শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা (প্রথম অধ্যায়)
শ্রী
শ্রী গীতা সহায়িকা
(
প্রথম অধ্যায় )
উৎসর্গ
দাদু
– ঁবৈদ্যনাথ সাহা
কর্ত্তামা
– ঁযমুনা রানী সাহা
শ্রীমদ্ভগবদগীতার
প্রথম অধ্যায় পুরোপুরি সাহিত্য। এখানে অনেক রথী মহারথীর নাম আছে যাদের সম্পর্কে জানতে
পারলে শ্রী গীতা পাঠ অনেকটা সহজ হয় । আমি চেষ্টা করেছি এই সব রথী মহারথী ও অধীরথীদের
চরিত্র গুলো বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে । আমি এর রচয়িতা
নয় বলা যায় আমি সংকলিত অথবা সংগ্রহ করেছি আপনার ও আমার জানার জন্য ।
আপনার
জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধির জন্য আমার সংগ্রহ আপনার কাজে লাগবে বলে আমি আশা করি । পরবর্তীতে
আমি চেষ্টা করব শ্রী গীতার বিভূতিযোগের সব চরিত্রগুলো সংগ্রহ করে আপনাদের সামনে উপস্থাপন
করার ।
আপনাদের
আশির্বাদ আমার পথ চলার পথের শক্তি ।
নারায়ন
চন্দ্র সাহা (
সভাপতি
বি
আর পি সার্বজনীন পূজা মন্দির
ভাষানটেক
, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ।
শ্রীমদ্ভগবদগীতা র প্রথম অধ্যায়ের শ্লোকের ব্যাখ্যাঃ
মহাভারতের ভীষ্ম পর্বের ২৫ থেকে ৪২ তম অধ্যায় শ্রী গীতা হিসাবে পঠিত হয় । এই ১৮ অধ্যায়ে মোট ৭০০ টি শ্লোক , তিনটি ষটক রয়েছে । প্রত্যেক ষটকে ৬ টি ক রে অধ্যায় । শ্রী গীতার চারটি চরিত্র ।
১) ধৃতরাষ্ট্র
২) সঞ্জয়
৩) অর্জুন
৪) শ্রী কৃষ্ণ
এখানে ধৃতরাষ্ট্রের একটি শ্লোক , সঞ্জয় এর ৪০টি শ্লোক অর্জুনের ৮৫টি শ্লোক ও শ্রী কৃষ্ণের ৫৭৪টি শ্লোক আছে ।
তিনটি ষটক যথাক্রমে
১) কর্ম ষটক
২) ভক্তি ষটক
৩) জ্ঞান ষটক
গীতার বিষয়বস্তু কৃষ্ণ ও পাণ্ডব রাজকুমার অর্জুনের কথোপকথন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু ঠিক আগে শত্রুপক্ষে আত্মীয়, বন্ধু ও গুরুকে দেখে অর্জুন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। এই সময় কৃষ্ণ তাকে ক্ষত্রিয় যোদ্ধার ধর্ম স্মরণ করিয়ে দিয়ে এবং বিভিন্ন প্রকার যোগশাস্ত্র ও বৈদান্তিক দর্শন ব্যাখ্যা করে তাকে যুদ্ধে যেতে উৎসাহিত করেন। তাই গীতাকে বলা হয় মানব ধর্মতত্ত্বের সংক্ষিপ্ত পাঠ এবং হিন্দুদের জীবনচর্যার ব্যবহারিক পথনির্দেশিকা।
গীতাকে মোক্ষশাস্ত্র নামেও অভিহিত করা হয়।
অষ্টাদশ শতকের পূর্বপর্যন্ত গীতা মহাভারতের অংশ হতে পৃথক ছিলনা। তবে শঙ্করাচার্য ৭৮৮-৮২০ খ্রিস্টাব্দের মাঝে গীতার ভাষ্য রচনা করেন। ১৮৭৫ সালের পূর্বপর্যন্ত বিভিন্ন মতের আরও ৫০জন গীতার ভাষ্য ও অনুবাদ করেন। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রথম ভাগে কম্পানির অর্থায়নে চার্লস উইলকিন্স মহাভারতের ভীষ্ম পর্বের, ২৫তম অধ্যায় হতে ৪২তম অধ্যায় পর্যন্ত ১৮টি অধ্যায়কে আলাদা করে ‘Dialogues of Kreeshna and Arjoon in Eighteen Lectures with Notes’ নামে প্রথম ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করেন৷
গীতা ৭০০টি শ্লোক নিয়ে ১৮টি অধ্যায়ে বিভক্ত।
| অধ্যায় | অধ্যায়ের নাম | শ্লোক |
| ১ | অর্জুন বিষাদ যোগ | ৪৭ |
| ২ | সাংখ্য যোগ | ৭২ |
| ৩ | কর্ম যোগ | ৪৩ |
| ৪ | জ্ঞান-কর্ম-সন্ন্যাস যোগ | ৪২ |
| ৫ | কর্ম-সন্ন্যাস যোগ | ২৯ |
| ৬ | আত্ম-সংযম যোগ | ৪৭ |
| ৭ | জ্ঞান-বিজ্ঞান যোগ | ৩০ |
| ৮ | অক্ষর-পরব্রহ্ম যোগ | ২৮ |
| ৯ | রাজ-বিদ্যা-রাজ-গুহ্য যোগ | ৩৪ |
| ১০ | বিভূতি যোগ | ৪২ |
| ১১ | বিশ্বরূপ-দর্শন যোগ | ৫৫ |
| ১২ | ভক্তি যোগ | ২০ |
| ১৩ | ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ-বিভাগ যোগ | ৩৪ |
| ১৪ | গুণত্রয়-বিভাগ যোগ | ২৭ |
| ১৫ | পুরুষোত্তম যোগ | ২০ |
| ১৬ | দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগ | ২৪ |
| ১৭ | শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ যোগ | ২৮ |
| ১৮ | মোক্ষ-সন্ন্যাস যোগ | ৭৮ |
| সর্বমোট | ৭০০ |
আসুন আমরা শ্রী গীতার প্রথম অথ্যায়ের প্রথম শ্লোক নিয়ে আলোচনা শুরু করি ।
ধৃতরাষ্ট্র উবাচ
ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ ।
মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয় ॥১॥
ধর্মক্ষেত্রে, কুরুক্ষেত্রে, সমবেতাঃ, যুযুৎসবঃ,
মামকাঃ, পাণ্ডবাঃ, চ, এব, কিম্, অকুর্বত, সঞ্জয় ॥১॥
এখানে
ধৃতরাষ্ট্র অজ্ঞানরুপ এবং সংযমরূপ হলেন
সঞ্জয়। অজ্ঞান মানে অন্তরালে থাকে।
অজ্ঞানাবৃত মন ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ;
কিন্তু সংযমরূপ সঞ্জয়ের মাধ্যমে তিনি দেখেন ও
শোনেন। ধৃতরাষ্ট্র জানেন যে, পরমাত্মাই একমাত্র
সত্য, পুনশ্চ যতক্ষণ এর থেকে উৎপন্ন
মোহরূপ দুর্যোধন জীবিত থাকে, ততক্ষণ এর দৃষ্টি সর্বদা
কৌরবগণের উপরেই থাকে অর্থাৎ বিকারের
উপরেই থাকে।
শরীর
একটি ক্ষেত্র তা আগেই বলা
হয়েছে। যখন হৃদয় -দেশে
দৈবী সম্পত্তির বাহুল্য ঘটে, তখন এই
শরীর ধর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়। 'কুরু' অর্থ
কর- এই শব্দ আদেশাত্মক।
শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন - " প্রকৃতিজাত তিনটি গুণের বশীভূত হয়েই মানুষ কর্ম
করে। " সে ক্ষণমাত্রও কর্ম
না করে থাকতে পারে
না, গুণত্রয় তাকে দিয়ে করিয়ে
নেয়৷ ঘুমন্ত অবস্থাতেও কর্ম বন্ধ হয়
না, সেটিও সুস্থ দেহের আবশ্যক খোরাক মাত্র। এই তিনগুণ মানুষনে
দেবতা থেকে শুরু করে
কীটপর্যন্ত দেহের বন্ধনেই আবদ্ধ করে। যতক্ষণ প্রকৃতি
ও প্রকৃতিজাত গুণ জীবিত, ততক্ষণ
' কুরু' সক্রিয় থাকবে। অতএব, জন্ম-মৃত্যুময় এই
ক্ষেত্র, বিকারযুক্ত এই ক্ষেত্রই 'কুরুক্ষেত্র'
এবং পরমধর্ম পরমাত্মাতে প্রবেশ করতে পারে যে
পুণ্যময় প্রবৃত্তিসমূহ, সেই পুণ্যময় প্রবৃত্তি
সমূহের (পান্ডবের) ক্ষেত্রই 'ধর্মক্ষেত্র'।
তত্বদর্শী
মহাপুরুষের শরণাগত হলে শরীরের প্রবৃত্তিসমূহের
মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়, একেই ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞের সংঘর্ষ ও প্রকৃত যুদ্ধ
বলা হয়। ইতিহাসের পাতা
বিশ্বযুদ্ধের কাহিনীতে পরিপূর্ণ, কিন্তু সেই সব যুদ্ধে
যাঁরা বিজয়ী হয়েছেন তাঁরা প্রকৃত বিজয়ী নয়, কারণ এর
মধ্যে প্রতিহিংসা ছিলো। প্রকৃতিকে শান্ত করে প্রকৃতির উর্ধে
সত্ত্বার দিগদর্শন করা এবং তাতে
প্রবেশ করাই প্রকৃত বিজয়।
এই হল শাশ্বত বিজয়,
যার পশ্চাতে পরাজয় নেই। একেই বলে
মুক্তি, যার পর জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন নেই।
এইভাবে
অজ্ঞানে আবৃত প্রত্যেক মন
সংযমের দ্বারা জানতে পারে যে ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞের যুদ্ধের পরিণাম কি হয়? যার
যেমন সংযমবৃদ্ধি হয়, তেমনি তাঁর
দৃষ্টি খুলতে থাকে।
দ্বিতীয়
শ্লোকে বলা হয়েছে," রাজা
দুর্যোধন ব্যূহরচনাযুক্ত পান্ডবগণের সেনাকে দেখে দ্রোণাচার্যের নিকট
গিয়ে জানালেন-"
এখানে
দ্বৈতের আচরণই 'দ্রোণাচার্য'। যখন অনুভন
হয় যে পরমাত্মা থেকে
আমরা পৃথক (একেই বলে দ্বৈতবোধ)
তখনই তাঁকে লাভ করার জন্য
ব্যাকুলতা জেগে ওঠে, তখনই
আমরা গুরুর খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। দুই প্রবৃত্তির
মধ্যে একেই প্রাথমিক গুরু
বলা যেতে পারে। মানে
দ্রোনাচার্য প্রাথমিক গুরু এবং পরে
সদগুরু যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, যিনি যোগের পূর্ণস্থিতি
প্রাপ্ত মহাপুরুষ৷
মোহরূপ
হলো দুর্যোধন।। মোহই সকল ব্যাধির
মূল ও রাজা। দুর্যোধন
- দুর অর্থাৎ দূষিত, যো ধন অর্থাৎ
সেই ধন। আত্মিক সম্পত্তিই
স্থির সম্পত্তি। তাতে যে আবিলতা
সৃষ্টি করে, তা মোহ।
এই মোহ প্রকৃতির দিকে
আকৃষ্ট করে।
কে ধৃতরাষ্ট্র?
কুরুক্ষেত্রের
যুদ্ধ কীভাবে আমাদের মন ও শরীরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ?
কুরুক্ষেত্রের
যুদ্ধ বললেই আমাদের মনে ভেসে উঠে এক ভীষণ যুদ্ধ। অর্জুনের তীর, ভীমের গদা, শ্রী কৃষ্ণের
সুদর্শন চক্র, দিব্য রথ এমন আরো অনেক অনেক ঘটনা প্রবাহ। আবার ধর্মের সাথে যুদ্ধের ই
বা কী সম্পর্ক! অবশ্যই সম্পর্ক আছে। অধর্মের বিনাসের জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন হয়। কুরুক্ষেত্রে
যে যুদ্ধ দেখানো হয়েছে তাও অধর্মের বিরুদ্ধে। সেখানে সত্যেরই জয় হয়েছিলো৷ তাই তা ছিলো
ধর্মযুদ্ধ। এই যুদ্ধ আমাদের শরীর ও মনে অনবরত চলছে। শরীর ও মনে আবার যুদ্ধ কিরকম!
গীতায়
বলা হয়েছে , "ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রমিত্যভিধীয়তে"- অর্থাৎ , কৌন্তেয়!
এই দেহটায় ক্ষেত্র এর মধ্যে ভাল-মন্দ কর্মরূপ যে বীজবপন করা হয়, তা সংস্কাররুপে অঙ্কুরিত
হতে থাকে। দশটি ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহংকার পাঁচটি বিকার এবং সত্ত্ব, রজঃ,
তমঃ এই তিনটি গুণের বিকার হল এই ক্ষেত্রে বিস্তার। প্রকৃতিজাত এই ত্রিগুণদ্বারা অভিভূত
হয়ে মানুষ কর্ম করে। মানুষ ক্ষণকালও কর্ম না করে থাকতে পারে না। " পুনরপি
জনম্ পুনরমি মরণম্ জননী জঠরে শয়নম্ ।" জন্ম জন্মান্তর ধরে এই ক্রিয়াই তো চলছে।
এটাই কুরুক্ষেত্র। গুরুর শরণাগত হয়ে যখন কোমো সাধক সঠিক পথে চলে পরমধর্ম পরমাত্মার
দিকে অগ্রসর হয়, তখন এই ক্ষেত্রই ধর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়৷ তাই এই দেহটাই ক্ষেত্র।
এই
শরীরের অন্তরালে অন্তঃকরণের দুইটি পুরাতন প্রবৃত্তি বিদ্যমান, সে দুটি হল - দৈবী
সম্পদ্ ও আসুরী সম্পদ্। দৈবী সম্পদে আছেন পুণ্যরূপ পান্ডু এবং কর্তব্যরূপ কুন্তী।
পুণ্য জাগ্রত হবার আগে মানুষ কর্তব্য ভেবে যা কিছু করে, নিজের বুদ্ধি অনুসারে সে কর্তব্যই
করে, কিন্তু তার দ্বারা কর্তব্য পালন হয় না- কারণ পুণ্য ছাড়া কর্তব্য কি তা বোঝা সহজ
নয়। কুন্তী পান্ডুর সঙ্গে সম্বন্ধ হওয়ার হওয়ার পূর্বে সূর্যের বর পেয়ে যাকে অর্জন করেছিলেন,
তিনি ছিলেন "কর্ণ"। আজীবন তিনি কুন্তীর পুত্রদের সাথে যুদ্ধই করেছিলেন৷ পান্ডবদের
দুর্ধর্ষ শত্রু যদি কেউ থেকে থাকেন, তিনি হলেন কর্ণ। বিজাতীয় কর্মই হল " কর্ণ",
যা বন্ধনের কারণ, যার থেকে পরম্পরাগত গোঁড়ামীর চিত্রণ হয়।
মস্তিষ্ক
পূর্ণ জাগ্রত হলে ধর্মরূপ যুধিষ্ঠির, অনুরাগরূপ অর্জুন, ভাবরূপ ভীম, নিয়মরূপ নকুল,
সৎসঙ্গরূপ সহদেব, সাত্বিকতারূপ সাত্যকি, কায়াতে সামর্থ্যরূপ কাশিরাজ, কর্তব্যদ্বারা
জগতে বিজয়রূপ কুন্তীভোজ ইত্যাদি ইষ্টোন্মুখ মানসিক প্রবৃত্তিরূপ উৎকর্ষ হয়। যারা গণনায়
সাত অক্ষৌহিনী। 'অক্ষ' দৃষ্টিকেই বলা হয়। সত্যময় দৃষ্টিকোণ দিয়ে যার গঠন হয়, তাকেই
বলে দৈবীসম্পদ্। পরমধর্ম পরমাত্মাপর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয় এই সাতটি সোপান, 'সাতটি ভূমিকা',
কোনো অন্য গণনা নয়। বস্তুত এই প্রবৃত্তিসমূহ অনন্ত। তাই বলা হয়েছে সাত অক্ষৌহিনী৷
অন্যদিকে
কুরুক্ষেত্র, ' যাতে দশটি ইন্দ্রিয় ও একটি মন মিলিত হয়ে সেনার সংখ্যা দাড়িয়েছে এগারো
অক্ষৌহিনী। মন ও ইন্দ্রিয়গম্য দৃষ্টিকোণ দিয়ে যার গঠন হয়, তাকে বলা হয়ে থাকে আসুরী
সম্পদ্। তার মধ্যে আছে অজ্ঞানরূপ ধৃতরাষ্ট্র, যে সব সত্য জেনেও অন্ধ। তার সহচারিণী
গান্ধারী - ইন্দ্রিয়ের আধারযুক্ত প্রবৃত্তি। তার সঙ্গে আছে মোহরূপ ' দুর্যোধন', দুর্বুদ্ধিরূপ
'দুঃশাসন', বিজাতীয় কর্মরূপ কর্ণ, ভ্রমরূপ ভীষ্ম, দ্বৈতের আচরণরূপ দ্রোণাচার্য, আসক্তিরুপ
অশ্বত্থামা, বিকল্পরূপ বিকর্ণ, অপূর্ণ সাধনে কৃপার আচরণরূপ কৃপাচার্য, আর আছেন বিদূর
যাঁর অজ্ঞানের মধ্যে থাকা সত্বেও তাঁর দৃষ্টি পান্ডবদেরও উপরে ছিলো, পুণ্য থেকে প্রবাহিত
প্রবৃত্তির উপর ছিলো, কারণ আত্মা পরমাত্মারই শুদ্ধ অংশ। এই প্রকার আসুরিক সম্পদ্ ও
অনন্ত। ক্ষেত্র একটাই, এই দেহটা ; এর মধ্যে যুদ্ধে ইচ্ছুক প্রবৃত্তি দুইটি - একটি প্রকৃতিতে
বিশ্বাস এনে দেয় ও অন্যটি পরমপুরুষ পরমাত্মাতে বিশ্বাস ও প্রবেশ দেয়। তত্বদর্শী মহাপুরষের
সংরক্ষণে সাধন করলে ক্রমশঃ দৈবী সম্পদের উৎকর্ষ ও আসুরিক সম্পদের সর্বথা শমন হয়। মনে
যখন কোনো বিকার থাকেনা তখন মন নিরুদ্ধ হয় শেষে এই নিরুদ্ধ মনেরও সম্পূর্ণ রূপে বিলয়
হয়। এই অবস্থায় দৈবী সম্পদের আর কোনো প্রয়োজন থাকে না৷ বিশ্বরূও দর্শনের সময় অর্জুন
দেখেছিলেন যে, কৌরব পক্ষের পরে পান্ডব পক্ষের যোদ্ধাও যোগেশ্বরের মুখ-গহ্বরে সমাহিত
হচ্ছেন। অর্থাৎ, সাধনার অন্তিম স্তরে দৈবী সম্পদ্ ও বিলয় হয় এবং সনাতন -শাশ্বত সত্য
পরিণাম দৃষ্টিগোচর হয়।
বিয়ের পর মৃগয়ার সময়ে তিনি ভুলবশত দুটি মিলনরত হরিণকে বিদ্ধ করেন। সেটি ছিল আসলে ঋষি কিন্দম ও তার স্ত্রী, যারা সন্তান উৎপন্ন করতে মিলিত হয়েছিলেন। কিন্দম অভিশাপ দেন যে পাণ্ডুও স্ত্রীসম্ভোগকালে মৃত্যুবরণ করবেন
রাজ্যত্যাগ
ঋষি অভিশাপে বিচলিত হয়ে প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য তিনি তাঁর রাজ্য ধৃতরাষ্ট্র এর হাতে দিয়েছিলেন এবং বনে নির্বাসনে যান। সেখানে তিনি স্ত্রীদের সাথে তপস্বীর মত জীবনযাপন করতেন।
পুত্রদের জন্ম
অভিশাপের ফলে পাণ্ডুর সন্তানলাভের পথ বন্ধ হয়ে গেলে কুন্তী দুর্বাসমুনির থেকে প্রাপ্ত বিশেষ দিব্যমন্ত্রর সাহায্যে ধর্ম দেবতাকে আহ্বান করে তার ঔরসে যুধিষ্ঠিরকে জন্ম দেন। এইভাবে কুন্তী বায়ুর মাধ্যমে ভীম, ও ইন্দ্র দেবের মাধ্যমে অর্জুনকে জন্ম দেন। মাদ্রীও একই মন্ত্রের বলে অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে আহবান করে নকুল ও সহদেবকে জন্ম দেন।এরাই পঞ্চপাণ্ডব।কিছু মতানুসারে একবার মাদ্রী লুকিয়ে দেবী সরস্বতীকে আহ্বান করেন।কিন্তু যেহেতু দেবী সরস্বতী একজন নারী তিনি বরদান দেন কোনো পুরুষের সাথে সঙ্গম করলে মাদ্রি গর্ভবতী হবেন এবং সরস্বতীর মতো একটি কন্যার জন্ম দেবেন।যখন পাণ্ডু জোর করে মদ্রীর সাথে সঙ্গম করেন তখন মাদ্রী গর্ভবতী হয়ে পড়েন।এরপর মাদ্রী যখন সহমরণের জন্যে চিতায় উঠেন তার চিতার উপরে একটি কন্যার জন্ম হয়।সরস্বতীর কন্যা হওয়ায় নাম রাখা হয় শাশ্বতী।ইনি কীর্তিকা বা শঙ্কুবতী নামেও পরিচিত।
মৃত্যু
এরপর একদিন বসন্তকালে মাদ্রীকে দেখে মোহিত হয়ে তিনি অভিশাপের কথা ভুলে যান । মোহের বশে মাদ্রীর সাথে সম্ভোগ করতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়।নিজেকে স্বামীহন্তা ভেবে নিজের সন্তানদের ভার কুন্তীর হাতে দিয়ে মাদ্রীও তাঁর পতির সাথে সহমরণে যান।
কিমকুর্বত সঞ্জয় = তারপর কি করল ? ।
স্বাভাবিক প্রশ্ন কে এই সঞ্জয় ?
সঞ্জয় ( সংস্কৃত অর্থ "বিজয়") বা সঞ্জয় গাভালগন প্রাচীন ভারতীয় হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতের একটি চিত্র । সঞ্জয় হলেন অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের উপদেষ্টা , কুরু রাজ্যের শাসক এবং কৌরবদের পিতা , সেইসাথে তাঁর সারথি হিসেবে কাজ করছেন। সঞ্জয় ঋষি ব্যাসের শিষ্য । তিনি ব্যাস দ্বারা প্রদত্ত দিব্য দৃষ্টি (ঐশ্বরিক দৃষ্টি), তার মনের মধ্যে দূরবর্তী ঘটনাগুলি পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতার দান করেছেন বলে কথিত আছে । তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ঘটনা বর্ণনা করেন , যার মধ্যে ভগবদ্গীতায় বর্ণিত ঘটনাগুলিও রয়েছে ।
মহাভারতে ভূমিকা
একজন বার্তাবাহক হিসেবে

এই মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সঞ্জয় কৌরবদের দূত হয়ে যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়েছিলেন তাদের পক্ষে আলোচনা করার জন্য।
ঐশ্বরিক দৃষ্টির দান
একটি ঐশ্বরিক দৃষ্টি থাকা শুধুমাত্র একটি সূক্ষ্ম দৃষ্টি ("সঞ্জয়ের উপহার") থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে ব্যক্তি একটি সূক্ষ্ম দৃষ্টির অধিকারী সে তার মনের মধ্যে অদৃশ্য জিনিসগুলির প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়, যেখানে ঐশ্বরিক দৃষ্টিতে, এটি মনের মধ্যে না হয়ে, এটি ব্যক্তিগতভাবে দেখার মতো। এছাড়াও, শব্দগুলি শারীরিক কান দিয়ে শোনা যায় এবং চিন্তার স্রোত হিসাবে নয়।
মহাভারত যুদ্ধের বর্ণনাকারী হিসেবে
সঞ্জয় যখন হস্তিনাপুরে ছিলেন, তখন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনার ধারাবাহিকতা তাঁর কাছে খুব স্পষ্ট ছিল ("সঞ্জয়ের উপহার")। তিনি চোখ দিয়ে দেখলেন যেন তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন। সঞ্জয় দেখলেন: ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডবরা সেখানে সমবেত হয়েছেন, কান দিয়ে শুনেছেন দুর্যোধনের কথা, পিতামহ ভীষ্মের প্রচণ্ড যুদ্ধ-কান্না, কুরুদের ধ্বংসের ঘোষণাকারী পঞ্চজন্যের প্রবল ধ্বনি এবং কৃষ্ণ ও অর্জুনের মধ্যে সংলাপ। গীতার আমদানি ("সঞ্জয়ের উপহার")।
সঞ্জয়ের স্পষ্টতই একজন গড় ব্যক্তির চেয়ে একটি সুবিধা রয়েছে কারণ তিনি এমন কিছু শুনতে পেতেন যা এমনকি গড় ব্যক্তিকে ভয় দেখায়। তিনি "ঋষি ব্যাস কর্তৃক প্রদত্ত দূরত্বে ঘটনা" ("সঞ্জয়, সারথি") দেখতে পেয়েছিলেন বলে তাকে প্রতিভাধর বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। মহাভারত যুদ্ধের প্রাক্কালে, গীতার কথা বলা হয়েছিল, "আমরা গীতার প্রথম শ্লোকে দেখতে পাই, রাজা ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়ের কাছ থেকে যুদ্ধ সম্পর্কে তথ্য চেয়েছিলেন যিনি ঐশ্বরিক দৃষ্টির দান পেয়েছিলেন" ("সঞ্জয়ের উপহার")।
ধৃতরাষ্ট্রের উপদেষ্টা হিসেবে সঞ্জয়ের কাজ ততটা কঠিন ছিল না। যতক্ষণ না তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে তাঁর "যুদ্ধের বিভিন্ন সময়ে ভীমের হাতে শতাধিক পুত্রের মৃত্যুর খবর জানান এবং দুঃখী রাজাকে তাঁর অন্ধকার সময়ে সান্ত্বনা দেন" ("ব্যাস")। সঞ্জয় কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রতিটি ঘটনা বলেন। সঞ্জয় এর বিভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন: পৃথিবী, অন্যান্য গ্রহ, এবং ভারতীয় উপমহাদেশের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং (প্রাচীন) শত শত রাজ্য, উপজাতি, প্রদেশ, শহর, শহর, গ্রাম, নদী, পর্বত এবং বনের একটি বিস্তৃত তালিকা দেয়। ভারতীয় উপমহাদেশ (ভারত বর্ষ)।
তিনি প্রতিটি পক্ষের দ্বারা প্রতিটি দিনে গৃহীত সামরিক গঠন, প্রতিটি বীরের মৃত্যু এবং প্রতিটি যুদ্ধ-দৌড়ের বিবরণ ("ব্যাস") সম্পর্কেও ব্যাখ্যা করেছেন। সঞ্জয় যুদ্ধের ঘটনাবলী এবং তার মতামতের বর্ণনায় অত্যন্ত স্পষ্টবাদী হিসেবে পরিচিত এবং তিনি কৃষ্ণ ও অর্জুনের ("সঞ্জয়, সারথি") হাতে কৌরবদের ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণীও করেছিলেন। সঞ্জয় ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের সৎ উপদেষ্টা।
প্রতীকবাদ
সঞ্জয় একজন গুণী চরিত্র যিনি "স্বজ্ঞাত জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে, যা দীর্ঘ এবং কঠিন আধ্যাত্মিক অনুশীলন থেকে উদ্ভূত হয়, সত্ত্ব এবং অভ্যন্তরীণ জাগরণের প্রাধান্য" (V, "ভগবদ্গীতায় প্রতীকবাদ")। স্বর্গীয় অনুগ্রহ অর্জনের জন্য তিনি অর্জুনের মতো সৌভাগ্যবান না হওয়া সত্ত্বেও, তিনি এখনও ভগবান কৃষ্ণের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হন কারণ তিনি তার দেহ এবং মনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারদর্শী ছিলেন (V, "ভগবদ্গীতায় প্রতীকবাদ")। তিনি সচেতনতার অনুভূতির প্রতিনিধিত্ব করেন কারণ তিনি যুদ্ধে ঘটে যাওয়া সমস্ত বিবরণ প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হন। সঞ্জয় বুঝতে পেরেছিলেন যখন "অর্জুন তার ধনুক এবং তীর ফেলে দিয়েছিলেন এবং রথের আসনে বসেছিলেন, তার মন দুঃখে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল" । যুদ্ধ থেকে ক্লান্ত হয়ে অর্জুনকে তার শারীরিক চেহারার অতীত দেখে, সঞ্জয় মন এবং শরীরে তার দক্ষতা প্রদর্শন করে কারণ তিনি অর্জুনকে দুঃখিত হিসাবে দেখতে পেরেছিলেন।
আমাদের ভারত ও মহাভারত সম্পর্কে একটি ধারনা থাকা উচিত ।
গান্ধারী এবং ধৃতরাষ্ট্রের একশজন পুত্র গুলির নাম –
১. দুর্যোধন ২. যুযুতসুরাজ
৩. দুঃশাসন ৪. দুঃসহ ৫. দুঃসল ৬. জলসনদ্ধ ৭. সম ৮. সহ ৯ বিন্দ ১০. অনুবিন্দ ১১.
দুর্ধর্ষ ১২. সুবাহু ১৩. দূষপ্রধর্ষণ ১৪. দুমর্শন ১৫. দুর্মুখ ১৬. দূষকর্ণ ১৭. কর্ণ
১৮. বীবিংসতী ১৯. বিকর্ণ ২০. শল ২১. সত্ত্ব ২২. সুলোচন ২৩. চিত্র
২৪. ঊপচিত্র ২৫. চিত্রাক্ষ ২৬. চারুচিত্র ২৭. শরাসন ২৮. দুর্মদ ২৯. দুরবিগহ ৩০. বিবিতসু ৩১. বিকটানন ৩২. ঊর্ণনাভ ৩৩. সুনাভ ৩৪. নন্দ ৩৫. উপনন্দ ৩৬. চিত্রবান ৩৭. চিত্রবর্মা ৩৮. সুবর্মা ৩৯. দুরবিমচন ৪০. অয়বাহু ৪১. চিত্রাঙ্গ
৪২. চিত্রকুণ্ডল ৪৩. মহাবহু ৪৪. ভীমবেগ ৪৫. ভীমবাল ৪৬. বলাকি ৪৭. বলবর্ধন ৪৮. ঊগ্রাউধ ৪৯. শূরসেন ৫০. কুন্ডধার ৫১. মহোদয় ৫২. চিত্রাঊধ ৫৩. নিষঙ্গী ৫৪. পাশী ৫৫. বিন্দরক ৫৬. দীরবর্মা ৫৭. দীরক্ষেত্র ৫৮. সমকীর্তি ৫৯. অনুদর
৬০. দীরসনদ্ধ ৬১. সত্যসনদ্ধ
৬২. জরাসনদ্ধ ৬৩. সদ ৬৪. সুবাক ৬৫. অগ্রশ্রবাঃ ৬৬. অগ্রসেন ৬৭. দূস্পরাজয় ৬৮. অপরাজিত
৬৯. কুণ্ড শায়ী ৭০. বিশালক্ষ ৭১. দুরাধর ৭২. দৃঢ় হস্ত ৭৩. সুহস্ত ৭৪. বতবেগ ৭৫. সুবরচা
৭৬. আদিত্যকেতু ৭৭. বহাসি ৭৮. নাগদত্য ৭৯. অগ্রজায়ু
৮০. কবচী ৮১. ক্রথ্ন ৮২. কুন্ত
৮৩. ধনুর্ধর ৮৪. উগ্র ৮৫. ভিমরথ ৮৬. বিরবাহু ৮৭. আলোলুপ ৮৮. অভয় ৮৯. অনঅধৃষ্য ৯০. কুণ্ডভেদী
৯১. বিরাধী ৯২. দীর্ঘলোচন ৯৩. প্রমথ ৯৪. প্রমথি ৯৫. দীর্ঘরমা ৯৬. দীর্ঘওবাহু ৯৭. ব্যুঢ়রু
৯৮. কনকধজ ৯৯. কুন্ডশি ১০০. বিরজা।
দুর্যোধন
সংস্কৃত শব্দ "দু"/"দুহ" থেকে তৈরি হয়েছে যার অর্থ "কঠিন" এবং "যোধন" যার অর্থ "লড়াই"/"যুদ্ধ"। সুতরাং দুর্যোধন আসলে এমন একজনকে বোঝায় যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ/পরাজয় বা যুদ্ধ করা অত্যন্ত কঠিন ।
দুর্যোধন বা দূর্যোধন হলেন মহাভারতের একটি চরিত্র। তিনি কৌরব পক্ষের যুবরাজ ছিলেন। তার পিতার নাম ধৃতরাষ্ট্র এবং মাতার নাম গান্ধারী। তিনি ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান এবং দুঃশাসনের বড় ভাই।
জন্ম
ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে গান্ধারীর গর্ভে জন্ম হয়েছিল দুর্যোধনের। গান্ধার-রাজ সুবলের একমাত্র মেয়ে গান্ধারী ভগবান মহাদেব-এর কৃপা পেলে মহাদেব তাকে একশ'পুত্র পাবার বর বা আশির্বাদ দেন। তবে ঐ সময় গান্ধারীর মনে মেয়ে সন্তান পাবার আশা ছিল। তাই দুর্যোধনসহ তাদের ১০০ জন ভাই-এর সাথে দুঃশলা নামের একমাত্র বোনের জন্ম হয়।
যখন গান্ধারীর গর্ভাবস্থা একটি অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তখন তার শাশুড়ি অম্বিকা এবং অম্বালিকা তার উপর খুব বিরক্ত হন। পান্ডু এবং কুন্তী এর আগে একটি পুত্রের জন্ম দেন যার নাম তারা যুধিষ্ঠির রাখেন। তাই হতাশায় সে তার গর্ভকে মারধর করে। এর ফলে তার গর্ভ থেকে ধূসর রঙের মাংসের একটি শক্ত ভর বের হতে থাকে। তিনি ব্যাসকে অনুরোধ করেছিলেন , মহান ঋষি যিনি তাকে "শত পুত্র প্রপ্তিরস্থু" (সংস্কৃতে "একশত পুত্রের আশীর্বাদ") হিসাবে আশীর্বাদ করেছিলেন, তার কথাগুলিকে মুক্ত করার জন্য। ব্যাস মাংসের বলটিকে একশত এক সমান টুকরোতে ভাগ করে দুধের পাত্রে রেখেছিলেন , যা সিলমোহর করে দুই বছর ধরে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। দ্বিতীয় বছরের শেষে, প্রথম পাত্রটি খোলা হয়েছিল, এবং দুর্যোধনের আবির্ভাব হয়েছিল।
দুর্যোধন এবং ভীম একই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ভীম দিবাভাগে এবং দুর্যোধন রাত্রিভাগে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের সময় দুর্যোধন গাধার মতো গর্জন করেছিলেন। একই সাথে কাক, শৃগাল, শকুন, হায়েনা প্রভৃতি পশুপাখি অমঙ্গলসূচক শব্দে উচ্চস্বরে চিৎকার করতে শুরু করল। বিভিন্ন লক্ষণ বিবেচনা করে বিদুর ও অন্যান্য ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা তাকে কুরু বংশের ধ্বংসের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেন। অনেকে তার পিতাকে এই কুলক্ষণযুক্ত পুত্রকে ত্যাগ করার পরামর্শ দেন। পুত্রস্নেহে অন্ধ হয়ে তিনি তাতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। তাই শেষ পর্যন্ত দুর্যোধন রাজপরিবারেই প্রতিপালিত হন।
তার প্রথম ও প্রধান স্ত্রী ছিলেন কলিঙ্গরাজ চিত্রাঙ্গদা ও পর্বতনন্দিনীর কন্যা ভানুমতি।ভানুমতির গর্ভে লক্ষণকুমার ও লক্ষণা নামে যমজ পুত্র কন্যা হয়। প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা ভগদত্তের কন্যা শ্রাবনী গর্ভে মোট তিনটি পুত্র ও দুটি কন্যার জন্ম হয়,যাদের মধ্যে পদ্মকুমার সবার বড় ছিলেন।মদ্ররাজ শল্য এবং অবন্তিনির কন্যা সবিধার গর্ভে কালকেতু নামে একটি পুত্র ও লক্ষী নামে একটি কন্যা হয়। ত্রিলোকপুরের রাজা বসন্তরাজ ও বৈশালীর কন্যা ময়ূরীর গর্ভে একটি কন্যার জন্ম হয়।এছাড়াও এক অজ্ঞাতনামা ব্যাধকন্যা কে তিনি উপপত্নী বানিয়েছিলেন।
পাশা চক্রান্ত, আর দ্রৌপদীর অপমান

ইন্দ্রপ্রস্থের সমৃদ্ধি ও খ্যাতির প্রতি দুর্যোধনের ঈর্ষা এবং পাণ্ডবদের দ্বারা অপমানিত হওয়ার কারণে তিনি ক্রোধান্বিত হয়েছিলেন এবং তিনি পাণ্ডবদের নিক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন । তার ইচ্ছাকে সমর্থন করার জন্য, শকুনি যুধিষ্ঠিরকে পাকিদা বা পাশার খেলায় পরাজিত করে তার রাজ্য এবং সম্পদ লুট করার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন , যাতে শকুনি হারাতে পারেননি কারণ তার কাছে পাশা ছিল যা সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে না পেরে, কূটনীতির কারণে, যুধিষ্ঠির তার সমগ্র রাজ্য, তার সম্পদ, তার চার ভাই এমনকি তার স্ত্রীকেও জুয়া খেলায়, একটিকে অন্যকে দাড়ি দিয়ে পুনরুদ্ধার করার জন্য। যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে হারানোর পর, কর্ণের পরামর্শে, দুর্যোধন তার ভাই দুশাসনকে তাকে দরবারে টেনে আনতে উত্সাহিত করেছিলেন কারণ সে এখন তার সম্পত্তি। দুষণা দ্রৌপদীর চুল টেনে দরবারে নিয়ে গেল। কর্ণ দুর্যোধনকে দ্রৌপদীকে তার বাম উরুতে বসতে বললেন, এইভাবে দুর্যোধন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাকে অপমান করার জন্য বাম ঊরু দেখালেন এবং চাপ দিলেন। দ্রৌপদী প্রত্যাখ্যান করেন এবং দুর্যোধন দুশাশনকে তার বস্ত্র খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ভাইয়ের আদেশ মেনে দুঃশান হেসে দ্রৌপদীর শাড়ি টানতে লাগলেন। দুর্যোধন, কর্ণ, শকুনি এবং অন্যান্য কৌরব ( বিকর্ণ, বিদুর ছাড়া )ও হাসতে লাগলেন। তবে কৃষ্ণের কৃপায় দ্রৌপদীর পোশাকের পরিমাণ একই ছিল।
এই কর্মের কারণে ভীম প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি দুর্যোধনের উরু ভেঙ্গে দেবেন।
ক্রুদ্ধ দ্রৌপদী কুরু বংশকে অভিশাপ দিতে যাচ্ছিলেন , গান্ধারী হস্তক্ষেপ করলেন। পাণ্ডবদের, তাদের মিত্রদের এবং ইতিহাসের প্রতিশোধের ভয়ে, ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারী যুধিষ্ঠিরের সমস্ত ক্ষতিকে উল্টে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরে (হয় দুর্যোধন তার পিতাকে পাণ্ডবদেরকে আবার খেলতে বাধ্য করার জন্য বা শকুনির দুষ্ট কৌশলের মাধ্যমে) খেলার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। পাশার এই খেলার জন্য শকুনি শর্ত দেন যে হারলে, যুধিষ্ঠির এবং তার ভাইদের তাদের রাজ্য পুনরুদ্ধার করার আগে তেরো বছর বনবাসে এবং এক বছর অগ্য়তাবাস (সম্ভবত ছদ্মবেশে অন্যদের কাছে অজানা) কাটাতে হবে। ত্রয়োদশ বছর ছদ্মবেশে পার করতে হবে, নইলে নির্বাসনের মেয়াদ পুনরাবৃত্তি হবে। পাণ্ডবরা হেরে বনবাস শুরু করে।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ
দুর্যোধনই ছিলেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মূল কারণ। তিনি কৃষ্ণের মাধ্যমে যুধিষ্ঠিরের পাঠানো শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। কৃষ্ণ শেষ পর্যন্ত পাণ্ডবদের জন্য পাঁচটি গ্রাম চেয়ে যুদ্ধ বন্ধ করার পরামর্শ দেন । কিন্তু দুর্যোধনের এক বক্তব্য ছিল, যে যুদ্ধ ব্যতীত সূচের অগ্রভাগে যত ভূমি ধরে তাও তিনি পাণ্ডবদের দেবেন না।
অতঃপর যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। দুর্যোধনের পক্ষে এগারো অক্ষৌহিনী এবং পাণ্ডবদের পক্ষে সাত অক্ষৌহিনী সেনা যোগদান করে। কৃষ্ণ তার চার অক্ষৌহিনী নারায়ণী সেনা দুর্যোধনকে দিয়ে দেন। কারণ কৃষ্ণের শর্ত ছিল যে তিনি যে পক্ষে যাবেন, সেনাদের তার বিপরীত পক্ষে প্রদান করবেন। দুর্যোধন সৈন্য নেন, এবং অর্জুন কৃষ্ণকে নিজের পক্ষে আসবার নিমন্ত্রণ দেন।
যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত দুর্যোধন পরাজিত হন। এবং ভীমের সাথে গদা যুদ্ধে ভীম তার উরু ভঙ্গ করেন। কারণ পাশা খেলার সময় তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি দুর্যোধনের উরু ভঙ্গ করবেন।
উপপাণ্ডব এবং পাঞ্চালদের শেষ অবশিষ্টাংশকে হত্যা করার পর, অশ্বত্থামা দুর্যোধনের কাছে ফিরে আসেন। তিনি দুর্যোধনকে তার তরবারির রক্ত দেখালেন যা উপপাণ্ডবদের ছিল, শুনে দুর্যোধন শান্তভাবে প্রতিশোধে সন্তুষ্ট হয়ে তার শরীর ছেড়ে চলে গেলেন। দুর্যোধনের মৃত্যুর সাথে সাথে, সঞ্জয় তার ঐশ্বরিক দৃষ্টিশক্তি হারান, যা তিনি দুর্যোধনের পিতা ধৃতরাষ্ট্রকে আপডেট করার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। এটি যুদ্ধের উপসংহারের প্রতীক।
পাণ্ডবরা অবসর গ্রহণের পর, শুধুমাত্র যুধিষ্ঠির জীবিত স্বর্গে পৌঁছেছিলেন। সেখানে তিনি দুর্যোধনকে দেখেন, যা তাকে হতবাক করে দেয়। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলে, নারদ উত্তর দেন যে দুর্যোধন তার ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেছেন।
গদা-যুদ্ধ

যুদ্ধের অষ্টাদশ দিনে, অশ্বত্থামা , কৃপা এবং কৃতবর্মাকে নিজের সৈন্যদল নিয়ে দুর্যোধন একটি হ্রদে ধ্যান করতে যান। অবশেষে যখন পাণ্ডব এবং কৃষ্ণ তাকে খুঁজে পেলেন, দুর্যোধন তাদের বলেছিলেন যে তিনি তাদের রাজ্য উপহার দিতে চান এবং বনে অবসর নিতে চান। যুধিষ্ঠির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তাকে বলেছিলেন যে হস্তিনাপুর দুর্যোধনের উপহার নয়। পরিবর্তে, তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে দুর্যোধন পাণ্ডব ভাইদের মধ্যে যেকোনও একজনকে তার পছন্দের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করার জন্য বেছে নিতে পারেন, যুদ্ধের বিজয়ী যুদ্ধের বিজয়ী।
যুধিষ্ঠির, অর্জুন , নকুল বা সহদেবের উপর গদা দিয়ে তার প্রস্তাবিত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও , দুর্যোধন তার নিমেষ ভীমকে বেছে নিয়েছিলেন । ভীমের শারীরিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, তার নৈপুণ্যের প্রতি নিষ্ঠার কারণে দুর্যোধনের আরও ভাল কৌশল ছিল। বলরামের দুই শিষ্যের মধ্যে দীর্ঘ ও নৃশংস যুদ্ধের পর, দুর্যোধন ভীমকে ক্লান্ত করতে শুরু করেন এবং ভীমকে প্রায় অজ্ঞান করে দেন।
এই সময়ে, লড়াই পর্যবেক্ষণ করে, কৃষ্ণ ভীমকে ডাকলেন এবং বারবার তাঁর উরুতে হাত দিয়ে তালি দিয়ে সংকেত দিলেন। উদ্দেশ্য হিসাবে, ভীমকে সেই শপথের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যা তিনি পাশার খেলার পরে দুর্যোধনের উরু পিষে নিয়েছিলেন। ভীম বিজয়ী হয়ে দুর্যোধনকে তার গদা দিয়ে আক্রমণ করেন এবং তার উরুতে আঘাত করেন এবং দুর্যোধনকে মারাত্মকভাবে আহত করেন। ভীম কর্তৃক অপমানজনকভাবে লাথি মারার পর, দুর্যোধন বিলাপ করেছিলেন যে তাকে অন্যায় উপায়ে হত্যা করা হয়েছিল, কারণ একটি গদা লড়াইয়ে কোমরের নীচে আক্রমণ করা অবৈধ ছিল।
লঙ্ঘনে ক্ষুব্ধ হয়ে কৃষ্ণের ভাই বলরাম আক্রমণ করার জন্য অস্ত্র তুলেছিলেন। কৃষ্ণ বলরামকে দুর্যোধনের মন্দ কাজের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এবং তিনি যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করার জন্য তাকে তিরস্কার করেছিলেন।
কর্ণের সঙ্গে সম্পর্ক
মার্শাল প্রদর্শনীতে যেখানে কৌরব এবং পাণ্ডব রাজকুমাররা তাদের গুরুজন, তাদের গুরু দ্রোণ এবং সেই রাজ্যের লোকদের সামনে তাদের দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন , সেখানে কর্ণ উপস্থিত হয়েছিলেন এবং একজন অবিশ্বাস্য অর্জুনকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন , যাকে রাজকুমারদের মধ্যে সেরা বলে মনে করা হয়। কিন্তু কর্ণকে থামানো হয়েছিল যখন কৃপা তাকে তার বংশ নির্ণয় করতে বলেছিল, কারণ এটি অসম প্রতিযোগিতার জন্য অনুপযুক্ত হবে। কর্ণ ক্ষত্রিয় না হয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল। [ ৫ ]
দুর্যোধন অবিলম্বে কর্ণকে রক্ষা করেছিলেন, যুক্তি দিয়েছিলেন যে এটি দক্ষতা এবং সাহসিকতা, এবং জন্ম নয়, যা একজন যোদ্ধাকে সংজ্ঞায়িত করে। ধৃতরাষ্ট্র কর্তৃক তাকে প্রদত্ত বর ব্যবহার করে দুর্যোধন কর্ণকে অঙ্গের রাজা করেন যাতে তাকে অর্জুনের সমতুল্য বলে গণ্য করা হয়। [ 6 ] কর্ণ দুর্যোধনের প্রতি আনুগত্য ও বন্ধুত্বের অঙ্গীকার করেছিলেন। তাদের কেউই জানত না যে কর্ণ আসলে কুন্তীর জ্যেষ্ঠ পুত্র, পান্ডুর সাথে তার বিয়ের আগে (সূর্যদেবতা) সূর্যের জন্ম ।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে , কর্ণ ছিলেন দুর্যোধনের সর্বশ্রেষ্ঠ চ্যাম্পিয়ন এবং পঞ্চদশ দিন থেকে সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । দুর্যোধন আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে কর্ণ অর্জুনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং তার চার ভাইকে পরাজিত করবেন। কর্ণ যখন নিহত হন, তখন দুর্যোধন তার মৃত্যুতে তীব্রভাবে শোক প্রকাশ করেন, এমনকি তার নিজের ভাইদের মৃত্যুর চেয়েও অসহায় ছিলেন। কর্ণের পরিচয় যখন তাঁর কাছে প্রকাশ করা হয়, তখন কর্ণের প্রতি দুর্যোধনের ভালবাসা বেড়ে যায় এবং বলা হয় তিনিই ছিলেন, পাণ্ডবরা নন, যিনি কর্ণের শেষকৃত্য করেছিলেন। কৃষ্ণ নিশ্চিত করেছেন যে কর্ণের উপর তার সর্বোচ্চ অধিকার রয়েছে, কারণ তারা একে অপরকে সত্যিকারের ভালবাসত এবং সমর্থন করেছিল।
আধুনিক উপাসনালয়ে দুর্যোধনঃ
- কেরালার কোল্লাম জেলার পোরুভজি পেরুভিরুথি মালানাদা মন্দিরে , দুর্যোধনকে প্রধান দেবতা হিসেবে পূজা করা হয়। এটি দক্ষিণ ভারতের একমাত্র মন্দির যেখানে একজন কৌরবকে ঈশ্বর বলে মনে করা হয় । [ 25 ]
- উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন অঞ্চলে , বেশ কয়েকটি সুন্দর খোদাই করা মন্দির দুর্যোধনকে উত্সর্গীকৃত এবং তাকে দেবতা হিসাবে পূজা করা হয় । মহাভারতের যুদ্ধে দুর্যোধনের সাথে কুমায়ুনের পাহাড়ী উপজাতিরা যুদ্ধ করেছিল; তিনি একজন দক্ষ ও উদার প্রশাসক হিসেবে সম্মানিত ছিলেন।
- উত্তরাখণ্ডের গাড়ওয়াল ডিভিশনের ওসলায় একটি মন্দির আছে । এটি সৌর বাসিন্দাদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। লোকেদের বিশ্বাস তিনি মহাসুর আশীর্বাদ নিয়ে মানুষের সেবা করার জন্য এখানে অবস্থান করেছিলেন।
মহাভারতের দুর্যোধন ভিলেন না ট্রাজিক হিরো ?
