ঈশ্বর ও দেবতাঃ
ঈশ্বর ও দেবতাঃ
==========
ছান্দোগ্য উপনিষদে (৩:১৪:১) এর সারমর্ম সংক্ষিপ্ত আকারে ব্যক্ত হয়েছে –
‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম তজ্জ্বলানিতি’ অর্থাৎ জগত ব্রহ্মময় ।
শিবপুরাণ জ্ঞানসংহিতা ৬৭ নং শ্লোক
”সর্ব্বং শিবমর্য়ং ব্রহ্ম
শিবাং পরং ন কিঞ্চন । “
আমিই শিব আবার শিবও আমি , এবং তুমিও শিব ।” শিবময় ব্রহ্ম ” ।
এ জগতে শিব ব্যাতিত আর কিছুই নেই ।
শ্রী গীতাঃ৭/১৯
বহুনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্মং প্রপদ্যতে।
বাসুদেবঃ সর্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ।।১৯।।
অনুবাদঃ বহু জন্মের পর তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তি আমাকে সর্ব কারণের পরম কারণ রূপে জেনে আমার শরণাগত হন। জগত বিষ্ণুময় ।
শাক্তধর্মমতে, দেবী হলেন পরব্রহ্ম। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়। অন্য সকল দেব ও দেবী তার রূপভেদমাত্র। দর্শন ও ধর্মানুশীলনের ক্ষেত্রে শাক্তধর্মের সঙ্গে শৈবধর্মের সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। যদিও শাক্তরা কেবলমাত্র ব্রহ্মের শক্তিস্বরূপিণী নারীমূর্তিরই পূজা করে থাকেন। এই ধর্মে ব্রহ্মের পুরুষ রূপটি হল শিব। তবে তার স্থান শক্তির পরে এবং তার পূজা সাধারণত সহায়ক অনুষ্ঠান রূপে পালিত হয়ে থাকে।
প্রধান শাক্ত ধর্মগ্রন্থ দেবীভাগবত পুরাণ-এ দেবী ঘোষণা করেছেন:
"আমিই প্রত্যক্ষ দৈবসত্ত্বা, অপ্রত্যক্ষ দৈবসত্ত্বা, এবং তুরীয় দৈবসত্ত্বা। আমি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব; আবার আমিই সরস্বতী, লক্ষ্মী ও পার্বতী। আমি সূর্য, আমি নক্ষত্ররাজি, আবার আমিই চন্দ্র। আমিই সকল পশু ও পাখি। আবার আমি জাতিহীন, এমনকি তস্করও। আমি ভয়াল কর্মকারী হীন ব্যক্তি; আবার আমিই মহৎ কার্যকারী মহামানব। আমি নারী, আমি পুরুষ, আমিই জড়।
তবে কি দাঁড়াল সকল শক্তির আধার ”মা” । “ জগত মা ময় “ ।
‘গণেশ’ নামটি একটি সংস্কৃত শব্দবন্ধ। ‘গণ’ ও ‘ঈশ’ শব্দদুটির সন্ধির মাধ্যমে এই শব্দটির উৎপত্তি। ‘গণ’ শব্দের অর্থ একটি গোষ্ঠী, সমষ্টি বা বিষয়শ্রেণি এবং ‘ঈশ’ শব্দের অর্থ ঈশ্বর বা প্রভু। গণেশের নামের পরিপ্রেক্ষিতে ‘গণ’ শব্দটির মাধ্যমে বিশেষভাবে একই নামের একপ্রকার উপদেবতার গোষ্ঠীকে বোঝায়। এঁরা গণেশের পিতা শিবের অনুচরবর্গ। সাধারণভাবে ‘গণ’ বলতে বোঝায় একটি বিষয়শ্রেণি, শ্রেণি, গোষ্টী, সংঘ বা জনসমষ্টি। কোনো কোনো টীকাকারের মতে, ‘গণেশ’ নামের অর্থ ‘গোষ্ঠীর ঈশ্বর’ বা পঞ্চভূত ইত্যাদি ‘সৃষ্ট বিষয়সমূহের ঈশ্বর’। ‘গণপতি’ নামটি গণেশ নামের সমার্থক। এটিও একটি সংস্কৃত শব্দবন্ধ। ‘গণ’ ও ‘পতি’ শব্দদুটির মিলনের মাধ্যমে এই শব্দটির উৎপত্তি। এখানে ‘গণ’ শব্দের অর্থ গোষ্ঠী এবং ‘পতি’ শব্দের অর্থ শাসক বা প্রভু। গণপতি শব্দটির উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ২য় সহস্রাব্দে রচিত ঋগ্বেদ গ্রন্থের ২য় মণ্ডলের ২৩ সূক্তের ১ম শ্লোকে। তবে বৈদিক ‘গণপতি’ শব্দটির মাধ্যমে বিশেষভাবে গণেশকে নির্দেশ করা হয়েছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। প্রাচীন সংস্কৃত অভিধান অমরকোষ গ্রন্থে‘গণেশ’ নামের আটটি সমার্থক শব্দ পাওয়া যায়। এগুলি হল: ‘বিনায়ক’, ‘বিঘ্নরাজ’ (যা ‘বিঘ্নেশ’ নামেরও সমার্থক), ‘দ্বৈমাতুর’ (যাঁর দুইজন মাতা), ‘গণাধিপ’ (যা ‘গণপতি’ ও ‘গণেশ’ নামেরও সমার্থক), ‘একদন্ত’ (যাঁর একটি দাঁত, এখানে গণেশের হস্তীমুণ্ডের বাইরের দাঁতের কথা বলা হয়েছে), ‘হেরম্ব’, ‘লম্বোদর’ (যাঁর স্ফীত উদর) ও ‘গজানন’ (যাঁর হাতির মতো মাথা)।
খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে বৈদান্তিক ধর্মসংস্কারক আদি শঙ্কর এই বিশেষ পূজার প্রবর্তন করেছিলেন। গণেশ, শিব, সূর্য, বিষ্ণু ও দুর্গা – এই পঞ্চ দেবদেবীর পূজাকেই বলা হয় পঞ্চদেবতা পূজা বা পঞ্চায়তন পূজা। এই পঞ্চদেবদেবী হিন্দুদের পঞ্চ সম্প্রদায়ের প্রধান দেবতা। বৈদিক দার্শনিক তত্ত্বের বিচারে, এঁরা কেহই পৃথক দেবতা নন, বরং একই সগুণ ব্রহ্মের পাঁচটি পৃথক রূপমাত্র। সম্প্রদায়ভেদে ইঁহাদের একজন পূজকের ইষ্টদেবতা। তাঁকে কেন্দ্রে রেখে পূজক পঞ্চদেবতাকেই পূজা করেন –
একং সৎ বিপ্রাঃ বহুধা বদন্তি – এই ঋক্মন্ত্রের অনুধ্যানে।
ঈশ্বর সম্পর্কে ঋকবেদে বলা আছে-
‘একং সদ বিপ্রা বহুধা বদন্তি (ঋক-১/৬৪/৪৬) অর্থাৎ সেই এক ঈশ্বরকে পণ্ডিতগণ বহু নামে বলে থাকেন।
‘একং সন্তং বহুধন কল্পায়ন্তি’ (ঋক-১/১১৪/৫) অর্থাৎ সেই এক ঈশ্বরকে বহুরূপে কল্পনা করা হয়েছে।
‘দেবানাং পূর্বে যুগে হসতঃ সদাজায়ত’ (ঋক-১০/৭২/৭) অর্থাৎ দেবতারও পূর্বে সেই অব্যাক্ত (ঈশ্বর) হতে ব্যক্ত জগত উৎপন্ন হয়েছে।
সনাতন দর্শনে বহু ঈশ্বরবাদের স্থান নেই বরং আমরা একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। হিন্দু শাস্ত্র মতে, ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। সনাতন দর্শন বলে, ঈশ্বর স্বয়ম্ভূ অর্থাৎ ঈশ্বর নিজে থেকে উৎপন্ন, তার কোন স্রষ্টা নাই, তিনি নিজেই নিজের স্রষ্টা। আমাদের প্রাচীন ঋষিগণ বলে গিয়েছেন, ঈশ্বরের কোন নির্দিষ্ট রূপ নেই (নিরাকার ব্রহ্ম) তাই তিনি অরূপ, তবে তিনি যে কোন রূপ ধারণ করতে পারেন কারণ তিনিই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। ঋকবেদে বলা আছে, ঈশ্বর ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’- ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। ঈশ্বর বা ব্রহ্ম (ব্রহ্মা নন) সম্পর্কে আরও বলা হয়, ‘অবাংমনসগোচর’ অর্থাৎ ঈশ্বরকে কথা (বাক), মন বা চোখ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, তিনি বাহ্য জগতের অতীত।
ঈশ্বরকে বলা হয় নির্গুণ অর্থাৎ জগতের সব গুণের আধার তিনি। আবার ঈশ্বর সগুণও কারণ সর্ব শক্তিমান ঈশ্বর চাইলেই যে কোন গুণের অধিকারী হতে পারেন এবং সেই গুণের প্রকাশ তিনি ঘটাতে পারেন। দেব দেবীগণ ঈশ্বরের এই সগুণের প্রকাশ। অর্থাৎ ঈশ্বরের এক একটি গুণের সাকার প্রকাশই দেবতা। ঈশ্বর নিরাকার কিন্তু তিনি যে কোন রূপে সাকার হতে পারেন আমাদের সামনে কারণ তিনি সর্ব ক্ষমতার অধিকারী। যদি আমরা বিশ্বাস করি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান তাহলে নিরাকার ঈশ্বরের সাকার গুণের প্রকাশ খুবই স্বাভাবিক। তাই ঈশ্বরের শক্তির সগুন রূপ দূর্গা, কালী, পার্বতী; বিদ্যার সগুণ রূপ সরস্বতী; ঐশ্বর্যের সগুণ রূপ লক্ষ্মী, মৃত্যুর রূপ যম। তেমনি ঈশ্বর যখন সৃষ্টি করেন তখন ব্রহ্মা ( ব্রহ্ম নয়), যখন পালন করেন তখন বিষ্ণু আর প্রলয়রূপে শিব। এজন্য বলা হয়ে থাকে ঈশ্বরই ব্রহ্মা,তিনিই বিষ্ণু, তিনিই শিব। তাহলে আমারা এখন বুঝতে পারছি দেব দেবী অনেক হতে পারে কিন্তু ঈশ্বর এক এবং দেবতাগণ এই পরম ব্রহ্মেরই বিভিন্ন রূপ।
Comments
Post a Comment