ওঁ - তৎ- সৎ
ওঁ - তৎ- সৎ
ব্রক্ষ্ম - জীব - জগত
বেদ - বেদজ্ঞ - যজ্ঞ
গুরুদেব রবি ঠাকুর বলছেন -
প্রাচীন ভারতে ব্রহ্মের কোন প্রতিমা ছিল না, কোন চিহ্ন ছিল না— কেবল এই একটিমাত্র ক্ষুদ্র অথচ সুবৃহৎ ধ্বনি ছিল ওঁ। এই ধ্বনির সহায়ে ঋষিগণ উপাসনানিশিত আত্মাকে একাগ্রগামী শরের ন্যায় ব্রহ্মের মধ্যে নিমগ্ন করিয়া দিতেন।
আধুনিক সমস্ত ভারতবর্ষীয় আর্য্য ভাষায় যেখানে আমরা হাঁ বলিয়া থাকি প্রাচীন সংস্কৃতভাষায় সেইখানে ওঁ শব্দের প্রয়োগ। হাঁ শব্দ ওঁ শব্দেরই রূপান্তর বলিয়া সহজেই অনুমিত হয়। উপনিষদ্ও বলিতেছেন ওমিত্যেতদ্ অনুকৃতির্হ স্ম— ওঁ শব্দ অনুকৃতিবাচক, অর্থাৎ ‘ইহা করো’ বলিলে, ওঁ অর্থাৎ হাঁ বলিয়া সেই আদেশের অনুকরণ করা হইয়া থাকে। ওঁ স্বীকারোক্তি।
এই স্বীকারোক্তি ওঁ, ব্রহ্ম-নির্দ্দেশক শব্দরূপে গণ্য হইয়াছে। ব্রহ্মধ্যানের কেবল এইটুকুমাত্র অবলম্বন— ওঁ, তিনি হাঁ। ইংরাজ মনীষী কার্লাইলও তাঁহাকে Everlasting Yea অর্থাৎ শাশ্বত ওঁ বলিয়াছেন। এমন প্রবল পরিপূর্ণ কথা আর কিছুই নাই, তিনি হাঁ, ব্রহ্ম ওঁ।... উপনিষদের ঋষিগণ বলিলেন জগতে ও জগতের বাহিরে ব্রহ্মই একমাত্র ওঁ, তিনি চিরন্তন হাঁ,তিনিই Everlasting Yea।
রামকৃষ্ণ পরমহংসের মতে, “...ওঁ হইতে ‘ওঁ শিব’, ‘ওঁ কালী’, ‘ওঁ কৃষ্ণ হয়েছেন।”
স্বামী বিবেকানন্দের মতে, ওঁ-কার “সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের প্রতীক, ঈশ্বরেরও প্রতীক।”
পতঞ্জলির যোগসূত্র-এ ওঁ-কারকে ঈশ্বরের প্রতীক বলে বর্ণিত হয়েছে এবং বলা হয়েছে, ওঁ-কারের স্মরণ ও উচ্চারণে সমাধি লাভ করা যায়।যোগদর্শনের শ্রেষ্ঠ আচার্য পতঞ্জলি যোগসূত্রে সমাধিপাদে(১ম, ২৭-২৮) বলেছেন,
“তস্য বাচকঃ প্রণবঃ। তজ্জপস্তুদর্থভাবনম্।”- প্রণব ঈশ্বরের নাম। তাঁর জপ ও চিন্তা করনীয়।
ভগবান শ্রী কৃষ্ণ বলছেন
অক্ষর ব্রক্ষ্মযোগ অষ্টম অধ্যায় ।
শ্লোক নং ১২ ও ১৩
সর্ব্বদ্বারাণি সংযম্য মনো হৃদি নিরুধ্য চ ।
মুর্দ্ধ্ম্যাধায়াত্মনঃ প্রাণমাস্থিতো যোগধারণাম্ ।।
ওমিত্যেকাক্ষরং ব্রক্ষ্ম ব্যাহরণ মামুনস্মরণ্ ।
যঃ প্রযাতি ত্যজন দেহং স যাতি পরমাং গতিম্।।
সমুদ্বয় ইন্দ্রিয়দ্বার সংযত করিয়া , মনকে হৃদয়ের মধ্যে নিরুদ্ধ করিয়া , প্রাণকে ভ্রুদ্বয়মধ্যে স্থাপন করিয়া ধৈর্য্য অবলম্বন পূর্ব্বক একাক্ষর ব্রক্ষ্ম প্রতিপাদক ওঁকার উচ্চারণ করিতে করিতে আমাকে চিন্তা করেন , সেই উপাসক দেহান্তকাল পরম গতি লাভ করেন। শ্রী গীতা ৮/১২,১৩ ।
শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন, তিনি সকল অক্ষরের মধ্যে ওঁ-কার।এই সম্পর্কে গীতায় (৭ অধ্যায় /৮ নং শ্লোক) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,
“আমি জলের রস, চন্দ্র-সূর্যের কিরণ, বেদের ওঁ(প্রণব), আকাশে শব্দ ও মানুষের মধ্য পুরুষত্ব রূপে বিরাজ করি।”
সত্ত্ব , তম , রজ এই তিন মিলেই বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডের সৃষ্টি। সত্ত্ব প্রকৃতি , তম অন্ধকার , রজ অহংকার প্রবৃত্তি ।
এই তিন গুণের সমন্বয়ে শব্দ তন্মাত্রের সৃষ্টি হয়েছিল। এই শব্দ তন্মাত্র থেকেই আকাশ বা ব্যোমের সৃষ্টি ।আর তারপর সৃষ্টি হলো স্পর্শ তন্মাত্র বায়ু ।তারপর রুপ তন্মাত্র আলো তারপর সৃষ্টি হলো রস তন্মাত্র জল , এরপর গন্ধ তন্মাত্র মাটির সৃষ্টি ।
