আমাদের ভারতীয় সভ্যতা

 আমাদের ভারতীয় সভ্যতা

ভারত ও মহাভারত এর অর্থ কি ?

ভারত বলতে আমরা যেটা বুঝি সেটা হলো ভারতবর্ষ বা ভারত উপমহাদেশে । ভারত শব্দটির অর্থ কি বা এইটা কোথা থেকে এলো ?
ভারত নামটির উৎপত্তি হয়েছে হিন্দু পৌরাণিক রাজা ভরতের নামানুসারে। কথিত আছে এই অঞ্চল বা বর্ষ (সংস্কৃত বর্ষ শব্দটির অর্থ ভূখণ্ড ।) রাজা ভরতকে দান করা হয়েছিল বলে এর নাম ভারতবর্ষ।
পুরাণে ‘দক্ষিণে সমুদ্র এবং উত্তরে তুষার আবাস’-এর মধ্যবর্তী ভূমিকে ভারত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অনেকের মতে, কিংবদন্তী রাজা ভরতের নাম থেকে ‘ভারত’ শব্দটির উদ্ভব ঘটেছে। দুষ্মন্ত এবং শকুন্তলার পুত্র ভরতকে, ঋগ্বৈদিক যুগের মানুষের পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়।
তবে, সমাজ বিজ্ঞানী ক্যাথরিন ক্লেমেন্টিন-ওঝার মতে, ভারত কোনও রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক সত্তা নয়। এটি আসলে একটি ধর্মীয় এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সত্তা।
আবার ভারত, এ নামটি বিভিন্ন প্রাচীন সংস্কৃত পুরাণ থেকে এসেছে। যেমন, বায়ু পুরাণে নামটি পাওয়া যায়। ভারত মূলত দেবতা ‘অগ্নি’র একটি নাম। ঋগ্বেদে ভারতী হিসেবে এখানকার অধিবাসীদের, বিশেষ করে যারা দশ-রাজার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, বুঝানো হয়েছে। মহাভারতে ভরতের রাজ্যকে বলা হয় ভারতবর্ষ। ভগবত পুরাণে ভারত শব্দটি জাত ভারতের নাম থেকে এসেছে বলে বর্ণিত।
ভারতবর্ষের আর এক নাম আর্যদেশ ।
=========================
প্রথমত,
ইউরোপীয় পণ্ডিতগণের মতে এবং বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যমতে, আর্যগণ ছিল একদল কৃষিকর্মকারী যাযাবর জাতি। এরা ককেশীয় শ্রেণীভুক্ত আফ্রিকান জাতি যারা খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৭৫হাজার বছর পূর্বে আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে সারা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিশেষত তারা তাদের পশুচারণের জন্য বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতো। এরই ধারাবাহিকতায় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫হাজার বছর পূর্বে এরা বর্তমানের ইরান অঞ্চলে আসে। কথিত আছে, তাদেরই একটি দল কোন এককালে ভারতবর্ষে আগমন করে এবং বসতি গড়ে। মূলত তাদের হাত ধরেই সিন্ধু সভ্যতা গড়ে ওঠে এবং বিকশিত হয়। এরূপে আর্যগণ ভারতবর্ষে বসতি শুরু করলে এর নামকরণ হয় আর্যদেশ।
দ্বিতীয়ত,
সংস্কৃত ভাষায় লিখিত শ্লোক তথা পৌরাণিক গ্রন্থসমূহতে আর্যদের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে আর্য বলতে জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান লোকদের বোঝানো হয়েছে। আবার কারও মতে, আর্য শব্দের অর্থ ঈশ্বরের পুত্র। ঈশ্বরের অনেক পুত্রদের মধ্যে যে পিতার আজ্ঞাবহ, অনুগত, ও জ্ঞানশীল সে আর্য নামে অভিহিত হতো। এই ধারণা অনুয়ায়ী ভারতবর্ষে বসবাসকারী লোকদের ঈশ্বরের পুত্র তথা অত্যন্ত জ্ঞানী মনে করা হয়। ভারতবর্ষে এই শ্রেণীর লোকদের বসবাস হওয়ায় তা আর্যদেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ভারতবর্ষের আর এক নাম জম্বুদ্বীপ ।
======================
জম্বুদ্বীপ
পুরাতন লিপি থেকে জানা যায় যে ভারতবর্ষ নামটির পরিচিতির পূর্বে ভারত, জম্বুদ্বীপ নামেই পরিচিত ছিল। সূর্যসিধান্তের লেখায় পাওয়া জম্বুদ্বীপ।আক্ষরিক অর্থ ধরলে এর মানে হল জাম গাছে ভরা দ্বীপ কিন্তু সনাতন সৃষ্টিতত্ব (মানে হিন্দু বৌদ্ধ কিংবা জৈন) অনুযায়ী জম্বুদ্বীপ মানে হল “সাধারণ মানুষের বাসস্থান”। দার্শনিকভাবে এটা ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নাম হতে পারত। পুরাণ অনুযায়ী এই জায়গা নয়টি পর্বত ও আটটি বর্ষ নিয়ে তৈরি। বৌদ্ধ লিপি মহাবংশ অনুযায়ী অশোকপুত্র মাহিন্দা (পরে যার নাম হয় মহেন্দ্র) অনুরাধাপুরের (সিংহল) অধিপতি দেবনমপিয় তিস্যের কাছে নিজেকে জম্বুদ্বীপ থেকে আসছেন বলেই জানিয়েছিলেন।
==================
ভা মানে তেজ, তেজ, বুদ্ধিমত্তা।
ভাথি মানে আলো নিক্ষেপ করা। বিভাথির অর্থ হল উজ্জ্বল হওয়া।
তারপর, ভাস্কর নামে - যিনি 'সৃষ্টি করেন'/কার 'আলো'/'ভা' - অর্থাৎ সূর্য।
অথবা ভারতীতে - একজন যিনি সম্পূর্ণরূপে তেজ এবং বুদ্ধিমত্তা বা 'সম্পূর্ণ সাদা উজ্জ্বল আলো' বা সত্ত্ব শক্তি ভারতী, বা দেবী সরস্বতী - বুদ্ধিমত্তা, আধ্যাত্মিক উজ্জ্বলতা এবং জ্ঞানের দেবী।
তাই মহান কবি যিনি তাঁর মধ্যে প্রচুর প্রাকৃতিক 'সরস্বতী শক্তি' প্রদর্শন করেছিলেন, তাকে যথাযথভাবে সুব্রমণ্য ভারতী বলা হয়েছিল!
আদি শঙ্করাচার্যের দশনামী সম্প্রদায়ে, শৃঙ্গেরি পিধামে (কর্নাটক) নিযুক্ত স্বামীজিদের প্রায়ই তাদের সন্ন্যাস নামের সাথে 'ভারতী তীর্থ' যুক্ত থাকে। 'ভারতী তীর্থ' যেমন 'আত্মজ্ঞানের দেবীর ঐশ্বরিক জলে পবিত্র করা হয়েছে'।
ভারতী মানে ভরত বা ভরত কন্যা। তাই ভারত তার বিখ্যাত শাসক ভরত থেকে এবং বুদ্ধি বা আত্মজ্ঞানের দেশ ভারতী থেকে এর নাম ভারত পেয়েছে।
ভারতীর অন্য অর্থ হল "বাকপটুতা" এবং মহাসরস্বতী (মহাদেবীর সত্ত্ব-রূপ) নামগুলির মধ্যে একটি।
ভারতীর অর্থ ;- সরস্বতীর নামগুলির মধ্যে একটি, হিন্দুদের বাক, বাগ্মিতা এবং সকল প্রকার জ্ঞানের দেবী।
==================
ভারত এর
ভা অর্থ - তেজ, বুদ্ধিমত্তা।
ভা - উজ্জ্বল হওয়া, উজ্জ্বল বা উজ্জ্বল হওয়া
ভা-আলো/দীপ্তি । { প্রতিভাতে ভা আছে । ভা এখানে জ্ঞানের আলো ।}
রত - দখল করা বা নিযুক্ত করা, সক্রিয়ভাবে অভিপ্রায়।

তা হলে শব্দগত অর্থ যেখানে বাসকারী মানুষ জ্ঞান অন্বেষনে নিযুক্ত সেই জায়গাটা হলো ভারত । আর জ্ঞানের সমাহার যেখানে তাই মহাভারত । মহাভারতে এক লক্ষ শ্লোক ও দীর্ঘ গদ্যাংশ রয়েছে। এই মহাকাব্যের শব্দসংখ্যা প্রায় আঠারো লক্ষ।

বাঙালি কারা?

আর্য্য পুরাণ ঐতরেয় আরণ্যকের বিবরণে জানা যায়, বহুকাল আগে পূর্বদেশে বলি নামে এক রাজা ছিলেন। এই বলি রাজা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম ছিলেন। নিঃসন্তান ও বৃদ্ধ বলি রাজা নিজের উত্তরাধিকারী রেখে যাবার জন্য দীর্ঘতমা মুনিকে নিয়োগ করলেন নিজ স্ত্রী রানী সুদেষ্ণার গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্য।
কিন্তু সুদেষ্ণা নিজে এই বৃদ্ধ অন্ধ ঋষির কাছে না গিয়ে নিজের এক ধাত্রীকন্যাকে পাঠালেন। সেই ধাত্রীকন্যার গর্ভে কাক্ষীবান প্রভৃতি এগারোজন ঋষির জন্ম হয়। তারপর রাজার বিশেষ অনুরোধে সুদেষ্ণা নিজে ওঁর কাছে যান। দীর্ঘতমা রানী সুদেষ্ণার অঙ্গ স্পর্শ করে বললেন, তোমার গর্ভে পাঁচ পুত্রের জন্ম হবে এবং এদের নামে পাঁচটি দেশ হবে। এদের নাম হবে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্ম। অঙ্গের নামে অঙ্গ দেশ, বঙ্গের নামে বঙ্গ দেশ, কলিঙ্গের নামে কলিঙ্গ দেশ, পুণ্ড্রেরর নামে পুণ্ড্র দেশ এবং সুহ্মেরর নামে সুহ্ম দেশ।

বলি রাজার রানী সুদেষ্ণার গর্ভে দীর্ঘতমার দানে প্রাপ্ত পাঁচ পুত্রের এক পুত্র বঙ্গ এবং বঙ্গের নামে গঠিত বঙ্গ দেশের বাসিন্দা বঙ্গ সন্তানেরা আজকের বাঙালি।

বঙ্গ সন্তানদের পূর্ব পুরুষ বা পিতামহ দীর্ঘতমার পরিচয়ঃ
=====================================
মহর্ষি উতথ্য ও তাঁর পত্নী মমতার পুত্র দীর্ঘতমা যখন মমতার গর্ভে ছিলেন তখন উতথ্যের ভ্রাতা বৃহস্পতি বল প্রয়োগ করে মমতার সঙ্গে মিলিত হবার চেষ্টা করেন। গর্ভস্থ দীর্ঘতমা নিজের পা দিয়ে মায়ের জোনিপথ বন্ধ করে পিতৃব্যের এই অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। ক্রুদ্ধ বৃহস্পতি শাপ দেন যে, তুই দীর্ঘ তামসে প্রবিষ্ট হ। (তুই অন্ধ হয়ে জন্মা)। তাই এই অন্ধ পুত্রের নাম হয় দীর্ঘতমা। ধার্মিক ও বেদজ্ঞ হলেও দীর্ঘতমা ছিলেন অত্যন্ত কাম-পরায়ণ। তিনি যখন গোধর্ম গ্রহণ করলেন, তখন প্রতিবেশী মুনিরা ওঁকে ত্যাগ করেন। দীর্ঘতমার পত্নী ছিলেন পরম রূপলাবন্যবতী প্রদ্বেষী। ওঁর পুত্রের নাম গৌতম। দীর্ঘতমার ষাঁড়বৃত্তির জন্য ক্ষুব্ধ হয়ে প্রদ্বেষী পুত্রকে আদেশ দেন দীর্ঘতমাকে গঙ্গাবক্ষে একটি ভেলায় বসিয়ে ছেড়ে দিতে।
স্ত্রী ওঁকে পরিত্যাগ করেছিলেন বলে দীর্ঘতমা স্ত্রীজাতিদের অভিশাপ দেন যে, তাঁদের যাবজ্জীবন একই পতির অধীন হয়ে থাকতে হবে। কোনও নারী যদি অন্যপুরুষের ভজনা করেন (এমন কি তা পতির মৃত্যুর পরে হলেও) তাহলে তাঁকে পতিত হতে হবে। পতিবিহীনা নারীদের সম্পদ থাকলেও - তাঁরা তা ভোগ করতে পারবেন না। করলে অকীর্তি হবে।
ভেলার উপরে বসে গঙ্গা নদীতে ভেসে যাওয়া এ হেন দীর্ঘতমা মুনিকে বলিরাজা উদ্ধার করে নিজ স্ত্রী সুদেষ্ণার গর্ভে সন্তান উৎপাদনে নিয়োগ দেন।