দুঃশলা
দুঃশলা (সংস্কৃত: প্রতিবর্ণীকৃত) ছিলেন হস্তিনাপুরের রাজকুমারী,
এবং হিন্দু
মহাকাব্য মহাভারতে রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও রাণী গান্ধারীর একমাত্র কন্যা।তিনি তার কৌরব ভ্রাতাগণ এবং তার পৈতৃক সৎ ভাই যুযুৎসুর জন্মের পরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সিন্ধুর রাজা জয়দ্রথের সাথে তার বিয়ে হয়। সে তার মায়ের মতোই খুব সুন্দর ছিল। সবচেয়ে পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের একমাত্র রাজকন্যা হওয়ার কারণে,
তিনি রাজপরিবারের সকল সদস্যদের বিশেষ করে তার বড় ভাই দুর্যোধনের খুব প্রিয় ছিলেন।[২][৩] দুঃশলার পুত্রের নাম সুরথ এবং মেয়ের নাম ছিল রোশনি।
কিংবদন্তি
জয়দ্রথ যখন দ্রৌপদীকে অপহরণ ও শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হন,
তখন কিছু পাণ্ডব তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দুঃশলাকে বিধবা হতে বাধা দেওয়ার জন্য যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে,
তারা তাকে ছেড়ে দেন, কেবল তার মস্তক মুণ্ডন করে দেন। পরবর্তীতে, জয়দ্রথ তার জিঘাংসা মেটানোর জন্য কুরুক্ষেত্র
যুদ্ধে অর্জুনের পুত্র অভিমন্যুকে হত্যা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু অর্জুন কৃষ্ণের সহায়তায় তার শিরচ্ছেদ করেন।
পরে, অশ্বমেধ যজ্ঞের সময়,
পাণ্ডবদের ঘোড়া সিন্ধুতে এসেছিল, যা তখন শাসিত হচ্ছিল দুঃশলা পুত্র সুরথ কর্তৃক। অর্জুনের সাথে লড়াই করার সম্ভাবনা দেখে আতঙ্কিত সুরথ আত্মহত্যা করে দুঃশলা যুদ্ধক্ষেত্রে আসে, এবং সুরথের শিশু পুত্রকে নিয়ে কাঁদছিল,
যা অর্জুনের হৃদয় ভেঙে দেয়। অর্জুন শিশুটিকে সিন্ধুর রাজা ঘোষণা করলেন ।
দুঃশাসন
দুঃশাসন মহাকাব্য মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র। আক্ষরিক অর্থে,
দুঃশাসন অর্থ যাকে শাসন করা কষ্টসাধ্য। দুঃশাসন মহাভারতের অন্যতম বিরোধী
চরিত্র। তিনি কৌরব রাজপুত্রদের মধ্যে দ্বিতীয় এবং হস্তিনাপুরের যুবরাজ ও জ্যেষ্ঠ কৌরব দুর্যোধনের অনুজ এবং প্রধান সহযোগী। তাঁর পিতা-মাতা হলেন যথাক্রমে ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারী। ত্রিগর্তের রাজকন্যা চন্দ্রমুখীকে তিনি বিবাহ করেন।তিনি ত্রিলোকাপুরার শ্বেতাকে এবং লতাকেও বিয়ে করেছিলেন। তিনি নির্জারার সাথে যুদ্ধ করেন এবং তিনি তার স্ত্রী হন। তার বোন দিবিজাও তার স্ত্রী ছিলেন। তার পুত্রের নাম দ্রুমসেন। দুঃশাসনের ঈর্ষাপরায়ণতা এবং নীচ মানসিকতা মহাভারতে তার পতন ডেকে আনে।
নামব্যুৎপত্তি
দুঃশাসন শব্দটি সংস্কৃত শব্দ "দুঃ" কঠিন, কষ্টকর এবং "শাসন" অর্থ শাসন করা। অর্থাৎ, দুঃশাসন অর্থ "যাকে শাসন করা দুঃসাধ্য"।
জন্ম ও ক্রমবৃদ্ধি
গান্ধারী ব্যাসদেবের সেবা করায় তিনি বর দিয়েছিলেন গান্ধারী শতপুত্রের জননী হবেন। যথাকালে গান্ধারী গর্ভবতী হলেন কিন্তু কুড়ি মাস চলে গেলেও তার প্রসব হল না।এদিকে কুন্তীর পুত্রলাভের খবর পেয়ে গান্ধারী অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে ধৃতরাষ্ট্রকে না জানিয়ে লোহার মুগুর দিয়ে নিজের গর্ভপাত করেন। এর ফলে তার গর্ভ হতে এক লৌহকঠিন মাংসপিণ্ড নির্গত হল। গান্ধারী দাসীদের তা নষ্ট করার হুকুম দিতে যাচ্ছিলেন এমন সময় ব্যাসদেব এসে তাকে নিষেধ করলেন। তিনি ভ্রুণকে শীতল জলে ভিজিয়ে শত ভাগে ভাগ করেন এবং তা ঘৃতপূর্ণ কলসে রাখেন। একবছর পর দুর্যোধন এবং একবছর এক মাসের মধ্যে দুঃশাসন,
দুঃসহ, বিকর্ণ প্রভৃতি শতপুত্র ও দুঃশলা নামে একটি কন্যার জন্ম হল। দুঃশাসন তার বড়ভাই দুর্যোধনের অনুগত ছিলেন এবং দুর্যোধনের সকল অপকর্মের সহযোগী ছিলেন। দুর্যোধন এবং মামা শকুনির সাথে মিলে পাণ্ডবদেরকে হত্যার নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।
কুরুসভায় দ্রৌপদীর নিগ্রহ
দুঃশাসন কর্তৃক দ্রৌপদীর নিগ্রহ
শকুনির সাথে পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির সর্বস্বান্ত হওয়ার পর নিজের ভাইদের এবং নিজেকে পণ করে হেরে যান। এরপর তিনি তাদের ধর্মপত্নী দ্রৌপদীকে পণ করে তাকেও হারান। দুঃশাসন দ্রৌপদীকে তার অন্তঃপুর থেকে কেশ ধরে সভায় টেনে আনেন এবং কর্ণের আদেশে তাকে বিবস্ত্রা করার চেষ্টা করেন। এসময় দ্রৌপদী শ্রীকৃষ্ণকে আহ্বান করতে থাকেন। কৃষ্ণ ধর্মের অবতার নিয়ে বস্ত্ররূপে দ্রৌপদীকে আবৃত করতে থাকেন। দুঃশাসনের আকর্ষণেও তা শেষ হয় না। সভায় এই ভাবে স্ত্রীকে অপমানিত হতে দেখে ভীম প্রতিজ্ঞা করেন যে যুদ্ধভূমিতে তিনি দুঃশাসনের বক্ষ বিদারণ করে তার রক্তপান করবেন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ এবং মৃত্যু
দুঃশাসন কুরুক্ষেত্র
যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং অনেক যোদ্ধার সাথে যুদ্ধ করেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনে দুঃশাসনই প্রথম তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। তিনি নকুল এবং পরে যুধিষ্ঠিরের সাথে ভয়ানক যুদ্ধ করেন এবং তাদের কাছে পরাজিত হন।
যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে,
দুঃশাসন নকুলের দেহরক্ষীকে হত্যা করেন। ক্রুদ্ধ নকুল তলোয়ার যুদ্ধে দুঃশাসনকে পরাজিত করে প্রায় হত্যা করতে যাচ্ছিলেন,
তবে, তখন নকুলের, ভীমের প্রতিজ্ঞা অর্থাৎ ভীম কর্তৃক দুঃশাসনকে বধ করার কথা স্মরণে এলে, নকুল, দুঃশাসনকে ছেড়ে দেন।
যুদ্ধের দশম দিনে, ভীষ্মকে রক্ষা করার জন্য দুঃশাসন, শিখণ্ডীকে আক্রমণ করেন এবং আহত করেন। যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে,
দুঃশাসন ছিলেন শক্তিশালী সপ্তরথীদের অন্যতম যারা অন্যায় যুদ্ধে অভিমন্যুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। ঐদিনের যুদ্ধে অভিমন্যু প্রচণ্ডভাবে দুঃশাসনকে আহত করেছিল। পরে,
দুঃশাসনপুত্র দ্রুমসেন অভিমন্যুকে হত্যা করে।
১৪তম দিনে,
দুঃশাসন, অর্জুনকে আক্রমণ করেন এবং জয়দ্রথের কাছে পৌঁছতে না দেওয়ার জন্য বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু,
একটি ছোট তীর-ধনুকের দ্বন্দ্বে অর্জুনের কাছে দুঃশাসন পরাজিত হন। রাত্রিকালীন যুদ্ধের সময়, দুঃশাসন বিরাটের দেহরক্ষীদের পরাজিত করে হত্যা করেন।
ভীম, দুঃশাসনের বুক বিদীর্ণ করে এবং বুকের রক্ত পান করছে।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ১৬তম দিনে,
দুঃশাসন মগধের মন্ত্রী বৃহন্তকে হত্যা করেন। পরবর্তীতে, ভীম এবং দুঃশাসনের সাথে গদা যুদ্ধ হয়। ভীম,
তাকে পরাজিত করেন। যখন, দুঃশাসন যুদ্ধে অসমর্থ এবং আহত হলে ভীম দুঃশাসনের উভয় হাত উপড়ে ফেলেন। তারপর ভীম, তার (দুঃশাসনের) বর্ম এবং রক্ষাকবচ খুলে ফেলে এবং খালি হাতে বুক চিড়ে দুঃশাসনকে হত্যা করে। পুরো মহাভারত কাব্যে, দুঃশাসনের মৃত্যু সবচেয়ে নৃশংস মৃত্যু। প্রতিজ্ঞা অনুসারে, ভীম দুঃশাসনের বুকের রক্ত পান করে। এই নৃশংস দৃশ্যের প্রত্যক্ষকারী সব সৈন্য,
ভীমকে দানব মনে করে এবং অনেকে তা দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সমস্ত কৌরব সমর্থক এবং সহকারী যোদ্ধা এই দৃশ্য দেখে অত্যন্ত বিমর্ষ হয়। ভীম দুঃশাসনের রক্ত সংগ্রহ করেন এবং দ্রৌপদীর খোলা চুল ধুয়ে দেন। কারণ,
কুরু রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করেছিল দুঃশাসন। তখন, দ্রৌপদী প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি শুধু দুঃশাসনের বুকের রক্ত দিয়ে চুল ধুয়ে চুলের খোঁপা বাঁধবেন। না হলে, কখনো চুলের খোঁপা বাঁধবেন না।
যুযুৎসু (মহাভারত)
যুযুৎসু মহাকাব্য মহাভারতের একটি চরিত্র। যুযুৎসু ধৃতরাষ্ট্রের এবং গান্ধারীর পরিচারিকা (পরবর্তী বর্ণনা অনুযায়ী সুগধার) পুত্র। তিনি গান্ধারীর শত পুত্র- দুর্যোধন এবং বাকি কৌরব ভ্রাতৃগণ এবং তাদের বোন দুঃশলার সৎ ভ্রাতা। এমনকি, তিনি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর ধৃতরাষ্ট্রের একমাত্র জীবিত পুত্র। যুযুৎসই
ধৃতরাষ্ট্রের একমাত্র পুত্র যিনি পাণ্ডবদের পক্ষের হয়ে কৌরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।
নামব্যুৎপত্তি
যুযুৎসু শব্দটি ‘যুধ’ থেকে এসেছে যার অর্থ যুদ্ধ,
লড়াই। যুযুৎসু শব্দের
পূর্ণ অর্থ হল, যিনি যুদ্ধ করতে ইচ্ছা করেন। নিচে মহাভারতে উল্লেখিত
যুযুৎসু এর আরো নামগুলো হলো-
- ধার্তরাষ্ট্র - ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র,
- কৌরব্য - কুরু বংশধর,
- বৈশ্যাপুত্র - বৈশ্যা নারীর পুত্র,
- করণ - ক্ষত্রিয় পুরুষের ঔরসে বৈশ্যা নারীর গর্ভজাত
সন্তান।
জন্ম
যুযুৎসু মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে সুগধার গর্ভে জন্মগ্রহণ
করেন। দুর্যোধন এবং ভীমের পরে এবং দুঃশাসনের ও অন্যান্য ৯৮ জন কৌরব ভাইদের এবং দুঃশলার আগে জন্মগ্রহণ করেন। অতএব, ধৃতরাষ্ট্রের সর্বমোট ১০২ জন সন্তান (১০১ জন পুত্র এবং ১ জন কন্যা)।
কৌরব শিবিরে ধার্মিক
যুযুৎসু বৈশ্যা পরিচারিকার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন,
তবুও তিনি ধার্মিক এবং
ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। তুলনামূলক, নীচগর্ভে জন্মগ্রহণ করেও,
তিনি কখনো ধর্মের পথ
হতে বিচ্যুত হন নি। ধর্মের পথে থাকার জন্য তিনি তার পারিবারিক বন্ধন ত্যাগ করেছিলেন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রারম্ভে,
যুদ্ধক্ষেত্রে যুধিষ্ঠির একটি ঘোষণা করেন যে- শঙ্খ বাজানোর পূর্বে,
যিনি ধর্মের ও
ন্যায়ের জন্য যুদ্ধে পক্ষ পরিবর্তন করতে চান,
তিনি এইমুহুর্তে তা
করতে পারেন।। এই ঘোষণা শুনে, তখন যুযুৎসু কৌরবপক্ষ ত্যাগ করে ধর্ম ও ন্যায়ের জন্য পাণ্ডব শিবিরে
যোগদান করেন।
এছাড়াও, যুযুৎসু পান্ডবদেরকে, দুর্যোধনের ধূর্ত পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করে ভীম-এর
জীবন রক্ষা করেছিলেন, যার মধ্যে বিষাক্ত জল পরিবেশনের কথা অন্তর্ভুক্ত ছিল। যুযুৎসু এবং বিকর্ণ উভয়েই দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র এবং খারাপ দুরভিসন্ধিকে ঘৃণা
করতেন। তথাপি, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় বিকর্ণ ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসার
কারণে কৌরব পক্ষ ছেড়ে যান নি এবং যুদ্ধে ভীমের হাতে নিহত হন। [৫] কিন্তু যুযুৎসু ধর্ম রক্ষার জন্য কৌরব শিবির ত্যাগ করে পাণ্ডব শিবিরে যোগ দেন এবং পাণ্ডবদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেন। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম মহারথী। (মহারথী হলেন এমন
ব্যক্তি, যিনি
একসাথে ৭,২০,০০০ সৈন্যের সাথে যুদ্ধ করতে সমর্থ।) যুদ্ধ শেষে কৌরবপক্ষের
যে ১১ জন যোদ্ধা বেঁচেছিলেন তাদের মধ্যে যুযুৎসু অন্যতম। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তিনি
বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধের সপ্তম দিনে,
কুলগুরু কৃপাচার্যের সাথে তাঁর প্রচণ্ড তলোয়ার লড়াই হয় এবং তিনি আঘাতপ্রাপ্ত
হন। তবে তিনি বেঁচে যান। ষোড়শতম দিনে, যুযুৎসু শকুনির পুত্র উলুকের সাথে যুদ্ধ করেন এবং তাকে আহত
করেন। আহত হয়ে উলুক পালিয়ে যাওয়ার কারণে তাকে তিনি হত্যা করতে পারেন নি।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ
শেষে
শ্রীকৃষ্ণের দেহত্যাগের পর পাণ্ডবগণ পৃথিবী থেকে মহাপ্রস্থানের সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন,
মহারাজ যুধিষ্ঠির, যুযুৎসুকে হস্তিনাপুরের তত্ত্বাধায়কের দায়িত্ব দিয়ে ছোট পরীক্ষিতকে হস্তিনাপুরের রাজা নিযুক্ত করেন।
ভানুমতী (মহাভারত)
ভানুমতী হলেন ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চরিত্র
দুর্যোধন এবং কলির অবতার এর সহধর্মিনী।
মহাভারতে ভানুমতীর তিনবার উল্লেখ আছে। শান্তি পর্বে দুর্যোধন রাজা
চিত্রাঙ্গদের কন্যাকে তার স্বয়ম্বর সভা থেকে কর্ণের সাহায্যে অপহরণ করেন।পরে
স্ত্রী-পর্বে তার শ্বাশুড়ি গান্ধারী তার বিবরণ দেন।
গ্রন্থের বিবরণ
মহাভারতে ভানুমতীর সরাসরি কোনো উল্লেখ নেই। শাল্য পর্বে দুর্যোধন তার পুত্র
লক্ষ্মণ কুমারের মায়ের দুর্গতি নিয়ে আক্ষেপ করেন। স্ত্রী পর্বে দুর্যোধনের মা
গান্ধারী তার পুত্রবধুর বিবরণ দেন। শান্তি পর্বে ঋষি নারদ দুর্যোধনের সাথে কর্ণের বন্ধুত্বের একটি গল্পের উল্লেখ
করেন। যেখানে কলিঙ্গরাজ চিত্রাঙ্গদের মেয়েকে তার স্বয়ম্বর থেকে অপহরণ করতে তার
বন্ধুকে সাহায্য করেন কর্ণ। যেহেতু এই মহাকাব্যের কোথাও দুর্যোধনের স্ত্রীর নামের
উল্লেখ নেই, তার
নামটি এসেছে বিভিন্ন লোককাহিনী থেকে।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর গান্ধারী কৃষ্ণকে এভাবে তার পুত্রবধুর বর্ণনা দেন।
দেখো,
আবার, আমার ছেলের মৃত্যুর চেয়েও বেদনাদায়ক এই দৃশ্য,
নিহত বীরদের পাশে এই ফর্সা নারীরা কাঁদছে! দেখো,
হে কৃষ্ণ, লক্ষ্মণার মা, সেই বৃহৎ নিতম্বের রমণী, তার পরিচ্ছদ বিক্ষিপ্ত, দুর্যোধনের সেই প্রিয় পত্নী, সোনার যজ্ঞবেদির মতো। নিঃসন্দেহে,
মহান বুদ্ধিমত্তার এই মেয়েটি,
তার পরাক্রমশালী সশস্ত্র স্বামী পূর্বে জীবিত থাকাকালীন,
তার স্বামীর সুদর্শন বাহুর আলিঙ্গনে খেলাধুলা করত! কেন,
সত্যিই, যুদ্ধে নিহত আমার ছেলে ও নাতিদের দেখে আমার এই হৃদয় শত
টুকরো হয়ে যায় না? হায়,
সেই নির্দোষ ভদ্রমহিলা এখন গন্ধ নিচ্ছেন তার ছেলের (মাথার)
রক্তাক্ত সেই দেহ। এখন আবার সেই ফর্সা উরুর ভদ্রমহিলা তার ফর্সা হাত দিয়ে ধীরে
ধীরে দুর্যোধনের শরীর বুলিয়ে দিচ্ছেন। এই সে তার স্বামীর জন্য এবং এই সে তার
ছেলের জন্য শোকাচ্ছন্ন হয়। এই সে তার স্বামীর দিকে তাকায়,
আরেকবার তার ছেলের দিকে। দেখ, হে মাধব, তার মাথায় হাত দিয়ে আঘাত করে,
সে তার বীর পতি, কুরুদের রাজার বক্ষে পতিত হয়। পদ্মের পুষ্পদণ্ডের মতো
বর্ণের অধিকারিণী, তিনি এখনও পদ্মের মতো সুন্দরী দেখতে। হতভাগ্য রাজকন্যা এই তার ছেলের মুখ এবং
এই তার স্বামীর মুখে হাত বুলায়।
— গান্ধারী, কিশোরী মোহন গাঙ্গুলী অনূদিত
মহাভারতের শান্তি পর্বে দুর্যোধনের বিবাহের উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবঋষি নারদ
রাজা চিত্রাঙ্গদের মেয়ের স্বয়ম্বরের গল্পটি বলেন। গ্রন্থে কোথাও তার নামের
উল্লেখ নেই, তবে
বলা হয়েছে তিনি ফর্সা এবং সুন্দরী।
দুর্যোধন কলিঙ্গরাজ চিত্রাঙ্গদের কন্যার স্বয়ম্বরে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন।
নিমন্ত্রণ পেয়ে দুর্যোধন তার বন্ধু কর্ণকে সাথে নিয়ে রাজাপুর নগরে যান। অন্যান্য
রাজরাজরা যেমন শিশুপাল, জরাসন্ধ, ভীষ্মক, বক্র,
কপটারোমন, নীল, রুক্মী, শৃঙ্গ, অশোক,
শতধনবান প্রভৃতি সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শুরু
হওয়ার পর রাজকুমারী তার সহচরী এবং দেহরক্ষীদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে হাতে মালা
নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন। যখন তাকে অংশগ্রহণকারীদের নাম এবং তাদের বংশ সম্পর্কে
অবহিত করা হচ্ছিল, তখন তিনি দুর্যোধনের কাছ থেকে চলে গেলেন। দুর্যোধন তার এই প্রত্যাখ্যান মেনে
নিতে অস্বীকার করেন এবং ইতোমধ্যেই রাজকন্যার দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে,
তাকে এবং কর্ণকে দ্বন্দ্বে আহবান করে তার রথে তুলে নিয়ে
যান। কর্ণ তার বন্ধুকে রক্ষা করার জন্য বাকি প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে সফলভাবে যুদ্ধ
করেন। কর্ণ সহজেই পশ্চাদ্ধাবনকারী রাজাদের পরাজিত করেন এবং অন্যান্য রাজকীয়
যোদ্ধারা কর্ণের যুদ্ধের পরাক্রম দেখে তাদের বাসনা ত্যাগ করেন। হস্তিনাপুর পৌঁছে দুর্যোধন তার এই অপহরণের বৈধতা দিতে তার প্রপিতামহ
ভীষ্ম কর্তৃক তার সৎ ভাই বিচিত্রবীর্যের জন্য কাশীর তিন কন্যার অপহরণের উদাহরণ টানেন। অবশেষে ভানুমতী বিয়েতে
তার মত দেন এবং দুর্যোধনের সাথে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়।
ভানুমতী, সুন্দর
বর্ণের কুমারী, কে
তার স্বয়ম্বর থেকে দূর্যোধন তার সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু কর্ণের সাহায্যে তার (ভানুমতী) প্রত্যাখ্যানের উত্তেজনার বশে তাকে
অপহরণ করেন।
ভানুমতি অর্জুনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন কিন্তু পরিস্থিতির কারনে দুর্যোধনকে
বিয়ে করেছিলেন। দুর্যোধন তাঁর জামাতা হওয়ায় শল্য কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরব
পক্ষকে সমর্থন করেছিলেন।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হলে , এই দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির
জন্য ভানুমতি অর্জুনের সংগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন । তবে অনেকই এটাকে কল্পনা
বলেছেন । তবে কর্ণের সংগে তার বিশেষ বন্ধুত্ব ছিলো যা অনেকেইে প্রেম বলতে চান ।তবে
কর্ণ একমাত্র বৃষালীকেই ভালোবাসতেন ।
কারো কারো মতেঃ
চিত্রাঙ্গদাঃ
মহাভারতের কুন্তীঃ
মাদ্রী
| মাদ্রী | |
|---|---|
মাদ্রী (সংস্কৃত: माद्री) হলেন হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতের অন্যতম নারীচরিত্র। তিনি হলেন মদ্রদেশের রাজকন্যা এবং হস্তিনাপুরের রাজা পাণ্ডুর দ্বিতীয়া স্ত্রী। তিনি কনিষ্ঠ পাণ্ডবদ্বয় তথা যমজ ভাই নকুল ও সহদেবের গর্ভধারিনী বা মাতা। তার ভাই হলেন মদ্রদেশের যুবরাজ এবং পরবর্তীতে রাজা শল্য। তার আসল নাম মাধুরী।মাদ্রী শব্দের অর্থ হলো মদ্র দেশের রাজকন্যা, অথবা মদ্রকুমারী।
কুন্তীর সাথে তার বিয়ের পরে পাণ্ডু মদ্ররাজের কনিষ্ঠ কন্যা মাদ্রীকে বিয়ে করেছিলেন। পাণ্ডু ও মাদ্রীর কোন সন্তান ছিল না। ফলস্বরূপ, সপত্নী কুন্তীর কাছ থেকে ঋষি দুর্বাসাপ্রদত্ত পুত্রেষ্টিমন্ত্র অল্পসময়ের জন্য চেয়ে নিয়ে তিনি অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে পুত্রদান নিমিত্তে আহ্বান করেন। তাদের আশীর্বাদে দুই পুত্র (কনিষ্ঠ পাণ্ডব) নকুল ও সহদেবের জন্ম হয়। কিছু মতানুসারে তিনি সরস্বতীর বরে শাশ্বতী নামে একটি কন্যার জন্ম দিয়েছিলেন।
নকুল ও সহদেবের জন্মের পর পাণ্ডু একদা বনে মাদ্রীকে দেখে কামার্ত হয়ে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হন। এই সঙ্গমের ফলে পাণ্ডুর মৃত্যু হয়। নিজেকে স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী ভেবে মাদ্রী তাঁর পুত্রদের কুন্তীর দায়িত্বে রেখে সতী (স্বামীর চিতায় স্বেচ্ছায় সহমরণে যাওয়া) হন।
প্রথম পান্ডব যুধিষ্ঠিরঃ
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– পঞ্চপাণ্ডবদের একজন। অন্যান্য পাণ্ডবদের মতেই ইনিও ছিলেন পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ পুত্র। এঁর প্রকৃত পিতা ধর্ম। মায়ের নাম কুন্তী (কুন্তীর দ্বিতীয় পুত্র)। উল্লেখ্য, কুন্তীর প্রথম পুত্র ছিলেন কর্ণ (সূর্য-এর ঔরসে জাত)।
একবার একটি বনে, কিন্দম মুনি হরিণের রূপ ধারণ করে একটি হরিণীর সাথে সঙ্গম করছিলেন। ওই বনে পাণ্ডু মৃগয়া গিয়ে সঙ্গমরত হরিণের উপর শর নিক্ষেপ করে হত্যা করেন। মৃত্যুর আগে মুনি স্বমূর্তি ধারণ করে, পাণ্ডুকে অভিশাপ দিয়ে বলেন–
'মৃগভ্রমেই আমার উপর শরনিক্ষেপ করিয়াছ, এ নিমিত্ত তোমার ব্রহ্মহত্যার পাপ হইবে না, কিন্তু সঙ্গমসময়ে আমাকে বধ করাতে তোমার যে পাপ হইয়াছে, তাহার ফল অবশ্যই তোমাকে ভোগ করিতে হইবে। তুমি যে সময়ে স্ত্রীসংসর্গ করিবে, সেই সময়ে তোমার মৃত্যু হইবে। তুমি যে পত্নীর সইত সংসর্গ করিয়া কালগ্রাসে পতিত হইবে, তিনি ভক্তিভাবে তোমার সহগামিনী হইবেন। হে রাজন! তুমি যেমন সুখের সময়ে আমাকে দুঃখ দিলে, সেইরূপ তোমাকেও সুখকালে দুঃখ পাইতে হইবে।' [মহাভারত, আদিপর্ব: অষ্টাদশাধিকশততম অধ্যায়। পাণ্ডুর প্রতি মৃগরূপী মুনির শাপ]
এই অভিশাপের কারণে, মাদ্রী এবং কুন্তী উভয়ই স্বামী-সংসর্গ থেকে বঞ্চিত হন। পরে কুন্তী সন্তান কামনায় পাণ্ডুর অনুরোধে তিন দেবতার সাথে মিলিত হন এবং তিনটি সন্তান লাভ করেন। কুন্তী প্রথম আহ্বান করেছিলেন ধর্ম দেবতাকে। ধর্মের সাথে মিলিত হলে, যুধিষ্ঠিরের জন্ম হয়। যুধি (যুদ্ধে) স্থির থাকতেন বলে, তাঁর নাম হয়েছিল যুধিষ্ঠির।
পাণ্ডুর মৃত্যুর পর কুন্তী নিজের তিনটি পুত্র ও মাদ্রীর দুটি পুত্র নিয়ে হস্তিনাপুরে ধৃতরাষ্ট্র-এর আশ্রয়ে আসেন। এই সময় পঞ্চপাণ্ডব ও ধৃতরাষ্ট্রের একশত সন্তান দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষা লাভ করেন।
জতুগৃহের পথে যাত্রাকালে বিদুর সাঙ্কেতিক ভাষায় যুধিষ্ঠিরকে দুর্যোধনের দুরভিসন্ধি জানিয়ে দেন। পরে কৌশলে জতুগৃহ থেকে এঁরা রক্ষা পান এবং নৌকা যোগে নদী পার হয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করেন। অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে জঙ্গলে সকলে ঘুমিয়ে পড়লে দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম একা সকলকে পাহারা দেন। এই সময় তিনি হিড়িম্ব নামক এক রাক্ষসকে হত্যা করে পাণ্ডবদের রক্ষা করেন। পরে যুধিষ্ঠির ও কুন্তীর অনুগ্রহে ভীমের সাথে হিড়িম্বার বিবাহ হয়।
এরপর যুধিষ্ঠির সবাইকে নিয়ে একচক্রা নগরীর একটি ব্রাহ্মণ পরিবারের আশ্রয়ে উঠে আসেন। এখানে ভীম বক নামক রাক্ষসকে হত্যা করেন। এই নগরীতে থাকাকালীন সময়ে পাণ্ডবরা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর-সভার কথা জানতে পারেন। এই স্বয়ংবর সভা দেখার জন্য পাণ্ডবরা রওনা হন। পথে গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণের সাথে অর্জুনের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে অর্জুন অঙ্গারপর্ণকে পরাজিত করে বন্দী করেন। এরপর অঙ্গারপর্ণের স্ত্রী কুম্ভীনসী যুধিষ্ঠিরের কাছে স্বামীর মুক্তির আবেদন করেন। যুধিষ্ঠিরের আদেশে অর্জুন তাঁকে ছেড়ে দেন।
স্বয়ংবর সভায় অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রৌপদীকে লাভ করলে, সভায় আহুত অন্যান্যরা পাণ্ডবদের আক্রমণ করে। পাণ্ডবরা যুদ্ধে সকলকে পরাজিত করে দ্রৌপদীকে সাথে নিয়ে কুন্তীর কাছে আসেন। দ্রৌপদীকে নিয়ে পঞ্চপাণ্ডব যখন ঘরে ফেরেন, তখন কুন্তী ঘরের মধ্যে ছিলেন। পঞ্চপাণ্ডব তাঁদের মাকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তাঁরা একটি অপূর্ব সামগ্রী ভিক্ষা করে এনেছেন। কুন্তী না দেখেই বলেন, তোমরা সকলে মিলে সেই জিনিস ভোগ কর। এরপর দ্রৌপদীকে দেখে ইনি বিব্রত হয়ে পড়েন। পরে কৃষ্ণ-দ্বৈপায়নের (বেদব্যাস)-এর বিধান মতে- পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদীকে বিবাহ করেন।
উল্লেখ্য দ্রৌপদীর গর্ভে যুধিষ্ঠিরের প্রতিবিন্ধ্য নামক পুত্র জন্মে। এছাড়া তিনি গোবাসনের কন্যা দেবিকার স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত হয়ে দেবিকাকে লাভ করেন। এঁর গর্ভে বৌধেয় নামক এক পুত্র জন্মে। নারদের পরামর্শে যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেন। মগধরাজ জরাসন্ধ এই যজ্ঞের বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন জেনে- কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন মগধ রাজ্যে যান। এখানে ভীম জরাসন্ধকে হত্যা করেন।
এরপর ধৃতরাষ্ট্র নিজ উদ্যোগে পঞ্চপাণ্ডব, দ্রৌপদী এবং কুন্তীকে হস্তিনাপুরে নিয়ে আসেন। পাণ্ডবরা ফিরে এসে ইন্দ্রপ্রস্থ নগর প্রতিষ্ঠা করে পৃথক রাজ্য স্থাপন করেন এবং যুধিষ্ঠির রাজা হন। রাজসূয় যজ্ঞের অর্থ আহরণের জন্য পাণ্ডবরা দিগ্বিজয়ে বের হন। যথাসময়ে এঁরা দিগ্বিজয় শেষে ফিরে এলে যুধিষ্ঠির রাজসূয়ো যজ্ঞ সম্পন্ন করেন।
দ্রৌপদীকে নিয়ে যাতে ভ্রাতৃবিরোধ না ঘটে, সে কারণে নারদ নিয়ম করে দেন যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, দ্রৌপদী একজন মাত্র পাণ্ডবের অধীনে থাকবেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অধিকারপ্রাপ্ত পাণ্ডব ব্যতীত অন্য কোন পাণ্ডব দ্রৌপদীকে গ্রহণ করলে বা দ্রৌপদীর সাথে অধিকারপ্রাপ্ত পাণ্ডবের বিহারকালে অন্য পাণ্ডব দর্শন করলে, তাঁকে ১২ বৎসর বনবাসী থাকতে হবে। ঘটনাক্রমে- একবার এক ব্রাহ্মণকে সাহায্য করার জন্য, অর্জুন অস্ত্রাগারে প্রবেশ করলে, সেখানে যুধিষ্ঠিরের সাথে দ্রৌপদীকে এক শয্যায় দেখতে পান। এই কারণে অর্জুন ১২ বৎসর বনবাসের জন্য গৃহত্যাগ করেন। ১২ বৎসর পরে ভাইদের সাথে মিলিত হন।
দুর্যোধন যজ্ঞানুষ্ঠানে এসে পাণ্ডবদের ঐশ্বর্যে ঈর্ষান্বিত হন এবং পাণ্ডবদের ক্ষতি করার জন্য শকুনি'র (দুর্যোধনের মামা) পরামর্শ নেন। শকুনির পরামর্শে দুর্যোধন যুধিষ্ঠিরকে পাশা খেলায় নিমন্ত্রণ করেন। যুধিষ্ঠির উক্ত খেলায় রাজী হলে, শকুনি কপট পাশাতে যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করেন। এই খেলায় যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীসহ রাজ্যপাট হারান। দুর্যোধনের নির্দেশে দুঃশাসন রজস্বঃলা দ্রৌপদীর চুল ধরে সভায় আনেন। কর্ণের পরামর্শে প্রকাশ্য সভায় দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করা শুরু করলে, দ্রৌপদীর কাতর আহ্বানে কৃষ্ণ অলৌকিকভাবে তাঁকে অশেষ কাপড় দ্বারা আবৃত করে রাখেন। পরে ধৃতরাষ্ট্র সকলকে মুক্তি দেন। দুর্যোধন ও শকুনি'র পরামর্শে ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে পুনরায় পাশা খেলায় অনুমোদন দান করেন। এবার যুধিষ্ঠির হেরে গিয়ে ১২ বৎসর বনবাস ও ১ বৎসর অজ্ঞাতবাসের শাস্তি পান।
এরপর পাণ্ডবরা রাজ্য ত্যাগ করে বনবাসের পথে গেলে দ্রৌপদী তাঁদের সাথে যান। এই যাত্রায় এঁরা প্রথমে কাম্যক বনে আসেন, পরে দ্বৈতবনে এসে সরস্বতী নদীর তীরে আশ্রম নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকেন। এই সময় দ্রৌপদী ও ভীম প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের জন্য যুধিষ্ঠিরকে উত্তেজিত করতে থাকলে, ইনি প্রতিজ্ঞায় অটল থাকেন। এই সময় অস্ত্র সংগ্রহের জন্য অর্জুন দেবালোকে যাত্রা করেন। এরপর যুধিষ্ঠির অন্যান্যদের নিয়ে নৈমিষারাণ্য, প্রয়াগ, বদরিকাশ্রম, ভৃগুতীর্থ, গঙ্গাসাগরসঙ্গম, মহেন্দ্রপর্বত, প্রভাসতীর্থ প্রভৃতি বহু তীর্থস্থান ভ্রমণ করেন।
বনবাসের একাদশ বৎসরে যমুনার উৎপত্তিস্থানের নিকটস্থ বিশাখযূপ বনে পাণ্ডবদের বসবাসকালে, একদিন ভীম মৃগয়ায় বের হন। সেখানে অগস্ত্য-শাপে অজগররূপী নহুষ ভীমকে বেষ্ঠন করে আহার করতে উদ্যত হন। যুধিষ্ঠির বিভিন্ন দুর্লক্ষণ দেখে ভীমের খোঁজে বের হয়ে, অজগররূপী নহুষের কাছে উপস্থিত হন। যুধিষ্ঠির নহুষের কাছে ভীমের মুক্তি দাবী করলে, নহুষ যুধিষ্ঠিরের কাছে কিছু প্রশ্নের উত্তর চেয়ে বলেন যে, প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলেই তবে ভীমকে মুক্তি দেবেন। এরপর যুধিষ্ঠির নহুষের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে ভীমকে উদ্ধার করেন। এই সময় নহুষ অভিশাপ মুক্ত হন।
পাণ্ডবরা দ্বৈতবনে অবস্থানকালে দুর্যোধন মৃগয়ার অছিলায় পাণ্ডবদের দুর্দশা দেখতে এসে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের দ্বারা নিগৃহীত হলে পাণ্ডবরা তাঁকে রক্ষা করেন। এই সময় আত্মগ্লানিতে দুর্যোধন প্রায়োপবেশন করেন। এরপর কাম্যকবনে পাণ্ডবরা ফিরে এসে বসবাস করতে থাকে। একদিন পাণ্ডবদের অনুপস্থিতিতে জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে হরণ করেন। পাণ্ডবরা পরে জয়দ্রথকে ধরে এনে লাঞ্ছিত করতে থাকলে যুধিষ্ঠির তাঁকে রক্ষা করেন। কিন্তু ভীম তাঁর মাথায় অর্ধাস্ত্র বাণদ্বারা পঞ্চচূড়া তৈরি করে পাণ্ডবদের দাসরূপে বেড়াতে আদেশ করেন। এরপরও যুধিষ্ঠির তাঁকে মুক্তি দেন।
বনবাসের দ্বাদশবর্ষে যুধিষ্ঠিরকে পরীক্ষা করার জন্য ধর্মদেবতা হরিণরূপে এক ব্রাহ্মণের অরণি-মন্থ চুরি করেন। ব্রাহ্মণ তাঁর অগ্নিহোত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় যুধিষ্ঠিরের শরণাপন্ন হন। এরপর পঞ্চপাণ্ডব উক্ত হরিণের অনুসরণ করেন। হরিণরূপী ধর্ম অদৃশ্য হলে, যুধিষ্ঠির প্রার্থী ব্রাহ্মণের বিমুখ হওয়ার আশঙ্কায় অত্যন্ত দুঃখিত হন। দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে যুধিষ্ঠির নকুলকে নিকটস্থ সরোবর থেকে জল সংগ্রহের আদেশ দেন। নকুল উক্ত সরোবর থেকে জল সংগ্রহ করতে গেলে ধর্ম, বকরূপে আকাশ থেকে তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জল সংগ্রহ করতে বললেন। নকুল তা অগ্রাহ্য করে অগ্রসর হলে ভূপতিত হন। এরপর যুধিষ্ঠির অন্যান্য ভাইদের পাঠালেন। প্রত্যেকেই ধর্মকে অগ্রাহ্য করে জল সংগ্রহ করতে গেলে ভূপতিত হন। এরপর যুধিষ্ঠির নিজেই সরোবরে উপস্থিত হয়ে চার ভাইয়ের অবস্থা দেখলেন। ধর্ম তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জল সংগ্রহ করতে বলেন। যুধিষ্ঠির সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলে ধর্ম তাঁকে যে কোন এক ভাইয়ের জীবন ভিক্ষা দিতে ইচ্ছা করলেন। উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেন যে, কুন্তী ও মাদ্রীর অন্তত একটি করে সন্তান বেঁচে থাকুক। ধর্ম তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে অপর চার পাণ্ডবের জীবনদান করলেন। এরপর ধর্ম বর প্রার্থনা করতে বললে, যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণের অরণি-মন্থ ফিরে চাইলেন। ধর্ম অরণি-মন্থ ফিরিয়ে দিয়ে অন্য বর প্রার্থনা করতে বললেন। এরপর অজ্ঞাতবাসকালে তাদের যেন কেউ চিনতে না পারে এই বর প্রার্থনা করলে, ধর্ম সেই বর দান করে প্রস্থান করেন। এরপর ধর্ম পাণ্ডবদের বিরাট রাজ্যে বাস করার উপদেশ দিয়ে প্রস্থান করেন।
যুধিষ্ঠির বিরাটরাজের সভায় কঙ্ক নামে দ্যুতনিপুণ ব্রাহ্মণ হিসাবে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সৌরন্ধ্রীরূপী দ্রৌপদীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কীচক তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিলে, দ্রৌপদী তা প্রত্যাখান করেন। এরপর কীচকের বারবার অনুরোধে সুদেষ্ণা (কীচকের বোন) মদ আনার অছিলায়, দ্রৌপদীকে কীচকের ঘরে পাঠান। কীচক দ্রৌপদীকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করলে, দ্রৌপদী তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বিরাটের রাজসভায় উপস্থিত হন। এরপর কীচক রাজসভায় এসে সর্বসমক্ষে দ্রৌপদীর চুল ধরে তাকে লাথি মারেন। বিরাট-সভায় কীচক প্রকাশ্যে দ্রৌপদীকে লাথি মারলে, আত্মপরিচয় প্রকাশের আশঙ্কায় ভীমকে প্রতিশোধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বলেন। পরে দ্রৌপদীর অনুরোধে ভীম কীচককে হত্যা করেছিলেন।
পাণ্ডবদের এই অজ্ঞাতবাসের শেষাংশে দুর্যোধন বিরাটরাজের গোধন হরণ করলে যুধিষ্ঠিরের ইঙ্গিতে বৃহন্নলারূপী অর্জুন কৌরব-সৈন্যদের পরাস্ত করে গোধন উদ্ধার করেন। অজ্ঞাতবাস শেষে যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের কাছে রাজ্য ফিরে চান। দুর্যোধন তাতে অসম্মত হলে, সঞ্জয় পাঁচ ভাইয়ের জন্য পাঁচটি গ্রাম প্রার্থনা করেন। যুদ্ধ পরিহার করার জন্য কৃষ্ণকে দুর্যোধনের কাছে পাঠান। সকল প্রস্তাবই দুর্যোধন অগ্রাহ্য করেন। এরপর যুধিষ্ঠির দুঃখিত হয়ে যুদ্ধের ব্যাপক আয়োজন সম্পন্ন করেন।
যুদ্ধের আরম্ভে যুধিষ্ঠির রথ থেকে নেমে ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, শল্য প্রমুখ গুরুজনদের প্রণাম করে আশীর্বাদ ভিক্ষা করেন। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র যুযুৎসু পাণ্ডব পক্ষে যোগ দিতে ইচ্ছা করলে যুধিষ্ঠির সম্মতি দেন।
যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে অভিমন্যু চক্রব্যূহ ভেদ করার ইচ্ছা করলে, যুধিষ্ঠির তাঁকে বাধা দেন, পরে নিরুপায় হয়ে অভিমন্যুকে অনুমতি দেন। উল্লেখ্য উক্ত যুদ্ধে অভিমন্যু নিহত হন।
দ্রোণকে যুদ্ধে নিরস্ত করার জন্য কৃষ্ণ এবং ভীমের প্ররোচনায় যুধিষ্ঠির 'অশ্বত্থামা হতঃ-ইতি গজঃ' এই মিথ্যা উচ্চারণ করেন। যুধিষ্ঠিরের এই বাক্যে দ্রোণ তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা'র মৃত্যু হয়েছে মনে করে অস্ত্রত্যাগ করেন। উল্লেখ্য অশ্বত্থামা নামক হাতির মৃত্যু হয়েছে এই সংবাদটাই যুধিষ্ঠির মিথ্যার আশ্রয়ে উচ্চারণ করেন। এই মিথ্যাচারের জন্য তাঁর রথ কিছুটা ভূমির দিকে নেমে যায়।
যুদ্ধের সপ্তদশ দিনে যুধিষ্ঠির কর্ণের কাছে পরাজিত ও লাঞ্ছিত হয়ে শিবিরে পলায়ন করেন। এই সময় অর্জুন উপস্থিত হয়ে কর্ণকে হত্যা করতে ব্যর্থ হলে যুধিষ্ঠির তাঁকে তিরস্কার করে গাণ্ডিব ত্যাগ করতে বলেন। এতে অর্জুন ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে যুধিষ্ঠিরকে হত্যা করতে উদ্যত হলে কৃষ্ণ তাঁকে নিবারণ করেন। পরে অবশ্য কর্ণকে অর্জুনই হত্যা করেছিলেন।
যুদ্ধের অষ্টাদশ দিনে যুধিষ্ঠির শল্যকে হত্যা করেন। যুদ্ধের শেষে দুর্যোধনের দ্বৈপায়ন হ্রদে আত্মগোপন করলে, যুধিষ্ঠির তাঁকে তীক্ষ্ণবাক্যে উত্তেজিত করেন। পরে ভীমের সাথে দুর্যোধনের গদা যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ভীম অন্যায়ভাবে দুর্যোধনের উরু ভেঙে দেন। যুদ্ধের শেষে ক্রুদ্ধ গান্ধারী যুদ্ধক্ষেত্রে এলে ইনি তাঁর ক্রোধ প্রশমিত করার জন্য গান্ধারীর পায়ে ধরেন। এ সময় গান্ধারী বস্ত্রাবরণের আড়াল থেকে শুধুমাত্র যুধিষ্ঠিরের নখগুলি দেখতে পান। ফলে যুধিষ্ঠিরের নখগুলো বিকৃত হয়ে যায়।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর পাণ্ডবরা সবার মৃতদেহ সৎকারের সময় কুন্তী তাঁদের কাছে কর্ণের জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করে তাঁর উদ্দেশ্যেও তর্পণ করতে অনুরোধ করেন। এতে যুধিষ্ঠির ক্ষিপ্ত হয়ে অভিশাপ দেন যে, স্ত্রী জাতি কোন বিষয়ই গোপন রাখতে পারবে না।
যুদ্ধ শেষে যুধিষ্ঠিরের রাজ্যাভিষেক হয়। এই সময় যুধিষ্ঠির আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুর জন্য অনুতপ্ত হয়ে রাজপদ ত্যাগ করতে উদ্যত হন। কিন্তু কৃষ্ণ, কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন, অনুনয় করে তাঁকে রাজ্য গ্রহণে সম্মত করান। রাজ্যগ্রহণের পর ইনি শরশয্যাশায়ী ভীষ্মের কাছে উপস্থিত হন। ভীষ্ম তাঁকে বহু পরামর্শ দিয়ে দেহত্যাগ করেন। এরপর ইনি আত্মীয়-স্বজন হত্যাজনীত অপরাধ থেকে উদ্ধারের জন্য ব্যাসদেবের পরামর্শে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। এরপর যুধিষ্ঠির ৩৬ বৎসর রাজত্ব করেন। এই সময় ইনি ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর সেবা করার ব্যবস্থা করেন।
যদুবংশ ধ্বংসের পর ইনি অভিমন্যুর পুত্র পরীক্ষিৎ-কে রাজ্যে অভিষিক্ত করেন এবং যুযুৎসু'র উপর রাজ্যের ভার অর্পণ করে চার ভাই ও দ্রৌপদীসহ মহাপ্রস্থানের প্রস্তুতি নেন। এই সময় তাঁদের সাথে ধর্মদেবতা কুকুররূপে সঙ্গ নেন। পথিমধ্যে চার ভাই ও দ্রৌপদীর পতন ঘটে। এরপর একমাত্র কুকুরকে সঙ্গী করে ইনি স্বর্গদ্বারে উপস্থিত হন। কিন্তু ইন্দ্র যুধিষ্ঠিরকে বলেন যে, তিনি কুকুরসহ স্বর্গে প্রবেশ করতে দিবেন না। উত্তরে ইনি বলেন যে, প্রভুভক্ত কুকুর ছাড়া স্বর্গে প্রবেশ করলে, তা নির্দয়তা হবে। সুতরাং কুকুর ছাড়া তিনি স্বর্গে প্রবেশ করবেন না। এরপর ধর্ম কুকুরের রূপ পরিত্যাগ করে যুধিষ্ঠিরকে বলেন যে, যুধিষ্ঠির তোমার সমান স্বর্গে কেউ নেই।
স্বর্গে প্রবেশ করে তিনি তাঁর ভাইদের দেখতে চান। দেবদূতরা তাঁকে নরকে নিয়ে যান। সেখানে ভাইদের দেখতে পেয়ে স্বর্গে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে, ইন্দ্র তাঁকে বলেন যে, যুধিষ্ঠির অশ্বত্থামার মৃত্যু সংবাদ দিয়ে দ্রোণাচার্যের সাথে প্রতারণা করেন বলে, তাঁকে কৌশলে নরক দর্শন করান হয়েছে। এরপর যুধিষ্ঠির পাণ্ডবদের নিয়ে স্বর্গে প্রবেশ করেন।
দ্বিতীয় পান্ডব ভীমঃ
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে এই নামে তিনটি চরিত্র রয়েছে। এঁরা হলেন–
১. পুরূরবার পুত্র।
২. ইনি ছিলেন বিদর্ভরাজ ও দয়মন্তীর পিতা। ইনি বহুদিন নিঃসন্তান ছিলেন বলে অত্যন্ত দুঃখিত ছিলেন। একবার দমন নামে এক ঋষি তাঁর কাছে এলে- ইনি পুত্রলাভের আশায় মহর্ষির কাছে তাঁর স্ত্রীকে পাঠান। ফলে ইনি তিনটি ক্ষেত্রজ পুত্র ও একটি ক্ষেত্রজ কন্যা লাভ করেন। পুত্র তিনটির নাম ছিল দম, দান্ত ও দমন। কন্যার নাম ছিল দয়মন্তী।
৩. পাণ্ডুর ক্ষেত্রজ পুত্র। পাণ্ডুর অনুমতিক্রমে তাঁর স্ত্রী কুন্তী পবনদেবের সাথে মিলিত হলে- ভীমের জন্ম হয়। ইনি ছিলেন কুন্তীর তৃতীয় পুত্র এবং পাণ্ডুর দ্বিতীয় ক্ষেত্রজ পুত্র।
ইনি দৈহিক আকৃতিতে ছিলেন বিশাল এবং শক্তি ছিল অপরিমিত। এঁর কোন দাড়ি না থাকায় কর্ণ এঁকে মাকুন্দ বলে পরিহাস করতেন। এর গায়ের রং ছিল কাঁচা সোনার মত। ইনি ছিলেন বিশাল কাঁধের অধিকারী, উন্নতবক্ষ ও অযুত হাতীর শক্তির সমান বলশালী। ইনি অতিরিক্ত ভোজনপটু ছিলেন বলে, বৃকোদর নামপ্রাপ্ত হন। বাকী চার পাণ্ডব এবং ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সাথে দ্রোণাচার্যের কাছে ইনি অস্ত্র শিক্ষা করেন। এরপর ইনি বলরামের কাছে বিশেষভাবে গদাযুদ্ধ শেখেন। ফলে ইনি অবিলম্বে গদা যুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। ছোটবেলায় শারীরীক শক্তির কারণে কৌরবদের একশত ভাইকে সবসময় নিপীড়িত করতেন। বিপদের সময় দ্রৌপদী এবং ভীম এঁর উপরই সবচেয়ে বেশী নির্ভর করতেন।
শৈশবে দুর্যোধন তাঁকে হত্যা করার জন্য প্রমাণকোটি নামক স্থানে একটি জলক্রীড়ার জন্য স্থান নির্বাচন করেন। পরে সকলকে ডেকে উক্ত স্থানে জলক্রীড়া করার সময় বিষ মিশ্রিত পিঠা খাওয়ান এবং লতা দিয়ে হাত পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেন। এই অবস্থায় ইনি নাগলোকে পৌঁছুলে, নাগদের দংশনে তাঁর শরীরস্থ বিষের ক্ষয় হয়। জ্ঞান লাভ করে ইনি নাগদের হত্যা করতে থাকেন। পরে নাগরাজ তাঁকে নিজের দৌহিত্র কুন্তীভোজের দৌহিত্র বলে চিনতে পেরে ভীমকে আলিঙ্গন করেন এবং রসায়ন পান করান। ইনি মোট আটটি রসায়ন-কুণ্ডু পান করে আট দিন ঘুমিয়ে কাটান। আটদিন ধরে ইনি রসায়ন হজম করে অযুত হাতির বল লাভ করেন। পরে নাগদের সহায়তায় ইনি ঘরে ফিরে আসেন।
দুর্যোধন জুতগৃহে অন্যান্য পাণ্ডবদের সাথে এঁকেও পুড়িয়ে মারার উদ্যোগ নেন। পরে বিদুরের সহায়তায় অন্যান্যদের সাথে ইনিও রক্ষা পান। ভীম সুরঙ্গপথে সকলকে অন্যত্র পাঠিয়ে নিজেই জতুগৃহে অগ্নিসংযোগ করে সকলকে সাথে নিয়ে গঙ্গাতীরে উপস্থিত হন এবং সেখান থেকে বিদুরের প্রেরিত নৌকায় করে গঙ্গা পার হয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করেন। দেখুন : জতুগৃহ
এখানে সকলে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ভীম একা সকলকে পাহারা দেন। এই বনে হিড়িম্ব নামক এক রাক্ষস বাস করতো। হিড়িম্ব এদের মাংস খাওয়ার জন্য তাঁর বোন হিড়িম্বাকে পাঠায়। কিন্তু হিড়িম্বা ভীমের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সুন্দরী নারীরূপ ধরে ভীমের সামনে আসেন এবং হিড়িম্বের অভিসন্ধির কথা বলে দেন। ইনি ভীমের কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেন। বোনের বিলম্ব দেখে হিড়িম্ব নিজে এলে, ভীম তাঁকে হত্যা করেন এবং হিড়িম্বাকে বিবাহ করেন।
এরপর পাণ্ডবেরা একচক্রা নামক নগরে এসে এক ব্রাহ্মণের ঘরে আশ্রয় নেন। এই নগরীতে বক নামক রাক্ষস প্রতিদিন নগরীর একজন করে মানুষ ভক্ষণ করতো। পাণ্ডবরা যেদিন ব্রাহ্মণের ঘরে আশ্রয় নেন, সেদিনই উক্ত ব্রাহ্মণ রাক্ষসের খাবার হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কুন্তী উক্ত ব্রাহ্মণের পরিবর্তে রাক্ষসের কাছে ভীমকে পাঠান। ভীম উক্ত রাক্ষসকে হত্যা করে একচক্রাবাসীদেরকে রাক্ষসদের হাত থেকে রক্ষা করেন। দেখুন : বক
এই নগরীতে থাকাকালীন সময়ে পাণ্ডবরা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর-সভার কথা জানতে পারেন। উক্ত সভায় অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রৌপদীকে লাভ করলে- সভায় আহুত অন্যান্যরা পাণ্ডবদের আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে মূল কৃতিত্ব দেখান অর্জুন ও ভীম। পাণ্ডবরা যুদ্ধে সকলকে পরাজিত করে দ্রৌপদীকে সাথে নিয়ে কুন্তী'র কাছে আসেন। দ্রৌপদীকে নিয়ে পঞ্চপাণ্ডব যখন ঘরে ফেরেন, তখন কুন্তী ঘরের মধ্যে ছিলেন। পঞ্চপাণ্ডব তাঁদের মাকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তাঁরা একটি অপূর্ব সামগ্রী ভিক্ষা করে এনেছেন। কুন্তী না দেখেই বলেন,- তোমরা সকলে মিলে সেই জিনিস ভোগ কর। এরপর দ্রৌপদীকে দেখে ইনি বিব্রত হয়ে পড়েন। পরে ব্যাসদেবের বিধান মতে- পঞ্চপাণ্ডবের সাথে দ্রৌপদী বিবাহ করেন।
এরপর পাণ্ডবেরা ইন্দ্রপ্রস্থে রাজধানী স্থাপন করে রাজত্ব শুরু করলে, যুধিষ্ঠির রাজা হন। নারদের পরামর্শে যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেন। মগধরাজ জরাসন্ধ এই যজ্ঞের বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন জেনে কৃষ্ণ ভীম ও অর্জুনকে সাথে নিয়ে মগধ রাজ্যে উপস্থিত হন। কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন স্নাতক ব্রাহ্মণবেশে জরাসন্ধের সম্মূখে আসেন। জরাসন্ধ এই তিনজনের হাতে অস্ত্রব্যবহারের চিহ্ন দেখে প্রকৃত পরিচয় জানতে ইচ্ছা করলে, কৃষ্ণ তাঁদের প্রকৃত পরিচয় দেন। এরপর জরাসন্ধের সাথে ভীমের মল্লযুদ্ধ হয়। ভীম একাধিকবার জরাসন্ধকে পরাজিত করে শরীর বিছিন্ন করেন, কিন্তু অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে উক্তশরীর জোড়া লেগে জরাসন্ধ জীবিত হয়ে উঠতে থাকেন। এরপর কৃষ্ণের ইশারায় ভীম বিচ্ছিন্ন হওয়া দেহকে মিলিত হওয়ায় বাধা সৃষ্টি করলে- জরাসন্ধের প্রকৃত মৃত্যু ঘটে। রাজসূয় যজ্ঞের অর্থ আহরণের জন্য পাণ্ডবরা দিগ্বিজয়ে বের হলে ভীম পূব দিকে যাত্রা করেন। এই যাত্রায় ইনি পাঞ্চাল, বিদেহ, দশার্ণ, চেদি, কোশল, অযোধ্যা প্রভৃতি দেশ জয় করে ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে আসেন।
হস্তিনাপুরে দুর্যোধনের দ্যুতসভায় শকুনির কাছে যুধিষ্ঠির পরাজিত হলে- সভামধ্যে দুঃশাসন দ্রৌপদীকে অপমান করলে, ভীম দুঃশাসনের বক্ষরক্ত পান করার প্রতিজ্ঞা করেন। সভামধ্যে দ্রৌপদীকে অপমান করার জন্য দুর্যোধন বাম উরু প্রদর্শন করলে, ভীম দুর্যোধনের উরুভঙ্গের প্রতিজ্ঞা করেন। বনযাত্রাকালে ইনি দুর্যোধনের রক্তপান ও কৌরবভ্রাতাদের হত্যা করবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেন।
কাম্যকবনে বসবাসকালে বকরাক্ষসের ভাই কির্মীর প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে পাণ্ডবদের আক্রমণ করলে, ভীম তাকেও হত্যা করেন। দ্বৈতবনে বসবাসকালে ভীম কপটতার দ্বারা যুদ্ধজয়ের পরামর্শ দিতে গেলে- যুধিষ্ঠিরের যুক্তির কাছে ইনি পরাজিত হন। বদরিকাশ্রমের কাছে বসবাসকালে, গঙ্গায় সুগন্ধী পদ্মফুল ভেসে যেতে দেখে দ্রৌপদী উক্ত পদ্মসংগ্রহের জন্য ভীমকে অনুরোধ করেন। ভীম উক্ত পদ্ম সংগ্রহের জন্য অগ্রসর হয়ে গন্ধমাদন পর্বতে উপস্থিত হন। সেখানে তাঁর অগ্রজ হনুমানের সাথে দেখা হয়। পদ্ম সংগ্রহের জন্য ভুল করে মানুষের অগম্য স্বর্গপথে ভীম রওনা দিলে, হনুমান রুগ্ন বানরের বেশে তাঁর পথরোধ করে বসেন। ভীম হনুমানকে পথ ছেড়ে দিতে বললে, হনুমান তাতে রাজী হলেন না। ভীম তাঁর অগ্রজকে চিনতে না পেরে আস্ফালন করতে থাকলে, হনুমান তাঁর লেজ বিছিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি এই লেজ সরিয়ে তোমার গন্তব্যে যাও। এরপর ভীম বহু চেষ্টা করেও উক্ত লেজ সরাতে অক্ষম হলে, হনুমান তাঁর পরিচয় দেন। এরপর ভীম তাঁর অগ্রজের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সমুদ্র লঙ্ঘনের পূর্বে হনুমানের রূপ কেমন ছিল তা দেখার জন্য আবেদন জানান। এই সময় হনুমান তাঁর বিন্ধ্যপর্বতের মতো বিশাল রূপ দেখান। এরপর হনুমান পদ্মবনের প্রকৃত পথ দেখান। উল্লেখ্য কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি আড়ালে থেকে ভীমকে সাহায্য করেছিলেন। এরপর হনুমানের দেখানো পথ ধরে ইনি কুবের ভবনের নিকটস্থ একটি জলাশয় থেকে কুবেরের অনুচরদের পরাজিত করে উক্ত পদ্ম সংগ্রহ করেন।
জটাসুর নামক এক রাক্ষস পাণ্ডবদের সাথে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে বাস করতেন। একদিন ভীম মৃগয়ায় গেলে, এই রাক্ষস যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেব ও দ্রৌপদীকে অপহরণ করে। ভীম ফিরে এসে প্রকৃত বিষয় অবগত হয়ে এই অসুরকে হত্যা করেন। অর্জুন স্বর্গে অস্ত্রশিক্ষার জন্য গেলে, তাঁর ফিরে আসার প্রতীক্ষায় কৈলাসপর্বতের কাছে পাণ্ডবরা যখন প্রতীক্ষা করছিলেন, তখন দ্রৌপদীর প্ররোচনায় ভীম কুবেরের অনুচর রাক্ষসদেরকে সেখান থেকে বিতারিত করেন। এই সময় কুবেরের বন্ধু মণিমান ভীমের হাতে নিহত হন। বনবাসের একাদশ বত্সরে যমুনার উত্পত্তিস্থানের নিকটস্থ বিশাখযূপ বনে পাণ্ডবেরা বসবাসকালে একদিন ভীম মৃগয়ায় বের হন। সেখানে অগস্ত্য-শাপে অজগররূপী নহুষ ভীমকে বেষ্ঠন করে ভক্ষণ করতে উদ্যত হন। যুধিষ্ঠির বিভিন্ন দুর্লক্ষণ দেখে ভীমের খোঁজে বের হয়ে, অজগররূপী নহুষের কাছে উপস্থিত হন। যুধিষ্ঠির নহুষের কাছে ভীমের মুক্তি দাবী করলে, নহুষ যুধিষ্ঠিরের কাছে কিছু প্রশ্নের উত্তর দাবী করে বলেন যে, প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলেই ভীমকে মুক্তি দেবেন। এরপর যুধিষ্ঠির নহুষের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে ভীমকে উদ্ধার করেন।
কাম্যকবনে পাণ্ডবরা ফিরে এসে বসবাস করা কালে পাণ্ডবদের অনুপস্থিতে জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে হরণ করেন। পাণ্ডবরা জয়দ্রথকে ধরে এনে লাঞ্ছিত করতে থাকলে যুধিষ্ঠির তাঁকে রক্ষা করেন। কিন্তু ভীম তাঁর মাথায় অর্ধাস্ত্র বাণদ্বারা পঞ্চচূড়া তৈরি করে পাণ্ডবদের দাসরূপে বেড়াতে আদেশ করেন। এরপরও যুধিষ্ঠির তাঁকে মুক্তি দেন।
পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসকালে ভীম বল্লভ নামে বিরাটের রন্ধনশালার অধ্যক্ষ হন। এখানে থাকা অবস্থায় ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে আয়োজিত উত্সবে জীমূত নামক মহামল্ল ও অন্যান্য বহু মল্লযোদ্ধাকে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করেন। বিরাটের শ্যালক দ্রৌপদীকে ভোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে সভামধ্যে অপমান করলে, দ্রৌপদী ভীমকে বিষয়টি জানান। পরে ভীমের পরামর্শে দ্রৌপদী কীচককে রাত্রিবেলায় নাট্যশালায় আমন্ত্রণ জানান। কীচক দ্রৌপদীকে পাবার জন্য রাত্রিবেলায় নাট্যশালায় এলে ভীমের হাতে নিহত হন। কীচকের মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাবার সময় কীচকের ভাইয়েরা দ্রৌপদীকেও বন্দী করে শ্মশানে নিয়ে যান। ভীম ছদ্মবেশে তাঁদের সাথে গিয়ে সকলকে হত্যা করে দ্রৌপদীকে উদ্ধার করেন। এরপর সুশর্মা দুর্যোধনের সহায়তায় বিরাটরাজকে পরাজিত ও বন্দী করে তাঁর সকল গবাদি পশু হরণ করেন। পরে যুধিষ্ঠিরের আদেশে ভীম সুশর্মাকে পরাজিত ও বন্দী করে বিরাটরাজকে উদ্ধার করেন। অবশ্য এই যুদ্ধে মূখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন অর্জুন। দেখুন : অর্জুন
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভীম একা ধৃতরাষ্ট্রের একশত পুত্রকে হত্যা করেছিলেন। পাণ্ডবরা ভীমকে সামনে রেখে যুদ্ধ শুরু করেন। ইনি প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে ভীষ্মের সাথে যুদ্ধ করেন। দ্বিতীয় দিনে ইনি ক্রমান্বয়ে শক্রদেব, ভানুমান, শ্রুতায়ু, সত্য, সত্যদেব, কেতুমানসহ বহু কৌরব সৈন্যকে হত্যা করেন। চতুর্দশ ও পঞ্চম দিনে দ্রোণাচার্যের সাথে বীরত্বব্যঞ্জক যুদ্ধ করেন। যুদ্ধের সপ্তদশ দিনে ইনি দুঃশাসনকে হত্যা করে প্রতিজ্ঞা স্বরূপ তার বক্ষ চিরে রক্তপান করেন। এই দিনেই ইনি কর্ণের কাছে পরাজিত হন। কিন্তু কর্ণ কুন্তীর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে অর্জুন ছাড়া অন্য কোন পাণ্ডবকে হত্যা করবেন না। সেই কারণে ইনি ভীমকে মুক্তি দেন।
যুদ্ধের অষ্টাদশ দিনে দুর্যোধনের সকল সৈন্য নিহত হলে- দুর্যোধন পালিয়ে দ্বৈপায়ন হ্রদে যান। মায়া দ্বারা জলের স্তম্ভ তৈরি করে সেখানে লুকিয়ে থাকেন। এই সময় দুর্যোধনের পক্ষের তিন সেনাপ্রধান অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা যুদ্ধের পরামর্শ করতে এলে- তিনি পরদিনের জন্য এই আলোচনা স্থগিত রাখতে বলেন। এই আলোচনা কয়েকজন শিকারী শুনে পাণ্ডবদের কাছে এসে দুর্যোধনের অবস্থানের কথা জানান। পাণ্ডবরা সেখানে এলে, ভীমের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। উল্লেখ্য ইনি ভীমকে হত্যা করার জন্য তের বত্সর এক লৌহ মূর্তির উপর গদা প্রহার অভ্যাস করেছিলেন। সরস্বতী নদীর দক্ষিণ প্রান্তে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। গদা যুদ্ধে ভীম অত্যন্ত বলশালী হলেও দুর্যোধন অত্যন্ত কৌশলী ছিলেন। কৃষ্ণের ইঙ্গিতে ভীম অন্যায়ভাবে দুর্যোধনের উরুতে আঘাত করে তা ভেঙে দেন। উল্লেখ্য গদা যুদ্ধে কটি দেশের নিম্নে আঘাত করা অন্যায় বলে বিবেচিত হত। উরু ভঙ্গের পর ভীম দুর্যোধনের মস্তক বাম পা দ্বারা নিস্পিষ্ট করেন। এই অন্যায় যুদ্ধ দেখে উপস্থিত বলরাম ভীমকে হত্যা করতে অগ্রসর হলে, কৃষ্ণ তাঁকে শান্ত করেন। দুর্যোধন এই অন্যায় যুদ্ধের জন্য কৃষ্ণকে তিরস্কার করেন।
পাণ্ডবেরা মৃতপ্রায় দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করে চলে গেলে, সেখানে কৃপাচার্য, কৃতবর্মা ও অশ্বত্থামা আসেন। এরপর দুর্যোধন অশ্বত্থামাকে সেনাপতি হিসাবে নিয়োগ করেন এবং ভীমের ছিন্নমুণ্ডু আনার নির্দেশ দেন। এই অশ্বত্থামা বাকি দুজনকে দ্বার রক্ষায় রেখে পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ করে ঘুমন্ত সকলকেই হত্যা করেন। এই সময় পঞ্চপাণ্ডব কৃষ্ণ ও সাত্যকি অনত্র্য থাকায় তাঁরা রক্ষা পান। অশ্বত্থামা দুর্যোধনকে এই সংবাদ প্রেরণ করলে আনন্দ চিত্তে প্রাণত্যাগ করেন। এই হত্যাকাণ্ডে অন্যান্য পাণ্ডববীরদের সাথে দ্রৌপদীর সকল সন্তান মৃত্যুবরণ করে। এই কারণে দ্রৌপদী অশ্বত্থামাকে হত্যা করে তার মাথার মণি এনে দেওয়ার জন্য ভীমকে অনুরোধ করেন। অর্জুন ও কৃষ্ণ অশ্বত্থামাকে পরাজিত করলে, ভীম অশ্বত্থামার মাথার মণি এনে দ্রৌপদীকে দেন। যুদ্ধ শেষে যুধিষ্ঠির ভীমকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করেন।
ভীম গোপনে ধৃতরাষ্ট্রকে অপমান করলে, ধৃতরাষ্ট্র বনবাসী হন। ময়দানব বিন্দু সরোবর থেকে বৃষপর্বা গদা এনে ভীমকে উপহার দিয়েছিলেন। মহাপ্রস্থানের পথে দ্রৌপদী, সহদেব, নকুল, ও অর্জুনের পরে এর পতন ঘটে। অতিভোজন ও আত্ম-প্রশংসার কারণে এঁর পতন ঘটেছিল।
এঁর তিনজন স্ত্রীর নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন দ্রৌপদী, বলন্ধরা ও হিড়িম্বা। এঁদের গর্ভে তাঁর তিনটি পুত্র জন্মগ্রহণ করেছিল। এরা হলেন- সুতসোম- দ্রৌপদীর গর্ভজাত, সর্বগ-বলন্ধরার গর্ভজাত, ঘটোত্কচ-হিড়িম্বার গর্ভজাত।
ভীমসেন
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে–
১. পরীক্ষিতের ঔরসে সুযশার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। এঁর স্ত্রীর নাম ছিল কুমারী। এঁদের পুত্রের নাম ছিল প্রতীশ্রবা।
২. দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীমের অপর নাম ভীমসেন।
ভীমা
দুর্গা দেবীর অপর নাম। দুর্গা হিমাচলে ভীষণ রূপ ধারণ করে, রাক্ষসদের হত্যা করে মুনিদের রক্ষা করেন। এই কারণে দুর্গাকে ভীমা নামে অভিহিত করা হয়।
তৃতীয় পান্ডব অর্জুনঃ
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে এই নামে একাধিক চরিত্র পাওয়া যায়। যেমন–
১. মাহিষ্মতী পুরীতে অর্জুন নামক একজন রাজা ছিলেন। এঁর পিতার নাম ছিল কৃর্তবীর্য। এই কারণে ইনি কার্তবীর্য বা কার্তবীর্যার্জুন নামে পরিচিত ছিলেন।
২. মহাভারতের অন্যতম চরিত্র। এঁর অপরাপর নাম– অরিমর্দন, কপিকেতন, কপিধ্বজ, কিরীটী, কৃষ্ণসখ, কৃষ্ণসারথি, কৌন্তেয়, গাণ্ডিবধন্বা, গাণ্ডিবী, গুড়াকেশ, চিত্রযোধী, জিষ্ণু, তৃতীয় পাণ্ডব, ধনঞ্জয়, পার্থ, ফল্গুন, ফাল্গুনি, বিজয়, বীভৎসু, শব্দবেধী, শব্দভেদী, শুভ্র, শ্বেতবাহ, শ্বেতবাহন, সব্যসাচী।
পাণ্ডু নামক রাজা কিমিন্দম মুনির অভিশাপের (যে কোন নারীর সাথে সঙ্গম করতে গেলে– পাণ্ডু মৃত্যুবরণ করবেন) কারণে স্ত্রীসংগম থেকে বিরত থাকেন। এই কারণে ইনি তাঁর স্ত্রীদ্বয়ের গর্ভে সন্তান লাভ করতে পারলেন না। এরপর ইনি তাঁর স্ত্রী কুন্তী'কে ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের জন্য অন্য পুরুষকে গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। কুন্তী সন্তান কামনায় তিনবার তিনজন দেবতাকে আহ্বান করেছিলেন। শেষবারে তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে আহ্বান করেন। এর ফলে ইন্দ্রের ঔরসে তিনি অর্জুনকে জন্ম দেন। উল্লেখ্য এঁর পূর্বে একই ভাবে কুন্তী পাণ্ডুর অনুরোধে আরও দুটি সন্তান লাভ করেছিলেন। এরা হলেন- ধর্মের ঔরসে যুধিষ্ঠির ও পবনের ঔরসে ভীম। সেই কারণে অর্জুন তৃতীয় পাণ্ডব নামে পরিচিত হয়ে থাকেন। অবশ্য তবে তারও আগে অবিবাহিতা অবস্থায় সূর্যের ঔরসে কুন্তীর গর্ভে জন্মেছিল কর্ণ। কিন্তু তখন তিনি পাণ্ডুর স্ত্রী ছিলেন না বলে- কর্ণ পাণ্ডব হিসাবে স্বীকৃতি পান নি।
অর্জুন প্রথমে কৃপাচার্যের কাছে, পরে দ্রৌণাচার্যের কাছে অন্যান্য পাণ্ডব ও ধৃতরাষ্ট্রের সন্তানদের সাথে অস্ত্রবিদ্যা ও যুদ্ধনীতি শিক্ষা করেন। ইনি দ্রৌণাচার্যের সকল শিষ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কথিত আছে দ্রৌণাচার্য তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা এবং অর্জুনকে বিশেষ যত্নের সাথে অস্ত্রশিক্ষা দান করছিলেন। ধনুর্বিদ্যায় সমকালীন সকল বীরদের মধ্যে ইনি শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কৌরবসভায় অস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শনকালে দ্রৌণাচার্য সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে ব্রহ্মশির নামক অমোঘ অস্ত্র দান করেন। গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণকে পরাজিত করে- তাঁর কাছ থেকে তিনি চাক্ষুষী বিদ্যা (যার প্রভাবে যে কোন অদৃশ্য বস্তুকে দেখা সম্ভব হতো) লাভ করেন।
দ্রুপদ-কন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরসভায় অন্যান্য পাণ্ডবদের সাথে ছদ্মবেশে ইনি উপস্থিত হন। এই সভায় একমাত্র তিনিই চক্রমধ্য-মৎস্যকে বিদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে সূত্রে ইনি দ্রৌপদীকে লাভ করেন। কিন্তু মাতৃ-আজ্ঞায় পঞ্চপাণ্ডব একত্রে তাঁকে বিবাহ করেন। দ্রৌপদীকে নিয়ে যাতে ভ্রাতৃবিরোধ না ঘটে, সে কারণে- নারদ নিয়ম করে দেন যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, দ্রৌপদী একজন মাত্র পাণ্ডবের স্ত্রী হিসাবে থাকবেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অধীকারপ্রাপ্ত পাণ্ডব ব্যতীত অন্য কোন পাণ্ডব দ্রৌপদীকে গ্রহণ করলে বা দ্রৌপদীর সাথে অধিকারপ্রাপ্ত পাণ্ডবের বিহারকালে অন্য পাণ্ডব দর্শন করলে- তাঁকে ১২ বৎসর বনবাসী থাকতে হবে। ঘটনাক্রমে একবার এক ব্রাহ্মণকে সাহায্য করার জন্য- অর্জুন অস্ত্রাগারে প্রবেশ করলে- সেখানে যুধিষ্ঠিরের সাথে দ্রৌপদীকে এক শয্যায় দেখতে পান। এই কারণে ইনি ১২ বৎসর বনবাসের জন্য গৃহত্যাগ করেন। বনবাসকালে ইনি বিভিন্নস্থানে ভ্রমণ করে বেড়ান। এই সময়ে ইনি পরশুরামের সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তাঁর কাছ থেকে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করেন। এই ভ্রমণকালে ইনি নাগকন্যা উলূপী ও মণিপুর-রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদাকে বিবাহ করেন। তাঁর ঔরসে উলূপীর গর্ভে ইরাবান এবং চিত্রাঙ্গদার গর্ভে বভ্রুবাহনের জন্ম হয়।
এরপর অক্ষক্রীড়ায় যুধিষ্ঠির রাজ্যচ্যুত হলে, অন্যান্য ভাইদের সাথে ইনি ১৩ বৎসরের জন্য বনবাসে যান। এই সময়ে কিরাতবেশী মহাদেব-এর সাথে তাঁর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে অর্জুনকে পাশুপাত অস্ত্র প্রদান করেন। এরপর ইন্দ্র, বরুণ, কুবের ও যমের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তাঁদের শ্রেষ্ঠ অস্ত্রসমূহ লাভ করেন। এরপর তাঁর পিতা ইন্দ্র তাঁকে স্বর্গে নিয়ে যান। সেখানে ইনি গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছে নৃত্যগীতি শিক্ষা করেন। স্বর্গবাসকালে উর্বশী তাঁকে প্রেম নিবেদন করলে- ইনি তাঁকে মাতৃজ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করেন। এই কারণে, উর্বশী তাঁকে এক বৎসর নপুংসক অবস্থায় অতিবাহিত হওয়ার অভিশাপ দেন। এরপর ইনি ইন্দ্রের কাছে অস্ত্রশিক্ষা সমাপ্ত করেন। শিক্ষা শেষে ইনি গুরুদক্ষিণা বাবদ- ইন্দ্রের শত্রু নিবাতকবচ নামক তিন কোটি দানবকে তাদের সমুদ্র মধ্যস্থ দুর্গসহ ধ্বংস করেন এবং পৌলম ও কালকেয় অসুরদের বিনাশ করেন। এই কারণে ইন্দ্র সন্তুষ্ট হয়ে- তাঁকে অভেদ্য দিব্যকবচ, হিরণ্ময়ী মালা, দেবদত্ত শঙ্খ, দিব্যকিরীট, দিব্যবস্ত্র ও ভরণ উপহার দেন। পাঁচ বৎসর ইন্দ্রলোকে থাকার পর ইনি বনে এসে ভাইদের সাথে যোগ দেন।
এরপর দ্বৈতবনে থাকাকালে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন দুর্যোধনকে বন্দী করেন। এই কারণে চিত্রসেনের সাথে অর্জুনের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে অর্জুন চিত্রসেনকে পরাজিত করে দুর্যোধনকে উদ্ধার করেন।
সিন্ধুরাজ দ্রৌপদীকে হরণ করলে, অর্জুন ও ভীম মিলে তাঁকে শাস্তি দেন। এরপর এঁরা মৎস্যরাজ বিরাট-ভবনে উপস্থিত হন। সেখানে উর্বশীর শাপে অর্জুন নপংশুক হয়ে বৃহন্নলা নাম ধারণ করেন। এই বেশে বিরাট-কন্যা উত্তরাকে ইনি নৃত্যগীত শেখানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে এক বৎসর অতিবাহিত করেন। পাণ্ডবদের এই অজ্ঞাতবাসের শেষাংশে দুর্যোধন বিরাটরাজের গোধন হরণ করলে বৃহন্নলারূপী অর্জুন কৌরব-সৈন্যদের পরাস্ত করে গোধন উদ্ধার করেন। যুদ্ধ শেষে বিরাটরাজ অর্জুনের সাথে উত্তরার বিবাহ ঠিক করেন। কিন্তু শিষ্যা কন্যার মত বলে ইনি নিজ পুত্র অভিমন্যুর সাথে উত্তরার বিবাহ দেন।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি কৃষ্ণকে উপদেষ্টা ও তাঁর রথের সারথি হিসাবে লাভ করেন। এরপর অর্জুন স্বজনবধে বিমুখ হলে- কৃষ্ণ তাঁকে উপদেশ দিয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেন। এই উপদেশসমূহের সংকলনই হলো- শ্রীমদ্ভগভদ্গীতা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি অসংখ্য কৌরব-সৈন্যকে হত্যা করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দশম দিনে এঁর শরাঘাতে ভীষ্ম শরশয্যা গ্রহণ করে- ইচ্ছামৃত্য গ্রহণ করেন। এছাড়া যুদ্ধের দ্বাদশ দিনে ভগদত্তকে, চতুর্দশ দিনে অভিমন্যু বধের প্রতিজ্ঞা স্বরূপ জয়দ্রুতকে, পঞ্চদশ দিনে দ্রোণাচার্যকে, ষোড়শ দিনে মগধরাজ দণ্ডধারকে ও সপ্তদশ দিনে কর্ণকে হত্যা করেন।
যুদ্ধজয়ের পর যুধিষ্ঠির অশ্বমেধযজ্ঞের আয়োজন করেন। যজ্ঞের অশ্ব রক্ষার জন্য অর্জুন যাত্রা করে ত্রিগর্ত, প্রাগ্জ্যোতিষপুর ও সিন্ধুদেশ জয় করেন। মণিপুরে নিজপুত্র বভ্রুবাহনের সাথে যুদ্ধে ইনি প্রাণ হারালে– অর্জুনের স্ত্রী নাগকন্যা উলূপী নাগলোক থেকে সঞ্জীবনী এনে তাঁকে জীবিত করে তোলেন। এরপর ইনি অশ্বসহ স্বরাজ্যে ফিরে সেন। এরপর শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু ও যাদবকুলের বিনাশের সংবাদ পেয়ে ইনি দ্বারকায় যান। অর্জুন সেখানকার নারীদের নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে আসার সময়- পথে আভীর দস্যুরা যাদব-নারীদের লুণ্ঠন করে। কৃষ্ণের মৃত্যু ও নিজ দৈবশক্তি হানির ফলে ইনি দস্যুদের বাধা দিতে পারেন নাই।
পাণ্ডবরা অর্জুনের পৌত্র (অভিমন্যুর পুত্র) পরীক্ষিত্কে রাজা করে মহাপ্রস্থানে গমন করেন। পথে লোহিত সাগরের তীরে অগ্নিদেবের অনুরোধে অর্জুন গাণ্ডীবধনু ও অক্ষয় তূণ দুটি পরিত্যাগ করেন। হিমালয় পার হয়ে মহাস্থানের পথে যেতে যেতে- দ্রৌপদী, সহদেব, নকুলের পতনের পর অর্জুনের মৃত্যু হয়। ভীমের প্রশ্নে উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেন, –অর্জুন একদিনে শত্রু-সৈন্য বিনষ্ট করবার প্রতিজ্ঞা করে তা রক্ষা করতে অসমর্থ হয়েছিলেন এবং অন্যান্য ধনুর্ধরদের অবজ্ঞা করতেন বলেই এঁর পতন হয়েছে।
চতুর্থ পাণ্ডব নকুল
শৈশবে ইনি অন্যান্য কুরুসন্তানদের সাথে দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষা করেন। ইনি অসি যুদ্ধে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। অর্জুন কর্তৃক অর্জিত দ্রৌপদীর ইনি চতুর্থ স্বামী। দ্রৌপদীর গর্ভে এঁর শতানিক নামক পুত্র জন্মেছিল। এছাড়া ইনি চেদিরাজকন্যা করেণুমতীকেও বিবাহ করেছিলেন। এঁর গর্ভে নিরমিত্র নামক এক পুত্র জন্মেছিল। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞকালে ইনি পশ্চিমদিকে যাত্রা করে দশার্ণ, মালব, ত্রিগর্ত ও পঞ্চনদ প্রভৃতি দেশ জয় করেছিলেন।
দ্যূতক্রীড়ায় যুধিষ্ঠির পরাজিত হলে অপর পাণ্ডবদের সাথে ইনিও বনবাসে যান। ঘোষযাত্রাকালে গন্ধর্বদের হাতে দুর্যোধন বন্দী হলে- ভীম, অর্জুন ও সহদেবের সাথে ইনিও যুদ্ধ করেন। হরিণরূপী-ধর্ম এক ব্রাহ্মণের অরণি-মন্থ হরণ করলে- তা উদ্ধারের জন্য অপর পাণ্ডবের সাথে ইনিও যান। এক্ষেত্রে পাণ্ডবেরা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে- ইনি নিকটস্থ সরোবরে জল আনতে গেলে- ধর্ম আকাশ থেকে তাঁকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন। এই প্রশ্নে উত্তর না দিয়ে ইনি জল আনতে গেলে- ইনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। উল্লেখ্য জল আনতে গিয়ে ভীম, অর্জুন ও সহদেবেরও একই পরিণতি হলে- যুধিষ্ঠির ধর্মের সকল প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিয়ে ধর্মকে সন্তুষ্ট করেন। পরে ধর্ম সকল মৃত ভাইয়ের মধ্য থেকে একজনকে মাত্র প্রাণ দেবেন এরূপ শর্ত দিলে- যুধিষ্ঠির বৈমাত্রেয় ভাই বলে নকুলের জীবন চেয়ে ছিলেন।
মত্স্যরাজ বিরাটের প্রাসাদে অজ্ঞাতবাসকালে ইনি যুধিষ্ঠিরের অশ্বরক্ষক ও অশ্বচিকিত্সক পরিচয় দেন এবং 'গ্রন্থিক' নামে বিরাটের অশ্বের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত হন। দ্যূত সভায় দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণকালে ইনি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি বহু কৌরব-সৈন্য বিনাশ করেন। যুদ্ধের ষোড়শ দিনে ইনি কর্ণের কাছে পরাজিত ও লাঞ্ছিত হন। কুন্তির কাছে কৃত প্রতিজ্ঞা অনুসারে কর্ণ (সূর্যের ঔরসজাত কুন্তির প্রথম পুত্র) নকুলকে প্রাণভিক্ষা দেন। অশ্বত্থামা কর্তৃক দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র নিহত হলে ইনি উপপ্লব্য থেকে দ্রৌপদীকে নিয়ে আসেন। অশ্বত্থামার মণি হরণকালে নকুল ভীমের সারথি হয়েছিলেন। যুদ্ধশেষে মহাপ্রস্থানের পথে যাবার সময় দ্রৌপদী ও সহদেবের পর সুমেরু শিখরে এঁর পতন ঘটেছিল। ইনি নিজেকে সর্বাপেক্ষা রূপবান হিসাবে মনে করতেন। এই গর্বের কারণে ইনি সশরীরে স্বর্গে যেতে পারেননি।