এই যে আমরা প্রথমেই শব্দ তন্মাত্রের কথা বললাম । এই শব্দ তন্মাত্রই হলো ওঁ । এই ওঁ থেকেই সব। ওঁ শুধু সনাতন ধর্মেই নয় আরও অনেক ধর্মের পবিত্র শব্দ , মন্ত্র যা বলেন ।
ওঁ বা ওঁ-কার (অপর বানানে ওঙ্কার)[সংস্কৃত, অ + উ +ম্]। বা প্রণব বা ত্র্যক্ষর হিন্দুধর্মের পবিত্রতম ও সর্বজনীন প্রতীক। এটি হিন্দু দর্শনের সর্বোচ্চ ঈশ্বর ব্রহ্মের বাচক। এই ধর্মের প্রতিটি সম্প্রদায় ও উপসম্প্রদায়ের নিকটেই এটি পবিত্র বলে গণ্য। ওঁ-কার বৌদ্ধ ও জৈনদেরও একটি পবিত্র প্রতীক। শিখ সম্প্রদায়ও এটিকে সম্মান করেন।
অ – অভেদত্ব / আদিমত্ব / সৃষ্টি / ব্রক্ষ্মা
উ – উৎকর্ষতা / কোয়ালিটি / স্থিতি / বিষ্ণু
ম – মিতি / মাটি / লয / ধংস্ব / মহেশ্বর ।
সৃষ্টি নিয়ে বেদ ঃ
কিছু না থাকা থেকে অদ্বিতীয় ব্রহ্ম এর বিকাশ ঘটিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জগতের ভিন্ন ভিন্ন সম্পন্ন হয়। আবার একই সাথে বিভিন্ন গুণের আবির্ভাব ঘটে।
সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে বেদের বিখ্যাত দুটি সুক্ত হলো- নাসাদিয় সুক্ত এবং হিরণ্যগর্ভ সুক্ত। সেখান থেকে কিছু উদ্ধৃত করা হলো- ‘শুরুতে কোনো অস্তিত্ব (সৎ) বা অনস্তিত্ব (অসৎ) ছিল না। সেখানে ছিল না কোনো বায়ুমণ্ডল’। (ঋগ্বেদ ১০.১২৯.১)
‘চারদিক ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। সমস্ত জিনিস একত্রে পুঞ্জিভূত ছিল। সেখান থেকে প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হলো।’ (ঋগবেদ ১০.১২৯.৩)
‘প্রথমে হিরণ্যগর্ভ সৃষ্টি হলো। সেখানে ছিল উত্তপ্ত গলিত তরল। এটি ছিল মহাশূন্যে ভাসমান। বছরের পর বছর এই অবস্থায় অতিক্রান্ত হয়।’ (শতপথ ব্রাক্ষ্মণ ১১.১.৬.১)
‘তারপর যেখানে বিস্ফোরণ ঘটল গলিত পদার্থ থেকে, বিন্দু থেকে যেন সব প্রসারিত হতে শুরু হলো। সেই বিস্ফোরিত অংশসমূহ থেকে বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র তৈরী হলো। তার এক জীবনপ্রদ অংশ থেকে পৃথিবী সৃষ্টি হলো।’ (ঋগ্বেদ ১০.৭২.২-৪)
‘তারপর সৃষ্ট ক্ষেত্রে সাত ধাপে সংকোচন-প্রসারণ সম্পন্ন হলো। তারপর সৃষ্টি হলো ভারসাম্যের।’ (ঋগ্বেদ ১০.৭২.৮-৯)
ঐ বিষ্ফোরণের সময় যে শব্দ তাই ওঁ ।
ব্রহ্ম অর্থাৎ ঈশ্বর আর ব্রহ্মা ঈশ্বরের একটি রূপ বা দেবতা) এই সক্রিয় ভাব হতেই সৃষ্টির বিকাশ। তাই, যেকোনো কাজের শুরুতেই “ওঁ তৎ সৎ ” উচ্চারণ করুন এবং পূজার সময় প্রথমে “ওঁ” উচ্চারণ করে মন্ত্রপাঠ শুরু করুন। ওঁ -প্রণব(ব্রহ্ম), তৎ-জীব, সৎ-জগৎ। ব্রহ্মের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ বেদ। জীবের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ব্রহ্মজ্ঞ। জগত কর্মময়। কর্মের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ যজ্ঞ। সুতরাং, “ওঁ তৎ সৎ” মন্ত্রে বেদ, ব্রহ্মজ্ঞ ও যজ্ঞকে বোঝায়। তাই, আমাদের সকল কাজের শুরুতেই “ওঁ তৎ সৎ ” উচ্চারণ করে শুরু করা উচিৎ। প্রণব বা ওঁ-কারই বেদের নির্যাস ও ব্রহ্মবস্তু।
Comments
Post a Comment