বেদের পূর্ব থেকে ইংরেজ শাসন

তসলীমা নাসরীন এর একটা লেখায় পড়েছিলাম সেখানে তিনি বলেছিলেন , তোমার বাবা ‘র বাবা’র বাবা’র বাবা’র বাবা হিন্দু ছিল। আমি আর একধাপ এগিয়ে বলতে পারি সেই হিন্দু বাবা’র বাবা’র বাবা’র বাবা’র বাবা মনে হয় কেউ কেউ বৌদ্ধ ছিল , তার আগে মনে হয় তারা সনাতন ছিল , কেউ জৈন ছিল কেউ আর্য্য ছিল।আপনি যদি মেঘালয় যান সেখানে খ্রীষ্টান ধর্মের মানুষ বেশী । আবার আপনি যদি আমাদের বান্দরবন যান সেখানে পাহাড়ের ধারে যারা বাস করে , মনে হতে পারে তারা চাকমা , বৌদ্ধ। তাদের মধ্যে অনেকেই খ্রিষ্টান ধর্মালম্বী। ভারতের দু একটি রাজ্যে মনে হয় খ্রিষ্টান ধর্মালম্বী সংখ্যাগুরু। তার অর্থ দাঁড়ালো কালের প্রভাবে আমাদের ভারতবর্ষের মানুষ বিভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করেছে। হতে পারে ভাল লেগে , হতে পারে আর্থিক কারণে , হতে পারে রাজার চাপে , হতে পারে ভাললাগা/ভালবাসার কারণে । কিন্তু সে তার সংস্কৃতি,সভ্যতা ও বাপ দাদার ভাষা থেকে খুব একটা সরে আসেনি।
মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ভীমবেটকা প্রস্তর ক্ষেত্র ভারতে মানববসতির প্রাচীনতম নিদর্শন। এক লক্ষ বছর আগেও এখানে মানুষের বসবাস ছিল। প্রায় ৯০০০ বছর আগে এদেশে স্থায়ী মানববসতি গড়ে উঠে; যা কালক্রমে পশ্চিম ভারতের ইতিহাস-প্রসিদ্ধ সিন্ধু সভ্যতার রূপ ধারণ করে । এই সভ্যতার আনুমানিক সময়কাল ৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। এরপর ভারতে বৈদিক যুগের সূত্রপাত হয়। এই যুগেই হিন্দুধর্ম তথা প্রাচীন ভারতীয় সমাজের অন্যান্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলির আবির্ভাব ঘটে। বৈদিক যুগের সমাপ্তিকাল আনুমানিক ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। আনুমানিক ৫৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয় মহাজনপদ নামে অনেকগুলি স্বাধীন রাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রাজ্য ।
ভারতের জ্ঞাত ইতিহাসের সূচনা হয় ৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সিন্ধু সভ্যতার উন্মেষ ও প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে। পরবর্তী হরপ্পা যুগের সময়কাল ২৬০০ – ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সূচনায় এই ব্রোঞ্জযুগীয় সভ্যতার পতন ঘটে। সূচনা হয় লৌহ-নির্ভর বৈদিক যুগের। এই যুগেই সমগ্র গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে মহাজনপদ নামে পরিচিত ১৬টি প্রধান প্রধান রাজ্য-তথা-জনবসতির উত্থান ঘটে। এই জনপদগুলির অধিকাংশই রাজতান্ত্রিক হলেও এদের মধ্যে "লিচ্ছিবি" ছিল গণতান্ত্রিক। এই জনপদের মধ্যে অন্যতম ছিল মগধ।খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে মগধে জন্মগ্রহণ করেন মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধ; পরবর্তীকালে যাঁরা ভারতের জনসাধারণের মধ্যে শ্রমণ ধর্মদর্শন প্রচার করেন।
ঋক্ বেদ, রামায়ণ ও মহাভারতসহ প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উৎস হিসেবে স্বীকৃত অন্যান্য গ্রন্থগুলোতে যুদ্ধবিগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনী গড়ে উঠেছে দুটি ভিন্ন ভিন্ন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। অযোধ্যা অধিপতি শ্রীরাম চন্দ্র এবং লঙ্কার রাজা রাবনের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের কাহিনী নিয়ে গড়ে উঠেছে রামায়ণ। অপরপক্ষে কৌরব ও পান্ডবদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের কাহিনী নিয়ে হয়েছে মহাভারত। এছাড়াও প্রাচীন ভারতের একটি যুদ্ধ সম্পর্কে প্রথম ও প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋক্ বেদের সপ্তম মন্ডলে, যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে দশ রাজার যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। ঋক্ বেদ-এ উল্লেখিত এই যুদ্ধের বর্ণনা দ্বারা তৎকালে বিদ্যমান রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পর্কেও জানা যায়। এই যুদ্ধটি সম্ভবত রাম-রাবণ কিংবা কুরু-পান্ডবের যুদ্ধের অনেক আগে সংঘটিত হয়েছিল। দশ রাজার এই যুদ্ধে (ঋক্))বৈদিক যুগের প্রাচীন ভারতের উল্লেখযোগ্য জনপদসমূহের সব জনগণ জড়িয়ে পড়েছিল। এই যুদ্ধটি পারুস্নি (পরবর্তী নাম রবি) নদীর তীরে সংঘটিত হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, প্রাচীন ভারতের দশটি উপজাতি-ভৃগু, দ্রুহায়ু, তুরভাসা, পাক্থা (বর্তমানের পাঠান বা পশ্তু), ভালানাস, আলিনা, ভিসানিন, শিবা, অনু, এবং পুরু। এই দশ উপজাতি তাদের দশজন রাজার নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ ছিল। রাজা সুদস-এর বিরুদ্ধে এরা যুদ্ধে অবতীর্ন হয় এবং এভাবেই দশ রাজার যুদ্ধ নামে এটি পরিচিতি পায়। এখানে অন্যান্য কিছু উপজাতির কথাও বলা হয়ে থাকে যেমন, অজ, ইয়াক্ষু, এবং শিগরু এদের নাম দশ রাজার যুদ্ধের মধ্যে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। তবে তারা তাদের নিজেদের রাজাদের নেতৃত্বে পরিচালিত নাও হয়ে থাকতে পারেন। আবার সব রাজাদের নাম উল্লেখ করা নাও হয়ে থাকতে পারে। যেমন কাবাশা, ভেদ, এবং পৃষ্ণি প্রভৃতি কয়েকজন রাজার কথা জানা যায়, যাদের নাম এখানে উল্লেখিত হয় না। এক্ষেত্রে আর একটি মত হচ্ছে, এই যুদ্ধে জড়িত রাজা এবং দলপতিদের তালিকা আসলে দশ জনের বেশী, তবে ঋক্ বেদে হয়তো এই তালিকাটি মোটামুটিভাবে ‘দশ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দশ-এর বেশী রাজাদের তালিকা যারা রাজা সুদস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ন হয়েছিলেন তাদের নামগুলো হচ্ছে: পুরু, যদু, তুরভাসা, অনু, দ্রুহায়ু, আলিনা, পাক্থা, ভালিনাস, শিবা, ভিসানিন, সিমাইয়ু, বৈকর্ন এবং অন্যান্যরা এই যুদ্ধে জড়িত ছিলেন। তবে এটি মোটামুটি ধরে নেয়া হয় যে, কিংবদন্তির এই যুদ্ধে প্রাচীন ভারতের দশটি উপজাতীয় প্রধান (রাজা) ভরত উপজাতির অন্তর্ভূক্ত ত্রত্সু উপজাতির রাজা সুদস-কে ক্ষমতাচ্যুত তথা ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। রাজা সুদাস ছিলেন ভরত রাজার ষোড়শ বংশধর।
উপরে উল্লিখিত দশ রাজা অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ক্ষুদ্রতর শক্তিগুলো দ্বারা সমর্থিত এবং খ্যাতনামা ভবিষ্যদ্বক্তা বিশ্বমিত্র কর্তৃক প্ররোচিত হয়েছিলেন। এদের অনেকেই রাজা সুদস-এর মিত্র ছিলেন এবং ভারতবাসীদের সাথে বানিজ্য করতেন ও তাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন। কিন্তু সেই চূড়ান্ত দিনে তারা সুদস এবং তার ক্ষুদ্র অথচ শক্তিশালী ভরত উপজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। এভাবে এইসব সুপিরিয়রদের সম্মিলিত শক্তির দ্বারা পরিবেষ্ঠিত হয়ে সুদস-এর টিকে থাকার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। দশ রাজার ইচ্ছা ছিল সুদস ও ভরতদের ধ্বংস করা, তাদেরকে দাসে পরিণত করা, ভরত ভূমিকে বিভক্ত করা, এবং যুদ্ধ শেষে তা দখল করে নেয়া। এই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য একদিন তাদের বিরাট সেনাবাহিনী পারুসনি নদীর তীরে সমবেত হয়ে রাজা সুদস-কে যুদ্ধে আহ্বান করল।
সৈন্য সংখ্যার দিক দিয়ে বিরাট পার্থক্য, অসম শক্তিসম্পন্ন, এবং সুদস-এর চিন্তা ও কল্পনার বাইরে তাই যুক্তিসঙ্গতভাবে তাঁর উচিত ছিল আত্মসমর্পন করা। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রাজা সুদস-কে জনগণ সমর্থন করত, তাঁকে ভালোবাসত এবং একজন ন্যায়পরায়ন রাজা হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব, দয়া এবং দানশীলতাকে তারা শ্রদ্ধা করত। এভাবে জনগণের সমর্থনপুষ্ট হয়ে তিনি আত্মসমর্পনের পরিবর্তে যুদ্ধে অবতীর্ন হলেন।
যুদ্ধ করার এই সিদ্ধান্তে তিনি তাঁর গুরু কিংবদন্তির আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব বশিষ্ঠ মুনির সমর্থন পেয়েছিলেন। আর এভাবে রবি নদীর তীরে এক ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ দিনে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে স্বীকৃত ও উল্লেখযোগ্য প্রথম যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল।
ঋক্ বেদ থেকে জানা যায় যে, সমস্ত প্রকার প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভরত রাজ্যের রাজা সুদাস দশ রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং জয় লাভ করেছিলেন। এই যুদ্ধটি ছিল অসম্ভব ব্যাপার এবং জয়লাভ করা ছিল একটি অলৌকিক ঘটনা। তবে সুদস এবং ভরতগণ শুধু জয়লাভই করেন নাই তারা তাদের শত্রুপক্ষ দশ রাজার সম্মিলিত শক্তিকে নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রাজা সুদস-এর এক বুদ্ধিদীপ্ত যুদ্ধ কৌশল, রবি নদী এবং সেসময়ের ঝড়-ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশ এই অলৌকিক বিজয়ে সাহায্য করেছিল।
যেভাবেই হোক না কেন ভরতগণ এই যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন। আর এর ফলশ্র“তিতে তারা প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী উপজাতি হিসেবে আবির্ভূত হতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা সুদাস-এর বংশধরগণ পুরু এবং কুরু এই দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন ।
এইভাবে দশ রাজার যুদ্ধ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে মোড় ঘোরানো বা কাল নির্ধারণী এক ঘটনা। কারণ এই যুদ্ধে জয়লাভের পরেই রাজা সুদাস তাঁর নেতৃত্বাধীন ভরত উপজাতিকে বিশ্বের এই অংশের শাসক উপজাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ষোড়শ মহাজনপদ
===========
খ্রিস্ট পূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারত ঐক্যবদ্ধ ছিল না । মূলত বৌদ্ধ ও জৈন শাস্ত্র থেকে জানতে পারা যায় যে, ওই সময় ভারত ষোলটি রাজ্য বা মহাজনপদে বিভক্ত ছিল । যথা—
(১) অঙ্গ (বর্তমান পূর্ব বিহারের মুঙ্গের ও ভাগলপুর),
(২) মগধ (বর্তমান দক্ষিণ বিহারের পাটনা, গয়া এবং সাহাবাদের কিছু অংশ),
(৩) বৃজি (বর্তমান বিহারের গঙ্গানদীর উত্তর দিকের অঞ্চল),
(৪) কাশী (বর্তমান উত্তর প্রদেশের বারাণসী),
(৫) কোশল (বর্তমান উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা),
(৬) মল্ল (বর্তমান উত্তর প্রদেশের দেওরিয়া, বস্তি, গোরক্ষপুর এবং সিদ্ধার্থ নগর ),
(৭) চেদি (যমুনা ও নর্মদার মধ্যবর্তী অঞ্চল),
(৮) বৎস (বর্তমান উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ ও মির্জাপুর ),
(৯) কুরু (বর্তমান থানেশ্বর, দিল্লি ও মিরাট অঞ্চল ),
(১০) পাঞ্চাল (বর্তমান উত্তর প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চল, বেরিলি, বদায়ুন ও ফরক্কাবাদ),
(১১) মৎস (বর্তমান রাজস্থানের আলোয়ার, ভরতপুর ও জয়পুর অঞ্চল ),
(১২) সুরসেন (বর্তমান উত্তর প্রদেশের মথুরা),
(১৩) অস্মক (বর্তমান গোদাবরীর দক্ষিণতীর),
(১৪) অবন্তী (বর্তমান মালয়),
(১৫) গান্ধার (বর্তমান পাকিস্তানের পেশোয়ার ও রাওয়ালপিন্ডি)
(১৬) কম্বোজ (দক্ষিণ-পশ্চিম কাশ্মীর)।
এই মহাজনপদ গুলির অধিকাংশ রাজতান্ত্রিক হলেও, দু-একটি রাজ্যে (যেমন-বৃজি ও মল্ল) প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল । রাজনৈতিক প্রাধান্য বিস্তারের জন্য রাজ্যগুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা লেগেই থাকতো । ক্রমে চারটি রাজ্য (মগধ, কোশল, অবন্তি ও বৎস) অপর রাজ্য গুলিকে গ্রাস করে শক্তিশালী হয়ে ওঠে । তারপর সাম্রাজ্য গঠনের জন্য ঐ চারটি রাজ্য যুদ্ধে লিপ্ত হয় । অবশেষে মগধ এই যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ভারতে প্রথম একটি ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য স্থাপন করে ।
রামায়ন ও মহাভারতের কিছু বংশ পরম্পরা পরিচিতি ।
===================================
বিশ্বামিত্র মুণী ও দিব্যাঙ্গনা মেনকার গর্ভজাত কন্যা শকুন্তলা।
রামচন্দ্রের পূর্ব বংশধর রাজা মান্ধাত্বা থেকে পুরু রাজা । সেই বংশে জন্ম নিয়েছিলেন রাজা দুষ্মন্ত।
এই রাজা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার গর্ভে জাত হলেন রাজা ভরত। এই ভরতের বংশে জন্মগ্রহণ করলেন রাজা হস্তী । রাজা হস্তী প্রতিষ্ঠা করলেন হস্তিনাপুর।
রাজা হস্তীর সন্তান অজমীঢ়। অজমীঢ় ও স্ত্রী ধূমিনীর সন্তান ঋক্ষ্ম , ঋক্ষ্মর সন্তান রাজা সংবরণ , সংবরণ ও তপতীর সন্তান কুরু। কুরুর সন্তান প্রতীপ , প্রতীপ রাজার সন্তান রাজা শান্তনু। রাজা শান্তনুর সন্তান ভীষ্ম ,‌চিত্রবীর্য্য ও বিচিত্র বীর্য্য । রাজা বিচিত্র বীর্য্যর সন্তান ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডব । ধৃতরাষ্ট্রে সন্তান দুর্য্যোধন সহ ১০০ পুত্র। আবার পান্ডুর পাঁচ সন্তান। যুধীষ্টির , ভীম , অর্জুন , নকুল সহদেব। অর্জুনের সন্তান অভিমুণ্য । অভিমুণ্যর সন্তাণ পরীক্ষিত । পরিক্ষীত পুত্র জন্মেজয় । এরপর কুরুবংশের যবনিকা।
অজমীঢ় ও স্ত্রী নীলিনীর গর্ভে আসে পাঁচ পুত্র। মৃদগল , সৃঞ্জয় , বৃহদিষু , যবনীর ও কৃমিলাশ্ব। এই পাঁচ ভাই মিলে প্রতিষ্ঠা করেন পাঞ্চাল রাজ্য। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা ছিলেন সৃঞ্জয়। এই বংশে জন্মগ্রহণ করেন রাজা সুদাস।সুদাসের পিতার নাম ছিলো দিবোদাস।সুদাসের সন্তান প্রিশতা । প্রিশতার সন্তান রাজা দ্রুপদ । পাঞ্চাল রাজা দ্রুপদের কন্যা হলেন দ্রৌপদী।
==================
সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য সুপরিচিত। ঐতিহাসিক সিন্ধু সভ্যতা এই অঞ্চলেই গড়ে উঠেছিল। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে এখানেই স্থাপিত হয়েছিল বিশালাকার একাধিক সাম্রাজ্য। নানা ইতিহাস-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যপথ এই অঞ্চলের সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য সভ্যতার বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রক্ষা করত। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ—বিশ্বের এই চার ধর্মের উৎসভূমি ভারত। খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দে জরথুষ্ট্রীয় ধর্ম (পারসি ধর্ম), ইহুদি ধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলাম এদেশে প্রবেশ করে, ও ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।
অব্যবহিত পরবর্তীতেই একাধিক বৈদেশিক শাসনে আওতায় চলে আসে উত্তর-পূর্বের এই অঞ্চল। এগুলির মধ্যে ৫৪৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ প্রতিষ্ঠিত হখামনি পারসিক সাম্রাজ্য ৩২৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ মহামতি আলেকজান্ডারের রাজত্বকাল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পাঞ্জাব ও গান্ধার অঞ্চলে ব্যাকট্রিয়ার প্রথম ডিমেট্রিয়াস কর্তৃক ১৮৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে স্থাপন করেন ইন্দো-গ্রিক রাজ্য। প্রথম মিনান্ডারের আমলে গ্রিকো-বৌদ্ধ যুগে এই রাজ্য বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির চরমে পৌঁছায়।
খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রতিষ্ঠিত ও মহামতি অশোকের শাসিত মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে দক্ষিণ এশিয়ার সিংহভাগ অঞ্চল একত্রিত হয়।
গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০ - খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯)
গ্রীক দার্শনিক প্লেটো প্লেটো (খ্রিষ্টপূর্ব ৪২৭ - খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪৭)
গ্রীক দার্শনিক এরিষ্টটল (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪ – ৭ই মার্চ, খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২)
ম্যাসিডনের তৃতীয় আলেকজান্ডার (২৩ অথবা ২৯ জুলাই ৩৫৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ – ১০ অথবা ১১ জুন ৩২৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য যিনি গ্রিকদের নিকট সান্দ্রোকোত্তোস বা আন্দ্রাকোত্তাস নামে পরিচিত ছিলেন, (৩৪০ খ্রিস্টপূর্ব-২৯৮ খ্রিষ্টপূর্ব) মৌর্য্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রথম সম্রাট যিনি বৃহত্তর ভারতের অধিকাংশকে এক শাসনে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হতে ২৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্বেচ্ছা অবসর নেওয়া পর্য্যন্ত রাজত্ব করেন ও তাঁর পরে তাঁর পুত্র বিন্দুসার সিংহাসনে আরোহণ করেন।
আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর ব্যাক্ট্রিয়া ও সিন্ধু নদ পর্য্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্যের পূর্বদিকের অংশ সেনাপতি প্রথম সেলেউকোস নিকাতোরের অধিকারে আসে। ৩০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে প্রথম সেলেউকোস নিকাতোর তাঁকে আরাখোশিয়া, গেদ্রোসিয়া ও পারোপামিসাদাই ইত্যাদি সিন্ধু নদের পশ্চিমদিকের বিশাল অঞ্চল সমর্পণ করতে এবং নিজ কন্যাকে তাঁর সাথে বিবাহ দিতে বাধ্য হন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তির পর প্রথম সেলেউকোস নিকাতোর পশ্চিমদিকে প্রথম আন্তিগোনোস মোনোফথালমোসের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। চন্দ্রগুপ্ত প্রথম সেলেউকোস নিকাতোরকে ৫০০টি যুদ্ধ-হস্তী দিয়ে সহায়তা করেন। যা ইপসাসের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে তাঁকে জয়লাভে সহায়তা করে।
আমরা সবাই পড়েছি গ্রীকদের নগররাষ্ট্র ছিল। আর সেই সময় আমাদের সম্রাজ্য ছিল।
এই চন্দ্রগুপ্ত ও তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা চাণক্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করেন। চাণক্য রচিত অর্থশাস্ত্রের ওপর নির্ভর করে চন্দ্রগুপ্ত একটী শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রশাসন গড়ে তোলেন। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য ও কৃষির উন্নতির সাথে সাথে এই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার ফলস্বরূপ একটি শক্রিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। মেগাস্থিনিসের বর্ণনা অনুসারে, চন্দ্রগুপ্তের মৌর্য্যের বিশাল সেনাবাহিনীতে ৪ লক্ষ সৈন্য ছিল।
চাণক্য বা কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩ অব্দ) ।
কজন প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা এবং অর্থশাস্ত্র নামক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন। চাণক্য রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে প্রাচীন ভারতের একজন দিকপাল ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বগুলি চিরায়ত অর্থনীতির বিকাশ লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।চাণক্যের রচনা গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনের শেষ দিকে অবলুপ্ত হয় এবং ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে পুনরাবিষ্কৃত হয়। প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক চাণক্য পরবর্তীকালে মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উত্থানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ও তাঁর পুত্র বিন্দুসারের রাজ-উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এই চানক্য ছিলেন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ।
আসুন আমরা তক্ষশীল বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু ধারণা গ্রহণ করি।
খ্রি: পু: ৪১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত তক্ষশীলা বিদ্যাপিঠে ১টি লাইব্রেরিও ছিল,যেখানে অসংখ্য তাল পাতার লেখ্য ছিল। ঐ সংগ্রহশালায় হিন্দুইজম, রাজনিতি, সাহিত্য,মেডিসিন আর দর্শনের অনেক উপাদান ছিল। এখানকার শিক্ষার উচু মানের জন্য একে ভারতের ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপিটাল বলা হতো।
তক্ষশীলা হলো প্রাচীন ‘গান্ধার’ রাজ্যের রাজধানী যার অবস্থান ছিল বর্তমান পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল)উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। এটি পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত ছাত্র ভর্তি হতো ১৬ বৎসর বয়সে। এই সময় এরা বেদ অধ্যয়ন করতো। ১৮ বৎসর বয়স থেকে ছাত্রদের শেখানো হতো শিল্পকলা, তীর নিক্ষেপ, শিকার, আইন, চিকিৎসা এবং সমরবিদ্যা। শিক্ষকদের জন্য আবসিক ব্যবস্থা ছিল। বিভিন্ন পণ্ডিতদের কাছে পর্যায়ক্রমে এ সকল শিক্ষা চলতো। বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশের পর হতে শিক্ষা দেওয়া শুরু হয়েছিল বৌদ্ধ দর্শন। উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রগুলো ছিল— বেদ, ভাষা, ব্যাকরণ, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র (আয়ুর্বেদ), ধনুর্বিদ্যা, রাজনীতি, যুদ্ধবিদ্যা, জ্যোতিঃশাস্ত্র, হিসাব বিজ্ঞান, গণিত, অর্থনীতি, সঙ্গীত ও হস্তশিল্প।
প্রায় ১০ হাজারের উপর ছাত্র-শিক্ষকের মুখরিত ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রদের কাছ থেকে শিক্ষা বাবদ এবং থাকা-খাওয়ার জন্য অর্থ গ্রহণ করতো বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু শিক্ষক ও বিশ্বদ্যালয়ের অন্যান্য খরচ আসতো রাজকোষ ও ছাত্রদের কাছ থেকে। দরিদ্র ছাত্ররা তক্ষশীলায় নানা রকম কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ মেটাতো।
তক্ষশীলার নামকরণ হয়েছে রামের ভাই ভরত ও তার স্ত্রী মান্দভির পুত্র তক্ষের নামানুসারে। কিংবদন্তিতে রয়েছে, তক্ষ একটি রাজ্য শাসন করতেন যার নাম ছিল তক্ষ খন্ড এবং তিনিই তক্ষশীলা নগরের প্রতিষ্ঠা করেন।
এখানে উচ্চ শিক্ষার জন্য রাজগৃহ (Rajagriha), বেনারস (Benaras), মিথিলা (Mithila), উজ্জয়িনী (Ujjaini) আরকোশল (Kosala)-এর মতো দূর দূরান্ত থেকে ছাত্র আসতো। আলেকজান্ডারের সময়কার দার্শনিকরাও এখানে সমাদৃত ছিলেন।
মহাভারত থেকে জানা যায় দায়ময় (Dhaumya) আর তার ছাত্র উদ্ধলকা (Uddalaka), অরুনী (Aruni) আর ভেদা (Veda)এর মতো শিক্ষকরা এখানে শিক্ষকতা করেছেন। এখানে একেকজন পন্ডিত তার সিনিয়ার ছাত্রদের সহযোগিতায় গড়ে তুলতেন নিজস্ব একেকটা ইন্সটিটিউট। আর একেকজন পন্ডিতের প্রতিষ্ঠানে রাজপুত্র থেকে শুরু করে বিদেশি সহ নানা শ্রেণীর অনধিক ২০ জন ছাত্র আর পুরো তক্ষশীলায় আনুমানিক ৫ শতাধিক ছাত্র অধ্যায়ন করতো । পৃথিবীর প্রথম এই বিদ্যাপিঠ অন্যান্য সভ্যতায়ও এর অবদান অনস্বিকার্য।
বিবাহ মানেতো শুধু দুইজন ছেলেমেয়ের ঘর নয় এর সংগে যুক্ত হয় সামাজিক রাজনৈতিক আদানপ্রদান । সেসময় চন্দ্রগুপ্তের হাত ধরেই গ্রীক সভ্যতার সংগে ভারতীয় সভ্যতার যোগাযোগ শুরু হয়।একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে প্লেটো যখন তার দি এ্যাকাডেমী প্রতিষ্ঠা করেন তখন আমাদের বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল।সম্রাট চন্দ্র গুপ্ত জৈন ধর্মালম্বী ছিলেন।
কেমন ছিল খ্রীষ্টজন্মের ৩০০ বছর পূর্বে আমাদের শাসণ ব্যবস্থা ঃ মৌর্য্য
শাসন ব্যবস্থা ।=============================================
গ্রাম নিয়ন্ত্রন করত গ্রামিক উপাধিকারী
৫/১০ টি গ্রামিক উপাধিকারী নিয়ন্ত্রন করত গোপ ।
৫/১০ জন গোপ নিয়ন্ত্রন করত প্রদেষ্ট্রি।( এদেরকে সমাহর্ত্রীর ভ্রাম্যমান সহকারীও বলা হত। )
কয়েকজন প্রদেষ্ট্রিকে নিয়ন্ত্রন করত স্থানিক। ( একটি জনপদের একচতুর্থাংশকে বলা হত স্থানিক।)
জনপদ শাসন করতেন সমাহর্ত্রী ।
কয়েকটি জনপদ নিয়ে গঠিত হত প্রদেশ । আর প্রদেশের শাসন কার্য্য পরিচালনার দায়িত্ব ছিল কুমার উপাধিকারি “ প্রদেশ পাল “ ।
আর রাজা সবার উপরে । যিনি থাকতেন রাজধানী পাটলিপুত্র তে।
কৌটিল্য’র অর্থশাস্ত্র মোতাবেক রাজা কে ধর্মপ্রবর্তক ও আইনপ্রণয়নে সর্বোচ্চ বলে অভিহিত । রাজা শাসণ বা রাজকীয় অনুশাসন ছিল সকল আইনের উৎস।
রাজাকে সহায়তা করার জন্য থাকত সচিব বা অমাত্য। এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণদেরকে বলা হতো মন্ত্রীণ বা মহামন্ত্রী ।আবার রাজা উপদেষ্টা নিয়োগ দিতেন। যাদের কে নিয়ে তিনি মন্ত্রীপরিষদ গঠন করতেন। তবে উপদেষ্টা অপেক্ষা মন্ত্রীণ বা মহামন্ত্রীদের ক্ষমতা ছিল বেশী। একটি অর্থ হিসাব করলেই তা পাওয়া যাবে। মহামন্ত্রীদের বেতন ছিল ৪৮০০০ পাণ। আর উপদেষ্টা ও প্রদেশপালদের বেতন ছিল ১২০০০ পাণ।
রাজা রাজকার্য্য পরিচালনার জন্য মন্ত্রীপরিষদের সংগে আলোচনা করে উপরাজ্যপাল , কোষাধক্ষ্য , বিচারক , সেনাপ্রধান ইত্যাদি নিয়োগ দিতেন।
এ ছাড়াও দেওয়াণী ও ফৌজদারী মামলার বিচারক , রাজস্ব আদায় বিভাগের কর্মকর্তা সমহর্ত্রী , কোষাগারের ভারপ্রাপ্তকর্মকর্তা সন্নিধাত্রী ও প্রমোদ উদ্যানের তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দিতেন।
রাজার ধর্মীয় বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। তাকে বলা হতো রাজ পুরোহিত। রাজকর্মচারীদের মধ্যে তার স্থান ছিল সবার উপরে। তারপরে ছিলো যুবরাজের।
রাজা সেনাপ্রধান নিয়োগ দিতেন। রাজার ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার জন্য ছিল প্রতিহার।
বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব পালন করতেন অধ্যক্ষগণ । যেমন নগরাধ্যক্ষ , বলাধ্যক্ষ , সুতাধ্যক্ষ , সুত্রাধক্ষ্য ইত্যাদি।
রাজার অধীনে নৌ বাহিনীও ছিল।
রাজার আয় ছিল প্রধানত ফষলের উপর করের উপর। কর ছিল উৎপাদিত ফষলের ১/৬ অংশ। কোন কোন সময় ১/৪ অথবা ১/৮ করতে পারত।জন্মকর ছিল , মৃত্যুকর ছিল। নগরে বিক্রিত পন্যের উপর কর ছিল। বিচার সংক্রান্ত ব্যাপারে জড়িমানার ব্যবস্থা ছিল।শিল্পোৎপাদন ও শিল্পজাত দ্রব্য বিক্রির উপর ছিল প্রায় ১/১০ অংশ কর।গণিকা ও জুয়ার আড্ডা থেকেও কর সংগ্রহ করা হত।
রাজা গুপ্তচর নিয়োগ দিতেন। গুপ্তচর ছিল দুই ধরণের।সংস্থা ও সঞ্চারা। সংস্থা একজায়গায় স্থির থাকত। আর সঞ্চারা ঘুরেফিরে তথ্য সংগ্রহ করত।সে সময় অনেক নারীও গুপ্তচরবৃত্তির কাজ করত।
========
জৈনধর্ম (প্রথাগত নাম জিন সাশন বা জৈন ধর্ম) হল একটি ভারতীয় ধর্ম। এই ধর্ম সকল জীবিত প্রাণীর প্রতি অহিংসার শিক্ষা দেয়। জৈন ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন অহিংসা ও আত্ম-সংযম হল মোক্ষ এবং জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তিলাভের পন্থা।
"জৈন" শব্দটি এসেছে সংস্কৃত "জিন" (অর্থাৎ, জয়ী) শব্দটি থেকে। যে মানুষ আসক্তি, আকাঙ্ক্ষা, ক্রোধ, অহংকার, লোভ ইত্যাদি আন্তরিক আবেগগুলিকে জয় করেছেন এবং সেই জয়ের মাধ্যমে পবিত্র অনন্ত জ্ঞান (কেবল জ্ঞান) লাভ করেছেন, তাঁকেই "জিন" বলা হয়। "জিন"দের আচরিত ও প্রচারিত পথের অনুগামীদের বলে "জৈন"।
জৈনধর্ম শ্রমণ প্রথা থেকে উদ্গত ধর্মমত। এটি বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মমতগুলির অন্যতম।জৈনরা তাঁদের ইতিহাসে চব্বিশজন তীর্থঙ্করের কথা উল্লেখ করেন। এঁদের শিক্ষাই জৈনধর্মের মূল ভিত্তি। প্রথম তীর্থঙ্করের নাম ঋষভ এবং সর্বশেষ তীর্থঙ্করের নাম মহাবীর।
জৈনধর্মের দ্বিতীয় প্রধান আদর্শ হল ‘অনেকান্তবাদ’। জৈনদের কাছে, ‘অনেকান্তবাদ’ হল মুক্তমনস্ক হওয়া। এর মধ্যে সকল মতাদর্শ গ্রহণ ও বিভিন্ন বিশ্বাসের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা এর অঙ্গ। জৈনধর্ম এই ধর্মের অনুরাগীদের বিপরীত ও বিরুদ্ধ মতবাদগুলিকে বিবেচনা করার শিক্ষা দেয়। জৈনদের অনেকান্তবাদ ধারণাটি মহাত্মা গান্ধীর ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও অহিংসার আদর্শকে অনুপ্রাণিত করেছিল।

