্ষাত করতে যাওয়ার পথে রাজা দুর্যোধন তাদের বাধা দেন এবং ভয়ানক যুদ্ধে লিপ্ত হন।


যুদ্ধ

চক্রব্যূহের সময় (একটি চাকার মতো গঠন), দুই পাঞ্চাল ভাই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে থাকা অর্জুনের

সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন এবং তাকে গুরুতর পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করতে চেয়েছিলেন। চক্রব্যূহকে ছিদ্র করতে না পারায় তারা কুরু সেনাকে বাইপাস করার চেষ্টা করে। দুর্যোধন তাদের পর্যবেক্ষণ করে যুদ্ধে নিয়োজিত করেন। ভাইয়েরা দুর্যোধনকে বিশটি তীর এবং তার ঘোড়া আরও চারটি নিয়ে আক্রমণ করেছিল। দুর্যোধন একটি তীর দিয়ে যুধামন্যুর মান, তার ধনুক আরেকটি তীর দিয়ে ভেঙে ফেলে এবং অবশেষে যুধামন্যুর সারথিকে একটি কীলকযুক্ত তীর দিয়ে ভেঙে ফেলে, অত্যাশ্চর্য কিন্তু তাকে হত্যা করেনি। উত্তমৌজ দুর্যোধনের সারথিকে সোনার অলঙ্কৃত তীর দিয়ে হত্যা করে। প্রতিশোধ হিসেবে দুর্যোধন উত্তমৌজের রথের চারটি ঘোড়াকে হত্যা করে এবং তার দুই সারথিকেও হত্যা করে। উত্তমৌজস তার এখন অকেজো রথ থেকে লাফ দিয়ে তার ভাইয়ের রথে উঠল। দুর্যোধন তার গদা (গদা) নিয়ে তাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে দেখে উভয় ভাই তাদের রথ থেকে লাফিয়ে উঠলেন এবং অর্জুনের সাথে দেখা করতে আরও দুটি রথে চলে গেলেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় , উত্তমৌজ শত্রু শিবিরের অনেক মহান যোদ্ধা যেমন দ্রোণ , অশ্বত্থামা , কৃতবর্মা , দুর্যোধন , কর্ণ এবং কৃপের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন ।

তারা পান্ডবদের সাথে ছিল যখন তারা একটি হ্রদে লুকিয়ে থাকা দুর্যোধনের সন্ধানে গিয়েছিল।আঠারো তারিখে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মধ্যরাতে অশ্বত্থামা পাণ্ডব শিবিরে ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে । যুধিষ্ঠির উভয় শিবিরের মৃত যোদ্ধাদের সাথে তাদের দাহ করেন।

কৃতবর্মনের সাথে ভয়ানক সংঘর্ষ: কৃতবর্মণ এবং দুই পাঞ্চাল ভাইয়ের মধ্যে একটি মহান যুদ্ধ সংঘটিত

হয়েছিল যখন তারা অর্জুনের রথকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছিল যাতে তার রথের চাকা রক্ষা করা যায়। এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল যখন অর্জুন কম্ভোজা বিভাগকে ছিদ্র করার চেষ্টা করেছিলেন, যা তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সিন্ধু রাজ্যের রাজা জয়দ্রথের দিকে তার অগ্রগতি। মধ্যাহ্ন সূর্যের মত ক্রোধে জ্বলন্ত অর্জুন কৃতবর্মণকে থামিয়ে কাম্ভোজা বিভাগে প্রবেশ করলেন। কৃতবর্মণ অর্জুনের অগ্রগতি রোধ করতে সক্ষম হননি। কিন্তু তিনি তার দুই রক্ষক উত্তমৌজস এবং যুধামন্যুর পথে দাঁড়িয়েছিলেন যারা অর্জুনকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও কৃতবর্মার প্রতি শ্রদ্ধার বশবর্তী হয়ে অর্জুন বৃদ্ধ লোকটিকে হত্যা করেননি, তবে দুই ভাইয়ের মধ্যে সেরকম কোনো অনুযোগ ছিল না। কৃতবর্মা দুই ভাইকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। তিনি দুই পাঞ্চাল রাজকুমারের মুখোমুখি হন যখন তারা অর্জুনের রথ অনুসরণ করতে অগ্রসর হয়, তার রথের চাকা দুপাশে রক্ষা করতে। কিন্তু ভোজদের শাসক কৃতবর্মা তাদের উভয়কে তীক্ষ্ণ তীর দিয়ে বিদ্ধ করে যথাক্রমে তিনটি এবং চারটি তীর দিয়ে আঘাত করেন। বিনিময়ে এই দুই রাজপুত্র তাকে দশটি করে তীর বিদ্ধ করে। আবার প্রত্যেকে তিনটি করে তীর পাঠাল। উত্তমৌজ তিনটি তীর নিক্ষেপ করে কৃতবর্মার মান ও ধনুক কেটে ফেলে। তখন হৃদিকার পুত্র কৃতবর্মা আরেকটি ধনুক তুলে নিয়ে ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে এই উভয় যোদ্ধাকে তাদের ধনুক থেকে বঞ্চিত করে এবং তীর বৃষ্টি দিয়ে ঢেকে দেন। তারপর দুই যোদ্ধা দুটি নতুন ধনুক তুলে নিয়ে কৃতবর্মনকে বিদ্ধ করতে লাগলেন। কিন্তু এই দুই রাজকুমারকে সফলভাবে কৃতবর্মণ দ্বারা প্রতিহত করা হয়েছিল এবং তাই তারা অর্জুনের সাথে ধরার জন্য কাম্ভোজা বিভাগে কোন ভর্তি হতে পারেনি, যদিও পুরুষদের মধ্যে এই দুটি ষাঁড় প্রবলভাবে লড়াই করেছিল।


সুভদ্রা পুত্র অভিমন্যু

অভিমন্যু মহাভারত মহাকাব্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য চরিত্র ও অর্জুন-সুভদ্রার পুত্র, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের

ভাগিনেয় এবং মৎস্য রাজকন্যা উত্তরার স্বামী। শৌর্যে বীর্যে তিনি তার পিতা অর্জুন ও পিতামহ ইন্দ্রের সমতুল্য। অভিমন্যু নামের অভি অর্থ অত্যধিক; আর মন্যু অর্থ ক্রোধ। তাই অভিমন্যু নামের অর্থ দাড়ায় ক্রোধিত পুরুষ। যুদ্ধ ক্ষেত্রে অভিমন্যু তার পিতা অর্জুন ও মাতুল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সমান। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিবসে মাত্র ষোলো বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার একমাত্র সন্তান পরীক্ষিৎ তার মৃত্যুর পর জন্মগ্রহণ করেন।

জন্ম,

শিক্ষা ও বিবাহ

অর্জুনেরনবারো বছরের ব্রহ্মচর্য ও বনবাস সম্পূর্ণ হওয়ার পর অভিমন্যুর জন্ম হয়। মাতার গর্ভেথাকতেই তার শিক্ষা শুরু হয়েছিল। গর্ভাবস্থায় সুভদ্রা অর্জুনের নিকট চক্রব্যূহে প্রবেশের প্রণালী শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ায় অভিমন্যু কেবল চক্রব্যূহে প্রবেশ করতে জানতেন,বাহির হতে জানতেন না।

পান্ডবগণের বনবাস ও অজ্ঞাতবাসের কারণে অভিমন্যু তার বাল্যকাল দ্বারকায় মাতুলালয়ে অতিবাহিত করেন।সেখানে কৃষ্ণ ও বলরামের অভিভাবকত্বে তিনি কৃষ্ণপুত্র প্রদ্যুম্ন এবং যাদববীর কৃতবর্মাও সাত্যকীর নিকট অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করেন।

ঘটোৎকচের সহায়তায় তিনি বলরাম ও রেবতীর কন্যা শশীরেখা বা সুরেখা বা বৎসলাকে বিয়ে করেন। তাদের

প্রথমে রেণুকা ও সত্যপ্রিয়া নামে দুটি যমজ, পরে আরো একটি কন্যা অভিলাশার জন্ম হয়।এছাড়াও শ্রীকৃষ্ণ ও দেবী প্রতিবির কন্যা সিতিসুন্দরীর গর্ভে জৈত্র, ভুরিবল ও রবি নামে তিনটি যমজ পুত্রের জন্ম হয়।


অজ্ঞাতবাসকালে পঞ্চপান্ডব ও দ্রৌপদী মৎস্যরাজ বিরাটের নিকট ছদ্মবেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তেরো বৎসর সম্পূর্ণ হওয়ার পর তারা আত্মপ্রকাশ করলে বিরাট স্বীয় কন্যা উত্তরার সঙ্গে অর্জুনের বিবাহের প্রস্তাব দেয়। তখন অর্জুন জানায় উত্তরা তাকে আচার্যের ন্যায় শ্রদ্ধা করে। তাই তিনি উত্তরাকে পুত্রবধূ রূপে গ্রহণ করবেন। তার পুত্র অভিমন্যুই মৎস্যরাজের জামাতা হওয়ার উপযুক্ত। এরপর উপপ্লব্য নগরীতে অভিমন্যু ও উত্তরার বিবাহ সম্পন্ন হয়। এদের পুত্র পরীক্ষীত।


কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অভিমন্যু বধ

মহাভারতের যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে কৌরব সেনাপতি দ্রোণাচার্য একটি চক্রব্যূহ রচনা করেন। এই ব্যুহভেদের কৌশল মাত্র চার জনের জানা ছিল। তারা হলেন- কৃষ্ণ, প্রদ্যুম্ন,অর্জুন আর অভিমুন্য।

এইসময়ে চক্রব্যূহ ভেদ করার জন্য পান্ডব শিবিরে অভিমন্যু ব্যতীত আর কেউ উপস্থিত না থাকায় যুধিষ্ঠির তার ওপর এই গুরুভার অর্পণ করেন। এরপর অভিমন্যু যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং চক্রব্যূহ ভেদ করে কৌরব সেনা মধ্যে উপস্থিত হন। তার শরবর্ষণে মদ্ররাজ শল্য ও দুঃশাসন মূর্ছিত হন। কর্ণের এক ভাই ও শল্যের ভ্রাতা নিহত হয় এবং শল্য রণভূমি থেকে পলায়ণ করেন। এইসময় যুধিষ্ঠির, ভীম, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখন্ডী, সাত্যকী, বিরাট ও দ্রুপদ ব্যূহে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে ধৃতরাষ্ট্রের জামাতা সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ শিবের বরে তাদের পরাস্ত করেন ও ব্যূহের প্রবেশ পথ রুদ্ধ করে্ন। কুরুসৈন্য বেষ্টিত অভিমন্যু একাকী যুদ্ধ করতে থাকেন। কৌরবসৈন্য ছত্রভঙ্গ হয় এবং যোদ্ধারা পালাতে থাকে। শল্যপুত্র রুক্মরথ, দুর্যোধনের পুত্র লক্ষণ ও কোশলরাজ বৃহদবল তার বাণে হত হন।


অভিমন্যুকে অপ্রতিরোধ্য দেখে কর্ণ দ্রোণের উপদেশে তাকে পিছন থেকে আক্রমণ করে তাকে রথচ্যূত ও ধনুর্হীন করেন এবং দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, দুর্যোধন ও শকুনি নিষ্করুণ ভাবে তার ওপর শরাঘাত করতে থাকেন। অভিমন্যু খড়গ, চক্র, গদা এমনকি রথের চাকা দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এইসময় দুঃশাসনের পুত্র তার মাথায় গদাঘাত করে। ফলে কৌরবসেনা নিপীড়িত বালক অভিমন্যুর প্রাণশূন্য দেহ ভূপাতিত হয়।অভিমুন্যের বধের জন্য দ্রোণ, দ্রৌণি, কৃপ, কর্ণ, শল্য, কৃতবর্মা, শকুনি, বৃহদ্বল, ভূরি, ভুরিশ্রবা, শল, পৌরব আর বৃষসেনকে দায়ি করা হয়।

উত্তরা

( সংস্কৃত : उत्तरा , রোমানাইজড :  উত্তরা ) ছিলেন মৎস্যের রাজকন্যা , যেমনটি হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে বর্ণিত হয়েছে । তিনি ছিলেন রাজা বিরাট এবং রানী সুদেষ্ণার কন্যা , যার দরবারে পান্ডবরা তাদের নির্বাসনে এক বছর গোপনে কাটিয়েছিলেন। এই সময়কালে, তিনি তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের কাছ থেকে সঙ্গীত এবং নৃত্য শিখেছিলেন এবং পরে তার পুত্র অভিমন্যুকে বিয়ে করেছিলেন । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় অল্প বয়সে উত্তরা বিধবা হয়েছিলেন । যুদ্ধে পান্ডবদের বিজয়ের পর, তিনি এবং তার অজাত পুত্র অশ্বত্থামা দ্বারা আক্রান্ত হন এবং কৃষ্ণের ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপে রক্ষা পান । তার পুত্র পরীক্ষিত কুরু বংশকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং মহাভারত এবং ভাগবত পুরাণ উভয়েই পালিত একজন সুপরিচিত রাজা হয়েছিলেন ।

উত্তরা

সংস্কৃত নাম Uttarā একটি মেয়েলি সমাপ্তি ā যোগ করে উত্তরা শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এর একাধিক অর্থ থাকতে পারে; ব্রিটিশ ইন্ডোলজিস্ট মনিয়ার উইলিয়ামসের মতে , এই প্রসঙ্গে,এর অর্থ 'উপর,' 'উচ্চতর,' 'উন্নত,' বা 'উৎকৃষ্ট'। শব্দটি 'উত্তর দিক', সেইসাথে 'একটি উত্তর' বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়। নামের পুরুষ রূপটি মহাভারতে তার বড় ভাইয়ের নাম হিসাবেও দেখা যায় ।

সাহিত্যিক পটভূমি

উত্তরা হল মহাভারতের একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র , ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃত মহাকাব্যগুলির

মধ্যে একটি । কাজটি ধ্রুপদী সংস্কৃতে রচিত এবং এটি বহু শতাব্দী ধরে সংশোধন, সম্পাদনা এবং ইন্টারপোলেশনের একটি যৌগিক কাজ। পাঠ্যটির টিকে থাকা সংস্করণের প্রাচীনতম অংশগুলি 400 খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি হতে পারে।


মহাভারতের পাণ্ডুলিপিগুলি অসংখ্য সংস্করণে বিদ্যমান, যেখানে প্রধান চরিত্র এবং পর্বগুলির সুনির্দিষ্ট এবং বিবরণগুলি প্রায়শই উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয় । ভগবদ্গীতা সম্বলিত বিভাগগুলি ব্যতীত যা অসংখ্য পাণ্ডুলিপির মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, মহাকাব্যের বাকি অংশগুলি অনেক সংস্করণে বিদ্যমান। উত্তর এবং দক্ষিণের পুনরাবর্তনগুলির মধ্যে পার্থক্যগুলি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, দক্ষিণী পাণ্ডুলিপিগুলি আরও বিস্তৃত এবং দীর্ঘ। "বোম্বে" সংস্করণ, "পুনা" সংস্করণ, "কলকাতা" সংস্করণ এবং পাণ্ডুলিপিগুলির "দক্ষিণ ভারতীয়" সংস্করণগুলির উপর নির্ভর করে পণ্ডিতরা একটি সমালোচনামূলক সংস্করণ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন । ভান্ডারকার ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিষ্ণু সুকথাঙ্করের নেতৃত্বে পণ্ডিতদের দ্বারা তৈরি করা সবচেয়ে স্বীকৃত সংস্করণ, কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় , কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ।

উত্তরা পরবর্তী লিখিত কিছু পুরাণ শাস্ত্রেও আবির্ভূত হয়েছে , যার মধ্যে সবচেয়ে বিশিষ্ট হল

কৃষ্ণ-সম্পর্কিত ভাগবত পুরাণ ।


জীবনী

মহাভারত অনুসারে , উত্তরার জন্ম হয়েছিল মৎস্য রাজ্যের রাজা বিরাট এবং তার সহধর্মিণী সুদেষ্ণার , কেকায়ার রাজা সুতার কন্যা । তার দুই বড় ভাই- উত্তরা ও শঙ্খ- এবং দেড় ভাই শ্বেতা ছিল।

মহাকাব্যের চতুর্থ বই বিরাট পর্বে উত্তরাকে মূল আখ্যানের মধ্যে প্রবর্তন করা হয়েছে , যা পাঁচ

পাণ্ডব ভাই এবং তাদের সাধারণ স্ত্রী দ্রৌপদীর নির্বাসনের শেষ বছর সম্পর্কে বর্ণনা করে , যা তাদের অজ্ঞাতসারে কাটাতে হয়েছিল। তারা মৎস্যে একত্রে থাকতেন এবং বিরাটের দরবারে নানা ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন বৃহন্নলা নামে একজন নপুংসক হিসেবে বসবাস করতেন এবং উত্তরার গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন, তাকে নৃত্য, যন্ত্র ও কণ্ঠসংগীতের দক্ষতা শেখাতেন যা তিনি স্বর্গের অপ্সরাদের কাছ থেকে শিখেছিলেন । উত্তরাকে অর্জুন অসাধারণ প্রতিভাবান বলে প্রশংসা করেছেন। তাদের নির্বাসন শেষ হওয়ার পর, পাণ্ডবরা তাদের আসল পরিচয় বিরাটের কাছে প্রকাশ করেছিলেন। বিরাট অবিলম্বে উত্তরার হাতে অর্জুনের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এই যুক্তিতে যে একজন ছাত্রের সাথে একজন শিক্ষকের সম্পর্ক একটি সন্তানের সাথে পিতামাতার মতো। পরিবর্তে, অর্জুন পরামর্শ দিয়েছিলেন যে উত্তরা তার পুত্র অভিমন্যুকে বিয়ে করে তার পুত্রবধূ হন । উভয় পক্ষের অনুমোদনে, উত্তরা এবং অভিমন্যুর বিবাহ অনুষ্ঠান উপপ্লব্য শহরে তাদের আত্মীয়স্বজন এবং সহযোগীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উপপ্লব্যে বসবাসের সময়, পাণ্ডবদের কাছে একজন দরিদ্র ব্রাহ্মণ এসেছিলেন, যিনি উত্তরাকে দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে কুরু রাজবংশের অবসান হলে তিনি একটি পুত্রের জন্ম দেবেন এবং সেই কারণে তাকে পরীক্ষিত বলা হবে 'যাকে পরীক্ষা করা হয়েছে')।"

মহাভারতেরপরবর্তী কয়েকটি পর্বে (বই) পাণ্ডব এবং তাদের কাকাতো ভাই কৌরবদের মধ্যে সংঘটিত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে , যেখানে মৎস্য পাণ্ডবদের সঙ্গে মিত্রতা করেছিলেন। যুদ্ধের

সময় উত্তরা তার পিতা, ভাই এবং সমগ্র মৎস্য বাহিনীকে হারিয়েছিল। তিনি খুব অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিলেন যখন অভিমন্যু, নিজের মাত্র ষোল বছর বয়সী, যুদ্ধে নিহত হন। স্বামীর মৃতদেহ দেখে শোকে আচ্ছন্ন হয়ে, তিনি তার কাকা-শ্বশুর এবং দৈব অবতার কৃষ্ণের দ্বারা সান্ত্বনা পেয়েছিলেন । তার স্বামীর মৃতদেহ দেখে তার দুঃখ ও বিলাপ আবার কৌরবদের মা গান্ধারী দ্বারা স্ত্রীপর্বতে চিত্রিত হয়েছে ।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সমাপ্তির পর, যা পাণ্ডবদের বিজয়ে শেষ হয়েছিল, অশ্বত্থামা — দ্রোণাচার্যের

পুত্র , যিনি কৌরব বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন — অবশিষ্ট পাণ্ডব সেনাদের হত্যা করে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এই ঘটনাটি সৌপ্তিক পর্বে বর্ণনা করা হয়েছে । অশ্বত্থামা অর্জুনের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং প্রচলিত উপায়ে অর্জুনকে পরাজিত করতে তার অক্ষমতার বিষয়ে সচেতন, অশ্বত্থামা ব্রহ্মশিরা নামে পরিচিত শক্তিশালী ঐশ্বরিক অস্ত্রের আবাহন করেছিলেন । এর জবাবে অর্জুনও ব্রহ্মশিরাকে মুক্ত করার জন্য প্রস্তুত হলেন। নারদ এবং ব্যাস , হিন্দু পুরাণের শ্রদ্ধেয় ঋষি, হস্তক্ষেপ করেন এবং উভয় যোদ্ধাকে তাদের স্বর্গীয় অস্ত্র প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেন। অর্জুন তাদের নির্দেশ মেনে চলেন এবং তিনি যে ব্রহ্মশিরা খুলেছিলেন তা প্রত্যাহার করে নেন। যাইহোক, অশ্বত্থামার অস্ত্রের উপর প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ব্রহ্মশিরাকে একবার প্রত্যাহার করার ক্ষমতার অভাব ছিল। প্রতিশোধের জন্য গ্রাসকারী আকাঙ্ক্ষা দ্বারা চালিত, অশ্বত্থামা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তিনি যদি পাণ্ডবদের ধ্বংস করতে না পারেন তবে তিনি তাদের বংশকে শেষ করে দেবেন। একটি জঘন্য কাজে, তিনি ব্রহ্মশিরাকে উত্তরার গর্ভের দিকে নিয়ে যান, যা শেষ পর্যন্ত অনাগত সন্তানের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। যাইহোক, কৃষ্ণ আশ্বস্ত করেছিলেন যে শিশুটিকে রক্ষা করা হবে এবং একজন যোদ্ধার একটি অনাগত সন্তানের উপর অস্ত্র ঘুরিয়ে দেওয়ার চিন্তায় ক্রোধে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তিনি অশ্বত্থামাকে সহস্রাব্দ বেঁচে থাকার অভিশাপ দিয়েছিলেন, সম্পূর্ণ একা এবং রোগের বোঝা, তার নিজের পুঁজের দুর্গন্ধে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল । অশ্বমেধিকা পর্ব পরীক্ষিতের জন্ম সম্পর্কে প্রমাণ করে। উত্তরা প্রসবের সময়, শিশুটি মৃত জন্মগ্রহণ করে; তিনি অন্যান্য রাজকীয় মহিলাদের দ্বারা সান্ত্বনা পেয়েছিলেন। যখন কৃষ্ণ তার সাথে দেখা করতে এলেন, তখন তিনি তাকে কাঁদলেন এবং তার সন্তানকে বাঁচানোর জন্য তার আগের আশ্বাসের কথা মনে করিয়ে দিলেন। তার ঐশ্বরিক ক্ষমতা ব্যবহার করে, কৃষ্ণ মৃত শিশুটিকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন, এবং শিশুটির নাম রাখা হয়েছিল পরীক্ষিত , যার অর্থ 'যাকে পরীক্ষা করা হয়েছে'।

মহাভারতে উত্তরার শেষ আবির্ভাব হয় আশ্রমবাসিক পর্বে । যুদ্ধের পনেরো বছর পর, কুরু অগ্রজ ধৃতরাষ্ট্র

