অসুর

 অসুর শব্দটিকে আমরা সাধারনত খারাপ অর্থে ব্যবহার করি । তবে উৎপত্তিগত দিক থেকে অসুর শব্দটি খুব খারাপ নয়। আসলে অহুর শব্দটি থেকে অসুর শব্দটির উৎপত্তি । অহুর (ইংরেজি: Ahura) হল একটি আবেস্তীয় ভাষার শব্দ যা এক বিশেষ শ্রেণীর জরথুস্ট্রবাদী দৈবসত্ত্বাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। উচ্চারণ গত সমস্যার কারণে অহুর শব্দটি সিন্ধু নদীর তীরে এসে হয়ে যায় অসুর । যেমন সিন্ধু হয়ে গিয়েছিলো হিন্দু ।

আবার অসুর একজন পূর্ব সেমিটিক দেবতা, এবং মেসোপটেমীয় ধর্মের অ্যাসিরীয় মধ্যে প্রধান। ইনি প্রধানত মেসোপটেমিয়ার উত্তরের অর্ধেক এবং উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার কিছু অংশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া মাইনর অঞ্চলে পূজিত হতেন। মূলত এসব অঞ্চল নিয়ে প্রাচীন আসিরীয় অঞ্চল গঠিত হয়েছিলো।কিছু পণ্ডিত দাবি করেন যে, আশারীয় আইকনোগ্রাফীতে বারবার যে পাখাওয়ালা সূর্য দেবতার কথা বলা হয়েছে তিনি মূলত অসুর। অনেক আশারীয় রাজা নিজেদের নামের সংগে অসুর নাম গ্রহণ করেছেন। যেমন আসুর উবাল্লিত ১, আসুরনাসিরপাল, আসুর আহা ইদ্দিনা এবং আসুরবানিপাল।
আমাদের ভারতবর্ষেও অসুর পদবী অনেকে ধারণ করেছিলেন । যেমন আসামের নারকাসুর ।
ভারতীয় পাণ্ডুলিপিতে অসুরদেরকে শক্তিশালী অতিমানব অর্ধদেবতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাদের ভালো কিংবা খারাপ গুণাবলি থাকে। ভালো অসুরদের বলা হয় আদিত্য আর তারা বরুণের দ্বারা পরিচালিত হয়, অপরদিকে অকল্যাণকামী অসুরদের বলা হয় দানব এবং তারা বৃত্রের দ্বারা পরিচালিত হয়। বৈদিক পাণ্ডুলিপির প্রাচীনতম অংশগুলোতে অগ্নি, ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতাদেরকেও অসুর বলে ডাকা হয়েছে, কারণ তারা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র, জ্ঞান বা ক্ষমতার "অধিপতি"। পরবর্তী বৈদিক ও বৈদিক-পরবর্তী লেখনীসমূহে, কল্যাণকামী দেবতাদের দেব বলা হয়েছে, যেখানে অকল্যাণকামী অসুরেরা উক্ত দেবদের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে, যাদেরকে "দেবতাদের শত্রু" হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দেব, যক্ষ (প্রাকৃতিক আত্মা) ও রাক্ষসদের (ভূত, দৈত্য) পাশাপাশি অসুররা হল ভারতীয় পৌরাণিকতার অংশ। হিন্দুধর্মে বহু মহাজাগতিক তত্ত্বে অসুরদেরকে তুলে ধরা হয়।
সংস্কৃত ভাষার আদি যুগে ‘অসুর’ শব্দের অর্থ ছিল ‘প্রানবন্ত তেজদীপ্ত পুরুষ’ । অসুর শব্দের উৎপত্তি ‘অস’ ধাতু থেকে – যার মানে হল শক্তি, ছোড়া ও এগোনো । এই অস ধাতু থেকেই এসেছে অসি, অস্ত্র ইত্যাদি ! আর প্রাচীন পারসিক ভাষায় অশ হল ত্রয়াত্মক অনুশাসন, যা দৈহিক মানসিক ও নৈতিক স্তরে জীবনের অভিব্যক্তিকে পরিচালনা করে ! তাই ‘আবেস্তা’ ধর্মগ্রন্থে অসুরদের নাম – ‘আহুর মাজদা’।
সায়নাচার্যের মত অনুসারে – অসুর জাতি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক উন্নত ছিল । অসুর শব্দের অর্থ তিনি করেছেন ‘বলবান’, ‘প্রজ্ঞাবান’, ‘শত্রুনাং নিরসিত’ ও ‘প্রাণস্য দাতা’ । হরিচরন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ বইয়েও এই অর্থই পাওয়া যায় । ঋকবেদেও এই অর্থ প্রযুক্ত হয়েছে । - প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে অসুর গোষ্ঠীকে ‘নিষাদ’ যার মানে করলে – ‘যাদের মধ্যে কোন খাদ নেই’ – যারা পাঁচ মিশেলি জাতি নয় । তাই খৃস্টপূর্ব পঞ্চম-চতুর্থ শতকে পাণিনি সংস্কৃত ব্যাকরন তৈরির সময়ে লিখেছিলেন ‘নিষাদপঞ্চমা পঞ্চ জনাহ’ অর্থাৎ ব্রাহ্মন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য শূদ্র ও নিষাদকে ধরে সমাজে পঞ্চ বর্ণ হয় ! পরে পুরাণকালে ব্রাহ্মন্য ধর্ম জাঁকিয়ে বসলে ‘নিষাদ’ গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে চতুর্বর্ণ ও জাতিভেদ প্রথা চালু হয় ।