প্রথম মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ও তাঁর পত্নী দুর্ধরার সন্তান ছিলেন বিন্দুসার ।বিন্দুসার (খ্রিস্টপূর্ব ৩২০ - খ্রিস্টপূর্ব ২৭২) দ্বিতীয় মৌর্য্য সম্রাট ছিলেন, যিনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের পর ২৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিংহাসন লাভ করেন। তিনি যিনি গ্রিকদের নিকট আমিত্রোখাতেস বা আল্লিত্রোখাদেস নামে পরিচিত ছিলেন, যা সংস্কৃত শব্দ অমিত্রঘাত বা শত্রু বিনাশকারী থেকে উদ্ভূত হয়েছে। তিনি অজাতশত্রু নামেও পরিচিত ছিলেন।
বিন্দুসার প্রথম মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ও তাঁর পত্নী দুর্ধরার সন্তান ছিলেন। জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয় সিংহসেন। জৈন প্রবাদানুসারে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উপদেষ্টা চাণক্য শত্রু দ্বারা বিষপ্রয়োগে হত্যা করার চেষ্টার বিরুদ্ধে শারীরিক প্রতিষেধক তৈরী করার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যকে তাঁর অজান্তে অল্প মাত্রায় বিষ পান করাতেন। একদিন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য তাঁর বিষযুক্ত খাবার অন্তঃসত্ত্বা দুর্ধরার সঙ্গে ভাগ করে খেলে, দুর্ধরার মৃত্যু হয়। তাঁর সন্তানকে বাঁচাতে চাণক্য সদ্যমৃত দুর্ধরার পেট কেটে তাঁকে বের করে আনেন।
এই বিন্দুসার ছিলেন আজীবক ধর্মে দীক্ষিত।( আজীবিক একটি অন্যতম মুখ্যত ভারতীয় ধর্ম। এই ধর্ম ২০০০ বছর ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত ছিল। মক্খলি গোসালা এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক ছিলেন।)
এরপর ক্ষমতায় আসেন সম্রাট অশোক। আশোকের রাজ্যলাভ নীতিসম্মত ছিলনা।
২৭২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিন্দুসারের মৃত্যু হলে উত্তরাধিকারের প্রশ্নে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বিন্দুসার তাঁর অপর পুত্র সুসীমকে উত্তরাধিকারী হিসেবে চেয়েছিলেন, কিন্তু সুসীমকে উগ্র ও অহঙ্কারী চরিত্রের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে বিন্দুসারের মন্ত্রীরা অশোককে সমর্থন করেন।রাধাগুপ্ত নামক এক মন্ত্রী অশোকের সিংহাসনলাভের পক্ষে প্রধান সহায়ক হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অশোক শঠতা করে সুসীমকে একটি জ্বলন্ত কয়লা ভর্তি গর্তে ফেলে দিয়ে হত্যা করেন। ২৬৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পিতার মৃত্যুর তিন বছর পরে অশোক মৌর্য্য সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন।
সিংহাসনে আরোহণ করে অশোক পরবর্তী আট বছর তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। উত্তরে হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে শুরু করে দাক্ষিণাত্যের কিছু অংশ বাদ দিয়ে সমগ্র ভারতবর্ষ তাঁর করায়ত্ত হয়।তাঁর রাজত্বকালের অষ্টম বর্ষে তিনি কলিঙ্গ আক্রমণ করেন। এই ভয়াবহ যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ মানুষ নিহত হন এবং দেড় লক্ষ মানুষ নির্বাসিত হন ।
যে কলিঙ্গের যুদ্ধে প্রচুর মানুষের মৃত্যু ও তাঁদের আত্মীয় স্বজনদের অপরিসীম কষ্ট লক্ষ্য করে অশোক দুঃখে ও অনুশোচনায় দগ্ধ হন। এই ভয়ানক যুদ্ধের কুফল লক্ষ্য করে যুদ্ধপ্রিয় অশোক একজন শান্তিকামী ও প্রজাদরদী সম্রাট এবং বৌদ্ধ ধর্মের একজন পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় শুধুমাত্র মৌর্য্য সাম্রাজ্য নয়, এশিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত হয়। তাঁর পুত্র মহিন্দ ও কন্যা সংঘমিত্রা সিংহলে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেন।
তারপরে শুরু হলো ভারববর্ষে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক চর্চা।
অশোকের মৃত্যুর পরবর্তী পঞ্চাশ বছর দশরথ, সম্প্রতি, শালিশুক, দেববর্মণ, শতধনবান ও বৃহদ্রথ এই ছয় জন সম্রাটের রাজত্বকালে মৌর্য্য সাম্রাজ্য দুর্বল হতে থাকে। শেষ সম্রাট বৃহদ্রথ নিজ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ কর্তৃক নিহত হওয়ার পর,১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের পতন এবং শুঙ্গ সাম্রাজ্যের সূচনা ঘটে।
শুঙ্গ রাজত্ব ঃ
=====
পুষ্যমিত্র শুঙ্গ (রাজত্বকাল: খ্রিস্টপূর্ব ১৮৫ -খ্রিস্টপূর্ব ১৪৯) শুঙ্গ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট ছিলেন। ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৌর্য্য রাজবংশের নবম সম্রাট বৃহদ্রথের প্রধান সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ মৌর্য্য সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজে শক্তি প্রদর্শনের সময় তাঁকে হত্যা করে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটান ও শুঙ্গ রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। পুষ্যমিত্র একজন ব্রাহ্মণ ছিলেন।
বিভিন্ন গ্রন্থে পুষ্যমিত্রকে একজন বৌদ্ধ ধর্ম বিরোধী শাসক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অশোকাবদান গ্রন্থে উল্লিখিত রয়েছে, যে ইতিহাসের বুকে অমর হওয়ার উদ্দেশ্যে এক মন্ত্রী পরামর্শে পুষ্যমিত্র বৌদ্ধ ধর্ম ধ্বংস করতে উদ্যত হন। প্রথমেই তিনি কুক্কুতারাম বৌদ্ধবিহার ধ্বংস করে ভিক্ষুদের হত্যা করেন। এরপর তিনি শকল নগরীতে একটি শিলালিপি স্থাপন করে ঘোষণা করেন যে, তাঁর নিকট একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর কর্তিত মস্তক নিয়ে এলে পুরস্কার স্বরূপ একটি করে স্বর্ণমুদ্রা, অন্যমতে একশত মুদ্রা প্রদান করা হবে। বিভাষা নামক দ্বিতীয় শতাব্দীর সর্বাস্তিবাদ-বৈভাষিক গ্রন্থে উল্লেখ করা আছে যে, পুষ্যমিত্র কাশ্মীর সীমান্তে প্রায় পাঁচ শত বৌদ্ধবিহার ধ্বংস করেন ও বহু ভিক্ষুকে হত্যা করেন।পঞ্চদশ শতাব্দীর তিব্বতী লামা তারানাথের তাঁর গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, ব্রাহ্মণ রাজা পুষ্যমিত্র মধ্যদেশ হতে জলন্ধর পর্য্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় বৌদ্ধ মঠ ধ্বংস করেন ও বহু বৌদ্ধ পণ্ডিতকে হত্যা করলে সমগ্র উত্তর ভারত থেকে বৌদ্ধ ধর্ম অবলুপ্তির পথে চলে যায়।বিভাষা গ্রন্থে উল্লিখিত বৌদ্ধ কল্পকথা ও প্রবাদানুসারে, বোধি বৃক্ষ ধ্বংস করতে উদ্যত হলে বৃক্ষের রক্ষাকারী যক্ষ দংষ্ট্রানিবাসী সসৈন্যে সম্রাটকে হত্যা করেন। চতুর্থ শতাব্দীতে রচিত শারিপুত্রপরিপিচ্ছ নামক মহাসাংঘিক গ্রন্থের চীনা অনুবাদেও এই কাহিনী স্থান পেয়েছে। আর্য্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প নামক গ্রন্থে পুষ্যমিত্র শুঙ্গকে উদ্দেশ্য করে গোমিমুখ্য ও গোমিষণ্ড ইত্যাদি কটূক্তি করা হয়েছে।শুঙ্গ রাজবংশেররাজত্বকালেই যে তক্ষশীলা অঞ্চলের বৌদ্ধ স্থাপত্যগুলিকে ক্ষতি করা হয়েছিল, জন মার্শালের মতে তার প্রমাণ রয়েছে। তাঁর মতে সাঁচীর স্তুপ পুষ্যমিত্র শুঙ্গের রাজত্বকালে ধ্বংস হয় এবং পরবর্তী সম্রাট অগ্নিমিত্রের রাজত্বকালে পুনর্নির্মাণ করা হয়। দেউর কোঠার স্তূপ যে পুষ্যমিত্রের আমলেই ধ্বংস করা হয়েছিল, সেই বিষয়ে বহু ঐতিহাসিক সহমত পোষণ করেন।
পুষ্যমিত্রের দ্বারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলির সত্যতা সম্বন্ধে বহু ঐতিহাসিক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। রোমিলা থাপরের মতে, এই ধরণের কোন ঘটনার কোন পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এতিয়েন লামোত্তে ও কোয়েনরাড এলস্টের মত বেলজীয় ভারততত্ত্ববিদেরা পুষ্যমিত্রের বৌদ্ধ বিরোধিতার ঘটয়ান যে সম্পূর্ণ অমূলক, তা মনে করেছেন।
তবে মতভেদ থাকলেও তাঁর আমল থেকে আবার বেদের পূর্ণ ব্যবহার শুরু হতে থাকে। বলা হয়ে থাকে তার নির্দেশে মনুসংহিতার সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। পুষ্যমিত্রের ব্রাহ্মণ্যবাদী বিপ্লব সংঘটিত হবার পরে সুমতি ভার্গব ১৭০-১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই গ্রন্থ পুনঃ সংস্করণ করেন বলে কথিত আছে।
মনু
====
ঋগবেদে মনুকে মানবজাতির পিতা বলা হয়েছে। তিনি আদিত্য বিবস্বতের পুত্র বলে বিবস্বান, স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মার পুত্র বলে স্বায়ম্ভুব মনু, যাস্কের নিরুক্তে মনু দ্যুস্থানীয় দেবতা, তৈত্তিরীয় সংহিতায় মনু এক পরিবারের পিতা, শুক্ল যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে সুপ্রসিদ্ধ মনুমৎস্যকথা অংশে তিনি মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা। তিনি মানবজাতির পিতা, তাই তিনি নৈতিক ও সামাজিক আদর্শের প্রবর্তক – মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি, যজ্ঞানুষ্ঠানের সৃষ্টিকর্তা, শাসক ব্যবহার বিষয়ে প্রামাণ্য ব্যক্তি, মহর্ষি, বেদবিদ্যায় বিদ্বান, পৃথিবীর উৎপত্তি-স্থিতি-প্রলয়ের কারণ তিনি জানেন।
পুরাণ মত অনুযায়ী মনু ব্রহ্মার দেহ থেকে তৈরি হয়েছেন । সুতরাং, পৃথিবীতে ভগবান ব্রহ্মার একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন মনু। যাকে স্বায়ম্ভুব মনু বলা হয়। তবে জানা গেছে ব্রহ্মার ইচ্ছায় ১৪ জন মনু [স্বায়ম্ভুব (ব্রহ্মা ও গায়ত্রী থেকে সম্ভূত),স্বরোচিষ, উত্তম, তামস, রৈবত, চাক্ষুষ, বৈবস্বত বা সত্যব্রত ,সাবর্ণি, রোচ্য, ভৌত, মেরূ সাবর্ণি ,ঋভু, ঋতুধামা, বিস্বব] জন্ম নিয়েছেন এবং এদের সবাই ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছেন । স্বায়ম্ভুব মনু ব্রহ্মার কাছ থেকে স্মৃতিশাস্ত্র পাঠ করা শিখে তা তার শিষ্যদের তা পাঠ করান। পরবর্তীতে ভৃগু নামে একজন মনুর আদেশে এই ধর্মশাস্ত্র ঋষিদের কাছে ব্যাখ্যা করেন। যা এখন “মনুসংহিতা” নামে পরিচিত। বলা হয় বেদের পরে মনুসংহিতা সৃষ্টি হয়েছে। ভগবান ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনুর দেখানো পথ অনুসরণ করে বাকি ১৪ জন মনু এই শাস্ত্র ধারণ ও পরিবর্ধন করেছেন । মুলত “ভগবান ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনু” এর বর্ণিত শ্লোকগুলিই বাকি মনুরা সম্পাদনা ও টীকা বা ব্যাখ্যা যোগ করেছেন এবং কিছু কিছু আইন ও আচরণ পদ্ধতির প্রবর্তন করেছেন। এরকমই একটা পরিচয় অনেকেই বিশ্বাস করেন।
শুঙ্গ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলীপুত্র, কিন্তু ভগভদ্র প্রভৃতি শাসকগণ পূর্ব মালবের বেশনগর (বিদিশা) থেকেও দরবার চালাতেন।
পুষ্যমিত্র শুঙ্গ ৩৬ বছর রাজত্ব করেছিলেন এবং তাঁর পর তাঁর পুত্র অগ্নিমিত্র সিংহাসনে বসেন। দশজন শুঙ্গ রাজা ছিলেন। যদিও রাজ্যের দ্বিতীয় রাজা অগ্নিমিত্রের মৃত্যুর পরই সাম্রাজ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে। শিলালিপি এবং মুদ্রা থেকে জানা যায়, উত্তর ও মধ্যভারতের অধিকাংশ অঞ্চল ক্ষুদ্র রাজ্য এবং নগর-রাজ্য দ্বারা গঠিত ছিল এবং এগুলি শুঙ্গ শাসন মুক্ত ছিল। এই সাম্রাজ্য প্রভূত পরিমাণে বিদেশী আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। তারা কলিঙ্গ, সাতবাহন সাম্রাজ্য, ইন্দো-গ্রীক রাজ্য এবং সম্ভবত পাঞ্চাল ও মথুরার সঙ্গেও যুদ্ধে লিপ্ত থাকত।
শিল্পকলা, শিক্ষা, দর্শন এবং শিক্ষার অন্যান্য দিক এইসময় বিস্তারলাভ করে, যেমন ছোট টেরাকোটার ছবি, বৃহৎ প্রস্তর ভাস্কর্য, এবং ভারহুতের স্তুপ, সাঁচীর স্তুপ প্রভৃতি স্থাপত্য মিনার। শুঙ্গ শাসকগণ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষা ও শিল্পচর্চার রীতি শুরু করেন। এই সাম্রাজ্যে যে লিপি ব্যবহৃত হত তা ছিল ব্রাহ্মী লিপির ভিন্নরূপ এবং ভাষা ছিল সংস্কৃত।
শুঙ্গ সাম্রাজ্য এমন এক সময়ে সংস্কৃতি চর্চার বিস্তারে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছিল যখন কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু চিন্তাধারা বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। পতঞ্জলির মহাভাষ্য এই সময়েই লিখিত হয়। মথুরা শিল্পরীতির উত্থানের সাথে সাথে স্থাপত্য কারুকার্য উন্নতিলাভ করে।
৭৩ খ্রীস্টপূর্বে শুঙ্গ সাম্রাজ্যের পতনের পর কাণ্ব সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে।
কাণ্ব রাজবংশ ঃ
========= একটি ব্রাহ্মণ রাজবংশ। এই রাজবংশ মগধের শুঙ্গ সাম্রাজ্যকে সরিয়ে ৭৫ খ্রিস্টপূর্ব থেক ৩০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত ভারতের পূর্ব অংশ শাসন করেছিল।
কাণ্ব রাজবংশের বাসুদেব কাণ্ব ৭৫ খ্রিস্টপূর্ব শুঙ্গ সাম্রাজ্যের শেষ শাসক দেবভূতিকে সিংহাসনচ্যুত করে। কাণ্ব শাসকেরা শুঙ্গ সাম্রাজ্যের রাজাদের তাঁদের পূর্বের রাজত্বে নিভৃতে শাসন করতে দেন। কাণ্ব শাসকেরা মগধ শাসন করেছিল।
বাসুদেব কাণ্ব ( ৭৫ খ্রিস্টপূর্ব - ৬৬ খ্রিস্টপূর্ব )
ভূমিমিত্র কাণ্ব ( ৬৬ খ্রিস্টপূর্ব - ৫২ খ্রিস্টপূর্ব )
নারায়ণ কাণ্ব ( ৫২ খ্রিস্টপূর্ব - ৪০ খ্রিস্টপূর্ব )
সুশারমান কাণ্ব ( ৪০ খ্রিস্টপূর্ব - ৩০ খ্রিস্টপূর্ব )
গুন্তুর জেলার অমরাবতী গ্রামে সাতবাহন সাম্রাজ্যের এক শাসকের সাথে যুদ্ধে কাণ্ব রাজবংশ পরাজিত হলে এই রাজবংশের ইতি ঘটে।
সাতবাহন সাম্রাজ্য ঃ
============একটি প্রাচীন ভারতীয় সাম্রাজ্য যা খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে পরবর্তী সাড়ে চারশত বছর ধরে দক্ষিণ ভারতে বিস্তৃত ছিল। মৌর্য্য সাম্রাজ্যের সামন্ত রাজ্য হিসেবে সাতবাহনরা গণ্য হলেও মৌর্য্য সাম্রাজ্যের পতনের পর শুঙ্গ ও কাণ্ব রাজবংশের সঙ্গে যুদ্ধ করে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীকালে তাঁরা পশ্চিমী ক্ষত্রপ রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
সাতবাহন সম্রাজ্যের পাশাপাশি আমরা তামিল চোল সম্রাজ্য দেখেতে পাই ।
চোল রাজবংশ ছিল একটি তামিল রাজবংশ। দক্ষিণ ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে এই সাম্রাজ্যই ছিল সর্বাপেক্ষা দীর্ঘকালীন সাম্রাজ্য। চোল রাজবংশের প্রথম নথিভুক্ত উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে লিখিত সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে। বিভিন্ন অঞ্চলে এই রাজবংশের শাসন খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।
{খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতাব্দীর প্রথমার্ধে শুংনু নামে এক উপজাতি তাদের প্রতিবেশী ইউয়েচি নামে অপর এক উপজাতিকে হারিয়ে দেয়। দীর্ঘ সংঘর্ষের পর য়ুঝি উপজাতির লোকেরা পশ্চিমদিকে সরে যেতে বাধ্য হয়। তারা পশ্চিমদিকে সরে ইলি নদীর উপত্যকা পেরিয়ে ইস্সিক কুল হ্রদের (ইংরাজীতে Lake Issyk Kul) দক্ষিণতীর ধরে এগোতে থাকে। তাদের এই স্থান পরিবর্তন শকসহ বেশ কিছু উপজাতিকে তাদের সামনে এগোতে বাধ্য করে। ১৪৫-১২৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী কোন সময়ে তারা ব্যাকট্রিয় ও পার্থিয়ায় বসতি স্থাপন করে। এক প্রজন্ম পর তারা সেই জায়গা ত্যাগ করে কাবুল উপত্যকা পেরিয়ে পাঞ্জাব সমভূমিতে প্রবেশ করে। খ্রীষ্টাব্দ শুরুর দিকে য়ুঝি উপজাতির নেতা কিউ-সিউ-কিও (ইংরাজীতে K'iu-tsiu-k'io) বাকী চার নেতাকে মেরে সমগ্র উপজাতির প্রধান হয়ে বসে। তার নাম থেকেই নাম হয় কিউই-শাং (ইংরাজীতে Kuei-shang), বা কুষাণ।}
সাতবাহন ও চোল রাজবংশের পরে চলে আসে এই কুষাণ সম্রাজ্য । যা ৬০ হইতে ২৪০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করে।
যে সকল বিদেশি জাতি ভারতবর্ষে সম্রাজ্য স্থাপন করেছিল তাদের মধ্যে কৃষাণুদের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য । কৃষাণ যুগের ইতিহাস রচনার জন্য বেশ কিছু সাহিত্যিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস পাওয়া যায়। কৃষানরা ছিল ইউচি কাতির একটি শাখা । কৃষাণ শাখার নেতা কুজা কদফিসেস কর্তৃক খ্রীষ্টপূর্ব ৩০ অব্দ নাগাদ পাঁচটি শাখায় বিভক্ত ইউ টিরা ঐক্যবদ্ধ হয় । তিতিন কাবুল , সোমায়ার , কাশ্মির অধিকার করেন। এরপর তাঁর পুত্র বিম কদফিসেস সিংহাসনে বসেন।তাঁর সম্রাজ্য মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্থান থেকে সিন্ধু উপতক্যা পয্যন্ত বিস্তৃত ছিল । কৃষাণ বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন কনিষ্ক । ৭৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সিংহাসন আরোহন করেন এবং একটি অব্দ বা সম্বৎ প্রবর্তন করেন যা পরবর্তীতে শকাব্দ নামে সিংহাসনে বসেন।তাঁর সম্রাজ্য মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্থান থেকে সিন্ধু উপতক্যা পয্যন্ত বিস্তৃত ছিল । কৃষাণ বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন কনিষ্ক । ৭৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সিংহাসন আরোহন করেন এবং একটি অব্দ বা সম্বৎ প্রবর্তন করেন যা পরবর্তীতে শকাব্দ নামে পরিচিতি লাভ করে। ভারতে তিনি এক বিশাল সম্রাজ্য গড়ে তোলেন , এটি উত্তর পশ্চিমে পেশোয়ার থেকে পূর্বে বাংলা , উত্তর কাশ্মির থেকে দক্ষিন মধ্যপ্রদেশ পর্য্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভারতের বাইরে বর্তমানে সোভিয়েত তুর্কিস্থান এবং আফগানিস্থানের কিছু অংশও তার সম্রাজ্যেরভুক্ত ছিল। পেশোয়ার ছিল তার রাজধানী। বিশাল সম্রাজ্যকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন রাজকর্মচারীদের মাধ্যমে এখানে থেকেই তিনি শাসনকার্য্য পরিচালনা করতেন।শুধুমাত্র বিজেতা ও সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠরুপেই নয় , বৌদ্ধধর্ম ম জ্ঞান বিজ্ঞান শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসাবেও তিনি ইতিহাস খ্যাত হয়ে আছেন । তাঁর আমলেই বৌদ্ধ ধর্ম মহাজান ও হীনযান এ দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মহাযান মতাবলম্বীর গৌতম বুদ্ধকে দেবতার পর্য্যায়ে স্থাপন করে তাঁর মূর্তী পূজা শুরু করে। কণিষ্কের প্রচেষ্টায় বৌদ্ধ ধর্ম ভারত ও ভারতের বাইরে প্রসার লাভ করে । বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও তিনি পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন।
গুপ্ত সাম্রাজ্য
=========
গুপ্ত সাম্রাজ্য ছিল একটি প্রাচীন ভারতীয় সাম্রাজ্য। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় ৩২০ থেকে ৫৫০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে এই সাম্রাজ্য প্রসারিত ছিল।মহারাজ শ্রীগুপ্ত ধ্রুপদি সভ্যতা-র আদর্শে এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।গুপ্ত শাসকদের ভারতে যে শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থাপিত হয়েছিল, তার ফলশ্রুতিতে দেশ বৈজ্ঞানিক ও শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করতে সক্ষম হয়।গুপ্তযুগকে বলা হয় ভারতের স্বর্ণযুগ।এই যুগ ছিল আবিষ্কার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাস্তুবিদ্যা, শিল্প, ন্যায়শাস্ত্র, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম ও দর্শনের বিশেষ উৎকর্ষের যুগ; বর্তমান হিন্দু সংস্কৃতি মূলত এই যুগেরই ফসল।গুপ্ত যুুগের আমলে অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি যেমন কালিদাস, আর্যভট্ট, বরাহমিহির, বিষ্ণু শর্মা -এর অবির্ভাব হয়েছিলো। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ সম্রাট।
গুপ্ত রাজবংশের শাসকগণ
প্রায় ৩২০ থেকে ৫৫০ অবধি,গুপ্ত বংশের প্রধান শাখা ভারতের গুপ্ত সাম্রাজ্য শ্বাসন করেছিলেন। এই সাম্রাজ্য শ্রীগুপ্ত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শাসকগণ:
• শ্রী গুপ্ত
• ঘটোৎকচ
• প্রথম চন্দ্রগুপ্ত
• সমুদ্রগুপ্ত
• রামগুপ্ত
• দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
• প্রথম কুমারগুপ্ত
• স্কন্দগুপ্ত
• পুরুগুপ্ত
• প্রথম কুমারগুপ্ত দ্বিতীয়
• বুধগুপ্ত
• নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য
• প্রথম কুমারগুপ্ত তৃতীয়
• বিষ্ণুগুপ্ত
• বৈনগুপ্ত
• ভানুগুপ্ত
সমুদ্রগুপ্ত
=====
ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক শাসক।“শক্তিমান মাত্রেই যুদ্ধ করবে ও শত্রু নিপাত করবে” – কৌটিল্যের এই নীতির প্রভাবে সিংহাসনে বসেই মহাপদ্মনন্দ ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মতো দিগ্বিজয়ের পরিকল্পনা করেন সমুদ্রগুপ্ত।
উত্তর ভারতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করার পর সমুদ্রগুপ্ত দাক্ষিণাত্য বিজয়ে অগ্রসর হন, নাকি উত্তর ভারত সম্পূর্ণ জয় করার আগেই তিনি দক্ষিণের রাজ্যসমূহ নিজ ছত্রছায়ায় এনেছিলেন, তা বিতর্কিত। দাক্ষিণাত্যের সকল রাজা (‘সর্বদক্ষিণাপথরাজ’) তাঁর হাতে পরাস্ত হয়েছিলেন। দাক্ষিণাত্যের মোট বারো জন রাজার নাম উল্লিখিত আছে।
৭১২ খ্রিস্টাব্দে আরব সেনানায়ক মুহাম্মদ বিন কাশিম দক্ষিণ পাঞ্জাবের সিন্ধ ও মুলতান অধিকার করে নিলে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান শাসনের সূচনা ঘটে। এই অভিযানের ফলে দশম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে মধ্য এশিয়া থেকে সংগঠিত একাধিক অভিযানের ভিত্তিভূমি সজ্জিত করে। এরই ফলস্রুতিতে ভারতীয় উপমহাদেশে দিল্লি সুলতানি ও মুঘল সাম্রাজ্যের মতো মুসলমানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। মুঘল শাসনে উপমহাদেশের প্রায় সমগ্র উত্তরাঞ্চলটি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। মুঘল শাসকরা ভারতে মধ্যপ্রাচ্যের শিল্প ও স্থাপত্যকলার প্রবর্তন ঘটান। মুঘলদের সমকালেই দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্ব পশ্চিম ভারতে বিজয়নগর সাম্রাজ্য, অহোম রাজ্য এবং বাংলা, মারাঠা সাম্রাজ্য ও একাধিক রাজপুত রাজ্যের মতো বেশ কিছু স্বাধীন রাজ্যের উন্মেষ ঘটে।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ঃ
=============
সাত শতকে প্রসিদ্ধি অর্জনকারী বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। বিহারের পাটনা থেকে ৮৫ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে এবং আধুনিক রাজগিরের ১১ কিমি উত্তরে অবস্থিত বড়গাঁও গ্রামের কাছে নালন্দার প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। বাংলার ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থিত হলেও নালন্দা মহাবিহারের সঙ্গে এতদঞ্চলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
সাধারণভাবে প্রচলিত ইতিহাস নালন্দার প্রাচীনত্বকে বুদ্ধের সময় পর্যন্ত নিয়ে যায়। অবশ্য এখানে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন থেকে গুপ্ত যুগের আগেকার কোন নিদর্শন পাওয়া যায় নি। পাল রাজাদের (আট থেকে বারো শতক) সময়েই এটি বিভিন্ন কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ধারণা করা হয় যে, গুপ্ত সম্রাটগণই নালন্দা মহাবিহারের নির্মাতা এবং সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্তই সম্ভবত এক্ষেত্রে প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ফা-হিয়েন এর ভ্রমণ বিবরণীতে নালন্দায় বৌদ্ধ স্থাপনার কোন উল্লেখ না থাকায় এ বিষয়ে কিছুটা নিশ্চিত হওয়া যায়। সাত শতকের দিকে নালন্দা একটি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। চৈনিক তীর্থযাত্রী হিউয়েন-সাং পড়াশোনার জন্য এখানে কয়েক বছর অতিবাহিত করেন। তাঁর সময় থেকেই নালন্দা বিশিষ্ট পুরোহিতগণের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। হিউয়েন-সাং-এর ভ্রমণের ৩০ বছরের মধ্যে ই-ৎসিঙ (৬৭৫ থেকে ৬৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১০ বছর এখানে শিক্ষাগ্রহণ করেন) সহ কমপক্ষে ১১ জন কোরীয় ও চৈনিক তীর্থযাত্রীসহ বিশিষ্টজনেরা নালন্দা ভ্রমণ করেন বলে জানা যায়। কনৌজের হর্ষবর্ধন (৬০৬-৬৪৭ খ্রি.) নালন্দা বিহারের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