, গান্ধারী , কুন্তী এবং বিদুর বনে চলে যান। উত্তরা, রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে, রাজধানী শহরে ফিরে আসার আগে তাদের সাথে কিছু দূরত্বের জন্য সঙ্গী হয়েছিল। 1মহাকাব্যের শেষে, যখন পাণ্ডবরা অবশেষে পৃথিবী ত্যাগ করেন, তখন উত্তরার শাশুড়ি, সুভদ্রা , যুবক পরীক্ষিতের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব পান, যিনি হস্তিনাপুরের নতুন রাজা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন । উত্তরা হয়তো তার অবশিষ্ট জীবন রাণী-মা হিসেবেই কাটিয়েছেন।

উত্তরাধিকার


কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের জন্য অভিমন্যুর প্রস্থানের আগে উত্তরার আবেদনগুলি 20 শতকের প্রথম দিকে প্রিন্টের জন্য একটি সাধারণ বিষয় ছিল।

উত্তরা হিন্দুধর্মের কৃষ্ণ-কেন্দ্রিক সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব । পুরাণ শাস্ত্র অনুসারে , কৃষ্ণের মৃত্যুর কয়েক বছর পরে, ঋষি ব্যাসের পুত্র শুক দ্বারা তাঁর পুত্র পরীক্ষিতকে তাঁর জীবনী বর্ণনা করা হয়েছিল, যা তখন ভাগবত পুরাণ হিসাবে সংকলিত হয়েছিল । কৃষ্ণের উত্তরার পুত্রকে রক্ষা করার পর্বটিও এই শাস্ত্রগুলিতে বর্ণিত হয়েছে, তবে মহাভারতে দেওয়া বিবরণ থেকে ভিন্ন । এটি অনুসারে, অশ্বত্থামার অস্ত্রটি উত্তরায় আঘাত করার পরে, তিনি গর্ভপাতের ভয়ে কৃষ্ণের কাছে ছুটে যান। কৃষ্ণ আত্মারূপে তার গর্ভে প্রবেশ করেছিলেন এবং পরীক্ষিতকে রক্ষা করেছিলেন, যার কারণে তাকে বিষ্ণুরতাও বলা হয়েছিল।


কৃষ্ণের মূর্তিতত্ত্বের বিবরণ জনপ্রিয়ভাবে উত্তরায় দায়ী। ব্রজ ও রাজস্থান অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় আখ্যান অনুসারে , বজ্রনাভ — কৃষ্ণের প্রপৌত্র — দ্বারকার সিংহাসনে বসার পর কৃষ্ণের প্রকাশ্য রূপ দেখতে চেয়েছিলেন। তবে তাকে গাইড করার মতো কোনো মডেল ছিল না। বজ্রনাভ জীবিত সাক্ষীদের সন্ধান করেছিলেন: উত্তরা, যিনি এখন হস্তিনাপুরের বয়স্ক রাণী-মা ছিলেন এবং কৃষ্ণের বন্ধু উদ্ধব । উত্তরা একটি প্রাণবন্ত বিশদ বিবরণ প্রদান করেছে, কিন্তু ভাস্কররা সন্তোষজনকভাবে কৃষ্ণের প্রতিলিপি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা এই প্রত্যক্ষদর্শীদের সাহায্যের জন্য তালিকাভুক্ত করেছিল এবং ঐশ্বরিক প্রকাশের জন্য প্রার্থনা করেছিল, যার ফলে একটি ত্রয়ী হিসাবে উপস্থিত হয়েছিল: গোবিন্দ দেব , গোপীনাথ এবং মদন মোহন । যাইহোক, চিত্রের কোনোটিই কৃষ্ণের রূপকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করেনি, প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট কিছু দিক থেকে সফল হয়েছে এবং অন্যের দিক থেকে ছোট হয়েছে। তাদের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও, এই ছবিগুলির প্রত্যেকটি এখন থেকে তার নিজস্বভাবে উপাসনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হয়ে উঠবে, যদিও, মধ্যযুগীয় সময়কালে তাদের পুনঃআবিষ্কারের আগে তারা দীর্ঘ সময়ের জন্য অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করা হয়। পৌরাণিক কাহিনীবিদ দেবদত্ত পট্টনায়কের মতে , গল্পের একটি ভিন্নতা কৃষ্ণের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মূর্তিগুলিকে যুক্ত করে - যেগুলি উত্তরার বর্ণনার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। দ্রষ্টব্যঃ এই আইকনগুলি ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং হিন্দুধর্মের ভাগবত সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে । ইতিহাসবিদরা এই আখ্যানটিকে অভিজ্ঞতামূলক প্রমাণের পরিবর্তে বিশ্বাসের মূলে একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণ হিসাবে দেখেন।


দ্রৌপদী পুত্রঃ

মহাভারতে দ্রৌপদী অন্যতমা। তাঁর পাঁচজন পুত্র তাদের নাম যথাক্রমে-

১.প্রতিবিন্ধ্য

২.সুতসোম

৩.শ্রুতকর্মা

৪.শতানীক

৫.শ্রুতসেন।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে গুরু দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা কর্তৃক ঘুমন্ত অবস্থায় নির্মম ভাবে তারা নিহত

হন।

শ্লোক: 7:
অস্মাকন্ত্ত বিশিষ্টা যে তান্নিবোধ দ্বিজোত্তম ।
নায়কা মম সৈন্যস্য সংজ্ঞার্থং তান্ ব্রবীমি তে ॥৭॥


অনুবাদ : হে দ্বিজোত্তম ! আমাদের পক্ষে যে সমস্ত বিশিষ্ট সেনাপতি সামরিক শক্তি পরিচালনার জন্য রয়েছেন, আপনার অবগতির জন্য আমি তাঁদের সম্বন্ধে বলছি।


শ্লোক: 8: 

ভবান্ ভীষ্মশ্চ কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিতিঞ্জয়ঃ । 

অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তিস্তথৈব চ ॥৮॥ 

 ভবান্, ভীষ্মঃ, চ, কর্ণঃ, চ, কৃপঃ, চ, সমিতিঞ্জয়ঃ, অশ্বত্থামা, বিকর্ণঃ, চ, সৌমদত্তিঃ, তথা, এব, চ ॥৮॥

অনুবাদ : সেখানে রয়েছেন আপনার মতোই ব্যক্তিত্বশালী-ভীষ্ম, কর্ণ, কৃপা, অশ্বত্থামা , বিকর্ণ ও সোমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবা, যাঁরা সর্বদা সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে থাকেন।

ভীষ্ম , কর্ণ সম্পর্কে আমরা পূর্বেই জেনেছি । এখন আমাদের জানতে হবে কে কৃপা , অশ্বত্থামা , বিকর্ণ ও সোমদত্ত , ভুরিশ্রবা ?

মহাভারত অনুসারে, অশ্বত্থামা মানে "পবিত্র কণ্ঠ যা ঘোড়ার সাথে সম্পর্কিত"।  তাকে এমন নামকরণ করা হয়েছে কারণ এটি বিশ্বাস করা হয় যে যখন তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তিনি একটি ঘোড়ার মতো চিৎকার করেছিলেন।

তার আরও কিছু নাম হল:

দ্রোণপুত্র (द्रोणपुत्र) - দ্রোণাচার্যের পুত্র

গুরুপুত্র(गुरुपुत्र) - গুরু দ্রোণের পুত্রকৃপিকুমার

(কৃপিকুমার)- কৃপির পুত্র

আচার্যপুত্র (आचार्यपुत्र) - আচার্যের পুত্র (দ্রোণাচার্য)

অশ্বত্থামা ছিলেন দ্রোণ ও কৃপির পুত্র । তিনি একটি বনের গুহায় জন্মগ্রহণ করেন (বর্তমানে তপকেশ্বর মহাদেব মন্দির, দেরাদুন , উত্তরাখণ্ডে )। দ্রোণ শিবকে সন্তুষ্ট করার জন্য বহু বছর ধরে কঠোর তপস্যা করেছিলেন যাতে শিবের মতো বীরত্বের অধিকারী পুত্র লাভ করেন।

তিনি তার কপালে একটি ঐশ্বরিক রত্ন নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যা তাকে মানুষের চেয়ে নীচের সমস্ত জীবের উপর ক্ষমতা দিয়েছে; এটি তাকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি, বার্ধক্য, রোগ, অস্ত্র এবং দেবতাদের থেকেও রক্ষা করেছিল। মণি তাকে প্রায় অজেয় এবং অমর করে তুলেছিল। যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হলেও দ্রোণ সামান্য অর্থ বা সম্পত্তি নিয়ে সরল জীবনযাপন করতেন। ফলস্বরূপ, অশ্বত্থামার একটি কঠিন শৈশব ছিল, তার পরিবার এমনকি দুধের খরচ বহন করতে সক্ষম ছিল না। তার পরিবারের জন্য একটি উন্নত জীবন প্রদান করতে চান, দ্রোণ তার প্রাক্তন সহপাঠী এবং বন্ধু, দ্রুপদ থেকে সাহায্য চাইতে পাঞ্চাল রাজ্যে গিয়েছিলেন , যিনি দ্রোণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি যখন রাজা হবেন, তখন তিনি তার রাজ্যের অর্ধেক তার সাথে ভাগ করে নেবেন। যাইহোক, দ্রুপদ বন্ধুত্বকে তিরস্কার করেছিলেন, দাবি করেছিলেন যে একজন রাজা এবং একজন ভিক্ষুক বন্ধু হতে পারে না, দ্রোণকে অপমান করে।

এই ঘটনার পর এবং দ্রোণের দুর্দশা দেখে কৃপা দ্রোণকে হস্তিনাপুরে আমন্ত্রণ জানান । এইভাবে, দ্রোণ পাণ্ডব এবং কৌরব উভয়েরই গুরু হয়েছিলেন । তাদের সাথে অশ্বত্থামাকেও যুদ্ধশিল্পে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। অশ্বত্থামা যুদ্ধবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন, বিভিন্ন গোপনীয়তা এবং ঐশ্বরিক অস্ত্র শিখেছিলেন।

 

রাজকুমারদের সাথে থাকাকালীন, দুর্যোধন ঘোড়ার প্রতি অশ্বত্থামার অনুরাগ দেখেছিলেন এবং তাকে একটি ভাল জাতের ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন। বিনিময়ে, দুর্যোধন হস্তিনাপুরের প্রতি দ্রোণের কর্তব্য-নির্ভর আনুগত্য ছাড়াও নিজের প্রতি এবং বর্ধিতভাবে, কৌরবদের প্রতি অশ্বত্থামার ব্যক্তিগত আনুগত্য লাভ করেন ।

 

যখন দ্রোণ তাঁর শিষ্যদেরকে তাঁর দক্ষিণা দিতে বলেছিলেন ; দ্রুপদকে বন্দী করার অনুরোধ করে , কৌরবরা ব্যর্থ হলে, পাণ্ডবরা দ্রুপদকে পরাজিত করে দ্রোণের সামনে হাজির করে। দ্রোণ দ্রুপদ রাজ্যের উত্তর অর্ধেক নিয়েছিলেন এবং অশ্বত্থামাকে রাজা হিসাবে মুকুট পরিয়েছিলেন, যার রাজধানী অহিচ্ছত্রে ছিল ।

 

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ভূমিকা

অশ্বথামা পাণ্ডবদের উপর নারায়ণ অস্ত্র নিক্ষেপ করেন হস্তিনাপুর যখন দ্রোণকে কৌরবদের শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেয় , তখন দ্রোণ এবং অশ্বত্থামা উভয়েই হস্তিনাপুরের প্রতি অনুগত হন এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেন।

 

যুদ্ধের 14 তম দিনে, তিনি অঞ্জনপার্বণ ( ঘটোৎকচের শক্তিশালী পুত্র) সহ রাক্ষসদের একটি বিভাগকে হত্যা করেন এবং ঘটোৎকচকেও পরাজিত করেন, কিন্তু তার বিভ্রম মোকাবেলায় ব্যর্থ হন। তিনি অর্জুনের বিরুদ্ধেও বেশ কয়েকবার দাঁড়িয়েছিলেন, তাকে জয়দ্রথের কাছে পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন , কিন্তু পরাজিত হন এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান। যাইহোক, জয়দ্রথকে রক্ষা করার পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন , অশ্বত্থামা, এক সময়ে, তার সর্বাস্ত্র তীর ব্যবহার করে এবং দুর্যোধনের প্রতি ক্রুদ্ধ অর্জুন কর্তৃক প্রবর্তিত শক্তিশালী মানবস্ত্র তীরটি ধ্বংস করে দুর্যোধনের ঐশ্বরিক স্বর্গীয় বর্ম এবং জীবনকে সফলভাবে রক্ষা করেছিলেন ।

 

ভীম অশ্বত্থামা নামে একটি হাতিকে বধ করেন। রাজনামা থেকে ফোলিও ।

যুদ্ধের দশম দিনে, ভীষ্মের পতনের পর, দ্রোণ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সেনাপতি হন। তিনি দুর্যোধনকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি যুধিষ্ঠিরকে বন্দী করবেন , কিন্তু তিনি বারবার তা করতে ব্যর্থ হন। দুর্যোধন তাকে কটূক্তি ও অপমান করেছিলেন, যা অশ্বত্থামাকে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল, যার ফলে অশ্বত্থামা এবং দুর্যোধনের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হয়।

 

সেদিন সশস্ত্র দ্রোণকে পরাজিত করা অসম্ভব হবে জেনে অর্জুন তার গুরুকে হত্যা করতে অস্বীকার করেছিলেন, তাই কৃষ্ণ দ্রোণকে নিরস্ত্র করার পরিকল্পনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ভীম তখন অশ্বত্থামা নামে একটি হাতিকে বধ করতে এগিয়ে যাবেন এবং তারপর দ্রোণের কাছে দাবি করবেন যে তিনি তার পুত্রকে হত্যা করেছেন। তার দাবি অবিশ্বাস করে, দ্রোণ যুধিষ্ঠিরের কাছে আসেন, যুধিষ্ঠিরের ধর্ম ও সততার দৃঢ় আনুগত্যের কথা জেনে । দ্রোণ সত্য জানতে চাইলে যুধিষ্ঠির উত্তর দিয়েছিলেন "অশ্বত্থামা মারা গেছে, হাতি।" হাতি শব্দটি অস্পষ্টভাবে যোগ করা যাতে দ্রোণ তা শুনতে না পারেন।

 

ধৃষ্টদ্যুম্ন তার পিতা দ্রুপদকে দ্রোণের হত্যার প্রতিশোধ হিসাবে শোকাহত দ্রোণকে হত্যা করার এই সুযোগটি ব্যবহার করেছিলেন । প্রতারণামূলক উপায়ে তার পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল জানতে পেরে, অশ্বত্থামা ক্রোধে ভরা হয়েছিলেন এবং পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে নারায়ণস্ত্রের আহ্বান জানান।

 

যখন অস্ত্রের আহ্বান করা হয়, হিংস্র বাতাস বইতে শুরু করে, বজ্রধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় এবং প্রতিটি পাণ্ডব সৈন্যের জন্য একটি তীর দেখা দেয়। অস্ত্র নিরস্ত্র লোকদের উপেক্ষা করে জেনে কৃষ্ণ সমস্ত সৈন্যদের তাদের রথ পরিত্যাগ করে নিরস্ত্র করার নির্দেশ দেন। তাদের সৈন্যদের নিরস্ত্র করার পর (কিছু অসুবিধার সাথে ভীম সহ), অস্ট্রা নিরীহভাবে অতিক্রম করে। বিজয়ের আকাঙ্ক্ষায় দুর্যোধন পুনরায় অস্ত্রটি ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ করলে, অশ্বত্থামা বলেছিলেন যে যদি অস্ত্রটি আবার ব্যবহার করা হয় তবে এটি তার ব্যবহারকারীকে চালু করবে।

 

নারায়ণস্ত্র পাণ্ডব বাহিনীর একটি অক্ষৌহিণীকে ধ্বংস করেন। যাইহোক, নারায়ণস্ত্র ব্যবহারের পরে, উভয় বাহিনীর মধ্যে একটি ভয়ানক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাঁর নারায়ণস্ত্র পাণ্ডবদের হত্যা করতে ব্যর্থ হতে দেখে, অশ্বত্থামা অগ্নেয়াস্ত্রকে আমন্ত্রণ জানান এবং সমস্ত দৃশ্যমান ও অদৃশ্য শত্রুদের দিকে তা চালু করেন। অস্ত্রটি শীঘ্রই অর্জুনকে পরাভূত করে এবং বেশ কয়েকটি জ্বলন্ত তীর দ্বারা বেষ্টন করে এবং পাণ্ডব সেনাবাহিনীর মধ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে এবং পরিস্থিতির গুরুতরতা উপলব্ধি করার পর, অর্জুন অগ্নেয়াস্ত্রের প্রভাবকে বশ করার জন্য তার বরুণাস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে এটি পাণ্ডব বাহিনীর আরেকটি অক্ষৌহিনীকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিল, যেটি শুধুমাত্র অর্জুন এবং কৃষ্ণ বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। এটি অশ্বত্থামাকে হতবাক করেছিল কারণ তিনি বিভ্রান্ত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং তার জ্ঞান এবং দক্ষতা সম্পর্কে সন্দেহ করেছিলেন। পরে, অশ্বত্থামা সরাসরি যুদ্ধে ধৃষ্টদ্যুম্নকে পরাজিত করেন কিন্তু সাত্যকি এবং ভীম অশ্বত্থামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় তার পশ্চাদপসরণ ঢেকে দেওয়ায় তাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হন। অশ্বত্থামা উভয় যোদ্ধাকে পরাজিত করেন এবং তাদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পশ্চাদপসরণ করেন।

 

অশ্বত্থামা একবারে লক্ষ লক্ষ তীর নিক্ষেপ করেছিলেন, যার ফলে অর্জুন নিজেই স্তব্ধ হয়েছিলেন। অশ্বত্থামা আবার অর্জুনকে পরাভূত করার চেষ্টা করেন , কিন্তু শেষ পর্যন্ত, অর্জুন তাকে পরাজিত করে তার শরীরে বেশ কয়েকটি তীর বিদ্ধ করে যা তাকে অজ্ঞান করে দেয় এবং তার সারথি অশ্বত্থামাকে অর্জুনের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়।

 

পাণ্ড্য রাজ্যের রাজা মলয়ধ্বজ , পাণ্ডবদের অন্যতম শক্তিশালী যোদ্ধা, অশ্বত্থামার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে দীর্ঘ তীরন্দাজের পর, অশ্বত্থামা মলয়ধ্বজকে অস্ত্রহীন করে দেন এবং ঘটনাস্থলেই তাকে হত্যা করার সুযোগ পান, কিন্তু তিনি তাকে আরও যুদ্ধের জন্য সাময়িকভাবে রক্ষা করেন। মলয়ধ্বজ তখন একটি হাতির উপর অশ্বত্থামার বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং একটি শক্তিশালী ল্যান্স নিক্ষেপ করেন, যা পরবর্তীটির ডায়ডেমটি ধ্বংস করে দেয়। অশ্বথামা মলয়ধ্বজের শিরশ্ছেদ করেন, তার অস্ত্র কেটে দেন এবং মলয়ধ্বজের ছয় অনুসারীকেও হত্যা করেন। এটা দেখে কৌরব বাহিনীর সকল মহান যোদ্ধা অশ্বত্থামার এই কাজের জন্য সাধুবাদ জানালেন।

 

দুঃশাসনের ভয়ানক মৃত্যুর পর , অশ্বত্থামা হস্তিনাপুরের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে দুর্যোধনকে পাণ্ডবদের সাথে শান্তি স্থাপনের পরামর্শ দেন । পরে, দুর্যোধন ভীমের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার পর, কৌরবের পক্ষ থেকে বেঁচে থাকা শেষ তিনজন, অশ্বত্থামা, কৃপা এবং কৃতবর্মা , তাঁর পাশে ছুটে আসেন। অশ্বত্থামা দুর্যোধনের প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নিয়েছিলেন, এবং দিনের আগে শল্যকে হত্যা করার পরে দুর্যোধন তাঁকে সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন।

 

কৃপা এবং কৃতবর্মার সাথে , অশ্বত্থামা রাতে পাণ্ডবদের শিবির আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছিলেন। অশ্বত্থামা যখন সেখানে পৌঁছান, তখন তিনি পাণ্ডবদের শিবিরের পাহারা দিচ্ছিল ভয়ঙ্কর ভূতের রূপে শিবের মুখোমুখি হন। তাকে চিনতে না পেরে, অশ্বত্থামা নির্ভয়ে তার সমস্ত শক্তিশালী অস্ত্র দিয়ে ভয়ঙ্কর ভূতকে আক্রমণ করতে শুরু করেছিলেন কিন্তু এমনকি কোনও ক্ষতি করতেও ব্যর্থ হন। শীঘ্রই, একটি সোনার বেদী তার সামনে উদ্ভাসিত হয় এবং তিনি শিবিরে উত্তরণের বিনিময়ে নিজেকে বলিদান হিসাবে নিবেদন করেন। শিব তার আসল রূপে অশ্বত্থামার সামনে আবির্ভূত হলেন এবং তাকে একটি ঐশ্বরিক তলোয়ার উপহার দিলেন। অতঃপর শিব স্বয়ং অশ্বত্থামার দেহে প্রবেশ করে তাঁকে সম্পূর্ণরূপে অপ্রতিরোধ্য করে তোলেন।

 

অশ্বত্থামা শিবিরে প্রবেশ করার পর, তিনি প্রথমে পাণ্ডব বাহিনীর সেনাপতি এবং তার পিতার হত্যাকারী ধৃষ্টদ্যুম্নকে লাথি মেরে জাগিয়ে তোলেন। অশ্বত্থামা অর্ধ-জাগ্রত ধৃষ্টদ্যুম্নকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিলেন যখন রাজপুত্র তার হাতে একটি তলোয়ার নিয়ে মারা যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিলেন। অশ্বত্থামা শিখণ্ডী , উত্তমৌজ, যুধামন্যু , উপপাণ্ডব এবং পাণ্ডব বাহিনীর অন্যান্য অনেক বিশিষ্ট যোদ্ধা সহ অবশিষ্ট যোদ্ধাদের হত্যা করে এগিয়ে যান । যদিও অনেক যোদ্ধা পাল্টা লড়াই করার চেষ্টা করেছিলেন, অশ্বত্থামা তার দেহ শিবের কাছে থাকার কারণে অক্ষত ছিলেন । যারা অশ্বত্থামার ক্রোধ থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিল তাদের শিবিরের প্রবেশদ্বারে কৃপা এবং কৃতবর্মা দ্বারা কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

 

বধের পর তিনজন যোদ্ধা দুর্যোধনের কাছে ফিরে আসেন । তাঁর কাছে সমস্ত পাঁচাল এবং উপপাণ্ডবদের মৃত্যুর খবর জানানোর পর , তিনি অশ্বত্থামাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন যা ভীষ্ম , দ্রোণ এবং কর্ণ তাঁর শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার আগে অর্জন করতে পারেননি।

 