মহাভারতে পঞ্চম পাণ্ডব সহদেবঃ
কর্ণ
ইনি অন্যান্য দেশের রাজপুত্রদের সাথে দ্রোণাচার্যের অস্ত্রশিক্ষা করেন। অস্ত্রশিক্ষা শেষে ইনি অর্জুনের সকল অস্ত্রকৌশল দেখান এবং অর্জুনকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আহ্বান করেন। কর্ণের পরিচয় অজ্ঞাত থাকায় অর্জুন এই আহ্বানে সাড়া দেন নাই। কর্ণের এরূপ বীরত্বের পরিচয় পেয়ে দুর্যোধন তাঁর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে অঙ্গরাজ্যের রাজপদে অভিষিক্ত করেন। এরপর দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় ইনি লক্ষ্যভেদের চেষ্টা করলে— দ্রৌপদী ঘোষণা দেন যে, সূতপুত্রের গলায় মালা দেবেন না। সে কারণে ইনি এই প্রতিযোগিতা থেকে বিরত থাকেন। অর্জুন লক্ষ্যভেদে দ্রৌপদী লাভ করলে— অন্যান্য রাজন্যবর্গের সাথে ইনি পাণ্ডবদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং অর্জুনের কাছে পরাস্ত হন। ইনি দ্রোণাচার্যের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র বিদ্যা শিখতে চাইলে, সূতপুত্র বলে দ্রোণাচার্য তাঁকে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।
এরপর ইনি পরশুরামের কাছে গিয়ে ব্রাহ্মণ পরিচয়ে এই বিদ্যালাভ করেন। একদিন পরশুরাম এঁর কোলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলেন। এমন সময় অলর্ক নামক একটি কীট কর্ণের উরু বিদীর্ণ করে। গুরুর ঘুম ভেঙে যাবার ভয়ে ইনি যন্ত্রণা সহ্য করতে থাকলেন। একসময় পরশুরাম ঘুম ভেঙে উঠে সকল বিষয় দেখে এবং কর্ণের কষ্ট সহিষ্ণুতা লক্ষ্য করে তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানতে চাইলেন। অবশেষে কর্ণ ব্রাহ্মণ নয় জেনে এবং গুরুকে প্রতারণা করার জন্য অভিশাপ দিয়ে বললেন যে, কপট উপায়ে ব্রহ্মাস্ত্র লাভের জন্য, কার্যকালে কর্ণ এই অস্ত্রের কথা ভুলে যাবেন। আর একবার ইনি এক ব্রাহ্মণের হোম ধেনু হত্যা করার জন্য, উক্ত ব্রাহ্মণ তাঁকে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে,— যুদ্ধকালে এঁর মহাভয় উপস্থিত হবে, পৃথিবী তাঁর রথের চাকা গ্রাস করবে এবং কোন এক বিশেষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করতে সচেষ্ট হলে তাঁর হাতেই কর্ণের মৃত্যু হবে।
পরশুরামের কাছে অস্ত্রশিক্ষা সমাপ্ত করে ইনি কলিঙ্গরাজের কন্যার স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত হন। সেখানে কলিঙ্গরাজ জরাসন্ধের সাথে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে জরাসন্ধ সন্তুষ্ট হয়ে কর্ণকে মালিনীনগর দান করেন। কর্ণ দুর্যোধনের পরামর্শদাতাদের অন্যতম ছিলেন। পাণ্ডবদের জতুগৃহ দাহে ইনি পরামর্শ দিয়েছিলেন। পাণ্ডবদের বনবাসকালীন সময়ে দ্বৈতবনে অবস্থানের সময় শকুনি ও কর্ণের পরামর্শে দুর্যোধন পাণ্ডবদের দুর্দশা দেখতে যান। সেখানে গন্ধর্বরাজের কাছে দুর্যোধন পরাজিত ও বন্দী হলে কর্ণ তাদের উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন। অবশেষে অর্জুন তাদের রক্ষা করেছিলেন। দুর্যোধনের বৈষ্ণবযজ্ঞকালে ইনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, অর্জুনকে হত্যা না করা পর্যন্ত পাদ-প্রক্ষালন বা জল গ্রহণ করবেন না। আসুরব্রত অবলম্বন করে ইনি আবার প্রতিজ্ঞা করেন যে অর্জুন নিহত না হওয়া পর্যন্ত, এঁর কাছে কেউ কোন কিছু প্রার্থনা করলে তাকে তিনি বিমুখ করবেন না।
কর্ণের দানশীলতা পরীক্ষা করার জন্য কৃষ্ণ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে এসে আহার করার জন্য তাঁর ছেলে বৃষকেতুর মাংস চান। কর্ণ তাঁর পুত্রকে হত্যা করে কৃষ্ণকে আহার করতে দেন। কৃষ্ণ কর্ণের এই ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে এই সন্তানের জীবন দান করেন। এই ব্রত পালনের সময় অর্জুনের পিতা ইন্দ্র ব্রাহ্মণবেশ ধারণ করিয়া অর্জুনের জন্য তাঁর কুণ্ডলদ্বয় ও কবচ প্রার্থনা করেন। কর্ণের পিতা সূর্য এ বিষয়ে কর্ণকে পূর্বেই সতর্ক করে দিলেও সত্য রক্ষার্থে কর্ণ তা ইন্দ্রকে দান করেন। তবে সূর্যের পরামর্শে অর্জুনকে হত্যা করার জন্য ইন্দ্রের কাছ থেকে একাগ্নি বাণ প্রার্থনা করেন। ইন্দ্র এই অস্ত্র একবার মাত্র ব্যবহারের সূযোগ দেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চতুর্দশ দিবসে কর্ণ ঘটোৎকচ বধে এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলেন।
কর্ণের মাতাপিতা (কুন্তী ও সূর্য) কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু কর্ণ তা অগ্রাহ্য করেছিলেন। তবে প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন অর্জুন ছাড়া অন্য কোন পাণ্ডবকে তিনি হত্যা করবেন না। যুদ্ধের প্রারম্ভে ভীষ্ম কবচ-কুণ্ডল হীন কর্ণকে নীচ ও গর্বিত বলেছিলেন এবং পশুরাম কর্তৃক অভিশপ্ত বলে ভীষ্ম তাঁকে অবজ্ঞা করেছিলেন। সেই কারণে ইনি প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন যে ভীষ্ম জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় অস্ত্র ধারণ করবেন না। ভীষ্ম শরশয্যায় অবস্থানকালে কর্ণকে তাঁর জন্মবৃত্তান্ত অবগত করিয়ে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে নিষেধ করলে- কর্ণ দুর্যোধনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে বলে তা অগ্রাহ্য করেন।
মহাভারতের ট্রাজিক নায়ক কর্ণের পূর্বজন্মঃ
মহাভারতের “ দ্রৌপদী “
গান্ধারী
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে, এই নামে দুটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র পাওয়া যায়। যেমন–
১. ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের গান্ধার রাজ্যের রাজা সুবলের কন্যা। এঁর প্রকৃত নাম জানা যায় না। ইনি পিতার নামে- সুবলকন্যা এবং তাঁর জন্মস্থান গান্ধারের নামানুসারে ইনি গান্ধারী নামে পরিচিত ছিলেন। মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষায় তাঁর মন পরিপূর্ণ ছিল। ইনি কুমারী অবস্থায় মহাদেবের কাছে শতপুত্র লাভের বর চেয়েছিলেন।
ভীষ্ম এঁর সাথে ধৃতরাষ্ট্রের বিবাহের জন্য গান্ধাররাজের কাছে প্রস্তাব পাঠালে, গান্ধাররাজ তাঁর পুত্র শকুনি'র সাথে সালঙ্কৃতা অবস্থায় গান্ধারীকে হস্তিনাপুরীতে পাঠান। এবং এখানেই তাঁর সাথে ধৃতরাষ্ট্রের বিবাহ হয়। স্বামীর অন্ধত্বের কারণে গান্ধারী চোখে সব সময় এক খণ্ড কাপড় বেঁধে রাখতেন। বেদব্যাস একদিন ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে হস্তিনাপুরীতে এলে, গান্ধারী যথোচিত সেবা যত্ন করে ঋষিকে তুষ্ট করেন। পরিতুষ্ট বেদব্যাস তাঁকে বর দিতে ইচ্ছা করলে, ইনি তাঁর কাছে শতপুত্র লাভের বর প্রার্থনা করে তা লাভ করেন।
গর্ভবতী হওয়ার পর দুই বৎসরেও তাঁর সন্তান প্রসব না হওয়ায় এবং পাণ্ডুর প্রথম পুত্র যুধিষ্ঠিরের জন্ম হওয়ায়, ইনি ঈর্ষায় নিজের উদরে আঘাত করতে থাকেন। ফলে ইনি একটি লৌহকঠিন মাংশপিণ্ড প্রসব করেন। ইনি ক্ষোভে দুঃখে এই মাংসপিণ্ড ফেলে দিতে উদ্যোগী হলে, ব্যাসদেব সেখানে উপস্থিত হয়ে তাঁকে এই কর্ম থেকে নিবৃত করেন। পরে ব্যাসবেদের পরামর্শে ইনি, একশতটি ঘৃতপূর্ণ কুণ্ড স্থাপন করে, শীতল জলে এই মাংস খণ্ডটি ধৌত করেন। ফলে এই মাংস খণ্ডটি একশত এক ভাগে বিভক্ত হয়। পরে আরো একটি ঘৃতকুণ্ড স্থাপন করে এই ১০১টি খণ্ড রেখে দিলেন। এক বত্সর পর এই মাংস পিণ্ড হতে প্রথমে দুর্যোধন ও এক বত্সর এক মাসের মধ্যে অন্যান্য ১০০টি পুত্র ও একটি কন্যার জন্ম হয়।
ইনি অত্যন্ত ধর্মশীলা ছিলেন। প্রকাশ্য সভার মধ্যে দুর্যোধন দ্রৌপদীকে অপমান করলে দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করার জন্য ইনি ধৃতরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেন। অন্যায় আচরণের জন্য ইনি দুর্যোধন ও দুঃশাসনকে কখনও ক্ষমা করেন নি। ইনি পণ-মুক্ত পাণ্ডবদের অর্ধরাজ্য দান করে সন্ধিস্থাপনের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আগে দুর্যোধন এঁর কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে গেলে- ইনি বলেন যে- যেখানে ধর্ম সেখানেই জয়। যুদ্ধের শেষে মাতৃস্নেহে আকুল হয়ে তাঁর পুত্রদের জন্য ক্রন্দন করেছেন এবং পাণ্ডবদের অভিশাপ দিতে অগ্রসর হয়েছেন। পরে ব্যাসদেবের অনুরোধে ইনি তাঁর ক্রোধ দমন করেন। গান্ধারী সক্রোধে যুধিষ্ঠিরের কাছে এলে, যুধিষ্ঠির তাঁর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেন। এই সময় যুধিষ্ঠিরের শরীর কাপড়ে ঢাকা ছিল। গান্ধারী ক্রোধের সাথে যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকালে ইনি শুধু যুধিষ্ঠিরের পায়ের আঙুলের নখ দেখতে পান। গান্ধারীর তীব্র দৃষ্টিতে যুধিষ্ঠিরের পায়ের নখ বিকৃত হয়ে যায়। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কৃষ্ণ যুদ্ধ থামানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করে নি বলে ইনি কৃষ্ণকে অভিশাপ দেন। এই অভিশাপের ফলে বনের মধ্যে কৃষ্ণ নিকৃষ্টভাবে নিহত হন।
পাণ্ডবদের রাজ্যলাভের পর পনের বত্সর ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী পাণ্ডবদের আশ্রয়ে ছিলেন। এরপর এঁরা বাণপ্রস্থ অবলম্বন করে গঙ্গাতীরে রাজর্ষি শতযূপের আশ্রমে যান। এখানে আশ্রম নির্মাণ করে অন্যান্য সকলের সাথে বসবাস করতে থাকেন। বনবাসকালে ইনি শুধুমাত্র জলপান করে তপস্যা করতেন। বাণপ্রস্থের তৃতীয় বত্সরে ইনি সবার সাথে অরণ্যে প্রবেশ করেন। উক্ত বনে দাবানলের সৃষ্টি হলে ধৃতরাষ্ট্র, কুন্তী সহ ইনি মৃত্যুবরণ করেন।
২. ইনি ছিলেন ভরতবংশীয় অজমীঢ়ের স্ত্রী।
শ্লোক: 2:
সঞ্জয় উবাচ
দৃষ্ট্বা তু পাণ্ডবানীকং ব্যূঢ়ং দুর্যোধনস্তদা।
আচার্যমুপসঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীৎ॥২॥
অনুবাদ : সঞ্জয় বললেন- হে রাজন্ ! পাণ্ডবদের সৈন্যসজ্জা দর্শন করে রাজা দুর্যোধন দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে বললেন-
আমরা এই শ্লোকে সঞ্জয়কে পেলাম যার সম্পর্কে আমরা পূর্বে জেনেছি। এখন আমরা পেলাম নতুন চরিত্র দ্রোনাচার্য । আসুন তার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি ।
দ্রোণাচার্য
দ্রোণঃ এছাড়াও দ্রোণাচার্য নামে পরিচিত, হলেন মহাকাব্য মহাভারতে বর্ণিত অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।
মহাকাব্যে বর্ণিত হয়েছে, তিনি হলেন কৌরব এবং পাণ্ডবদের রাজ অস্ত্রগুরু। তিনি হস্তিনাপুরের রাজার মুখ্য উপদেষ্টা এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাযোদ্ধাও বটে। আরো উল্লেখিত হয়েছে, তিনি অসুরদের গুরু শুক্রাচার্যের এবং মহাবলীর বন্ধু। তিনি ঋষি ভরদ্বাজের পুত্র এবং ঋষি অগ্নিরসের বংশজ। এই অস্ত্রগুরু মহাভারতের যুগের আধুনিক সামরিক কলাকৌশল, ব্যুহ রচনা, দিব্যাস্ত্র প্রভৃতিতে খুবই দক্ষ ছিলেন। তিনি ভয়ংকর দিব্যাস্ত্র ব্রহ্মাস্ত্রের ব্যবহারও জানতেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তিনি একাদশ দিন থেকে পঞ্চদশ দিন পর্যন্ত কৌরব সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধ করেন। আচার্যবর যুদ্ধের ১১শ দিনে, ১২শ দিনে, ১৪শ দিনে ও ১৪শ রাত্রিতে মোট ৪ বার মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে বন্দি করতে চেয়েছিলেন এবং প্রতিবারই ব্যর্থ হন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পঞ্চদশ দিনে, তিনি যখন যুদ্ধক্ষেত্রে সমাধিমগ্ন ছিলেন তখন পাণ্ডব সেনাপতি ধৃষ্টদ্যুম্ন, তাঁকে বধ করেন। [১] বলা হয়ে থাকে, দ্রোণ হলেন দেবগুরু বৃহস্পতির অবতার। তিনি একাধারে পাণ্ডবদের, কৌরবদের, ধৃষ্টদ্যুম্ন, জয়দ্রথ এবং নিজপুত্র অশ্বত্থামার গুরু।
বিবরণ
ঋষি ভরদ্বাজ একদিন হতির্ধান নামক স্থানে গঙ্গা স্নানে গেছেন। আর এমনি যোগাযোগ রূপযৌবন সম্পন্না
মদদৃপ্তা আপ্সরা ঘৃতাচি সেই সময় সেই খানে স্নান করছিল। ক্ষরস্রোতে তার অঙ্গবস্ত্র
ভেসে গেল। জলে দাঁড়িয়ে নগ্ন সুন্দরী। মুনি সেই দৃশ্য দেখে নিজেকে সামলাতে পারলেন
না। বীর্য স্ফলিত হল। তিনি জানতেন তাঁর তার বীর্যের অমোঘত্ব। তিনি সেই শক্তিকে একটি
কলসে রক্ষা করলেন। পরে দেখা গেল সেই কলসের মধ্যে একটি পুত্র সন্তান জন্মেছে। যার গর্ভধারিনী
একটি কলস। দ্রোন শব্দের একটি অর্থ হল কলস। পষৎ রাজার পুত্রের নাম দ্রুপদ। দ্রোন আর
দ্রুপদ সমবয়সী। দুই বালক ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে লেখা পড়া, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা
শিখতে লাগলেন। রাজা পৃষৎ ভরদ্বাজের বন্ধু। দ্রোন আর দ্রুপদের মধ্যে ও সুন্দর বন্ধুত্ব
গড়ে উঠল। কিন্তু রাজন অসম বন্ধুত্ব স্থায়ী হয় না। আর দুনিয়ায় বন্ধুত্ব একটা শব্দ
মাত্র। প্রভুত্বই সার কথা। এই জগতে সম্পর্ক একটাই তুমি প্রভু আমি ভৃত্য, অথবা আমি প্রভু
তুমি ভৃত্য। রাজা পৃষতের মৃত্যু হয় দ্রুপদ উত্তর পাঞ্চালের রাজা হলেন। আর ভরদ্বাজ
স্বর্গে গলেন। বিদ্বান তাপস দ্রোন হলেন আশ্রমিক। একজন সিংহাসনে, আর একজন কুশাসনে।দ্রোনের
জীবন পথ আর তার বাল্য বন্ধুর জীবন পথ ভিন্ন। সময় চলছে দিন, মাস, বছর, বছরের পর বছর।দ্রোন
শরদ্বানের কন্যা কৃপীকে বিবাহ করলেন। এই বার তিনি সংসারি হলেন। দ্রোন মহেন্দ্রপর্বতে
পরশুরামের কাছে গেলেন। তাকে সন্তুষ্ট করে বললেন, "হে ভার্গব, আপনি সমস্ত অস্ত্র
ও শস্ত্র প্রয়োগ এবং সংহার বিদ্যা আমাকে দান করুন।" পরশুরাম বললেন, তথাস্তু।
দ্রোন হলেন অদ্বিতীয় আচার্য। এই আনন্দ সংবাদ কাকে জানাবেন? প্রিয় সখা দ্রুপদকে। দ্রুপদ
রাজা হয়েছেন, সখা হিসেবে তাকে তো অভিনন্দন জানান উচিত। দ্রুপদের সভায় গিয়ে দ্রোন
বললেন, বন্ধু চিনতে পারছ? আমি তোমার বাল্য সখা দ্রোন। এ কি কোন কটু কথা। দ্রুপদের কি
হল কে জানে। চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে গেল। ভুরু কুঁচকে কর্কশ কন্ঠে বললেন, কে তুমি?
তোমার বুদ্ধি সুদ্ধি, কাণ্ড জ্ঞান আছে বলে মনে হয় না৷ কারণ তুমি প্রথমেই আমাকে সখা
বলে পরিচয় দিয়েছ। নির্বোধ। আমি রাজা, তোমার মতো শ্রহীন দরিদ্রের আমি সখা হতে যাব
কোন দুঃখে। তোমার সঙ্গে বাল্যকালে যে সখ্য ছিল, উহা কেবল খেলার ও পড়ার স্বার্থের জন্য।
শোন ব্রাহ্মণ, দরিদ্র কখনো ধনীর, মূর্খ কখনো পন্ডিতের, ক্লীব কখনো বীরের সখা হতে পারে
না। মানুষের অহংকারই শত্রু তার বীজ, এই বীজ থেকে মাথা তুলবে একটি ধ্বংস বৃক্ষ, ভূমি
হবে করুক্ষেত্র। ভেতরে জ্বলছে আগুন। বুকে বাজছে দামামা প্রতিশোধ। কীভাবে নেবেন এই ব্রাহ্মণ।
কৃপাচার্যের গৃহে আশ্রিত। উপার্জন শূন্য। ব্রাহ্মণের চিরাচরিত বৃত্তি অবলম্বনে দারিদ্র্য
ঘুচবে না, সেই কারণেই অস্ত্রবিদ্যা আয়ত্ত করে ক্ষত্রিয় হতে চাই লেন। ভীষ্ম সসম্মানে
তাকে রাজপ্রাসাদে বরন করে নিলেন। রাজ পুত্রদের অস্ত্রবিদ্যা যুদ্ধবিদ্যা দান করবেন।
অভাব কিছু রইল না। কিন্তু অন্তরের জ্বালা! স্ত্রীর সামনে বন্ধু দ্রুপদের কাটা কাটা
কথা দুহাত বিস্তারিত করে বাল্য বন্ধুকে আলিঙ্গন করতে গিয়ে ছিলেন, কিন্তু হয় নি। আচার্য
দ্রোন তার ছাত্র রাজপুত্রদের বললেন, হে নিষ্পাপ শিষ্যবৃন্দ, আমার একটি বিশেষ আকাঙ্ক্ষার
কথা আজ তোমাদের জানাই। তোমাদের অস্ত্রশিক্ষা সম্পূর্ণ হলে আমার সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ
করতে হবে। তোমাদের মধ্যে কে কে সমর্থ উঠে দাড়াও। এই ভাবে সমস্ত শিষ্যদের ডেকে বললেন
আমার শিক্ষা শেষ। এই বার গুরুদক্ষিণা। কী দেবে আমাকে? আমি বলছি তোমরা পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ
কে যুদ্ধে পরাজিত করে বন্দি করে আমার কাছে নিয়ে এসো। এই আমাকে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ দক্ষিণা।
অনেক দিন ধরে আমার অন্তরে একটা আগুন জ্বলছে। তখন কুমারগণ সকলেই রথে চড়িয়া দ্রোনের
সহিত দ্রুত গতিতে রাজ্যের দিকে ধাবিত হইলেন। দ্রোণাচার্য শিষ্যদের নিয়ে যুদ্ধে চলছেন।বাহিনীতে
রয়েছেন দূর্যোধন, কর্ণ, যুযুৎসু, দুঃশাসন, বিকর্ণ, জলসন্ধ, পঞ্চপান্ডব। দ্রুপদ আর
তার মন্ত্রীদের বন্দী করে দ্রোণাচার্যের কাছে আনা হল। অস্ত্রধারী দ্রোণাচার্য এই ক্ষণ
টির অপেক্ষায় ছিলেন। এসো, এসো রাজা এসো! কোথায় তোমার সিংহাসন! রাজমুকুট, রাজছত্র,
অমাত্য বিমাত্য! রাজভূষণের এ কী অবস্থা! নিশ্চয়ই তুমি আমার বন্ধু নও! বন্ধু ভেবে আমাকে
আলিঙ্গনের চেষ্টা করো না। তুমি এখন রাজ্যহারা ভিখারী। রাজার বন্ধু কি ভিখারী হতে পারে?
পাঞ্চালের রাজা এখন আমি ভরদ্বাজ গোত্রীয় ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্য। না না আমি তোমাকে প্রানে
বধ করবো না কারণ আমি যে ব্রাহ্মণ, ক্ষমাই ব্রাহ্মণের ধর্ম। তাছাড়া, তুমি যে আমার বাল্যবন্ধু!
সে কথা আমি ভুলি কেমন করে। তবে আমি তোমাকে একটি কথা বলছি শোনো? এই যে গঙ্গা নদী দেখতে
পারছো না ওই নদীর দক্ষিণ দিকে রাজা তুমি।আর উত্তর দিকে রাজা আমি, এই কথা শুনে দ্রুপদ
রাজি হয়ে গেলেন। মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছেন আমাকে একটি মহাশক্তিশালী পুত্র
চাই তবেই এই দ্রোণাচার্য কে পরাজিত করতে পারবো।
জন্ম
একদা মহর্ষি ভরদ্বাজ গঙ্গায় স্নানের সময় অপ্সরা ঘৃতাচী কে দেখে উত্তেজিত ও কামার্ত হন
এবং তাঁর বীর্যপাত হয়। তিনি সেই বীর্য এক কলসে সংরক্ষণ করেন। সেই কলস থেকে দ্রোণের
জন্ম হয়।
বিয়ে
দ্রোণ শরদ্বানের কন্যা এবং কৃপাচার্য এর ভগিনী কৃপী কে বিয়ে করেন। অশ্বত্থামা নামে তাঁদের
এক পুত্র জন্মায়।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দ্রোণ কৌরব পক্ষে যুদ্ধ করেন। ভীষ্ম এর শরশয্যা গ্রহণের পর তিনি কৌরবপক্ষের সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ৫ দিন কৌরবপক্ষের সেনাপতি ছিলেন।
মৃত্যু
দ্রোণাচার্য যুদ্ধে অপরাজেয় হয়ে উঠলে তাঁকে আটকাতে কৃষ্ণ পাণ্ডবদের বুদ্ধি দেন অশ্বত্থামা এর মিথ্যা মৃত্যুসংবাদ দ্রোণের নিকট প্রচার করতে। বাস্তবে অশ্বত্থামা অমর ছিলেন। দ্রোণ
মহাভারতের কৃপাচার্য
কৃপাচার্য , হিন্দু ধর্মগ্রন্থের এক চরিত্র। মহাকাব্য মহাভারত
অনুসারে, তিনি কুরু রাজ্যের পরিষদ সদস্য এবং পাণ্ডব ও কৌরব রাজকুমারদের কুলগুরু ছিলেন।
যোদ্ধা-ঋষি শরদ্বানের বংশ থেকে জন্মগ্রহণকারী, কৃপ ও তার
বোন কৃপীকে কুরু রাজ্যের রাজা শান্তনু দত্তক নিয়েছিলেন।[২][৩][১] কৃপ তার জন্মদাতা
দ্বারা প্রশিক্ষিত হয়েছিল এবং তার মতো মহান তীরন্দাজ হয়েছিলেন।[৪] পরবর্তীতে মহাকাব্যে,
তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন এবং যুদ্ধে
বেঁচে যাওয়া কৌরবদের কয়েকজনের অন্যতম।[১][৫]
মহাভারতে, কৃপ গৌতম (গৌতমের বংশধর), শারদ্বত (শরদ্বানের পুত্র),
শারদ্বন (শরদ্বানের পুত্র) এবং ভরতাচার্য (ভরতের বংশধরদের শিক্ষক) সহ আরও অনেক নামে
পরিচিত।
কৃপকে চিরঞ্জীবী (অমর ব্যক্তি যা কলিযুগের শেষ পর্যন্ত বেঁচে
থাকবেন) হিসাবে বিবেচনা করা হয়, কিছু গ্রন্থ অনুসারে, তিনি পরবর্তী মন্বন্তরে ( হিন্দু
সৃষ্টিতত্ত্বের চক্রাকার সময়কাল ) সপ্তর্ষিদের একজন হয়ে উঠবেন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী জীবনকাল
কৃপ (উপরে বামে) শিখণ্ডির সাথে যুদ্ধরত।
পাণ্ডব এবং কৌরবদের মধ্যে সংঘটিত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৃপাচার্য,
দুর্যোধনকে সমর্থন করেন এবং কৌরব পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করেন। মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে উল্লিখিত
হয়েছে যে, কৌরবদের সেনাপতি পিতামহ ভীষ্ম, কৃপাচার্যকে মহারথী এবং মহাযোদ্ধা ঘোষণা
করেন।[৪] কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৃপাচার্য পাণ্ডবপক্ষের বহু যোদ্ধার সাথে যুদ্ধ করেন,
যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বৃহক্ষেত্র, চেকিতান, সাত্যকি, সহদেব, অর্জুন, ভীম, ধৃষ্টকেতু
প্রমুখ যোদ্ধা। এছাড়া, তিনি শিখণ্ডীকে পরাজিত করেন এবং অভিমন্যুর দেহরক্ষী সুকেতুকে
ও কলিঙ্গ যুবরাজকে বধ করেন।
শল্য পর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, কৃপাচার্য, কর্ণকে পাণ্ডবদের
সাথে শান্তিস্থাপন করার জন্য উপদেশ দেন, কিন্তু কর্ণ তা মেনে নেন নি। যুদ্ধের ১৮তম
দিনে পাণ্ডবদের হাতে কৌরবপক্ষ পরাজিত হয় এবং গদাযুদ্ধে ভীমের হাতে দুর্যোধন নিহত হন।
ঐদিন রাতে, পাণ্ডবগণ যখন শিবিরে ছিলেন না, তখন কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা মিলে
ঘুমন্ত পাণ্ডবপুত্রদের ও অন্যান্য পাণ্ডবপক্ষের যোদ্ধাদের নৃশংসভাবে হত্যা করেন এবং
পাণ্ডব শিবিরে অগ্নিসংযোগ করেন।
স্ত্রী পর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, কৃপাচার্য শত কৌরবের পিতা-মাতা
ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী এর কাছে ফিরে আসেন এবং যুদ্ধের পরিসমাপ্তির কথা জানান। মহাভারতের
আশ্রমবাসিক পর্বে উক্ত হয়েছে যে, ধৃতরাষ্ট্র বনবাসে যাওয়ার সময় কৃপাচার্যও তাদের
সাথে বনবাসে যেতে চাইলেন। কিন্তু, ধৃতরাষ্ট্র তাকে বনবাসে যেতে নিষেধ করেন। তিনি হস্তিনাপুরের
নতুন রাজা যুধিষ্ঠিরকে অনুরোধ করেন যে, কৃপাচার্যকে যুধিষ্ঠির যেন কুরুরাজ্যে রাখেন।
পাণ্ডবগণ মহাপ্রস্থানে গমন করলে, 'কৃপাচার্য' পাণ্ডবদের উত্তরসূরী ও অর্জুনের পৌত্র
পরীক্ষিতের গুরু হন। বিশ্বাস করা হয় যে, তার দায়িত্ব সম্পন্ন হওয়ার পর কৃপাচার্য
তপস্যার করার জন্য বনে গমন করেন এবং সেখানে তার জীবনের শেষ সময় অতিবাহিত করেন।
শ্লোক:
3:
পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমূম্ ।
ব্যূঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা ॥৩॥
অনুবাদ : হে
আচার্য ! পাণ্ডবদের মহান সৈন্যবল দর্শন করুন, যা আপনার অত্যন্ত বুদ্ধিমান শিষ্য দ্রুপদের
পুত্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যূহের আকারে রচনা করেছেন।
দ্রপদ সম্পর্কে আমরা কিছুটা ধারনা আমরা দ্রৌপদির চরিত্র বিশ্লেষন করেছি । আসুন আমরা দ্রপদ পুত্র সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি । তিনি হলে ধৃষ্টদুম্ন ।
ধৃষ্টদ্যুম্ন
ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রুপদ কর্তৃক আয়োজিত একটি যজ্ঞ (অগ্নি-বলি) থেকে জন্মগ্রহণ করেন , যিনি তার শত্রু
দ্রোণকে হত্যা করতে সক্ষম একটি পুত্র চেয়েছিলেন । পাণ্ডব রাজপুত্র অর্জুন - ব্রাহ্মণের
ছদ্মবেশে - বিবাহে দ্রৌপদীর হাত জিতলে, ধৃষ্টদ্যুম্ন তার পরিচয় বুঝতে পেরেছিলেন ।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে , ধৃষ্টদ্যুম্ন পাণ্ডবদের সাথে যোগ দেন এবং পাণ্ডব বাহিনীর সর্বোচ্চ
সেনাপতি হন। যুদ্ধের পনেরতম দিনে, তিনি দ্রোণের শিরশ্ছেদ করেন, তার জন্মের মিশনটি পূরণ
করেন।
জন্ম
ধৃষ্টদ্যুম্ন, দ্রৌপদীর সাথে, একটি " অয়োনিজা " হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা একটি মহিলার
গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেনি। [ তাঁর জন্ম মহাকাব্যের
আদি পর্বে বর্ণিত হয়েছে । কিংবদন্তি অনুসারে, দ্রুপদ একবার তার বাল্যবন্ধু দ্রোণকে
তার দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে অপমান করেছিলেন এবং এটি তাদের মধ্যে ঘৃণার জন্ম দেয়।
দ্রোণ তখন পাণ্ডব ভাইদের শিক্ষক হন এবং তারা দ্রুপদকে পরাজিত ও বন্দী করেন। যদিও তাদের
অতীত বন্ধুত্বের কারণে দ্রোণ দ্রুপদের জীবন রক্ষা করেছিলেন, তিনি জোর করে পাঁচালের
অর্ধেক নিয়েছিলেন । তার পরাজয়ের দ্বারা অপমানিত, দ্রুপদ প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন,
কিন্তু যেহেতু তার সন্তান বা সহযোগীদের কেউই দ্রোণকে পরাজিত করার মতো শক্তিশালী ছিল
না, তাই তিনি একটি শক্তিশালী পুত্র লাভের জন্য একটি যজ্ঞ (অগ্নি-বলি) করার সিদ্ধান্ত
নেন।
দ্রুপদ ঋষি উপযজ ও যজকে প্রধান পুরোহিত নিযুক্ত করেন এবং যজ্ঞ পরিচালিত হয়। এটি সম্পন্ন হওয়ার
পর, ঋষিরা দ্রুপদ রাণীকে একটি পুত্র সন্তানের জন্য নৈবেদ্য ভক্ষণ করার নির্দেশ দেন।
যাইহোক, রানী তার মুখে জাফরানের সুগন্ধি দিয়েছিলেন এবং তাদের স্নান করে মুখ ধোয়া
পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। অপেক্ষা করতে না পেরে ঋষিরা যজ্ঞবেদিতে নৈবেদ্য ঢেলে
দেন, যার ফলে একটি যৌবনের উদ্ভব হয়। তিনি একটি অগ্নিবর্ণ ছিল, তার মাথায় একটি মুকুট
এবং তার শরীরে বর্ম পরা ছিল এবং তার হাতে একটি তলোয়ার, একটি ধনুক এবং কিছু তীর ছিল।
এরপর তিনি একটি রথে গেলেন এবং তাকে দেখে পাঁচালের লোকেরা আনন্দিত হল। [ তার জন্মের
পরপরই, একটি ঐশ্বরিক কণ্ঠ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল:
দ্রোণ বিনাশের জন্যই এই রাজপুত্রের জন্ম হয়েছে। তিনি পাঞ্চালদের সমস্ত ভয় দূর করে তাদের খ্যাতি
ছড়িয়ে দেবেন। তিনি রাজার দুঃখও দূর করবেন।
এর পরেই অগ্নি থেকে এক সুন্দরী কন্যার আবির্ভাব ঘটে। ঋষিরা যুবকের নাম রাখেন ধৃষ্টদ্যুম্ন, এবং কন্যার
নাম রাখা হয় কৃষ্ণা, যা তার পৃষ্ঠপোষক নাম দ্রৌপদী দ্বারা বেশি পরিচিত ।
কিছুক্ষণ পর দ্রোণ ধৃষ্টদ্যুম্নের কথা শুনে তাঁকে তাঁর রাজ্যে আমন্ত্রণ জানান। যদিও দ্রোণ ধৃষ্টদ্যুম্নের
ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে জানতেন, তবুও তিনি আনন্দের সাথে তাকে ছাত্র হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন
এবং তাকে উন্নত সামরিক কলা শিখিয়েছিলেন। এটি তাকে খুব শক্তিশালী যোদ্ধা করে তুলেছিল,
আকাশের অস্ত্র সম্পর্কে অত্যন্ত জ্ঞানী। ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণের তত্ত্বাবধানে মহারথী
হয়েছিলেন।
দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর
ধৃষ্টদ্যুম্ন তার বোন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর আয়োজন করেছিলেন এবং এর নিয়মগুলি রাজা ও রাজকুমারদের বলেছিলেন।
যখন একজন যুবক ব্রাহ্মণ দ্রৌপদীকে সমস্ত রাজপুত্র এবং অভিজাতদের সামনে জিতেছিলেন, তখন
ধৃষ্টদ্যুম্ন গোপনে ব্রাহ্মণ এবং তার বোনকে অনুসরণ করেছিলেন, শুধুমাত্র আবিষ্কার করতে
যে ব্রাহ্মণ আসলে অর্জুন ছিলেন , পাঁচ পান্ডব ভাইয়ের একজন।
বিয়ে ও সন্তান
ধৃষ্টদ্যুম্নের একাধিক স্ত্রী ছিল। তার চার পুত্র ছিল- ক্ষত্রধর্মন, ক্ষত্রবর্মণ, ক্ষত্রঞ্জয়, এবং ধৃষ্টকেতু। প্রথম তিনজন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দ্রোণের হাতে নিহতহন, যেখানে ধৃষ্টকেতু কর্ণের হাতে নিহত হন ।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ
কৌরবদের বিরুদ্ধে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ধৃষ্টদ্যুম্ন পাণ্ডব বাহিনীর সেনাপতি (সেনাপতি) নিযুক্ত হন । যুদ্ধের
শেষ পর্যন্ত তিনি তার অবস্থান বজায় রেখেছিলেন।
দ্রোণ হত্যা
যুদ্ধের ১৫তম দিনে দ্রোণ দ্রুপদকে হত্যা করেন। পাণ্ডবরা দ্রোণের একমাত্র দুর্বলতা, তার পুত্র
অশ্বত্থামাকে পুঁজি করার জন্য একটি চক্রান্ত করেছিল । পাণ্ডব ভীম অশ্বত্থামা নামে একটি
হাতিকে বধ করেছিলেন। পাণ্ডবরা অশ্বত্থামার মৃত্যুর গুজব ছড়ায়। ভয়ঙ্কর সংবাদ শুনে,
দ্রোণ অবিশ্বাসে জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের কাছে গেলেন, যিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে
অশ্বত্থামাকে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু বিড়বিড় করলেন যে এটি অশ্বত্থামা নামের হাতি
ছিল; তার উত্তরের শেষাংশ পাণ্ডব যোদ্ধাদের শঙ্খ দ্বারা আবৃত ছিল। পুত্রের মৃত্যু হয়েছে
ভেবে দ্রোণ মর্মাহত ও হৃদয়বিদারক হলেন। তিনি অস্ত্র সমর্পণ করে বসেন। দ্রোণ ধ্যান
করতে শুরু করলেন, এবং তার আত্মা অশ্বত্থামার আত্মার সন্ধানে তার দেহ ছেড়ে দিল। ধৃষ্টদ্যুম্ন
পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তার তলোয়ার নিয়ে দ্রোণের শিরচ্ছেদ করে তাকে হত্যা করেন।
মৃত্যু
যুদ্ধের 18 তম রাতে, অশ্বত্থামা রাতে পাণ্ডব শিবির আক্রমণ করেন এবং ধৃষ্টদ্যুম্নকে আহত করেন।
ধৃষ্টদ্যুম্ন একটি সম্মানজনক মৃত্যুর জন্য ভিক্ষা করে, হাতে তলোয়ার নিয়ে মারা যেতে
বলে, অশ্বত্থামা তাকে উপেক্ষা করেন, শিরচ্ছেদ করার পরিবর্তে তাকে পিটিয়ে হত্যা করতে
এগিয়ে যান, কিন্তু তার দেহ অদৃশ্য হয়ে যায়।
শ্লোক:
4:
অত্র শূরা মহেষ্বাসা ভীমার্জুনসমা যুধি ।
যুযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথঃ ॥৪॥
অনুবাদ : সেই সমস্ত সেনাদের মধ্যে অনেকে ভীম ও অর্জুনের মতো বীর ধনুর্ধারী রয়েছেন এবং যুযুধান, বিরাট ও দ্রুপদের মতো মহাযোদ্ধা রয়েছেন।
ভীম ও অর্জুন সম্পর্কে আমরা জেনেছি । এখানে আমরা পেলাম যুযুধান ও বিরাট রাজা ।
বিরাটরাজ
ইনি মৎস্যদেশের রাজা ছিলেন বলে, মৎস্যরাজ নামে পরিচিত ছিলেন। এঁর স্ত্রীর নাম ছিল সুদেষ্ণা, ভাইয়ের নাম ছিল শতানীক এবং শ্যালকের নাম ছিল কীচক। সুদেষ্ণা গর্ভে তিন পুত্র ও এক কন্যা জন্মগ্রহণ করে। পুত্রদের নাম ছিল- শঙ্খ, শ্বেত ও ভূমিঞ্জয় (উত্তর) এবং কন্যার নাম ছিল উত্তরা। ইনি কুবেরের মত ধনী ছিলেন। এঁর সম্পদের ভিতর উল্লেখযোগ্য ছিল তাঁর গবাদি পশু। পাণ্ডবেরা অজ্ঞাতবাসের সময় এঁর রাজদরবারে ছদ্মনামে ও ছদ্মবেশে আশ্রয় নেন। এই সময়ে পাণ্ডবরা যে ছদ্মনামে ও ছদ্মবেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যে সকল ছদ্মবেশে এবং ছদ্মনামে পাণ্ডবরা তাঁর দরবারে ছিলেন,
তা হলো–
যুধিষ্ঠির : ছদ্মনাম কঙ্ক, ছদ্মবেশ- দ্যুতনিপুণ সভাসদ।
ভীম : ছদ্মনাম বল্লভ, ছদ্মবেশ- পাচক।
অর্জুন : ছদ্মনাম বৃহন্নলা, ছদ্মবেশ- বিরাটরাজ কন্যা উত্তরার সঙ্গীতশিক্ষক।
নকুল : ছদ্মনাম তন্তিপাল, ছদ্মবেশ- গোশালার অধ্যক্ষ।
সহদেব : ছদ্মনাম গ্রন্থিক, ছদ্মবেশ- অশ্বশালার অধ্যক্ষ।
দ্রৌপদী : ছদ্মনাম সৌরন্ধ্রী, ছদ্মবেশ- রানী সুদেষ্ণার পরিচারিকা।
কীচক দ্রৌপদীকে কামনা করে ব্যর্থ হয়ে প্রকাশ্যে দ্রৌপদীকে অপমান করেন। এর প্রতিশোধ হিসাবে ভীম তাঁকে হত্যা করেন। একবার বিরাটরাজ তাঁর এই শ্যালক কীচকের সহায়তায় ত্রিগর্তরাজ সুশর্মাকে পরাজিত করে তাঁর রাজ্য অধিকার করেছিলেন। রাজ্যভ্রষ্ট হয়ে সুশর্মা দুর্যোধনের আশ্রয় নেন। কীচকের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে, সুশর্মা দুর্যোধনের সৈন্যের সাহায্যে বিরাটরাজ্যের দক্ষিণাংশ আক্রমণ করেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বিরাট সুশর্মা'র হাতে পরাজিত ও বন্দী হন। এরপর যুধিষ্ঠিরের আদেশে ভীম সুশর্মা'র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। যুদ্ধে ভীম সুশর্মাকে পরাজিত করে বন্দী করে নিয়ে আসেন এবং সেই সাথে বিরাটকে উদ্ধার করেন। এই সময় দুর্যোধন, কর্ণ, ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখের নেতৃত্বে বিরাটরাজ্যের উত্তরাংশ আক্রমণ করে সমস্ত গো-সম্পদ অধিকার করেন। এই আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য বিরাটপুত্র উত্তর, বৃহন্নলারূপী অর্জুনকে রথের সারথি করে যুদ্ধযাত্রা করেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল কৌরববাহিনী দেখে উত্তর পলায়নের চেষ্টা করলে- অর্জুন তাঁকে থামিয়ে উত্তরাকে সারথি বানিয়ে নিজেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। অর্জুন এই যুদ্ধে কৌরববাহিনীকে পরাজিত করে গো-সম্পদ উদ্ধার করেন। যুদ্ধজয়ের সংবাদ শুনে বিরাট তাঁর পুত্রের বিষয়ে অহঙ্কার প্রকাশ করলে- যুধিষ্ঠির বলেন যে, সারথি বৃহন্নলা'র (অর্জুন) জন্যই যুদ্ধজয় হয়েছে। যুধিষ্ঠিরের এই কথা শুনে বিরাট অহঙ্কার করে বলেন যে- নপুংশক ভীষ্ম ও দ্রোণের মত বীরকে পরাজিত করতে পারে না। এই সময় বিরাট তাঁর হাতের পাশ দ্বারা যুধিষ্ঠিরের মুখে আঘাত করে রক্তপাত ঘটান। অর্জুন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে,- বিনাযুদ্ধে যুধিষ্ঠিরের কেউ রক্তপাত ঘটালে- তিনি তাঁকে হত্যা করবেন। এই জন্য যুধিষ্ঠির এই ঘটনা অর্জুনের কাছ থেকে গোপন করেন। পরে উত্তরের কাছে সকল বিষয় অবগত হয়ে বিরাট যুধিষ্ঠিরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অজ্ঞাতবাসকালের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে, পাণ্ডবরা বিরাটের কাছে আত্মপ্রকাশ করেন। বিরাট তাঁর কন্যা উত্তরার সাথে অর্জুনের বিবাহের প্রস্তাব দিলে- নিজ কন্যাস্থানীয়া বিবেচনা করে অর্জুন তাঁর পুত্র অভিমন্যুর সাথে উত্তরার বিবাহ দেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি পাণ্ডবদের পক্ষে যোগ দেন। যুদ্ধের পঞ্চদশ দিনে ইনি দ্রোণাচার্যের হাতে নিহত হন।