বাংলার পাল রাজগণ নালন্দার প্রতি তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত রাখেন। এটি পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মপাল বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। লামা তারনাথ উল্লেখ করেন যে, ধর্মপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিক্রমশীলা মহাবিহার তত্ত্বাবধানকারী প্রধান ব্যক্তি নালন্দা দেখাশোনা করার জন্যও রাজা কর্তৃক আদেশপ্রাপ্ত হন। সুবর্ণদ্বীপের শৈলেন্দ্র রাজা বালপুত্রদেব জাভার ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য দেবপালএর অনুমতি নিয়ে নালন্দায় একটি বৌদ্ধ মঠ নির্মাণ করেন। এদের প্রতিপালনের জন্য দেবপাল ৫টি গ্রামও দান করেন। সে সময় নালন্দা বিহার ছিল বৌদ্ধ সংস্কৃতি জগতের বিশেষ কেন্দ্র এবং এর অভিভাবক হিসেবে পাল রাজগণ সমগ্র বৌদ্ধ জগতে উচ্চস্থান লাভ করেন। ঘোসরাওয়া শিলালিপি থেকে নালন্দা বিহারের প্রতি বিশেষ আগ্রহ এবং বৌদ্ধ ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি দেবপালের গভীর অনুরাগের কথা জানা যায়।
দ্বিতীয় গোপাল, প্রথম মহীপাল এবং রামপাল নালন্দার বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। তবে এ কথা জোর দিয়ে বলা যেতে পারে যে, পাল রাজগণ শুধু নালন্দাতেই তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা সীমাবদ্ধ রাখেন নি; তাঁরা আরও বেশ কয়েকটি নতুন বৌদ্ধ স্থাপনা প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে বা সম্প্রসারণে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।
চৈনিক তীর্থযাত্রী, বিশেষ করে হিউয়েন-সাং-এর বিবরণের ভিত্তিতে কানিংহাম কর্তৃক শনাক্তকৃত নালন্দায় ১৮৭২ সালের দিকে কয়েকটি প্রাথমিক উৎখনন পরিচালিত হয়। পরে ১৯১৫-১৬ থেকে ১৯৩৫-৩৬ সালের মধ্যে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং জে.এ পেইজ (JA Page)-এর নেতৃত্বেআর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া উৎখনন পরিচালনা করে এবং মঠ, মন্দির স্থাপত্যসহ অন্যান্য স্থাপনা উন্মোচিত হয়। নালন্দার বিহারসমূহ সাধারণ ধরনের। এর সাধারণ নক্শা সমকোণী চতুর্ভুজাকৃতির যা উন্মুক্ত বারান্দাসহ বাইরের ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ দ্বারা ঘেরা। বিহারটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল একদিকে পুরোহিতদের সারিবদ্ধ কতগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মঠ, অপরদিকে মন্দির, সুসজ্জিত ভবন ও কোর্ট। উভয় দিক প্রাচীর বেষ্টিত হয়ে সমগ্র বিহারটি গঠন করেছিল। মন্দির এবং মঠসমূহ ছিল দ’ুটি সমান্তরাল সারিতে, মন্দিরগুলি পূর্বাভিমুখী এবং মঠগুলি ছিল পশ্চিমাভিমুখী। এগুলির মাঝের বিস্তৃত জায়গায় কখনও কখনও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মন্দির গড়ে উঠতো।
নালন্দায় নানা ধরনের সীল এবং ভাস্কর্য পাওয়া গেছে। মঠ বা বিহারে ব্যবহূত আনুষ্ঠানিক বা সরকারি সীলসমূহ যথারীতি চাকা ও হরিণের ছবি এবং শ্রী-নালন্দা-মহা-বিহারীয়ার্য-ভিক্ষু-সংঘস্য ক্ষোদিত লিপি বহন করত। সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার বিভিন্ন শাসক অথবা কর্মকর্তাদের সীলও পাওয়া গেছে। ব্রোঞ্জ নির্মিত সামগ্রীর জন্য নালন্দা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে পাওয়া গেছে তন্ত্রযান-বজ্রযান ধর্মমতের গৌতম বুদ্ধ এবং বৌদ্ধ দেব-দেবীর ব্রোঞ্জনির্মিত পাঁচ শতাধিক মূর্তি, পালযুগে যেগুলি নালন্দাকে কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। বৌদ্ধমতসহ নালন্দার ব্রোঞ্জ নির্মিত শিল্পকর্মের প্রভাব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে।
নালন্দার পন্ডিতগণ ছিলেন স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিখ্যাত। হিউয়েন-সাং এবং ই-ৎসিঙ উভয়েই নালন্দার শিক্ষকগণের উচ্চ প্রশংসা করেছেন। হিউয়েন-সাং যখন নালন্দায় ছিলেন তখন বাঙালি বৌদ্ধ ভিক্ষু শীলভদ্র ছিলেন এর অধ্যক্ষ। শীলভদ্র ছিলেন সর্বপ্রথম বাঙালি বৌদ্ধ শিক্ষক যিনি বাংলার বাইরে এরূপ দুর্লভ সম্মান অর্জন করেন। হিউয়েন-সাং নিজেও শীলভদ্রের একজন ছাত্র ছিলেন। পরবর্তী পাল রাজাদের দলিলপত্রেও বিভিন্ন প্রসঙ্গে নালন্দার উল্লেখ পাওয়া যায়।
চার থেকে নয় শতক পর্যন্ত নালন্দা শিক্ষা-দীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যমান ছিল। নালন্দায় প্রাপ্ত বৈন্যগুপ্ত, বুধগুপ্ত এবং কুমারগুপ্তের মাটির সীলগুলি চতুর্থ থেকে সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এর সমৃদ্ধির বড় সাক্ষ্য। যদিও গুপ্ত সম্রাটগণ এর পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং হিউয়েন সাং-এর বর্ণনানুযায়ী শকারীদিত্য নামে একজন গুপ্ত সম্রাট ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা এবং যদিও এ তথ্যকে সত্য বলে মনে হয় না, তথাপি বিশাল এ প্রতিষ্ঠানের সবচাইতে সমৃদ্ধিশালী যুগ ছিল ছয় থেকে নয় শতক পর্যন্ত। এর কারণ বাংলার পাল রাজগণের অকুণ্ঠ ও উদার পৃষ্ঠপোষকতা যাঁরা শিক্ষা-দীক্ষার এই মহান প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বড় দান অনুমোদনের মাধ্যমে গুপ্তদের ঔজ্জ্বল্যকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন।
বারো শতকের দিকে নালন্দা তার গুরুত্ব হারায়। তেরো শতকের প্রথমদিকে যখন ধর্মস্বামী নালন্দা পরিদর্শন করেন ততোদিনে এর অতীত গৌরব লুপ্ত এবং এর অনেকগুলি স্থাপনা তুর্কীদের হাতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কেবল দুটি বিহার ছিল ব্যবহারের উপযোগী এবং সেখানে রাহুলশ্রীভদ্র নামক ৯০ বছর বয়স্ক একজন মহাপন্ডিত-এর সঙ্গে ধর্মস্বামীর দেখা হয়।
পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত এলাকায় অবস্থানের কারণে বাংলার সঙ্গে নালন্দার বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সংযোগ। এটি কম গৌরবের বিষয় নয় যে, প্রাচীন যুগের শিক্ষা-সংস্কৃতির একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র নালন্দার উপর বাংলার প্রভাববলয় বিস্তৃত হয়েছিল। একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলার সংস্কৃতি ও শিক্ষা এ কেন্দ্র থেকে লাভবান হয়েছে।
শশাঙ্ক
====
গুপ্তদের পতন ও শশাঙ্কের উত্থানের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলায় বেশ কিছু স্বাধীন শাসকের উদ্ভব ঘটে। এঁদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায় অল্প কিছু লিপি এবং স্বর্ণ মুদ্রার ভিত্তিতে। রোহতাসগড়ে প্রাপ্ত সিলের ছাঁচে লিখিত ‘শ্রী মহাসামন্ত শশাঙ্ক’, বাণভট্টের সমসাময়িক সাহিত্য উপকরণ, চৈনিক তীর্থযাত্রী হিউয়েন-সাং এর বিবরণ এবং বৌদ্ধ গ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প শশাঙ্কের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি বঙ্গাব্দ চালু করেন।
শশাঙ্ক প্রথম বাঙালি সম্রাট ও প্রথম স্বাধীন বাঙালি নৃপতি । তিনি মোটামুটি ভাবে ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রাজত্ব করেন বলে ধারণা করা হয়।
সম্ভবত ৬০৬ খ্রিঃ শশাংক রাজা সিংহাসনে বসেন।
গৌড়ের সিংহাসনে বসারপর উত্তর ও পশ্চিম বাংলার কিছু অংশ তিনি গৌড়ের অন্তভূক্ত করেন। গৌড়ে তাঁর অধিকার স্থাপন করে প্রতিবেশী অঞ্চলে রাজ্যবিস্তার শুরু করেন। তিনি দন্ডভুক্তি (মেদিনীভুক্ত) রাজ্য, উড়িষ্যার রাজ্য এবং বিহারের মগধ রাজ্য জয় করে তার রাজ্যসীমা বৃদ্ধি করেন। পশ্চিমে তার রাজ্য বারণসী পর্যন্ত বিস্তৃত করেন।
রাজধানীঃ শশাংকে গৌড়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তাঁ রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে ছয় মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত রাঙামাটির নিকট কানসোনা। হিউয়েন সাং এর ভাষার শশাংকের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ নগরে রক্তমৃত্তিকা বিহারে বিহারে অবস্থিত ছিল।
উত্তর ও পশ্চিম বঙ্গ জয়ঃ উত্তর এবং পশ্চিম বঙ্গ নিঃসন্দেহে তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সম্ভবত মগধ প্রথম থেকেই তার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শশাংকের নামাঙ্কিত মুত্রাসমূহে দেখা যায় মুদ্রার এক পৃষ্ঠে শিব ও বৃষের মূর্তি এবং অপরপৃষ্ঠে গজ লক্ষী মূর্তি খোদিত আছে। এ থেকে বোঝা যায়, শশাংক শৈব ধর্মের ছিলেন।
শশাঙ্ক দুঃসাহসিক অভিযানকারী ছিলেন। রাজধানী কর্ণসুবর্ণ তাঁল আমলে সম্পদময়ী হয়ে ওঠেছিল। তিনি শুধু গৌড়দেশের মর্যাদা গঠনের আয়োজনও করেন। মেদিনীপুরের দাঁতন বা দন্ডভুক্তি অঞ্চলে দিঘী জলসেচ ব্যবস্থা জণ্যে তা প্রচেষ্টার সাক্ষ্য দেন।
পাল
===
শশাঙ্কের রাজ্যের পতনের পর বাংলা অঞ্চলে নৈরাজ্য দেখা দেয়। এই সময় এই অঞ্চলে কোনও কেন্দ্রীয় শাসক ছিলেন না। ক্ষুদ্র গোষ্ঠীপতিরা নিরন্তর নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। সমসাময়িক গ্রন্থে এই অবস্থাটিকে ‘মাৎস্যন্যায়’ (অর্থাৎ বড়ো মাছ যেমন ছোটো মাছকে খেয়ে ফেলে, সেই রকম অবস্থা) বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সময়েই গোপাল প্রথম পাল রাজা হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন।
গোপালের সিংহাসনারোহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল। কারণ একাধিক স্বাধীন গোষ্ঠীপতি কোনও প্রকার বিরোধ ছাড়াই তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
গোপালের সাম্রাজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটান তাঁর পুত্র ধর্মপাল ও পৌত্র দেবপাল।
দেবপালের মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে। দেবপালের ভ্রাতুষ্পুত্র বিগ্রহপাল অল্প কিছুকাল রাজত্ব করার পর সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। বিগ্রহপালের পুত্র তথা উত্তরসূরি নারায়ণপাল ছিলেন একজন দুর্বল শাসক। তাঁর রাজত্বকালে রাষ্ট্রকূট রাজা অমোঘবর্ষ পালদের পরাজিত করেন। পালেদের পতনের সুযোগ নিয়ে অসমের রাজা হরজর সম্রাট উপাধি গ্রহণ করেন এবং শৈলোদ্ভব রাজবংশ ওড়িশা অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে।
পাল সম্রাটরা ছিলেন মহাযান বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক।পাল সম্রাটরা শৈব সন্ন্যাসীদেরও (বিশেষত গোলাগি মঠের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যাঁরা) সমর্থন করতেন। নারায়ণপাল নিজে একটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তাঁর ব্রাহ্মণ মন্ত্রী কর্তৃক আয়োজিত যজ্ঞেও উপস্থিত ছিলেন। বৌদ্ধ দেবদেবীদের পাশাপাশি পাল যুগে হিন্দু দেবতা বিষ্ণু, শিব ও সরস্বতীর মূর্তিও নির্মিত হয়েছিল।
পাল সাম্রাজ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের পরবর্তী ধ্রুপদি যুগের একটি সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের উৎসস্থল ছিল বাংলা অঞ্চল। পাল সাম্রাজ্যের নামকরণ করা হয় এই সাম্রাজ্যের শাসক রাজবংশের নামানুসারে। পাল সম্রাটদের নামের শেষে ‘পাল’ অনুসর্গটি যুক্ত ছিল। প্রাচীন প্রাকৃত ভাষায় এই শব্দটির অর্থ ছিল ‘রক্ষাকর্তা’। পাল সম্রাটেরা বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অনুগামী ছিলেন। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সম্রাট পদে গোপালের নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে এই সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটে।[৩] অধুনা বাংলা ও বিহার ভূখণ্ড ছিল পাল সাম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র। এই সাম্রাজ্যের প্রধান শহরগুলি ছিল পাটলীপুত্র, বিক্রমপুর, রামাবতী (বরেন্দ্র), মুঙ্গের, তাম্রলিপ্ত ও জগদ্দল।
পাল সম্রাটরা ছিলেন প্রাজ্ঞ কূটনীতিবিদ ও যুদ্ধজয়ী। তাঁদের সেনাবাহিনীর বৈশিষ্ট্য ছিল একটি বৃহৎ যুদ্ধহস্তী বাহিনী। তাঁদের নৌবাহিনী বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করত। পাল সম্রাটরা ছিলেন ধ্রুপদি ভারতীয় দর্শন, সাহিত্য, চিত্রকলা ও ভাস্কর্যশিল্পের বিশিষ্ট পৃষ্ঠপোষক। তাঁরা একাধিক বৃহদায়তন মন্দির ও মঠ নির্মাণ করিয়েছিলেন। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল সোমপুর মহাবিহার। তাঁরা নালন্দা ও বিক্রমশিলা মহাবিহারের পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন। তাঁদের রাজত্বকালেই প্রোটো-বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটে। শ্রীবিজয় সাম্রাজ্য, তিব্বতি সাম্রাজ্য ও আরব আব্বাসীয় খিলাফতের সঙ্গে পাল সাম্রাজ্যের সুসম্পর্ক বজায় ছিল। বাংলা ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পাল যুগেই বাংলায় প্রথম ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। পাল প্রত্নস্থলগুলিতে আব্বাসিদ মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। তাছাড়া আরব ইতিহাসবিদদের রচিত নথিপথেও পাল সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁদের দেশের বাণিজ্যিক ও বৌদ্ধিক যোগাযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ এই যুগেই ভারতীয় সভ্যতার গাণিতিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান-সংক্রান্ত কীর্তিগুলির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল।
খ্রিস্টীয় ৯ম শতাব্দীর প্রথম ভাগে পাল সাম্রাজ্য সর্বাধিক সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। এই সময় পাল সাম্রাজ্যই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। সেই যুগে এই সাম্রাজ্য অধুনা পূর্ব-পাকিস্তান, উত্তর ও উত্তরপূর্ব ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে প্রসারিত হয়। পাল সাম্রাজ্য সর্বাধিক সমৃদ্ধি ঘটেছিল সম্রাট ধর্মপাল ও দেবপালের রাজত্বকালে। তিব্বতে অতীশের মাধ্যমে পাল সাম্রাজ্য প্রভূত সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেছিল। পাল সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক প্রভাব পড়েছিল দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতেও। উত্তর ভারতে পাল শাসন ছিল ক্ষণস্থায়ী। কারণ কনৌজের আধিপত্য অর্জনের জন্য গুর্জর-প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূটদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে পাল সম্রাটরা পরাজিত হন। কিছুকালের জন্য পাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল। তারপর সম্রাট প্রথম মহীপাল বাংলা ও বিহার অঞ্চলে দক্ষিণ ভারতীয় চোল অনুপ্রবেশ প্রতিহত করেন। সম্রাট রামপাল ছিলেন সর্বশেষ শক্তিশালী পাল সম্রাট। তিনি কামরূপ ও কলিঙ্গে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। খ্রিস্টীয় ১১শ শতাব্দীতে পাল সাম্রাজ্যের নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এর ফলে সাম্রাজ্যের শক্তি অনেকটাই হ্রাস প্রাপ্ত হয়।
খ্রিস্টীয় ১২শ শতাব্দীতে হিন্দু সেন রাজবংশের পুনরুত্থানের ফলে পাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। সেই সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বশেষ প্রধান বৌদ্ধ সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। বাংলার ইতিহাসে পাল যুগকে অন্যতম সুবর্ণযুগ মনে করা হয়। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে কয়েক শতাব্দীব্যাপী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে পাল সম্রাটরা বাংলায় স্থিতাবস্থা ও সমৃদ্ধি আনয়ন করেছিলেন। পূর্বতন বঙ্গীয় সভ্যতাকে তাঁরা উন্নত করে তোলেন। সেই সঙ্গে শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রে অসামান্য কীর্তি রেখে যান। তাঁরা বাংলা ভাষার ভিত্তি রচনা করেছিলেন। বাংলার প্রথম সাহিত্যকীর্তি চর্যাপদ পাল যুগেই রচিত হয়েছিল। আজও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে পাল উত্তরাধিকার প্রতিফলিত হয়।
সেন বংশ
=======
সেন রাজবংশ কিঞ্চিদধিক একশ বছর (১০৯৭-১২২৫ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলা শাসন করে। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে একাদশ শতাব্দীর অন্তিমলগ্নে পাল রাজবংশের অবসান ঘটিয়ে সেনদের উত্থান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূ্র্ণ অধ্যায়। বাংলার পাল রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে বারেন্দ্র 'সামন্তচক্রের' বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন পশ্চিমবঙ্গে ক্রমশ স্বীয় আধিপত্য বিস্তার করেন এবং অবশেষে বাংলার পাল রাজবংশের রাজা মদনপালের রাজত্বকালে স্বাধীন সত্ত্বার বিকাশ ঘটান। বাংলায় সেন শাসনের বিশেষ তাৎপর্য এই যে, সেনগণই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলার ওপর তাদের নিরঙ্কুশ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বাংলার সেন বংশীয় রাজাদের মধ্যে বিজয় সেন, বল্লাল সেন, ও লক্ষ্মণ সেন বিশিষ্ট স্থান অধিকার করছেন।বিশ্বরূপ সেন—তিনি বঙ্গের সেন বংশীয় নরপতি বল্লাল সেনের পৌত্র । লক্ষ্মণ সেনের অন্যতম পত্নী তাদাদেবী বা তাড়াদেবীর গর্ভে বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন নামে দুই পুত্র জন্মে। লক্ষ্মণ সেনের পরলোক গমনের পরে তাহার পুত্র মাধব সেন প্রথমে বাঙ্গালার রাজা হইয়াছিলেন । তৎপরে র্তাহীর ভ্রাত। কেশব সেন ও বিশ্বরূপ সেন পর পর বাঙ্গালার রাজা হইয়াছিলেন ।
লক্ষ্মণ সেন ছিলেন বৈষ্ণব মতবাদের কঠোর অনুসারী। তিনি 'পরমবৈষ্ণব' বা 'পরমনরসিংহ' উপাধি ধারণ করেন। তাঁর ধর্মমত পরিবর্তন সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায় না। লক্ষ্মণ সেন তাঁর অসামান্য গুণাবলী ও দানশীলতার জন্য খ্যাত ছিলেন। তবকাত-ই-নাসিরীর লেখক মিনহাজ-উস-সিরাজ তাঁর দানশীলতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বাংলার 'মহান রায়' হিসেবে অভিহিত করেন এবং দিল্লীর সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবকের তুল্য বিবেচনা করেন। তাঁর শাসনকালের শেষ দিকে অবশ্য লক্ষ্মণ সেন রাজকার্য পরিচালনায় অশক্ত হয়ে পড়েন। এই সময় সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ও সংহতির অভাব পরিলক্ষিত হয়। সমসাময়িক লেখসূত্রে সেন রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কতগুলি বিদ্রোহী প্রধানের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আভাস পাওয়া যায়।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে সেন রাজবংশের রাজত্বকাল দীর্ঘস্থায়ী না হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলায় যে রাজনৈতিক অনৈক্য দেখা দিয়েছিল, সেন রাজারা তা রোধ করেন। সেন রাজারা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু। তাই এই সময় বাংলায় হিন্দুধর্ম রাজ-পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এবং সমাজে ব্রাহ্মণদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। মুসলমান রাজত্বকালেও যে বাংলায় হিন্দু সংস্কৃতি টিকে ছিল, তার অন্যতম কারণ এই সংস্কৃতিতে সেন রাজাদের অবদান। সেন রাজাদের শাসন শেষ হলে বাংলায় তুর্কি শাসন শুরু হয়।
১২০৬ সালে মহম্মদ ঘোরি দিল্লিতে তুর্কি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগেই ১২০২ সালে তুর্কি সামরিক নেতা ইখতিয়ার উদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলা আক্রমণ করেন। এর কিছুদিন আগে লক্ষ্মণ সেন নদিয়ায় অস্থায়ী রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। নদিয়া তুর্কিদের দ্বারা আক্রান্ত হলে বৃদ্ধ লক্ষ্মণ সেন বাধা না দিয়ে নৌকাযোগে পূর্ববঙ্গে পালিয়ে আসেন। নদিয়া তুর্কি শাসনে চলে যায়। তবে লক্ষ্মণ সেন পূর্ববঙ্গ থেকে শাসনকাজ চালিয়ে যান। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র বিশ্বরূপ সেন রাজা হন। তিনি ১২২৫ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। বিশ্বরূপ সেনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সূর্য সেন রাজা হয়েছিলেন। তবে লক্ষ্মণ সেনের মৃত্যুর পর থেকেই বাংলায় সেন শাসন দুর্বল হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে সামন্ত বিদ্রোহের ফলে সেন রাজ্যের পতন ঘটে।
মোগল
=====
মঙ্গোল শব্দের আরবি ও ফারসি অপভ্রংশ থেকে 'মোগল' । শব্দটি সম্রাট ও বৃহৎ অর্থে সাম্রাজ্য বোঝাতে ব্যবহৃত হত।তবে বাবরের পূর্বপুরুষরা সাবেক মঙ্গোলদের চেয়ে ফারসি সংস্কৃতি দ্বারা বেশি প্রভাবিত ছিলেন।
বাবর মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন মধ্য এশিয়ার তুর্কো-মঙ্গোল বংশোদ্ভূত শাসক। বাবার দিক থেকে তিনি তৈমুর লং ও মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন। মধ্য এশিয়া থেকে বিতাড়িত হয়ে বাবর ভারতে ভাগ্য নির্মাণে নিয়োজিত হন। তিনি নিজেকে কাবুলের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং আফগানিস্তান থেকে খাইবার পাস হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। পানিপথের যুদ্ধে বিজয়ের পর বাবরের সেনাবাহিনী উত্তর ভারতের অধিকাংশ এলাকা জয় করে নেয়। তবে শাসন পাকাপোক্ত করতে অনেক সময় লেগে যায়।অস্থিতিশীলতা তার ছেলে হুমায়ুনের সময়ও ছড়িয়ে পড়ে। হুমায়ুন দিগ্বিজয়ী সেনাপতি শেরশাহ কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারত থেকে পারস্যে পালিয়ে যান। হুমায়ুনের সাথে পারস্যের সাফাভিদের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং মুঘল সাম্রাজ্যে পারসীয় সাংস্কৃতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। সাফাভিদের সহায়তায় হুমায়ুন মুঘলদের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। কিছুকাল পর নিজস্ব গ্রন্থাগারে ঘটা এক দুর্ঘটনায় হুমায়ুনের মৃত্যু হলেতার ছেলে আকবর অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সিংহাসনে বসেন। আকবরের অভিভাবক বৈরাম খান ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি মজবুত করতে আকবরের সহায়তা করেছেন।
১৫৫৬ সালে আকবরের ক্ষমতারোহণের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্রূপদী যুগ শুরু হয়। আকবর ও তার ছেলে জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ভারতে অর্থনৈতিক প্রগতি বহুদূর অগ্রসর হয়। আকবর অনেক হিন্দু রাজপুত রাজ্যের সাথে মিত্রতা করেন। কিছু রাজপুত রাজ্য উত্তর পশ্চিম ভারতে মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জারি রাখে কিন্তু আকবর তাদের বশীভূত করতে সক্ষম হন। মুঘল সম্রাটরা মুসলিম ছিলেন তবে জীবনের শেষের দিকে শুধুমাত্র সম্রাট আকবর ও তার পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর নতুন ধর্ম দীন-ই-ইলাহির অনুসরণ করতেন।
মুঘল সাম্রাজ্য স্থানীয় সমাজে হস্তক্ষেপ করত না তবে প্রশাসনিকভাবে এসববের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হত। অনেক বেশি কাঠামোগত, কেন্দ্রীভূত শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। মুঘল শাসনামলে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন গোষ্ঠী যেমন মারাঠা, রাজপুত ও শিখরা সামরিক শক্তি অর্জন করে।
শাহজাহানের যুগে মুঘল স্থাপত্য এর স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে। তিনি অনেক স্মৃতিসৌধ, মসজিদ, দুর্গ নির্মাণ করেন যার মধ্যে রয়েছে আগ্রার তাজমহল, মোতি মসজিদ, লালকেল্লা, দিল্লি জামে মসজিদ। আওরঙ্গজেবের শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্যের সীমানা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছায়। শিবাজী ভোসলের অধীনে মারাঠাদের আক্রমণের ফলে সাম্রাজ্যের অবনতি শুরু হয়। আওরঙ্গজেবের সময় দক্ষিণ ভারত জয়ের মাধ্যমে ৩.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটারের বেশি অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়। এসময় সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল ১৫০ মিলিয়নের বেশি যা তৎকালীন পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ এবং জিডিপি ছিল ৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
