বারুণী স্নান কি এবং কেন ?

 বারুণী স্নান কি এবং কেন ?

================
প্রথমেই দুজন বিখ্যাত মহামানবের দুটি পংতি স্মরণে রাখি ।
সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই - চণ্ডীদাস ।
মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান...- নজরুল ।
ভারতবর্ষের বর্তমান প্রধান নদী গঙ্গা । প্রথম দিকে কিন্তু গঙ্গার এত পরিচিতি ছিলোনা । কয়েক হাজার বছর পূর্বে যে দুটি নদী ও নদের নাম বেশী উচ্চারিত হতো তা হলো সরস্বতী ও সিন্দু নদ । কিন্তু কালের প্রভাবে গঙ্গা হয়ে গেলো ভারতবর্ষে শ্রেষ্ঠ নদী ।
গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২,৫২৫ কিমি (১,৫৬৯ মা); উৎসস্থল পশ্চিম হিমালয়ে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে। দক্ষিণ ও পূর্বে গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। জলপ্রবাহের ক্ষমতা অনুযায়ী গঙ্গা বিশ্বের প্রথম ২০টি নদীর একটি। গাঙ্গেয় অববাহিকার জনসংখ্যা ৪০ কোটি এবং জনঘনত্ব ১,০০০ জন/বর্গমাইল (৩৯০ /কিমি২)। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নদী অববাহিকা।
গঙ্গা নদীর উৎপত্তি নিয়ে সনাতন ধর্মে সুন্দর পৌরাণিক কাহিনী আছে । কাহিনীটা নিম্নরুপ
গঙ্গার জন্মকাহিনি বিষয়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলির মধ্যে মতদ্বৈধ দৃষ্ট হয়। একটি কাহিনি অনুযায়ী ব্রহ্মার কমণ্ডলু এক নারীমূর্তির স্বরূপ প্রাপ্ত হয়। ইনিই গঙ্গা। বৈষ্ণব মতানুসারে, ব্রহ্মা তার কমণ্ডলুর জল নিয়ে সশ্রদ্ধ চিত্তে বিষ্ণুর পদ ধৌত করেছিলেন। সেই থেকেই গঙ্গার জন্ম। তৃতীয় একটি মত অনুযায়ী, গঙ্গা পর্বতরাজ হিমালয় ও তার পত্নী মেনকার কন্যা এবং পার্বতীর ভগিনী। তবে প্রতিটি মতেই একথা স্বীকৃত যে ব্রহ্মা গঙ্গাকে পবিত্র করে তাকে স্বর্গে উত্তীর্ণ করেন।
মহাভারতের কাহিনি অনুসারে, রাজা সগর ষাট হাজার পুত্রের জনক হয়েছিলেন। তিনি একবার অশ্বমেধ যজ্ঞ করবে।দেবরাজ ইন্দ্র তাতে ঈর্ষান্বিত হয়ে যজ্ঞের পবিত্র ঘোড়া অপহরণ করেন। সগর তার ষাট হাজার পুত্রকে অশ্বের অন্বষণে প্রেরণ করেন। তারা পাতালে ধ্যানমগ্ন মহর্ষি কপিলের কাছে ঘোড়াটিকে দেখতে পান। মহর্ষিকে চোর সন্দেহ করে তারা তার বহু বছরের ধ্যান ভঙ্গ করলে ক্রুদ্ধ মহর্ষি দৃষ্টিপাত মাত্র তাদের ভস্ম করে দেন। সগর রাজার ষাট হাজার সন্তানের আত্মা পারলৌকিক ক্রিয়ার অভাবে প্রেতরূপে আবদ্ধ হয়ে থাকেন।
পরে সগরের বংশধর, রাজা দিলীপের পুত্র ভগীরথ তাদের আত্মার মুক্তিকামনায় গঙ্গাকে মর্ত্যে নিয়ে আসার মানসে ব্রহ্মার তপস্যা শুরু করেন। তপস্যায় সন্তুষ্ট ব্রহ্মা গঙ্গাকে মর্ত্যে প্রবাহিত হয়ে সগরপুত্রদের আত্মার সদগতিতে সহায়তা করতে নির্দেশ দেন। গঙ্গা এই নির্দেশকে অসম্মানজনক মনে করে মর্ত্যলোক প্লাবিত করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তখন ভগীরথ গঙ্গার গতিরোধ করার জন্য শিবের আরাধনা করেন।