সাত্যকি বা যুযুধান (সংস্কৃত: বেশি পরিচিত সাত্যকি নামে )
মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের একজন প্রধান বীর।যদু বংশীয় সত্যকের পুত্র ও শিনির পৌত্র।ওঁর জন্মদত্ত নাম ছিল যুযুধান। সাত্যকি অর্জুনের কাছে অস্ত্রশিক্ষা করেন।ভীষ্ম তাকে অধিরথ (শ্রেষ্ঠ শ্রেণীর যোদ্ধা) হিসেবে গণনা করেছিলেন। সাত্যকি ছিলেন কৃষ্ণের অনুগত। পাণ্ডব পক্ষে তিনি যোগ দেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সাত্যকি ভুরিশ্রবার সঙ্গে দ্বৈরথ যুদ্ধে বিপদগ্রস্থ হন। ভুরিশ্রবা যখন সাত্যকির শিরশ্ছেদ করবার জন্য অসি তুলেছেন,তখন অর্জুন ভুরিশ্রবার বাহু দ্বিখণ্ডিত করেন।
এই অন্যায় আচরণের জন্য ভুরিশ্রবা অর্জুনকে ভর্ৎসনা করে যখন যোগযুক্তহয়ে দেহত্যাগ করছেন, তখন সাত্যকি ভুরিশ্রবার শিরশ্ছেদ করেন। যুদ্ধে শাল্বরাজ সাত্যকির হাতে নিহত হন। ভুরিশ্রবার পিতা সোমদত্তকেও সাত্যকি বধ করেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পঁয়ত্রিশ বছর বাদে যখন যদুবংশীয় বীররা পানমত্ত হয়ে পরস্পরের সঙ্গে
হানাহানি করছেন, তখন সাত্যকির সঙ্গেসকৃতবর্মার বচসা শুরু হয়।
নিদ্রিত পাণ্ডব ও পাঞ্চাল বীরদের হত্যাকাণ্ডে কৃতবর্মা অশ্বত্থামার সহকারী ছিলেন বলে সাত্যকি ওঁকে তিরস্কার করেন। কৃতবর্মা সাত্যকির অন্যায় ভাবে ভুরিশ্রবা-বধের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। বচসা চরমে উঠলে সাত্যকি অসি দিয়ে কৃতবর্মার শিরশ্ছেদ করেন। তাই দেখে ভোজ ও অন্ধকবংশীয়গণ সাত্যকিকে আক্রমণ করাতে কৃষ্ণ ও রুক্মিনীর পুত্র প্রদ্যুম্ন সাত্যকিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। শেষে দুজনেই নিহত হলেন।
শ্লোক:
5:
ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশিরাজশ্চ বীর্যবান্ ।
পুরুজিৎ কুন্তিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ ॥৫
অনুবাদ: সেখানে ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, কাশিরাজ, পুরুজিৎ, কুন্তিভোজ ও শৈব্যের মতো অত্যন্ত বলবান যোদ্ধারাও রয়েছেন।
ধৃষ্টকেতু :
চেদীর রাজা শিশুপালের এক পুত্র, যিনি পাণ্ডবদের সাথে বন্ধুত্ব করেছিলেন এবং কুরুক্ষেত্র
যুদ্ধের জন্য তাদের একটি অক্ষৌহিনী সৈন্যবাহিনী সরবরাহ করেছিলেন। তিনি দ্রোণ কর্তৃক
নিহত হন। যুদ্ধের পর তার বোন নকুলকে বিয়ে করেন। তাকে পৃথিবীতে অবতারিত স্বর্গীয় বিশ্বদেবদের
একজন বলা হয় ।
চেকিতান: মহাভারতের একটি চরিত্র । ইনি একজন যদু-বৃষ্ণিবংশীয় রাজা। ইনি বসুদেবের ভগিনী শ্রুতকীর্তি ও কেকয়রাজ ধৃষ্টকেতুর তৃতীয়পুত্র।তার অন্যান্য ভাইরা হলেন সন্তরদন,বৃদ্ধক্ষত্র, যুদ্ধমুষ্টি o সুমুষ্টিক। তার বোন ভদ্রা শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী।দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় চেকিতান উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি মহাভারত যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই পাণ্ডব সেনাবাহিনীর অন্যতম বীর ছিলেন। ইন্দ্রপ্রস্থে দানবরাজ ময় নির্মিত সভাস্থলে যুধিষ্ঠিরের প্রবেশের সময় যে সব নৃপতিগণ তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁদের মধ্যে চেকিতান একজন। চেকিতান রাজসূয় যজ্ঞ উপলক্ষ্যে যুধিষ্ঠিরকে একটি তূণীর উপহার দেন।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুধিষ্ঠির পাঞ্চাল রাজপুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নকে পাণ্ডবদের সেনাপতি নির্বাচন করেন। এরপর ধৃষ্টদ্যুম্ন পাণ্ডব পক্ষীয় যােদ্ধাদের মধ্যে কে কোন কৌরব যােদ্ধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন স্থির করে দেন। ধৃষ্টদ্যুম্নএ সময় চেকিতানকে সােমদত্তের পুত্র শলের সঙ্গে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন।
যুদ্ধের ১৮তম দিনে, দুর্যোধন তাঁকে বধ করেন।
কাশিরাজ হল মহাভারতে উল্লিখিত একটি নাম এবং মানুষ এবং স্থানের জন্য ব্যবহৃত অনেকগুলি সঠিক নামের মধ্যে একটিকে প্রতিনিধিত্ব করে। কাশীরাজ ছিলেন কাশীর রাজা এবং অম্বা, অম্বিকা এবং অম্বালিকার পিতা , যারা ভীষ্মের সৎ ভাই বিচিত্রবীর্যের সাথে বিবাহিত ছিলেন।
কুন্তী রাজ্য ছিল কুন্তি-ভোজের রাজ্য, ভোজ-যাদবদের মধ্যে অন্যতম প্রধান রাজা ।
কুন্তী , পাণ্ডবদের মা এবং কুরু রাজা পাণ্ডুর প্রথম স্ত্রী , ছিলেন কুন্তীভোজের দত্তক কন্যা। তার দেওয়া নাম ছিল পৃথা এবং তিনি বাসুদেব কৃষ্ণের পিতা বাসুদেবের বোন ছিলেন । কুন্তী রাজ্য অবন্তী রাজ্যের প্রতিবেশী ছিল ।এটি সম্ভবত অবন্তীর উত্তরে ছিল।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ
কুন্তীরা যুদ্ধে অসামান্য পরাক্রমের অধিকারী, প্রচন্ড শক্তি ও প্রবল পরাক্রমের অধিকারী, ভীষ্মের দ্বারা
তাদের সমস্ত আত্মীয় ও উপদেষ্টাদের সাথে যুদ্ধে নিহত হয়েছিল ।
পুরুজিৎ
(পুরুজিত)। - একজন রাজা যিনি ছিলেন কুন্তীভোজের পুত্র এবং পাণ্ডবদের মা কুন্তীর ভাই । কুন্তিভোজ নামে তার এক ভাই ছিল। মহাযুদ্ধে তিনি কৌরব বাহিনীর দুর্মুখের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
শিবি (ওরফে সিবি, শিবি,
সিভি) একটি রাজ্য হিসাবে এবং প্রাচীন
ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতে একজনসরাজার নাম হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে । শিবি নামে একজন রাজা ছিলেন যিনিশিবি নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন বা তাঁর নামে রাজ্যের নামকরণ করা যেতে পারে। শিবি (ওরফে
সিবি, শৈব্য) রাজা তাঁর সত্যবাদিতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তার সত্যবাদিতা এবং সহানুভূতি
সম্পর্কে কিংবদন্তিটি নিম্নরূপ: রাজা শিবি একটি ঘুঘুকে রক্ষা করেছিলেন যাকে একটি বাজপাখি
তাড়া করেছিল (যা ঘুঘুটিকে দুপুরের খাবার হিসাবে খেতে চেয়েছিল), এবং বাজপাখির বিকল্প
খাবার হিসাবে তার উরু থেকে মাংস দিয়েছিল। মহাভারতের যুদ্ধে শৈব্য পাণ্ডবদের পক্ষে
যুদ্ধ করেছিলেন ।
শ্লোকঃ
৬
যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান্।
সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ॥৬॥
অনুবাদ
: সেখানে রয়েছেন অত্যন্ত বলবান যুধামন্যু, প্রবল পরাক্রমশালী উত্তমৌজা, সুভদ্রার পুত্র এবং দ্রৌপদীর পুত্রগণ। এই সব যোদ্ধারা সকলেই এক-একজন মহারথী।
এখানে আমরা পেলাম – যুধামন্য , উত্তমৌজা , সুভদ্রার পুত্র ও দ্রৌপদির পুত্র ।
উত্তমৌজ এবং যুধামন্যু
উত্তমৌজ এবং যুধামন্যু হল হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে বৈশিষ্ট্যযুক্ত পাঞ্চাল রাজ্যের দুই ভাই । মহাকাব্যের কিছু সংস্করণে, তারা পাঞ্চালরাজা দ্রুপদ এর পুত্র এবং এইভাবে দ্রৌপদীর ভাই । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় , তারা অর্জুনের দেহরক্ষী হয়ে দুর্যোধনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল ।
মহাভারতে উত্তমৌজএবং তার ভাই যুধামন্যুর নাম উল্লেখ আছে। তারা অশুমান এবং আর্যমান নামে আদিত্যদের অবতার।
একবার,উত্তমৌজ এবং তার ভাই যুধামন্যু যখন দুর্যোধন বিশজন মহান এবং গুরুত্বপূর্ণ সারথির (
মহারাথীদের ) একটি তালিকা দিচ্ছিলেন যারা পাণ্ডবদের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছিলেন মহাভারত অনুসারে , তারা ছিলেন রাজকীয় ভাই ও রাজকুমার। পাঁচালদের গোষ্ঠী । তৎকালীন দক্ষিণ পাঞ্চালের রাজার নাম ছিল দ্রুপদ । মহাভারতের বিভিন্ন স্থানে তাদের ভূমিকা ও কর্তব্যের উল্লেখ আছে। দুজনেই প্রথমে অর্জুনের দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন । যুধামন্যুকে অর্জুনের রথের বাম চাকার রক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল, এবং উত্তমৌজকে ডান চাকার রক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। পরে তাদের পিছন দিকে রথ রক্ষা করতে বলা হয়।
অর্জুনের সাথে সাক্ষাত করতে যাওয়ার পথে রাজা দুর্যোধন তাদের বাধা দেন এবং ভয়ানক যুদ্ধে লিপ্ত হন।
যুদ্ধ
চক্রব্যূহের সময় (একটি চাকার মতো গঠন), দুই পাঞ্চাল ভাই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে থাকা অর্জুনের
সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন এবং তাকে গুরুতর পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করতে চেয়েছিলেন।
চক্রব্যূহকে ছিদ্র করতে না পারায় তারা কুরু সেনাকে বাইপাস করার চেষ্টা করে। দুর্যোধন
তাদের পর্যবেক্ষণ করে যুদ্ধে নিয়োজিত করেন। ভাইয়েরা দুর্যোধনকে বিশটি তীর এবং তার
ঘোড়া আরও চারটি নিয়ে আক্রমণ করেছিল। দুর্যোধন একটি তীর দিয়ে যুধামন্যুর মান, তার
ধনুক আরেকটি তীর দিয়ে ভেঙে ফেলে এবং অবশেষে যুধামন্যুর সারথিকে একটি কীলকযুক্ত তীর
দিয়ে ভেঙে ফেলে, অত্যাশ্চর্য কিন্তু তাকে হত্যা করেনি। উত্তমৌজ দুর্যোধনের সারথিকে
সোনার অলঙ্কৃত তীর দিয়ে হত্যা করে। প্রতিশোধ হিসেবে দুর্যোধন উত্তমৌজের রথের চারটি
ঘোড়াকে হত্যা করে এবং তার দুই সারথিকেও হত্যা করে। উত্তমৌজস তার এখন অকেজো রথ থেকে
লাফ দিয়ে তার ভাইয়ের রথে উঠল। দুর্যোধন তার গদা (গদা) নিয়ে তাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে
দেখে উভয় ভাই তাদের রথ থেকে লাফিয়ে উঠলেন এবং অর্জুনের সাথে দেখা করতে আরও দুটি রথে
চলে গেলেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় , উত্তমৌজ শত্রু শিবিরের অনেক মহান যোদ্ধা যেমন
দ্রোণ , অশ্বত্থামা , কৃতবর্মা , দুর্যোধন , কর্ণ এবং কৃপের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন ।
তারা পান্ডবদের সাথে ছিল যখন তারা একটি হ্রদে লুকিয়ে থাকা দুর্যোধনের সন্ধানে গিয়েছিল।আঠারো তারিখে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মধ্যরাতে অশ্বত্থামা পাণ্ডব শিবিরে ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে । যুধিষ্ঠির উভয় শিবিরের মৃত যোদ্ধাদের সাথে তাদের দাহ করেন।
কৃতবর্মনের সাথে ভয়ানক সংঘর্ষ: কৃতবর্মণ এবং দুই পাঞ্চাল ভাইয়ের মধ্যে একটি মহান যুদ্ধ সংঘটিত
হয়েছিল যখন তারা অর্জুনের রথকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছিল যাতে তার রথের চাকা রক্ষা
করা যায়। এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল যখন অর্জুন কম্ভোজা বিভাগকে ছিদ্র করার চেষ্টা
করেছিলেন, যা তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সিন্ধু রাজ্যের রাজা জয়দ্রথের দিকে তার
অগ্রগতি। মধ্যাহ্ন সূর্যের মত ক্রোধে জ্বলন্ত অর্জুন কৃতবর্মণকে থামিয়ে কাম্ভোজা বিভাগে
প্রবেশ করলেন। কৃতবর্মণ অর্জুনের অগ্রগতি রোধ করতে সক্ষম হননি। কিন্তু তিনি তার দুই
রক্ষক উত্তমৌজস এবং যুধামন্যুর পথে দাঁড়িয়েছিলেন যারা অর্জুনকে অনুসরণ করার চেষ্টা
করেছিলেন। যদিও কৃতবর্মার প্রতি শ্রদ্ধার বশবর্তী হয়ে অর্জুন বৃদ্ধ লোকটিকে হত্যা
করেননি, তবে দুই ভাইয়ের মধ্যে সেরকম কোনো অনুযোগ ছিল না। কৃতবর্মা দুই ভাইকে শিক্ষা
দিতে চেয়েছিলেন। তিনি দুই পাঞ্চাল রাজকুমারের মুখোমুখি হন যখন তারা অর্জুনের রথ অনুসরণ
করতে অগ্রসর হয়, তার রথের চাকা দুপাশে রক্ষা করতে। কিন্তু ভোজদের শাসক কৃতবর্মা তাদের
উভয়কে তীক্ষ্ণ তীর দিয়ে বিদ্ধ করে যথাক্রমে তিনটি এবং চারটি তীর দিয়ে আঘাত করেন।
বিনিময়ে এই দুই রাজপুত্র তাকে দশটি করে তীর বিদ্ধ করে। আবার প্রত্যেকে তিনটি করে তীর
পাঠাল। উত্তমৌজ তিনটি তীর নিক্ষেপ করে কৃতবর্মার মান ও ধনুক কেটে ফেলে। তখন হৃদিকার
পুত্র কৃতবর্মা আরেকটি ধনুক তুলে নিয়ে ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে এই উভয় যোদ্ধাকে তাদের
ধনুক থেকে বঞ্চিত করে এবং তীর বৃষ্টি দিয়ে ঢেকে দেন। তারপর দুই যোদ্ধা দুটি নতুন ধনুক
তুলে নিয়ে কৃতবর্মনকে বিদ্ধ করতে লাগলেন। কিন্তু এই দুই রাজকুমারকে সফলভাবে কৃতবর্মণ
দ্বারা প্রতিহত করা হয়েছিল এবং তাই তারা অর্জুনের সাথে ধরার জন্য কাম্ভোজা বিভাগে
কোন ভর্তি হতে পারেনি, যদিও পুরুষদের মধ্যে এই দুটি ষাঁড় প্রবলভাবে লড়াই করেছিল।
সুভদ্রা পুত্র অভিমন্যু
অভিমন্যু মহাভারত মহাকাব্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য চরিত্র ও অর্জুন-সুভদ্রার পুত্র, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের
ভাগিনেয় এবং মৎস্য রাজকন্যা উত্তরার স্বামী। শৌর্যে বীর্যে তিনি তার পিতা অর্জুন ও
পিতামহ ইন্দ্রের সমতুল্য। অভিমন্যু নামের অভি অর্থ অত্যধিক; আর মন্যু অর্থ ক্রোধ। তাই
অভিমন্যু নামের অর্থ দাড়ায় ক্রোধিত পুরুষ। যুদ্ধ ক্ষেত্রে অভিমন্যু তার পিতা অর্জুন
ও মাতুল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সমান। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিবসে মাত্র ষোলো
বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার একমাত্র সন্তান পরীক্ষিৎ তার মৃত্যুর পর জন্মগ্রহণ
করেন।
জন্ম,
শিক্ষা ও বিবাহ
অর্জুনেরনবারো বছরের ব্রহ্মচর্য ও বনবাস সম্পূর্ণ হওয়ার পর অভিমন্যুর জন্ম হয়। মাতার গর্ভেথাকতেই তার শিক্ষা শুরু হয়েছিল। গর্ভাবস্থায় সুভদ্রা অর্জুনের নিকট চক্রব্যূহে প্রবেশের প্রণালী শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ায় অভিমন্যু কেবল চক্রব্যূহে প্রবেশ করতে জানতেন,বাহির হতে জানতেন না।
পান্ডবগণের বনবাস ও অজ্ঞাতবাসের কারণে অভিমন্যু তার বাল্যকাল দ্বারকায় মাতুলালয়ে অতিবাহিত করেন।সেখানে কৃষ্ণ ও বলরামের অভিভাবকত্বে তিনি কৃষ্ণপুত্র প্রদ্যুম্ন এবং যাদববীর কৃতবর্মাও সাত্যকীর নিকট অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করেন।
ঘটোৎকচের সহায়তায় তিনি বলরাম ও রেবতীর কন্যা শশীরেখা বা সুরেখা বা বৎসলাকে বিয়ে করেন। তাদের
প্রথমে রেণুকা ও সত্যপ্রিয়া নামে দুটি যমজ, পরে আরো একটি কন্যা অভিলাশার জন্ম হয়।এছাড়াও
শ্রীকৃষ্ণ ও দেবী প্রতিবির কন্যা সিতিসুন্দরীর গর্ভে জৈত্র, ভুরিবল ও রবি নামে তিনটি
যমজ পুত্রের জন্ম হয়।
অজ্ঞাতবাসকালে পঞ্চপান্ডব ও দ্রৌপদী মৎস্যরাজ বিরাটের নিকট ছদ্মবেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তেরো বৎসর সম্পূর্ণ হওয়ার পর তারা আত্মপ্রকাশ করলে বিরাট স্বীয় কন্যা উত্তরার সঙ্গে অর্জুনের
বিবাহের প্রস্তাব দেয়। তখন অর্জুন জানায় উত্তরা তাকে আচার্যের ন্যায় শ্রদ্ধা করে।
তাই তিনি উত্তরাকে পুত্রবধূ রূপে গ্রহণ করবেন। তার পুত্র অভিমন্যুই মৎস্যরাজের জামাতা
হওয়ার উপযুক্ত। এরপর উপপ্লব্য নগরীতে অভিমন্যু ও উত্তরার বিবাহ সম্পন্ন হয়। এদের
পুত্র পরীক্ষীত।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অভিমন্যু বধ
মহাভারতের যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে কৌরব সেনাপতি দ্রোণাচার্য একটি চক্রব্যূহ রচনা করেন। এই ব্যুহভেদের কৌশল মাত্র চার জনের জানা ছিল। তারা হলেন- কৃষ্ণ, প্রদ্যুম্ন,অর্জুন আর অভিমুন্য।
এইসময়ে চক্রব্যূহ ভেদ করার জন্য পান্ডব শিবিরে অভিমন্যু ব্যতীত আর কেউ উপস্থিত না
থাকায় যুধিষ্ঠির তার ওপর এই গুরুভার অর্পণ করেন। এরপর অভিমন্যু যুদ্ধে অবতীর্ণ হন
এবং চক্রব্যূহ ভেদ করে কৌরব সেনা মধ্যে উপস্থিত হন। তার শরবর্ষণে মদ্ররাজ শল্য ও দুঃশাসন
মূর্ছিত হন। কর্ণের এক ভাই ও শল্যের ভ্রাতা নিহত হয় এবং শল্য রণভূমি থেকে পলায়ণ করেন।
এইসময় যুধিষ্ঠির, ভীম, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখন্ডী, সাত্যকী, বিরাট ও দ্রুপদ ব্যূহে প্রবেশ
করার চেষ্টা করলে ধৃতরাষ্ট্রের জামাতা সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ শিবের বরে তাদের পরাস্ত করেন
ও ব্যূহের প্রবেশ পথ রুদ্ধ করে্ন। কুরুসৈন্য বেষ্টিত অভিমন্যু একাকী যুদ্ধ করতে থাকেন।
কৌরবসৈন্য ছত্রভঙ্গ হয় এবং যোদ্ধারা পালাতে থাকে। শল্যপুত্র রুক্মরথ, দুর্যোধনের পুত্র
লক্ষণ ও কোশলরাজ বৃহদবল তার বাণে হত হন।
অভিমন্যুকে অপ্রতিরোধ্য দেখে কর্ণ দ্রোণের উপদেশে তাকে পিছন থেকে আক্রমণ করে তাকে রথচ্যূত ও ধনুর্হীন করেন এবং দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, দুর্যোধন ও শকুনি নিষ্করুণ ভাবে তার ওপর শরাঘাত
করতে থাকেন। অভিমন্যু খড়গ, চক্র, গদা এমনকি রথের চাকা দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে
ব্যর্থ হন। এইসময় দুঃশাসনের পুত্র তার মাথায় গদাঘাত করে। ফলে কৌরবসেনা নিপীড়িত বালক
অভিমন্যুর প্রাণশূন্য দেহ ভূপাতিত হয়।অভিমুন্যের বধের জন্য দ্রোণ, দ্রৌণি, কৃপ, কর্ণ,
শল্য, কৃতবর্মা, শকুনি, বৃহদ্বল, ভূরি, ভুরিশ্রবা, শল, পৌরব আর বৃষসেনকে দায়ি করা
হয়।
উত্তরা
( সংস্কৃত : उत्तरा , রোমানাইজড : উত্তরা
) ছিলেন মৎস্যের রাজকন্যা , যেমনটি হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে বর্ণিত হয়েছে । তিনি
ছিলেন রাজা বিরাট এবং রানী সুদেষ্ণার কন্যা , যার দরবারে পান্ডবরা তাদের নির্বাসনে
এক বছর গোপনে কাটিয়েছিলেন। এই সময়কালে, তিনি তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের কাছ থেকে সঙ্গীত
এবং নৃত্য শিখেছিলেন এবং পরে তার পুত্র অভিমন্যুকে বিয়ে করেছিলেন । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের
সময় অল্প বয়সে উত্তরা বিধবা হয়েছিলেন । যুদ্ধে পান্ডবদের বিজয়ের পর, তিনি এবং তার
অজাত পুত্র অশ্বত্থামা দ্বারা আক্রান্ত হন এবং কৃষ্ণের ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপে রক্ষা পান
। তার পুত্র পরীক্ষিত কুরু বংশকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং মহাভারত এবং
ভাগবত পুরাণ উভয়েই পালিত একজন সুপরিচিত রাজা হয়েছিলেন ।
উত্তরা
সংস্কৃত নাম Uttarā
একটি মেয়েলি সমাপ্তি ā যোগ করে উত্তরা শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এর একাধিক অর্থ থাকতে পারে; ব্রিটিশ ইন্ডোলজিস্ট মনিয়ার উইলিয়ামসের মতে , এই প্রসঙ্গে,এর অর্থ 'উপর,' 'উচ্চতর,' 'উন্নত,' বা 'উৎকৃষ্ট'। শব্দটি 'উত্তর দিক', সেইসাথে 'একটি উত্তর' বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়। নামের পুরুষ রূপটি মহাভারতে তার বড় ভাইয়ের নাম হিসাবেও দেখা যায় ।
সাহিত্যিক পটভূমি
উত্তরা হল মহাভারতের একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র , ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃত মহাকাব্যগুলির
মধ্যে একটি । কাজটি ধ্রুপদী সংস্কৃতে রচিত এবং এটি বহু শতাব্দী ধরে সংশোধন, সম্পাদনা
এবং ইন্টারপোলেশনের একটি যৌগিক কাজ। পাঠ্যটির টিকে থাকা সংস্করণের প্রাচীনতম অংশগুলি
400 খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি হতে পারে।
মহাভারতের পাণ্ডুলিপিগুলি অসংখ্য সংস্করণে বিদ্যমান, যেখানে প্রধান চরিত্র এবং পর্বগুলির সুনির্দিষ্ট
এবং বিবরণগুলি প্রায়শই উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয় । ভগবদ্গীতা সম্বলিত বিভাগগুলি
ব্যতীত যা অসংখ্য পাণ্ডুলিপির মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, মহাকাব্যের বাকি
অংশগুলি অনেক সংস্করণে বিদ্যমান। উত্তর এবং দক্ষিণের পুনরাবর্তনগুলির মধ্যে পার্থক্যগুলি
বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, দক্ষিণী পাণ্ডুলিপিগুলি আরও বিস্তৃত এবং দীর্ঘ। "বোম্বে"
সংস্করণ, "পুনা" সংস্করণ, "কলকাতা" সংস্করণ এবং পাণ্ডুলিপিগুলির
"দক্ষিণ ভারতীয়" সংস্করণগুলির উপর নির্ভর করে পণ্ডিতরা একটি সমালোচনামূলক
সংস্করণ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন । ভান্ডারকার ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিষ্ণু
সুকথাঙ্করের নেতৃত্বে পণ্ডিতদের দ্বারা তৈরি করা সবচেয়ে স্বীকৃত সংস্করণ, কিয়োটো
বিশ্ববিদ্যালয় , কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত
।
উত্তরা পরবর্তী লিখিত কিছু পুরাণ শাস্ত্রেও আবির্ভূত হয়েছে , যার মধ্যে সবচেয়ে বিশিষ্ট হল
কৃষ্ণ-সম্পর্কিত ভাগবত পুরাণ ।
জীবনী
মহাভারত অনুসারে , উত্তরার জন্ম হয়েছিল মৎস্য রাজ্যের রাজা বিরাট এবং তার সহধর্মিণী সুদেষ্ণার
, কেকায়ার রাজা সুতার কন্যা । তার দুই বড় ভাই- উত্তরা ও শঙ্খ- এবং দেড় ভাই শ্বেতা
ছিল।
মহাকাব্যের চতুর্থ বই বিরাট পর্বে উত্তরাকে মূল আখ্যানের মধ্যে প্রবর্তন করা হয়েছে , যা পাঁচ
পাণ্ডব ভাই এবং তাদের সাধারণ স্ত্রী দ্রৌপদীর নির্বাসনের শেষ বছর সম্পর্কে বর্ণনা করে
, যা তাদের অজ্ঞাতসারে কাটাতে হয়েছিল। তারা মৎস্যে একত্রে থাকতেন এবং বিরাটের দরবারে
নানা ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন বৃহন্নলা নামে একজন নপুংসক হিসেবে বসবাস
করতেন এবং উত্তরার গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন, তাকে নৃত্য, যন্ত্র ও কণ্ঠসংগীতের
দক্ষতা শেখাতেন যা তিনি স্বর্গের অপ্সরাদের কাছ থেকে শিখেছিলেন । উত্তরাকে অর্জুন অসাধারণ
প্রতিভাবান বলে প্রশংসা করেছেন। তাদের নির্বাসন শেষ হওয়ার পর, পাণ্ডবরা তাদের আসল
পরিচয় বিরাটের কাছে প্রকাশ করেছিলেন। বিরাট অবিলম্বে উত্তরার হাতে অর্জুনের কাছে বিয়ের
প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এই যুক্তিতে যে একজন ছাত্রের
সাথে একজন শিক্ষকের সম্পর্ক একটি সন্তানের সাথে পিতামাতার মতো। পরিবর্তে, অর্জুন পরামর্শ
দিয়েছিলেন যে উত্তরা তার পুত্র অভিমন্যুকে বিয়ে করে তার পুত্রবধূ হন । উভয় পক্ষের
অনুমোদনে, উত্তরা এবং অভিমন্যুর বিবাহ অনুষ্ঠান উপপ্লব্য শহরে তাদের আত্মীয়স্বজন এবং
সহযোগীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উপপ্লব্যে বসবাসের সময়, পাণ্ডবদের কাছে একজন
দরিদ্র ব্রাহ্মণ এসেছিলেন, যিনি উত্তরাকে দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে কুরু রাজবংশের
অবসান হলে তিনি একটি পুত্রের জন্ম দেবেন এবং সেই কারণে তাকে পরীক্ষিত বলা হবে 'যাকে
পরীক্ষা করা হয়েছে')।"
মহাভারতেরপরবর্তী কয়েকটি পর্বে (বই) পাণ্ডব এবং তাদের কাকাতো ভাই কৌরবদের মধ্যে সংঘটিত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে , যেখানে মৎস্য পাণ্ডবদের সঙ্গে মিত্রতা করেছিলেন। যুদ্ধের
সময় উত্তরা তার পিতা, ভাই এবং সমগ্র মৎস্য বাহিনীকে হারিয়েছিল। তিনি খুব অল্প বয়সে
বিধবা হয়েছিলেন যখন অভিমন্যু, নিজের মাত্র ষোল বছর বয়সী, যুদ্ধে নিহত হন। স্বামীর
মৃতদেহ দেখে শোকে আচ্ছন্ন হয়ে, তিনি তার কাকা-শ্বশুর এবং দৈব অবতার কৃষ্ণের দ্বারা
সান্ত্বনা পেয়েছিলেন । তার স্বামীর মৃতদেহ দেখে তার দুঃখ ও বিলাপ আবার কৌরবদের মা
গান্ধারী দ্বারা স্ত্রীপর্বতে চিত্রিত হয়েছে ।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সমাপ্তির পর, যা পাণ্ডবদের বিজয়ে শেষ হয়েছিল, অশ্বত্থামা — দ্রোণাচার্যের
পুত্র , যিনি কৌরব বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন — অবশিষ্ট পাণ্ডব সেনাদের হত্যা করে
তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এই ঘটনাটি সৌপ্তিক পর্বে বর্ণনা
করা হয়েছে । অশ্বত্থামা অর্জুনের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং প্রচলিত উপায়ে অর্জুনকে
পরাজিত করতে তার অক্ষমতার বিষয়ে সচেতন, অশ্বত্থামা ব্রহ্মশিরা নামে পরিচিত শক্তিশালী
ঐশ্বরিক অস্ত্রের আবাহন করেছিলেন । এর জবাবে অর্জুনও ব্রহ্মশিরাকে মুক্ত করার জন্য
প্রস্তুত হলেন। নারদ এবং ব্যাস , হিন্দু পুরাণের শ্রদ্ধেয় ঋষি, হস্তক্ষেপ করেন এবং
উভয় যোদ্ধাকে তাদের স্বর্গীয় অস্ত্র প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেন। অর্জুন তাদের নির্দেশ
মেনে চলেন এবং তিনি যে ব্রহ্মশিরা খুলেছিলেন তা প্রত্যাহার করে নেন। যাইহোক, অশ্বত্থামার
অস্ত্রের উপর প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ব্রহ্মশিরাকে একবার প্রত্যাহার করার
ক্ষমতার অভাব ছিল। প্রতিশোধের জন্য গ্রাসকারী আকাঙ্ক্ষা দ্বারা চালিত, অশ্বত্থামা সিদ্ধান্ত
নিয়েছিলেন যে তিনি যদি পাণ্ডবদের ধ্বংস করতে না পারেন তবে তিনি তাদের বংশকে শেষ করে
দেবেন। একটি জঘন্য কাজে, তিনি ব্রহ্মশিরাকে উত্তরার গর্ভের দিকে নিয়ে যান, যা শেষ
পর্যন্ত অনাগত সন্তানের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। যাইহোক, কৃষ্ণ আশ্বস্ত করেছিলেন যে
শিশুটিকে রক্ষা করা হবে এবং একজন যোদ্ধার একটি অনাগত সন্তানের উপর অস্ত্র ঘুরিয়ে দেওয়ার
চিন্তায় ক্রোধে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তিনি অশ্বত্থামাকে সহস্রাব্দ বেঁচে থাকার অভিশাপ
দিয়েছিলেন, সম্পূর্ণ একা এবং রোগের বোঝা, তার নিজের পুঁজের দুর্গন্ধে তাড়িয়ে দেওয়া
হয়েছিল । অশ্বমেধিকা পর্ব পরীক্ষিতের জন্ম সম্পর্কে প্রমাণ করে। উত্তরা প্রসবের সময়,
শিশুটি মৃত জন্মগ্রহণ করে; তিনি অন্যান্য রাজকীয় মহিলাদের দ্বারা সান্ত্বনা পেয়েছিলেন।
যখন কৃষ্ণ তার সাথে দেখা করতে এলেন, তখন তিনি তাকে কাঁদলেন এবং তার সন্তানকে বাঁচানোর
জন্য তার আগের আশ্বাসের কথা মনে করিয়ে দিলেন। তার ঐশ্বরিক ক্ষমতা ব্যবহার করে, কৃষ্ণ
মৃত শিশুটিকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন, এবং শিশুটির নাম রাখা হয়েছিল পরীক্ষিত , যার
অর্থ 'যাকে পরীক্ষা করা হয়েছে'।
মহাভারতে উত্তরার শেষ আবির্ভাব হয় আশ্রমবাসিক পর্বে । যুদ্ধের পনেরো বছর পর, কুরু অগ্রজ ধৃতরাষ্ট্র
, গান্ধারী , কুন্তী এবং বিদুর বনে চলে যান। উত্তরা, রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যদের
সাথে, রাজধানী শহরে ফিরে আসার আগে তাদের সাথে কিছু দূরত্বের জন্য সঙ্গী হয়েছিল।
1মহাকাব্যের শেষে, যখন পাণ্ডবরা অবশেষে পৃথিবী ত্যাগ করেন, তখন উত্তরার শাশুড়ি,
সুভদ্রা , যুবক পরীক্ষিতের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব পান, যিনি হস্তিনাপুরের নতুন রাজা
হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন । উত্তরা হয়তো তার অবশিষ্ট জীবন রাণী-মা হিসেবেই কাটিয়েছেন।
উত্তরাধিকার
কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের জন্য অভিমন্যুর প্রস্থানের আগে উত্তরার আবেদনগুলি 20 শতকের প্রথম দিকে প্রিন্টের জন্য একটি সাধারণ বিষয় ছিল।
উত্তরা হিন্দুধর্মের কৃষ্ণ-কেন্দ্রিক সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব । পুরাণ শাস্ত্র
অনুসারে , কৃষ্ণের মৃত্যুর কয়েক বছর পরে, ঋষি ব্যাসের পুত্র শুক দ্বারা তাঁর পুত্র
পরীক্ষিতকে তাঁর জীবনী বর্ণনা করা হয়েছিল, যা তখন ভাগবত পুরাণ হিসাবে সংকলিত হয়েছিল
। কৃষ্ণের উত্তরার পুত্রকে রক্ষা করার পর্বটিও এই শাস্ত্রগুলিতে বর্ণিত হয়েছে, তবে
মহাভারতে দেওয়া বিবরণ থেকে ভিন্ন । এটি অনুসারে, অশ্বত্থামার অস্ত্রটি উত্তরায় আঘাত
করার পরে, তিনি গর্ভপাতের ভয়ে কৃষ্ণের কাছে ছুটে যান। কৃষ্ণ আত্মারূপে তার গর্ভে প্রবেশ
করেছিলেন এবং পরীক্ষিতকে রক্ষা করেছিলেন, যার কারণে তাকে বিষ্ণুরতাও বলা হয়েছিল।
কৃষ্ণের মূর্তিতত্ত্বের বিবরণ জনপ্রিয়ভাবে উত্তরায় দায়ী। ব্রজ ও রাজস্থান অঞ্চলের একটি জনপ্রিয়
আখ্যান অনুসারে , বজ্রনাভ — কৃষ্ণের প্রপৌত্র — দ্বারকার সিংহাসনে বসার পর কৃষ্ণের
প্রকাশ্য রূপ দেখতে চেয়েছিলেন। তবে তাকে গাইড করার মতো কোনো মডেল ছিল না। বজ্রনাভ
জীবিত সাক্ষীদের সন্ধান করেছিলেন: উত্তরা, যিনি এখন হস্তিনাপুরের বয়স্ক রাণী-মা ছিলেন
এবং কৃষ্ণের বন্ধু উদ্ধব । উত্তরা একটি প্রাণবন্ত বিশদ বিবরণ প্রদান করেছে, কিন্তু
ভাস্কররা সন্তোষজনকভাবে কৃষ্ণের প্রতিলিপি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা এই প্রত্যক্ষদর্শীদের
সাহায্যের জন্য তালিকাভুক্ত করেছিল এবং ঐশ্বরিক প্রকাশের জন্য প্রার্থনা করেছিল, যার
ফলে একটি ত্রয়ী হিসাবে উপস্থিত হয়েছিল: গোবিন্দ দেব , গোপীনাথ এবং মদন মোহন । যাইহোক,
চিত্রের কোনোটিই কৃষ্ণের রূপকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করেনি, প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট কিছু
দিক থেকে সফল হয়েছে এবং অন্যের দিক থেকে ছোট হয়েছে। তাদের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও, এই
ছবিগুলির প্রত্যেকটি এখন থেকে তার নিজস্বভাবে উপাসনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হয়ে
উঠবে, যদিও, মধ্যযুগীয় সময়কালে তাদের পুনঃআবিষ্কারের আগে তারা দীর্ঘ সময়ের জন্য
অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করা হয়। পৌরাণিক কাহিনীবিদ দেবদত্ত পট্টনায়কের মতে
, গল্পের একটি ভিন্নতা কৃষ্ণের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মূর্তিগুলিকে যুক্ত করে - যেগুলি
উত্তরার বর্ণনার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। দ্রষ্টব্যঃ এই আইকনগুলি ভারত জুড়ে
ছড়িয়ে পড়েছে এবং হিন্দুধর্মের ভাগবত সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে । ইতিহাসবিদরা
এই আখ্যানটিকে অভিজ্ঞতামূলক প্রমাণের পরিবর্তে বিশ্বাসের মূলে একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণ
হিসাবে দেখেন।
দ্রৌপদী পুত্রঃ
মহাভারতে দ্রৌপদী অন্যতমা। তাঁর পাঁচজন পুত্র তাদের নাম যথাক্রমে-
১.প্রতিবিন্ধ্য
২.সুতসোম
৩.শ্রুতকর্মা
৪.শতানীক
৫.শ্রুতসেন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে গুরু দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা কর্তৃক ঘুমন্ত অবস্থায় নির্মম ভাবে তারা নিহত
হন।
শ্লোক: 7:
অস্মাকন্ত্ত বিশিষ্টা যে তান্নিবোধ দ্বিজোত্তম ।
নায়কা মম সৈন্যস্য সংজ্ঞার্থং তান্ ব্রবীমি তে ॥৭॥
অনুবাদ : হে দ্বিজোত্তম ! আমাদের পক্ষে যে সমস্ত বিশিষ্ট সেনাপতি সামরিক শক্তি পরিচালনার জন্য রয়েছেন, আপনার অবগতির জন্য আমি তাঁদের সম্বন্ধে বলছি।
শ্লোক: 8:
ভবান্ ভীষ্মশ্চ কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিতিঞ্জয়ঃ ।
অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তিস্তথৈব চ ॥৮॥
ভবান্, ভীষ্মঃ, চ, কর্ণঃ, চ, কৃপঃ, চ, সমিতিঞ্জয়ঃ, অশ্বত্থামা, বিকর্ণঃ, চ, সৌমদত্তিঃ, তথা, এব, চ ॥৮॥
অনুবাদ : সেখানে রয়েছেন আপনার মতোই ব্যক্তিত্বশালী-ভীষ্ম, কর্ণ, কৃপা, অশ্বত্থামা , বিকর্ণ ও সোমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবা, যাঁরা সর্বদা সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে থাকেন।
ভীষ্ম , কর্ণ সম্পর্কে আমরা পূর্বেই জেনেছি । এখন আমাদের জানতে হবে কে কৃপা , অশ্বত্থামা , বিকর্ণ ও সোমদত্ত , ভুরিশ্রবা ?