অশ্বত্তমা গ্রেফতার হন এবং অর্জুন তাকে দ্রৌপদীর কাছে নিয়ে আসেন ।

পাণ্ডব ও কৃষ্ণ , যারা রাতের বেলা দূরে ছিল, এখন তাদের শিবিরে ফিরে এসেছে। এসব ঘটনার সংবাদ শুনে যুধিষ্ঠির অজ্ঞান হয়ে গেলেন এবং পাণ্ডবরা অসহায় হয়ে পড়লেন। ভীম ক্রুদ্ধ হয়ে দ্রোণের পুত্রকে হত্যা করতে ছুটে গেলেন। তারা তাকে গঙ্গার ধারে ঋষি ব্যাসের আশ্রমে খুঁজে পায় ।

 

অশ্বত্থামা, তার সময় এসেছে বলে বিশ্বাস করে, তাদের হত্যার শপথ পূরণের জন্য ঘাসের একটি ছোট ফলক থেকে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে ব্রহ্মাস্ত্র আহ্বান করেছিলেন। কৃষ্ণ অর্জুনকে অশ্বত্থামার বিরুদ্ধে তার নিজের ব্রহ্মাস্ত্রকে গুলি করতে বলেছিলেন আত্মরক্ষার জন্য। ব্যাস হস্তক্ষেপ করেন এবং ধ্বংসাত্মক অস্ত্রগুলিকে একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে বাধা দেন। তিনি অর্জুন এবং অশ্বত্থামা উভয়কেই তাদের অস্ত্র ফিরিয়ে নিতে বললেন। অর্জুন, কীভাবে তা করতে হবে জেনে তা ফিরিয়ে নিলেন।

অশ্বত্থামা, কীভাবে পাণ্ডবদের বংশের অবসান ঘটানোর প্রয়াসে ব্রহ্মাস্ত্রকে গর্ভবতী উত্তরার গর্ভের দিকে পুনঃনির্দেশিত করেছিলেন তা না জেনে। দ্রৌপদী, সুভদ্রা এবং সুদেষ্ণার অনুরোধে কৃষ্ণ উত্তরার অনাগত সন্তানকে ব্রহ্মাস্ত্রের প্রভাব থেকে রক্ষা করেছিলেন। অশ্বত্থামাকে তখন তার কপালে রত্নটি সমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং কৃষ্ণ অভিশাপ দিয়েছিলেন যে তিনি কলিযুগের শেষ অবধি তার আঘাত থেকে রক্ত ​​এবং পুঁজ বের হওয়া পর্যন্ত বনে ঘুরে বেড়াবেন এবং কারও সাথে কথা বলতে পারবেন না। অশ্বত্থামা তখন বনে গেলেন যাতে আর কখনো দেখা না হয়। 


বিকর্ণ (সংস্কৃত: विकर्ण) হলেন মহাকাব্য মহাভারতে বর্ণিত তৃতীয় কৌরব, ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর পুত্র এবং যুবরাজ দুর্যোধনের ভাই৷ বিকর্ণ কৌরবদের মধ্যে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে। দুর্যোধনের কাছে পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির তাঁর রাজ্য সহ সব কিছু হারিয়ে ফেলেন৷ বিকর্ণই একমাত্র কৌরব যিনি রাজসভায় দুর্যোধন যখন যুধিষ্ঠির তথা পাণ্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদীর অপমান করছিল তখন তার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন৷

 

যৌবনে বিকর্ণ হলেন দ্রোণের একজন শিষ্য যিনি তীর-ধনুক চালনায় অর্জুনের মতো পারদর্শী ছিলেন। অস্ত্রশিক্ষা শেষে দ্রোণ কৌরবদের বললেন- গুরুদক্ষিণা হিসেবে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে বন্দী করে নিয়ে আসতে হবে৷ দুর্যোধন, দুঃশাসন, যুযুৎসু, বিকর্ণ এবং অন্য কৌরবগণ হস্তিনাপুরের সৈন্যসহ পাঞ্চাল রাজ্য আক্রমণ করে৷ বিকর্ণ ও তাঁর ভাইয়েরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যেতে এবং যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হন৷

 

ব্যাসদেবের আশীর্বাদে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর যে শতপুত্র জন্মগ্রহণ করে তাদের মধ্যে সবচেয়ে ধার্মিক ছিলেন বিকর্ণ৷ দুর্যোধনের ভাই হলেও তিনি, তাঁর বাকি ভাইদের মত বদমেজাজি ও অহংকারী ছিলেন না৷ পান্ডবদের পাশাখেলায় পরাজয় হেতু সভামধ্যে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময়ে ধৃতরাষ্ট্র আর এক বৈশ্য দাশীর পুত্র যুযুৎসু ব্যতীত একমাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন তিনিই৷ এর প্রতিবাদে এমনকি তিনি সেই সভাস্থল ত্যাগ করেন৷ পরবর্তীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও তিনি কৌরব পক্ষের হয়ে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেন৷ ভীম কৌরবদের একশ ভাইকে বধ করবার পণ নিয়ে যখন কুরুক্ষেত্রকে প্রায় শ্মশানে পরিণত করেছেন তখন বিকর্ণ তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে দ্বন্দ্বের আহ্বান জানান, ভীম কিছুকাল ভাবেন তার সভার কথা মনে হতে তিনি বিকর্ণকে বলেন তুমি একমাত্র কৌরব যে জানে ধর্ম কি? তুমি সরে দাঁড়াও আমি তোমাকে বধ করতে চাই না৷ তুমিই একমাত্র যে সেই সভায় দুর্যোধনের প্রতিবাদ করেছিলে৷ কিন্তু বিকর্ণ বলেন আজ আমার সরে যাওয়াটাও অধর্ম হবে, আমি জানি কৌরবদের এই যুদ্ধে জয়লাভ কোনোদিনই হবে না যেহেতু বাসুদেব কৃষ্ণ পান্ডব পক্ষে আছে, কিন্তু আমি আমার ভাই এবং জ্যেষ্ঠ ভাই দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করতে পারব না৷ আমি ধার্মিক কিন্তু বিভীষণ নই৷ আমাকে যুদ্ধ করতেই হবে৷ তিনি বলেন “সেই সভাস্থলে আমার যা কর্তব্য ছিল করেছি, কিন্তু এখন আমার কর্তব্য আমার ভাইদের রক্ষা করা৷ তাই এসো আমার সাথে দ্বন্দ্ব কর বৃকোদর ভীম৷

 

সোমদত্ত ছিলেন বাহ্লীকার পুত্র যিনি ছিলেন শান্তনুর বড় ভাই।

বাহলিকা ছিলেন রাজা প্রতিপা ও রানী সুনন্দার ২য় পুত্র। ১ম পুত্র ছিলেন দেবপী, যিনি কুষ্ঠ রোগের কারণে মুকুটে আরোহণ করেননি এবং সারা জীবন তপস্যা করার জন্য বনে যান। তাই, বাহলিকা হস্তিনাপুরের যুবরাজ ছিলেন, এবং যৌক্তিকভাবে তিনি শান্তনুর পরিবর্তে রাজা হতেন। যাইহোক, তিনি বাহলিকা অঞ্চলে চলে যান (একটি পৃথক জমি তাকে তার পিতা বা জরাসন্ধ একটি চুক্তির ফলে দেওয়া হয়েছিল) যার ফলে শান্তনু হস্তিনাপুরের রাজা হন।

বাহলিকা তার পরিবারের সাথে রঙ্গভূমিতে, যুধিষ্ঠিরের যুবরাজের সময়, যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সময়, পাশার খেলার সময়ও ছিলেন।

তিনি তাঁর পুত্র, নাতি এবং নাতিদের সাথে কৌরবদের পক্ষে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর বংশধরেরা সবাই কুর্ক্ষেত্র যুদ্ধে মারা যান। জয়দ্রথ বধের ১৪ তম দিনে সাত্যকির হাতে তাঁর নাতি ভুরিশ্রাব স নিহত হন। তার পুত্র সোমদত্তও ১৪ তারিখে সাত্যকির হাতে নিহত হন যখন সূর্যাস্তের পর যুদ্ধ চলতে থাকে। তিনি নিজেও ভীমের হাতে নিহত হন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ১৩ তম দিনে ভুরিশ্রাবের উভয় পুত্রও অভিমন্যুর হাতে মারা যায়।

শ্লোক: 9:
অন্যে চ বহবঃ শূরাঃ মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ।
নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধবিশারদাঃ ॥৯॥

অনুবাদ : এ ছাড়া আরও বহু সেনানায়ক রয়েছেন, যাঁরা আমার জন্য তাঁদের জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত । তাঁরা সকলেই নানা প্রকার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং তাঁরা সকলেই সামরিক বিজ্ঞানে বিশারদ।

শ্লোক: 10:
অপর্যাপ্তং তদস্মাকং বলং ভীষ্মাভিরক্ষিতম্ ।
পর্যাপ্তং ত্বিদমেতেষাং বলং ভীমাভিরক্ষিতম্ ॥১০॥

অনুবাদ : আমাদের সৈন্যবল অপরিমিত এবং আমরা পিতামহ ভীষ্মের দ্বারা পূর্ণরূপে সুরক্ষিত, কিন্তু ভীমের দ্বারা সতর্কভাবে সুরক্ষিত পাণ্ডবদের শক্তি সীমিত।

শ্লোক: 11:
অয়নেষু চ সর্বেষু যথাভাগমবস্থিতাঃ ।
ভীষ্মমেবাভিরক্ষন্ত্ত ভবন্তঃ সর্ব এব হি ॥১১

অনুবাদ : এখন আপনারা সকলে সেনাব্যূহের প্রবেশপথে নিজ নিজ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থিত হয়ে পিতামহ ভীষ্মকে সর্বতোভাবে সাহায্য প্রদান করুন।

শ্লোক: 12:
তস্য সঞ্জনয়ন্ হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ ।
সিংহনাদং বিনদ্যোচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্ ॥১২॥

অনুবাদ : তখন কুরুবংশের বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম দুর্যোধনের হর্ষ উৎপাদনের জন্য সিংহের গর্জনের মতো অতি উচ্চনাদে তাঁর শঙ্খ বাজালেন।

শ্লোক: 13:
ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ ।
সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোভবৎ ॥১৩॥

অনুবাদ : তারপর শঙ্খ, ভেরী, পণব, আনক, ঢাক ও গোমুখ শিঙাসমূহ হঠাৎ একত্রে ধ্বনিত হয়ে এক তুমুল শব্দের সৃষ্টি হল।

ভেরিভেরী /বিশেষ্য পদ/ দামামা, ঢাক, পটই, কাড়ানাকাড়া।

পণব /বিশেষ্য পদ/ ঢোল জাতীয় প্রাচীন বাদ্যবিশেষ।

আনক /বিশেষ্য পদ/ ঢাক, ভেরী, মৃদঙ্গ।

শ্লোক: 14:
ততঃ শ্বেতৈর্হয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ ।
মাধবঃ পান্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ ॥১৪॥

অনুবাদ : অন্য দিকে, শ্বেত অশ্বযুক্ত এক দিব্য রথে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন উভয়ে তাঁদের দিব্য শঙ্খ বাজালেন।

শঙ্খ


শঙ্খ হিন্দু ধর্মে ধর্মীয় আচারের গুরুত্ব রয়েছে ।। হিন্দুধর্মে , পাঁচজন্য নামক শঙ্খ হল হিন্দু রক্ষাকর্তা দেবতা বিষ্ণুর একটি পবিত্র প্রতীক । এটি এখনও হিন্দু আচার-অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় এবং অতীতে এটি যুদ্ধের বাদ্যযন্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হত। [অরুণাভ বোসের মতে, "হিন্দু শাস্ত্রে শঙ্খকে খ্যাতি, দীর্ঘায়ু এবং সমৃদ্ধি, পাপ পরিষ্কারকারী এবং দেবী লক্ষ্মীর বাসস্থান হিসাবে প্রশংসা করা হয়েছে , যিনি সমৃদ্ধির দেবী এবং বিষ্ণুর সহধর্মিণী "। বিষ্ণুর সাথে মিলিত হয়ে হিন্দু শিল্পে শাঁখা প্রদর্শিত হয় । জলের প্রতীক হিসাবে, এটি মহিলা উর্বরতা এবং সর্প ( নাগাস ) এর সাথে যুক্ত। শঙ্খ বৌদ্ধধর্মের আটটি শুভ প্রতীকের মধ্যে একটি , অষ্টমঙ্গলা , এবং এটি বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক ধ্বনিকে প্রতিনিধিত্ব করে। বৈশিষ্ট্য এই খোলসটি Turbinellidae পরিবারের একটি সামুদ্রিক শামুক প্রজাতির Turbinella pyrum থেকে এসেছে । এই প্রজাতিটি ভারত মহাসাগর এবং আশেপাশের সমুদ্রে বাস করতে দেখা যায়। খোসাটি পোর্সেলেনিয়াস (অর্থাৎ শেলের পৃষ্ঠটি শক্তিশালী, শক্ত, চকচকে এবং কিছুটা স্বচ্ছ, চীনামাটির বাসনের মতো )। এটি যে কোনও উপযুক্ত সামুদ্রিক শামুকের খোলসও হতে পারে যাতে অভিনয়কারীর আবরণের জন্য একটি গর্ত তৈরি করা হয়েছিল। শেলের মূল অংশের সামগ্রিক আকৃতি আয়তাকার বা শঙ্কুযুক্ত। আয়তাকার আকারে, এটির মাঝখানে একটি প্রোটিউবারেন্স রয়েছে, তবে প্রতিটি প্রান্তে টেপার। উপরের অংশটি ( সিফোনাল ক্যানেল ) কর্কস্ক্রু-আকৃতির, যখন নীচের প্রান্তটি ( স্পিয়ার ) পেঁচানো এবং টেপারিং। এর রঙ নিস্তেজ, এবং পৃষ্ঠটি শক্ত, ভঙ্গুর এবং স্বচ্ছ। সমস্ত শামুকের খোসার মতো, অভ্যন্তরটি ফাঁপা। খোসার ভেতরের পৃষ্ঠগুলো খুবই চকচকে, কিন্তু বাইরের পৃষ্ঠে উচ্চ যক্ষ্মা দেখা যায়। হিন্দুধর্মে, চকচকে, সাদা, কোমল শাঁখা যার প্রান্ত এবং ভারী। প্রকারভেদ

ইংরেজিতে, এই প্রজাতির খোলস "দিব্য শঙ্খ" বা "পবিত্র চাঙ্ক" নামে পরিচিত। এটিকে সহজভাবে "চাঁক" বা শঙ্খও বলা যেতে পারে। শাঙ্কের দুটি রূপ রয়েছে: একটি সাধারণ রূপ যা "ডান-টার্নিং" বা প্যাটার্নে ডেক্সট্রাল, এবং খুব কমই বিপরীত কুণ্ডলী বা "বাম-বাঁক" বা সিনিস্ট্রালের মুখোমুখি হয়। [ এর কুণ্ডলীর দিক অনুসারে, শাঁখার দুটি জাত রয়েছে: বামাবর্ত ("বাম-বাঁক" যেমন ছিদ্র উপরের দিকে দেখা যায়): "প্রজাতির খুব সাধারণভাবে ঘটতে থাকা ডেক্সট্রাল ফর্ম, যেখানে শেল কুণ্ডলী বা ঘূর্ণি ঘড়ির কাঁটার দিকে সর্পিলভাবে প্রসারিত হয় যখন খোলের শীর্ষ থেকে দেখা হয়। " হিন্দু ধর্মে, একটি দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ অসীম স্থানের প্রতীক এবং বিষ্ণুর সাথে যুক্ত। বামাবর্ত শঙ্খ প্রকৃতির নিয়মের উল্টো দিকের প্রতিনিধিত্ব করে এবং শিবের সাথে যুক্ত । দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ হল "প্রজাতির একটি অত্যন্ত বিরল সিনিস্ট্রাল রূপ, যেখানে খোলের কুণ্ডলী বা ঘূর্ণিগুলি খোলের শীর্ষ থেকে দেখা হলে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সর্পিলভাবে প্রসারিত হয়।" দক্ষিণাবর্ত শঙ্খকে সমৃদ্ধি দেবী লক্ষ্মীর বাসস্থান বলে মনে করা হয় - বিষ্ণুর সহধর্মিণী, এবং তাই এই ধরনের শাঁখাকে ঔষধি ব্যবহারের জন্য আদর্শ বলে মনে করা হয়। এটি ভারত মহাসাগরের একটি খুব বিরল জাত । এই ধরনের শাঁখার ছিদ্রের প্রান্তে এবং কলুমেলার উপরে তিন থেকে সাতটি শিলা দেখা যায় এবং এর একটি বিশেষ অভ্যন্তরীণ গঠন রয়েছে। এই ধরণের ডান সর্পিল গ্রহের গতি প্রতিফলিত করে। এটিকে বুদ্ধের মাথার চুলের সাথে তুলনা করা হয় যা ডানদিকে সর্পিল। বুদ্ধের ভ্রুর মধ্যবর্তী লম্বা সাদা কোঁকড়া এবং তাঁর নাভির শঙ্খের মতো ঘূর্ণিও এই শঙ্খের অনুরূপ। বরাহ পুরাণ বলে যে দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ দিয়ে স্নান করলে পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। স্কন্দ পুরাণ বর্ণনা করে যে এই শঙ্খ দিয়ে বিষ্ণুকে স্নান করালে সাতটি জীবনের পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। একটি দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ একটি বিরল "রত্ন" বা রত্ন হিসাবে বিবেচিত হয় এবং মহান গুণাবলী দ্বারা সজ্জিত। এটি দীর্ঘায়ু, খ্যাতি এবং সম্পদকে এর উজ্জ্বলতা, শুভ্রতা এবং বিশালতার সমানুপাতিকভাবে প্রদান করে বলেও বিশ্বাস করা হয়। এই ধরনের শাঁখায় ত্রুটি থাকলেও তা সোনায় বসিয়ে দিলে শঙ্খের গুণাগুণ পুনরুদ্ধার হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। [ এর প্রথম দিকের উল্লেখগুলিতে, শঙ্খকে একটি শিঙা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই আকারে এটি বিষ্ণুর প্রতীক হয়ে উঠেছে। একই সাথে, এটি একটি ভক্তিমূলক নৈবেদ্য হিসাবে এবং সমুদ্রের বিপদগুলি দূরে রাখার জন্য একটি কবজ হিসাবে ব্যবহৃত হত। এটি শব্দের প্রকাশ হিসাবে প্রাচীনতম শব্দ-উৎপাদনকারী সংস্থা ছিল এবং অন্যান্য উপাদানগুলি পরে এসেছিল, তাই এটিকে উপাদানগুলির উত্স হিসাবে গণ্য করা হয়। এটা উপাদান নিজেদের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয় । একটি ট্রাম্পেট বা বাতাসের যন্ত্র তৈরি করতে, কেউ শঙ্খের শীর্ষের অগ্রভাগের কাছে একটি গর্ত ড্রিল করে । যখন এই গর্ত দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হয়, তখন এটি শঙ্খের ভোঁদড়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, একটি উচ্চ, তীক্ষ্ণ, তীক্ষ্ণ শব্দ উৎপন্ন করে। এই ধ্বনিটির কারণেই সাহায্যকারী এবং বন্ধুদের ডেকে আনার জন্য শঙ্খকে যুদ্ধের ট্রাম্পেট হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। শঙ্ক দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধে ব্যবহৃত হতে থাকে। এটি যে ধ্বনি উৎপন্ন করেছিল তার নাম ছিল শঙ্কনদ । [ উদ্ধৃতি প্রয়োজন ] আজকাল, হিন্দু মন্দির এবং বাড়িতে পূজার সময় শঙ্খ ফুঁকানো হয়, বিশেষ করে হিন্দু আরতির আচারে , যখন দেবতাদের আলো দেওয়া হয়। শঙ্খ দেবতাদের, বিশেষ করে বিষ্ণুর মূর্তি স্নান করতে এবং ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের জন্যও ব্যবহৃত হয়। এই উদ্দেশ্যে কোনও গর্ত ড্রিল করা হয় না, যদিও অ্যাপারচারটি পরিষ্কার করা হয় বা খুব কমই ঘূর্ণি কাটা হয় পাঁচটি মুখের সাথে পরপর পাঁচটি খোলস উপস্থাপন করার জন্য। শাঁখা চুড়ি, ব্রেসলেট এবং অন্যান্য জিনিস তৈরিতে উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এটির জলজ উৎপত্তি এবং ভালভার সাথে সাদৃশ্য থাকার কারণে, এটি তান্ত্রিক আচারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে, এর প্রতীকবাদকেও বলা হয় যে এটি নারীর উর্বরতার প্রতিনিধিত্ব করে। যেহেতু জল নিজেই একটি উর্বরতার প্রতীক, তাই শঙ্খ, যা একটি জলজ পণ্য, মহিলা উর্বরতার প্রতীক হিসাবে স্বীকৃত। প্রাচীন গ্রীসে , মুক্তো সহ শাঁসকে যৌন প্রেম এবং বিবাহ এবং মাতৃদেবী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন জাদু এবং যাদুবিদ্যা আইটেম এছাড়াও ঘনিষ্ঠভাবে এই ট্রাম্পেট সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়. বৌদ্ধ যুগের অনেক আগে থেকেই এই ধরনের যন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল ।