ক্রদ্ধ গঙ্গা শিবের মস্তকে পতিত হন। কিন্তু শিব শান্তভাবে নিজ জটাজালে গঙ্গাকে আবদ্ধ করেন এবং ছোটো ছোটো ধারায় তাকে মুক্তি দেন। শিবের স্পর্শে গঙ্গা আরও পবিত্র হন। স্বর্গনদী গঙ্গা পাতালে প্রবাহিত হওয়ার আগে মর্ত্যলোকে সাধারণ জীবের মুক্তির হেতু একটি পৃথক ধারা রেখে যান। এইভাবে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল – তিন লোকে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা "ত্রিপথগা" নামে পরিচিতা হন।
যেহেতু ভগীরথ গঙ্গার মর্ত্যাবতরণের প্রধান কারণ, সেই হেতু গঙ্গার অপর নাম ভাগীরথী। সংস্কৃতে ভগীরথের এই দুঃসাধ্য সাফল্যের কথা মাথায় রেখে "ভগীরথ প্রযত্ন" নামে একটি শব্দবন্ধ প্রচলিত আছে।
গঙ্গার অপর নাম জাহ্নবী। কথিত আছে, মর্ত্যে ভগীরথকে অনুসরণ করার সময় গঙ্গা ঋষি জহ্নুর আশ্রম প্লাবিত করেন। উগ্রতপা জহ্নু ক্রুদ্ধ হয়ে গঙ্গার সমস্ত জল পান করে ফেলেন। তখন দেবগণ গঙ্গার মুক্তির জন্য ঋষির কাছে প্রার্থনা করতে থাকলে নিজের জঙ্ঘা বা জানু চিরে গঙ্গাকে মুক্তি দেন। এইরূপে গঙ্গা জহ্নু ঋষির কন্যা রূপে পরিচিতা হন এবং তার অপর নাম হয় জাহ্নবী।
হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী কলিযুগের অন্তে সরস্বতী নদীর মতো গঙ্গাও শুকিয়ে যাবে। তখন আবার সত্যযুগের সূচনা হবে।
বর্তমান সনাতন ধর্ম আর্য্য সভ্যতা কে বোঝায় । এ দুর্বল দিক হলো এর কাহিনী আছে , সাহিত্যও আছে কিন্তু ইতিহাস লিপিবদ্ধ নেই । তাই বিভিন্ন জন বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করেন । আমার অবস্থাও তাই ।
জার্মান দার্শনিক ম্যাক্সমুলারের একটি লিখা পড়েছিলাম। সেখানে তিনি বলতে চাইছেন , সগর রাজার আমলে ভারতবর্ষের অনাবৃষ্টির কারনে প্রচন্ড খরা হয়েছিলো । সেই খরাতে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক ব্যাহত হয় , ফলে এই খাদ্যাভাবে ৬০০০০ ষাট হাজারের মত প্রজা মারা যায় । প্রজা সন্তান সমতুল্য । তাই বলা হয় সগর রাজার ৬০,০০০ সন্তান মারা যায় বা ভষ্ম হয়ে যায় । কারণ সনাতন ধর্ম মতে মানুষ মারা গেলে তাকে পোড়ানো হয় । আর পোড়ালেতো ভস্ম হয়েই যাবে। আর তখন থেকেই শুরু হয় পরিকল্পনা কি ভাবে কৃষি কাজের জন্য জলকে ধরে রাখা যায় বা প্রবাহিত করা যায় । কপিল মুনীর বুদ্ধির দ্বারা তখন থেকে রাজা ভগীরথের সময় পয্যন্ত হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে খাল খনন করে গঙ্গানদীকে সমতলে প্রবাহিত করা হয় । যেহেতু ভগীরথী রাজার আমলে এই কার্য্য শেষ হয় তাই তার নামানুসারে নদীর নাম দেওয়া হয় ভগীরথী।
মানুষ তার প্রয়োজনে অনেক কিছুই করেছে । যেমন বর্তমান যুগে সুয়েজ খাল , পানামা খাল ইত্যাদী ।
ঠিক সেই রকম ভাবে বলাই যায় পরশুরাম নামে কোন এক মহামানব তার দলবল সহ কৃষি কাজের জন্য খাল খনন করে নিয়ে এসেছিলো শীতালক্ষা নদীতে । আর ঐ দিনটিা স্মরনেই করা হয় লাঙ্গল বন্ধ । অর্থাৎ কৃষির জন্য লাঙ্গল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারনেই জল প্রবাহিত করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো । সেই কাজটি করেছিলেন পরশুরাম সহ আরও অনেকে । তবে যেহেতু নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পরশুরাম তাই ইতিহাসে তার নামটি লিখা হয়েছে ।
আবার বারুণীস্নান সম্পর্কে পৌরাণিক কাহিনী নিম্নরুপ ।