মহাভারত অনুসারে, অশ্বত্থামা মানে "পবিত্র কণ্ঠ যা ঘোড়ার সাথে সম্পর্কিত"। তাকে এমন নামকরণ করা হয়েছে কারণ এটি বিশ্বাস করা হয় যে যখন তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তিনি একটি ঘোড়ার মতো চিৎকার করেছিলেন।
তার আরও কিছু নাম হল:
দ্রোণপুত্র (द्रोणपुत्र) - দ্রোণাচার্যের পুত্র
গুরুপুত্র(गुरुपुत्र) - গুরু দ্রোণের পুত্রকৃপিকুমার
(কৃপিকুমার)- কৃপির পুত্র
আচার্যপুত্র (आचार्यपुत्र) - আচার্যের পুত্র (দ্রোণাচার্য)
অশ্বত্থামা
ছিলেন দ্রোণ ও কৃপির পুত্র । তিনি একটি বনের গুহায় জন্মগ্রহণ করেন (বর্তমানে তপকেশ্বর
মহাদেব মন্দির, দেরাদুন , উত্তরাখণ্ডে )। দ্রোণ শিবকে সন্তুষ্ট করার জন্য বহু বছর ধরে
কঠোর তপস্যা করেছিলেন যাতে শিবের মতো বীরত্বের অধিকারী পুত্র লাভ করেন।
তিনি তার কপালে একটি ঐশ্বরিক রত্ন নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যা তাকে মানুষের চেয়ে নীচের সমস্ত জীবের উপর ক্ষমতা দিয়েছে; এটি তাকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি, বার্ধক্য, রোগ, অস্ত্র এবং দেবতাদের থেকেও রক্ষা করেছিল। মণি তাকে প্রায় অজেয় এবং অমর করে তুলেছিল। যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হলেও দ্রোণ সামান্য অর্থ বা সম্পত্তি নিয়ে সরল জীবনযাপন করতেন। ফলস্বরূপ, অশ্বত্থামার একটি কঠিন শৈশব ছিল, তার পরিবার এমনকি দুধের খরচ বহন করতে সক্ষম ছিল না। তার পরিবারের জন্য একটি উন্নত জীবন প্রদান করতে চান, দ্রোণ তার প্রাক্তন সহপাঠী এবং বন্ধু, দ্রুপদ থেকে সাহায্য চাইতে পাঞ্চাল রাজ্যে গিয়েছিলেন , যিনি দ্রোণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি যখন রাজা হবেন, তখন তিনি তার রাজ্যের অর্ধেক তার সাথে ভাগ করে নেবেন। যাইহোক, দ্রুপদ বন্ধুত্বকে তিরস্কার করেছিলেন, দাবি করেছিলেন যে একজন রাজা এবং একজন ভিক্ষুক বন্ধু হতে পারে না, দ্রোণকে অপমান করে।
এই ঘটনার পর
এবং দ্রোণের দুর্দশা দেখে কৃপা দ্রোণকে হস্তিনাপুরে আমন্ত্রণ জানান । এইভাবে, দ্রোণ
পাণ্ডব এবং কৌরব উভয়েরই গুরু হয়েছিলেন । তাদের সাথে অশ্বত্থামাকেও যুদ্ধশিল্পে প্রশিক্ষণ
দেওয়া হয়েছিল। অশ্বত্থামা যুদ্ধবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন, বিভিন্ন গোপনীয়তা এবং
ঐশ্বরিক অস্ত্র শিখেছিলেন।
রাজকুমারদের
সাথে থাকাকালীন, দুর্যোধন ঘোড়ার প্রতি অশ্বত্থামার অনুরাগ দেখেছিলেন এবং তাকে একটি
ভাল জাতের ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন। বিনিময়ে, দুর্যোধন হস্তিনাপুরের প্রতি দ্রোণের
কর্তব্য-নির্ভর আনুগত্য ছাড়াও নিজের প্রতি এবং বর্ধিতভাবে, কৌরবদের প্রতি অশ্বত্থামার
ব্যক্তিগত আনুগত্য লাভ করেন ।
যখন দ্রোণ তাঁর
শিষ্যদেরকে তাঁর দক্ষিণা দিতে বলেছিলেন ; দ্রুপদকে বন্দী করার অনুরোধ করে , কৌরবরা
ব্যর্থ হলে, পাণ্ডবরা দ্রুপদকে পরাজিত করে দ্রোণের সামনে হাজির করে। দ্রোণ দ্রুপদ রাজ্যের
উত্তর অর্ধেক নিয়েছিলেন এবং অশ্বত্থামাকে রাজা হিসাবে মুকুট পরিয়েছিলেন, যার রাজধানী
অহিচ্ছত্রে ছিল ।
কুরুক্ষেত্র
যুদ্ধে ভূমিকা
অশ্বথামা পাণ্ডবদের
উপর নারায়ণ অস্ত্র নিক্ষেপ করেন হস্তিনাপুর যখন দ্রোণকে কৌরবদের শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ
দেয় , তখন দ্রোণ এবং অশ্বত্থামা উভয়েই হস্তিনাপুরের প্রতি অনুগত হন এবং কুরুক্ষেত্র
যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেন।
যুদ্ধের 14
তম দিনে, তিনি অঞ্জনপার্বণ ( ঘটোৎকচের শক্তিশালী পুত্র) সহ রাক্ষসদের একটি বিভাগকে
হত্যা করেন এবং ঘটোৎকচকেও পরাজিত করেন, কিন্তু তার বিভ্রম মোকাবেলায় ব্যর্থ হন। তিনি
অর্জুনের বিরুদ্ধেও বেশ কয়েকবার দাঁড়িয়েছিলেন, তাকে জয়দ্রথের কাছে পৌঁছাতে বাধা
দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন , কিন্তু পরাজিত হন এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান। যাইহোক,
জয়দ্রথকে রক্ষা করার পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন , অশ্বত্থামা, এক সময়ে, তার সর্বাস্ত্র
তীর ব্যবহার করে এবং দুর্যোধনের প্রতি ক্রুদ্ধ অর্জুন কর্তৃক প্রবর্তিত শক্তিশালী মানবস্ত্র
তীরটি ধ্বংস করে দুর্যোধনের ঐশ্বরিক স্বর্গীয় বর্ম এবং জীবনকে সফলভাবে রক্ষা করেছিলেন
।
ভীম অশ্বত্থামা
নামে একটি হাতিকে বধ করেন। রাজনামা থেকে ফোলিও ।
যুদ্ধের দশম
দিনে, ভীষ্মের পতনের পর, দ্রোণ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সেনাপতি হন। তিনি দুর্যোধনকে প্রতিশ্রুতি
দিয়েছিলেন যে তিনি যুধিষ্ঠিরকে বন্দী করবেন , কিন্তু তিনি বারবার তা করতে ব্যর্থ হন।
দুর্যোধন তাকে কটূক্তি ও অপমান করেছিলেন, যা অশ্বত্থামাকে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল,
যার ফলে অশ্বত্থামা এবং দুর্যোধনের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হয়।
সেদিন সশস্ত্র
দ্রোণকে পরাজিত করা অসম্ভব হবে জেনে অর্জুন তার গুরুকে হত্যা করতে অস্বীকার করেছিলেন,
তাই কৃষ্ণ দ্রোণকে নিরস্ত্র করার পরিকল্পনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ভীম তখন অশ্বত্থামা
নামে একটি হাতিকে বধ করতে এগিয়ে যাবেন এবং তারপর দ্রোণের কাছে দাবি করবেন যে তিনি
তার পুত্রকে হত্যা করেছেন। তার দাবি অবিশ্বাস করে, দ্রোণ যুধিষ্ঠিরের কাছে আসেন, যুধিষ্ঠিরের
ধর্ম ও সততার দৃঢ় আনুগত্যের কথা জেনে । দ্রোণ সত্য জানতে চাইলে যুধিষ্ঠির উত্তর দিয়েছিলেন
"অশ্বত্থামা মারা গেছে, হাতি।" হাতি শব্দটি অস্পষ্টভাবে যোগ করা যাতে দ্রোণ
তা শুনতে না পারেন।
ধৃষ্টদ্যুম্ন
তার পিতা দ্রুপদকে দ্রোণের হত্যার প্রতিশোধ হিসাবে শোকাহত দ্রোণকে হত্যা করার এই সুযোগটি
ব্যবহার করেছিলেন । প্রতারণামূলক উপায়ে তার পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল জানতে পেরে,
অশ্বত্থামা ক্রোধে ভরা হয়েছিলেন এবং পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে নারায়ণস্ত্রের আহ্বান জানান।
যখন অস্ত্রের
আহ্বান করা হয়, হিংস্র বাতাস বইতে শুরু করে, বজ্রধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় এবং প্রতিটি
পাণ্ডব সৈন্যের জন্য একটি তীর দেখা দেয়। অস্ত্র নিরস্ত্র লোকদের উপেক্ষা করে জেনে
কৃষ্ণ সমস্ত সৈন্যদের তাদের রথ পরিত্যাগ করে নিরস্ত্র করার নির্দেশ দেন। তাদের সৈন্যদের
নিরস্ত্র করার পর (কিছু অসুবিধার সাথে ভীম সহ), অস্ট্রা নিরীহভাবে অতিক্রম করে। বিজয়ের
আকাঙ্ক্ষায় দুর্যোধন পুনরায় অস্ত্রটি ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ করলে, অশ্বত্থামা
বলেছিলেন যে যদি অস্ত্রটি আবার ব্যবহার করা হয় তবে এটি তার ব্যবহারকারীকে চালু করবে।
নারায়ণস্ত্র
পাণ্ডব বাহিনীর একটি অক্ষৌহিণীকে ধ্বংস করেন। যাইহোক, নারায়ণস্ত্র ব্যবহারের পরে,
উভয় বাহিনীর মধ্যে একটি ভয়ানক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাঁর নারায়ণস্ত্র পাণ্ডবদের হত্যা
করতে ব্যর্থ হতে দেখে, অশ্বত্থামা অগ্নেয়াস্ত্রকে আমন্ত্রণ জানান এবং সমস্ত দৃশ্যমান
ও অদৃশ্য শত্রুদের দিকে তা চালু করেন। অস্ত্রটি শীঘ্রই অর্জুনকে পরাভূত করে এবং বেশ
কয়েকটি জ্বলন্ত তীর দ্বারা বেষ্টন করে এবং পাণ্ডব সেনাবাহিনীর মধ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি
করে। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে এবং পরিস্থিতির গুরুতরতা উপলব্ধি করার পর, অর্জুন অগ্নেয়াস্ত্রের
প্রভাবকে বশ করার জন্য তার বরুণাস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে এটি পাণ্ডব
বাহিনীর আরেকটি অক্ষৌহিনীকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিল, যেটি শুধুমাত্র অর্জুন
এবং কৃষ্ণ বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। এটি অশ্বত্থামাকে হতবাক করেছিল কারণ তিনি বিভ্রান্ত
হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং তার জ্ঞান এবং দক্ষতা সম্পর্কে সন্দেহ
করেছিলেন। পরে, অশ্বত্থামা সরাসরি যুদ্ধে ধৃষ্টদ্যুম্নকে পরাজিত করেন কিন্তু সাত্যকি
এবং ভীম অশ্বত্থামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় তার পশ্চাদপসরণ ঢেকে
দেওয়ায় তাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হন। অশ্বত্থামা উভয় যোদ্ধাকে পরাজিত করেন এবং তাদের
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পশ্চাদপসরণ করেন।
অশ্বত্থামা
একবারে লক্ষ লক্ষ তীর নিক্ষেপ করেছিলেন, যার ফলে অর্জুন নিজেই স্তব্ধ হয়েছিলেন। অশ্বত্থামা
আবার অর্জুনকে পরাভূত করার চেষ্টা করেন , কিন্তু শেষ পর্যন্ত, অর্জুন তাকে পরাজিত করে
তার শরীরে বেশ কয়েকটি তীর বিদ্ধ করে যা তাকে অজ্ঞান করে দেয় এবং তার সারথি অশ্বত্থামাকে
অর্জুনের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়।
পাণ্ড্য রাজ্যের
রাজা মলয়ধ্বজ , পাণ্ডবদের অন্যতম শক্তিশালী যোদ্ধা, অশ্বত্থামার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।
তাদের মধ্যে দীর্ঘ তীরন্দাজের পর, অশ্বত্থামা মলয়ধ্বজকে অস্ত্রহীন করে দেন এবং ঘটনাস্থলেই
তাকে হত্যা করার সুযোগ পান, কিন্তু তিনি তাকে আরও যুদ্ধের জন্য সাময়িকভাবে রক্ষা করেন।
মলয়ধ্বজ তখন একটি হাতির উপর অশ্বত্থামার বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং একটি শক্তিশালী ল্যান্স
নিক্ষেপ করেন, যা পরবর্তীটির ডায়ডেমটি ধ্বংস করে দেয়। অশ্বথামা মলয়ধ্বজের শিরশ্ছেদ
করেন, তার অস্ত্র কেটে দেন এবং মলয়ধ্বজের ছয় অনুসারীকেও হত্যা করেন। এটা দেখে কৌরব
বাহিনীর সকল মহান যোদ্ধা অশ্বত্থামার এই কাজের জন্য সাধুবাদ জানালেন।
দুঃশাসনের ভয়ানক
মৃত্যুর পর , অশ্বত্থামা হস্তিনাপুরের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে দুর্যোধনকে পাণ্ডবদের
সাথে শান্তি স্থাপনের পরামর্শ দেন । পরে, দুর্যোধন ভীমের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর
মুখোমুখি হওয়ার পর, কৌরবের পক্ষ থেকে বেঁচে থাকা শেষ তিনজন, অশ্বত্থামা, কৃপা এবং
কৃতবর্মা , তাঁর পাশে ছুটে আসেন। অশ্বত্থামা দুর্যোধনের প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নিয়েছিলেন,
এবং দিনের আগে শল্যকে হত্যা করার পরে দুর্যোধন তাঁকে সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন।
কৃপা এবং কৃতবর্মার
সাথে , অশ্বত্থামা রাতে পাণ্ডবদের শিবির আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছিলেন। অশ্বত্থামা
যখন সেখানে পৌঁছান, তখন তিনি পাণ্ডবদের শিবিরের পাহারা দিচ্ছিল ভয়ঙ্কর ভূতের রূপে
শিবের মুখোমুখি হন। তাকে চিনতে না পেরে, অশ্বত্থামা নির্ভয়ে তার সমস্ত শক্তিশালী অস্ত্র
দিয়ে ভয়ঙ্কর ভূতকে আক্রমণ করতে শুরু করেছিলেন কিন্তু এমনকি কোনও ক্ষতি করতেও ব্যর্থ
হন। শীঘ্রই, একটি সোনার বেদী তার সামনে উদ্ভাসিত হয় এবং তিনি শিবিরে উত্তরণের বিনিময়ে
নিজেকে বলিদান হিসাবে নিবেদন করেন। শিব তার আসল রূপে অশ্বত্থামার সামনে আবির্ভূত হলেন
এবং তাকে একটি ঐশ্বরিক তলোয়ার উপহার দিলেন। অতঃপর শিব স্বয়ং অশ্বত্থামার দেহে প্রবেশ
করে তাঁকে সম্পূর্ণরূপে অপ্রতিরোধ্য করে তোলেন।
অশ্বত্থামা
শিবিরে প্রবেশ করার পর, তিনি প্রথমে পাণ্ডব বাহিনীর সেনাপতি এবং তার পিতার হত্যাকারী
ধৃষ্টদ্যুম্নকে লাথি মেরে জাগিয়ে তোলেন। অশ্বত্থামা অর্ধ-জাগ্রত ধৃষ্টদ্যুম্নকে শ্বাসরোধ
করে হত্যা করেছিলেন যখন রাজপুত্র তার হাতে একটি তলোয়ার নিয়ে মারা যাওয়ার অনুমতি
চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিলেন। অশ্বত্থামা শিখণ্ডী , উত্তমৌজ,
যুধামন্যু , উপপাণ্ডব এবং পাণ্ডব বাহিনীর অন্যান্য অনেক বিশিষ্ট যোদ্ধা সহ অবশিষ্ট
যোদ্ধাদের হত্যা করে এগিয়ে যান । যদিও অনেক যোদ্ধা পাল্টা লড়াই করার চেষ্টা করেছিলেন,
অশ্বত্থামা তার দেহ শিবের কাছে থাকার কারণে অক্ষত ছিলেন । যারা অশ্বত্থামার ক্রোধ থেকে
পালানোর চেষ্টা করেছিল তাদের শিবিরের প্রবেশদ্বারে কৃপা এবং কৃতবর্মা দ্বারা কুপিয়ে
হত্যা করা হয়েছিল।
বধের পর তিনজন
যোদ্ধা দুর্যোধনের কাছে ফিরে আসেন । তাঁর কাছে সমস্ত পাঁচাল এবং উপপাণ্ডবদের মৃত্যুর
খবর জানানোর পর , তিনি অশ্বত্থামাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন যা ভীষ্ম , দ্রোণ এবং কর্ণ
তাঁর শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার আগে অর্জন করতে পারেননি।
অশ্বত্তমা গ্রেফতার
হন এবং অর্জুন তাকে দ্রৌপদীর কাছে নিয়ে আসেন ।
পাণ্ডব ও কৃষ্ণ
, যারা রাতের বেলা দূরে ছিল, এখন তাদের শিবিরে ফিরে এসেছে। এসব ঘটনার সংবাদ শুনে যুধিষ্ঠির
অজ্ঞান হয়ে গেলেন এবং পাণ্ডবরা অসহায় হয়ে পড়লেন। ভীম ক্রুদ্ধ হয়ে দ্রোণের পুত্রকে
হত্যা করতে ছুটে গেলেন। তারা তাকে গঙ্গার ধারে ঋষি ব্যাসের আশ্রমে খুঁজে পায় ।
অশ্বত্থামা,
তার সময় এসেছে বলে বিশ্বাস করে, তাদের হত্যার শপথ পূরণের জন্য ঘাসের একটি ছোট ফলক
থেকে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে ব্রহ্মাস্ত্র আহ্বান করেছিলেন। কৃষ্ণ অর্জুনকে অশ্বত্থামার
বিরুদ্ধে তার নিজের ব্রহ্মাস্ত্রকে গুলি করতে বলেছিলেন আত্মরক্ষার জন্য। ব্যাস হস্তক্ষেপ
করেন এবং ধ্বংসাত্মক অস্ত্রগুলিকে একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে বাধা দেন। তিনি অর্জুন
এবং অশ্বত্থামা উভয়কেই তাদের অস্ত্র ফিরিয়ে নিতে বললেন। অর্জুন, কীভাবে তা করতে হবে
জেনে তা ফিরিয়ে নিলেন।
অশ্বত্থামা,
কীভাবে পাণ্ডবদের বংশের অবসান ঘটানোর প্রয়াসে ব্রহ্মাস্ত্রকে গর্ভবতী উত্তরার গর্ভের
দিকে পুনঃনির্দেশিত করেছিলেন তা না জেনে। দ্রৌপদী, সুভদ্রা এবং সুদেষ্ণার অনুরোধে কৃষ্ণ
উত্তরার অনাগত সন্তানকে ব্রহ্মাস্ত্রের প্রভাব থেকে রক্ষা করেছিলেন। অশ্বত্থামাকে তখন
তার কপালে রত্নটি সমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং কৃষ্ণ অভিশাপ দিয়েছিলেন যে তিনি
কলিযুগের শেষ অবধি তার আঘাত থেকে রক্ত এবং পুঁজ বের হওয়া পর্যন্ত বনে ঘুরে বেড়াবেন
এবং কারও সাথে কথা বলতে পারবেন না। অশ্বত্থামা তখন বনে গেলেন যাতে আর কখনো দেখা না
হয়।
বিকর্ণ (সংস্কৃত:
विकर्ण) হলেন মহাকাব্য মহাভারতে বর্ণিত তৃতীয় কৌরব, ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর পুত্র
এবং যুবরাজ দুর্যোধনের ভাই৷ বিকর্ণ কৌরবদের মধ্যে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে
উল্লেখিত হয়েছে। দুর্যোধনের কাছে পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির তাঁর রাজ্য সহ সব কিছু হারিয়ে
ফেলেন৷ বিকর্ণই একমাত্র কৌরব যিনি রাজসভায় দুর্যোধন যখন যুধিষ্ঠির তথা পাণ্ডবদের স্ত্রী
দ্রৌপদীর অপমান করছিল তখন তার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন৷
যৌবনে বিকর্ণ
হলেন দ্রোণের একজন শিষ্য যিনি তীর-ধনুক চালনায় অর্জুনের মতো পারদর্শী ছিলেন। অস্ত্রশিক্ষা
শেষে দ্রোণ কৌরবদের বললেন- গুরুদক্ষিণা হিসেবে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে বন্দী করে নিয়ে
আসতে হবে৷ দুর্যোধন, দুঃশাসন, যুযুৎসু, বিকর্ণ এবং অন্য কৌরবগণ হস্তিনাপুরের সৈন্যসহ
পাঞ্চাল রাজ্য আক্রমণ করে৷ বিকর্ণ ও তাঁর ভাইয়েরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যেতে এবং যুদ্ধক্ষেত্র
ত্যাগ করতে বাধ্য হন৷
ব্যাসদেবের
আশীর্বাদে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর যে শতপুত্র জন্মগ্রহণ করে তাদের মধ্যে সবচেয়ে ধার্মিক
ছিলেন বিকর্ণ৷ দুর্যোধনের ভাই হলেও তিনি, তাঁর বাকি ভাইদের মত বদমেজাজি ও অহংকারী ছিলেন
না৷ পান্ডবদের পাশাখেলায় পরাজয় হেতু সভামধ্যে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময়ে ধৃতরাষ্ট্র
আর এক বৈশ্য দাশীর পুত্র যুযুৎসু ব্যতীত একমাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন তিনিই৷ এর প্রতিবাদে
এমনকি তিনি সেই সভাস্থল ত্যাগ করেন৷ পরবর্তীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও তিনি কৌরব পক্ষের
হয়ে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেন৷ ভীম কৌরবদের একশ ভাইকে বধ করবার পণ নিয়ে যখন কুরুক্ষেত্রকে
প্রায় শ্মশানে পরিণত করেছেন তখন বিকর্ণ তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে দ্বন্দ্বের আহ্বান জানান,
ভীম কিছুকাল ভাবেন তার সভার কথা মনে হতে তিনি বিকর্ণকে বলেন তুমি একমাত্র কৌরব যে জানে
ধর্ম কি? তুমি সরে দাঁড়াও আমি তোমাকে বধ করতে চাই না৷ তুমিই একমাত্র যে সেই সভায়
দুর্যোধনের প্রতিবাদ করেছিলে৷ কিন্তু বিকর্ণ বলেন আজ আমার সরে যাওয়াটাও অধর্ম হবে,
আমি জানি কৌরবদের এই যুদ্ধে জয়লাভ কোনোদিনই হবে না যেহেতু বাসুদেব কৃষ্ণ পান্ডব পক্ষে
আছে, কিন্তু আমি আমার ভাই এবং জ্যেষ্ঠ ভাই দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করতে পারব না৷ আমি ধার্মিক
কিন্তু বিভীষণ নই৷ আমাকে যুদ্ধ করতেই হবে৷ তিনি বলেন “সেই সভাস্থলে আমার যা কর্তব্য
ছিল করেছি, কিন্তু এখন আমার কর্তব্য আমার ভাইদের রক্ষা করা৷ তাই এসো আমার সাথে দ্বন্দ্ব
কর বৃকোদর ভীম৷”
সোমদত্ত ছিলেন বাহ্লীকার পুত্র যিনি ছিলেন শান্তনুর
বড় ভাই।
বাহলিকা
ছিলেন রাজা প্রতিপা ও রানী সুনন্দার ২য় পুত্র। ১ম পুত্র ছিলেন দেবপী, যিনি কুষ্ঠ রোগের
কারণে মুকুটে আরোহণ করেননি এবং সারা জীবন তপস্যা করার জন্য বনে যান। তাই, বাহলিকা হস্তিনাপুরের
যুবরাজ ছিলেন, এবং যৌক্তিকভাবে তিনি শান্তনুর পরিবর্তে রাজা হতেন। যাইহোক, তিনি বাহলিকা
অঞ্চলে চলে যান (একটি পৃথক জমি তাকে তার পিতা বা জরাসন্ধ একটি চুক্তির ফলে দেওয়া হয়েছিল)
যার ফলে শান্তনু হস্তিনাপুরের রাজা হন।
বাহলিকা
তার পরিবারের সাথে রঙ্গভূমিতে, যুধিষ্ঠিরের যুবরাজের সময়, যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের
সময়, পাশার খেলার সময়ও ছিলেন।
তিনি
তাঁর পুত্র, নাতি এবং নাতিদের সাথে কৌরবদের পক্ষে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর
বংশধরেরা সবাই কুর্ক্ষেত্র যুদ্ধে মারা যান। জয়দ্রথ বধের ১৪ তম দিনে সাত্যকির হাতে
তাঁর নাতি ভুরিশ্রাবা স নিহত
হন। তার পুত্র সোমদত্তও ১৪ তারিখে সাত্যকির হাতে নিহত হন যখন সূর্যাস্তের পর যুদ্ধ
চলতে থাকে। তিনি নিজেও ভীমের হাতে নিহত হন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ১৩ তম দিনে ভুরিশ্রাবের
উভয় পুত্রও অভিমন্যুর হাতে মারা যায়।
শ্লোক: 9:
অন্যে চ বহবঃ শূরাঃ মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ।
নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধবিশারদাঃ ॥৯॥
শ্লোক: 10:
অপর্যাপ্তং তদস্মাকং বলং ভীষ্মাভিরক্ষিতম্ ।
পর্যাপ্তং ত্বিদমেতেষাং বলং ভীমাভিরক্ষিতম্ ॥১০॥
অয়নেষু চ সর্বেষু যথাভাগমবস্থিতাঃ ।
ভীষ্মমেবাভিরক্ষন্ত্ত ভবন্তঃ সর্ব এব হি ॥১১
তস্য সঞ্জনয়ন্ হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ ।
সিংহনাদং বিনদ্যোচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্ ॥১২॥
ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ ।
সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোভবৎ ॥১৩॥
পণব /বিশেষ্য পদ/ ঢোল জাতীয় প্রাচীন বাদ্যবিশেষ।
আনক /বিশেষ্য পদ/ ঢাক, ভেরী, মৃদঙ্গ।
ততঃ শ্বেতৈর্হয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ ।
মাধবঃ পান্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ ॥১৪॥
শঙ্খ
ইংরেজিতে, এই প্রজাতির খোলস "দিব্য শঙ্খ" বা "পবিত্র চাঙ্ক" নামে পরিচিত। এটিকে সহজভাবে "চাঁক" বা শঙ্খও বলা যেতে পারে। শাঙ্কের দুটি রূপ রয়েছে: একটি সাধারণ রূপ যা "ডান-টার্নিং" বা প্যাটার্নে ডেক্সট্রাল, এবং খুব কমই বিপরীত কুণ্ডলী বা "বাম-বাঁক" বা সিনিস্ট্রালের মুখোমুখি হয়। [ এর কুণ্ডলীর দিক অনুসারে, শাঁখার দুটি জাত রয়েছে: বামাবর্ত ("বাম-বাঁক" যেমন ছিদ্র উপরের দিকে দেখা যায়): "প্রজাতির খুব সাধারণভাবে ঘটতে থাকা ডেক্সট্রাল ফর্ম, যেখানে শেল কুণ্ডলী বা ঘূর্ণি ঘড়ির কাঁটার দিকে সর্পিলভাবে প্রসারিত হয় যখন খোলের শীর্ষ থেকে দেখা হয়। " হিন্দু ধর্মে, একটি দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ অসীম স্থানের প্রতীক এবং বিষ্ণুর সাথে যুক্ত। বামাবর্ত শঙ্খ প্রকৃতির নিয়মের উল্টো দিকের প্রতিনিধিত্ব করে এবং শিবের সাথে যুক্ত । দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ হল "প্রজাতির একটি অত্যন্ত বিরল সিনিস্ট্রাল রূপ, যেখানে খোলের কুণ্ডলী বা ঘূর্ণিগুলি খোলের শীর্ষ থেকে দেখা হলে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সর্পিলভাবে প্রসারিত হয়।" দক্ষিণাবর্ত শঙ্খকে সমৃদ্ধি দেবী লক্ষ্মীর বাসস্থান বলে মনে করা হয় - বিষ্ণুর সহধর্মিণী, এবং তাই এই ধরনের শাঁখাকে ঔষধি ব্যবহারের জন্য আদর্শ বলে মনে করা হয়। এটি ভারত মহাসাগরের একটি খুব বিরল জাত । এই ধরনের শাঁখার ছিদ্রের প্রান্তে এবং কলুমেলার উপরে তিন থেকে সাতটি শিলা দেখা যায় এবং এর একটি বিশেষ অভ্যন্তরীণ গঠন রয়েছে। এই ধরণের ডান সর্পিল গ্রহের গতি প্রতিফলিত করে। এটিকে বুদ্ধের মাথার চুলের সাথে তুলনা করা হয় যা ডানদিকে সর্পিল। বুদ্ধের ভ্রুর মধ্যবর্তী লম্বা সাদা কোঁকড়া এবং তাঁর নাভির শঙ্খের মতো ঘূর্ণিও এই শঙ্খের অনুরূপ। বরাহ পুরাণ বলে যে দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ দিয়ে স্নান করলে পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। স্কন্দ পুরাণ বর্ণনা করে যে এই শঙ্খ দিয়ে বিষ্ণুকে স্নান করালে সাতটি জীবনের পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। একটি দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ একটি বিরল "রত্ন" বা রত্ন হিসাবে বিবেচিত হয় এবং মহান গুণাবলী দ্বারা সজ্জিত। এটি দীর্ঘায়ু, খ্যাতি এবং সম্পদকে এর উজ্জ্বলতা, শুভ্রতা এবং বিশালতার সমানুপাতিকভাবে প্রদান করে বলেও বিশ্বাস করা হয়। এই ধরনের শাঁখায় ত্রুটি থাকলেও তা সোনায় বসিয়ে দিলে শঙ্খের গুণাগুণ পুনরুদ্ধার হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। [ এর প্রথম দিকের উল্লেখগুলিতে, শঙ্খকে একটি শিঙা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই আকারে এটি বিষ্ণুর প্রতীক হয়ে উঠেছে। একই সাথে, এটি একটি ভক্তিমূলক নৈবেদ্য হিসাবে এবং সমুদ্রের বিপদগুলি দূরে রাখার জন্য একটি কবজ হিসাবে ব্যবহৃত হত। এটি শব্দের প্রকাশ হিসাবে প্রাচীনতম শব্দ-উৎপাদনকারী সংস্থা ছিল এবং অন্যান্য উপাদানগুলি পরে এসেছিল, তাই এটিকে উপাদানগুলির উত্স হিসাবে গণ্য করা হয়। এটা উপাদান নিজেদের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয় । একটি ট্রাম্পেট বা বাতাসের যন্ত্র তৈরি করতে, কেউ শঙ্খের শীর্ষের অগ্রভাগের কাছে একটি গর্ত ড্রিল করে । যখন এই গর্ত দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হয়, তখন এটি শঙ্খের ভোঁদড়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, একটি উচ্চ, তীক্ষ্ণ, তীক্ষ্ণ শব্দ উৎপন্ন করে। এই ধ্বনিটির কারণেই সাহায্যকারী এবং বন্ধুদের ডেকে আনার জন্য শঙ্খকে যুদ্ধের ট্রাম্পেট হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। শঙ্ক দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধে ব্যবহৃত হতে থাকে। এটি যে ধ্বনি উৎপন্ন করেছিল তার নাম ছিল শঙ্কনদ । [ উদ্ধৃতি প্রয়োজন ] আজকাল, হিন্দু মন্দির এবং বাড়িতে পূজার সময় শঙ্খ ফুঁকানো হয়, বিশেষ করে হিন্দু আরতির আচারে , যখন দেবতাদের আলো দেওয়া হয়। শঙ্খ দেবতাদের, বিশেষ করে বিষ্ণুর মূর্তি স্নান করতে এবং ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের জন্যও ব্যবহৃত হয়। এই উদ্দেশ্যে কোনও গর্ত ড্রিল করা হয় না, যদিও অ্যাপারচারটি পরিষ্কার করা হয় বা খুব কমই ঘূর্ণি কাটা হয় পাঁচটি মুখের সাথে পরপর পাঁচটি খোলস উপস্থাপন করার জন্য। শাঁখা চুড়ি, ব্রেসলেট এবং অন্যান্য জিনিস তৈরিতে উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এটির জলজ উৎপত্তি এবং ভালভার সাথে সাদৃশ্য থাকার কারণে, এটি তান্ত্রিক আচারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে, এর প্রতীকবাদকেও বলা হয় যে এটি নারীর উর্বরতার প্রতিনিধিত্ব করে। যেহেতু জল নিজেই একটি উর্বরতার প্রতীক, তাই শঙ্খ, যা একটি জলজ পণ্য, মহিলা উর্বরতার প্রতীক হিসাবে স্বীকৃত। প্রাচীন গ্রীসে , মুক্তো সহ শাঁসকে যৌন প্রেম এবং বিবাহ এবং মাতৃদেবী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন জাদু এবং যাদুবিদ্যা আইটেম এছাড়াও ঘনিষ্ঠভাবে এই ট্রাম্পেট সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়. বৌদ্ধ যুগের অনেক আগে থেকেই এই ধরনের যন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল ।
বামাবর্ত ("বাম-বাঁক" যেমন ছিদ্র উপরের দিকে দেখা যায়): "প্রজাতির খুব সাধারণভাবে ঘটতে থাকা ডেক্সট্রাল ফর্ম, যেখানে শেল কুণ্ডলী বা ঘূর্ণি ঘড়ির কাঁটার দিকে সর্পিলভাবে প্রসারিত হয় যখন খোলের শীর্ষ থেকে দেখা হয়। " হিন্দু ধর্মে, একটি দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ অসীম স্থানের প্রতীক এবং বিষ্ণুর সাথে যুক্ত। বামাবর্ত শঙ্খ প্রকৃতির নিয়মের উল্টো দিকের প্রতিনিধিত্ব করে এবং শিবের সাথে যুক্ত । দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ হল "প্রজাতির একটি অত্যন্ত বিরল সিনিস্ট্রাল রূপ, যেখানে খোলের কুণ্ডলী বা ঘূর্ণিগুলি খোলের শীর্ষ থেকে দেখা হলে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সর্পিলভাবে প্রসারিত হয়।" দক্ষিণাবর্ত শঙ্খকে সমৃদ্ধি দেবী লক্ষ্মীর বাসস্থান বলে মনে করা হয় - বিষ্ণুর সহধর্মিণী, এবং তাই এই ধরনের শাঁখাকে ঔষধি ব্যবহারের জন্য আদর্শ বলে মনে করা হয়। এটি ভারত মহাসাগরের একটি খুব বিরল জাত । এই ধরনের শাঁখার ছিদ্রের প্রান্তে এবং কলুমেলার উপরে তিন থেকে সাতটি শিলা দেখা যায় এবং এর একটি বিশেষ অভ্যন্তরীণ গঠন রয়েছে। এই ধরণের ডান সর্পিল গ্রহের গতি প্রতিফলিত করে। এটিকে বুদ্ধের মাথার চুলের সাথে তুলনা করা হয় যা ডানদিকে সর্পিল। বুদ্ধের ভ্রুর মধ্যবর্তী লম্বা সাদা কোঁকড়া এবং তাঁর নাভির শঙ্খের মতো ঘূর্ণিও এই শঙ্খের অনুরূপ। বরাহ পুরাণ বলে যে দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ দিয়ে স্নান করলে পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। স্কন্দ পুরাণ বর্ণনা করে যে এই শঙ্খ দিয়ে বিষ্ণুকে স্নান করালে সাতটি জীবনের পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। একটি দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ একটি বিরল "রত্ন" বা রত্ন হিসাবে বিবেচিত হয় এবং মহান গুণাবলী দ্বারা সজ্জিত। এটি দীর্ঘায়ু, খ্যাতি এবং সম্পদকে এর উজ্জ্বলতা, শুভ্রতা এবং বিশালতার সমানুপাতিকভাবে প্রদান করে বলেও বিশ্বাস করা হয়। এই ধরনের শাঁখায় ত্রুটি থাকলেও তা সোনায় বসিয়ে দিলে শঙ্খের গুণাগুণ পুনরুদ্ধার হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। [ এর প্রথম দিকের উল্লেখগুলিতে, শঙ্খকে একটি শিঙা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই আকারে এটি বিষ্ণুর প্রতীক হয়ে উঠেছে। একই সাথে, এটি একটি ভক্তিমূলক নৈবেদ্য হিসাবে এবং সমুদ্রের বিপদগুলি দূরে রাখার জন্য একটি কবজ হিসাবে ব্যবহৃত হত। এটি শব্দের প্রকাশ হিসাবে প্রাচীনতম শব্দ-উৎপাদনকারী সংস্থা ছিল এবং অন্যান্য উপাদানগুলি পরে এসেছিল, তাই এটিকে উপাদানগুলির উত্স হিসাবে গণ্য করা হয়। এটা উপাদান নিজেদের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয় । একটি ট্রাম্পেট বা বাতাসের যন্ত্র তৈরি করতে, কেউ শঙ্খের শীর্ষের অগ্রভাগের কাছে একটি গর্ত ড্রিল করে । যখন এই গর্ত দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হয়, তখন এটি শঙ্খের ভোঁদড়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, একটি উচ্চ, তীক্ষ্ণ, তীক্ষ্ণ শব্দ উৎপন্ন করে। এই ধ্বনিটির কারণেই সাহায্যকারী এবং বন্ধুদের ডেকে আনার জন্য শঙ্খকে যুদ্ধের ট্রাম্পেট হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। শঙ্ক দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধে ব্যবহৃত হতে থাকে। এটি যে ধ্বনি উৎপন্ন করেছিল তার নাম ছিল শঙ্কনদ । [ উদ্ধৃতি প্রয়োজন ] আজকাল, হিন্দু মন্দির এবং বাড়িতে পূজার সময় শঙ্খ ফুঁকানো হয়, বিশেষ করে হিন্দু আরতির আচারে , যখন দেবতাদের আলো দেওয়া হয়। শঙ্খ দেবতাদের, বিশেষ করে বিষ্ণুর মূর্তি স্নান করতে এবং ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের জন্যও ব্যবহৃত হয়। এই উদ্দেশ্যে কোনও গর্ত ড্রিল করা হয় না, যদিও অ্যাপারচারটি পরিষ্কার করা হয় বা খুব কমই ঘূর্ণি কাটা হয় পাঁচটি মুখের সাথে পরপর পাঁচটি খোলস উপস্থাপন করার জন্য। শাঁখা চুড়ি, ব্রেসলেট এবং অন্যান্য জিনিস তৈরিতে উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এটির জলজ উৎপত্তি এবং ভালভার সাথে সাদৃশ্য থাকার কারণে, এটি তান্ত্রিক আচারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে, এর প্রতীকবাদকেও বলা হয় যে এটি নারীর উর্বরতার প্রতিনিধিত্ব করে। যেহেতু জল নিজেই একটি উর্বরতার প্রতীক, তাই শঙ্খ, যা একটি জলজ পণ্য, মহিলা উর্বরতার প্রতীক হিসাবে স্বীকৃত। প্রাচীন গ্রীসে , মুক্তো সহ শাঁসকে যৌন প্রেম এবং বিবাহ এবং মাতৃদেবী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন জাদু এবং যাদুবিদ্যা আইটেম এছাড়াও ঘনিষ্ঠভাবে এই ট্রাম্পেট সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়. বৌদ্ধ যুগের অনেক আগে থেকেই এই ধরনের যন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল । আয়ুর্বেদ শঙ্খ অনেক রোগের চিকিৎসায় আয়ুর্বেদ ঔষধি সূত্রে ব্যবহৃত হয় । খোসা উপাদান থেকে তৈরি একটি পাউডার পেটের রোগের চিকিৎসা হিসেবে আয়ুর্বেদে ব্যবহৃত হয়। এটি শঙ্খের ছাই হিসাবে প্রস্তুত করা হয়, যা সংস্কৃতে শঙ্খ ভস্ম নামে পরিচিত , যা খোসাকে চুনের রসে ভিজিয়ে এবং 10 থেকে 12 বার আচ্ছাদিত ক্রুসিবলে ক্যালসিনেট করে এবং অবশেষে এটিকে গুঁড়ো ছাইতে পরিণত করে প্রস্তুত করা হয়। শাঁখার ছাইতে ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ম্যাগনেসিয়াম থাকে এবং এটি অ্যান্টাসিড এবং হজমের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বলে মনে করা হয়। তাৎপর্য ত্রাভাঙ্কোরের পূর্ববর্তী রাজ্যের পতাকায় একটি পবিত্র শঙ্খ শঙ্খের ধ্বনি পবিত্র ওম ধ্বনির প্রতীক। শঙ্খ ধারণ করা বিষ্ণু তাকে শব্দের দেবতা হিসাবে উপস্থাপন করে। ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ ঘোষণা করে যে শঙ্খ হল লক্ষ্মী এবং বিষ্ণু উভয়েরই বাসস্থান, শঙ্খের দ্বারা পরিচালিত জল দ্বারা স্নান করাকে একযোগে সমস্ত পবিত্র জলে স্নানের মতো মনে করা হয়। শঙ্খ সদমা পুরাণ ঘোষণা করে যে বিষ্ণুর মূর্তিকে গরুর দুধ দিয়ে স্নান করা লক্ষ যজ্ঞ (অগ্নি বলি) করার মতোই পুণ্যময় এবং গঙ্গা নদীর জলে বিষ্ণুকে স্নান করা জন্মের চক্র থেকে মুক্তি দেয়। এতে আরও বলা হয়েছে, "যখন শঙ্খের (শঙ্খ) কেবল দর্শনই সমস্ত পাপ দূর করে যেমন সূর্য কুয়াশা দূর করে, তবে এর পূজার কথা কেন?" পদ্ম পুরাণ গঙ্গার জল এবং দুধ দ্বারা বিষ্ণুকে স্নানের একই প্রভাব বলে দাবি করে এবং আরও যোগ করে যে এটি করা মন্দকে এড়িয়ে যায়, বিষ্ণুর মূর্তিটির আগে নিজের মাথায় শঙ্খ থেকে জল ঢেলে দেওয়া গঙ্গা নদীতে স্নানের সমতুল্য। বৌদ্ধধর্মে , শঙ্খকে আটটি শুভ প্রতীকের একটি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাকে অষ্টমঙ্গলাও বলা হয় । ডানদিকে বাঁকানো সাদা শঙ্খ খোল ( তিব্বতি : དུང་གྱས་འཁྱིལ , Wylie : dung gyas' Khyil ), মার্জিত, গভীর, সুরেলা, আন্তঃপ্রবেশকারী এবং গভীর শব্দের বিচ্ছিন্নতাপূর্ণ শব্দের প্রতিনিধিত্ব করে অজ্ঞতার ঘুম এবং তাদের নিজেদের কল্যাণ এবং অন্যের কল্যাণ সাধন করার জন্য তাদের আহ্বান জানায়। [ উদ্ধৃতি প্রয়োজন ] শাঁখা ছিল ত্রাভাঙ্কোরের রাজকীয় রাষ্ট্রীয় প্রতীক এবং জাফনা রাজ্যের রাজকীয় পতাকায়ও চিত্রিত ছিল । এটি ভারতীয় রাজনৈতিক দল বিজু জনতা দলের নির্বাচনী প্রতীকও । শিখ যোদ্ধারাও যুদ্ধ শুরু করার আগে শাঁখা ব্যবহার করত। আরতি আরতা প্রার্থনা করার সময় সমস্ত নিহঙ্গদের দ্বারা এখনও মর্যাদা অনুশীলন করা হয় এবং হোলা মহল্লা উৎসবেও ব্যবহৃত হয়। শঙ্খ ( পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের প্রধান দেবতার শঙ্খের প্রতিনিধিত্ব করে এটি ভারতের কেরালা রাজ্যের রাষ্ট্রীয় প্রতীকের একটি অংশ । প্রতীকটি ভারতীয় রাজকীয় রাজ্য ত্রাভাঙ্কোর এবং কোচিন রাজ্যের পূর্ববর্তী প্রতীক থেকে উদ্ভূত হয়েছিল । শঙ্খ বিষ্ণুর অন্যতম প্রধান গুণ। বিষ্ণুর মূর্তি, হয় বসা বা দাঁড়ানো ভঙ্গিতে, দেখায় যে তাকে সাধারণত তার বাম হাতে শঙ্খ ধারণ করে, যখন সুদর্শন চক্র ( চক্র - চাকতি), গদা (গদা) এবং পদ্ম (পদ্ম ফুল) তার উপরের ডানদিকে, নীচের বাম দিকে সাজায়। নীচের ডান হাত, যথাক্রমে। বিষ্ণুর অবতার যেমন মৎস্য , কুরমা , বরাহ এবং নরসিংহকেও বিষ্ণুর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সাথে শাঁখা ধারণ করা হয়েছে। কৃষ্ণ - বিষ্ণুর অবতার বর্ণনা করা হয়েছে যাকে পাঞ্চজন্য নামক একটি শঙ্খ রয়েছে। জগন্নাথ এবং বিঠোবার মতো আঞ্চলিক বিষ্ণু রূপগুলিও শঙ্খ ধারণ করে চিত্রিত হতে পারে। বিষ্ণু ছাড়াও অন্যান্য দেবতাদেরও শঙ্খ ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সূর্য দেবতা সূর্য , ইন্দ্র – স্বর্গের রাজা এবং বৃষ্টির দেবতা যুদ্ধের দেবতা কার্তিকেয় , দেবী বৈষ্ণবী এবং যোদ্ধা দেবী দুর্গা একইভাবে, গজা লক্ষ্মী মূর্তিগুলিতে লক্ষ্মীকে ডান হাতে একটি শঙ্খ এবং অন্য হাতে পদ্ম ধারণ করা দেখায়। কখনও কখনও, ভাস্কর্যে বিষ্ণুর শঙ্খকে আয়ুধপুরুষ "অস্ত্র-পুরুষ" হিসাবে চিত্রিত করা হয় এবং বিষ্ণু বা তার অবতারদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ হিসাবে চিত্রিত করা হয়। এই অধস্তন ব্যক্তিকে শঙ্খপুরুষ বলা হয় যাকে উভয় হাতে শঙ্খ ধারণ করা হয়েছে। মন্দিরের স্তম্ভ, দেয়াল, গোপুরাম (টাওয়ার), বেসমেন্ট এবং মন্দিরের অন্য কোথাও, শঙ্খ ও চক্রের ভাস্কর্য চিত্র – বিষ্ণুর প্রতীক – দেখা যায়। পুরী শহরটি শঙ্খ-ক্ষেত্র নামেও পরিচিত, কখনও কখনও এটির কেন্দ্রে জগন্নাথ মন্দিরের সাথে শিল্পে শঙ্খ বা শঙ্খ হিসাবে চিত্রিত করা হয় । শালিগ্রামে পাওয়া চারটি চিহ্নের মধ্যে শাঙ্ক হল একটি , বিশেষ করে নেপালের গণ্ডকী নদীতে পাওয়া একটি মূর্তিচিত্রের জীবাশ্ম পাথর যা হিন্দুরা বিষ্ণুর প্রতিনিধি হিসেবে পূজা করে। হিন্দু পুরাণ ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণে একটি হিন্দু কিংবদন্তি শঙ্খের সৃষ্টির কথা স্মরণ করে: শিব অসুরদের দিকে একটি ত্রিশূল নিক্ষেপ করেছিলেন , তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাদের ছাই সমুদ্রে উড়ে গিয়ে শঙ্খ তৈরি করে। শঙ্খকে লক্ষ্মীর ভাই বলে মনে করা হয় কারণ উভয়েরই জন্ম সমুদ্র থেকে। একটি কিংবদন্তীতে শঙ্খাসুর নামে একজন অসুরের বর্ণনা রয়েছে , যিনি বিষ্ণুর মৎস্য অবতার মৎস্য দ্বারা নিহত হন । সাগর মন্থনের সময় যে কয়টি পদার্থের উদ্ভব হয়েছিল তার মধ্যে শঙ্খ পাঞ্চজন্য অন্যতম । রামায়ণ এবং মহাভারতের হিন্দু মহাকাব্যে , শাংখের প্রতীক ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে । রামায়ণ মহাকাব্যে, লক্ষ্মণ , ভরত এবং শত্রুঘ্নকে যথাক্রমে শেশ , সুদর্শন চক্র এবং পাঞ্চজন্যের অংশ-অবতার হিসাবে বিবেচনা করা হয় , যেখানে রাম , তাদের জ্যেষ্ঠ ভাই, দশাবতারের একজন, বিষ্ণুর দশ অবতার হিসাবে বিবেচিত হয় । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় , কৃষ্ণ, পাণ্ডব রাজপুত্রের সারথি এবং মহাকাব্যের একজন নায়ক - অর্জুন - যুদ্ধ ঘোষণা করতে পাঞ্চজন্যকে ধ্বনিত করেন। সংস্কৃতে পঞ্চজন্য মানে 'পাঁচ শ্রেণীর প্রাণীর উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা'। পাঁচ পাণ্ডব ভাইদেরই তাদের নিজস্ব শাঁখা বর্ণনা করা হয়েছে। যুধিষ্ঠির , ভীম , অর্জুন, নকুল এবং সহদেবকে যথাক্রমে অনন্ত-বিজয়া, পাউন্ড্র-খড়্গ, দেবদত্ত, সুঘোষ এবং মণি-পুষ্পক নামে শঙ্খের অধিকারী বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ভগবদ্গীতায় পাণ্ডব ও কৌরবদের বিভিন্ন শঙ্খের নাম উল্লেখ করা হয়েছে: তারপর, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শঙ্খ বাজিয়েছিলেন, যার নাম পঞ্চজন্য; অর্জুন উড়িয়ে দিলেন দেবদত্তকে; এবং ভীম, ভোজনকারী এবং অতিশয় কর্ম সম্পাদনকারী, পাউন্ডরাম নামক তার ভয়ঙ্কর শঙ্খ বাজিয়েছিলেন কুন্তীর পুত্র রাজা যুধিষ্ঠির অনন্তবিজয় শঙ্খ বাজালেন এবং নকুল ও সহদেব সুঘোষ ও মণিপুস্পককে বাজালেন। সেই মহান ধনুর্ধারী কাশীর রাজা, মহান যোদ্ধা শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট এবং অজেয় সাত্যকি, দ্রুপদ, দ্রৌপদীর পুত্ররা এবং অন্যান্যরা, হে রাজা, সুভদ্রার পুত্র প্রভূত অস্ত্রে সজ্জিত, সকলেই নিজ নিজ শঙ্খ ফুঁকলেন। নাগাদের সাথে মেলামেশা জলের সাথে শঙ্খের যোগসূত্রের কারণে, নাগদের (সর্প) প্রায়ই শঙ্খের নামকরণ করা হয়। মহাভারত , হরিবংশ এবং ভাগবত পুরাণে নাগের তালিকায় রয়েছে শঙ্খ, মহাশঙ্খ, শঙ্খপাল এবং শঙ্কচুদা। শেষ দুটি বৌদ্ধ জাতক কাহিনী এবং জিমুতাবাহনেও উল্লেখ করা হয়েছে । [ 36 ] একটি কিংবদন্তি বলে যে ধ্যানমূলক আচারের অংশ হিসাবে একটি শঙ্খ ব্যবহার করার সময়, কেওলি গ্রামের জঙ্গলে একজন সাধু তার শাঁখাটি উড়িয়ে দেন এবং সেখান থেকে একটি সাপ বেরিয়ে আসে। সাপ সাধুকে নির্দেশ দিয়েছিল যে তাকে নাগা দেবতা (সর্প দেবতা) হিসাবে পূজা করা উচিত এবং তারপর থেকে এটি শঙ্কু নাগা নামে পরিচিত। হিমাচল প্রদেশের কুল্লু জেলার আরও অনেক জায়গায় অনুরূপ কিংবদন্তি বর্ণিত হয়েছে ।মহাভারতে কৃষ্ণ
হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে
, কৃষ্ণ হলেন যদুবংশ প্রধান বাসুদেব এবং তাঁর স্ত্রী দেবকীর পুত্র । তিনি তার উপাধি,
বাসুদেব দ্বারাও ব্যাপকভাবে পরিচিত ।
কৃষ্ণ একজন রাজনৈতিক সংস্কারক
হিসেবেঃ
সুরসেন রাজ্যের রাজা কমসাকে
উৎখাত করার প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন কৃষ্ণ । শূরসেনের রাজ্য ছিল অন্ধক, বৃষ্ণী
ও ভোজদের দ্বারা গঠিত যাদব বংশের আদি রাজ্য। কংসকে উৎখাত করে, কৃষ্ণ পুরানো রাজা উগ্রসেনকে
সিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং রাজ্যের মধ্যে দলগত লড়াইয়ের কারণে রাজ্যকে পতন
থেকে স্থিতিশীল করেন।
পরবর্তী হুমকি এলো দেশের
বাইরে থেকে, মগধ রাজ্য থেকে । মগধের শাসক জরাসন্ধ সুরসেনকে বহুবার আক্রমণ করে তার সৈন্যবাহিনীকে
দুর্বল করে দিয়েছিল। কৃষ্ণ এবং অন্যান্য যাদব প্রধানরা সকলেই ধরে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা
করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাদের নিজ রাজ্য থেকে দক্ষিণ ও পশ্চিমে পালাতে হয়েছিল।
পরে, কৃষ্ণের উদ্যোগে,
সুরসেন থেকে পালিয়ে আসা যাদবরা দ্বারক নামে একটি নতুন রাজ্য গঠন করে । এর রাজধানী
ছিল দ্বারাবতী, গুজরাট উপকূল থেকে দূরে নয় এমন একটি দ্বীপে চারদিকে পাহাড় দ্বারা
সুরক্ষিত একটি শহর । এটি ভূমি থেকে আক্রমণ থেকে প্রতিরোধী করে তোলে। সামুদ্রিক রাজ্যগুলির
সাথে সমুদ্র বাণিজ্যের মাধ্যমে রাজ্যটি সমৃদ্ধ হয়েছিল।
কৃষ্ণ পান্ডবদের সাথেও
যাদবদের একটি জোট স্থাপন করেছিলেন , কুরুদের একটি দল , যারা প্রতিষ্ঠিত কুরু রাজ্যের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল । এই জোট কৌশলগতভাবে যাদবদেরও লাভবান করেছিল। পাণ্ডবদের সাহায্যে
তারা মগধের রাজা জরাসন্ধকে উৎখাত করেন যিনি ছিলেন তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। এই সহায়তার
জন্য, কৃষ্ণ পাণ্ডবদের দুর্যোধনের নেতৃত্বে কুরুদের বিরুদ্ধে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে জয়ী
হতে সাহায্য করেছিলেন । এইভাবে পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের শাসন কৃষ্ণ ইন্দ্রপ্রস্থে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত
করেছিলেন , যাকে আধুনিক দিল্লি বলে মনে করা হয় ।
যাইহোক, যাদব প্রধানরা
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে উভয় পক্ষেই লড়াই করেছিল এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও যাদব নেতাদের
মধ্যে শত্রুতা অব্যাহত ছিল। 36 বছর পর, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর থেকে, যাদবদের নিজেদের
রাজ্যে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে দ্বারকায় যাদব রাজ্যের সম্পূর্ণ বিনাশ ঘটে,
বলরাম এবং কৃষ্ণও শোকের কারণে প্রস্থান করেন। যাদবের মধ্যে এই লড়াইয়ের জন্যও দুর্যোধনের
মা গান্ধারীর কাছ থেকে কৃষ্ণের অভিশাপের জন্য দায়ী করা হয় ।
কিন্তু কৃষ্ণ পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরকে
যে সাহায্য করেছিলেন , তা শোধ হয়ে গেল। যুধিষ্ঠিরের শাসনের অবসান হলে, তিনি হস্তিনাপুরে
কুরু রাজকুমার পরীক্ষিতের সাথে যাদব রাজকুমার বজ্রকে দ্বারকের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন
। এইভাবে যাদবদের রাজকীয় বংশ অনিরুদ্ধের পুত্র, যুবরাজ বজ্র , কৃষ্ণের প্রপৌত্র এবং
প্রদ্যুম্নের নাতির মাধ্যমে অব্যাহত ছিল । পরীক্ষিত ছিলেন অভিমন্যুর পুত্র এবং অর্জুনের
নাতি ।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রস্তুতিঃ
( মহাভারত , বই 5, অধ্যায়
5) যেহেতু আমরা একটি রাজনৈতিক পথ অবলম্বন করতে আগ্রহী, এটি নিঃসন্দেহে আমাদের প্রথম
কর্তব্য; অন্যথায় অভিনয় করা একজন মানুষ বড় বোকা হবে। কিন্তু কুরু এবং পান্ডু উভয়ের
সাথে আমাদের সম্পর্ক সমান, এই দুই পক্ষ একে অপরের সাথে যতই আচরণ করুক না কেন। কুরু
জাতির সেই প্রধান যদি ন্যায়সঙ্গত শর্তে শান্তি স্থাপন করে, তবে কুরা এবং পান্ডুদের
মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধে কোন আঘাত হবে না। অন্যদিকে, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র যদি উদ্ধত হয়
এবং মূর্খতা থেকে সন্ধি করতে অস্বীকার করে, তবে অন্যকে ডেকে নিয়ে আমাদেরও ডেকে পাঠান।
গাণ্ডীবের ধারক তখন ক্রোধে বরখাস্ত হবে এবং নিস্তেজ মাথার এবং দুষ্ট দুর্যোধন, তার
পক্ষপাতিত্ব এবং বন্ধুদের সাথে যা তার ভাগ্য পূরণ করবে।
অর্জুন এবং দুর্যোধন উভয়ের জন্য যুদ্ধে সাহায্যের প্রস্তাবঃ
( মহাভারত , বই 5, অধ্যায়
7) দশ লক্ষ সংখ্যার গোয়ালের একটি বিশাল দল রয়েছে, যা আমাকে শক্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বী
করে এবং নারায়ণ নামে পরিচিত, যাদের সকলেই যুদ্ধের ঘনঘটায় যুদ্ধ করতে সক্ষম। এই সৈন্যরা,
যুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য, তোমাদের একজনের কাছে পাঠানো হবে এবং আমি একা, ময়দানে যুদ্ধ না
করার সংকল্প করেছি, এবং আমার অস্ত্র রেখে, অন্যের কাছে যাবে। আপনি, প্রথমে, এই দুটির
মধ্যে যেটি আপনার কাছে নিজেকে প্রশংসিত করে তা নির্বাচন করতে পারেন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ প্রতিরোধে শান্তি
মিশনঃ
( মহাভারত , পুস্তক 5, অধ্যায়
83) আমি রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে যাব, যা ধার্মিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা আমাদের
জন্য উপকারী এবং যা কুরুদের মঙ্গলের জন্যও তা সম্পন্ন করতে আগ্রহী।
যাদব প্রধানদের মধ্যে রাজনীতিঃ
হস্তিনাপুরে পাণ্ডবদের দূত হিসেবে কৃষ্ণ, জয়পুরের আকবর রাজনামার
শিল্পী জগানা ফোলিও।
( মহাভারত , বই 12, অধ্যায় 80) আমি কখনই আমার আত্মীয়দের
সমৃদ্ধি সম্পর্কে চাটুকার বক্তৃতা করে তাদের প্রতি দাস আপত্তিজনক আচরণ করি না। আমার
যা আছে তার অর্ধেক আমি তাদের দিয়ে দেই এবং তাদের খারাপ কথাগুলো ক্ষমা করে দিই। আগুন
পেতে ইচ্ছুক ব্যক্তি যেমন আগুনের কাঠি মাটি করে দেয়, তেমনি আমার আত্মীয়দের দ্বারা
তাদের নিষ্ঠুর বক্তব্যে আমার হৃদয় মাটি হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, সেই নিষ্ঠুর বক্তৃতাগুলি
প্রতিদিন আমার হৃদয়কে পোড়ায়। সংকর্ষণে (বলরাম) বসবাস করতে পারে; গাদায় মৃদুতা;
এবং প্রদ্যুম্ন সম্পর্কে, তিনি একজন ব্যক্তির সৌন্দর্যে আমাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। যদিও
আমার পাশে এসব আছে তবুও আমি অসহায়। অন্ধক এবং বৃষ্ণিদের মধ্যে আরও অনেকের মধ্যে প্রচুর
সমৃদ্ধি এবং শক্তি এবং সাহসী সাহস এবং অবিরাম অধ্যবসায় রয়েছে। যার পক্ষে তারা নিজেদের
সীমাবদ্ধ করে না সে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। অন্যদিকে, যার পক্ষে তারা নিজেদের পরিসর
করে, তিনি সবকিছু অর্জন করেন। উভয়ের (যেমন, আহুকা এবং আকরুরা,) দ্বারা অসন্তুষ্ট
(পালাক্রমে) আমি তাদের উভয়ের পক্ষে নেই। একজন ব্যক্তির পক্ষে আহুকা এবং আকরুরা উভয়ের
পক্ষে থাকা এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কী হতে পারে? আবার, একজনের পক্ষে দুজনের পক্ষে না
থাকা তার চেয়ে বেশি বেদনাদায়ক আর কী হতে পারে আমি দুই ভাইয়ের মায়ের মতো একে অপরের
বিরুদ্ধে জুয়া খেলছি, উভয়কে জয়ের আহ্বান জানাচ্ছি। আমি এইভাবে, উভয় দ্বারা পীড়িত.