বামাবর্ত ("বাম-বাঁক" যেমন ছিদ্র উপরের দিকে দেখা যায়): "প্রজাতির খুব সাধারণভাবে ঘটতে থাকা ডেক্সট্রাল ফর্ম, যেখানে শেল কুণ্ডলী বা ঘূর্ণি ঘড়ির কাঁটার দিকে সর্পিলভাবে প্রসারিত হয় যখন খোলের শীর্ষ থেকে দেখা হয়। " হিন্দু ধর্মে, একটি দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ অসীম স্থানের প্রতীক এবং বিষ্ণুর সাথে যুক্ত। বামাবর্ত শঙ্খ প্রকৃতির নিয়মের উল্টো দিকের প্রতিনিধিত্ব করে এবং শিবের সাথে যুক্ত । দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ হল "প্রজাতির একটি অত্যন্ত বিরল সিনিস্ট্রাল রূপ, যেখানে খোলের কুণ্ডলী বা ঘূর্ণিগুলি খোলের শীর্ষ থেকে দেখা হলে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সর্পিলভাবে প্রসারিত হয়।" দক্ষিণাবর্ত শঙ্খকে সমৃদ্ধি দেবী লক্ষ্মীর বাসস্থান বলে মনে করা হয় - বিষ্ণুর সহধর্মিণী, এবং তাই এই ধরনের শাঁখাকে ঔষধি ব্যবহারের জন্য আদর্শ বলে মনে করা হয়। এটি ভারত মহাসাগরের একটি খুব বিরল জাত । এই ধরনের শাঁখার ছিদ্রের প্রান্তে এবং কলুমেলার উপরে তিন থেকে সাতটি শিলা দেখা যায় এবং এর একটি বিশেষ অভ্যন্তরীণ গঠন রয়েছে। এই ধরণের ডান সর্পিল গ্রহের গতি প্রতিফলিত করে। এটিকে বুদ্ধের মাথার চুলের সাথে তুলনা করা হয় যা ডানদিকে সর্পিল। বুদ্ধের ভ্রুর মধ্যবর্তী লম্বা সাদা কোঁকড়া এবং তাঁর নাভির শঙ্খের মতো ঘূর্ণিও এই শঙ্খের অনুরূপ। বরাহ পুরাণ বলে যে দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ দিয়ে স্নান করলে পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। স্কন্দ পুরাণ বর্ণনা করে যে এই শঙ্খ দিয়ে বিষ্ণুকে স্নান করালে সাতটি জীবনের পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। একটি দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ একটি বিরল "রত্ন" বা রত্ন হিসাবে বিবেচিত হয় এবং মহান গুণাবলী দ্বারা সজ্জিত। এটি দীর্ঘায়ু, খ্যাতি এবং সম্পদকে এর উজ্জ্বলতা, শুভ্রতা এবং বিশালতার সমানুপাতিকভাবে প্রদান করে বলেও বিশ্বাস করা হয়। এই ধরনের শাঁখায় ত্রুটি থাকলেও তা সোনায় বসিয়ে দিলে শঙ্খের গুণাগুণ পুনরুদ্ধার হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। [ এর প্রথম দিকের উল্লেখগুলিতে, শঙ্খকে একটি শিঙা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই আকারে এটি বিষ্ণুর প্রতীক হয়ে উঠেছে। একই সাথে, এটি একটি ভক্তিমূলক নৈবেদ্য হিসাবে এবং সমুদ্রের বিপদগুলি দূরে রাখার জন্য একটি কবজ হিসাবে ব্যবহৃত হত। এটি শব্দের প্রকাশ হিসাবে প্রাচীনতম শব্দ-উৎপাদনকারী সংস্থা ছিল এবং অন্যান্য উপাদানগুলি পরে এসেছিল, তাই এটিকে উপাদানগুলির উত্স হিসাবে গণ্য করা হয়। এটা উপাদান নিজেদের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয় । একটি ট্রাম্পেট বা বাতাসের যন্ত্র তৈরি করতে, কেউ শঙ্খের শীর্ষের অগ্রভাগের কাছে একটি গর্ত ড্রিল করে । যখন এই গর্ত দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হয়, তখন এটি শঙ্খের ভোঁদড়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, একটি উচ্চ, তীক্ষ্ণ, তীক্ষ্ণ শব্দ উৎপন্ন করে। এই ধ্বনিটির কারণেই সাহায্যকারী এবং বন্ধুদের ডেকে আনার জন্য শঙ্খকে যুদ্ধের ট্রাম্পেট হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। শঙ্ক দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধে ব্যবহৃত হতে থাকে। এটি যে ধ্বনি উৎপন্ন করেছিল তার নাম ছিল শঙ্কনদ । [ উদ্ধৃতি প্রয়োজন ] আজকাল, হিন্দু মন্দির এবং বাড়িতে পূজার সময় শঙ্খ ফুঁকানো হয়, বিশেষ করে হিন্দু আরতির আচারে , যখন দেবতাদের আলো দেওয়া হয়। শঙ্খ দেবতাদের, বিশেষ করে বিষ্ণুর মূর্তি স্নান করতে এবং ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের জন্যও ব্যবহৃত হয়। এই উদ্দেশ্যে কোনও গর্ত ড্রিল করা হয় না, যদিও অ্যাপারচারটি পরিষ্কার করা হয় বা খুব কমই ঘূর্ণি কাটা হয় পাঁচটি মুখের সাথে পরপর পাঁচটি খোলস উপস্থাপন করার জন্য। শাঁখা চুড়ি, ব্রেসলেট এবং অন্যান্য জিনিস তৈরিতে উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এটির জলজ উৎপত্তি এবং ভালভার সাথে সাদৃশ্য থাকার কারণে, এটি তান্ত্রিক আচারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে, এর প্রতীকবাদকেও বলা হয় যে এটি নারীর উর্বরতার প্রতিনিধিত্ব করে। যেহেতু জল নিজেই একটি উর্বরতার প্রতীক, তাই শঙ্খ, যা একটি জলজ পণ্য, মহিলা উর্বরতার প্রতীক হিসাবে স্বীকৃত। প্রাচীন গ্রীসে , মুক্তো সহ শাঁসকে যৌন প্রেম এবং বিবাহ এবং মাতৃদেবী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন জাদু এবং যাদুবিদ্যা আইটেম এছাড়াও ঘনিষ্ঠভাবে এই ট্রাম্পেট সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়. বৌদ্ধ যুগের অনেক আগে থেকেই এই ধরনের যন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল । আয়ুর্বেদ শঙ্খ অনেক রোগের চিকিৎসায় আয়ুর্বেদ ঔষধি সূত্রে ব্যবহৃত হয় । খোসা উপাদান থেকে তৈরি একটি পাউডার পেটের রোগের চিকিৎসা হিসেবে আয়ুর্বেদে ব্যবহৃত হয়। এটি শঙ্খের ছাই হিসাবে প্রস্তুত করা হয়, যা সংস্কৃতে শঙ্খ ভস্ম নামে পরিচিত , যা খোসাকে চুনের রসে ভিজিয়ে এবং 10 থেকে 12 বার আচ্ছাদিত ক্রুসিবলে ক্যালসিনেট করে এবং অবশেষে এটিকে গুঁড়ো ছাইতে পরিণত করে প্রস্তুত করা হয়। শাঁখার ছাইতে ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ম্যাগনেসিয়াম থাকে এবং এটি অ্যান্টাসিড এবং হজমের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বলে মনে করা হয়। তাৎপর্য ত্রাভাঙ্কোরের পূর্ববর্তী রাজ্যের পতাকায় একটি পবিত্র শঙ্খ শঙ্খের ধ্বনি পবিত্র ওম ধ্বনির প্রতীক। শঙ্খ ধারণ করা বিষ্ণু তাকে শব্দের দেবতা হিসাবে উপস্থাপন করে। ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ ঘোষণা করে যে শঙ্খ হল লক্ষ্মী এবং বিষ্ণু উভয়েরই বাসস্থান, শঙ্খের দ্বারা পরিচালিত জল দ্বারা স্নান করাকে একযোগে সমস্ত পবিত্র জলে স্নানের মতো মনে করা হয়। শঙ্খ সদমা পুরাণ ঘোষণা করে যে বিষ্ণুর মূর্তিকে গরুর দুধ দিয়ে স্নান করা লক্ষ যজ্ঞ (অগ্নি বলি) করার মতোই পুণ্যময় এবং গঙ্গা নদীর জলে বিষ্ণুকে স্নান করা জন্মের চক্র থেকে মুক্তি দেয়। এতে আরও বলা হয়েছে, "যখন শঙ্খের (শঙ্খ) কেবল দর্শনই সমস্ত পাপ দূর করে যেমন সূর্য কুয়াশা দূর করে, তবে এর পূজার কথা কেন?" পদ্ম পুরাণ গঙ্গার জল এবং দুধ দ্বারা বিষ্ণুকে স্নানের একই প্রভাব বলে দাবি করে এবং আরও যোগ করে যে এটি করা মন্দকে এড়িয়ে যায়, বিষ্ণুর মূর্তিটির আগে নিজের মাথায় শঙ্খ থেকে জল ঢেলে দেওয়া গঙ্গা নদীতে স্নানের সমতুল্য। বৌদ্ধধর্মে , শঙ্খকে আটটি শুভ প্রতীকের একটি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাকে অষ্টমঙ্গলাও বলা হয় । ডানদিকে বাঁকানো সাদা শঙ্খ খোল ( তিব্বতি : དུང་གྱས་འཁྱིལ , Wylie : dung gyas' Khyil ), মার্জিত, গভীর, সুরেলা, আন্তঃপ্রবেশকারী এবং গভীর শব্দের বিচ্ছিন্নতাপূর্ণ শব্দের প্রতিনিধিত্ব করে অজ্ঞতার ঘুম এবং তাদের নিজেদের কল্যাণ এবং অন্যের কল্যাণ সাধন করার জন্য তাদের আহ্বান জানায়। [ উদ্ধৃতি প্রয়োজন ] শাঁখা ছিল ত্রাভাঙ্কোরের রাজকীয় রাষ্ট্রীয় প্রতীক এবং জাফনা রাজ্যের রাজকীয় পতাকায়ও চিত্রিত ছিল । এটি ভারতীয় রাজনৈতিক দল বিজু জনতা দলের নির্বাচনী প্রতীকও । শিখ যোদ্ধারাও যুদ্ধ শুরু করার আগে শাঁখা ব্যবহার করত। আরতি আরতা প্রার্থনা করার সময় সমস্ত নিহঙ্গদের দ্বারা এখনও মর্যাদা অনুশীলন করা হয় এবং হোলা মহল্লা উৎসবেও ব্যবহৃত হয়। শঙ্খ ( পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের প্রধান দেবতার শঙ্খের প্রতিনিধিত্ব করে এটি ভারতের কেরালা রাজ্যের রাষ্ট্রীয় প্রতীকের একটি অংশ । প্রতীকটি ভারতীয় রাজকীয় রাজ্য ত্রাভাঙ্কোর এবং কোচিন রাজ্যের পূর্ববর্তী প্রতীক থেকে উদ্ভূত হয়েছিল । শঙ্খ বিষ্ণুর অন্যতম প্রধান গুণ। বিষ্ণুর মূর্তি, হয় বসা বা দাঁড়ানো ভঙ্গিতে, দেখায় যে তাকে সাধারণত তার বাম হাতে শঙ্খ ধারণ করে, যখন সুদর্শন চক্র ( চক্র - চাকতি), গদা (গদা) এবং পদ্ম (পদ্ম ফুল) তার উপরের ডানদিকে, নীচের বাম দিকে সাজায়। নীচের ডান হাত, যথাক্রমে। বিষ্ণুর অবতার যেমন মৎস্য , কুরমা , বরাহ এবং নরসিংহকেও বিষ্ণুর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সাথে শাঁখা ধারণ করা হয়েছে। কৃষ্ণ - বিষ্ণুর অবতার বর্ণনা করা হয়েছে যাকে পাঞ্চজন্য নামক একটি শঙ্খ রয়েছে। জগন্নাথ এবং বিঠোবার মতো আঞ্চলিক বিষ্ণু রূপগুলিও শঙ্খ ধারণ করে চিত্রিত হতে পারে। বিষ্ণু ছাড়াও অন্যান্য দেবতাদেরও শঙ্খ ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সূর্য দেবতা সূর্য , ইন্দ্র – স্বর্গের রাজা এবং বৃষ্টির দেবতা যুদ্ধের দেবতা কার্তিকেয় , দেবী বৈষ্ণবী এবং যোদ্ধা দেবী দুর্গা একইভাবে, গজা লক্ষ্মী মূর্তিগুলিতে লক্ষ্মীকে ডান হাতে একটি শঙ্খ এবং অন্য হাতে পদ্ম ধারণ করা দেখায়। কখনও কখনও, ভাস্কর্যে বিষ্ণুর শঙ্খকে আয়ুধপুরুষ "অস্ত্র-পুরুষ" হিসাবে চিত্রিত করা হয় এবং বিষ্ণু বা তার অবতারদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ হিসাবে চিত্রিত করা হয়। এই অধস্তন ব্যক্তিকে শঙ্খপুরুষ বলা হয় যাকে উভয় হাতে শঙ্খ ধারণ করা হয়েছে। মন্দিরের স্তম্ভ, দেয়াল, গোপুরাম (টাওয়ার), বেসমেন্ট এবং মন্দিরের অন্য কোথাও, শঙ্খ ও চক্রের ভাস্কর্য চিত্র – বিষ্ণুর প্রতীক – দেখা যায়। পুরী শহরটি শঙ্খ-ক্ষেত্র নামেও পরিচিত, কখনও কখনও এটির কেন্দ্রে জগন্নাথ মন্দিরের সাথে শিল্পে শঙ্খ বা শঙ্খ হিসাবে চিত্রিত করা হয় । শালিগ্রামে পাওয়া চারটি চিহ্নের মধ্যে শাঙ্ক হল একটি , বিশেষ করে নেপালের গণ্ডকী নদীতে পাওয়া একটি মূর্তিচিত্রের জীবাশ্ম পাথর যা হিন্দুরা বিষ্ণুর প্রতিনিধি হিসেবে পূজা করে। হিন্দু পুরাণ ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণে একটি হিন্দু কিংবদন্তি শঙ্খের সৃষ্টির কথা স্মরণ করে: শিব অসুরদের দিকে একটি ত্রিশূল নিক্ষেপ করেছিলেন , তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাদের ছাই সমুদ্রে উড়ে গিয়ে শঙ্খ তৈরি করে। শঙ্খকে লক্ষ্মীর ভাই বলে মনে করা হয় কারণ উভয়েরই জন্ম সমুদ্র থেকে। একটি কিংবদন্তীতে শঙ্খাসুর নামে একজন অসুরের বর্ণনা রয়েছে , যিনি বিষ্ণুর মৎস্য অবতার মৎস্য দ্বারা নিহত হন । সাগর মন্থনের সময় যে কয়টি পদার্থের উদ্ভব হয়েছিল তার মধ্যে শঙ্খ পাঞ্চজন্য অন্যতম । রামায়ণ এবং মহাভারতের হিন্দু মহাকাব্যে , শাংখের প্রতীক ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে । রামায়ণ মহাকাব্যে, লক্ষ্মণ , ভরত এবং শত্রুঘ্নকে যথাক্রমে শেশ , সুদর্শন চক্র এবং পাঞ্চজন্যের অংশ-অবতার হিসাবে বিবেচনা করা হয় , যেখানে রাম , তাদের জ্যেষ্ঠ ভাই, দশাবতারের একজন, বিষ্ণুর দশ অবতার হিসাবে বিবেচিত হয় । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় , কৃষ্ণ, পাণ্ডব রাজপুত্রের সারথি এবং মহাকাব্যের একজন নায়ক - অর্জুন - যুদ্ধ ঘোষণা করতে পাঞ্চজন্যকে ধ্বনিত করেন। সংস্কৃতে পঞ্চজন্য মানে 'পাঁচ শ্রেণীর প্রাণীর উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা'। পাঁচ পাণ্ডব ভাইদেরই তাদের নিজস্ব শাঁখা বর্ণনা করা হয়েছে। যুধিষ্ঠির , ভীম , অর্জুন, নকুল এবং সহদেবকে যথাক্রমে অনন্ত-বিজয়া, পাউন্ড্র-খড়্গ, দেবদত্ত, সুঘোষ এবং মণি-পুষ্পক নামে শঙ্খের অধিকারী বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ভগবদ্গীতায় পাণ্ডব ও কৌরবদের বিভিন্ন শঙ্খের নাম উল্লেখ করা হয়েছে: তারপর, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শঙ্খ বাজিয়েছিলেন, যার নাম পঞ্চজন্য; অর্জুন উড়িয়ে দিলেন দেবদত্তকে; এবং ভীম, ভোজনকারী এবং অতিশয় কর্ম সম্পাদনকারী, পাউন্ডরাম নামক তার ভয়ঙ্কর শঙ্খ বাজিয়েছিলেন কুন্তীর পুত্র রাজা যুধিষ্ঠির অনন্তবিজয় শঙ্খ বাজালেন এবং নকুল ও সহদেব সুঘোষ ও মণিপুস্পককে বাজালেন। সেই মহান ধনুর্ধারী কাশীর রাজা, মহান যোদ্ধা শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট এবং অজেয় সাত্যকি, দ্রুপদ, দ্রৌপদীর পুত্ররা এবং অন্যান্যরা, হে রাজা, সুভদ্রার পুত্র প্রভূত অস্ত্রে সজ্জিত, সকলেই নিজ নিজ শঙ্খ ফুঁকলেন। নাগাদের সাথে মেলামেশা জলের সাথে শঙ্খের যোগসূত্রের কারণে, নাগদের (সর্প) প্রায়ই শঙ্খের নামকরণ করা হয়। মহাভারত , হরিবংশ এবং ভাগবত পুরাণে নাগের তালিকায় রয়েছে শঙ্খ, মহাশঙ্খ, শঙ্খপাল এবং শঙ্কচুদা। শেষ দুটি বৌদ্ধ জাতক কাহিনী এবং জিমুতাবাহনেও উল্লেখ করা হয়েছে । [ 36 ] একটি কিংবদন্তি বলে যে ধ্যানমূলক আচারের অংশ হিসাবে একটি শঙ্খ ব্যবহার করার সময়, কেওলি গ্রামের জঙ্গলে একজন সাধু তার শাঁখাটি উড়িয়ে দেন এবং সেখান থেকে একটি সাপ বেরিয়ে আসে। সাপ সাধুকে নির্দেশ দিয়েছিল যে তাকে নাগা দেবতা (সর্প দেবতা) হিসাবে পূজা করা উচিত এবং তারপর থেকে এটি শঙ্কু নাগা নামে পরিচিত। হিমাচল প্রদেশের কুল্লু জেলার আরও অনেক জায়গায় অনুরূপ কিংবদন্তি বর্ণিত হয়েছে ।

মহাভারতে কৃষ্ণ

হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে , কৃষ্ণ হলেন যদুবংশ প্রধান বাসুদেব এবং তাঁর স্ত্রী দেবকীর পুত্র । তিনি তার উপাধি, বাসুদেব দ্বারাও ব্যাপকভাবে পরিচিত ।

 

কৃষ্ণ একজন রাজনৈতিক সংস্কারক হিসেবেঃ

সুরসেন রাজ্যের রাজা কমসাকে উৎখাত করার প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন কৃষ্ণ । শূরসেনের রাজ্য ছিল অন্ধক, বৃষ্ণী ও ভোজদের দ্বারা গঠিত যাদব বংশের আদি রাজ্য। কংসকে উৎখাত করে, কৃষ্ণ পুরানো রাজা উগ্রসেনকে সিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং রাজ্যের মধ্যে দলগত লড়াইয়ের কারণে রাজ্যকে পতন থেকে স্থিতিশীল করেন।

 

পরবর্তী হুমকি এলো দেশের বাইরে থেকে, মগধ রাজ্য থেকে । মগধের শাসক জরাসন্ধ সুরসেনকে বহুবার আক্রমণ করে তার সৈন্যবাহিনীকে দুর্বল করে দিয়েছিল। কৃষ্ণ এবং অন্যান্য যাদব প্রধানরা সকলেই ধরে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাদের নিজ রাজ্য থেকে দক্ষিণ ও পশ্চিমে পালাতে হয়েছিল।

 

পরে, কৃষ্ণের উদ্যোগে, সুরসেন থেকে পালিয়ে আসা যাদবরা দ্বারক নামে একটি নতুন রাজ্য গঠন করে । এর রাজধানী ছিল দ্বারাবতী, গুজরাট উপকূল থেকে দূরে নয় এমন একটি দ্বীপে চারদিকে পাহাড় দ্বারা সুরক্ষিত একটি শহর । এটি ভূমি থেকে আক্রমণ থেকে প্রতিরোধী করে তোলে। সামুদ্রিক রাজ্যগুলির সাথে সমুদ্র বাণিজ্যের মাধ্যমে রাজ্যটি সমৃদ্ধ হয়েছিল।

 

কৃষ্ণ পান্ডবদের সাথেও যাদবদের একটি জোট স্থাপন করেছিলেন , কুরুদের একটি দল , যারা প্রতিষ্ঠিত কুরু রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল । এই জোট কৌশলগতভাবে যাদবদেরও লাভবান করেছিল। পাণ্ডবদের সাহায্যে তারা মগধের রাজা জরাসন্ধকে উৎখাত করেন যিনি ছিলেন তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। এই সহায়তার জন্য, কৃষ্ণ পাণ্ডবদের দুর্যোধনের নেতৃত্বে কুরুদের বিরুদ্ধে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করেছিলেন । এইভাবে পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের শাসন কৃষ্ণ ইন্দ্রপ্রস্থে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন , যাকে আধুনিক দিল্লি বলে মনে করা হয় ।

 

যাইহোক, যাদব প্রধানরা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে উভয় পক্ষেই লড়াই করেছিল এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও যাদব নেতাদের মধ্যে শত্রুতা অব্যাহত ছিল। 36 বছর পর, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর থেকে, যাদবদের নিজেদের রাজ্যে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে দ্বারকায় যাদব রাজ্যের সম্পূর্ণ বিনাশ ঘটে, বলরাম এবং কৃষ্ণও শোকের কারণে প্রস্থান করেন। যাদবের মধ্যে এই লড়াইয়ের জন্যও দুর্যোধনের মা গান্ধারীর কাছ থেকে কৃষ্ণের অভিশাপের জন্য দায়ী করা হয় ।

 

কিন্তু কৃষ্ণ পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরকে যে সাহায্য করেছিলেন , তা শোধ হয়ে গেল। যুধিষ্ঠিরের শাসনের অবসান হলে, তিনি হস্তিনাপুরে কুরু রাজকুমার পরীক্ষিতের সাথে যাদব রাজকুমার বজ্রকে দ্বারকের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন । এইভাবে যাদবদের রাজকীয় বংশ অনিরুদ্ধের পুত্র, যুবরাজ বজ্র , কৃষ্ণের প্রপৌত্র এবং প্রদ্যুম্নের নাতির মাধ্যমে অব্যাহত ছিল । পরীক্ষিত ছিলেন অভিমন্যুর পুত্র এবং অর্জুনের নাতি ।

 

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রস্তুতিঃ

( মহাভারত , বই 5, অধ্যায় 5) যেহেতু আমরা একটি রাজনৈতিক পথ অবলম্বন করতে আগ্রহী, এটি নিঃসন্দেহে আমাদের প্রথম কর্তব্য; অন্যথায় অভিনয় করা একজন মানুষ বড় বোকা হবে। কিন্তু কুরু এবং পান্ডু উভয়ের সাথে আমাদের সম্পর্ক সমান, এই দুই পক্ষ একে অপরের সাথে যতই আচরণ করুক না কেন। কুরু জাতির সেই প্রধান যদি ন্যায়সঙ্গত শর্তে শান্তি স্থাপন করে, তবে কুরা এবং পান্ডুদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধে কোন আঘাত হবে না। অন্যদিকে, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র যদি উদ্ধত হয় এবং মূর্খতা থেকে সন্ধি করতে অস্বীকার করে, তবে অন্যকে ডেকে নিয়ে আমাদেরও ডেকে পাঠান। গাণ্ডীবের ধারক তখন ক্রোধে বরখাস্ত হবে এবং নিস্তেজ মাথার এবং দুষ্ট দুর্যোধন, তার পক্ষপাতিত্ব এবং বন্ধুদের সাথে যা তার ভাগ্য পূরণ করবে।

 

অর্জুন এবং দুর্যোধন উভয়ের জন্য যুদ্ধে সাহায্যের প্রস্তাবঃ

( মহাভারত , বই 5, অধ্যায় 7) দশ লক্ষ সংখ্যার গোয়ালের একটি বিশাল দল রয়েছে, যা আমাকে শক্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বী করে এবং নারায়ণ নামে পরিচিত, যাদের সকলেই যুদ্ধের ঘনঘটায় যুদ্ধ করতে সক্ষম। এই সৈন্যরা, যুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য, তোমাদের একজনের কাছে পাঠানো হবে এবং আমি একা, ময়দানে যুদ্ধ না করার সংকল্প করেছি, এবং আমার অস্ত্র রেখে, অন্যের কাছে যাবে। আপনি, প্রথমে, এই দুটির মধ্যে যেটি আপনার কাছে নিজেকে প্রশংসিত করে তা নির্বাচন করতে পারেন।


কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ প্রতিরোধে শান্তি মিশনঃ

( মহাভারত , পুস্তক 5, অধ্যায় 83) আমি রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে যাব, যা ধার্মিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা আমাদের জন্য উপকারী এবং যা কুরুদের মঙ্গলের জন্যও তা সম্পন্ন করতে আগ্রহী।

যাদব প্রধানদের মধ্যে রাজনীতিঃ

হস্তিনাপুরে পাণ্ডবদের দূত হিসেবে কৃষ্ণ, জয়পুরের আকবর রাজনামার শিল্পী জগানা ফোলিও।

( মহাভারত , বই 12, অধ্যায় 80) আমি কখনই আমার আত্মীয়দের সমৃদ্ধি সম্পর্কে চাটুকার বক্তৃতা করে তাদের প্রতি দাস আপত্তিজনক আচরণ করি না। আমার যা আছে তার অর্ধেক আমি তাদের দিয়ে দেই এবং তাদের খারাপ কথাগুলো ক্ষমা করে দিই। আগুন পেতে ইচ্ছুক ব্যক্তি যেমন আগুনের কাঠি মাটি করে দেয়, তেমনি আমার আত্মীয়দের দ্বারা তাদের নিষ্ঠুর বক্তব্যে আমার হৃদয় মাটি হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, সেই নিষ্ঠুর বক্তৃতাগুলি প্রতিদিন আমার হৃদয়কে পোড়ায়। সংকর্ষণে (বলরাম) বসবাস করতে পারে; গাদায় মৃদুতা; এবং প্রদ্যুম্ন সম্পর্কে, তিনি একজন ব্যক্তির সৌন্দর্যে আমাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। যদিও আমার পাশে এসব আছে তবুও আমি অসহায়। অন্ধক এবং বৃষ্ণিদের মধ্যে আরও অনেকের মধ্যে প্রচুর সমৃদ্ধি এবং শক্তি এবং সাহসী সাহস এবং অবিরাম অধ্যবসায় রয়েছে। যার পক্ষে তারা নিজেদের সীমাবদ্ধ করে না সে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। অন্যদিকে, যার পক্ষে তারা নিজেদের পরিসর করে, তিনি সবকিছু অর্জন করেন। উভয়ের (যেমন, আহুকা এবং আকরুরা,) দ্বারা অসন্তুষ্ট (পালাক্রমে) আমি তাদের উভয়ের পক্ষে নেই। একজন ব্যক্তির পক্ষে আহুকা এবং আকরুরা উভয়ের পক্ষে থাকা এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কী হতে পারে? আবার, একজনের পক্ষে দুজনের পক্ষে না থাকা তার চেয়ে বেশি বেদনাদায়ক আর কী হতে পারে আমি দুই ভাইয়ের মায়ের মতো একে অপরের বিরুদ্ধে জুয়া খেলছি, উভয়কে জয়ের আহ্বান জানাচ্ছি। আমি এইভাবে, উভয় দ্বারা পীড়িত.