১৮শ শতাব্দীর মধ্যভাগ নাগাদ মারাঠারা মুঘল সেনাবাহিনীর বিপক্ষে সফলতা লাভ করে এবং দক্ষিণাত্য থেকে বাংলা পর্যন্ত বেশ কিছু মুঘল প্রদেশে বিজয়ী হয়। সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সৃষ্টি হয় যার ফলে বিভিন্ন প্রদেশ কার্যত স্বাধীন হয়ে পড়ে। ১৭৩৯ সালে কারনালের যুদ্ধে নাদির শাহের বাহিনীর কাছে মুঘলরা পরাজিত হয়। এসময় দিল্লি লুন্ঠিত হয়। পরের শতাব্দীতে মুঘল শক্তি ক্রমান্বয়ে সীমিত হয়ে পড়ে এবং শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের কর্তৃত্ব শুধু শাহজাহানাবাদ শহরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সিপাহী বিদ্রোহের সমর্থনে তিনি একটি ফরমান জারি করেছিলেন। সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহীতার অভিযোগ এনে কারাবন্দী করে। শেষে তিনি রেঙ্গুনে নির্বাসিত হন এবং সেখানেই মারা যান।
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ধীরে ধীরে মুঘলদের পতন শুরু হয়। এর ফলে আফগান, বালুচ ও শিখরা উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়। অবশেষে ব্রিটিশরা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার উপরে নিজেদের শাসন কায়েম করে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ও পরবর্তী শতাব্দীতে ধীরে ধীরে ভারত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীনে চলে যায়। ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের নামে অভিহিত সিপাহী বিদ্রোহেরপ্রেক্ষিতে কোম্পানির শাসনে অসন্তুষ্ট ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারতকে ব্রিটিশ রাজের প্রত্যক্ষ শাসনে নিয়ে আসেন। এই সময়টি ছিল ভারতের পরিকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অবনমনের এক অধ্যায়। যদিও পাশ্চাত্য আধুনিক শিক্ষার প্রসার এই যুগেই বাংলার মাটিতে নবজাগরণের জন্ম দেয়।
দ্রাবিড় সভ্যতা
==========
এক সময় অনেকের এইরুপ ধারনা ছিল যে আর্যদের ভারত আগমনের সময় হতে ভারতের ইতিহাস আরম্ভ হয়েছে কিন’ এই কথাগুলো সত্য নয় । আর্যদের আগমনের বহু পূর্বে ভারতে বিভিন্ন জাতি এবং উপজাতির বাস ছিল ।আর্য সভ্যতার পূর্বে ভারতে যে সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায় তা সিন্ধু সভ্যতা নামে পরিচিত । কিন্তু’ এ কথা অনেকেরই অজানা যে সিন্ধু সভ্যতার পূর্বেও ভারতে সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল । আর্যদের আগমনের পূর্বে ভারতে দুইটি বিশিষ্ট সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায় – প্রাক-সিন্ধু সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতা । দ্রাবিড় সভ্যতা প্রাক-সিন্ধু অন্তর্গত । এদের সম্পর্কে তেমন তথ্য নেই বললেই চলে। নিচে তাদের সম্পর্কে কিছু কথা তুলে ধরা হলঃ
দ্রাবিড় জাতি ভারতের প্রাচীনতম সভ্য জাতি । দক্ষিণ-ভারতের তামিল, তেলেগু, কানাড়ী, মালায়ালাম প্রভৃতি ভাষাভাষীগোষ্ঠী দ্রাবিড়জাতির বংশধর বলে পরিচিত । [নোট: অনেকের মতে ইহারা বহিরাগত, আবার অনেকের মতে ভারতের আদিম নিবাসী ।] এদের উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ থাকলেও ইহা অনস্বীকার্য যে ইহারা সুপ্রাচীনকাল হতে ভারতে বসবাস করে এক সমৃদ্ধিশালী সভ্যতা সৃষ্টি করেছিল । প্রাচীন তামিল সাহিত্যে দ্রাবিড় নগরগুলির সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ আছে । এছাড়া দ্রাবিড়গণ শিল্প-বাণিজ্যেও উন্নত ছিল এবং সমুদ্র-পথে মধ্য-প্রাচ্যের বহুদেশের সাথে ব্যবসা-বানিজ্য করত । এরা দেবালয় নির্মাণ করে মাতৃদেবীর পূজা করত এবং এদের মধ্যে নর-বলির প্রথা প্রচলিত ছিল ।
বাঙালি জাতির উদ্ভব
==============
বাঙালি জাতির মূল কাঠামো সৃষ্টির কাল প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মুসলমান অধিকারের পূর্বপর্যন্ত বিস্তৃত। সমগ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীকে দু ভাগে করা যায়-প্রাক আর্য বা অনার্য নরগোষ্ঠী এবং আর্য নরগোষ্ঠী। আর্যপূর্ব জনগোষ্ঠী মূলত চার শাখায় বিভক্ত-নেগ্রিটো, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনীয় অস্ট্রো এশিয়াটিক বা অস্ট্রিক গোষ্ঠী থেকে বাঙালি জাতির প্রধান অংশ গড়ে উঠেছে বলে ধারনা করা হয়। এদের নিষাদ জাতি নামে অভিহিঁত করা হয়।
প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার বছর পূর্বে ইন্দোচীন থেকে বাংলায় প্রবেশ করে অস্ট্রিক জাতি নেগ্রিটোদের পরাজিত করে। অস্ট্রিক জাতির সম কালে বা কিছু পরে দ্রাবিড় জাতি খাইবার গিরিপথ দিয়ে আসে এবং সভ্যতায় উন্নততর বলে তারা অস্ট্রিক জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করে। অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় জাতির সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে আর্যপূর্ব বাঙালি জাতি। অর্থাৎ বাংলার প্রাচীন জাতি অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় নরগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত। এদের ভাষা ছিল অস্ট্রিক ভাষা। নৃতাত্ত্বিকভাবে এরা আদি অস্ট্রোলয়েড নরগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে উত্তর-পূর্বাঞ্চল দিয়ে মঙ্গোলীয়দের আগমন ঘটে। বাংলাদেশে বসবাসকারী উপজাতীয়দের বড় অংশ মঙ্গোলয়েড।
খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে আফগানিস্তানের খাইবার গিরিপথ দিয়ে ককেশীয় অঞ্চলের (ইউরাল পর্বতের দক্ষিণের তৃণভূমি অঞ্চল-বর্তমান মধ্যএশিয়া, ইরান) স্তেতকায় আর্যগোষ্ঠী ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। উপমহাদেশে আগমনের অন্তত চৌদ্দশত বছর পরে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে বঙ্গ ভূখন্ডে আর্যদের আগমন ঘটে।
স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আর্যগণ সাফল্য লাভ করে এবং বঙ্গ ভূখন্ড দখল করে নেয়। পরবর্তীতে এরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যায়। এভাবে আর্য ও অনার্য আদিম অধিবাসীদেগর সংমিশ্রণে এক নতুন মিশ্র জাতির উদ্ভব ঘটে। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে সেমীয় গোত্রের আরবীয়গণ ধর্মপ্রচার ও বাণিজ্যের মাধ্যমে বাঙালি জাতির সঙ্গে মিশ্রিত হয়। কাজেই বর্তমান বাঙালি জাতি অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আর্য, মঙ্গোলীয়, সেমীয়, নিগ্রো ইত্যাদি বিভিন্ন জাতির রক্তধারায় এক বিচিত্র জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এর সাথে ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীও মিশে যায়।
সিন্ধু সভ্যতাঃ
=========
সিন্ধু সভ্যতা ছিল ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতা। এই সভ্যতা ১৬০০-১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। প্রথম দিকে এই সভ্যতা পাঞ্জাব অঞ্চলের সিন্ধু অববাহিকায় বিকাশ লাভ করে। বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ, ভারতের পশ্চিমদিকের রাজ্যগুলো, আফগানিস্তানের দক্ষিন-পূর্ব অংশ এবং ইরানের বেলুচিস্তান এই সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আর্যপূর্ব যুগে বাংলা
বঙ্গদেশে জনবসতির প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে প্রত্ন-প্রস্তর যুগ, নব্য প্রস্তর যুগ এবং তাম্র যুগের কিছু অস্ত্রশস্ত্র এখানে পাওয়া গিয়েছে। পন্ডিতেরা অনুমান করেন যে, খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে এখানে এক সুসভ্য জাতির বাস ছিল। এরা ধান চাষ করত, সম্বর ও নীলগাই শিকার করত এবং শূকর পালন করত। এরা পাথর ও তামা ব্যবহার করত এবং ইট-পাথরের ভিতের উপর প্রশস্ত ঘর তৈরি করত। প্রাচীন পুন্ড্র ও বঙ্গ জাতি আর্যপূর্ব যুগের মানুষ ছিল বলে ধারনা করা হয়। আর্য-পূর্ব যুগে বাংলার অধিবাসীরা সভ্যতায় যথেষ্ট উন্নত ছিল। বাংলায় কৃষিকাজ, নৌকা নির্মাণ, বয়নশিল্প, ধাতুশিল্প প্রভৃতি আর্যপূর্ব যুগের লোকেরাই প্রচলন করে কুমার, কামার, সূত্রধর, তাম্রকার, স্বর্ণকার, মণিকার, কাঁসারী, শাখারী ইত্যাদি পেশাদারদের কারিগরী কাজে এরা সুদক্ষ ছিল।
আর্য জাতি ঃ
যারা আর্য ভাষা অর্থাৎ ল্যাটিন, গ্রিক, জার্মান, ফরাসি ভাষায় কথা বলত তারা আর্য জাতি। এদের বসবাস ছিল ইউরাল পর্বতের দক্ষিণের তৃণভূমি অঞ্চলে। এদের প্রাচীন সাহিত্যিক ধর্মীয় গ্রন্থ হলো ঋকবেদ। খ্রিস্টাপূর্ব ১৫০০ অব্দে আফগানিস্তানের খাইবার গিরিপথ দিয়ে আর্যগণ ভারতবর্ষে প্রভেশ করে। ভারতবর্ষে প্রবেশের চৌদ্দশত বছর পর খ্রিস্টপূর্ব ১০০ অব্দে আর্যগণ বাংলায় প্রবেশ করে। এ সময় বঙ্গদেশ অস্ট্রিক জাতির প্রভাবাধীন ছিল। ধারণা করা হয় যে, মৌর্যযুগ হতে গুপ্ত বংশের শাসনামল পর্যন্ত প্রায় আটশত বছর বঙ্গদেশে আর্যীকরণ ঘটেছিল।
* আর্যপূর্ব বঙ্গ জনগোষ্ঠী ছিল অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় জাতির মিশ্রণ।
* আর্যদের আগমনের পরে বঙ্গদেশে আসে ভোটচীনীয় জাতি। এরা হলো গারো, কোচ, চাকমা ত্রিপুরা প্রভৃতি।
আর্য যুগে বাংলা ঃ
খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে যুদ্ধযাত্রা, বাণিজ্য ও ধর্মপ্রচার উপলক্ষে আর্যরা ক্রমশ অধিক সংখ্যায় এদেশে এসে বসবাস আরম্ভ করে। আর্যরা এদেশে আসার ফলে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের উপর আর্যদের ভাষা, ধর্ম, সামাজিক প্রথা ও সভ্যতার অন্যান্য ক্ষেত্রে দারুণ প্রভাব পড়তে থাকে। ক্রমে বাংলায় বৈদিক, পৌরাণিক, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম প্রচারিত হয় এবং বর্ণভেদ ও জাতিভেদ প্রথা অনুসারে সমাজ গঠিত হয়। আর্য ভাষার প্রভাবে বাংলায় আদি ভাষাগুলো লুপ্ত হয় এবং কালক্রমে বহুযুগ পরে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটে। তা সত্ত্বেও বাংলার আদি ভাষা, ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি, বরং সংমিশ্রিত আকারে বিকাশ লাভ করেছে।
হর্ষবর্ধন ঃ
৬০৬ সালে রাজ্যবর্ধন শশাঙ্কের হাতে নিহত হলে হর্ষবর্ধন সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার সিংহাসন আরোহণকে স্মরনীয় করে রাখার জন্য তিনি ‘হর্ষাব্দ’ নামক সাল গণনার প্রচলন করেন।
সিংহাসন আরোহণ করেই তিনি ভগ্নি রাজ্যশ্রীকে উদ্ধারে ব্রতী হন এবং মিত্র কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মনের বাহিনীসহ গৌড়রাজ্য আক্রমণ করেন। তীব্র আক্রমণের আশংকায় শশাঙ্ক সম্মুখযুদ্ধ এড়াতে বন্দী রাজ্যশ্রীকে মুক্তি দিয়ে পূর্বদিকে সরে যান। ভগ্নি উদ্ধার করে হর্ষবর্ধন থানেশ্বরে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে শশাঙ্কের মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন গৌড় রাজ্য দখল করেন। প্রথম জীবনে হর্ষবর্ধন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও পরবর্তীতে ‘মহাযানী বৌদ্ধ’ ধর্ম গ্রহণ করেন। বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে এক বৌদ্ধ মহাসম্মেলনের আয়োজন করে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তার রাজত্বকালে ৬৩০-৬৪৪ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষ সফর করেন এবং তার শাসনের বিভিন্ন দিক লিপিবদ্ধ করেন।
প্রাচীন বাংলার জনপদ
প্রাচীন যুগে বাংলা অখন্ড কোন রাজ্য ছিল না। ভিন্ন ভিন্ন নামে খন্ডে খন্ডে বিভিন্ন জনপদে বিভক্ত ছিল সমগ্র বাংলা। প্রাচীন জনপদগুলোর সীমা ও বিস্তৃতি সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন্ বিভিন্ন সময়ে ও রাজন্যবর্গের শাসনামলে এর সীমা ও পরিধির পরিবর্তন ঘটেছে। তাই প্রাচীন বাংলার কোন সুনির্দিষ্ট সীমারেখা ছিল না।
গৌড়ঃ
বাংলার উত্তরাংশ এবং উত্তরবঙ্গে ছিল গৌড় রাজ্য। সপ্তম শতকে রাজা শশাঙ্ক বিহার ও উড়িষ্যা পর্যন্ত গৌড় রাজ্যের সীমা বর্ধিত করেন। প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোকে শশাংক গৌড় নামে একত্রিত করেন। মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ (বর্তমান রাঙ্গামাটি অঞ্চল) ছিল শশাঙ্কের সময়ে গৌড় রাজ্যের রাজধানী। আমাদের বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সন্নিকটের এলাকা গৌড় রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলার উত্তর-পশ্চিমাংশ,বিহার ও উড়িষ্যা অঞ্চলের রাজধানীও ছিল গৌড় নগরী।
বঙ্গঃ
ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও পটুয়াখালীর নিম্ন জলাভুমি এবং পশ্চিমের উচ্চভূমি যশোর, কুষ্টিয়া, নদীয়া, শান্তিপুর ও ঢাকার বিক্রমপুর সংলগ্ন অঞ্চল ছিল বঙ্গ জনপদের অন্তর্গত। সুতরাং বৃহত্তর ঢাকা প্রাচীনকালে বঙ্গ জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পুরানো শিলালিপিতে বিক্রমপুর ও নাব্য নামে দুটি অংশের উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন বঙ্গ ছিল একটি শক্তিশালী রাজ্য।
* ঋগ্বেদের (প্রচীন বৈদিক সাহিত্য) ঐতরেয় আরণ্যক-এ বঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া রামায়ণ ও মহাভারতে এবং কালিদাসের রঘুবংশ –এ বঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।
* সমগ্র বাংলা বঙ্গ নামে ঐক্যবদ্ধ হয় পাঠান আমলে।
সমতটঃ
হিউয়েন সাং এর বিবরণ অনুযায়ী সমতট ছিল বঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বাংশের একটি নতুন রাজ্য। মেঘনা নদীর মোহনাসহ বর্তমান কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চল সমতটের অন্তর্ভুক্ত। কুমিল্লা জেলার বড় কামতা এ রাজ্যের রাজধানী ছিল বলে জানা যায়।
রাঢ়ঃ
রাঢ় বাংলার একটি প্রাচীন জনপদ।ভাগীরথী নদীর পম্চিম তীর হতে গঙ্গা নদীর দক্ষিণাঞ্চল রাঢ় অঞ্চলের অন্তর্গত। অজয় নদী রাঢ় অঞ্চলকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। রাঢ়ের দক্ষিণে মেদেনীপুর জেলায় ‘তাম্রলিপি’ ও ‘দন্ডভুক্তি’ নামে দুটি ছোট বিভাগ ছিল। তৎকালে তাম্রলিপি ছিল একটি বিখ্যাত নৌবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র।
পুন্ড্রঃ
বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অবস্থানভুমিকে কেন্দ্র করে পুন্ড্র জনপদ গড়ে ওঠে। এটি বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন জনপদ। পুন্ড্রবর্ধন বা পুন্ড্রনগর ছিল প্রাচীন পুন্ড্র রাজ্যের রাজধানী। এর অবস্থান বর্তমান বগুড়ার মহাস্থানগড়। সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে প্রাচীন পুন্ড্র রাজ্যের স্বাধীন সত্ত্ব বিলুপ্ত হয়।
* ‘পৌন্দ্রিক’ শব্দের অর্থ আখ বা চিনি। এ শব্দ থেকে ‘পুন্ড্রবর্ধন’ নামের উৎপত্তি।
* পাল রাজারা উত্তরবঙ্গকে তাদের পিতৃভূমি মনে করত। সে কারণে এর নামকরণ করেছিল বারিন্দ্রী। এ বারিন্দ্রী থেকে বরেন্দ্র শব্দের উৎপত্তি। রাজশাহী বিভাগের উত্তর –পশ্চিমাংশ তথা রংপুরের সামান্য এলাকা ব্যতীত উত্তরবঙ্গের বিস্তৃত অঞ্চলে বরেন্দ্রভূমি গড়ে উঠে। বর্তমান করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরের লালমাটি সমৃদ্ধ অঞ্চলই বরেন্দ্র ভূমি নামে পরিচিত। রামায়ণে গঙ্গা ও করতোয়া নদীর পশ্চিমাংশের মধ্যবর্তী অংশকে বরেন্দ্রীমন্ডল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরিকেলঃ
হরিকেল হলো ভারতবর্ষের পূর্বপ্রান্তের অঞ্চল। ত্রিপুরার শৈলশ্রেণীর সমান্তরাল অঞ্চল সিলেট হতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত হরিকেল বিস্তৃত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত দুইটি শিলালিপিতে হরিকেল সিলেটের সঙ্গে সমার্থক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরুক্ষেত্র কেন ধর্মক্ষেত্র ?
================
ধর্মক্ষেত্র / তীর্থক্ষেত্র। ধর্মের সংসার- পবিত্র সংসার জীবন যাপন।
=======================================
মহাকবি কালিদাস তাঁর মেঘদূত কাব্যে বলছেন কুরুক্ষেত্র ও ব্রহ্মাবর্ত একই । এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন ব্রহ্মাবর্ত কি ?
বেদ মতে সরস্বতী ও দৃষদ্বতী নদীর মধ্যে অবস্থিত ভূমিকে বলা হয় ব্রহ্মাাবর্ত বা ব্রাক্ষ্মণের অঞ্চল ।
মনুস্মৃতিতে দৃষদ্বতী ও সরস্বতী নদী ব্রহ্মাবর্ত বৈদিক নগরের সীমানা সংজ্ঞায়িত করেছে বলে বিবরণ পাওয়া যায়ঃ
"সরস্বতী ও দৃষদ্বতী এই দুই প্রশস্ত দেবনদীর মধ্যস্থলে যে সকল দেবনির্মিত দেশ অর্থাৎ প্রশস্ত দেশ আছে, তাদেরকে ব্ৰহ্মাবৰ্ত বলে।"
মনুস্মৃতি অনুসারে, ব্রহ্মাবর্ত থেকে স্থান এবং এর বাসিন্দাদের বিশুদ্ধতা আরও হ্রাস পেয়েছে। আর্য (সম্ভ্রান্ত) লোকেরা "ভাল" এলাকায় বসবাস করে বলে বিশ্বাস করা হত এবং সেখান থেকে দূরত্ব বাড়লে জনসংখ্যার মধ্যে ম্লেচ্ছ (বর্বর) লোকের অনুপাত বেড়ে যায়। এটি ব্রহ্মাবর্ত কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাওয়ায় বিশুদ্ধতা হ্রাসের এককেন্দ্রিক বৃত্তের একটি সিরিজ বোঝায়।
দৃষদ্বতী শব্দের অর্থ পরিষ্কার জলের অধিকারিনী । ঋগ্বেদ মতে, বৈদিক জনগণ আধ্যাত্মিক কার্যক্রমের জন্য দৃষদ্বতীকে পছন্দ করতো।
সরস্বতী" শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ এভাবেও হতে পারে - সরসু+অতি সেক্ষেত্রে শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় "যা প্রচুর জল ধারণ করে ।
এটিকে এমন স্থান হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে যেখানে "ভাল" মানুষ জন্মগ্রহণ করে। নামটি "পবিত্র ভূমি", "দেবতার আবাস", এবং "সৃষ্টির দৃশ্য" ইত্যাদি ইত্যাদি ।
সংস্কৃতের অধ্যাপক প্যাট্রিক অলিভেলের করা মনুস্মৃতির অনুবাদ বলেছে:
===========================================
দেবতাদের দ্বারা সৃষ্ট এবং ঐশ্বরিক নদী সরস্বতী ও দ্রীষবতীর মধ্যে অবস্থিত ভূমিকে বলা হয় 'ব্রহ্মাবর্ত' - ব্রাহ্মণের অঞ্চল। সেই ভূখণ্ডের সামাজিক শ্রেণী ও মধ্যবর্তী শ্রেণীর মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে আচরণ করা হয় তাকে বলা হয় 'ভালো মানুষের আচরণ'। কুরুক্ষেত্র এবং মৎস্য, পাঞ্চাল ও শূরসেনদের ভূমি 'ব্রাহ্মণ দ্রষ্টার দেশ' গঠন করে, যা ব্রহ্মবর্তের সীমানা। পৃথিবীর সকল মানুষের উচিত সেই দেশে জন্মগ্রহণকারী ব্রাহ্মণের কাছ থেকে তাদের নিজ নিজ চর্চা শেখা উচিত।
মনুস্মৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সরস্বতী কুরু প্রদেশের উত্তর সীমারেখা তৈরি করলেও, দৃষদ্বতী কুরু প্রদেশের দক্ষিণে ও ব্রহ্মাবর্তের উত্তরে প্রবাহিত হয়েছিল। মহাভারত অনুসারে , কুরু প্রদেশের দক্ষিণ সীমানায় ছিল গুরু দ্রোণের আশ্রম (বর্তমানে গুরগাঁও এক প্রান্তে ও রোহতক ও ঝজ্জরের অপর প্রান্তে অবস্থিত;) এই শহরের দক্ষিণ দিকে দৃষদ্বতী প্রবাহিত হতো।
কুরুক্ষেত্র
======
হিন্দু পৌরাণিক মহাকাব্য মহাভারতে বর্ণিত কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধক্ষেত্র বিশেষ। মহাভারতে মতে ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সন্ধিতে পরশুরাম এই তীর্থক্ষেত্রটি তৈরি করেছিলেন। তখন এর নাম ছিল সমন্তপঞ্চক। জাবাল উপনিষদ ও শতপথ ব্রাহ্মণে একে দেবতাদের যজ্ঞস্থান নামে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ভরতবংশীয় রাজা কুরুর নামানুসারে এই স্থানের নাম কুরুক্ষেত্র বা কুরুজাঙ্গাল হয়। বর্তমানে ভারতের হরিয়ানা প্রদেশের একটি জেলা। এই স্থানটি ধর্মক্ষেত্র নামে পরিচিত ছিল।
সমন্তপঞ্চকের ইতিহাসঃ
===============
মহাভারতের আদি পর্বের দ্বিতীয় অধ্যায়ে, নৈমিষারণ্যে মহর্ষিদের কাছে এই তীর্থ সম্পর্কে বর্ণনা করেন।
ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে বিষ্ণুর তিন অবতারের দ্বিতীয় অবতার হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন পরশুরাম। কার্তবীর্যের পুত্ররা তাঁর পিতা জমদগ্নীকে হত্যা করেছে, এই সংবাদ পাওয়ার পর পরশুরাম ক্ষত্রিয় নিধন করার উদ্যোগ নেন। মহাভারতের মতে তিনি একুশবার পৃথিবীকে নিঃক্ষৎত্রিয় করেন। এই সময় ক্ষত্রিয়দের রক্ত দিয়ে পাঁচটি হ্রদ তৈরি করেন। পরে সেই হ্রদের রক্ পিতৃলোকের তর্পণ করেছিলেন। এরপর ঋচীক প্রভৃতি পিতৃগণ এসে এই কাজের প্রশংসা করেন এবং বর প্রার্থনা করতে বলেন। উত্তরে পরশুরাম বলেন যে, "হে পিতৃগণ! যদি প্রসন্ন হইয়া ইচ্ছানুরূপ বর প্রদানে অনুগ্রহ করেন, তাহা হইলে ক্রোধে অধীর হইয়া ক্ষৎত্রিয়বংশ ধ্বংস করিয়া যে পাপরাশি সঞ্চয় করিয়াছি, সেই সকল পাপ হইতে যাহাতে মুক্ত হই এবং এই শোণিতময় পঞ্চহ্রদ অদ্যাবধি পৃথিবীতে তীর্থস্থান বলিয়া যাহাতে প্রখ্যাত হয়, এরূপ বর প্রদান করুন।' পিতৃগণ সেই বর প্রদান করে, ক্ষত্রিয়দের হত্যা বন্ধ করার কথা বলে যান। এরপর পরশুরাম ক্ষত্রিয়নিধন বন্ধ করে দেন।
আবারঃ
=====
সন্ন্যাস গ্রহণ করে কুরু এখানে তপস্যা করে স্থানটি পবিত্র ধর্মক্ষেত্রে পরিণত করেন । কুরুর যজ্ঞকালে সরস্বতী নদী , ওঘবতী নদী - রূপে এসে এই জমি ভিজিয়ে দিয়ে যান । যজ্ঞের পর এখানে হাল চালনা করে কুরু বরলাভ করেন যে , এখানে যাঁরা প্রাণত্যাগ করবেন তাঁরা স্বর্গে যাবেন । কুরু এখানে সব সময়েই হাল চালনা করতেন । কৌতূহলী ইন্দ্র মানুষের স্বর্গলাভের এই সহজ-পন্থা রোধ করার জন্য কুরুর কাছে এসে হাল চালনা করতে বারণ করলে উভয়ের মধ্যে শর্ত হয় , এখানে উপবাস করে কিংবা যুদ্ধ করে মারা গেলে মানুষ এমনকি পশুরাও স্বর্গে যাবে । কুরুক্ষেত্রে ইক্ষুমতী নদীতীরে তক্ষক বাস করতেন । কুরুক্ষেত্রে শান্তনুর পুত্র চিত্রাঙ্গদ নিহত হন । দৈত্যপতি সুন্দ ও উপসুন্দ কুরুক্ষেত্রে বাস করতেন । প্রাচীনতম রাজা মান্ধাতা এই কুরুক্ষেত্রেই পূণ্যযজ্ঞ করেছিলেন । মহান মুদগল মুণিরও বসতি ছিল এই কুরুক্ষেত্র ।
আবারঃ
====
শতপথ ব্রাহ্মণে আছে, “দেবাঃ হ বৈ সত্রং নিষেদুরগ্নিরিন্দ্রঃ সোমো মখো বিষ্ণুর্বিশ্বেদেবা অন্যত্রেবাশ্বিভ্যাম্। তেষাং কুরুক্ষেত্রং দেবযজনমাস। তস্মাদাহুঃ কুরুক্ষেত্রং দেবযজনম্।” অর্থাৎ দেবতারা এইখানে যজ্ঞ করিয়াছিলেন, এজন্য ইহাকে ‘দেবতাদিগের যজ্ঞস্থান’ বলে।
নিচে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর ভাষ্যটি হুবুহু তুলে ধরা হলো—
====================================
কুরুক্ষেত্র একটি চক্র বা জনপদ। ঐ চক্র এখনকার স্থানেশ্বর বা থানেশ্বর নগরের দক্ষিণবর্তী। আম্বালা নগর হইতে উহা ১৫ ক্রোশ দক্ষিণ। পানিপাট হইতে উহা ২০ ক্রোশ উত্তর। কুরুক্ষেত্র ও পানিপাট ভারতবর্ষের যুদ্ধক্ষেত্র, ভারতের ভাগ্য অনেক বার ঐ ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি পাইয়াছে। “ক্ষেত্র” নাম শুনিয়া ভরসা করি, কেহ একখানি মাঠ বুঝিবেন না। কুরুক্ষেত্র প্রাচীন কালেই পঞ্চ যোজন দৈর্ঘ্যে এবং পঞ্চ যোজন প্রন্থে। এই জন্য উহাকে সমন্তপঞ্চক বলা যাইত। চক্রের সীমা এখন আরও বাড়িয়া গিয়াছে।
কুরু নামে এক জন চন্দ্রবংশীয় রাজা ছিলেন। তাঁহা হইতেই এই চক্রের নাম কুরুক্ষেত্র হইয়াছে। তিনি দুর্য্যোধনাদির ও পাণ্ডবদিগের পূর্ব্বপুরুষ; এজন্য দুর্য্যোধনাদিকে কৌরব বলা হয়, এবং কখন কখন পাণ্ডবদিগকেও বলা হয়। তিনি এই স্থানে তপস্যা করিয়া বর লাভ করিয়াছিলেন, এই জন্য ইহার নাম কুরুক্ষেত্র। মহাভারতে কথিত হইয়াছে যে, তাঁহার তপস্যার কারণেই উহা পুণ্যতীর্থ। ফলে চিরকালই কুরুক্ষেত্র পুণ্যক্ষেত্র বা ধর্মক্ষেত্র বলিয়া প্রসিদ্ধ।
বি দ্রঃ যোজন প্রাচীন ভারতের দূরত্বের একক। রামায়ণ অনুসারে পুষ্পক রথে চড়ে রাবণ ও লাফ দিয়ে হনুমান শত যোজন বিস্তৃত সাগর পার হয়ে লঙ্কায় পৌঁছেছিল। গুপী গাইন বাঘা বাইন চলচ্চিত্রে ষুণ্ডি থেকে হল্লা রাজ্যের দূরত্ব ছিলো ২০ যোজন।
বিষ্ণুপুরাণ এর ষষ্ঠ খন্ডের প্রথম অধ্যয়ে বলা হয়েছে-
১০ পরমাণু= ১ পরাসুক্ষ্ম; ১০ পরাসুক্ষ্ম= ১ ত্রসরেনু; ১০ ত্রসরেনু= ১ মহীরজ; ১০ মহীরজ= ১ বালাগ্র; ১০ বালাগ্র= ১ লিক্ষা; ১০ লিক্ষা = ১ যুক; ১০ যুক= ১ যবোদর; ১০ যবোদর= ১ যব; ১০ যব = ১ অঙ্গুলি(প্রায় ৩/৪ ইঞ্চি); ৬ অঙ্গুলি= ১ পদ; ২ পদ = ১ বিতস্তি; ২ বিতস্তি = ১ হস্ত; ৪ হস্ত = ১ ধনু; (১ দন্দ অথবা পৌরুষ অথবা নারীকা= ৬ ফুট; ১হস্ত=১.৫ফুট); ২০০০ ধনু= ১ গব্যুতি = ১২০০০ ফুট; ৪ গব্যুতি= ১ যোজন= ৯.০৯ মাইল
মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ এখানে হয়েছিলো । এইটা আমরা সবাই জানি। যারা এখানে মারা গিয়েছিলো তারা সবাই (দুর্যধন সহ ) স্বর্গে অবস্থান করছে ।
এরকম বিভিন্ন কারনে কুরুক্ষেত্র সবার কাছে ধর্মক্ষেত্র বলা হয় ।