প্রাগজ্যোতিষ ও শোণিতপুরের পূর্ব
রাজ্যের জয়ঃ
মহাকাব্য মহাভারত কৃষ্ণের দ্বারা সংঘটিত অনেক যুদ্ধ এবং বিভিন্ন
রাজ্যে তাঁর বিজয়ের বর্ণনা দেয়। তিনি ভারতের আসাম রাজ্যের আধুনিক গুয়াহাটিতে প্রাগজ্যোতিষের
রাজা নরকে পরাজিত করেন । তিনি রাজাদের ভৌম বংশের অন্তর্গত ভূমিপুত্র (পৃথিবীর পুত্র)
নামে পরিচিত ছিলেন । তার রাজ্যের নাম ছিল কামরূপ ।
তিনি প্রাগজ্যোতিষের পূর্বে শোণিতপুর ( আসামের শোণিতপুর বলে
বিবেচিত ) বানা বা ভানাও জয় করেছিলেন। যাইহোক, তারা মিত্র হয়ে ওঠে, কারণ কৃষ্ণের
নাতি অনিরুদ্ধ বানার কন্যা ঊষাকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি অসুরদের দৈত্য বংশের অন্তর্ভুক্ত
ছিলেন ।
( মহাভারত , বই 5, অধ্যায় 62), কৃষ্ণকে বন ও ভূমির পুত্র
(নারক) হত্যাকারী হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
( মহাভারত , পুস্তক 5, অধ্যায় 130) তিনি জরাসন্ধ, বক্র এবং
পরাক্রমশালী শক্তির শিশুপালকে এবং যুদ্ধে বন এবং অন্যান্য অসংখ্য রাজাকেও তার দ্বারা
বধ করেছেন। অসীম শক্তিতে তিনি রাজা বরুণ এবং পাবক, ইন্দ্র, মধু এবং কৈতভ ও হায়গ্রীবকে
পরাজিত করেছিলেন।
বিদর্ভ, গান্ধার ও পাণ্ড্য জয়ঃ
( মহাভারত , বই 5, অধ্যায় 48) ... যে বাসুদেব ( কৃষ্ণ
), অর্থাৎ, যিনি প্রধান শক্তি দ্বারা ভোজা জাতির সমস্ত রাজকীয় যোদ্ধাদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে
পড়েছিলেন, তিনি একটি মাত্র গাড়িতে চড়েছিলেন রুক্মিণী (রাজকুমারী) বিদর্ভ) তাকে স্ত্রী
বানানোর জন্য দারুণ খ্যাতি। এবং তার দ্বারা পরবর্তীতে উচ্চ আত্মার প্রদ্যুম্ন জন্মগ্রহণ
করেন ।
( মহাভারত , বই 7, অধ্যায় 11) কৃষ্ণ , স্ব-পছন্দে সমস্ত
রাজাকে পরাজিত করে, গান্ধার রাজার কন্যাকে জন্ম দিয়েছিলেন। সেই রাগান্বিত রাজারা যেন
জন্মগতভাবে ঘোড়ার মতো, তার বিবাহের গাড়িতে জোঁক দেওয়া হয়েছিল এবং চাবুক দিয়ে বিদ্ধ
করা হয়েছিল।
( মহাভারত , বই 7, অধ্যায় 23) পান্ড্য রাজা সারঙ্গধ্বজ দেশ
আক্রমণ করে এবং তার আত্মীয়রা পালিয়ে যাওয়ার পর, তার পিতা যুদ্ধে কৃষ্ণের হাতে নিহত
হন । তখন ভীষ্ম ও দ্রোণ , রাম ও কৃপের কাছ থেকে অস্ত্র পেয়ে রাজকুমার সারঙ্গধ্বজ অস্ত্রে
রুক্মী ও কর্ণ এবং অর্জুন ও অচ্যুতের সমতুল্য হয়ে ওঠেন । তখন তিনি দ্বারকা নগরীকে
ধ্বংস করে সমগ্র বিশ্বকে বশীভূত করতে চেয়েছিলেন। তবে, বিজ্ঞ বন্ধুরা তাকে ভালো করার
আকাঙ্ক্ষা থেকে তাকে সেই পথের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিয়েছিল। প্রতিশোধের সমস্ত চিন্তা
ত্যাগ করে, তিনি নিজের আধিপত্য শাসন করেছিলেন।
দার্শনিক হিসেবে কৃষ্ণঃ
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে কৃষ্ণ অর্জুনকে 'উপদেশ' প্রদান
করেন ।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় তার বন্ধু এবং চাচাতো ভাই অর্জুনের
সাথে কৃষ্ণের দার্শনিক কথোপকথন পরে হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ, বিখ্যাত ভগবদ্গীতা নামে
পরিচিত হয় । কীভাবে তিনি এই মহান জ্ঞান সংগ্রহ করেছিলেন তা মহাভারতের অনুগীতা অধ্যায়ে
প্রকাশিত হয়েছে , যেখানে বলা হয়েছে যে তিনি এই জ্ঞানটি অনেক পণ্ডিত পুরুষের সাথে
আলাপচারিতার মাধ্যমে এবং নিজের ধ্যানের মাধ্যমে পেয়েছিলেন। তিনি ঋষি সন্দীপনি, বৃহস্পতি
প্রমুখ মহান শিক্ষকদের কাছ থেকেও শিক্ষা লাভ করেন।
কৃষ্ণের জ্ঞানের সম্ভাব্য উৎসঃ
কৃষ্ণ একটি নির্দিষ্ট ব্রাহ্মণের কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের
উল্লেখ করেছেন
মহাভারতের একটি 18 শতকের পাণ্ডুলিপি ।
( মহাভারত , বই 14, অধ্যায় 16) এক অনুষ্ঠানে একজন ব্রাহ্মণ
আমাদের কাছে আসেন। অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে, তিনি বৃষের অঞ্চল থেকে এসেছিলেন। তিনি আমাদের
দ্বারা যথাযথভাবে শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। আমাদের জিজ্ঞাসার উত্তরে তিনি যা বলেছেন তা শুনুন।
ব্রাহ্মণ বললেন, "হে কৃষ্ণ, তুমি আমাকে যা চেয়েছিলে, মোক্ষের ধর্মের সাথে যুক্ত
, তোমার মমতার দ্বারা পরিচালিত হয় সমস্ত প্রাণীর প্রতি, তোমার নিজের মঙ্গলের জন্য
নয়, - যা প্রকৃতপক্ষে সমস্ত ভ্রমকে ধ্বংস করে, হে তুমি। যে শিল্পটি সর্বোত্তম প্রবৃত্তির
অধিকারী তা আমি এখন আপনাকে যথাযথভাবে বলব যখন আমি আপনাকে বক্তৃতা করছি তখন আপনি কি
মনোযোগ দিয়ে শুনবেন?" [এই জিজ্ঞাসা কৃষ্ণের লীলা। ছান্দোগ্য উপনিষদেও এর উল্লেখ
আছে।]
ভগবদ্গীতা থেকে কৃষ্ণের দর্শন
( মহাভারত , বই 6, অধ্যায় 26) আত্মা থেকে স্বতন্ত্র কোন
বস্তুগত অস্তিত্ব নেই; বা আত্মার গুণাবলীর অধিকারী কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। এই উভয়
বিষয়ে এই উপসংহারে পৌঁছেছেন যারা বিষয়ের সত্যতা জানেন। জেনে রাখুন যে আত্মা অমর হতে
হবে যার দ্বারা এই সমস্ত [মহাবিশ্ব] ব্যাপ্ত। যা অবিনশ্বর তার বিনাশকে কেউ ধারণ করতে
পারে না। বলা হয়েছে যে মূর্ত আত্মার দেহ যা চিরন্তন, অবিনাশী এবং অসীম, তাদের শেষ
আছে।
( মহাভারত , বই 6, অধ্যায় 26) একজন মানুষ হিসাবে, জীর্ণ
পোশাকগুলি ছুঁড়ে ফেলে, নতুন যা অন্যদের গায়ে দেয়, তাই মূর্ত (আত্মা), জীর্ণ দেহগুলিকে
ফেলে দিয়ে নতুন দেহে প্রবেশ করে। অস্ত্র তা ছিঁড়ে না, আগুন গ্রাস করে না; জল তা ভিজিয়ে
দেয় না, বাতাসও তা নষ্ট করে না। এটি কাটা, পোড়া, ভিজে যাওয়া বা শুকানো অক্ষম। এটি
অপরিবর্তনীয়, সর্বব্যাপী, স্থিতিশীল, দৃঢ় এবং চিরন্তন। এটাকে দুর্ভেদ্য, অকল্পনীয়
এবং অপরিবর্তনীয় বলা হয়।
( মহাভারত , বই 6, অধ্যায় 26) সমস্ত প্রাণী (জন্মের আগে)
অব্যক্ত ছিল। শুধুমাত্র একটি ব্যবধানে (জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে), হে ভরত, তারা প্রকাশ
পায়; অতঃপর আবার, যখন মৃত্যু আসে, তখন তারা (আরও একবার) অপ্রকাশিত হয়।
( মহাভারত , বই 6, অধ্যায় 27) এই পৃথিবীতে, দুই ধরনের ভক্তি;
সাংখ্যদের জ্ঞানের মাধ্যমে এবং যোগীদের কর্মের মাধ্যমে।
( মহাভারত , পুস্তক 6, অধ্যায় 29) অর্জুন বললেন, -- তুমি
সাধুবাদ জানাই, হে কৃষ্ণ, কর্ম পরিত্যাগ, আবার আবেদন (তাদের কাছে)। আমাকে অবশ্যই বলুন
যে এই দুটির মধ্যে কোনটি উচ্চতর। পবিত্র বলেছেন- কর্মের পরিত্যাগ এবং কর্মের প্রয়োগ
উভয়ই মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এর মধ্যে, কর্মের প্রয়োগ পরিত্যাগের চেয়ে
উচ্চতর। তাকে সর্বদা একজন তপস্বী হিসাবে পরিচিত হওয়া উচিত যার কোন বিদ্বেষ বা ইচ্ছা
নেই। কারণ, বিপরীত জোড়া থেকে মুক্ত হওয়ায় তিনি সহজেই কর্মের বন্ধন থেকে মুক্তি পান।
( মহাভারত , বই 6, অধ্যায় 29) যিনি জ্ঞানী তিনি কখনই এইগুলির
মধ্যে আনন্দ পান না যার শুরু এবং শেষ রয়েছে।
ভাগবত পুরাণে কৃষ্ণের শৈশব ।
বাসুদেবের ধর্ম (পরে IAST কৃষ্ণ
বাসুদেব "কৃষ্ণ- বাসুদেব ") ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণবাদ এবং বৈষ্ণবধর্মের প্রাচীনতম
উপাসনাগুলির মধ্যে একটি । এই ঐতিহ্যটিকে অন্যান্য ঐতিহ্যের সাথে আলাদাভাবে বিবেচনা
করা হয় যা ঐতিহাসিক বিকাশের পরবর্তী পর্যায়ে একত্রিত হওয়ার দিকে পরিচালিত করে, যা
কৃষ্ণের একেশ্বরবাদী ধর্মের বর্তমান ঐতিহ্যের ভিত্তি তৈরি করে কিছু প্রারম্ভিক পন্ডিত
এটিকে ভাগবতবাদের সাথে তুলনা করতেন , এবং এই ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠাতাকে বিশ্বাস
করা হয় কৃষ্ণ , যিনি বাসুদেবের পুত্র, এইভাবে তাঁর নাম বাসুদেব , এবং তাদের মতে তাঁর
অনুসারীরা নিজেদের ভাগবত বলে অভিহিত করে এবং এই ধর্মটি খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীতে
( পতঞ্জলির সময় ) বা খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীর প্রথম দিকে গঠিত হয়েছিল। পাণিনি
এবং মেগাস্থেনিসের প্রমাণ অনুসারে এবং কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে , যখন বাসুদেবকে একটি
দৃঢ়ভাবে একেশ্বরবাদী বিন্যাসে সর্বোচ্চ দেবতা হিসাবে পূজা করা হয়েছিল, যেখানে পরম
সত্তা ছিলেন নিখুঁত, শাশ্বত এবং কৃপায় পূর্ণ । ধর্মের বাইরের অনেক উৎসে, ভক্ত বা ভক্তকে
বাসুদেবক হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে । হরিবংসা , মহাভারত এবং ভাগবত পুরাণের পরবর্তী
সংযোজন বৃন্দাবন গ্রামে তাঁর শৈশব সম্পর্কে কথা বলে , যেখানে কৃষ্ণ তাঁর শৈশব ও কৈশোরের
দিনগুলি অতিবাহিত করেছিলেন।
শ্লোক: 15:
পাঞ্চজন্যং হৃষীকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ ॥
পৌন্ড্রং দধ্মৌ মহাশঙ্খং ভীমকর্মা বৃকোদরঃ ॥১৫॥
অনুবাদ : তখন, শ্রীকৃষ্ণ পাঞ্চজন্য নামক তাঁর শঙ্খ বাজালেন, অর্জুন বাজালেন, তাঁর দেবদত্ত নামক শঙ্খ এবং বিপুল ভোজনপ্রিয় ও ভীমকর্মা ভীমসেন বাজালেন পৌণ্ড্র নামক তাঁর ভয়ংকর শঙ্খ।
শ্লোক: 16:
অনন্তবিজয়ং রাজা কুন্তীপুত্রো যুধিষ্ঠিরঃ ।
নকুলঃ সহদেবশ্চ সুঘোষমণিপুষ্পকৌ ॥১৬॥
অনুবাদ : কুন্তীপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির অনন্তবিজয় নামক শঙ্খ বাজালেন এবং নকুল ও সহদেব বাজালেন সুঘোষ ও মণিপুষ্পক নামক শঙ্খ।
শ্লোক: 17:
কাশ্যশ্চ পরমেষ্বাসঃ শিখণ্ডী চ মহারথঃ ।
ধৃষ্টদ্যুম্নো বিরাটশ্চ সাত্যকিশ্চাপরাজিতঃ ॥১৭
শ্লোক: 18:
দ্রুপদো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্বশঃ পৃথিবীপতে ।
সৌভদ্রশ্চ মহাবাহুঃ শঙ্খান্ দধ্মুঃ পৃথক্ পৃথক্ ॥১৮॥
অনুবাদ : হে মহারাজ ! তখন মহান ধনুর্ধর কাশীরাজ, প্রবল যোদ্ধা শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট, অপরাজিত সাত্যকি, দ্রুপদ, দ্রৌপদীর পুত্রগণ, সুভদ্রার মহা বলবান পুত্র এবং অন্য সকলে তাঁদের নিজ নিজ পৃথক শঙ্খ বাজালেন।
শিখণ্ডী
শিখণ্ডী, যার জন্মগত নারী পরিচয়কে কখনো কখনো শিখন্দিনী হিসেবে উপস্থাপিত করা হয় , তিনি হলেন অম্বার পুনর্জন্ম , একজন রাজকন্যা যাকে ভীষ্ম একটি স্বয়ম্বরে অপহরণ করেছিলেন এবং পরে তাকে বর্জন করেছিলেন। রাজকুমার কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তার ভগ্নিপতি পান্ডবদের পক্ষে যুদ্ধ করেন এবং ভীষ্মের মৃত্যু ঘটাতে ভূমিকা রাখেন। এছাড়াও তিনি অশ্বত্থামা , কৃপা এবং কৃতবর্মার মতো মহান যোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধে নিযুক্ত হন ।
জাভানিজ ওয়েয়াং ঐতিহ্যে , শিখণ্ডী শ্রীকান্দি নামে পরিচিত এবং পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করে এবং নারীতে পরিবর্তিত হয়। তিনি পাণ্ডব ভাই অর্জুনের দ্বিতীয় স্ত্রী হন , দ্রৌপদী প্রথম।
মহাভারতের অধিকাংশ সংস্করণে, শিখণ্ডীকে তার পূর্বজন্মে অম্বা নামক রাজকন্যা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অম্বা ছিলেন কাশীর রাজার জ্যেষ্ঠ কন্যা । তার বোন, অম্বিকা এবং অম্বালিকার সাথে , তিনি ভীষ্ম কর্তৃক তাদের স্বয়ম্বরে জয়লাভ করেছিলেন । রাজা সালভা সহ বেশ কয়েকজন রাজাকে পরাজিত করার পর , ভীষ্ম রাজকন্যাদের সাথে হস্তিনাপুরে ফিরে আসেন এবং তাদের তার ছোট সৎ ভাই, রাজা বিচিত্রবীর্যের কাছে বধূ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তার বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে, অম্বা ভীষ্মকে বলেছিলেন যে তিনি সালভা রাজার প্রেমে পড়েছেন এবং অন্য কাউকে বিয়ে করতে প্রস্তুত নন। তাঁর কথা শুনে ভীষ্ম অম্বাকে তাঁর কাঙ্খিত স্বামীর কাছে মহিমান্বিতভাবে পাঠালেন। যাইহোক, সালভা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এই বলে যে ভীষ্ম তাকে স্বয়ম্বরে সেরা করেছিলেন, তিনি তাকে তার উপযুক্ত স্বামী হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। অম্বা ভীষ্মের কাছে ফিরে আসেন এবং দাবি করেন যে তিনি তাকে ক্ষত্রিয় ধর্ম অনুসারে বিয়ে করবেন , কিন্তু ভীষ্ম ব্রহ্মচর্যের ব্রতের কারণে প্রত্যাখ্যান করেন। তার দুর্ভাগ্যের জন্য বিলাপ করে, রাজকুমারী বনে অবসর নেওয়ার এবং তার বাকি জীবনের জন্য তপস্যা অনুশীলন করার সিদ্ধান্ত নেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি একটি আশ্রমে এসে তার দুর্দশার কথা জানালেন। ঋষিদের মধ্যে একজন হলেন মাতামহ, হোত্রবাহন, যিনি তার মনের অবস্থার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন এবং তাকে বলেছিলেন যে ভীষ্মের যুদ্ধ গুরু পরশুরাম তার সাহায্যে আসবেন। পরশুরাম হস্তিনাপুরে গিয়েছিলেন এবং তাঁর শিষ্যকে অম্বাকে বিয়ে করার নির্দেশ দেন। ভীষ্ম আবার তার ব্রত উদ্ধৃত করে তাকে মানতে অস্বীকার করলেন। ক্রুদ্ধ, পরশুরাম কুরুক্ষেত্রের ময়দানে ভীষ্মের বিরুদ্ধে 23 দিন ধরে একটি ভয়ানক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন, অস্ট্র নিযুক্ত করেন , কিন্তু তাকে সেরা করতে অক্ষম হন। তিনি দুঃখের সাথে আম্বাকে তার মন পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হওয়ার কথা জানান। রাজকন্যা বারো বছর কঠোর তপস্যায় নিযুক্ত ছিলেন, যা স্বর্গকে নিজেই ঝলসে দেয়। শিব তাকে তার পছন্দের বর দেওয়ার জন্য আবির্ভূত হলেন এবং তিনি ভীষ্মের মৃত্যু কামনা করলেন। শিব অম্বাকে বলেছিলেন যে তিনি একটি মেয়ে রূপে জন্মগ্রহণ করবেন যিনি পরবর্তী জীবনে একজন পুরুষ হবেন এবং একজন মহারথী হবেন যিনি ভীষ্মকে যুদ্ধে হত্যা করবেন। আনন্দিত, রাজকুমারী একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া জ্বালিয়ে, ভীষ্মের মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করেন এবং আত্মহনন করেন ।
সি. রাজাগোপালাচারীর একটি পুনরাবৃত্তি অনুসারে , তিনি একটি তপস্যা অবলম্বন করেছিলেন এবং দেবতা কার্তিকেয়ের কাছ থেকে নীল পদ্মের মালা পেয়েছিলেন এবং এটি ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে কেউ এই মালা পরলে ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠবে। তিনি পাঞ্চালাতে গিয়েছিলেন , কারণ এটি একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল যা তার সামরিক শক্তির জন্য পরিচিত। যাইহোক, ভীষ্মের বিরোধিতা করার ভয়ে কেউই তার কারণকে জয়ী করতে ইচ্ছুক ছিল না। অম্বা ক্রোধে রাজা দ্রুপদর দরজায় মালা ঝুলিয়ে যন্ত্রণায় চলে গেলেন।
তার নিঃসন্তান হওয়ার কারণে, রাজা দ্রুপদ শিবকে অনুশোচনা করেছিলেন, যিনি রাজাকে বলেছিলেন যে তার একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করবে, যে সময়কালে একজন পুরুষ হবে। শিখণ্ডী যখন দ্রুপদ রাণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন, তখন তিনি ছেলের মতোই লালন-পালন করেন। শিখণ্ডী প্রথাগত বয়সে পৌঁছে গেলে, দ্রুপদ দশর্ণার রাজা হিরণ্যবর্মনের কন্যার সাথে বিবাহের জন্য তার হাত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শিখণ্ডীর স্ত্রী শীঘ্রই বুঝতে পেরেছিলেন যে তার স্বামী একজন পুরুষ নয় এবং হিরণ্যবর্মন শীঘ্রই এই তথ্যটি বুঝতে পেরেছিলেন। ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি সত্য নির্ণয়ের জন্য দ্রুপদর কাছে একজন দূত পাঠান এবং পরবর্তীদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। দ্রুপদ জোর দিয়েছিলেন যে শিখণ্ডী আসলেই একজন মানুষ। তার বাবা-মায়ের কষ্টে ব্যথিত হয়ে শিখণ্ডী আমরণ অনশন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যান। তিনি একটি অরণ্য খুঁজে পান যেখানে মানুষ প্রবেশ করতে ভয় পায়, কারণ সেখানে স্তুনকর্ণ নামে এক যক্ষ বাস করত । তিনি যক্ষের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেন এবং তপস্যা করতে লাগলেন। স্তুনকর্ণ যখন তার অনুশীলন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, শিখণ্ডী তাকে তার গল্প বললেন। সমবেদনা বোধ করে, যক্ষ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার সাথে তার যৌন বিনিময়ের প্রস্তাব দেয়, যা শিখণ্ডী রাজি হয়। শিখণ্ডী তার পিতার কাছে পুরুষ হয়ে ফিরে আসেন এবং তাকে এই ঘটনাটি জানান। স্বস্তি পেয়ে দ্রুপদ হিরণ্যবর্মণকে তার ছেলের পুরুষত্ব পরিদর্শনের জন্য দূত পাঠাতে আমন্ত্রণ জানান। হিরণ্যবর্মণ অনেক নারীকে দ্রুপদর কাছে পাঠিয়েছিলেন, যারা শিখণ্ডীর পুরুষত্ব নিশ্চিত করেছিলেন। এইভাবে, দুই রাজা তাদের শান্তি পুনর্নবীকরণ করতে সক্ষম হন।
কুবের যখন স্তুনকর্ণের প্রাঙ্গণে গিয়েছিলেন, তখন যক্ষ তার নারী রূপের কারণে তাকে অভ্যর্থনা জানায়নি। ক্রুদ্ধ হয়ে কুবের যক্ষকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, যে যৌন আদান-প্রদান করা হয়েছে তা চিরস্থায়ী হবে। যক্ষ যখন কুবেরকে অভিশাপ উঠানোর জন্য অনুরোধ করেছিল, তখন যক্ষ তাকে বলেছিলেন যে শিখণ্ডীর মৃত্যুর পরে তিনি তার জন্ম লিঙ্গ ফিরে পাবেন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে , ভীম শিখণ্ডীকে পাণ্ডব সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ার জন্য বেছে নেন, কারণ তিনি ভীষ্মকে হত্যা করার জন্য জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু অর্জুন এবং কৃষ্ণ তার পরিবর্তে ধৃষ্টদ্যুম্নকে পছন্দ করেন । শিখণ্ডীকে পাণ্ডব বাহিনীর সাত অক্ষৌহিণীর একজনের সেনাপতি করা হয় ।
যুদ্ধের প্রথম দিনে, শিখণ্ডী অশ্বত্থামার মুখোমুখি হয় এবং উভয় যোদ্ধা যুদ্ধ থেকে প্রত্যাহার করার আগে একে অপরকে বেশ কয়েকবার আহত করে। যুদ্ধের সপ্তম দিনে, তিনি আবার অশ্বত্থামার মুখোমুখি হন এবং তাকে কপালে আঘাত করতে সক্ষম হন। যাইহোক, একজন ক্রুদ্ধ অশ্বত্থামা তার রথকে ধ্বংস করেন এবং তাকে খারাপভাবে আহত করেন। ভাগ্যক্রমে, সাত্যকি তার উদ্ধারে আসে।
যুদ্ধের নবম দিনের রাতে, একটি চূড়ান্ত পরাজয়ের পরে, পাণ্ডব এবং কৃষ্ণ ভীষ্মের সাথে দেখা করেন । যুধিষ্ঠির ক্ষত্রিয় জীবনের ধ্বংসাত্মক ক্ষতি রোধ করতে, কীভাবে তাকে হত্যা করা যেতে পারে তা তাদের জানাতে পৌত্রের কাছে অনুরোধ করেন। ভীষ্ম তাদের জানান যে তিনি অস্ত্রধারণের সময় পরাজিত হওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল; যাইহোক, তিনি শিখণ্ডীর সাথে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করবেন, যেহেতু তিনি মূলত একজন মহিলা ছিলেন এবং অর্জুন তার অস্ত্র রাখলে তাকে পরাজিত করতে পারে। [ 12 ] তাই, পরের দিনের যুদ্ধে, শিখণ্ডী অর্জুনের সাথে পান্ডব বাহিনীর অগ্রভাগে যাত্রা করেন। কৌরব বাহিনীর অসংখ্য যোদ্ধা এই জুটিকে ভীষ্মের কাছে পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। যাইহোক, পান্ডব বাহিনীর যোদ্ধাদের আক্রমণে, অর্জুন এবং শিখণ্ডী ধাক্কা দিয়ে ভীষ্মের কাছে পৌঁছান। শিখণ্ডীর পিছনে চড়ে অর্জুন ভীষ্মকে শত শত তীরের বিধ্বংসী ভলি দিয়ে আক্রমণ করেন, শিখণ্ডীর পথে অর্জুন মোকাবিলা করতে পারে না। ভীষ্ম তার রথ থেকে পড়ে যান এবং যুদ্ধে তার ভূমিকা শেষ হয়, শুভ উত্তরায়ণে তার জীবন বিসর্জন দেয় । [ 13 ]
যুদ্ধের দ্বাদশ দিনে, শিখণ্ডীর একমাত্র পুত্র, ক্ষত্রদেব, দুর্যোধনের পুত্র লক্ষ্মণ কুমারের হাতে নিহত হন । চতুর্দশ দিনের রাতে শিখণ্ডী কৃপাচার্যের কাছে পরাজিত হন এবং ষোড়শ দিনে আহত হন এবং কৃতবর্মার তীর তার বর্মে বিদ্ধ হলে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। শল্যের মৃত্যুর পর , শিখণ্ডী যুদ্ধের সপ্তদশ দিনে পশ্চাদপসরণকারী কৌরব বাহিনীকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করেন।
যুদ্ধের 18 তম দিনে উপপাণ্ডবদের সাথে শিখণ্ডী অশ্বত্থামার হাতে নিহত হন। অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য এবং কৃতবর্মা রাতে পাণ্ডব শিবির আক্রমণ করলে হতবাক, শিখণ্ডী অশ্বত্থামার সাথে তরবারি যুদ্ধে নিহত হন ।
দেবদত্ত পট্টনায়েকের মতে , অশ্বত্থামা শিখণ্ডীর প্রেমিকাকে তাঁর সামনেই হত্যা করেন; অন্যান্য সংস্করণে, শিখণ্ডীর সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে।
শ্লোক: 19:
স ঘোষো ধার্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়ানি ব্যদারয়ৎ, ।
নভশ্চ পৃথিবীং চৈব তুমুলোহভ্যনুনাদয়ন্ ॥১৯
অনুবাদ : শঙ্খ-নিনাদের সেই প্রচণ্ড শব্দ আকাশ ও পৃথিবী প্রতিধ্বনিত করে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় বিদারিত করতে লাগল।
শ্লোক: 20:
অথ ব্যবস্তিতান্ দৃষ্ট্বা ধার্তরাষ্ট্রান্ কপিধ্বজঃ ।
প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে ধনুরুদ্যম্য পান্ডবঃ ।
হৃষীকেশং তদা বাক্যমিদমাহ মহীপতে ॥২০॥
অনুবাদ : সেই সময় পান্ডু পুত্র অর্জুন হনুমান চিহ্নিত পতাকা শোভিত রথে অধিষ্ঠিত হয়ে তাঁর ধনুক তুলে নিয়ে শ্বর নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত হলেন। হে মহারাজ ! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সমর সজ্জায় বিন্যস্ত দেখে অর্জুন তখন শ্রীকৃষ্ণকে এই কথাগুলি বললেন-
মহাভারতে হনুমান
ভীম, যুধিষ্ঠির, অর্জুন, নকুল, সহদেব, দ্রৌপদী এবং কুন্তির সাথে 14 বছর নির্বাসনে থাকাকালীন, ভীম বনে একটি বানরের সাথে দেখা করেন। সে বিনীতভাবে বানরকে তার পথ থেকে তার লেজ তুলতে বলে, যাতে সে এগিয়ে যেতে পারে।
বানরটি ভীমকে নিজেই তার লেজ তুলে একপাশে রাখতে বলে। কিন্তু ভীম, শক্তিশালী প্রাণীদের একজন হওয়া সত্ত্বেও, নিছক একটি লেজ তুলতে অক্ষম। তিনি বুঝতে পারেন যে এটি কোন সাধারণ বানর নয় এবং তাকে তার শ্রদ্ধা জানায়।
এই যখন বানরটি প্রকাশ করে যে সে ভগবান হনুমান ছাড়া আর কেউ নয় এবং তার আসল রূপ ধারণ করে। ভীম তার শক্তি ও ক্ষমতার কারণে অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন এবং ভগবান হনুমান ভীমের অহংকার ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন । অনেকেই জানেন না যে হনুমান এবং ভীম ভাই, সুনির্দিষ্টভাবে সৎ-ভাই। তারা উভয়েই বায়ু (পবন) ভগবানের পুত্র। অতএব, তারা উভয়ই পবন পুত্র।
মহাভারত যুদ্ধে ভগবান হনুমান তার ভূমিকা পালন করেছিলেন
ভীমের সাথে সাক্ষাতের সময়, ভগবান হনুমান কৌরবদের বিরুদ্ধে তাদের ভবিষ্যতের যুদ্ধে পান্ডবদের রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাই ভগবান হনুমানকে পতাকার কাছে রথের শীর্ষে বসে থাকতে দেখা যায় যা অর্জুন ব্যবহার করেছিলেন এবং মহাভারতের যুদ্ধের সময় ভগবান কৃষ্ণ দ্বারা চালিত হয়েছিল। কিছু সংস্করণে তারা বলে যে ভগবান হনুমানের মূর্তি অর্জুনের রথের উপরে উড়ন্ত পতাকায় পাওয়া গিয়েছিল। এইভাবে রথটি ভগবান হনুমান দ্বারা সুরক্ষিত ছিল।
মহাভারত যুদ্ধের শেষে, কৃষ্ণ অর্জুনকে প্রথমে রথ থেকে নামতে বলেছিলেন, তারপর কৃষ্ণ নেমেছিলেন, ভগবান হনুমান সম্বলিত পতাকাটি অদৃশ্য হয়ে যায় এবং তার পরেই রথটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তাই পতাকাও হয়তো রথকে পুড়ে ছাই থেকে রক্ষা করছে। কারণ যুদ্ধের সময় রথটি অনেকগুলি ঐশ্বরিক অস্ত্র দ্বারা আঘাত করেছিল, কিন্তু ভগবান হনুমান রথটিকে একসাথে রেখে রথটিকে রক্ষা করেছিলেন ( ভগবান হনুমান যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রথ ছেড়ে যাননি। যুদ্ধের)।
ভগবান কৃষ্ণ যুদ্ধের পরে পদত্যাগ করার পরে রথটি পুড়ে যায় এবং সাথে সাথে ভগবান হনুমান উড়ে যান বা পতাকা থেকে অদৃশ্য হয়ে যান।
শ্লোক: 21:
অর্জুন উবাচ
সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে রথং স্থাপয় মেহচ্যুত ।
যাবদেতান্নিরীক্ষেহহং যোদ্ধুকামানবস্থিতান্ ॥২১॥
শ্লোক: 22:
কৈর্ময়া সহ যোদ্ধব্যমস্মিন্ রণসমুদ্যমে ॥২২॥
কৈঃ, ময়া, সহ, যোদ্ধব্যম্, অস্মিন্, রণসমুদ্যমে ॥২২॥
অনুবাদ : অর্জুন বললেন- হে অচ্যুত ! তুমি উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে আমার রথ স্থাপন কর, যাতে আমি দেখতে পারি যুদ্ধ করার অভিলাষী হয়ে কারা এখানে এসেছে এবং এই মহা সংগ্রামে আমাকে কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে।
শ্লোক: 23:
যোৎস্যমানানবেক্ষেহহং য এতেহত্র সমাগতাঃ ।
ধার্তরাষ্ট্রস্য দুর্বুদ্ধের্যুদ্ধে প্রিয়চিকীর্ষবঃ ॥২৩॥
অনুবাদ : ধৃতরাষ্ট্রের দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন পুত্রকে সন্তুষ্ট করার বাসনা করে যারা এখানে যুদ্ধ করতে এসেছে, তাদের আমি দেখতে চাই৷
শ্লোক: 24:
সঞ্জয় উবাচ:
এবমুক্তো হৃষীকেশো গুড়াকেশেন ভারত ।
সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে স্থাপয়িত্বা রথোত্তমম্ ॥২৪॥
অনুবাদ : সঞ্জয় বললেন- হে ভরত-বংশধর ! অর্জুন কতৃক এভাবে আদিষ্ট হয়ে, শ্রীকৃষ্ণ সেই অতি উত্তম রথটি চালিয়ে নিয়ে উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে রাখলেন।
শ্লোক: 25:
ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ সর্বেষাং চ মহীক্ষিতাম্ ।
উবাচ পার্থ পশ্যৈতান্ সমবেতান্ কুরূনিতি ॥২৫॥
অনুবাদ : ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখ পৃথিবীর অন্য সমস্ত নৃপতিদের সামনে ভগবান হৃষীকেশ বললেন, হে পার্থ ! এখানে সমবেত সমস্ত কৌরবদের দেখ।
শ্লোক: 26:
তত্রাপশ্যৎ স্থিতান্ পার্থঃ পিতৃনথ পিতামহান্ ।
আচার্যান্মাতুলান্ ভ্রাতৃন্ পুত্রান্ পৌত্রান্ সখীংস্তথা ।
শ্বশুরান্ সুহৃদশ্চৈব সেনয়োরুভয়োরপি ॥২৬॥
অনুবাদ : তখন অর্জুন উভয় পক্ষের সেনাদলের মধ্যে পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, শ্বশুর, মিত্র ও শুভাকাংক্ষীদের উপস্থিত দেখতে পেলেন।
শ্লোক: 27:
তান্ সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্বান্ বন্ধূনবস্থিতান্।
কৃপয়া পরয়াবিষ্টো বিষীদন্নিদমব্রবীৎ ॥২৭॥
অনুবাদ : যখন কুন্তীপুত্র অর্জুন সকল রকমের বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনদের যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থিত দেখলেন, তখন তিনি অত্যন্ত কৃপাবিষ্ট ও বিষণ্ণ হয়ে বললেন।
শ্লোক: 28:
অর্জুন উবাচ
দৃষ্ট্বেমং স্বজনং কৃষ্ণ যুযুৎসুং সমুপস্থিতম্ ।
সীদন্তি মম গাত্রাণি মুখং চ পরিশুষ্যতি ॥২৮॥
অনুবাদ : অর্জুন বললেন- হে প্রিয়বর কৃষ্ণ ! আমার সমস্ত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের এমনভাবে যুদ্ধাভিলাষী হয়ে আমার সামনে অবস্থান করতে দেখে আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হচ্ছে এবং মুখ শুষ্ক হয়ে উঠছে।
শ্লোক: 29:
বেপথুশ্চ শরীরে মে রোমহর্ষশ্চ জায়তে ।
গান্ডীবং স্রংসতে হস্তাৎ ত্বক্ চৈব পরিদহ্যতে ॥২৯॥
অনুবাদ : আমার সর্বশরীর কম্পিত ও রোমাঞ্চিত হচ্ছে, আমার হাত থেকে গাণ্ডীব খসে পড়ছে এবং ত্বক যেন জ্বলে যাচ্ছে।
মহাভারত অনুসারে , ধর্ম রক্ষার মহৎ উদ্দেশ্যে মহাবিশ্বের স্রষ্টা ব্রহ্মা দ্বারা পৌরাণিক গাণ্ডীব ধনুক তৈরি করা হয়েছিল। এই পবিত্র অস্ত্রটি তখন ভগবান শিবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল, যিনি এটি 503 বছরের জন্য ব্রহ্মার কাছে অর্পণ করার আগে সহস্রাব্দ ধরে রেখেছিলেন । পরবর্তীকালে, ইন্দ্র 580 বছর ধরে ধনুক চালান, তারপরে 500 বছর ধরে সোম । অবশেষে, পাণ্ডবদের বীর যোদ্ধা অর্জুনকে দান করার আগে বরুণ 100 বছর ধরে ধনুক ধরে রেখেছিলেন।
অগ্নি , অগ্নি দেবতা, তার শক্তি এবং মহিমা ফিরে পেতে, খান্ডবপ্রস্থের বন গ্রাস করতে চেয়েছিলেন । তিনি দুই বীর, কৃষ্ণ ও অর্জুনের সাহায্য তালিকাভুক্ত করেছিলেন । অর্জুন ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম সেরা যোদ্ধা এবং বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ। তিনি অগ্নির কাছে একটি ধনুক চেয়েছিলেন যা তার শক্তি, দক্ষতা এবং স্বর্গীয় অস্ত্রের শক্তির জন্য উপযুক্ত হবে।
অগ্নি তখন বরুণকে কাঙ্খিত অস্ত্র দিয়ে আশীর্বাদ করার অনুরোধ করেন । বরুণ অর্জুনকে গান্ধীব ধনুক দিয়েছিলেন, সেইসাথে দুটি তরঙ্গ যা অক্ষয় সংখ্যক তীর প্রদান করবে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় ধনুকটি অনেকের কাছে ভয় পেয়েছিল, অনেক মহান যোদ্ধা এবং দেবতাদের পরাজিত ও হত্যা করেছিল।
গাণ্ডীব একটি শক্তিশালী আত্মবিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস দেয়। এটি এক লক্ষ ধনুকের শক্তি বলে বিশ্বাস করা হয় এবং ধনুকটি 108টি স্বর্গীয় স্ট্রিং নিয়ে গঠিত। গান্ধীব ছিলেন অবিনশ্বর এবং স্বর্গীয় ও গন্ধর্বদের দ্বারা পূজিত হতেন।
দ্বাপর যুগের শেষে কৃষ্ণ পৃথিবী ত্যাগ করে বৈকুণ্ঠে চলে যান । কৃষ্ণ যখন প্রস্থান করছিলেন, তখন তিনি অর্জুনকে বলেছিলেন দ্বারিকাবাসীকে উদ্ধার করতে কারণ তিনি দ্বারিকাকে সমুদ্রের নীচে ডুবিয়েছিলেন। দ্বারিকা ডুবে যাওয়ার সময় অর্জুন সাময়িকভাবে ধনুক বাঁধতে পারেননি, বা তার স্বর্গীয় অস্ত্রগুলিকে আহ্বান করার জন্য প্রয়োজনীয় মন্ত্রগুলি মনে রাখতে পারেননি। অর্জুন জানতেন যে পৃথিবীতে তার সময়ও শেষ হয়ে গেছে, ব্যাস তাকে বলেছিলেন যে এই ঘটনা ঘটবে এবং যখন এটি ঘটবে, তখন পৃথিবীতে অর্জুনের কাজ শেষ। পরে, পাণ্ডবরা অবসর গ্রহণ করেন এবং হিমালয়ে যাত্রা করেন । তাদের পথে, অগ্নি এসে অর্জুনকে বরুণের কাছে গান্ডিব ফিরিয়ে দিতে বলে , কারণ এটি দেবতাদের ছিল। অর্জুন বাধ্য হয়ে তাদের সমুদ্রের জলে ফেলে দিলেন। এইভাবে স্বর্গীয় ধনুক দেবতাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
শ্লোক: 30:
ন চ শক্নোম্যবস্থাতুং ভ্রমতীব চ মে মনঃ ।
নিমিত্তানি চ পশ্যামি বিপরীতানি কেশব ॥৩০॥
অনুবাদ : হে কেশব ! আমি এখন আর স্থির থাকতে পারছি না। আমি আত্মবিস্মৃত হচ্ছি এবং আমার চিত্ত উদ্ ভ্রান্ত হচ্ছে। হে কেশীদানবহন্তা শ্রীকৃষ্ণ ! আমি কেবল অমঙ্গলসূচক লক্ষণসমূহ দর্শন করছি।
শ্লোক: 31:
ন চ শ্রেয়োহনুপশ্যামি হত্বা স্বজনমাহবে ।
ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ ॥৩১॥
অনুবাদ : হে কৃষ্ণ ! যুদ্ধে আত্মীয়-স্বজনদের নিধন করা শ্রেয়স্কর দেখছি না। আমি যুদ্ধে জয়লাভ চাই না, রাজ্য এবং সুখভোগও কামনা করি না।
শ্লোক: 32:
কিং নো রাজ্যেন গোবিন্দ কিং ভোগৈর্জীবিতেন বা ।
যেষামর্থে কাংক্ষিতং নো রাজ্যং ভোগাঃ সুখানি চ ॥৩২॥
কিম্, নঃ, রাজ্যেন, গোবিন্দ, কিম্, ভোগৈঃ, জীবিতেন, বা,
যেষাম, অর্থে, কাংক্ষিতম্, নঃ, রাজ্যম্, ভোগাঃ, সুখানি, চ, ॥৩২॥
শ্লোক: 33:
ত ইমেহবস্থিতা যুদ্ধে প্রাণাংস্ত্যক্ত্বা ধনানি চ ।
আচার্যাঃ পিতরঃ পুত্রাস্তথৈব চ পিতামহাঃ ॥৩৩॥
ত, ইমে, অবস্থিতাঃ, যুদ্ধে, প্রাণান্, ত্যক্ত্বা, ধনানি, চ,
আচার্যাঃ, পিতরঃ, পুত্রাঃ, তথা, এব, চ, পিতামহাঃ ॥৩৩॥
শ্লোক: 34:
মাতুলাঃ শ্বশুরাঃ পৌত্রাঃ শ্যালাঃ সম্বন্ধিনস্তথা ।
এতান্ন হন্তমিচ্ছামি ঘ্নতহপি মধুসূদন ॥৩৪॥
মাতুলাঃ, শ্বশুরাঃ, পৌত্রাঃ, শ্যালাঃ, সম্বন্ধিনঃ, তথা,
এতান্, ন হন্তুম্, ইচ্ছামি, ঘ্নতঃ, অপি, মধুসূদন ॥৩৪॥
শ্লোক: 35:
অপি ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য হেতোঃ কিং নু মহীকৃতে ।
নিহত্য ধার্তরাষ্ট্রান্নঃ কা প্রীতিঃ স্যাজ্জনার্দন ॥৩৫॥
অপি, ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য, হেতোঃ, কিম্, নু, মহীকৃতে,
নিহত্য, ধার্তরাষ্ট্রান্, নঃ, কা, প্রীতিঃ, স্যাৎ, জনার্দন ॥৩৫॥
অনুবাদ : হে গোবিন্দ ! আমাদের রাজ্যে কি প্রায়োজন, আর সুখভোগ বা জীবন ধারনেই বা কী প্রয়োজন, যখন দেখছি- যাদের জন্য রাজ্য ও ভোগসুখের কামনা, তারা সকলেই এই রণক্ষেত্রে আজ উপস্থিত? হে মধুসূদন ! যখন আচার্য, পিতৃব্য, পুত্র, পিতামহ, মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক ও আত্মীয়স্বজন, সকলেই প্রাণ ও ধনাদির আশা পরিত্যাগ করে আমার সামনে যুদ্ধে উপস্থিত হয়েছেন, তখন তাঁরা আমাকে বধ করলেও আমি তাঁদের হত্যা করতে চাইব কেন? হে সমস্ত জীবের প্রতিপলক জনার্দন ! পৃথিবীর তো কথাই নেই, এমন কি সমগ্র ত্রিভুবনের বিনিময়েও আমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নই। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের নিধন করে কি সন্তোষ আমরা লাভ করতে পারব?