অসুর জাতির অস্তিত্ব কিন্তু সেই মেহেরগড় সভ্যতা থেকেই রয়েছে । এর পর হরপ্পা সভ্যতাতেও অসুরদের অস্তিত্ব । আবার হরপ্পা সভ্যতাকে বুঝতে হলে ভারতের সনাতন ধ্যান ধারনা বোঝা দরকার ! ভারতবর্ষ চিরকালই নানান কউম বা গোষ্ঠী, নানান ধর্ম, নানান সংস্কৃতি ও নানান ভাষার মিলনক্ষেত্র । কুশান যুগ থেকে সুলতান যুগ, মুঘল যুগ ও বর্তমান ভারতে যেমন বিভিন্ন ভাষাভাষী, ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতি মিলে ভারতীয়, ঠিক তেমনই হরপ্পা সভ্যতার ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যতিক্রম নয় ! হরপ্পা সভ্যতা গড়ে উঠেছিল মুন্ডা, সান্তাড়, হো , ওঁরাওদের মত আদি বাসিন্দাদের নিয়ে । প্রাচীন পুরাণ ‘অসুর কাহিনি’তে বলে এদের নেতৃত্বে ছিল অসুর গোষ্ঠী । তাই আধুনিক পুরানে অন্য কোন আদিবাসী গোষ্ঠীকে শত্রু না মনে করে অসুর জাতিকেই তুলে ধরা হয়েছে শত্রু হিসেবে ।
হরপ্পা সভ্যতাকে দ্রাবিড় সভ্যতা বলাও সত্যের অপলাপ । সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁর ‘প্রাচীন ভারত’ বইয়ে লিখেছেন, ‘আজকের ভারতবর্ষের যে ভোগলিক সীমা, তার বহু পূর্বে ভারতবর্ষের সীমা মধ্য প্রাচ্যের দিকে অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল । শুধু বাণিজ্য সীমায় নয় সংস্কৃতিক আদান প্রদানের ভিত্তিতে জাতিগোষ্ঠী বা জনগোষ্ঠী এক না হলেও উত্তর পশ্চিম প্রদেশ ছাড়িয়েও বিরাট বিস্তৃতি ছিল । হয়ত কেন্দ্রিয় কোন শাসন ব্যবস্থা ছিল না ! কিন্তু হাজার হাজার বছরের এই বিস্তৃত অঞ্চলের শাসন ব্যবস্থার হাত বদল হয়েছিল ।
এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ ডক্টর অতুল সুর ‘সিন্ধু সভ্যতার স্বরূপ ও সমস্যা’ বইতে একই কথা বলেছেন – ‘কেন্দ্রসমুহে রাজারাজড়ার বাস করার মত কোনও রাজপ্রাসাদ পাইনি – তা থেকে মনে হয়, রাজারাজড়ার পরিবর্তে সঙ্ঘ দ্বারাই নগরসমুহ শাসিত হত !’ --- ‘পশ্চিমবঙ্গের দুই স্থানে খননকার্য চালানোর ফলে তাম্রাশ্ম সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে । তাঁর মধ্যে একটি স্থান বর্ধমান জেলার ‘পান্ডুরাজার ঢিপি’ ও অপরটি হল ‘বীরভূম জেলার ‘মহিষদল’ । - এই মহিষদল শব্দটি কিন্তু মহিষ কাল্টের দ্যোতক !তাই স্বাভাবিক ভাবেই অনুমান এই অঞ্চলের মহিষ-টোটেম গোষ্ঠীর, অর্থাৎ অসুর জাতির সভ্যতা ছিল । মোহেন জো দড়ো থেকে ব্রোঞ্জে গড়া প্রায় ৭ সেন্টি মিটার লম্বা একটি অসাধারন প্রানবন্ত মহিষের মূর্তি পাওয়া গেছে । এখন এটি দিল্লির জাদুঘরে আছে !
অসুরদের আদি ঈশ্বর হলেন ‘মহাদনিয়া’ ! মহাদনিয়াই - মহাদেব বা শিব নামে পুজো পেয়ে থাকেন । সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতরা বলেন ‘রুদ্র’ – ভারতবর্ষের ‘আদি ঈশ্বর’ !

Comments

Popular posts from this blog

শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা (প্রথম অধ্যায়)

শ্রী শ্রী গীতা সহায়িকা ( দশম অধ্যায় )

অকালবোধন ও রাজা রামচন্দ্র