কে ধৃতরাষ্ট্র?
=======
মহাভীষঃ
একদা রাজর্ষি (যিনি রাজা হয়েও ঋষি) মহাভিষ নামে এক রাজা স্বর্গলাভ করেছিলেন। একবার স্বর্গ সভায় তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বহু দেব-দেবীদের মাঝে গঙ্গাও ছিলেন। প্রবল বায়ুপ্রবাহে গঙ্গার সূক্ষ্ম বসন তখন খুলে যায়। এতে তিনি নিরাভরণা হয়ে গেলে সকলে দৃষ্টি সংযত করলেও রাজা মহাভিষ অসংকোচ দৃষ্টিতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে রইলেন। গঙ্গাও সেসময় তার প্রতি কিছুটা আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তবে এই বিষয়টা ব্রহ্মার ভালো লাগেনি। তাই তিনি মহাভিষকে স্বর্গচ্যুতির অভিশাপ দিলেন। রাজার কাতর অনুনয়ের পর ব্রহ্মদেব তাকে মর্ত্যলোকে কিছুকাল বাস করে পরে পুনরায় স্বর্গে প্রবেশের অধিকার দিলেন। রাজা মহাভিষ তখন কুরুবংশীয় রাজা “প্রতীপ”-এর পুত্র হিসেবে জন্মের জন্য সংকল্প করলেন (‘শান্তনু’ নামে)। রাজা প্রতীপ নিজেও একজন রাজর্ষি ছিলেন।
প্রতীপ রাজাঃ
========
পুরাণ অনুসারে, প্রতীপ ছিলেন ভীমসেনের প্রপৌত্র এবং দিলীপের পুত্র। তবে, মহাভারত অনুসারে, তিনি ছিলেন রাজা ভীমসেন এবং কৈকেয়দের রাজকন্যা সুকুমারীর পুত্র। তিনি শিবি গোত্রের সুনন্দাকে বিয়ে করেন, যার থেকে তিনি দেবাপি, বাহ্লীক এবং শান্তনুর জন্ম দেন।
প্রতীপ রাজার সংগে গঙ্গার সঙ্গে সাক্ষাৎঃ
==========================
একবার, রাজা প্রতীপ যখন গঙ্গা নদীর তীরে ধ্যান করছিলেন এবং সূর্যের আরাধনা করছিলেন, তখন সত্যলোকে ব্রহ্মার কাছ থেকে অভিশাপ পেয়ে দেবী গঙ্গা আবির্ভূত হন। গঙ্গা এসে প্রতীপের ডান কোলে বসলেন, যার ফলে তাঁর ধ্যান ভেঙে গেল। তিনি প্রতীপকে বিয়ে করার জন্য অনুরোধ করেন। প্রতীপ বললেন যে যেহেতু গঙ্গা তার ডান কোলে বসেছিল, যা কন্যা বা পুত্রবধূর স্থান, তাই প্রতীপ একটি পুত্রের জন্ম না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপেক্ষায় থাকতে হবে। তাই, তিনি গঙ্গাকে প্রস্তাব দেন যে তিনি তাঁর ছেলেকে বিয়ে করতে পারেন এবং তাঁর পুত্রবধূ হতে পারেন। এই সময়ে, প্রতীপ এবং তার স্ত্রী তখনও সন্তানহীন ছিলেন, কিন্তু তারা কিছু তপস্যা করার পরে, তারা দেবাপি, বাহ্লীক এবং শান্তনু নামে তিনটি পুত্রের জন্ম দেয়। কনিষ্ঠ পুত্র শান্তনু হস্তিনাপুর রাজ্যের উত্তরাধিকারী হন। শান্তনু পরে গঙ্গাকে বিয়ে করেন এবং দেবব্রতের পিতা হন, যিনি ভীষ্ম নামে সুপরিচিত।
গংগা দেবী
=======
গঙ্গার জন্মকাহিনি বিষয়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলির মধ্যে মতদ্বৈততা দৃষ্ট হয়। একটি কাহিনি অনুযায়ী ব্রহ্মার কমণ্ডলু এক নারীমূর্তির স্বরূপ প্রাপ্ত হয়। ইনিই গঙ্গা। বৈষ্ণব মতানুসারে, ব্রহ্মা তার কমণ্ডলুর জল নিয়ে সশ্রদ্ধ চিত্তে বিষ্ণুর পদ ধৌত করেছিলেন। সেই থেকেই গঙ্গার জন্ম। তৃতীয় একটি মত অনুযায়ী, গঙ্গা পর্বতরাজ হিমালয় ও তার পত্নী মেনকার কন্যা এবং পার্বতীর ভগিনী। তবে প্রতিটি মতেই একথা স্বীকৃত যে ব্রহ্মা গঙ্গাকে পবিত্র করে তাকে স্বর্গে উত্তীর্ণ করেন।
অষ্টবসুঃ
========
অষ্টবসু হলেন আটজন গণদেবতা। দক্ষের কন্যা ও ধর্মদেবের স্ত্রী বসুর গর্ভে তাদের জন্ম। কিছু পুরাণ ও রামায়ণ মতে অষ্টবসুদের বর্ণনা করা হয়েছে কশ্যপ ও অদিতির সন্তান এবং মহাভারতে মনু বা ব্রহ্মা প্রজাপতির সন্তান হিসেবে। তারা হলেন আটজন মৌলিক দেবতা প্রকৃতির দিকগুলি (পঞ্চভূত) প্রতিনিধিত্ব করে এবং মহাজাগতিক প্রাকৃতিক ঘটনা (সূর্য, চাঁদ ও তারা) প্রতিনিধিত্ব করে। বসু নামের অর্থ হল 'উজ্জ্বল' বা 'ধন দানকারী'। তারা তেত্রিশ দেবতার মধ্যে আটজন।
এই অষ্টবসুদের নামের ক্ষেত্রেও মহাভারতের সাথে রামায়ণের অমিল রয়েছে। তবে এখানে শুধু মহাভারতে উল্লেখিত নামগুলো দেয়া হলো : ১।। অনল (অগ্নির প্রতিনিধিত্বকারী), ২।। অনিল (বায়ুর প্রতিনিধিত্বকারী), ৩।। সোম (চন্দ্রের প্রতিনিধিত্বকারী), ৪।। অহস (অন্তরীক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী), ৫।। ধর বা পৃথু (পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বকারী), ৬।। ধ্রুব (নক্ষত্রসমূহের প্রতিনিধিত্বকারী), ৭।। প্রত্যুষ (ঊষালগ্নের প্রতিনিধিত্বকারী) এবং ৮।। প্রভাষ বা দ্যু (দ্যুলোকের বা আকাশের প্রতিনিধিত্বকারী)। এদেরকে আবার আটটি দিকেরও (মানে পূর্ব, পশ্চিম ইত্যাদি দিকের) দেবত্ব আরোপ করা হয়েছে।
একসময় অষ্টবসুরা তাদের স্ত্রীদের নিয়ে সুমেরু পর্বতে অবস্থিত ঋষি বশিষ্ঠের আশ্রমে ভ্রমণ করতে গিয়েছিলেন। ঋষি বশিষ্ঠের নন্দিনী নামক একটি কামধেনু ছিলো (কামধেনু মানে হলো জাদুকরী ক্ষমতাসম্পন্ন এক গাভী)। এটি মন্ত্রবলে যেকোনো কামনা পূরণ করতে পারতো বলে এর নাম কামধেনু। অনেকটা আলাদীনের চেরাগের দৈত্যের মতো! ঋষি বশিষ্ঠ এটার সাহায্যে অষ্টবসুদের সহজেই সমাদর করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু প্রভাষ পত্নীর এটার উপর দারুণ লোভ হলো। রাত্রে প্রভাষকে তার পত্নী এই গাভীটি চুরি করতে রাজি করালেন। তখন আশ্রমের সকলে নিদ্রা গেলে প্রভাষ, বিশেষ করে তার ভাই পৃথুর সহায়ক ভূমিকায়, গাভীটি চুরি করে নিয়ে পালিয়ে যেতে লাগলেন। এমনি সময়ে তিনি ও তার ভাই এবং তাদের পত্নীসহ চোরাই মাল নিয়ে ঋষি বশিষ্ঠের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে যান। ক্রুদ্ধ বশিষ্ঠ তখন তাদের অভিশাপ দিলেন, প্রত্যেককেই দেবত্ব খুইয়ে মর্ত্যলোকে বাস করতে হবে। পরে অষ্টবসুদের অনুরোধে ঋষি বশিষ্ঠ প্রভাষ ব্যতীত সকলের শাস্তি কমিয়ে দেন। তিনি তাদেরকে বলেন যে, প্রভাষ ব্যতীত সকলেই জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরই স্বর্গে ফিরে যেতে পারবেন। তবে প্রভাষকে চৌর্য কর্মের মূল হোতা হিসেবে মর্ত্যে দীর্ঘ জীবন থাকতে হবে। চিন্তিত বসুরা তখন উদ্ধারের জন্য দেবী গঙ্গার তপস্যায় মগ্ন হলেন।
এদিকে দেবী গঙ্গা তপস্যারত বসুদের কাছে গেলে তারা তাকে গঙ্গা এবং প্রতীপ পুত্র শান্তনুর সন্তান হিসেবে প্রসব করে জলে বিসর্জিত করার জন্য অনুরোধ করেন। জবাবে গঙ্গা তাদের বলেন, তাই হবে, কিন্তু তাদের যেন একটি পুত্র জীবিত থাকে। নতুবা তার সাথে শান্তনুর সঙ্গম ব্যর্থ হবে বলে আশংকা প্রকাশ করেন। বসুরা তখন সমাধান হিসেবে তাদের প্রত্যেকের নিজ বীর্যের অষ্টাংশ দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তারা এরপর গঙ্গাকে বললেন, এতে করে সেই জন্মানো পুত্র (ভীষ্ম) বলবান হবে, তবে তার সন্তান হবে না। গঙ্গা এভাবে অষ্টবসুদের বীর্যে সন্তান ধারণ করেছিলেন বলে ভীষ্মের অপর নাম হল ‘গাঙ্গেয়’, মানে গঙ্গাপুত্র। গঙ্গা অষ্টবসুদের প্রার্থনায় সম্মতি দিয়ে মহাভিষের কথা ভাবতে ভাবতে মর্ত্যে গমন করেন।
প্রতীপ পুত্র শান্তনুর রাজ্যাভিষেকঃ
===================
যৌবন লাভ করার পর প্রতীপ তাকে সিংহাসনে অভিষেক করিয়ে বললেন, “তুমি গঙ্গা তীরে যেয়ো। সেখানে এক রূপবতী কন্যা পাবে। তাকে তুমি বিবাহ করো, তবে তার পরিচয় জানতে চেয়ো না এবং তার কার্যে বাধা দিও না”। এই বলে তিনি তপস্যা করতে সপত্নীক বনে চলে যান।
শান্তনু ও গঙ্গার বিবাহ এবং ভীষ্মের জন্মঃ
=======================
শান্তনু পিতার কথামতো গঙ্গাতীরে যান। সেখানে রূপসী দেবী গঙ্গাকে সাধারণ মানবী মনে করে তাকে প্রণয় নিবেদন করলে গঙ্গা শর্ত সাপেক্ষে রাজি হলেন। যদি রাজা তার পরিচয় জানতে না চান এবং তার কার্যে বাধা না দেন, তবে তিনি তাকে বিবাহ করবেন। তবে বাধা পেলে তাকে ত্যাগ করবেন। পিতার কথা স্মরণ করে শান্তনু রাজি হন।
কিছুকাল পরে যথাক্রমে তাদের আটটি সন্তান হলো। এদের সাতজনকেই গঙ্গাদেবী জলে নিক্ষেপ করেন। শান্তনু মনে মনে ক্রুদ্ধ হলেও গঙ্গার তাকে পরিত্যাগের কথা ভেবে নীরব থাকলেন। তবে অষ্টম পুত্রের ক্ষেত্রে আর না পেরে বাদ সাধলেন। গঙ্গাও তখন বললেন, “ঠিক আছে রাজা, আমি একে জলে নিক্ষেপ করবো না। তবে তোমার সাথে আমার থাকাও শেষ হলো”। এরপর পূর্বের স্বরূপে ফিরে শান্তনুকে অষ্টবসুর কাহিনী বললেন। তারপর সদ্যজাত শিশুটিকে নিয়ে অন্তর্হিত হলেন। শান্তনু তখন বিষণ্ণ মনে রাজপ্রাসাদে ফিরে যান।
দেবব্রতের ভীষ্ম হয়ে ওঠার কাহিনী
===================
মহারাজ শান্তনু ও গঙ্গার পুত্র ‘দেবব্রত’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ঋষি বশিষ্ঠের কাছে শাস্ত্র শিক্ষা এবং পরশুরামের (বিষ্ণুর এক অবতার) কাছে অস্ত্র শিক্ষা অধ্যয়ন করলেন। পরে যুবক বয়সে উত্তীর্ণ হলে গঙ্গা তাকে তার পিতা শান্তনুর নিকট ফিরিয়ে দেন। রাজা তাকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করেন। একসময় শান্তনু ‘সত্যবতী’ নামের এক ধীবররাজার কন্যার প্রেমে পড়েন (উনারও একটা লম্বা ইতিহাস আছে! মহাভারতের রচয়িতা নামে খ্যাত মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস এরই ঔরসজাত সন্তান, পরাশর মুনির সাথে কুমারী অবস্থায় নদীতে নৌকা মাঝে মিলিত হয়ে এই সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন)। সত্যবতীকে বিয়ে করতে চাইলে সত্যবতীর পিতা রাজা শান্তনুর কাছে রাণী এবং শুধু তার কন্যার পুত্রদেরই রাজ্যাধিকার চান। শান্তনু তাতে সম্মত না হয়ে বিষণ্ণ মনে প্রাসাদে ফেরত আসেন। নিজের পিতাকে বিষণ্ণ দেখে এবং অমাত্যদের কাছে এর কারণ শুনে তিনি ধীবররাজের কাছে ছুটে গিয়ে ধীবরকন্যা সত্যবতীকে তার পিতার জন্য চাইলেন। নিজে প্রতিজ্ঞা করলেন যে, তিনি রাজ্যভোগ ও বিবাহ করবেন না এবং নিঃসন্তান থাকবেন। এছাড়াও নিঃস্বার্থ এবং নিরাসক্ত হয়ে কুরুরাজ্যের আমৃত্যু সেবা করবেন। তার এরূপ দৃঢ় সংকল্পের কারণে তার পিতা শান্তনু খুশি হলেন এবং তাকে ভীষ্ম নাম ও ইচ্ছামৃত্যুর বর দিলেন। সেই থেকেই দেবব্রতের নাম পাল্টে গিয়ে তিনি ভীষ্ম নামে পরিচিত হলেন। ভীষ্ম নিজেকে কুরুবংশের অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
কাশীরাজের তিন কন্যা অপহরণঃ
===================
বিয়ের পর শান্তনু ও সত্যবতী দম্পতির দুই পুত্র হলো, চিত্রাঙ্গদ এবং বিচিত্রবীর্য। এদের যৌবন লাভের পূর্বেই শান্তনুর মৃত্যু হয়। চিত্রাঙ্গদ যুবক বয়সে চিত্রাঙ্গদ নামেরই এক গন্ধর্বের সাথে যুদ্ধে নিহত হলে অপ্রাপ্তবয়স্ক বিচিত্রবীর্যকে ক্ষমতায় বসানো হয়। বিচিত্রবীর্য বড় হলে তার বিয়ের পাত্রীর জন্যে ভীষ্ম কাশীরাজের কন্যাদের স্বয়ংবর সভায় যান। কিছুটা বৃদ্ধ ভীষ্মকে দেখে উপস্থিত অন্য রাজা আর সভাসদরা উপহাস করলে ক্রোধান্বিত ভীষ্ম তাদের সামনে কাশীরাজের তিন কন্যা অম্বা, অম্বিকা এবং অম্বালিকাকে বলপূর্বক অপহরণ করেন। এই সময়ে অম্বার প্রেমিক শাল্বরাজ বাধা দিতে গেলে ভীষ্ম তাকে হত্যা করেন (মতান্তরে তাকে আহত করে ছেড়ে দেন)। পরে অম্বা তার প্রেমের কথা ভীষ্মকে জানালে তাকে সসম্মানে যেতে দেন।
অনেকে মনে করেন, এই সময়ে ভীষ্ম ও অম্বা পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। ভীষ্ম আর অম্বার এই কল্পিত প্রেম কাহিনী নিয়ে আলাদা বহু ভারতীয় সাহিত্য রচিত হয়েছে। তবে মূল মহাভারতে অম্বার প্রেমিক শাল্বরাজ অম্বাকে পরপুরুষ ছুঁয়েছে অভিযোগে পরিত্যাগ করে। আবার আরেক সংস্করণে প্রেমিককে অযথা হত্যার জন্য ভীষ্মের উপর অম্বা তীব্র রকমের ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, যেটি পরে দ্বন্দ্বে গিয়ে গড়ায়। বাকি দু’জন, অম্বিকা ও অম্বালিকার সাথে ভীষ্ম রাজা বিচিত্রবীর্যের বিয়ে দেন। বিচিত্রবীর্য দুই সুন্দরী পত্নী পেয়েই কামাসক্ত হয়ে পড়েন। এর সাত বছর পর কোনো উত্তরাধিকারী না রেখেই যক্ষ্মারোগে বিচিত্রবীর্য মারা যান।
অম্বা ও ভীষ্মের দ্বন্দ্বঃ
============
এদিকে সর্বদিকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অম্বা ভীষ্মকে তাকে বিবাহ করতে বললে ভীষ্ম তা করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অম্বা ভগবান পরশুরামকে ভীষ্মের বিরুদ্ধে যথাবিহিত করার আহ্বান করলে পরশুরাম তাকে নিয়ে ভীষ্মের কাছে উপস্থিত হয়ে দু’টি বিহিত করার আদেশ দিলেন: ১. অম্বাকে বিবাহ, কিংবা ২. যুদ্ধের আহ্বান। ভীষ্ম তার চিরকুমার থাকার প্রতিজ্ঞার জন্য বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিলেন না। সেজন্য গুরু-শিষ্য বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের যুদ্ধে কেউই কাউকে হারাতে পারলেন না। পরে দেবতারা উপস্থিত হয়ে তাদের যুদ্ধে নিরস্ত করলেন।
তখন অম্বা দেবতাদের কাছে পরজন্মে ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হতে চেয়ে বর চাইলে দেবতারা তা পূরণ করেন। অম্বা তখনি নিজেই নিজের চিতা সাজিয়ে তাতে দেহত্যাগ করেন। অম্বা পরবর্তীতে পাঞ্চালরাজা দ্রুপদের প্রথম কন্যা সন্তান হিসেবে জন্ম নেন। দ্রুপদ প্রথমে তার নারী পরিচয় গোপন রাখতে নাম রাখেন শিখণ্ডী। ঘটনাক্রমে তার সাথে দর্শানরাজ হিরণ্যবর্মার কন্যার সাথে বিয়ে হয় এবং সেই কন্যার কাছ থেকে শিখণ্ডীর আসল রূপ সর্বত্র প্রকাশ পেয়ে যায়। লোকে শিখণ্ডীকে “শিখণ্ডিনী” নামে ডাকতে আরম্ভ করে। এসব কথা দর্শানরাজের কানে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হন। ক্রুদ্ধ হিরন্যবর্মা পাঞ্চালের রাজা দ্রুপদকে যুদ্ধের আহ্বান করেন। দ্রুপদের বিপত্তিতে কষ্ট পেয়ে তাদের পুত্র রূপী কন্যা শিখণ্ডিনী গভীর বনে আত্মহননের উদ্দেশ্যে চলে যান। সেখানে স্বর্গের কোষাধ্যক্ষ কুবের দেবতার সঙ্গী এক যক্ষের সাথে শিখণ্ডিনীর সাক্ষাৎ হয়। সেই যক্ষই তার পুরুষত্ব শিখণ্ডিনীর সাথে অদলবদল করে শিখণ্ডিনীকে পুরুষ বানিয়ে দেয়। এসব তথ্য ভীষ্ম গুপ্তচর মারফৎ বিভিন্ন সময়ে জানতে পারেন এবং মনে মনে শিখণ্ডীকে বধের সংকল্প ত্যাগ করেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, ভীষ্ম রূপান্তরকামী, নারী ও দুর্বলের ওপর প্রহার না করার এবং তাদের সামনে অস্ত্র পরিত্যাগ করার শপথ করেছিলেন। এভাবেই দেবতাদের কথা সফল হয়েছিলো।
কুরুবংশ রক্ষা
========
বিচিত্রবীর্য ও চিত্রাঙ্গদের কোন উত্তরাধিকারী না রেখে যাওয়ায় কুরুবংশ সংকটে পড়ে। এদিকে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার দরুন তিনিও সন্তান উৎপাদন করতে পারবেন না। এই সময়ে তিনি তার সৎ মাতা সত্যবতীর সাথে শলা-পরামর্শপূর্বক তার পুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মুনিকে বিচিত্রবীর্যের দুই স্ত্রীর গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্য ডেকে আনেন। তিনি ধীবরকন্যার সন্তান হওয়ায় তার শরীরে মাছের মতো গন্ধ ছিলো। আর সন্ন্যাসীর সাজপোশাকে থাকতেন বিধায় বিচিত্রবীর্যের দুই রাণী তাকে পছন্দ করলেন না। তবে ভীষ্ম আর সত্যবতীর জোরাজুরিতে তারা উভয়েই একবার একবার করে বেদব্যাসের সাথে মিলিত হন। অম্বিকা অপছন্দের মিলনের সময়ে ঘৃণাবশত চোখ মুদে ছিলেন, তাই বেদব্যাস তাকে অন্ধ পুত্র জন্ম দেয়ার অভিশাপ দেন। আর অম্বালিকা বেদব্যাসের সন্ন্যাসীর সাজ দেখে ভয়ে পাংশুটে চেহারা হয়ে গিয়েছিলেন। তাই বেদব্যাসের অভিশাপে তার পাণ্ডুবর্ণ পুত্র জন্ম হবে বলে জানলেন। এভাবেই বেদব্যাসের ঔরসে এক রাণীর গর্ভে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র, অপর রাণীর গর্ভে পাণ্ডুর জন্ম হয়। অন্ধ পুত্র জন্মের কারণে অম্বিকার শাশুড়ি সত্যবতী রজঃস্বলা হলে পুনর্বার তাকে বেদব্যাসের কাছে যেতে বলেন। তখন রাণী তার এক শূদ্র দাসীকে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। সেই দাসীর গর্ভে মহামতি বিদুরের জন্ম হয়। এমনভাবেই ভীষ্ম কুরুবংশকে এক অনিবার্য পতনের হাত থেকে উদ্ধার করেন।