 

প্রাগজ্যোতিষ ও শোণিতপুরের পূর্ব রাজ্যের জয়ঃ

মহাকাব্য মহাভারত কৃষ্ণের দ্বারা সংঘটিত অনেক যুদ্ধ এবং বিভিন্ন রাজ্যে তাঁর বিজয়ের বর্ণনা দেয়। তিনি ভারতের আসাম রাজ্যের আধুনিক গুয়াহাটিতে প্রাগজ্যোতিষের রাজা নরকে পরাজিত করেন । তিনি রাজাদের ভৌম বংশের অন্তর্গত ভূমিপুত্র (পৃথিবীর পুত্র) নামে পরিচিত ছিলেন । তার রাজ্যের নাম ছিল কামরূপ ।

 

তিনি প্রাগজ্যোতিষের পূর্বে শোণিতপুর ( আসামের শোণিতপুর বলে বিবেচিত ) বানা বা ভানাও জয় করেছিলেন। যাইহোক, তারা মিত্র হয়ে ওঠে, কারণ কৃষ্ণের নাতি অনিরুদ্ধ বানার কন্যা ঊষাকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি অসুরদের দৈত্য বংশের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ।

 

( মহাভারত , বই 5, অধ্যায় 62), কৃষ্ণকে বন ও ভূমির পুত্র (নারক) হত্যাকারী হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

 

( মহাভারত , পুস্তক 5, অধ্যায় 130) তিনি জরাসন্ধ, বক্র এবং পরাক্রমশালী শক্তির শিশুপালকে এবং যুদ্ধে বন এবং অন্যান্য অসংখ্য রাজাকেও তার দ্বারা বধ করেছেন। অসীম শক্তিতে তিনি রাজা বরুণ এবং পাবক, ইন্দ্র, মধু এবং কৈতভ ও হায়গ্রীবকে পরাজিত করেছিলেন।

 

বিদর্ভ, গান্ধার ও পাণ্ড্য জয়ঃ

( মহাভারত , বই 5, অধ্যায় 48) ... যে বাসুদেব ( কৃষ্ণ ), অর্থাৎ, যিনি প্রধান শক্তি দ্বারা ভোজা জাতির সমস্ত রাজকীয় যোদ্ধাদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তিনি একটি মাত্র গাড়িতে চড়েছিলেন রুক্মিণী (রাজকুমারী) বিদর্ভ) তাকে স্ত্রী বানানোর জন্য দারুণ খ্যাতি। এবং তার দ্বারা পরবর্তীতে উচ্চ আত্মার প্রদ্যুম্ন জন্মগ্রহণ করেন ।

 

( মহাভারত , বই 7, অধ্যায় 11) কৃষ্ণ , স্ব-পছন্দে সমস্ত রাজাকে পরাজিত করে, গান্ধার রাজার কন্যাকে জন্ম দিয়েছিলেন। সেই রাগান্বিত রাজারা যেন জন্মগতভাবে ঘোড়ার মতো, তার বিবাহের গাড়িতে জোঁক দেওয়া হয়েছিল এবং চাবুক দিয়ে বিদ্ধ করা হয়েছিল।

 

( মহাভারত , বই 7, অধ্যায় 23) পান্ড্য রাজা সারঙ্গধ্বজ দেশ আক্রমণ করে এবং তার আত্মীয়রা পালিয়ে যাওয়ার পর, তার পিতা যুদ্ধে কৃষ্ণের হাতে নিহত হন । তখন ভীষ্ম ও দ্রোণ , রাম ও কৃপের কাছ থেকে অস্ত্র পেয়ে রাজকুমার সারঙ্গধ্বজ অস্ত্রে রুক্মী ও কর্ণ এবং অর্জুন ও অচ্যুতের সমতুল্য হয়ে ওঠেন । তখন তিনি দ্বারকা নগরীকে ধ্বংস করে সমগ্র বিশ্বকে বশীভূত করতে চেয়েছিলেন। তবে, বিজ্ঞ বন্ধুরা তাকে ভালো করার আকাঙ্ক্ষা থেকে তাকে সেই পথের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিয়েছিল। প্রতিশোধের সমস্ত চিন্তা ত্যাগ করে, তিনি নিজের আধিপত্য শাসন করেছিলেন।

 

দার্শনিক হিসেবে কৃষ্ণঃ

 

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে কৃষ্ণ অর্জুনকে 'উপদেশ' প্রদান করেন ।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় তার বন্ধু এবং চাচাতো ভাই অর্জুনের সাথে কৃষ্ণের দার্শনিক কথোপকথন পরে হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ, বিখ্যাত ভগবদ্গীতা নামে পরিচিত হয় । কীভাবে তিনি এই মহান জ্ঞান সংগ্রহ করেছিলেন তা মহাভারতের অনুগীতা অধ্যায়ে প্রকাশিত হয়েছে , যেখানে বলা হয়েছে যে তিনি এই জ্ঞানটি অনেক পণ্ডিত পুরুষের সাথে আলাপচারিতার মাধ্যমে এবং নিজের ধ্যানের মাধ্যমে পেয়েছিলেন। তিনি ঋষি সন্দীপনি, বৃহস্পতি প্রমুখ মহান শিক্ষকদের কাছ থেকেও শিক্ষা লাভ করেন।

 

কৃষ্ণের জ্ঞানের সম্ভাব্য উৎসঃ

কৃষ্ণ একটি নির্দিষ্ট ব্রাহ্মণের কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের উল্লেখ করেছেন

মহাভারতের একটি 18 শতকের পাণ্ডুলিপি ।

( মহাভারত , বই 14, অধ্যায় 16) এক অনুষ্ঠানে একজন ব্রাহ্মণ আমাদের কাছে আসেন। অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে, তিনি বৃষের অঞ্চল থেকে এসেছিলেন। তিনি আমাদের দ্বারা যথাযথভাবে শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। আমাদের জিজ্ঞাসার উত্তরে তিনি যা বলেছেন তা শুনুন। ব্রাহ্মণ বললেন, "হে কৃষ্ণ, তুমি আমাকে যা চেয়েছিলে, মোক্ষের ধর্মের সাথে যুক্ত , তোমার মমতার দ্বারা পরিচালিত হয় সমস্ত প্রাণীর প্রতি, তোমার নিজের মঙ্গলের জন্য নয়, - যা প্রকৃতপক্ষে সমস্ত ভ্রমকে ধ্বংস করে, হে তুমি। যে শিল্পটি সর্বোত্তম প্রবৃত্তির অধিকারী তা আমি এখন আপনাকে যথাযথভাবে বলব যখন আমি আপনাকে বক্তৃতা করছি তখন আপনি কি মনোযোগ দিয়ে শুনবেন?" [এই জিজ্ঞাসা কৃষ্ণের লীলা। ছান্দোগ্য উপনিষদেও এর উল্লেখ আছে।]

 

ভগবদ্গীতা থেকে কৃষ্ণের দর্শন

( মহাভারত , বই 6, অধ্যায় 26) আত্মা থেকে স্বতন্ত্র কোন বস্তুগত অস্তিত্ব নেই; বা আত্মার গুণাবলীর অধিকারী কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। এই উভয় বিষয়ে এই উপসংহারে পৌঁছেছেন যারা বিষয়ের সত্যতা জানেন। জেনে রাখুন যে আত্মা অমর হতে হবে যার দ্বারা এই সমস্ত [মহাবিশ্ব] ব্যাপ্ত। যা অবিনশ্বর তার বিনাশকে কেউ ধারণ করতে পারে না। বলা হয়েছে যে মূর্ত আত্মার দেহ যা চিরন্তন, অবিনাশী এবং অসীম, তাদের শেষ আছে।

 

( মহাভারত , বই 6, অধ্যায় 26) একজন মানুষ হিসাবে, জীর্ণ পোশাকগুলি ছুঁড়ে ফেলে, নতুন যা অন্যদের গায়ে দেয়, তাই মূর্ত (আত্মা), জীর্ণ দেহগুলিকে ফেলে দিয়ে নতুন দেহে প্রবেশ করে। অস্ত্র তা ছিঁড়ে না, আগুন গ্রাস করে না; জল তা ভিজিয়ে দেয় না, বাতাসও তা নষ্ট করে না। এটি কাটা, পোড়া, ভিজে যাওয়া বা শুকানো অক্ষম। এটি অপরিবর্তনীয়, সর্বব্যাপী, স্থিতিশীল, দৃঢ় এবং চিরন্তন। এটাকে দুর্ভেদ্য, অকল্পনীয় এবং অপরিবর্তনীয় বলা হয়।

 

( মহাভারত , বই 6, অধ্যায় 26) সমস্ত প্রাণী (জন্মের আগে) অব্যক্ত ছিল। শুধুমাত্র একটি ব্যবধানে (জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে), হে ভরত, তারা প্রকাশ পায়; অতঃপর আবার, যখন মৃত্যু আসে, তখন তারা (আরও একবার) অপ্রকাশিত হয়।

 

( মহাভারত , বই 6, অধ্যায় 27) এই পৃথিবীতে, দুই ধরনের ভক্তি; সাংখ্যদের জ্ঞানের মাধ্যমে এবং যোগীদের কর্মের মাধ্যমে।

 

( মহাভারত , পুস্তক 6, অধ্যায় 29) অর্জুন বললেন, -- তুমি সাধুবাদ জানাই, হে কৃষ্ণ, কর্ম পরিত্যাগ, আবার আবেদন (তাদের কাছে)। আমাকে অবশ্যই বলুন যে এই দুটির মধ্যে কোনটি উচ্চতর। পবিত্র বলেছেন- কর্মের পরিত্যাগ এবং কর্মের প্রয়োগ উভয়ই মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এর মধ্যে, কর্মের প্রয়োগ পরিত্যাগের চেয়ে উচ্চতর। তাকে সর্বদা একজন তপস্বী হিসাবে পরিচিত হওয়া উচিত যার কোন বিদ্বেষ বা ইচ্ছা নেই। কারণ, বিপরীত জোড়া থেকে মুক্ত হওয়ায় তিনি সহজেই কর্মের বন্ধন থেকে মুক্তি পান।

 

( মহাভারত , বই 6, অধ্যায় 29) যিনি জ্ঞানী তিনি কখনই এইগুলির মধ্যে আনন্দ পান না যার শুরু এবং শেষ রয়েছে।

ভাগবত পুরাণে কৃষ্ণের শৈশব ।

বাসুদেবের ধর্ম (পরে IAST কৃষ্ণ বাসুদেব "কৃষ্ণ- বাসুদেব ") ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণবাদ এবং বৈষ্ণবধর্মের প্রাচীনতম উপাসনাগুলির মধ্যে একটি । এই ঐতিহ্যটিকে অন্যান্য ঐতিহ্যের সাথে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয় যা ঐতিহাসিক বিকাশের পরবর্তী পর্যায়ে একত্রিত হওয়ার দিকে পরিচালিত করে, যা কৃষ্ণের একেশ্বরবাদী ধর্মের বর্তমান ঐতিহ্যের ভিত্তি তৈরি করে কিছু প্রারম্ভিক পন্ডিত এটিকে ভাগবতবাদের সাথে তুলনা করতেন , এবং এই ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠাতাকে বিশ্বাস করা হয় কৃষ্ণ , যিনি বাসুদেবের পুত্র, এইভাবে তাঁর নাম বাসুদেব , এবং তাদের মতে তাঁর অনুসারীরা নিজেদের ভাগবত বলে অভিহিত করে এবং এই ধর্মটি খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীতে ( পতঞ্জলির সময় ) বা খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীর প্রথম দিকে গঠিত হয়েছিল। পাণিনি এবং মেগাস্থেনিসের প্রমাণ অনুসারে এবং কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে , যখন বাসুদেবকে একটি দৃঢ়ভাবে একেশ্বরবাদী বিন্যাসে সর্বোচ্চ দেবতা হিসাবে পূজা করা হয়েছিল, যেখানে পরম সত্তা ছিলেন নিখুঁত, শাশ্বত এবং কৃপায় পূর্ণ । ধর্মের বাইরের অনেক উৎসে, ভক্ত বা ভক্তকে বাসুদেবক হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে । হরিবংসা , মহাভারত এবং ভাগবত পুরাণের পরবর্তী সংযোজন বৃন্দাবন গ্রামে তাঁর শৈশব সম্পর্কে কথা বলে , যেখানে কৃষ্ণ তাঁর শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলি অতিবাহিত করেছিলেন।


শ্লোক: 15:
পাঞ্চজন্যং হৃষীকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ ॥
পৌন্ড্রং দধ্মৌ মহাশঙ্খং ভীমকর্মা বৃকোদরঃ ॥১৫॥


অনুবাদ : তখন, শ্রীকৃষ্ণ পাঞ্চজন্য নামক তাঁর শঙ্খ বাজালেন, অর্জুন বাজালেন, তাঁর দেবদত্ত নামক শঙ্খ এবং বিপুল ভোজনপ্রিয় ও ভীমকর্মা ভীমসেন বাজালেন পৌণ্ড্র নামক তাঁর ভয়ংকর শঙ্খ।


শ্লোক: 16:
অনন্তবিজয়ং রাজা কুন্তীপুত্রো যুধিষ্ঠিরঃ ।
নকুলঃ সহদেবশ্চ সুঘোষমণিপুষ্পকৌ ॥১৬॥


অনুবাদ : কুন্তীপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির অনন্তবিজয় নামক শঙ্খ বাজালেন এবং নকুল ও সহদেব বাজালেন সুঘোষ ও মণিপুষ্পক নামক শঙ্খ।

শ্লোক: 17:
কাশ্যশ্চ পরমেষ্বাসঃ শিখণ্ডী চ মহারথঃ ।
ধৃষ্টদ্যুম্নো বিরাটশ্চ সাত্যকিশ্চাপরাজিতঃ ॥১৭

শ্লোক: 18:
দ্রুপদো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্বশঃ পৃথিবীপতে ।
সৌভদ্রশ্চ মহাবাহুঃ শঙ্খান্ দধ্মুঃ পৃথক্ পৃথক্ ॥১৮॥


অনুবাদ : হে মহারাজ ! তখন মহান ধনুর্ধর কাশীরাজ, প্রবল যোদ্ধা শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট, অপরাজিত সাত্যকি, দ্রুপদ, দ্রৌপদীর পুত্রগণ, সুভদ্রার মহা বলবান পুত্র এবং অন্য সকলে তাঁদের নিজ নিজ পৃথক শঙ্খ বাজালেন।

শিখণ্ডী


শিখণ্ডী, যার জন্মগত নারী পরিচয়কে কখনো কখনো শিখন্দিনী হিসেবে উপস্থাপিত করা হয় ,  তিনি হলেন অম্বার পুনর্জন্ম , একজন রাজকন্যা যাকে ভীষ্ম একটি স্বয়ম্বরে অপহরণ করেছিলেন এবং পরে তাকে বর্জন করেছিলেন। রাজকুমার কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তার ভগ্নিপতি পান্ডবদের পক্ষে যুদ্ধ করেন এবং ভীষ্মের মৃত্যু ঘটাতে ভূমিকা রাখেন। এছাড়াও তিনি অশ্বত্থামা , কৃপা এবং কৃতবর্মার মতো মহান যোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধে নিযুক্ত হন ।


জাভানিজ ওয়েয়াং ঐতিহ্যে , শিখণ্ডী শ্রীকান্দি নামে পরিচিত এবং পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করে এবং নারীতে পরিবর্তিত হয়। তিনি পাণ্ডব ভাই অর্জুনের দ্বিতীয় স্ত্রী হন , দ্রৌপদী প্রথম। 



মহাভারতের অধিকাংশ সংস্করণে,  শিখণ্ডীকে তার পূর্বজন্মে অম্বা নামক রাজকন্যা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অম্বা ছিলেন কাশীর রাজার জ্যেষ্ঠ কন্যা । তার বোন, অম্বিকা এবং অম্বালিকার সাথে , তিনি ভীষ্ম কর্তৃক তাদের স্বয়ম্বরে জয়লাভ করেছিলেন । রাজা সালভা সহ বেশ কয়েকজন রাজাকে পরাজিত করার পর , ভীষ্ম রাজকন্যাদের সাথে হস্তিনাপুরে ফিরে আসেন এবং তাদের তার ছোট সৎ ভাই, রাজা বিচিত্রবীর্যের কাছে বধূ হিসেবে উপস্থাপন করেন।


তার বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে, অম্বা ভীষ্মকে বলেছিলেন যে তিনি সালভা রাজার প্রেমে পড়েছেন এবং অন্য কাউকে বিয়ে করতে প্রস্তুত নন। তাঁর কথা শুনে ভীষ্ম অম্বাকে তাঁর কাঙ্খিত স্বামীর কাছে মহিমান্বিতভাবে পাঠালেন। যাইহোক, সালভা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এই বলে যে ভীষ্ম তাকে স্বয়ম্বরে সেরা করেছিলেন, তিনি তাকে তার উপযুক্ত স্বামী হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। অম্বা ভীষ্মের কাছে ফিরে আসেন এবং দাবি করেন যে তিনি তাকে ক্ষত্রিয় ধর্ম অনুসারে বিয়ে করবেন , কিন্তু ভীষ্ম ব্রহ্মচর্যের ব্রতের কারণে প্রত্যাখ্যান করেন। তার দুর্ভাগ্যের জন্য বিলাপ করে, রাজকুমারী বনে অবসর নেওয়ার এবং তার বাকি জীবনের জন্য তপস্যা অনুশীলন করার সিদ্ধান্ত নেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি একটি আশ্রমে এসে তার দুর্দশার কথা জানালেন। ঋষিদের মধ্যে একজন হলেন মাতামহ, হোত্রবাহন, যিনি তার মনের অবস্থার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন এবং তাকে বলেছিলেন যে ভীষ্মের যুদ্ধ গুরু পরশুরাম তার সাহায্যে আসবেন। পরশুরাম হস্তিনাপুরে গিয়েছিলেন এবং তাঁর শিষ্যকে অম্বাকে বিয়ে করার নির্দেশ দেন। ভীষ্ম আবার তার ব্রত উদ্ধৃত করে তাকে মানতে অস্বীকার করলেন। ক্রুদ্ধ, পরশুরাম কুরুক্ষেত্রের ময়দানে ভীষ্মের বিরুদ্ধে 23 দিন ধরে একটি ভয়ানক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন, অস্ট্র নিযুক্ত করেন , কিন্তু তাকে সেরা করতে অক্ষম হন। তিনি দুঃখের সাথে আম্বাকে তার মন পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হওয়ার কথা জানান। রাজকন্যা বারো বছর কঠোর তপস্যায় নিযুক্ত ছিলেন, যা স্বর্গকে নিজেই ঝলসে দেয়। শিব তাকে তার পছন্দের বর দেওয়ার জন্য আবির্ভূত হলেন এবং তিনি ভীষ্মের মৃত্যু কামনা করলেন। শিব অম্বাকে বলেছিলেন যে তিনি একটি মেয়ে রূপে জন্মগ্রহণ করবেন যিনি পরবর্তী জীবনে একজন পুরুষ হবেন এবং একজন মহারথী হবেন যিনি ভীষ্মকে যুদ্ধে হত্যা করবেন। আনন্দিত, রাজকুমারী একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া জ্বালিয়ে, ভীষ্মের মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করেন এবং আত্মহনন করেন । 


সি. রাজাগোপালাচারীর একটি পুনরাবৃত্তি অনুসারে , তিনি একটি তপস্যা অবলম্বন করেছিলেন এবং দেবতা কার্তিকেয়ের কাছ থেকে নীল পদ্মের মালা পেয়েছিলেন এবং এটি ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে কেউ এই মালা পরলে ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠবে। তিনি পাঞ্চালাতে গিয়েছিলেন , কারণ এটি একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল যা তার সামরিক শক্তির জন্য পরিচিত। যাইহোক, ভীষ্মের বিরোধিতা করার ভয়ে কেউই তার কারণকে জয়ী করতে ইচ্ছুক ছিল না। অম্বা ক্রোধে রাজা দ্রুপদর দরজায় মালা ঝুলিয়ে যন্ত্রণায় চলে গেলেন। 