বারুণী স্নান :- স্কন্দ পুরাণে লেখা আছে যে চৈত্রমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে শতভিষা নক্ষত্র যোগ হলে সেই তিথি বারুণী নামে পরিচিত। এই তিথিতে স্নান করলে বহুশত সূর্যগ্রহনের জন্য গঙ্গাস্নানের যে ফল সেই ফল লাভ করা যায়। হিমালয় কন্যা গঙ্গার অপরনাম বারুণী। বারুণী স্নান এখানে গঙ্গা স্নানেরই প্রতিরুপ।বাঙলা সনের প্রতি চৈত্র মাসের শতভিষা নক্ষত্রযুক্ত মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে এই স্নান অনুষ্ঠিত হয়। শাস্ত্র মতে কোন বছর যদি ঐদিনটি শনিবার হয় তবে ঐ বারুণী স্নান অসাধারণত্ব লাভ করে মহা বারুণী স্নান রুপ লাভ করে।এই স্নান টি বস্তুত্ব হিন্দু ধর্মীয় একটি পূন্য স্নান উৎসব।জীব জগতের পঙ্কের মধ্যে পথ চলতে গিয়ে পাপাচারে পূর্ণ্,ক্লেদাক্ত মুনস্যকুল এই পূণ্য স্নানের মধ্যমে পাপ মুক্ত হয়। দক্ষিণ জনপদের এই কপিলমুনিতে ঠিক কবে থেকে বারুণী মেলার আয়োজন হয়ে আসছে তা হিসেব করা খুব কঠিন।জনস্রুতি এমন পুন্যত্মা কপিল কালের কোন এক সময় সাধনায় সিদ্ধিলাভের জন্য কপোতাক্ষের পাড়ে সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির স্থাপন করেন এবং তিনি সেখানে ধ্যান মগ্ন অবস্থায় আদ্যা শক্তির সাক্ষৎ পান। গভির ধ্যানের দ্বারা তিনি সেখানে গঙ্গাকে কপতাক্ষের সঙ্গমে একত্রিত করেন।সময়টি ছিল চৈত্র মাসের শতভিষা নক্ষত্রযুক্ত মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী।আর এখানেই স্থাপন করেছিলেন বারুণী স্নানঘাট।
ধ্যান কি ? কঠোর মনোনিবেশ । আমরা কি বলতে পারিনা , কৃষিকাজ ও মানুষের প্রয়োজনে কপোতাক্ষ নদকে আর গতিশীল করার জন্য গঙ্গানদীর প্রবাহকে এদিন কপিল মুনী মেলাতে পেরেছিলেন । মুনীরা তো অনেক অনেক জ্ঞানের অধিকারী । হয়তো উনি নদীবিশেষজ্ঞ ছিলেন । আর তখন তো দিন কাল নক্ষত্র দ্বারাই করা হতো ।
স্নান মানে আমরা কি বুঝি ?
আমরা যদি ধর্মরাজ ও যুধিষ্ঠিরের কথোপথন পড়ি বা শুনি সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে
” মন থেকে সব কলুষ ধুয়ে ফেলায় স্নান । “
আমরা এই সব বিশেষ দিন গুলি পালন করি ঐসব পূর্ণাত্মাকে সন্মান জানানোর জন্য ।
প্রথমেই দুটো লাইন দিয়েছিলাম এই জন্যই যে , সব কিছুই মানুষ তার প্রয়োজনে সৃষ্টি করেছে । অতি প্রাকৃত শক্তি তথা ঈশ্বরের প্রতিতো আমাদের চরম বিশ্বাস থাকতে হবেই । তার পরের শক্তিটাই মানুষ । মানুষ , মহামানুষ হয়েছে , মহামানুষ এক পর্য্যায়ে দেবতা হয়ে গেছে । তবে সব কিছু মিলে মানুষই সত্য । মানুষ তার প্রয়োজনেই এই পৃথিবীকে তার মত করে নিয়েছে । হ্যাঁ এর মধ্যে অবশ্যই কোন না কোন অন্যায় আছে । যেমন আজকের যুগে আমরা পরিবেশ নষ্ট করে ফেলছি । আবার প্রকৃতি নিজেই তার প্রতিশোধ নিচ্ছে ।
আসুন এবারের বারণীস্নানে আমাদের প্রার্থনা হোক , করোনার কারণের আমাদের সভ্যতা হুমকির সম্মুখিন । আমরা যেন করোনা মুক্ত হতে পারি ।

Comments

Popular posts from this blog

শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা (প্রথম অধ্যায়)

শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা ( দশম অধ্যায় )

অকালবোধন ও রাজা রামচন্দ্র