ধৃতরাষ্ট্রে পূর্বজন্মঃ
------------------
ধৃতরাষ্ট্র তার পূর্ব জন্মে একজন ক্ষত্রিয় রাজা ছিলেন। আর তখনকার দিনে কিছু ক্ষত্রিয়রা হরিণের মাংসসহ অন্য পশু-পাখির মাংসও ভক্ষন করতো। একদিন রাজা হরিণ শিকারে জঙ্গলে যান এবং তিনি হঠাৎ একটি হরিণ দেখতে পান। হরিণটিকে ধরার জন্য তিনি হরিণটির পেছনে ছুটতে লাগলেন একবার হরিনটি সামনে আসে আবার আড়ালে চলে যায়। এক ধরনের মায়ার দ্বারা হরিনটি তাকে আকৃষ্ট করতে লাগলেন।' এভাবে হরিনটির পেছনে ছুটতে ছুটতে তিনি গভীর জঙ্গলে পৌঁছে যান এবং তখন সূর্য ডুবে যায়। ফলে রাজা আর প্রাসাদে যেতে পারলেন না। তাই বাধ্য হয়ে তিনি জঙ্গলেই একটি গাছের নিচে আশ্রয় নেন। তিনি গাছের ডালপালা ভেঙে গাছটির নিচে আগুন জ্বালালেন। রাজা খুবই ক্ষুধার্ত ছিলেন আর মনে মনে খাবাবের চিন্তা করছিলেন। তিনি যেই গাছটির নিচে বসে ছিলেন সেই গাছটির ওপরে ছিল এক পাখির বাসা। পাখির বাসাটিতে ছিল মা পাখি,বাবা পাখি আর তাদের একশো ছানা। বাবা পাখিটি মা পাখিকে বলতে লাগলো রাজা খুবই ক্ষুধার্ত আমাদের উচিত রাজাকে খাওয়ানো। বাবা পাখিটি বললো আমি আগুনে ঝাপ দিই আমার পালকগুলো পুড়ে যাবে এবং আমি ঝলসে যাবো তখন রাজা আমাকে খেতে পারবে। মা পাখিটি বললো তুমি মরে গেলে ছানাদের অনেক কষ্ট হবে তার চেয়ে বরং আমিই ঝাপ দিই। এক পর্যায়ে কথা কাটাকাটি হতে হতে হঠাৎ মা পাখিটি গাছ থেকে পড়ে যায় এবং সে ঝলসে যায়। পরে রাজা তার তীর দিয়ে আগুন থেকে পাখিটিকে উঠিয়ে খায়। খাবার পর রাজার ক্ষিধে আরও বেড়ে যায় রাজা তখন গাছের ওপরে তাকায় এবং দেখতে পায় গাছের ওপরে আরও পাখি আছে। তিনি তখন গাছ বেয়ে ওপরে উঠে বাবা পাখি আর তার ছানাগুলো নামায়। রাজা তার তীর দিয়ে ছানাগুলোর একচোখ দিয়ে ঢোকায় আর অন্যচোখ দিয়ে বের করে তীরে গাথে। এভাবে সে সবগুলো ছানাকে ঝলসে খায়। আর তার এই কৃতকর্মের জন্যই তিনি পরের জন্মে জন্মান্ধ হয়ে জন্ম গ্রহণ করেন এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাকে শত পুত্রের মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়।
প্রথমতঃ
ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ । এই ধরনের মানুষ রাজা হতে পারেনা যদিও তিনি বড় সন্তান । কিন্তু তিনি ছিলেন অত্যন্ত বলশালী ও ভালো যোদ্ধা । মানুষ হিসাবে খুব খারাপ ছিলেন এইটা পুরোপুরি বলা যাবেনা । শুধু অন্ধত্বের কারনে তিনি রাজা হতে পারেন নাই এইটা তিনি মেনে নিতে পেরেছিলেন না ।
তার পরিবর্তে রাজা হয়েছিলেন ছোট ভ্রাতা পান্ডু । তিনি বেশীদিন বাঁচেন নাই । আবার সেই সময় তিনি তথা পান্ডু নিঃসন্তান ছিলেন – ফলে বাধ্যহয়েই ধৃতরাষ্ট্রকে রাজা হতে হয় ।
তখনকার সময় নিয়োগ সন্তান ও কানীন সন্তান প্রথা ছিলো । যদি পিতা সন্তান উৎপাদন করতে অপারগ হোন অথবা স্বামী সন্তান হওয়া পূর্বেই মারা যান তখন বংশ রক্ষার জন্য পারিবারিক সম্মতির মাধ্যমে অন্যপুরুষের সংগে রাত্রিযাপন করা যায় অথবা কোন ব্রাক্ষ্মণের সংগে রাত্রি যাপন করা যায় এবং তার কারনে যেই সন্তান পৃথিবীতে আসতো তাকে বলা হয় নিয়োগ সন্তান । ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন নিয়োগ সন্তান । আবার কুমারী নারী , ব্রাক্ষ্মনের সংস্পর্শে এসে সন্তান গ্রহণ করেন , তাদের বলা হয় কানীন । যেমন কর্ণ ও ব্যাসদেব ।
পান্ডুর প্রথম স্ত্রী কুন্তী স্বামীর বিয়োগে ব্রাক্ষ্মনের সংস্পর্শে এসে সন্তান উৎপাদন করেন । তার প্রথম সন্তানের নাম যুধিষ্টির ।
ধৃতরাষ্ট্রের স্ত্রী গান্ধারীও গর্ভবতী হোন , কিন্তু তাঁর সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় ২ বছর পরে । তাদের প্রথম সন্তানের নাম দুর্যধন ।
যেহেতু যুধিষ্ঠির বড় সুতরাং তিনি হস্তিনাপুরের পরবর্তীরাজা হবেন এইটা আইন । কিন্তু দুর্যধন রাজা হতে চায় এবং ধৃতরাষ্ট্রে এতে সমর্থন থাকে যা মনের দিক থেকেও তার অন্ধত্বের প্রকাশ ঘটে । আর সেখান থেকেই শুরু মহাভারতে যুদ্ধ । যা ধৃতরাষ্ট্র চাইলে এড়ানো যেতো ।
প্রকাশ্যদরবারে দ্রৌপদির বস্ত্রহরণকে তিনি সমর্থন করেন । যা কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না । কারন দ্রৌপদি তার ছোট ভাই পান্ডুর সন্তানে বধু । যাকে কুলবধু বলা হয়ে থাকে। স্ত্রী অপমান কোন ধর্মেই সমর্থন করেনা । যা ধৃতরাষ্ট্র বন্ধ করতে পারতেন ।
তার স্ত্রী গান্ধারী বিধবা ছিলেন একথা না বলার কারনে তিনি গান্ধারীর পিতা গান্ধাররাজ সহ তার শতপুত্রকে ধরে নিয়ে এসে অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করেন । সেখানে তিনি ১০১ টি চালের দানা দিতেন তাদের খাদ্য হিসাবে। গান্ধার রাজ সহ অন্যান্য ভাই ঠিক করেছিলেন এভাবে চললে তারা সবাই মারা যাবেন তাই তারা ঠিক করেন শুধু একটি ভাইকে এই ১০১ টি চাল খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখবেন আর সবাই মারা যাবেন । যাতে ঐ জীবত ভাই এই কুরুবংশের ধ্বংসের কারণ হন । সেই একমাত্র ভাই হলেন শকুনী । যিনি গান্ধারীর ভাই । ধৃতরাষ্ট্রের শ্যালক ও দুর্যধনের মামা । যার প্রবল প্রভাব ছিলো ধৃতরাষ্ট্র ও ভাগনেদের প্রতি ।
"মহাভারত" মহাকাব্য অনুসারে রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কিছু ত্রুটি কী?
======================================
"মহাভারত" মহাকাব্যে কৌরবদের পিতা রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে একটি ত্রুটিপূর্ণ চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তার প্রধান কিছু ত্রুটি হল:
অন্ধত্ব: ধৃতরাষ্ট্র জন্মেছিলেন অন্ধ, রাজা কিন্তু তিনি তার পুত্র দুর্যোধনের প্রতি তার ভালবাসায় অন্ধও হয়েছিলেন। তিনি সত্য দেখতে অক্ষম ছিলেন, এমনকি যখন এটি তার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল, এবং প্রায়শই যুক্তির পরিবর্তে তার আবেগের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতেন।
পক্ষপাতিত্ব: ধৃতরাষ্ট্রের তার জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্যোধনের প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব ছিল, যার কারণে তিনি দুর্যোধনের অন্যায়কে উপেক্ষা করতেন এবং তাকে তার অন্যান্য পুত্র ও ভাগ্নেদের উপর পক্ষপাত করেছিলেন। এই পক্ষপাতিত্ব পরিবারে ফাটল সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়।
তার পুত্রদের উপর নিয়ন্ত্রণের অভাব: ধৃতরাষ্ট্র তার পুত্রদের শাসন করতে ব্যর্থ হন যখন তারা খারাপ আচরণ করে বা সহিংস কাজ করে। তিনি দুর্যোধনকে তার চাচাতো ভাই পান্ডবদের সাথে দুর্ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন, যা শুধুমাত্র দুই পরিবারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান শত্রুতাকে উস্কে দিয়েছিল।
ক্ষমতার প্রতি আসক্তি: ধৃতরাষ্ট্র হস্তিনাপুর রাজ্যের উপর তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বজায় রাখতে মগ্ন ছিলেন। তিনি তার ছেলেদের বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজকে সমর্থন করা এবং তার জনগণের কল্যাণকে উপেক্ষা করা সহ সিংহাসন ধরে রাখার জন্য যা কিছু করা দরকার তা করতে ইচ্ছুক ছিলেন।
বুদ্ধির অভাব: রাজা হিসেবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বুদ্ধির অভাব ছিল ধৃতরাষ্ট্রের। তিনি তার উপদেষ্টাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা তার রাজ্যের জন্য ক্ষতিকর ছিল।
ঈর্ষা: ধৃতরাষ্ট্র পান্ডবদের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন, বিশেষ করে তার ভাগ্নে যুধিষ্ঠিরের প্রতি, যিনি একজন জ্ঞানী এবং গুণী রাজপুত্র ছিলেন সকলের কাছে প্রিয়। এই ঈর্ষা তার পাণ্ডবদের ক্ষতি করার জন্য দুর্যোধনের পরিকল্পনাকে সমর্থন করে।
নিষ্ক্রিয়তা: ধৃতরাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে পাণ্ডব ও কৌরবদের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। তার পুত্র দুর্যোধন যখন অন্যায় করছিল তখন তিনি হস্তক্ষেপ করতে ব্যর্থ হন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে দেন।
সামগ্রিকভাবে, ধৃতরাষ্ট্রের ত্রুটিগুলি তার পরিবারের পতন এবং মহাভারতের মর্মান্তিক ঘটনার জন্য অবদান রাখে।
ধৃতরাষ্ট্র কি মহাভারতের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল?
===============================
হ্যাঁ ধৃতরাষ্ট্র অবশ্যই ছিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনকে (তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র) পাণ্ডবদের এই সমস্ত খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতেন। ধৃতশ্র তার পুত্রের অহংকার বিসর্জন দিয়ে মহাভারতের যুদ্ধ এড়াতে পারতেন। কিন্তু তিনি তার ছেলের ভালোবাসায় আবদ্ধ ছিলেন এবং যার কারণে তিনি তার ছেলেকে আটকাতে পারেন না। দুর্যোধন সর্বদা পরবর্তী রাজা হতে চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি জানতেন যে যুধিষ্ঠির (পান্ডবদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ) সিংহাসনের জন্য এগিয়ে ছিলেন, তাই দুর্যোধন পাণ্ডবদের থেকে ঈর্ষান্বিত হতে শুরু করেছিলেন।
এমনকি ধৃতরাষ্ট্রও চান তার ছেলে পরবর্তী রাজা হোক। তিনি জানেন যে আপনি যোগ্য একজন হয়েও রাজা হতে না পারলে কেমন লাগে। ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন পাণ্ডুর বড় ভাই কিন্তু তিনি অন্ধ হওয়ায় (রাজা হওয়ার জন্য শারীরিকভাবে উপযুক্ত ছিলেন না) তিনি রাজা হতে পারেননি। পাণ্ডু সিংহাসন ত্যাগ করলে ধৃতরাষ্ট্র সিংহাসন পেয়েছিলেন এবং তিনি সর্বদা জানতেন যে তাকে পাণ্ডুর জ্যেষ্ঠ পুত্রের (অর্থাৎ যুধিষ্ঠির) কাছে সিংহাসন হস্তান্তর করতে হবে। তাই ধৃতরাষ্ট্রের জীবনের অভিজ্ঞতাও ছিল দুর্যোধনের ভুল জেনেও দুর্যোধনকে থামাতে না পারার অন্যতম কারণ।
এছাড়াও পিতার ভালবাসা একটি শক্তিশালী ভালবাসা "প্রত্যেক পিতা তাদের সন্তানদের সেরা দিতে চান"। ধৃতরাষ্ট্র তার পুত্রকে পরবর্তী রাজা হতে চাওয়া তার দৃষ্টিতে ভুল ছিল না কিন্তু দুর্যোধন যেভাবে তা সম্পন্ন করতে গিয়েছিলেন তা ভুল ছিল। পাণ্ডবদের প্রতি দুর্যোধনের হিংসার মধ্যে ধৃতরাষ্ট্রেরও ঈর্ষার অনুপাত ছিল। সংক্ষেপে পিতার ভালবাসা ধৃতরাষ্ট্রকে ভুল পথে দাঁড় করিয়েছিল এবং তার সমস্ত পুত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল।
ভারতের মার্ভেলস অ্যান্ড মিস্ট্রিজের লেখক আপডেটেড 4 y
সম্পর্কিত
ধৃতরাষ্ট্রের ভালো দিকগুলো কী কী?
======================
প্রশ্নটি দেখতে সহজ, কিন্তু এর উত্তরটি বরং জটিল, কারণ এটি একটি কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ, যদিও দুষ্ট নয়, মানব মনোবিজ্ঞানের পরীক্ষা করে। নিম্নলিখিতটি বিস্তৃতভাবে মহাভারতের অন্যতম সম্মানিত আধুনিক ভাষ্যকার ভিএস সুকথাঙ্করের একটি সুনির্দিষ্ট এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে:
অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র একজন সাধারণ ব্যক্তিত্ব - সম্পূর্ণ ভালও নয়, সম্পূর্ণ মন্দও নয়। তার বেদনাদায়ক পাপ শুধু এই যে, তার সমস্ত দুর্দান্ত শারীরিক শক্তির জন্য, মানসিকভাবে সে দুর্বল এবং অস্থির, ভাল এবং মন্দের মধ্যে ক্রমাগত দোদুল্যমান। তার ভাল আবেগ আছে, কিন্তু তারা সবচেয়ে দুর্বল। তিনি জানেন, এবং অনুভব করেন যে পাণ্ডবদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে, যাদের তিনি নিজেই পরিবারের অভিভাবক। কিন্তু তিনি সর্বদা তার ভ্রান্ত পুত্রদের দুষ্টু কাজ এবং দুষ্টতাকে সমর্থন এবং ব্যাখ্যা করতে প্রবণ হন। যেহেতু তার নিজের নিষ্ক্রিয়তার অশুভ পরিণতি তার সামনে বড় আকার ধারণ করছে, সে ক্ষীণভাবে নিয়তি এবং পৌরুষের উপর দৈবের অস্পষ্ট আধিপত্যের উপর দোষ চাপিয়ে দোষী বিবেককে সহজ করার চেষ্টা করে ।
প্রাথমিকভাবে, যখন তার ভাইয়ের এতিম শিশুদের তার দায়িত্বে আনা হয়, তখন তিনি তাদের প্রতি স্নেহশীল এবং সদয় হন। কিন্তু সেই মেজাজ বেশিদিন স্থায়ী হয় না, কারণ তিনি সিংহাসনের উত্তরসূরি হিসেবে ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় নবাগতদেরকে তার ছেলেদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ধৃতরাষ্ট্র নামে একটি সূক্ষ্ম শ্লেষ রয়েছে , যার অর্থ হল ' যে রাজ্য দখল করেছে '। তাৎপর্যপূর্ণভাবে আবার, তার অন্ধত্বও সূক্ষ্মভাবে প্রতীকী, যতটা শারীরিক ততটা মানসিক। তিনি নিজের জন্য উপলব্ধি করতে এবং বিচার করতে অক্ষম এবং ক্রমাগত তার চারপাশের লোকদের প্রভাবের অধীনে চলে যান। কিন্তু তার প্রধান ধারণা হল তার নিজের নিরাপত্তা এবং যেকোনো মূল্যে তার ছেলেদের স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়া। অবিভক্ত সার্বভৌমত্বের প্রতি তাদের সন্দেহজনক দাবী রক্ষা করার জন্য, তিনি পান্ডবদের পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য দুর্যোধনের পরিকল্পনায় পড়েন। কিন্তু তিনি সত্যিই শোকাহত যে তারা পুড়িয়ে মারা হয়েছিল এবং পরে স্বস্তি পেয়েছিলেন এবং খুশি হন যে তারা রক্ষা পেয়েছে এবং প্যাঁচাল রাজকুমারীকে বিয়ে করেছে। অবিলম্বে যদিও তিনি আবার দুর্যোধনের স্ব-পরিষেবা পরিকল্পনার মন্ত্রের আওতায় পড়েন, কিন্তু ভীষ্ম ও দ্রোণের ঋষি পরামর্শে টেনে নেন এবং পাণ্ডবদের পুনর্বহাল করেন। কিন্তু বিদুরের সদর্থক উপদেশকে উপেক্ষা করে, দুর্ভাগ্যজনক পাশা-খেলার পর্বে সে তার পৈতৃক দুর্বলতার কাছে আত্মসমর্পণ করে। তিনি নিয়তিকে দোষারোপ করেন, কিন্তু তার বিবেকের ছাড় হিসাবে, হিংসা ও লোভের পরিণতি সম্পর্কে দুর্যোধনকে মৃদু ভর্ৎসনা করেন, তবুও আর কিছুই করেন না। পাণ্ডবদের জন্য খেলাটি বিপর্যয়করভাবে শেষ হয়, যখন ধৃতরষ্ট্র বিবেকের যন্ত্রণা ভোগ করে এবং দুর্যোধনের উপর তিরস্কার করে, যুধিষ্ঠিরকে আশীর্বাদ করে এবং তাকে মুক্ত করে। এর পরপরই তিনি আবারও দুর্যোধনের পরিকল্পনায় সম্মত হন নির্দোষ যুধিষ্ঠিরকে পাশা দেওয়ার দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জে প্রতারণা করার এবং তার ভাগ্নেদের তেরো বছরের জন্য নির্বাসনে পাঠানোর কঠোর শর্তে সম্মত হন। আবার তাদের চলে যাওয়ার পর সে ভয় ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ে। তার মানসিক পেন্ডুলাম কি সঠিক এবং অন্যটি উচ্চারিত কোনটি ভুলের দিকে সামান্য দুলছে, কুরুক্ষেত্রে চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি পর্যন্ত এইভাবে চলে।
শ্রী কৃষ্ণ প্রেম তার ভগবদ-গীতার বইতে উল্লেখ করেছেন, দুর্বল কুরু রাজা অভিজ্ঞতামূলক অহং, নিম্ন এবং ক্ষণস্থায়ী ব্যক্তিত্ব, অহংবোধ এবং মূর্খ মোহ দ্বারা অন্ধ হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। গীতা (3.27) অহঙ্কার-বিমুহাত্মার বর্ণনাকারী তার চরিত্রের সাথে মানানসই, যা সম্পূর্ণ মন্দ না হয়েও তার দুর্বল মানবিক দুর্বলতা দ্বারা মন্দ শক্তিকে সাহায্য করে।
সংস্কৃতে ধৃতরাষ্ট্র মানে কি?
=================
শব্দের দুটি অংশ ধৃত-রাষ্ট্র। তাদের অর্থ হল 'অধিষ্ঠিত বা সমর্থিত' এবং 'জাতি বা অঞ্চল'।
সুতরাং কেউ "অধিষ্ঠিত জাতি" এর মোট অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারে তবে এটি উদ্দেশ্যমূলক অর্থ নয়।
সম্মিলিত শব্দটি জাতির রাজার নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। (তিনি মহাভারতে কৌরবদের পিতা ছিলেন।)
অভিপ্রেত অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে "একজন যিনি জাতিকে একত্রিত করেছিলেন"।