তার নিঃসন্তান হওয়ার কারণে, রাজা দ্রুপদ শিবকে অনুশোচনা করেছিলেন, যিনি রাজাকে বলেছিলেন যে তার একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করবে, যে সময়কালে একজন পুরুষ হবে। শিখণ্ডী যখন দ্রুপদ রাণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন, তখন তিনি ছেলের মতোই লালন-পালন করেন। শিখণ্ডী প্রথাগত বয়সে পৌঁছে গেলে, দ্রুপদ দশর্ণার রাজা হিরণ্যবর্মনের কন্যার সাথে বিবাহের জন্য তার হাত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শিখণ্ডীর স্ত্রী শীঘ্রই বুঝতে পেরেছিলেন যে তার স্বামী একজন পুরুষ নয় এবং হিরণ্যবর্মন শীঘ্রই এই তথ্যটি বুঝতে পেরেছিলেন। ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি সত্য নির্ণয়ের জন্য দ্রুপদর কাছে একজন দূত পাঠান এবং পরবর্তীদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। দ্রুপদ জোর দিয়েছিলেন যে শিখণ্ডী আসলেই একজন মানুষ। তার বাবা-মায়ের কষ্টে ব্যথিত হয়ে শিখণ্ডী আমরণ অনশন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যান। তিনি একটি অরণ্য খুঁজে পান যেখানে মানুষ প্রবেশ করতে ভয় পায়, কারণ সেখানে স্তুনকর্ণ নামে এক যক্ষ বাস করত । তিনি যক্ষের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেন এবং তপস্যা করতে লাগলেন। স্তুনকর্ণ যখন তার অনুশীলন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, শিখণ্ডী তাকে তার গল্প বললেন। সমবেদনা বোধ করে, যক্ষ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার সাথে তার যৌন বিনিময়ের প্রস্তাব দেয়, যা শিখণ্ডী রাজি হয়। শিখণ্ডী তার পিতার কাছে পুরুষ হয়ে ফিরে আসেন এবং তাকে এই ঘটনাটি জানান। স্বস্তি পেয়ে দ্রুপদ হিরণ্যবর্মণকে তার ছেলের পুরুষত্ব পরিদর্শনের জন্য দূত পাঠাতে আমন্ত্রণ জানান। হিরণ্যবর্মণ অনেক নারীকে দ্রুপদর কাছে পাঠিয়েছিলেন, যারা শিখণ্ডীর পুরুষত্ব নিশ্চিত করেছিলেন। এইভাবে, দুই রাজা তাদের শান্তি পুনর্নবীকরণ করতে সক্ষম হন। 


কুবের যখন স্তুনকর্ণের প্রাঙ্গণে গিয়েছিলেন, তখন যক্ষ তার নারী রূপের কারণে তাকে অভ্যর্থনা জানায়নি। ক্রুদ্ধ হয়ে কুবের যক্ষকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, যে যৌন আদান-প্রদান করা হয়েছে তা চিরস্থায়ী হবে। যক্ষ যখন কুবেরকে অভিশাপ উঠানোর জন্য অনুরোধ করেছিল, তখন যক্ষ তাকে বলেছিলেন যে শিখণ্ডীর মৃত্যুর পরে তিনি তার জন্ম লিঙ্গ ফিরে পাবেন।



কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে , ভীম শিখণ্ডীকে পাণ্ডব সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ার জন্য বেছে নেন, কারণ তিনি ভীষ্মকে হত্যা করার জন্য জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু অর্জুন এবং কৃষ্ণ তার পরিবর্তে ধৃষ্টদ্যুম্নকে পছন্দ করেন । শিখণ্ডীকে পাণ্ডব বাহিনীর সাত অক্ষৌহিণীর একজনের সেনাপতি করা হয় ।


যুদ্ধের প্রথম দিনে, শিখণ্ডী অশ্বত্থামার মুখোমুখি হয় এবং উভয় যোদ্ধা যুদ্ধ থেকে প্রত্যাহার করার আগে একে অপরকে বেশ কয়েকবার আহত করে। যুদ্ধের সপ্তম দিনে, তিনি আবার অশ্বত্থামার মুখোমুখি হন এবং তাকে কপালে আঘাত করতে সক্ষম হন। যাইহোক, একজন ক্রুদ্ধ অশ্বত্থামা তার রথকে ধ্বংস করেন এবং তাকে খারাপভাবে আহত করেন। ভাগ্যক্রমে, সাত্যকি তার উদ্ধারে আসে।


যুদ্ধের নবম দিনের রাতে, একটি চূড়ান্ত পরাজয়ের পরে, পাণ্ডব এবং কৃষ্ণ ভীষ্মের সাথে দেখা করেন । যুধিষ্ঠির ক্ষত্রিয় জীবনের ধ্বংসাত্মক ক্ষতি রোধ করতে, কীভাবে তাকে হত্যা করা যেতে পারে তা তাদের জানাতে পৌত্রের কাছে অনুরোধ করেন। ভীষ্ম তাদের জানান যে তিনি অস্ত্রধারণের সময় পরাজিত হওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল; যাইহোক, তিনি শিখণ্ডীর সাথে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করবেন, যেহেতু তিনি মূলত একজন মহিলা ছিলেন এবং অর্জুন তার অস্ত্র রাখলে তাকে পরাজিত করতে পারে। [ 12 ] তাই, পরের দিনের যুদ্ধে, শিখণ্ডী অর্জুনের সাথে পান্ডব বাহিনীর অগ্রভাগে যাত্রা করেন। কৌরব বাহিনীর অসংখ্য যোদ্ধা এই জুটিকে ভীষ্মের কাছে পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। যাইহোক, পান্ডব বাহিনীর যোদ্ধাদের আক্রমণে, অর্জুন এবং শিখণ্ডী ধাক্কা দিয়ে ভীষ্মের কাছে পৌঁছান। শিখণ্ডীর পিছনে চড়ে অর্জুন ভীষ্মকে শত শত তীরের বিধ্বংসী ভলি দিয়ে আক্রমণ করেন, শিখণ্ডীর পথে অর্জুন মোকাবিলা করতে পারে না। ভীষ্ম তার রথ থেকে পড়ে যান এবং যুদ্ধে তার ভূমিকা শেষ হয়, শুভ উত্তরায়ণে তার জীবন বিসর্জন দেয় । [ 13 ]


যুদ্ধের দ্বাদশ দিনে, শিখণ্ডীর একমাত্র পুত্র, ক্ষত্রদেব, দুর্যোধনের পুত্র লক্ষ্মণ কুমারের হাতে নিহত হন । চতুর্দশ দিনের রাতে শিখণ্ডী কৃপাচার্যের কাছে পরাজিত হন এবং ষোড়শ দিনে আহত হন এবং কৃতবর্মার তীর তার বর্মে বিদ্ধ হলে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। শল্যের মৃত্যুর পর , শিখণ্ডী যুদ্ধের সপ্তদশ দিনে পশ্চাদপসরণকারী কৌরব বাহিনীকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করেন।


যুদ্ধের 18 তম দিনে উপপাণ্ডবদের সাথে শিখণ্ডী অশ্বত্থামার হাতে নিহত হন। অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য এবং কৃতবর্মা রাতে পাণ্ডব শিবির আক্রমণ করলে হতবাক, শিখণ্ডী অশ্বত্থামার সাথে তরবারি যুদ্ধে নিহত হন । 


দেবদত্ত পট্টনায়েকের মতে , অশ্বত্থামা শিখণ্ডীর প্রেমিকাকে তাঁর সামনেই হত্যা করেন; অন্যান্য সংস্করণে, শিখণ্ডীর সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে।

শ্লোক: 19:
স ঘোষো ধার্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়ানি ব্যদারয়ৎ, ।
নভশ্চ পৃথিবীং চৈব তুমুলোহভ্যনুনাদয়ন্ ॥১৯

অনুবাদ : শঙ্খ-নিনাদের সেই প্রচণ্ড শব্দ আকাশ ও পৃথিবী প্রতিধ্বনিত করে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় বিদারিত করতে লাগল।

শ্লোক: 20:
অথ ব্যবস্তিতান্ দৃষ্ট্বা ধার্তরাষ্ট্রান্ কপিধ্বজঃ ।
প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে ধনুরুদ্যম্য পান্ডবঃ ।
হৃষীকেশং তদা বাক্যমিদমাহ মহীপতে ॥২০॥

অনুবাদ : সেই সময় পান্ডু পুত্র অর্জুন হনুমান চিহ্নিত পতাকা শোভিত রথে অধিষ্ঠিত হয়ে তাঁর ধনুক তুলে নিয়ে শ্বর নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত হলেন। হে মহারাজ ! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সমর সজ্জায় বিন্যস্ত দেখে অর্জুন তখন শ্রীকৃষ্ণকে এই কথাগুলি বললেন-

মহাভারতে হনুমান


 ভীম, যুধিষ্ঠির, অর্জুন, নকুল, সহদেব, দ্রৌপদী এবং কুন্তির সাথে 14 বছর নির্বাসনে থাকাকালীন, ভীম বনে একটি বানরের সাথে দেখা করেন। সে বিনীতভাবে বানরকে তার পথ থেকে তার লেজ তুলতে বলে, যাতে সে এগিয়ে যেতে পারে।


বানরটি ভীমকে নিজেই তার লেজ তুলে একপাশে রাখতে বলে। কিন্তু ভীম, শক্তিশালী প্রাণীদের একজন হওয়া সত্ত্বেও, নিছক একটি লেজ তুলতে অক্ষম। তিনি বুঝতে পারেন যে এটি কোন সাধারণ বানর নয় এবং তাকে তার শ্রদ্ধা জানায়।


এই যখন বানরটি প্রকাশ করে যে সে ভগবান হনুমান ছাড়া আর কেউ নয় এবং তার আসল রূপ ধারণ করে। ভীম তার শক্তি ও ক্ষমতার কারণে অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন এবং ভগবান হনুমান ভীমের অহংকার ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন । অনেকেই জানেন না যে হনুমান এবং ভীম ভাই, সুনির্দিষ্টভাবে সৎ-ভাই। তারা উভয়েই বায়ু (পবন) ভগবানের পুত্র। অতএব, তারা উভয়ই পবন পুত্র।



মহাভারত যুদ্ধে ভগবান হনুমান তার ভূমিকা পালন করেছিলেন


ভীমের সাথে সাক্ষাতের সময়, ভগবান হনুমান কৌরবদের বিরুদ্ধে তাদের ভবিষ্যতের যুদ্ধে পান্ডবদের রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাই ভগবান হনুমানকে পতাকার কাছে রথের শীর্ষে বসে থাকতে দেখা যায় যা অর্জুন ব্যবহার করেছিলেন এবং মহাভারতের যুদ্ধের সময় ভগবান কৃষ্ণ দ্বারা চালিত হয়েছিল। কিছু সংস্করণে তারা বলে যে ভগবান হনুমানের মূর্তি অর্জুনের রথের উপরে উড়ন্ত পতাকায় পাওয়া গিয়েছিল। এইভাবে রথটি ভগবান হনুমান দ্বারা সুরক্ষিত ছিল।



মহাভারত যুদ্ধের শেষে, কৃষ্ণ অর্জুনকে প্রথমে রথ থেকে নামতে বলেছিলেন, তারপর কৃষ্ণ নেমেছিলেন, ভগবান হনুমান সম্বলিত পতাকাটি অদৃশ্য হয়ে যায় এবং তার পরেই রথটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তাই পতাকাও হয়তো রথকে পুড়ে ছাই থেকে রক্ষা করছে। কারণ যুদ্ধের সময় রথটি অনেকগুলি ঐশ্বরিক অস্ত্র দ্বারা আঘাত করেছিল, কিন্তু ভগবান হনুমান রথটিকে একসাথে রেখে রথটিকে রক্ষা করেছিলেন ( ভগবান হনুমান যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রথ ছেড়ে যাননি। যুদ্ধের)।



ভগবান কৃষ্ণ যুদ্ধের পরে পদত্যাগ করার পরে রথটি পুড়ে যায় এবং সাথে সাথে ভগবান হনুমান উড়ে যান বা পতাকা থেকে অদৃশ্য হয়ে যান।


শ্লোক: 21:
অর্জুন উবাচ
সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে রথং স্থাপয় মেহচ্যুত ।
যাবদেতান্নিরীক্ষেহহং যোদ্ধুকামানবস্থিতান্ ॥২১॥


শ্লোক: 22:
কৈর্ময়া সহ যোদ্ধব্যমস্মিন্ রণসমুদ্যমে ॥২২॥

কৈঃ, ময়া, সহ, যোদ্ধব্যম্, অস্মিন্, রণসমুদ্যমে ॥২২॥


অনুবাদ : অর্জুন বললেন- হে অচ্যুত ! তুমি উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে আমার রথ স্থাপন কর, যাতে আমি দেখতে পারি যুদ্ধ করার অভিলাষী হয়ে কারা এখানে এসেছে এবং এই মহা সংগ্রামে আমাকে কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে।

শ্লোক: 23:
যোৎস্যমানানবেক্ষেহহং য এতেহত্র সমাগতাঃ ।
ধার্তরাষ্ট্রস্য দুর্বুদ্ধের্যুদ্ধে প্রিয়চিকীর্ষবঃ ॥২৩॥


অনুবাদ : ধৃতরাষ্ট্রের দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন পুত্রকে সন্তুষ্ট করার বাসনা করে যারা এখানে যুদ্ধ করতে এসেছে, তাদের আমি দেখতে চাই৷


শ্লোক: 24:
সঞ্জয় উবাচ:
এবমুক্তো হৃষীকেশো গুড়াকেশেন ভারত ।
সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে স্থাপয়িত্বা রথোত্তমম্ ॥২৪॥


অনুবাদ : সঞ্জয় বললেন- হে ভরত-বংশধর ! অর্জুন কতৃক এভাবে আদিষ্ট হয়ে, শ্রীকৃষ্ণ সেই অতি উত্তম রথটি চালিয়ে নিয়ে উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে রাখলেন।


শ্লোক: 25:
ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ সর্বেষাং চ মহীক্ষিতাম্ ।
উবাচ পার্থ পশ্যৈতান্ সমবেতান্ কুরূনিতি ॥২৫॥


অনুবাদ : ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখ পৃথিবীর অন্য সমস্ত নৃপতিদের সামনে ভগবান হৃষীকেশ বললেন, হে পার্থ ! এখানে সমবেত সমস্ত কৌরবদের দেখ।


শ্লোক: 26:
তত্রাপশ্যৎ স্থিতান্ পার্থঃ পিতৃনথ পিতামহান্ ।
আচার্যান্মাতুলান্ ভ্রাতৃন্ পুত্রান্ পৌত্রান্ সখীংস্তথা ।
শ্বশুরান্ সুহৃদশ্চৈব সেনয়োরুভয়োরপি ॥২৬॥


অনুবাদ : তখন অর্জুন উভয় পক্ষের সেনাদলের মধ্যে পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, শ্বশুর, মিত্র ও শুভাকাংক্ষীদের উপস্থিত দেখতে পেলেন।


শ্লোক: 27:
তান্ সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্বান্ বন্ধূনবস্থিতান্।
কৃপয়া পরয়াবিষ্টো বিষীদন্নিদমব্রবীৎ ॥২৭॥


অনুবাদ : যখন কুন্তীপুত্র অর্জুন সকল রকমের বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনদের যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থিত দেখলেন, তখন তিনি অত্যন্ত কৃপাবিষ্ট ও বিষণ্ণ হয়ে বললেন।


শ্লোক: 28:
অর্জুন উবাচ
দৃষ্ট্বেমং স্বজনং কৃষ্ণ যুযুৎসুং সমুপস্থিতম্ ।
সীদন্তি মম গাত্রাণি মুখং চ পরিশুষ্যতি ॥২৮॥


অনুবাদ : অর্জুন বললেন- হে প্রিয়বর কৃষ্ণ ! আমার সমস্ত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের এমনভাবে যুদ্ধাভিলাষী হয়ে আমার সামনে অবস্থান করতে দেখে আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হচ্ছে এবং মুখ শুষ্ক হয়ে উঠছে।


শ্লোক: 29:
বেপথুশ্চ শরীরে মে রোমহর্ষশ্চ জায়তে ।
গান্ডীবং স্রংসতে হস্তাৎ ত্বক্ চৈব পরিদহ্যতে ॥২৯॥


অনুবাদ : আমার সর্বশরীর কম্পিত ও রোমাঞ্চিত হচ্ছে, আমার হাত থেকে গাণ্ডীব খসে পড়ছে এবং ত্বক যেন জ্বলে যাচ্ছে।

মহাভারত অনুসারে , ধর্ম রক্ষার মহৎ উদ্দেশ্যে মহাবিশ্বের স্রষ্টা ব্রহ্মা দ্বারা পৌরাণিক গাণ্ডীব ধনুক তৈরি করা হয়েছিল। এই পবিত্র অস্ত্রটি তখন ভগবান শিবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল, যিনি এটি 503 বছরের জন্য ব্রহ্মার কাছে অর্পণ করার আগে সহস্রাব্দ ধরে রেখেছিলেন । পরবর্তীকালে, ইন্দ্র 580 বছর ধরে ধনুক চালান, তারপরে 500 বছর ধরে সোম । অবশেষে, পাণ্ডবদের বীর যোদ্ধা অর্জুনকে দান করার আগে বরুণ 100 বছর ধরে ধনুক ধরে রেখেছিলেন। 

অগ্নি , অগ্নি দেবতা, তার শক্তি এবং মহিমা ফিরে পেতে, খান্ডবপ্রস্থের বন গ্রাস করতে চেয়েছিলেন । তিনি দুই বীর, কৃষ্ণ ও অর্জুনের সাহায্য তালিকাভুক্ত করেছিলেন । অর্জুন ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম সেরা যোদ্ধা এবং বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ। তিনি অগ্নির কাছে একটি ধনুক চেয়েছিলেন যা তার শক্তি, দক্ষতা এবং স্বর্গীয় অস্ত্রের শক্তির জন্য উপযুক্ত হবে।

অগ্নি তখন বরুণকে কাঙ্খিত অস্ত্র দিয়ে আশীর্বাদ করার অনুরোধ করেন । বরুণ অর্জুনকে গান্ধীব ধনুক দিয়েছিলেন, সেইসাথে দুটি তরঙ্গ যা অক্ষয় সংখ্যক তীর প্রদান করবে।  কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় ধনুকটি অনেকের কাছে ভয় পেয়েছিল, অনেক মহান যোদ্ধা এবং দেবতাদের পরাজিত ও হত্যা করেছিল।

গাণ্ডীব একটি শক্তিশালী আত্মবিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস দেয়।  এটি এক লক্ষ ধনুকের শক্তি বলে বিশ্বাস করা হয় এবং ধনুকটি 108টি স্বর্গীয় স্ট্রিং নিয়ে গঠিত। গান্ধীব ছিলেন অবিনশ্বর এবং স্বর্গীয় ও গন্ধর্বদের দ্বারা পূজিত হতেন।

দ্বাপর যুগের শেষে কৃষ্ণ পৃথিবী ত্যাগ করে বৈকুণ্ঠে চলে যান । কৃষ্ণ যখন প্রস্থান করছিলেন, তখন তিনি অর্জুনকে বলেছিলেন দ্বারিকাবাসীকে উদ্ধার করতে কারণ তিনি দ্বারিকাকে সমুদ্রের নীচে ডুবিয়েছিলেন। দ্বারিকা ডুবে যাওয়ার সময় অর্জুন সাময়িকভাবে ধনুক বাঁধতে পারেননি, বা তার স্বর্গীয় অস্ত্রগুলিকে আহ্বান করার জন্য প্রয়োজনীয় মন্ত্রগুলি মনে রাখতে পারেননি। অর্জুন জানতেন যে পৃথিবীতে তার সময়ও শেষ হয়ে গেছে, ব্যাস তাকে বলেছিলেন যে এই ঘটনা ঘটবে এবং যখন এটি ঘটবে, তখন পৃথিবীতে অর্জুনের কাজ শেষ। পরে, পাণ্ডবরা অবসর গ্রহণ করেন এবং হিমালয়ে যাত্রা করেন । তাদের পথে, অগ্নি এসে অর্জুনকে বরুণের কাছে গান্ডিব ফিরিয়ে দিতে বলে , কারণ এটি দেবতাদের ছিল। অর্জুন বাধ্য হয়ে তাদের সমুদ্রের জলে ফেলে দিলেন। এইভাবে স্বর্গীয় ধনুক দেবতাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।


শ্লোক: 30:
ন চ শক্নোম্যবস্থাতুং ভ্রমতীব চ মে মনঃ ।
নিমিত্তানি চ পশ্যামি বিপরীতানি কেশব ॥৩০॥


অনুবাদ : হে কেশব ! আমি এখন আর স্থির থাকতে পারছি না। আমি আত্মবিস্মৃত হচ্ছি এবং আমার চিত্ত উদ্ ভ্রান্ত হচ্ছে। হে কেশীদানবহন্তা শ্রীকৃষ্ণ ! আমি কেবল অমঙ্গলসূচক লক্ষণসমূহ দর্শন করছি।


শ্লোক: 31:
ন চ শ্রেয়োহনুপশ্যামি হত্বা স্বজনমাহবে ।
ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ ॥৩১॥

অনুবাদ : হে কৃষ্ণ ! যুদ্ধে আত্মীয়-স্বজনদের নিধন করা শ্রেয়স্কর দেখছি না। আমি যুদ্ধে জয়লাভ চাই না, রাজ্য এবং সুখভোগও কামনা করি না।

শ্লোক: 32:
কিং নো রাজ্যেন গোবিন্দ কিং ভোগৈর্জীবিতেন বা ।
যেষামর্থে কাংক্ষিতং নো রাজ্যং ভোগাঃ সুখানি চ ॥৩২॥

কিম্, নঃ, রাজ্যেন, গোবিন্দ, কিম্, ভোগৈঃ, জীবিতেন, বা,
যেষাম, অর্থে, কাংক্ষিতম্, নঃ, রাজ্যম্, ভোগাঃ, সুখানি, চ, ॥৩২॥
শ্লোক: 33:
ত ইমেহবস্থিতা যুদ্ধে প্রাণাংস্ত্যক্ত্বা ধনানি চ ।
আচার্যাঃ পিতরঃ পুত্রাস্তথৈব চ পিতামহাঃ ॥৩৩॥

ত, ইমে, অবস্থিতাঃ, যুদ্ধে, প্রাণান্, ত্যক্ত্বা, ধনানি, চ,
আচার্যাঃ, পিতরঃ, পুত্রাঃ, তথা, এব, চ, পিতামহাঃ ॥৩৩॥
শ্লোক: 34:
মাতুলাঃ শ্বশুরাঃ পৌত্রাঃ শ্যালাঃ সম্বন্ধিনস্তথা ।
এতান্ন হন্তমিচ্ছামি ঘ্নতহপি মধুসূদন ॥৩৪॥

মাতুলাঃ, শ্বশুরাঃ, পৌত্রাঃ, শ্যালাঃ, সম্বন্ধিনঃ, তথা,
এতান্, ন হন্তুম্, ইচ্ছামি, ঘ্নতঃ, অপি, মধুসূদন ॥৩৪॥
শ্লোক: 35:
অপি ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য হেতোঃ কিং নু মহীকৃতে ।
নিহত্য ধার্তরাষ্ট্রান্নঃ কা প্রীতিঃ স্যাজ্জনার্দন ॥৩৫॥

অপি, ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য, হেতোঃ, কিম্, নু, মহীকৃতে,
নিহত্য, ধার্তরাষ্ট্রান্, নঃ, কা, প্রীতিঃ, স্যাৎ, জনার্দন ॥৩৫॥

অনুবাদ : হে গোবিন্দ ! আমাদের রাজ্যে কি প্রায়োজন, আর সুখভোগ বা জীবন ধারনেই বা কী প্রয়োজন, যখন দেখছি- যাদের জন্য রাজ্য ও ভোগসুখের কামনা, তারা সকলেই এই রণক্ষেত্রে আজ উপস্থিত? হে মধুসূদন ! যখন আচার্য, পিতৃব্য, পুত্র, পিতামহ, মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক ও আত্মীয়স্বজন, সকলেই প্রাণ ও ধনাদির আশা পরিত্যাগ করে আমার সামনে যুদ্ধে উপস্থিত হয়েছেন, তখন তাঁরা আমাকে বধ করলেও আমি তাঁদের হত্যা করতে চাইব কেন? হে সমস্ত জীবের প্রতিপলক জনার্দন ! পৃথিবীর তো কথাই নেই, এমন কি সমগ্র ত্রিভুবনের বিনিময়েও আমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নই। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের নিধন করে কি সন্তোষ আমরা লাভ করতে পারব?