শ্লোক: 36:
পাপমেবাশ্রয়েদস্মান্ হত্বৈতানাততায়িনঃ ।
তস্মান্নার্হা বয়ং হন্তুং ধার্তরাষ্ট্রান্ সবান্ধবান্ ।
স্বজনং হি কথং হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধব ॥৩৬
অনুবাদ : এই ধরনের আততায়ীদের বধ করলে মহাপাপ আমাদের আচ্ছন্ন করবে। সুতরাং বন্ধুবান্ধব সহ ধৃতরাষ্ট্র্রের পুত্রদের সংহার করা আমাদের পক্ষে অবশ্যই উচিত হবে না। হে মাধব , লক্ষ্মীপতি শ্রীকৃষ্ণ ! আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করে আমাদের কী লাভ হবে ? আর তা থেকে আমরা কেমন করে সুখী হব ?
কৃতবর্মা
কৃতবর্মা
, হিন্দু ধর্মের একজন বৃষ্ণী যাদব
যোদ্ধা । কৌরবদের হয়ে
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে লড়ে মহাভারতে তাকে
একটি গৌণ চরিত্র হিসেবে
দেখা যায় । এফই পারগিটারের মতে
, তিনি যদু রাজবংশের অন্ধক
বংশে জন্মগ্রহণকারী হৃদিকার পুত্র ছিলেন ।
কৃতবর্মা
রাজা সত্রাজিতের কাছ থেকে কিংবদন্তি
শ্যামান্তক রত্ন চুরিতে উত্সাহিত
করেছিলেন বা কিছু বিবরণে
অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়
। তার বন্ধু আকুরার
সাথে , তিনি শতধন্বকে সত্রাজিতকে
হত্যা করতে এবং নিজের
জন্য গহনা চুরি করতে
বাধ্য করেছিলেন বলে কথিত আছে।
শতধন্বকে পরবর্তীকালে কৃষ্ণের দ্বারা হত্যা করা হয়েছিল, যদিও
তার কাছে আর রত্ন
ছিল না, এটি অক্রুরা
এবং কৃতবর্মাকে নিরাপদ রাখার জন্য দিয়েছিলেন। শ্যামান্তকের
অক্রুর অধিকার আবিষ্কারের কারণে দ্বারকায় বা অন্যান্য বিবরণে
দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে , কৃতবর্মা
এবং তাকে রত্নটি হস্তান্তর
করার জন্য শহরে ডেকে
পাঠানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত, কৃষ্ণ
সিদ্ধান্ত নেন যে অক্রুর
রত্নটি তার কাছে রাখতে
হবে। [ ৩ ]
কুরুক্ষেত্র
যুদ্ধ
কৃতবর্মা
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরব পক্ষ বেছে
নিয়েছিলেন যখন দুর্যোধন তাকে
একটি অক্ষৌহিনী ধার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি
দিয়ে তার সহায়তা চাওয়া
হয়েছিল ।
যুদ্ধের
প্রথম দিনে তিনি সাত্যকির
সাথে দ্বৈত যুদ্ধ করেন । মহারথী
হিসাবে , ভীষ্ম দ্বারা স্থাপিত উড়ন্ত বগলা গঠনের মাথায়
স্থাপন করা হয়েছিল ।
সমগ্র যুদ্ধে তিনি বেশ কিছু
সংঘাতে লিপ্ত হন। তিনি একক
যুদ্ধে ভীমের কাছে পরাজিত হন
এবং সাত্যকির বিরুদ্ধে আরেকটি লড়াইয়ে আহত হন। তিনি
ধৃষ্টদ্যুম্নের বিরুদ্ধে এবং অর্জুন , ভীম
এবং সাত্যকির বিরুদ্ধে একটি দ্বন্দ্ব যুদ্ধ
করেছিলেন। সে অভিমন্যুকে আক্রমণ
করে তার ঘোড়াকে হত্যা
করে। অর্জুনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর,
তিনি যুদ্ধে যুধুমন্যু এবং উত্তমৌজদের সাথে
দেখা করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে
শিখণ্ডী , ভীম ও যুধিষ্ঠিরকে
পরাজিত করেন। দ্রোণের মৃত্যুর পর তিনি যুদ্ধক্ষেত্র
থেকে পালিয়ে যান । তিনি
পান্ডবদের বিরুদ্ধে অশ্বত্থামার প্রতিহিংসার কাজে অংশ নিয়েছিলেন
এবং তাদের শিবিরে আগুন লাগিয়েছিলেন যখন
তাদের যোদ্ধারা ঘুমিয়ে ছিল। যুদ্ধের
পর, তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে তার
পুত্র দুর্যোধনের মৃত্যুর খবর জানান এবং
বাড়ি ফিরে আসেন। তিনি
যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞে আবির্ভূত হন।
যদু
গণহত্যা: মৌসালা পর্ব
মৌসালা
পর্বে কৃতবর্মা এবং সাত্যকির মধ্যে
দ্বন্দ্ব হল যদু হত্যাকাণ্ডের
জন্য উস্কানিমূলক ঘটনা, যার ফলস্বরূপ প্রভাসে
যদু জাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধ্বংস
হয়। মদ খাওয়ার কারণে
মদ্যপ হয়ে, সাত্যকি পাণ্ডব শিবিরের যোদ্ধাদের ঘুমন্ত অবস্থায় অনৈতিক হত্যার জন্য কৃতবর্মার ক্ষত্রিয়
জন্মকে উপহাস করেছিলেন বলে কথিত আছে,
এই বিশ্বাসে যে এই কাজের
জন্য তাকে কখনও ক্ষমা
করা হবে না। জবাবে,
কৃতবর্মা সাত্যকিকে বীরত্বপূর্ণ আচরণের জন্য অভিযুক্ত করেন
যখন শেষোক্তরা ভুরিশারবসকে আক্রমণ করেছিল যখন তিনি অস্ত্র
রেখেছিলেন। সাত্যকি তাকে সত্রাজিতের কাছ
থেকে শ্যামন্তক রত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে
তার অন্যায় ভূমিকার কথা মনে করিয়ে
দিয়ে পাল্টা জবাব দেয় ।
সত্যভামার শোক দেখে , সাত্যকি
তার প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং অবিলম্বে কৃতবর্মার
শিরচ্ছেদ করেছিলেন। ভোজ এবং অন্ধকদের
গোষ্ঠী একে অপরের সাথে
যুদ্ধ শুরু করে, যদু
হত্যাকাণ্ড শুরু করে।
বলরাম
বলরাম একজন
হিন্দু দেবতা এবং কৃষ্ণের বড়
ভাই । তিনি জগন্নাথ
ঐতিহ্যে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, ত্রয়ী দেবতাদের একজন। তিনি হলধারা , হলায়ুধা
, বলদেব , বলভদ্র , এবং সংকর্ষনা নামেও
পরিচিত ।
প্রথমত তাকে
হালা ( লাঙ্গালা , "লাঙ্গল") এর সাথে যুক্ত
করেছে কৃষিকাজ এবং কৃষকদের সাথে
তার দৃঢ় সম্পর্ক থেকে,
দেবতা হিসেবে যিনি প্রয়োজনের সময়
অস্ত্র হিসেবে কৃষি সরঞ্জাম ব্যবহার
করতেন, এবং পরবর্তী দুটি
তার শক্তিকে নির্দেশ করে।
মূলত
একজন কৃষি-সাংস্কৃতিক দেবতা,
বলরামকে বেশিরভাগই আদিশেশের অবতার হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে , দেবতা
বিষ্ণুর সাথে সম্পর্কিত সর্প
যখন কিছু বৈষ্ণব ঐতিহ্য
তাকে বিষ্ণুর অষ্টম অবতার হিসাবে বিবেচনা করে, জয়দেবের সাথে
। গীতগোবিন্দ
(c.1200) "বলরামকে
অন্তর্ভুক্ত করা প্যান্থিয়ন" বিষ্ণুর 10টি
প্রধান অবতারের নবম হিসাবে ।
ভারতীয়
সংস্কৃতিতে বলরামের তাৎপর্য প্রাচীন শিকড় রয়েছে। শিল্পকর্মে তার চিত্রটি সাধারণ
যুগের শুরুর কাছাকাছি এবং মুদ্রায় দ্বিতীয়
শতাব্দীর BCE তারিখের। জৈন
ধর্মে, তিনি বলদেব নামে
পরিচিত, এবং তিনি ঐতিহাসিকভাবে
উল্লেখযোগ্য কৃষক-সম্পর্কিত দেবতা।
বলরাম
হলেন একজন প্রাচীন দেবতা,
ভারতীয় ইতিহাসের মহাকাব্য যুগে প্রত্নতাত্ত্বিক এবং
মুদ্রাসংক্রান্ত প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত একজন বিশিষ্ট দেবতা।
নাগা (অনেক মাথাওয়ালা সর্প),
একটি লাঙ্গল এবং জল দেওয়ার
পাত্রের মতো অন্যান্য খামারের
নিদর্শনগুলির সাথে তার মূর্তিটি
প্রদর্শিত হয় , সম্ভবত একটি বুকোলিক, কৃষি
সংস্কৃতিতে তার উত্স নির্দেশ
করে।
বলরামের
আখ্যান মহাভারত , হরিবংশ , ভাগবত পুরাণ এবং অন্যান্য পুরাণে
পাওয়া যায় । তিনি
শঙ্করশনার ব্যুহ অবতার , শেশ ও লক্ষ্মণের
দেবতাদের সাথে শনাক্ত করেন
। বলরামের
কিংবদন্তি শেশের অবতার, দেবতা-সর্প বিষ্ণুর উপর
নির্ভর করে, বিষ্ণুর সাথে
তাঁর ভূমিকা এবং সম্পর্ক প্রতিফলিত
করে। যাইহোক, বলরামের পৌরাণিক কাহিনী এবং বিষ্ণুর দশ
অবতারের সাথে তার সম্পর্ক
তুলনামূলকভাবে ছোট এবং বৈদিক-পরবর্তী, কারণ এটি বৈদিক
গ্রন্থে পাওয়া যায় না।
বলরামের
কিংবদন্তি মহাভারতের অনেক পর্বে (বই)
পাওয়া যায় । বই
তিন ( বনপর্ব ) কৃষ্ণ এবং তাঁর সম্পর্কে
বলে যে বলরাম হলেন
বিষ্ণুর অবতার, অন্যদিকে কৃষ্ণ হলেন সমস্ত অবতার
এবং অস্তিত্বের উৎস। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের
কিছু শিল্পকর্মে , গুজরাটের মন্দির এবং অন্যত্র, উদাহরণস্বরূপ,
বলদেব হলেন বিষ্ণুর অষ্টম
অবতার, বুদ্ধ (বৌদ্ধধর্ম) বা অরিহন্ত (জৈনধর্ম)
এর আগে।
বলরাম
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ থেকে ২য়
শতক) একটি উল্লেখ পেয়েছেন,
যেখানে হাডসনের মতে, তার অনুগামীদের
কামানো মাথা বা বিনুনি
করা চুলের সাথে "তপস্বী উপাসক" হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
বলদেওয়া
হিসাবে বলরাম, মহাভারতের উপর ভিত্তি করে
রচিত কাকাউইন কাব্য, 11 শতকের জাভানিজ পাঠ কাকাউইন ভারতায়ুদ্ধের
একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ।
বলরাম
ছিলেন প্রাচীনকালে সমকর্ষনা নামে একজন শক্তিশালী
স্থানীয় দেবতা, যা খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ
শতাব্দী থেকে মথুরায় বৃষ্ণি
বীরদের স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত ।
খ্রিস্টীয় তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শতাব্দীতে
কুষাণ যুগে বিষ্ণুর অবতারের
ধারণা তৈরি হয়েছিল ।
ইন্দো-গ্রীক রাজা আগাথোক্লিসের অন্তর্গত
প্রায় 185-170 খ্রিস্টপূর্বাব্দের মুদ্রাগুলি বলরামের মূর্তি ও গ্রীক শিলালিপি
দেখায়। বলরাম-সম্দর্শনকে সাধারণত তার ডান হাতে
একটি গদা নিয়ে দাঁড়িয়ে
এবং বাম হাতে একটি
লাঙ্গল ধরে দেখানো হয়।
এই মুদ্রার অন্য দিকে বাসুদেব-কৃষ্ণ শঙ্খ ও চক্র
ধারণ করেছেন।
বলরাম
ছিলেন বাসুদেবের পুত্র । মথুরার অত্যাচারী
দুষ্ট রাজা কামসা তার
চাচাতো বোন দেবকীর সন্তানদের
হত্যা করার জন্য অভিপ্রায়
করেছিল , একটি ভবিষ্যদ্বাণীর কারণে
যে সে তার অষ্টম
সন্তানের হাতে মারা যাবে।
হরিবংশ বলে যে কামসা
বন্দী দেবকীর প্রথম ছয় সন্তানকে পাথরের
মেঝেতে আঘাত করে নবজাতককে
হত্যা করেছিল । বলরাম যখন
গর্ভধারণ করেছিলেন, বিষ্ণু হস্তক্ষেপ করেছিলেন, হিন্দু কিংবদন্তিগুলি বর্ণনা করেছিলেন; তাঁর ভ্রূণ দেবকীর
গর্ভ থেকে বাসুদেবের প্রথম
স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে স্থানান্তরিত হয় । কিছু
গ্রন্থে, এই স্থানান্তরটি বলরামকে
সংকর্ষনা (যাকে টেনে নিয়ে
যাওয়া হয়েছিল) উপাধি দেয়। বলরাম তার ছোট ভাই
কৃষ্ণের সাথে তার পালক-পিতা-মাতার সাথে,
গোপালক নন্দের পরিবারে এবং তার স্ত্রী
যশোদার সাথে বেড়ে ওঠেন
। ভাগবত পুরাণের 10 অধ্যায় এটিকে নিম্নরূপ বর্ণনা করেছে:
সমস্ত
কিছুর স্বয়ং ভগবান তাঁর একীভূত চেতনার
(যোগমায়া) সৃজনশীল শক্তিকে বলরাম এবং কৃষ্ণ হিসাবে
তাঁর নিজের জন্মের পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন। তিনি বলরাম দিয়ে
শুরু করেন। সমগ্র শেশ, যা আমার
আবাস, দেবকীর গর্ভে একটি ভ্রূণ হবে
যা আপনি রোহিণীর গর্ভে
প্রতিস্থাপন করবেন।
তাঁর
নাম রাখা হয়েছিল রাম,
কিন্তু তাঁর মহান শক্তির
কারণে তাঁকে বলরাম, বলদেব বা বলভদ্র বলা
হত, যার অর্থ শক্তিশালী
রাম । তিনি শ্রাবণ
পূর্ণিমায় জন্মগ্রহণ করেন , যা রক্ষা বন্ধনের
উপলক্ষ্যের সাথে মিলে যায়
।
শৈশব
এবং বিবাহ
কৃষ্ণ
এবং বলরাম ব্রাহ্মণ সন্দীপানির সাথে অধ্যয়ন করছেন
।
একদিন,
নন্দ নবজাতকের নাম কৃষ্ণ ও
বলরাম রাখার জন্য ঋষি গর্গমুনি
, তাঁর পুরোহিতের উপস্থিতির অনুরোধ করেন । গর্গা
উপস্থিত হলে নন্দ তাকে
ভালোভাবে গ্রহণ করেন এবং নামকরণ
অনুষ্ঠানের অনুরোধ করেন। গর্গামুনি তখন নন্দকে স্মরণ
করিয়ে দেন যে কংস
দেবকীর পুত্রের সন্ধান করছেন এবং যদি তিনি
ঐশ্বর্যের সাথে অনুষ্ঠানটি করেন
তবে তা তাঁর নজরে
আসবে। তাই নন্দ গর্গকে
গোপনে অনুষ্ঠান করতে বললেন এবং
গর্গ তাই করলেন:
রোহিণীর
পুত্র বলরাম অন্যের অতীন্দ্রিয় আনন্দ বৃদ্ধি করেন বলে তার
নাম রাম এবং অসামান্য
শক্তির কারণে তাকে বলদেব বলা
হয়। তিনি যদুদেরকে তাঁর
নির্দেশ অনুসরণ করার জন্য আকৃষ্ট
করেন এবং তাই তাঁর
নাম সংকর্ষণ।
যখন
তার বড় ভাই, খেলতে
খেলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তখন
গোয়ালের কোলে মাথা রেখে
শুয়ে পড়তেন, ভগবান কৃষ্ণ তাকে ব্যক্তিগতভাবে তার
পায়ে মালিশ করে এবং অন্যান্য
সেবা প্রদান করে শিথিল করতে
সাহায্য করতেন।
বলরাম
তার শৈশব তার ভাই
কৃষ্ণের সাথে গরু পালনকারী
হিসাবে অতিবাহিত করেছিলেন। তিনি কংস কর্তৃক
প্রেরিত ধেনুকা , সেইসাথে রাজার প্রেরিত প্রলাম্বা ও মুষ্টিকা কুস্তিগীরকে
হত্যা করেছিলেন। কৃষ্ণ যখন কংসকে বধ
করছিলেন তখন বলরাম তার
পরাক্রমশালী সেনাপতি কালবক্রকে হত্যা করেছিলেন । দুষ্ট রাজাকে
হত্যা করার পর, বলরাম
এবং কৃষ্ণ তাদের শিক্ষার জন্য উজ্জয়িনীতে সন্দীপানীর
আশ্রমে যান । বলরাম
রাজা কাকুদমির কন্যা রেবতীকে বিয়ে করেছিলেন । তাঁর দুটি
পুত্র ছিল - নিশাথা এবং উলমুকা এবং
একটি কন্যা - শশিরেখা যা বৎসলা নামেও
পরিচিত।
বলরাম
হলেন বিখ্যাত কৃষক, পশুসম্পদ সহ কৃষির অন্যতম
মূর্ত প্রতীক যার সাথে কৃষ্ণ
যুক্ত। লাঙ্গল বলরামের অস্ত্র। ভাগবত পুরাণে , তিনি এটিকে অসুরদের
সাথে যুদ্ধ করার জন্য ব্যবহার
করেন, যমুনা নদীকে বৃন্দাবনের কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্য একটি
পথ খনন করেন এবং
তিনি হস্তিনাপুরের পুরো রাজধানী গঙ্গা
নদীতে টেনে নিয়ে যাওয়ার
জন্য এটি ব্যবহার করেন।
কুরুক্ষেত্র
যুদ্ধ
বলরাম
কৌরবদের দুর্যোধন এবং পাণ্ডবদের ভীম
উভয়কেই গদা দিয়ে যুদ্ধের
কলা শিখিয়েছিলেন । কৌরব ও
পাণ্ডবদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে বলরাম
উভয় পক্ষের দায়িত্ব পালন করেন এবং
তাই নিরপেক্ষ ছিলেন। যুদ্ধের সময় তিনি তার
ভাগ্নে প্রদ্যুম্ন এবং অন্যান্য যাদবদের
সাথে তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন এবং শেষ দিনে
ফিরে এসেছিলেন, তার শিষ্যদের মধ্যে
লড়াই দেখতে। ভীম যখন দুর্যোধনকে
তার উরুতে গদা দিয়ে আঘাত
করে পরাজিত করেন, যুদ্ধের নিয়মের একটি ঐতিহ্যগত লঙ্ঘন,
বলরাম ভীমকে হত্যা করার হুমকি দেন।
এটি প্রতিরোধ করা হয়েছিল যখন
কৃষ্ণ বলরামকে ভীমের ব্রত স্মরণ করিয়ে
দিয়েছিলেন - দুর্যোধনকে ভীমের স্ত্রী দ্রৌপদীর কাছে উন্মুক্ত করে
উরুটি পিষে হত্যা করার
জন্য ।
অন্তর্ধান
ভাগবত
পুরাণে বর্ণনা করা হয়েছে যে,
বলরাম যদু বংশের অবশিষ্টাংশ
ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধে
অংশ নেওয়ার পর এবং কৃষ্ণের
অন্তর্ধান প্রত্যক্ষ করার পর, তিনি
ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসেছিলেন এবং এই পৃথিবী
থেকে বিদায় নেন।
কিছু
শাস্ত্রে একটি মহান সাদা
সাপ বর্ণনা করা হয়েছে যেটি
বলরামের মুখ থেকে বেরিয়ে
গিয়েছিল, তার পরিচয় অনন্ত-
শেষা , বিষ্ণুর একটি রূপ হিসাবে
। তিনি যে স্থান
থেকে প্রস্থান করেছিলেন সেটি গুজরাটের সোমনাথ
মন্দিরের কাছে অবস্থিত ।
মন্দিরের
কাছে অবস্থিত গুহাটি সম্পর্কে ভেরাভালের স্থানীয় লোকদের বিশ্বাস, বলরামের মুখ থেকে যে
সাদা সাপটি বেরিয়েছিল তা সেই গুহায়
ঢুকে পাটালায় ফিরে যায় ।
অশ্বিনীকুমার
অশ্বিনীকুমারদ্বয়,
নামান্তরে অশ্বিদ্বয়, মূলত বৈদিক দেবতা।
তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সবিত (সূর্যদেব) ও শরণ্যু, নামান্তরে
সংজ্ঞা, দেবীর যমজ পুত্রদ্বয় হিসাবে
উল্লিখিত ও পরিচিত। ঋগ্বেদে
এই যমজ দেবতাদের ভিষক
বা চিকিৎসক হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সূর্য
ও সংজ্ঞা অশ্বরূপে সঙ্গম করার ফলে এই
দুই যমজ পুত্রের জন্ম
হয়েছিল। বহু মূর্তিতেই অশ্বিনীকুমারদের
তাই অশ্বমুখ দেখা যায়। অশ্বরূপে
শরণ্যুসঙ্গমকালে সূর্য আরও এক পুত্র
লাভ করেন। সেই তৃতীয় পুত্রের
নাম রেবন্ত। রেবন্ত অশ্বদের অধিপতি দেবতা। অশ্বিনী সূর্যের অপর নাম। তাই
সূর্যপুত্র এই দুই যমজ
দেবতার নাম অশ্বিনীকুমারদ্বয়। এঁদের ভিতর
যিনি অগ্রজ, তার নাম নাসত্য
এবং যিনি অনুজ, তার
নাম দস্র। ঋগ্বেদে অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের উদ্দেশ্যে একটি সূক্ত গীত
হয়েছে। ক্লাসিকাল সংস্কৃত সাহিত্যেও অশ্বিনীকুমারদ্বয় বারবার উল্লিখিত হয়েছেন। মহাভারতের আদিপর্বের পৌষ্যপর্বাধ্যায়ে উপমন্যোপাখ্যানে দেব-চিকিৎসক হিসাবে
তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। মহাভারতের
আদিপর্বেরই সম্ভবপর্বাধ্যায়ের অন্তর্গত যুধিষ্ঠিরাদির জন্মবৃত্তান্ত থেকে জানা যায়
পাণ্ডুর কনিষ্ঠা পত্নী মাদ্রী সুদর্শন ও চিরতরুণ এই
দেবভিষকদ্বয়ের ঔরসে ক্ষেত্রজ যমজ
পুত্র লাভ করেন যাঁরা
পিতা-দেবতাদের মতনই সুদর্শন ও
অশ্ববান হয়েছিলেন। নাসত্যের ঔরসে নকুল ও
দস্রের ঔরসে সহদেব জন্মলাভ
করেন। নকুল ও সহদেব
পিতৃ-পরিচয়ে আশ্বিনেয় নামেও পরিচিত। একবার চ্যবনের রূপবতী পত্নী স্নানরতা সুকন্যাকে দেখে মোহিত হয়ে
ওঁরা সুকন্যাকে প্রস্তাব করেন চ্যবনকে ত্যাগ
করে ওঁদের একজনকে বিবাহ করতে। সুকন্যা তাতে সম্মত হন
না। ঘটনাচক্রে ওঁদের প্রসাদে চ্যবন তার যৌবন ফিরে
পান। চ্যবনের তখন ওঁদের বর
দেন যে, দেব-কর্মচারী
হলেও ওঁদের সোমপান করবার অধিকার থাকবে।
ব্রতের
ভাতের পূজা
স্বর্গের
চিকিৎসক অশ্বিনী কুমারদ্বয় সূর্যদেব ও সংজ্ঞা’র
পুত্র। অভিশাপগ্রস্ত সংজ্ঞা জগজ্জননী পার্বতীর কাছে নিজের দুর্দশা
থেকে মুক্তি চাইলে পার্বতী এক মুষ্টি চাল
দিয়ে তাকে বলেছিলেন-আশ্বিন
মাসের শেষ তারিখ পূর্বরাত্রে
শেষ দিবস রেখে এই
চাল ভক্তিপূর্বক রন্ধন শেষে মহাদেবের অর্চনা
করতে হবে এবং কার্তিক
মাসের ১ম দিবসে সেই
অন্ন ভক্ষণে মনস্কামনা পূর্ণ হবে। সে নিয়ম
মেনে রোগ ও অভিশাপমুক্ত
হয়েছিলেন দেবী সংজ্ঞা।
অশ্বমেধ যজ্ঞ
অশ্বমেধ হচ্ছে বৈদিক ধর্মের শ্রৌত ঐতিহ্য অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় যজ্ঞ অনুষ্ঠানগুলির
একটি। প্রাচীন ভারতে রাজারা তাদের সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব নতুনত্বকরণের জন্য এই বৈদিক
যজ্ঞের আয়োজন করতেন। সাম্রাজ্যের প্রসার, ক্ষমতা ও গৌরব অর্জন, প্রতিবেশী সাম্রাজ্যের
সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা হল যজ্ঞের উদ্দেশ্য। এই যজ্ঞে সাম্রাজ্যের প্রসারের জন্য
যজ্ঞনিয়ম অনুসারে একটি বলবান অশ্বকে পৃথিবী ভ্রমণের জন্য মুক্ত করা হয়। অশ্ব যে যে
স্থানে গমন করে, যজ্ঞকারী সেই স্থান অধিকার করেন। অশ্বকে কোনো নরপতি আটক করলে তার সাথে
অশ্ব-রক্ষকের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এক বছরের মধ্যে কোনো শত্রুপক্ষ যদি অশ্বটিকে হত্যা
বা বন্দী করতে না পারেন, তখন একে রাজ্যে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর অশ্বসহ অন্যান্য প্রাণীকে
খাবার খাওয়ানো হয় ও পরে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং যজ্ঞ শেষে রাজাকে অধিকৃত অঞ্চলসমূহের
"চক্রবর্তী সম্রাট" হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
মহাভারতের
আশ্বমেধিক পর্বে বর্ণিত অশ্বমেধ যজ্ঞ সবচেয়ে পরিচিত পাঠ্য। কৃষ্ণ এবং ব্যাস সম্রাট
যুধিষ্ঠিরকে এই যজ্ঞ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এছাড়াও দশরথ, পরীক্ষিত, জন্মেজয় অশ্বমেধযজ্ঞ
সম্পন্ন করেছিলেন।
বিগত
শহস্র বছরের মাঝে মাত্র দুজন প্রাচীন শাসক এই যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন বলে নথিভুক্ত
করা হয়। ১৭৪১ সালে দ্বিতীয়টি জয়পুরের মহারাজা জয় সিং এই যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন।
ব্যুৎপত্তি
“মেধ” শব্দের অন্যতম অর্থ হচ্ছে “যজ্ঞ”।
বৈদিক সংস্কৃত ধাতুপাঠ অনুযায়ী মেধৃ ধাতুর ‘মেধা সংগমন য়োর্হিংসায়াং চ’
এই ধাতু পাঠ অনুযায়ী মেধার তিনটি অর্থ হয়- শুদ্ধবুদ্ধি বৃদ্ধি করা, লোকদের মধ্যে
একতা ও প্রেম বৃদ্ধি করা এবং হিংসা। অরবিন্দ ঘোষও উক্ত অর্থে মত দিয়েছেন। তিনি আরও
বলেছেন, "অশ্ব" বা ঘোড়া হলো শক্তির প্রতীক, যে সার্বজনীন কার্যক্রম চালায়।
শতপথ
ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে, অশ্ব শব্দ বীর্যবাচক, দেশবোসীর শৌর্য-বীর্য বৃদ্ধি করা এবং রাষ্ট্রকে
সম্যক্ পরিচালনা করা অশ্বমেধ শব্দের অভিপ্রায়।
দয়ানন্দ সরস্বতীর মতে, "অশ্বমেধ" এর তিনটি অর্থ, যথা: একজন রাজার ন্যায়পরায়ণ ও
ন্যায়সঙ্গতভাবে তার প্রজাদের শাসন করা, একজন বিদ্বান ব্যক্তির মানুষকে বিনামূল্যে
জ্ঞানের উপহার দেয়া এবং বায়ু দূষণ মুক্ত রাখার জন্য ঘি এবং গন্ধযুক্ত ও পুষ্টিকর
পদার্থ আগুনে পোড়ানো।
সুভাষ কাকের মতে, "অশ্ব" অর্থ সূর্য আর "অশ্বমেধ" হলো সূর্যের বার্ষিক
নবায়নের যজ্ঞ, নববর্ষে এবং রাজার শাসন পুনর্নবীকরণ এর সহগামী। আধ্যাত্মিক স্তরে, এটি
অভ্যন্তরীণ সূর্যের সাথে পুনরায় যুক্ত হওয়ার একটি উদযাপন।
স্বামী পূর্নচৈতন্যর মতে, বৈদিক সংস্কৃত ও ধ্রুপদী সংস্কৃত আলাদা হওয়ায় ধ্রুপদী সংস্কৃতে
"অশ্ব" হলো ঘোড়া আর বৈদিক সংস্কৃতে "অশ্ব" এর দুটি অর্থ, যথা:
আত্মা ও রাষ্ট্র।
অন্যদিকে,রাল্ফ টি.এইচ. গ্রিফিথ সায়ণ ভাষ্যের অনুকরণে মতে দিয়েছেন, "অশ্ব" হলো "ঘোড়া" ও "মেধ" হলো "বলিদান"। মনির-উইলিয়ামস্ সংস্কৃত অভিধানেও উক্ত অর্থ পাওয়া যায়।
বাল্মিকী রামায়নে অশ্বমেধ যজ্ঞের বর্ণনা দেখা যায়। রাজা দশরথ পুত্রপ্রাপ্তির কামনায় এক অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। উক্ত বর্ণনায় রাজা যজ্ঞে আগত সকল সৎ এবং উপযুক্ত ব্যাক্তিকে দান ও ভোজনের ব্যবস্থা করেছিলেন। যজ্ঞে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য, শুদ্র -চারি বর্ণের বহু ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে অনেকেই বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন, এবং শত শত প্রাণী, এবং প্রতিটি পর্যায়ে অনেকগুলি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত আচার-অনুষ্ঠান ছিলো। (কিছু অনুবাদে যজ্ঞে বলি ও আহূতি প্রসঙ্গ না এলেও কিছু অনুবাদে যজ্ঞের এক পর্যায়ে ঘোড়া বধ এবং অগ্নিতে আহুতি দেবার কথা এসেছে।
মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে দেখা যায়, ব্যাসদেবের পরামর্শে রাজা যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু করেন। অশ্বমেধ যজ্ঞে রাষ্ট্রের প্রগতি ও প্রজাগণের উন্নতির জন্য রাজা বহু দান-দক্ষিণা করেন এবং রাজ্য প্রসারের জন্য যজ্ঞনিয়ম অনুসারে একটি বলবান অশ্বকে পৃথিবী ভ্রমণের জন্য মুক্ত করা হয়। অশ্ব যেসব স্থানে গমন করে, যজ্ঞকারী সেই স্থান অধিকার করেন। অশ্বকে কোনো নরপতি আটক করলে তার সাথে অশ্ব-রক্ষকের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুধিষ্ঠিরের সেই যজ্ঞের অশ্বকে রক্ষার জন্য অর্জুন নিযুক্ত হয়েছিলেন। অর্জুন পৃথিবীজয়ের পর হস্তিনাপুরে ফিরে আসলে অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু হয়। (কিছু অনুবাদক মহাভারতের অশ্বমেধিক পর্বে যজ্ঞ শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করেননি। অন্যদিকে, কিছু অনুবাদক অশ্বমেধিক পর্বে যজ্ঞ শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন যেখানে যজ্ঞে ঘোড়া বধ করা হয়।
অশ্বমেধ যজ্ঞে অশ্ব বধ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মহাভারতের অশ্বমেধিক পর্বেই যজ্ঞে পশু হত্যার বিরোধিতা
দেখা যায়। যজ্ঞে বলি নিয়ে একটি উপাখ্যানে বলা হয়েছে, দেবরাজ ইন্দ্রের অশ্বমেধ যজ্ঞে
বলির সময় উপস্থিত হলে মহর্ষিদের মাঝে শাস্ত্রবিহিত কর্ম নির্ণয়ে বাদানুবাদ শুরু হয়।
মহর্ষিগণ বলির পরিবর্তে ত্রৈবার্ষিক বীজ দ্বারা যজ্ঞ সম্পন্ন করা শাস্ত্রানুসারে সনাতন
ধর্ম বিহিত কর্ম বলে সিদ্ধান্ত দেন।
শান্তিপর্বে একটি বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়, মহারাজ উপরিচর তার অশ্বমেধ যজ্ঞে হত্যার পরিবর্তে
অরণ্যসম্ভূত বস্তু (ধান্য) দ্বারা যজ্ঞ পরিচালনা করেছিলেন। এ পর্বে আরও দেখা যায়,
দেবতা ও দেবর্ষিগণের মধ্যে "অজা" এর যাজ্ঞিক অর্থ নিয়ে মতভেদ হয়। দেবতারা
এর অর্থ বলেন "ছাগল", কিন্তু দেবর্ষিগণের মতে এর অর্থ হচ্ছে "খাদ্যশস্য",
কোনো পশু নয়। কারণ, যজ্ঞে পশু হত্যা করা সৎপুরুষদের ধর্ম নয়।
বেদের সায়ণ, মহীধর ও উব্বট ভাষ্যেও অশ্ব বধ এবং রাণীকে মৃত অশ্বের সাথে মিলিত হওয়ার বর্ণনা
পাওয়া যায়। দয়ানন্দ সরস্বতী তার ঋগ্বেদীয়ভাষ্য ভূমিকায় উক্ত ভাষ্যকারদের মতসমূহের
বিরোধিতা করেছেন। তার মতে সেখানে অশ্ব বধ এবং রাণীকে মিলিত হওয়ার কথা বলা হয়নি।
চারবেদের
অনেক মন্ত্রে অশ্ব হত্যার নিষেধ পাওয়া যায়। যেমন, অথর্ববেদে বলা হয়েছে,
রাজসূয়,
বাজপেয়, অগ্নিষ্টোম এইসব যজ্ঞ অধ্বর অর্থাৎ হিংষারহিত। অর্ক এবং অশ্বমেধ যজ্ঞ প্রভূর
মধ্যে স্থিত, যাহা জীবের বৃদ্ধিকারী এবং অত্যন্ত হর্ষদায়ক।
— অথর্ববেদ,
১১।৭।৭ (শৌনক শাখা)
শতপথ ব্রাহ্মণের অশ্বমেধ কান্ডে এ যজ্ঞের বর্ণনা পাওয়া যায়। এ বর্ণনা অনুযায়ী, রাজাকে
অশ্ব এবং প্রজা হচ্ছে অশ্ব ব্যতীত অপরাপর পশুর নাম। রাজ্যপালন এবং রাজ্যের উন্নতির
জন্য কর্ম (যেমন: কর ধার্য করা)-কে বলা হয় অশ্বমেধ।অশ্ব হচ্ছে রাজ্যের প্রতিকী নাম।
রাজা কর্তৃক রাজ্যের উন্নতির জন্য যে যজ্ঞ করা হয়, তাই অশ্বমেধ যজ্ঞ। আর রাজার স্ত্রীগণ
রাজ্য পালনের জন্য সন্তানদের শিক্ষা প্রদান করে তাদের আত্মা ও শরীরের বল বৃদ্ধি করবেন
এবং গর্ভস্বরূপ প্রজাসভায় পুত্ররূপ প্রজাকে সুখপ্রাপ্তির ইচ্ছা করবেন।
এছাড়া পদ্ধতিতে দেখা যায়, যজ্ঞের ঘোড়াটির অগ্রভাগ সাদা ও পশ্চাৎভাগ কালো বর্ণের হবে। ৪
চক্ষুযুক্ত কুকুর বধের দ্বারা সংকল্প করতে হবে। এক্ষেত্রে ঘোড়াটিকে সহস্র গো এর সমান
উল্লেখ করা হয়েছে৷ প্রকৃতপক্ষে অশ্ব এক্ষেত্রে সূর্য আর কুকুরটি লুব্ধক (cirius) কে
নির্দেশ করে যা "Dog Star" নামে পরিচিত। যার কেন্দ্রে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি
বিদ্যমান। সকালে সূর্যোদয় এক্ষত্রে তারার উজ্জ্বলতাকে ম্রিয়মান করে। যজ্ঞে
প্রয়োজনীয় স্থাপনার মধ্যে ২১ টি খুঁটি এবং একটি অগ্নি বেদী নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ঘোড়াটি তার ভ্রমণ শুরু করার আগে, জ্যোতিষীদের দ্বারা নির্বাচিত মুহুর্তে, বাড়িতে
একটি অনুষ্ঠান (সংকল্প/ দীক্ষা) ও অভিষেকের দ্বারা বছরব্যাপী যাত্রা শুরু করে।
যজ্ঞের ঘোড়া ফিরে এলে বিভিন্ন আচার পালিত হয়। রানিরা তখন একে ঘিরে ৬ বার প্রদক্ষিণ
ও মন্ত্রোচ্চারণ করেন। প্রধান মহিষী যজ্ঞ কুন্ডের নিকটে আসন গ্রহন করে (উত্তরীয় পরিধান
করে) আহুতি সমাপন করেন।
শ্লোক: 37:
যদ্যপেতে ন পশ্যন্তি লোভোপহতচেতসঃ ।
কুলক্ষয়কৃতং দোষং মিত্রদ্রোহে চ পাতকম্ ॥৩৭॥
শ্লোক: 38:
কথং ন জ্ঞেয়মস্মাভিঃ পাপাদস্মান্নিবর্তিতুম্ ।
কুলক্ষয়কৃতং দোষং প্রপশ্যদ্ভির্জনার্দন ॥৩৮॥
অনুবাদ : হে জনার্দন ! যদিও এরা রাজ্যলোভে অভিভূত হয়ে কুলক্ষয় জনিত দোষ ও মিত্রদ্রোহ নিমিত্ত পাপ লক্ষ্য করছে না, কিন্তু আমরা কুলক্ষয় জনিত দোষ লক্ষ্য করেও এই পাপ কর্মে কেন প্রবৃত্ত হব ?
শ্লোক: 39:
কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি কুলধর্মাঃ সনাতনাঃ ।
ধর্মে নষ্টে কুলং কৃৎস্নমধর্মোহভিভবত্যুত ॥৩৯
অনুবাদ : কুলক্ষয় হলে সনাতন কুলধর্ম বিনষ্ট হয় এবং তা হলে সমগ্র বংশ অধর্মে অভিভূত হয়।
শ্লোক: 40:
অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রীয়ঃ ।
স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্করঃ ॥৪০॥
অনুবাদ : হে কৃষ্ণ ! কুল অধর্মের দ্বারা অভিভূত হলে কুলবধূগণ ব্যভিচারে প্রবৃত্ত হয় এবং হে বার্ষ্ণেয় ! কুলস্ত্রীগণ অসৎ চরিত্রা হলে অবাঞ্ছিত প্রজাতি উৎপন্ন হয়।
| শ্লোক: 41: সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ । পতন্তি পিতরো হ্যেষাং লুপ্তপিণ্ডোদকক্রিয়াঃ ॥৪১॥ সঙ্করঃ, নরকায়, এব, কুলঘ্নানাম্, কুলস্য, চ, পতন্তি, পিতরঃ, হি, এষাম্, লুপ্ত-পিণ্ড-উদক-ক্রিয়াঃ ॥৪১॥ | অনুবাদ : বর্ণসঙ্কর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে কুল ও কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়। সেই কুলে পিণ্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লোপ পাওয়ার ফলে তাদের পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃপতিত হয়। |
| শ্লোক: 42: দোষৈরেতৈঃ কুলঘ্নানাং বর্ণসঙ্করকারকৈঃ । উৎসাদ্যন্তে জাতিধর্মাঃ কুলধর্মাশ্চ শাশ্বতাঃ ॥৪২॥ দোষৈঃ, এতৈঃ, কুলঘ্নানাম্, বর্ণ-সঙ্কর-কারকৈঃ, উৎসাদ্যন্তে, জাতি-ধর্মাঃ, কুলধর্মাঃ, চ, শাশ্বতাঃ ॥৪২॥ | অনুবাদ : যারা বংশের ঐতিহ্য নষ্ট করে এবং তার ফলে অবাঞ্ছিত সন্তানাদি সৃষ্টি করে, তাদের কুকর্মজনিত দোষের ফলে সর্বপ্রকার জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প এবং বংশের কল্যাণ-ধর্ম উৎসন্নে যায়। ফলে সনাতন জাতিধর্ম ও কুলধর্মও বিনষ্ট হয়। |
| শ্লোক: 43: উৎসন্ন কুলধর্মাণাং মনুষ্যাণাং জনার্দন । নরকে নিয়তং বাসো ভবতীত্যনুশুশ্রুম ॥৪৩॥ উৎসন্ন-কুল-ধর্মাণাম্, মনুষ্যাণাম্, জনার্দন, নরকে, নিয়তম্, বাসঃ, ভবতি, ইতি, অনুশুশ্রুম ॥৪৩॥ | অনুবাদ : হে জনার্দন ! আমি পরম্পরাক্রমে শুনেছি যে, যাদের কুলধর্ম বিনষ্ট হয়েছে, তাদের নিয়ত নরকে বাস করতে হয়। |
| শ্লোক: 44: অহো বত মহৎ পাপং কর্তুং ব্যাবসিতা বয়ম্ । যদ্ রাজ্যসুখলোভেন হন্তুং স্বজনমুদ্যতাঃ ॥৪৪॥ অহো, বত, মহৎ, পাপম্, কর্তুম্, ব্যাবসিতাঃ, বয়ম্, যৎ, রাজ্য-সুখ-লোভেন, হন্তুম্, স্বজনম্, উদ্যতাঃ ॥৪৪॥ | অনুবাদ : হায় ! কী আশ্চর্যের বিষয় যে, আমরা রাজ্যসুখের লোভে স্বজনদের হত্যা করতে উদ্যত হয়ে মহাপাপ করতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছি। |
| শ্লোক: 45: যদি মামপ্রতিকারমশস্ত্রং শস্ত্রপাণয়ঃ । ধার্তরাষ্ট্রা রণে হন্যুস্তন্মে ক্ষেমতরং ভবেৎ ॥৪৫॥ যদি, মাম, অপ্রতিকারম্, অশস্ত্রম্, শস্ত্র-পাণয়ঃ, ধার্তরাষ্ট্রাঃ, রণে, হন্যুঃ, তৎ, মে, ক্ষেমতরম্, ভবেৎ ॥৪৫॥ | অনুবাদ : প্রতিরোধ রহিত ও নিরস্ত্র অবস্থায় আমাকে যদি শস্ত্রধারী ধৃতরাষ্ট্র্রের পুত্রেরা যুদ্ধে বধ করে, তা হলে আমার অধিকতর মঙ্গলই হবে। |
| শ্লোক: 46: সঞ্জয় উবাচ এবমুক্ত্বার্জুনঃ সংখ্যে রথোপস্থ উপাবিশৎ । বিসৃজ্য সশরং চাপং শোকসংবিগ্নমানসঃ ॥৪৬॥ এবম্, উক্ত্বা, অর্জুনঃ, সংখ্যে, রথ-উপস্থে, উপাবিশৎ, বিসৃজ্য, সশরম্, চাপম্, শোক-সংবিগ্ন-মানসঃ ॥৪৬॥ | অনুবাদ : সঞ্জয় বললেন- রণক্ষেত্রে এই কথা বলে অর্জুন তাঁর ধনুর্বাণ ত্যাগ করে শোকে ভারাক্রান্ত চিত্তে রথোপরি উপবেশন করলেন। |
| ওং তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে অর্জুনবিষাদযোগো নাম প্রথমোঽধ্যায়ঃ ॥১ | |


Comments
Post a Comment