সশস্ত্র বাহিনী দিবসঃ
এই সশস্ত্র বলতে শুধু অস্ত্রধারী নয় । (শাস্ত্র + অস্ত্র )
শস্ত্রানী – শস্ত্রানী বলতে বোঝানো হয়েছে , একজন সেনা বাহিনীর শুধু অস্ত্রজ্ঞান থাকলেই হবেনা , তার অবশ্যই বিদ্যাশিক্ষাও থাকতে হবে। নৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন অস্ত্রবিদ হবেন সশস্ত্র । তা ছাড়া আপনি বধার্থে অস্ত্র ব্যবহার করবেন । যা অপরাধ ।
সেনাবাহিনীর মধ্যে যে ধাপ গুলো রয়েছে , যেমন লেফটেনেন্ট , মেজর , ব্রিগেডিয়ার ইত্যাদি । এগুলো আমরা মহাভারতে দেখতে পাই ।
শ্রী শ্রী গীতার প্রথম অধ্যায় অর্জুন বিষাদ যোগের প্রায় জায়গায় ব্যাক্তির নামে পূর্বে রথী , মহারথী ও অধিরথী বিষেশণ গুলো দেওয়া আছে।
রথীঃ যাঁহারা দশ সহস্রের চেয়ে কমসংখ্যক সৈনের সংগে একাকী যুদ্ধচালনা করতে পারেন তিনিই রথী।
মহারথীঃ যিনি একাকী দশ সহস্র ধনুধারীর সহিত যুদ্ধ করেন , এবং যিনি শস্ত্রশাস্ত্রে প্রবীণ তিনিই মহারথী।
অধিরথীঃ এর চেয়ে বেশী অর্থ্যাৎ ১২ মহারথীর সংগে একাকী যুদ্ধচালনা করতে পারেন তিনিই অধিরথী ।
আর যাহারা ২৪ অধিরথীর সংগে যুদ্ধ করতে পারেন , তাঁরা মহা – মহারথী ।
এক অক্ষৌহিণী সেনা বলতে কি বোঝায় ?
এক রথ, এক হস্তী, পঞ্চ পদাতি ও তিন অশ্ব, ইহাতে একটি পত্তি হয়।
তিন পত্তিতে এক সেনামুখ, তিন সেনামুখে এক গুল্ম, তিন গুল্মে এক গণ, তিন গণে এক বাহিনী, তিন বাহিনীতে এক পৃতনা ।
তিন পৃতনায় এক চমু, তিন চমূতে এক অনীকিনী, দশ অনীকিনীতে এক অক্ষৌহিণী হয়।
এক অক্ষৌহিণীতে একবিংশতি সহস্র অষ্টশত ও সপ্ততি-সংখ্যক রথ ও তৎসংখ্যক গজ, একলক্ষ নয় সহস্র তিন শত পঞ্চাশ জন পদাতি এবং পঞ্চষষ্টি সহস্র ছয় শত দশ অশ্ব থাকে।
আমি যে অক্ষৌহিণী শব্দের উল্লেখ করিলাম, সংখ্যাতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতেরা তাহার এইরূপ নিরূপণ করিয়াছেন
[এক অক্ষৌহিণীমাণ– ১ লক্ষ ৯ হাজার ৫০ পদাতি, ৬৫ হাজার ৬ শত ১০ অশ্ব, ২১ হাজার ৮ শত ৭০ হস্তী, ২১ হাজার ৮ শত ৭০ রথ। মোট সৈন্যসংখ্যা ২ লক্ষ ১৮ হাজার ৭ শত।
আমরা যদি লক্ষ্য করি , তবে দেখবেন আজকের সেনাবাহিনী এই ফরমেটে আবদ্ধ হয়ত নামগুলির ও সংখ্যার পরিবর্তন হয়েছে । শিক্ষার কোন বিকল্প নেই , তা মহাভারতে বলা হয়েছে।


Comments

Popular posts from this blog

শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা (প্রথম অধ্যায়)

শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা ( দশম অধ্যায় )

অকালবোধন ও রাজা রামচন্দ্র