শ্লোক: 36:
পাপমেবাশ্রয়েদস্মান্ হত্বৈতানাততায়িনঃ ।
তস্মান্নার্হা বয়ং হন্তুং ধার্তরাষ্ট্রান্ সবান্ধবান্ ।
স্বজনং হি কথং হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধব ॥৩৬


অনুবাদ : এই ধরনের আততায়ীদের বধ করলে মহাপাপ আমাদের আচ্ছন্ন করবে। সুতরাং বন্ধুবান্ধব সহ ধৃতরাষ্ট্র্রের পুত্রদের সংহার করা আমাদের পক্ষে অবশ্যই উচিত হবে না। হে মাধব , লক্ষ্মীপতি শ্রীকৃষ্ণ ! আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করে আমাদের কী লাভ হবে ? আর তা থেকে আমরা কেমন করে সুখী হব ?


ছয় জনকে আততায়ী বলে-
অগ্নিদো গরদশ্চৈব শস্ত্রপাণির্ধনাপহঃ।
ক্ষেত্রদারাপহারী চ ষড়েতে আততায়িনঃ ||
যে ঘরে আগুন দেয়, যে বিষ দেয়, শস্ত্রপাণি, ধনাপহারী, ভূমি যে অপহরণ করে ও বনিতা অপহরণ করে, এই ছয় জন আততায়ী অর্থশাস্ত্রানুসারে আততায়ী বধ্য। টীকাকারেরা অর্জ্জুনের বাক্যের এইরূপ অর্থ করেন যে, যদিও অর্থশাস্ত্রানুসারে আততায়ী বধ্য, তথাপি ধর্ম্মশাস্ত্রানুসারে গুরু প্রভৃতি অবধ্য। ধর্ম্মশাস্ত্রের কাছে অর্থশাস্ত্র দুর্ব্বল, সুতরাং দ্রোণ ভীষ্মাদি আততায়ী হইলেও তাঁহাদিগের বধে পাপাশ্রয় হইবে। একালে আমরা “Law” এবং “Moralityর” মধ্যে প্রভেদ করি, এ বিচার ঠিক সেইরূপ “Law”র উপর “Morals” ইংরেজের পিনাল কোডেও লিখে যে, অবস্থাবিশেষে আততায়ীর বধজন্য দণ্ড নাই। কিন্তু সেই সকল অবস্থায় আততায়ীর বধ সর্ব্বত্র আধুনিক নীতিশাস্ত্রসঙ্গত নহে।

আনন্দগিরি এই শ্লোকের আর একটা অর্থ করিয়াছেন। তিনি বলেন, এমনও বুঝাইতে পারে যে, গুরু প্রভৃতি বধ করিলে আমরাই আততায়ী হইব; সুতরাং আমাদের পাপাশ্রয় করিবে। “গুরুভ্রাতৃসুহৃৎপ্রভৃতীনেতান্ হত্বা বয়মাততায়িনঃ স্যামঃ।

কৃতবর্মা

 

কৃতবর্মা , হিন্দু ধর্মের একজন বৃষ্ণী যাদব যোদ্ধা কৌরবদের হয়ে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে লড়ে মহাভারতে তাকে একটি গৌণ চরিত্র হিসেবে দেখা যায়   এফই পারগিটারের মতে , তিনি যদু রাজবংশের অন্ধক বংশে জন্মগ্রহণকারী হৃদিকার পুত্র ছিলেন

কৃতবর্মা রাজা সত্রাজিতের কাছ থেকে কিংবদন্তি শ্যামান্তক রত্ন চুরিতে উত্সাহিত করেছিলেন বা কিছু বিবরণে অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায় তার বন্ধু আকুরার সাথে , তিনি শতধন্বকে সত্রাজিতকে হত্যা করতে এবং নিজের জন্য গহনা চুরি করতে বাধ্য করেছিলেন বলে কথিত আছে। শতধন্বকে পরবর্তীকালে কৃষ্ণের দ্বারা হত্যা করা হয়েছিল, যদিও তার কাছে আর রত্ন ছিল না, এটি অক্রুরা এবং কৃতবর্মাকে নিরাপদ রাখার জন্য দিয়েছিলেন। শ্যামান্তকের অক্রুর অধিকার আবিষ্কারের কারণে দ্বারকায় বা অন্যান্য বিবরণে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে , কৃতবর্মা এবং তাকে রত্নটি হস্তান্তর করার জন্য শহরে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত, কৃষ্ণ সিদ্ধান্ত নেন যে অক্রুর রত্নটি তার কাছে রাখতে হবে। [ ]

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ

কৃতবর্মা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরব পক্ষ বেছে নিয়েছিলেন যখন দুর্যোধন তাকে একটি অক্ষৌহিনী ধার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সহায়তা চাওয়া হয়েছিল

যুদ্ধের প্রথম দিনে তিনি সাত্যকির সাথে দ্বৈত যুদ্ধ করেন মহারথী হিসাবে , ভীষ্ম দ্বারা স্থাপিত উড়ন্ত বগলা গঠনের মাথায় স্থাপন করা হয়েছিল সমগ্র যুদ্ধে তিনি বেশ কিছু সংঘাতে লিপ্ত হন। তিনি একক যুদ্ধে ভীমের কাছে পরাজিত হন এবং সাত্যকির বিরুদ্ধে আরেকটি লড়াইয়ে আহত হন। তিনি ধৃষ্টদ্যুম্নের বিরুদ্ধে এবং অর্জুন , ভীম এবং সাত্যকির বিরুদ্ধে একটি দ্বন্দ্ব যুদ্ধ করেছিলেন। সে অভিমন্যুকে আক্রমণ করে তার ঘোড়াকে হত্যা করে। অর্জুনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর, তিনি যুদ্ধে যুধুমন্যু এবং উত্তমৌজদের সাথে দেখা করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিখণ্ডী , ভীম যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করেন। দ্রোণের মৃত্যুর পর তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান তিনি পান্ডবদের বিরুদ্ধে অশ্বত্থামার প্রতিহিংসার কাজে অংশ নিয়েছিলেন এবং তাদের শিবিরে আগুন লাগিয়েছিলেন যখন তাদের যোদ্ধারা ঘুমিয়ে ছিল।  যুদ্ধের পর, তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে তার পুত্র দুর্যোধনের মৃত্যুর খবর জানান এবং বাড়ি ফিরে আসেন। তিনি যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞে আবির্ভূত হন।

 

যদু গণহত্যা: মৌসালা পর্ব

মৌসালা পর্বে কৃতবর্মা এবং সাত্যকির মধ্যে দ্বন্দ্ব হল যদু হত্যাকাণ্ডের জন্য উস্কানিমূলক ঘটনা, যার ফলস্বরূপ প্রভাসে যদু জাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধ্বংস হয়। মদ খাওয়ার কারণে মদ্যপ হয়ে, সাত্যকি পাণ্ডব শিবিরের যোদ্ধাদের ঘুমন্ত অবস্থায় অনৈতিক হত্যার জন্য কৃতবর্মার ক্ষত্রিয় জন্মকে উপহাস করেছিলেন বলে কথিত আছে, এই বিশ্বাসে যে এই কাজের জন্য তাকে কখনও ক্ষমা করা হবে না। জবাবে, কৃতবর্মা সাত্যকিকে বীরত্বপূর্ণ আচরণের জন্য অভিযুক্ত করেন যখন শেষোক্তরা ভুরিশারবসকে আক্রমণ করেছিল যখন তিনি অস্ত্র রেখেছিলেন। সাত্যকি তাকে সত্রাজিতের কাছ থেকে শ্যামন্তক রত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে তার অন্যায় ভূমিকার কথা মনে করিয়ে দিয়ে পাল্টা জবাব দেয় সত্যভামার শোক দেখে , সাত্যকি তার প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং অবিলম্বে কৃতবর্মার শিরচ্ছেদ করেছিলেন। ভোজ এবং অন্ধকদের গোষ্ঠী একে অপরের সাথে যুদ্ধ শুরু করে, যদু হত্যাকাণ্ড শুরু করে।

 

বলরাম

 

বলরাম  একজন হিন্দু দেবতা এবং কৃষ্ণের বড় ভাই তিনি জগন্নাথ ঐতিহ্যে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, ত্রয়ী দেবতাদের একজন। তিনি হলধারা , হলায়ুধা , বলদেব , বলভদ্র , এবং সংকর্ষনা নামেও পরিচিত

প্রথমত  তাকে হালা ( লাঙ্গালা , "লাঙ্গল") এর সাথে যুক্ত করেছে কৃষিকাজ এবং কৃষকদের সাথে তার দৃঢ় সম্পর্ক থেকে, দেবতা হিসেবে যিনি প্রয়োজনের সময় অস্ত্র হিসেবে কৃষি সরঞ্জাম ব্যবহার করতেন, এবং পরবর্তী দুটি তার শক্তিকে নির্দেশ করে।

মূলত একজন কৃষি-সাংস্কৃতিক দেবতা, বলরামকে বেশিরভাগই আদিশেশের অবতার হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে , দেবতা বিষ্ণুর সাথে সম্পর্কিত সর্প যখন কিছু বৈষ্ণব ঐতিহ্য তাকে বিষ্ণুর অষ্টম অবতার হিসাবে বিবেচনা করে, জয়দেবের সাথে   গীতগোবিন্দ (c.1200) "বলরামকে অন্তর্ভুক্ত করা প্যান্থিয়ন" বিষ্ণুর 10টি প্রধান অবতারের নবম হিসাবে

ভারতীয় সংস্কৃতিতে বলরামের তাৎপর্য প্রাচীন শিকড় রয়েছে। শিল্পকর্মে তার চিত্রটি সাধারণ যুগের শুরুর কাছাকাছি এবং মুদ্রায় দ্বিতীয় শতাব্দীর BCE তারিখের।  জৈন ধর্মে, তিনি বলদেব নামে পরিচিত, এবং তিনি ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য কৃষক-সম্পর্কিত দেবতা।

বলরাম হলেন একজন প্রাচীন দেবতা, ভারতীয় ইতিহাসের মহাকাব্য যুগে প্রত্নতাত্ত্বিক এবং মুদ্রাসংক্রান্ত প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত একজন বিশিষ্ট দেবতা। নাগা (অনেক মাথাওয়ালা সর্প), একটি লাঙ্গল এবং জল দেওয়ার পাত্রের মতো অন্যান্য খামারের নিদর্শনগুলির সাথে তার মূর্তিটি প্রদর্শিত হয় , সম্ভবত একটি বুকোলিক, কৃষি সংস্কৃতিতে তার উত্স নির্দেশ করে।

বলরামের আখ্যান মহাভারত , হরিবংশ , ভাগবত পুরাণ এবং অন্যান্য পুরাণে পাওয়া যায় তিনি শঙ্করশনার ব্যুহ অবতার , শেশ লক্ষ্মণের দেবতাদের সাথে শনাক্ত করেন   বলরামের কিংবদন্তি শেশের অবতার, দেবতা-সর্প বিষ্ণুর উপর নির্ভর করে, বিষ্ণুর সাথে তাঁর ভূমিকা এবং সম্পর্ক প্রতিফলিত করে। যাইহোক, বলরামের পৌরাণিক কাহিনী এবং বিষ্ণুর দশ অবতারের সাথে তার সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে ছোট এবং বৈদিক-পরবর্তী, কারণ এটি বৈদিক গ্রন্থে পাওয়া যায় না।

বলরামের কিংবদন্তি মহাভারতের অনেক পর্বে (বই) পাওয়া যায় বই তিন ( বনপর্ব ) কৃষ্ণ এবং তাঁর সম্পর্কে বলে যে বলরাম হলেন বিষ্ণুর অবতার, অন্যদিকে কৃষ্ণ হলেন সমস্ত অবতার এবং অস্তিত্বের উৎস। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের কিছু শিল্পকর্মে , গুজরাটের মন্দির এবং অন্যত্র, উদাহরণস্বরূপ, বলদেব হলেন বিষ্ণুর অষ্টম অবতার, বুদ্ধ (বৌদ্ধধর্ম) বা অরিহন্ত (জৈনধর্ম) এর আগে।

বলরাম কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ থেকে ২য় শতক) একটি উল্লেখ পেয়েছেন, যেখানে হাডসনের মতে, তার অনুগামীদের কামানো মাথা বা বিনুনি করা চুলের সাথে "তপস্বী উপাসক" হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

 

বলদেওয়া হিসাবে বলরাম, মহাভারতের উপর ভিত্তি করে রচিত কাকাউইন কাব্য, 11 শতকের জাভানিজ পাঠ কাকাউইন ভারতায়ুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র

বলরাম ছিলেন প্রাচীনকালে সমকর্ষনা নামে একজন শক্তিশালী স্থানীয় দেবতা, যা খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী থেকে মথুরায় বৃষ্ণি বীরদের স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত খ্রিস্টীয় তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শতাব্দীতে কুষাণ যুগে বিষ্ণুর অবতারের ধারণা তৈরি হয়েছিল

ইন্দো-গ্রীক রাজা আগাথোক্লিসের অন্তর্গত প্রায় 185-170 খ্রিস্টপূর্বাব্দের মুদ্রাগুলি বলরামের মূর্তি গ্রীক শিলালিপি দেখায়। বলরাম-সম্দর্শনকে সাধারণত তার ডান হাতে একটি গদা নিয়ে দাঁড়িয়ে এবং বাম হাতে একটি লাঙ্গল ধরে দেখানো হয়। এই মুদ্রার অন্য দিকে বাসুদেব-কৃষ্ণ শঙ্খ চক্র ধারণ করেছেন।

বলরাম ছিলেন বাসুদেবের পুত্র মথুরার অত্যাচারী দুষ্ট রাজা কামসা তার চাচাতো বোন দেবকীর সন্তানদের হত্যা করার জন্য অভিপ্রায় করেছিল , একটি ভবিষ্যদ্বাণীর কারণে যে সে তার অষ্টম সন্তানের হাতে মারা যাবে। হরিবংশ বলে যে কামসা বন্দী দেবকীর প্রথম ছয় সন্তানকে পাথরের মেঝেতে আঘাত করে নবজাতককে হত্যা করেছিল বলরাম যখন গর্ভধারণ করেছিলেন, বিষ্ণু হস্তক্ষেপ করেছিলেন, হিন্দু কিংবদন্তিগুলি বর্ণনা করেছিলেন; তাঁর ভ্রূণ দেবকীর গর্ভ থেকে বাসুদেবের প্রথম স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে স্থানান্তরিত হয় কিছু গ্রন্থে, এই স্থানান্তরটি বলরামকে সংকর্ষনা (যাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল) উপাধি দেয়। বলরাম তার ছোট ভাই কৃষ্ণের সাথে তার পালক-পিতা-মাতার সাথে, গোপালক নন্দের পরিবারে এবং তার স্ত্রী যশোদার সাথে বেড়ে ওঠেন ভাগবত পুরাণের 10 অধ্যায় এটিকে নিম্নরূপ বর্ণনা করেছে:

সমস্ত কিছুর স্বয়ং ভগবান তাঁর একীভূত চেতনার (যোগমায়া) সৃজনশীল শক্তিকে বলরাম এবং কৃষ্ণ হিসাবে তাঁর নিজের জন্মের পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন। তিনি বলরাম দিয়ে শুরু করেন। সমগ্র শেশ, যা আমার আবাস, দেবকীর গর্ভে একটি ভ্রূণ হবে যা আপনি রোহিণীর গর্ভে প্রতিস্থাপন করবেন।

তাঁর নাম রাখা হয়েছিল রাম, কিন্তু তাঁর মহান শক্তির কারণে তাঁকে বলরাম, বলদেব বা বলভদ্র বলা হত, যার অর্থ শক্তিশালী রাম তিনি শ্রাবণ পূর্ণিমায় জন্মগ্রহণ করেন , যা রক্ষা বন্ধনের উপলক্ষ্যের সাথে মিলে যায়

 

শৈশব এবং বিবাহ

কৃষ্ণ এবং বলরাম ব্রাহ্মণ সন্দীপানির সাথে অধ্যয়ন করছেন

একদিন, নন্দ নবজাতকের নাম কৃষ্ণ বলরাম রাখার জন্য ঋষি গর্গমুনি , তাঁর পুরোহিতের উপস্থিতির অনুরোধ করেন গর্গা উপস্থিত হলে নন্দ তাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেন এবং নামকরণ অনুষ্ঠানের অনুরোধ করেন। গর্গামুনি তখন নন্দকে স্মরণ করিয়ে দেন যে কংস দেবকীর পুত্রের সন্ধান করছেন এবং যদি তিনি ঐশ্বর্যের সাথে অনুষ্ঠানটি করেন তবে তা তাঁর নজরে আসবে। তাই নন্দ গর্গকে গোপনে অনুষ্ঠান করতে বললেন এবং গর্গ তাই করলেন:

 

রোহিণীর পুত্র বলরাম অন্যের অতীন্দ্রিয় আনন্দ বৃদ্ধি করেন বলে তার নাম রাম এবং অসামান্য শক্তির কারণে তাকে বলদেব বলা হয়। তিনি যদুদেরকে তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করার জন্য আকৃষ্ট করেন এবং তাই তাঁর নাম সংকর্ষণ।

যখন তার বড় ভাই, খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তখন গোয়ালের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়তেন, ভগবান কৃষ্ণ তাকে ব্যক্তিগতভাবে তার পায়ে মালিশ করে এবং অন্যান্য সেবা প্রদান করে শিথিল করতে সাহায্য করতেন।

বলরাম তার শৈশব তার ভাই কৃষ্ণের সাথে গরু পালনকারী হিসাবে অতিবাহিত করেছিলেন। তিনি কংস কর্তৃক প্রেরিত ধেনুকা , সেইসাথে রাজার প্রেরিত প্রলাম্বা মুষ্টিকা কুস্তিগীরকে হত্যা করেছিলেন। কৃষ্ণ যখন কংসকে বধ করছিলেন তখন বলরাম তার পরাক্রমশালী সেনাপতি কালবক্রকে হত্যা করেছিলেন দুষ্ট রাজাকে হত্যা করার পর, বলরাম এবং কৃষ্ণ তাদের শিক্ষার জন্য উজ্জয়িনীতে সন্দীপানীর আশ্রমে যান বলরাম রাজা কাকুদমির কন্যা রেবতীকে বিয়ে করেছিলেন তাঁর দুটি পুত্র ছিল - নিশাথা এবং উলমুকা এবং একটি কন্যা - শশিরেখা যা বৎসলা নামেও পরিচিত।

বলরাম হলেন বিখ্যাত কৃষক, পশুসম্পদ সহ কৃষির অন্যতম মূর্ত প্রতীক যার সাথে কৃষ্ণ যুক্ত। লাঙ্গল বলরামের অস্ত্র। ভাগবত পুরাণে , তিনি এটিকে অসুরদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য ব্যবহার করেন, যমুনা নদীকে বৃন্দাবনের কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্য একটি পথ খনন করেন এবং তিনি হস্তিনাপুরের পুরো রাজধানী গঙ্গা নদীতে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটি ব্যবহার করেন।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ

বলরাম কৌরবদের দুর্যোধন এবং পাণ্ডবদের ভীম উভয়কেই গদা দিয়ে যুদ্ধের কলা শিখিয়েছিলেন কৌরব পাণ্ডবদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে বলরাম উভয় পক্ষের দায়িত্ব পালন করেন এবং তাই নিরপেক্ষ ছিলেন। যুদ্ধের সময় তিনি তার ভাগ্নে প্রদ্যুম্ন এবং অন্যান্য যাদবদের সাথে তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন এবং শেষ দিনে ফিরে এসেছিলেন, তার শিষ্যদের মধ্যে লড়াই দেখতে। ভীম যখন দুর্যোধনকে তার উরুতে গদা দিয়ে আঘাত করে পরাজিত করেন, যুদ্ধের নিয়মের একটি ঐতিহ্যগত লঙ্ঘন, বলরাম ভীমকে হত্যা করার হুমকি দেন। এটি প্রতিরোধ করা হয়েছিল যখন কৃষ্ণ বলরামকে ভীমের ব্রত স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন - দুর্যোধনকে ভীমের স্ত্রী দ্রৌপদীর কাছে উন্মুক্ত করে উরুটি পিষে হত্যা করার জন্য

অন্তর্ধান

ভাগবত পুরাণে বর্ণনা করা হয়েছে যে, বলরাম যদু বংশের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর এবং কৃষ্ণের অন্তর্ধান প্রত্যক্ষ করার পর, তিনি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসেছিলেন এবং এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

কিছু শাস্ত্রে একটি মহান সাদা সাপ বর্ণনা করা হয়েছে যেটি বলরামের মুখ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, তার পরিচয় অনন্ত- শেষা , বিষ্ণুর একটি রূপ হিসাবে তিনি যে স্থান থেকে প্রস্থান করেছিলেন সেটি গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরের কাছে অবস্থিত

মন্দিরের কাছে অবস্থিত গুহাটি সম্পর্কে ভেরাভালের স্থানীয় লোকদের বিশ্বাস, বলরামের মুখ থেকে যে সাদা সাপটি বেরিয়েছিল তা সেই গুহায় ঢুকে পাটালায় ফিরে যায়

 

অশ্বিনীকুমার

অশ্বিনীকুমারদ্বয়, নামান্তরে অশ্বিদ্বয়, মূলত বৈদিক দেবতা। তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সবিত (সূর্যদেব) শরণ‍্যু, নামান্তরে সংজ্ঞা, দেবীর যমজ পুত্রদ্বয় হিসাবে উল্লিখিত পরিচিত। ঋগ্বেদে এই যমজ দেবতাদের ভিষক বা চিকিৎসক হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সূর্য সংজ্ঞা অশ্বরূপে সঙ্গম করার ফলে এই দুই যমজ পুত্রের জন্ম হয়েছিল। বহু মূর্তিতেই অশ্বিনীকুমারদের তাই অশ্বমুখ দেখা যায়। অশ্বরূপে শরণ‍্যুসঙ্গমকালে সূর্য আরও এক পুত্র লাভ করেন। সেই তৃতীয় পুত্রের নাম রেবন্ত। রেবন্ত অশ্বদের অধিপতি দেবতা। অশ্বিনী সূর্যের অপর নাম। তাই সূর্যপুত্র এই দুই যমজ দেবতার নাম অশ্বিনীকুমারদ্বয়। এঁদের ভিতর যিনি অগ্রজ, তার নাম নাসত‍্য এবং যিনি অনুজ, তার নাম দস্র। ঋগ্বেদে অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের উদ্দেশ‍্যে একটি সূক্ত গীত হয়েছে। ক্লাসিকাল সংস্কৃত সাহিত‍্যেও অশ্বিনীকুমারদ্বয় বারবার উল্লিখিত হয়েছেন। মহাভারতের আদিপর্বের পৌষ‍্যপর্বাধ‍্যায়ে উপমন‍্যোপাখ‍্যানে দেব-চিকিৎসক হিসাবে তারা উল্লেখযোগ‍্য ভূমিকা পালন করেছেন। মহাভারতের আদিপর্বেরই সম্ভবপর্বাধ‍্যায়ের অন্তর্গত যুধিষ্ঠিরাদির জন্মবৃত্তান্ত থেকে জানা যায় পাণ্ডুর কনিষ্ঠা পত্নী মাদ্রী সুদর্শন চিরতরুণ এই দেবভিষকদ্বয়ের ঔরসে ক্ষেত্রজ যমজ পুত্র লাভ করেন যাঁরা পিতা-দেবতাদের মতনই সুদর্শন অশ্ববান হয়েছিলেন। নাসত‍্যের ঔরসে নকুল দস্রের ঔরসে সহদেব জন্মলাভ করেন। নকুল সহদেব পিতৃ-পরিচয়ে আশ্বিনেয় নামেও পরিচিত। একবার চ্যবনের রূপবতী পত্নী স্নানরতা সুকন্যাকে দেখে মোহিত হয়ে ওঁরা সুকন্যাকে প্রস্তাব করেন চ্যবনকে ত্যাগ করে ওঁদের একজনকে বিবাহ করতে। সুকন্যা তাতে সম্মত হন না। ঘটনাচক্রে ওঁদের প্রসাদে চ্যবন তার যৌবন ফিরে পান। চ্যবনের তখন ওঁদের বর দেন যে, দেব-কর্মচারী হলেও ওঁদের সোমপান করবার অধিকার থাকবে।

ব্রতের ভাতের পূজা

স্বর্গের চিকিৎসক অশ্বিনী কুমারদ্বয় সূর্যদেব সংজ্ঞা পুত্র। অভিশাপগ্রস্ত সংজ্ঞা জগজ্জননী পার্বতীর কাছে নিজের দুর্দশা থেকে মুক্তি চাইলে পার্বতী এক মুষ্টি চাল দিয়ে তাকে বলেছিলেন-আশ্বিন মাসের শেষ তারিখ পূর্বরাত্রে শেষ দিবস রেখে এই চাল ভক্তিপূর্বক রন্ধন শেষে মহাদেবের অর্চনা করতে হবে এবং কার্তিক মাসের ১ম দিবসে সেই অন্ন ভক্ষণে মনস্কামনা পূর্ণ হবে। সে নিয়ম মেনে রোগ অভিশাপমুক্ত হয়েছিলেন দেবী সংজ্ঞা।

 

অশ্বমেধ যজ্ঞ

 অশ্বমেধ হচ্ছে বৈদিক ধর্মের শ্রৌত ঐতিহ্য অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় যজ্ঞ অনুষ্ঠানগুলির

একটি। প্রাচীন ভারতে রাজারা তাদের সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব নতুনত্বকরণের জন্য এই বৈদিক যজ্ঞের আয়োজন করতেন। সাম্রাজ্যের প্রসার, ক্ষমতা ও গৌরব অর্জন, প্রতিবেশী সাম্রাজ্যের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা হল যজ্ঞের উদ্দেশ্য। এই যজ্ঞে সাম্রাজ্যের প্রসারের জন্য যজ্ঞনিয়ম অনুসারে একটি বলবান অশ্বকে পৃথিবী ভ্রমণের জন্য মুক্ত করা হয়। অশ্ব যে যে স্থানে গমন করে, যজ্ঞকারী সেই স্থান অধিকার করেন। অশ্বকে কোনো নরপতি আটক করলে তার সাথে অশ্ব-রক্ষকের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এক বছরের মধ্যে কোনো শত্রুপক্ষ যদি অশ্বটিকে হত্যা বা বন্দী করতে না পারেন, তখন একে রাজ্যে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর অশ্বসহ অন্যান্য প্রাণীকে খাবার খাওয়ানো হয় ও পরে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং যজ্ঞ শেষে রাজাকে অধিকৃত অঞ্চলসমূহের "চক্রবর্তী সম্রাট" হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে বর্ণিত অশ্বমেধ যজ্ঞ সবচেয়ে পরিচিত পাঠ্য। কৃষ্ণ এবং ব্যাস সম্রাট যুধিষ্ঠিরকে এই যজ্ঞ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এছাড়াও দশরথ, পরীক্ষিত, জন্মেজয় অশ্বমেধযজ্ঞ সম্পন্ন করেছিলেন।

 

বিগত শহস্র বছরের মাঝে মাত্র দুজন প্রাচীন শাসক এই যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন বলে নথিভুক্ত করা হয়। ১৭৪১ সালে দ্বিতীয়টি জয়পুরের মহারাজা জয় সিং এই যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন।

 

ব্যুৎপত্তি

মেধ শব্দের অন্যতম অর্থ হচ্ছে “যজ্ঞ। বৈদিক সংস্কৃত ধাতুপাঠ অনুযায়ী মেধৃ ধাতুর ‘মেধা সংগমন য়োর্হিংসায়াং চ এই ধাতু পাঠ অনুযায়ী মেধার তিনটি অর্থ হয়- শুদ্ধবুদ্ধি বৃদ্ধি করা, লোকদের মধ্যে একতা ও প্রেম বৃদ্ধি করা এবং হিংসা। অরবিন্দ ঘোষও উক্ত অর্থে মত দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, "অশ্ব" বা ঘোড়া হলো শক্তির প্রতীক, যে সার্বজনীন কার্যক্রম চালায়।

শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে, অশ্ব শব্দ বীর্যবাচক, দেশবোসীর শৌর্য-বীর্য বৃদ্ধি করা এবং রাষ্ট্রকে সম্যক্ পরিচালনা করা অশ্বমেধ শব্দের অভিপ্রায়।

দয়ানন্দ সরস্বতীর মতে, "অশ্বমেধ" এর তিনটি অর্থ, যথা: একজন রাজার ন্যায়পরায়ণ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে তার প্রজাদের শাসন করা, একজন বিদ্বান ব্যক্তির মানুষকে বিনামূল্যে জ্ঞানের উপহার দেয়া এবং বায়ু দূষণ মুক্ত রাখার জন্য ঘি এবং গন্ধযুক্ত ও পুষ্টিকর পদার্থ আগুনে পোড়ানো।

সুভাষ কাকের মতে, "অশ্ব" অর্থ সূর্য আর "অশ্বমেধ" হলো সূর্যের বার্ষিক নবায়নের যজ্ঞ, নববর্ষে এবং রাজার শাসন পুনর্নবীকরণ এর সহগামী। আধ্যাত্মিক স্তরে, এটি অভ্যন্তরীণ সূর্যের সাথে পুনরায় যুক্ত হওয়ার একটি উদযাপন।

স্বামী পূর্নচৈতন্যর মতে, বৈদিক সংস্কৃত ও ধ্রুপদী সংস্কৃত আলাদা হওয়ায় ধ্রুপদী সংস্কৃতে "অশ্ব" হলো ঘোড়া আর বৈদিক সংস্কৃতে "অশ্ব" এর দুটি অর্থ, যথা: আত্মা ও রাষ্ট্র।

অন্যদিকে,রাল্ফ টি.এইচ. গ্রিফিথ সায়ণ ভাষ্যের অনুকরণে মতে দিয়েছেন, "অশ্ব" হলো "ঘোড়া" ও "মেধ" হলো "বলিদান"। মনির-উইলিয়ামস্ সংস্কৃত অভিধানেও উক্ত অর্থ পাওয়া যায়।

বাল্মিকী রামায়নে অশ্বমেধ যজ্ঞের বর্ণনা দেখা যায়। রাজা দশরথ পুত্রপ্রাপ্তির কামনায় এক অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। উক্ত বর্ণনায় রাজা যজ্ঞে আগত সকল সৎ এবং উপযুক্ত ব্যাক্তিকে দান ও ভোজনের ব্যবস্থা করেছিলেন। যজ্ঞে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য, শুদ্র -চারি বর্ণের বহু ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে অনেকেই বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন, এবং শত শত প্রাণী, এবং প্রতিটি পর্যায়ে অনেকগুলি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত আচার-অনুষ্ঠান ছিলো। (কিছু অনুবাদে যজ্ঞে বলি ও আহূতি প্রসঙ্গ না এলেও কিছু অনুবাদে যজ্ঞের এক পর্যায়ে ঘোড়া বধ এবং অগ্নিতে আহুতি দেবার কথা এসেছে।

মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে দেখা যায়, ব্যাসদেবের পরামর্শে রাজা যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু করেন। অশ্বমেধ যজ্ঞে রাষ্ট্রের প্রগতি ও প্রজাগণের উন্নতির জন্য রাজা বহু দান-দক্ষিণা করেন এবং রাজ্য প্রসারের জন্য যজ্ঞনিয়ম অনুসারে একটি বলবান অশ্বকে পৃথিবী ভ্রমণের জন্য মুক্ত করা হয়। অশ্ব যেসব স্থানে গমন করে, যজ্ঞকারী সেই স্থান অধিকার করেন। অশ্বকে কোনো নরপতি আটক করলে তার সাথে অশ্ব-রক্ষকের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুধিষ্ঠিরের সেই যজ্ঞের অশ্বকে রক্ষার জন্য অর্জুন নিযুক্ত হয়েছিলেন। অর্জুন পৃথিবীজয়ের পর হস্তিনাপুরে ফিরে আসলে অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু হয়। (কিছু অনুবাদক মহাভারতের অশ্বমেধিক পর্বে যজ্ঞ শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করেননি। অন্যদিকে, কিছু অনুবাদক অশ্বমেধিক পর্বে যজ্ঞ শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন যেখানে যজ্ঞে ঘোড়া বধ করা হয়।

অশ্বমেধ যজ্ঞে অশ্ব বধ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মহাভারতের অশ্বমেধিক পর্বেই যজ্ঞে পশু হত্যার বিরোধিতা দেখা যায়। যজ্ঞে বলি নিয়ে একটি উপাখ্যানে বলা হয়েছে, দেবরাজ ইন্দ্রের অশ্বমেধ যজ্ঞে বলির সময় উপস্থিত হলে মহর্ষিদের মাঝে শাস্ত্রবিহিত কর্ম নির্ণয়ে বাদানুবাদ শুরু হয়। মহর্ষিগণ বলির পরিবর্তে ত্রৈবার্ষিক বীজ দ্বারা যজ্ঞ সম্পন্ন করা শাস্ত্রানুসারে সনাতন ধর্ম বিহিত কর্ম বলে সিদ্ধান্ত দেন।

শান্তিপর্বে একটি বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়, মহারাজ উপরিচর তার অশ্বমেধ যজ্ঞে হত্যার পরিবর্তে অরণ্যসম্ভূত বস্তু (ধান্য) দ্বারা যজ্ঞ পরিচালনা করেছিলেন। এ পর্বে আরও দেখা যায়, দেবতা ও দেবর্ষিগণের মধ্যে "অজা" এর যাজ্ঞিক অর্থ নিয়ে মতভেদ হয়। দেবতারা এর অর্থ বলেন "ছাগল", কিন্তু দেবর্ষিগণের মতে এর অর্থ হচ্ছে "খাদ্যশস্য", কোনো পশু নয়। কারণ, যজ্ঞে পশু হত্যা করা সৎপুরুষদের ধর্ম নয়।

বেদের সায়ণ, মহীধর ও উব্বট ভাষ্যেও অশ্ব বধ এবং রাণীকে মৃত অশ্বের সাথে মিলিত হওয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়। দয়ানন্দ সরস্বতী তার ঋগ্বেদীয়ভাষ্য ভূমিকায় উক্ত ভাষ্যকারদের মতসমূহের বিরোধিতা করেছেন। তার মতে সেখানে অশ্ব বধ এবং রাণীকে মিলিত হওয়ার কথা বলা হয়নি।

চারবেদের অনেক মন্ত্রে অশ্ব হত্যার নিষেধ পাওয়া যায়। যেমন, অথর্ববেদে বলা হয়েছে,

রাজসূয়, বাজপেয়, অগ্নিষ্টোম এইসব যজ্ঞ অধ্বর অর্থাৎ হিংষারহিত। অর্ক এবং অশ্বমেধ যজ্ঞ প্রভূর মধ্যে স্থিত, যাহা জীবের বৃদ্ধিকারী এবং অত্যন্ত হর্ষদায়ক।

অথর্ববেদ, ১১।৭।৭ (শৌনক শাখা)

শতপথ ব্রাহ্মণের অশ্বমেধ কান্ডে এ যজ্ঞের বর্ণনা পাওয়া যায়। এ বর্ণনা অনুযায়ী, রাজাকে অশ্ব এবং প্রজা হচ্ছে অশ্ব ব্যতীত অপরাপর পশুর নাম। রাজ্যপালন এবং রাজ্যের উন্নতির জন্য কর্ম (যেমন: কর ধার্য করা)-কে বলা হয় অশ্বমেধ।অশ্ব হচ্ছে রাজ্যের প্রতিকী নাম। রাজা কর্তৃক রাজ্যের উন্নতির জন্য যে যজ্ঞ করা হয়, তাই অশ্বমেধ যজ্ঞ। আর রাজার স্ত্রীগণ রাজ্য পালনের জন্য সন্তানদের শিক্ষা প্রদান করে তাদের আত্মা ও শরীরের বল বৃদ্ধি করবেন এবং গর্ভস্বরূপ প্রজাসভায় পুত্ররূপ প্রজাকে সুখপ্রাপ্তির ইচ্ছা করবেন।

এছাড়া পদ্ধতিতে দেখা যায়, যজ্ঞের ঘোড়াটির অগ্রভাগ সাদা ও পশ্চাৎভাগ কালো বর্ণের হবে। ৪ চক্ষুযুক্ত কুকুর বধের দ্বারা সংকল্প করতে হবে। এক্ষেত্রে ঘোড়াটিকে সহস্র গো এর সমান উল্লেখ করা হয়েছে৷ প্রকৃতপক্ষে অশ্ব এক্ষেত্রে সূর্য আর কুকুরটি লুব্ধক (cirius) কে নির্দেশ করে যা "Dog Star" নামে পরিচিত। যার কেন্দ্রে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি বিদ্যমান। সকালে সূর্যোদয় এক্ষত্রে তারার উজ্জ্বলতাকে ম্রিয়মান করে। যজ্ঞে প্রয়োজনীয় স্থাপনার মধ্যে ২১ টি খুঁটি এবং একটি অগ্নি বেদী নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঘোড়াটি তার ভ্রমণ শুরু করার আগে, জ্যোতিষীদের দ্বারা নির্বাচিত মুহুর্তে, বাড়িতে একটি অনুষ্ঠান (সংকল্প/ দীক্ষা) ও অভিষেকের দ্বারা বছরব্যাপী যাত্রা শুরু করে। যজ্ঞের ঘোড়া ফিরে এলে বিভিন্ন আচার পালিত হয়। রানিরা তখন একে ঘিরে ৬ বার প্রদক্ষিণ ও মন্ত্রোচ্চারণ করেন। প্রধান মহিষী যজ্ঞ কুন্ডের নিকটে আসন গ্রহন করে (উত্তরীয় পরিধান করে) আহুতি সমাপন করেন।

শ্লোক: 37:
যদ্যপেতে ন পশ্যন্তি লোভোপহতচেতসঃ ।
কুলক্ষয়কৃতং দোষং মিত্রদ্রোহে চ পাতকম্ ॥৩৭॥

শ্লোক: 38:
কথং ন জ্ঞেয়মস্মাভিঃ পাপাদস্মান্নিবর্তিতুম্ ।
কুলক্ষয়কৃতং দোষং প্রপশ্যদ্ভির্জনার্দন ॥৩৮॥


অনুবাদ : হে জনার্দন ! যদিও এরা রাজ্যলোভে অভিভূত হয়ে কুলক্ষয় জনিত দোষ ও মিত্রদ্রোহ নিমিত্ত পাপ লক্ষ্য করছে না, কিন্তু আমরা কুলক্ষয় জনিত দোষ লক্ষ্য করেও এই পাপ কর্মে কেন প্রবৃত্ত হব ?


শ্লোক: 39:
কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি কুলধর্মাঃ সনাতনাঃ ।
ধর্মে নষ্টে কুলং কৃৎস্নমধর্মোহভিভবত্যুত ॥৩৯

অনুবাদ : কুলক্ষয় হলে সনাতন কুলধর্ম বিনষ্ট হয় এবং তা হলে সমগ্র বংশ অধর্মে অভিভূত হয়।


শ্লোক: 40:
অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রীয়ঃ ।
স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্করঃ ॥৪০॥

অনুবাদ : হে কৃষ্ণ ! কুল অধর্মের দ্বারা অভিভূত হলে কুলবধূগণ ব্যভিচারে প্রবৃত্ত হয় এবং হে বার্ষ্ণেয় ! কুলস্ত্রীগণ অসৎ চরিত্রা হলে অবাঞ্ছিত প্রজাতি উৎপন্ন হয়।


শ্লোক: 41:
সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ ।
পতন্তি পিতরো হ্যেষাং লুপ্তপিণ্ডোদকক্রিয়াঃ ॥৪১॥

সঙ্করঃ, নরকায়, এব, কুলঘ্নানাম্, কুলস্য, চ,
পতন্তি, পিতরঃ, হি, এষাম্, লুপ্ত-পিণ্ড-উদক-ক্রিয়াঃ ॥৪১॥
অনুবাদ : বর্ণসঙ্কর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে কুল ও কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়। সেই কুলে পিণ্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লোপ পাওয়ার ফলে তাদের পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃপতিত হয়।


শ্লোক: 42:
দোষৈরেতৈঃ কুলঘ্নানাং বর্ণসঙ্করকারকৈঃ ।
উৎসাদ্যন্তে জাতিধর্মাঃ কুলধর্মাশ্চ শাশ্বতাঃ ॥৪২॥

দোষৈঃ, এতৈঃ, কুলঘ্নানাম্, বর্ণ-সঙ্কর-কারকৈঃ,
উৎসাদ্যন্তে, জাতি-ধর্মাঃ, কুলধর্মাঃ, চ, শাশ্বতাঃ ॥৪২॥
অনুবাদ : যারা বংশের ঐতিহ্য নষ্ট করে এবং তার ফলে অবাঞ্ছিত সন্তানাদি সৃষ্টি করে, তাদের কুকর্মজনিত দোষের ফলে সর্বপ্রকার জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প এবং বংশের কল্যাণ-ধর্ম উৎসন্নে যায়। ফলে সনাতন জাতিধর্ম ও কুলধর্মও বিনষ্ট হয়।


শ্লোক: 43:
উৎসন্ন কুলধর্মাণাং মনুষ্যাণাং জনার্দন ।
নরকে নিয়তং বাসো ভবতীত্যনুশুশ্রুম ॥৪৩॥

উৎসন্ন-কুল-ধর্মাণাম্, মনুষ্যাণাম্, জনার্দন,
নরকে, নিয়তম্, বাসঃ, ভবতি, ইতি, অনুশুশ্রুম ॥৪৩॥
অনুবাদ : হে জনার্দন ! আমি পরম্পরাক্রমে শুনেছি যে, যাদের কুলধর্ম বিনষ্ট হয়েছে, তাদের নিয়ত নরকে বাস করতে হয়।

শ্লোক: 44:
অহো বত মহৎ পাপং কর্তুং ব্যাবসিতা বয়ম্ ।
যদ্ রাজ্যসুখলোভেন হন্তুং স্বজনমুদ্যতাঃ ॥৪৪॥

অহো, বত, মহৎ, পাপম্, কর্তুম্, ব্যাবসিতাঃ, বয়ম্,
যৎ, রাজ্য-সুখ-লোভেন, হন্তুম্, স্বজনম্, উদ্যতাঃ ॥৪৪॥
অনুবাদ : হায় ! কী আশ্চর্যের বিষয় যে, আমরা রাজ্যসুখের লোভে স্বজনদের হত্যা করতে উদ্যত হয়ে মহাপাপ করতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছি।


শ্লোক: 45:
যদি মামপ্রতিকারমশস্ত্রং শস্ত্রপাণয়ঃ ।
ধার্তরাষ্ট্রা রণে হন্যুস্তন্মে ক্ষেমতরং ভবেৎ ॥৪৫॥

যদি, মাম, অপ্রতিকারম্, অশস্ত্রম্, শস্ত্র-পাণয়ঃ,
ধার্তরাষ্ট্রাঃ, রণে, হন্যুঃ, তৎ, মে, ক্ষেমতরম্, ভবেৎ ॥৪৫॥
অনুবাদ : প্রতিরোধ রহিত ও নিরস্ত্র অবস্থায় আমাকে যদি শস্ত্রধারী ধৃতরাষ্ট্র্রের পুত্রেরা যুদ্ধে বধ করে, তা হলে আমার অধিকতর মঙ্গলই হবে।


শ্লোক: 46:
সঞ্জয় উবাচ
এবমুক্ত্বার্জুনঃ সংখ্যে রথোপস্থ উপাবিশৎ ।
বিসৃজ্য সশরং চাপং শোকসংবিগ্নমানসঃ ॥৪৬॥

এবম্, উক্ত্বা, অর্জুনঃ, সংখ্যে, রথ-উপস্থে, উপাবিশৎ,
বিসৃজ্য, সশরম্, চাপম্, শোক-সংবিগ্ন-মানসঃ ॥৪৬॥
অনুবাদ : সঞ্জয় বললেন- রণক্ষেত্রে এই কথা বলে অর্জুন তাঁর ধনুর্বাণ ত্যাগ করে শোকে ভারাক্রান্ত চিত্তে রথোপরি উপবেশন করলেন।


ওং তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে অর্জুনবিষাদযোগো নাম প্রথমোঽধ্যায়ঃ ॥১


Comments

Popular posts from this blog

শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা ( দশম অধ্যায় )

অকালবোধন ও রাজা রামচন্দ্র