মহাভারতে উত্তরা
মহাভারতে উত্তরা
============
একবার অর্জুনকে পিতা ইন্দ্র তাঁর রাজসভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ইন্দ্রের রাজসভার অপ্সরা উর্বশী অর্জুনকে দেখে আকৃষ্ট হয়। ইন্দ্র এই কথা জানতে পেরে উর্বশীর মনস্কামনা পূর্ণ করতে বলেন। ইন্দ্রের কথামতো একরাত উর্বশী অর্জুনের ঘরে উপস্থিত হয়। কিন্তু অর্জুন উর্বশীর প্রতি কামভাব না রেখে তাঁকে কুরুদের “মাতা” বলে সম্বোধন করেন কারণ উর্বশী কুরু রাজবংশের আদিরাজা পুরূরবার পত্নী ছিলেন। এই কথায় ক্রোধান্বিত হয়ে উর্বশী অর্জুনকে অভিশাপ দেন যে সমগ্র জীবন তিনি কিন্নর হয়ে থাকবেন এবং অন্য নারীর সঙ্গে কেবল নাচ-গান করবেন। পরে ইন্দ্রের অনুরোধে উর্বশী এই শাপ একবছরে কমিয়ে আনেন। পান্ডবদের অজ্ঞাতবাসের ত্রয়োদশ বছরে এই অভিশাপ ফলে যায়।
অজ্ঞাতবাসের ত্রয়োদশ বছরে অর্জুন বৃহন্নলা রূপে বিরাটের রাজসভায় উপস্থিত হন। ইন্দ্রের রাজসভার গন্ধর্ব চিত্রসেনের থেকে শিখে আসা গান এবং নৃত্যে তিনি বিরাট রাজাকে মোহিত করেন। তিনি রাজকুমারী উত্তরাকে নাচ-গান শেখানোর জন্য বৃহন্নলাকে আদেশ দেন। বৃহন্নলা নারীদের জন্য অন্দর মহলে থেকে মেয়ে এবং বধূদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন।
কৌরবগণ সন্দেহ করেছিলেন যে পান্ডবগণ বিরাটের রাজ্যে আশ্রয় নিয়ে আছে। তাঁরা প্রথমে বিরাটের রাজ্যের প্রধান সম্পদ গরুগুলিকে চুরি করেন। পরদিন ভীষ্ম, দ্রোণ এবং কর্ণের নেতৃত্বে এক বৃহৎ সেনাবাহিনী মৎস রাজ্যের দিকে অগ্রসর হয়। মালিনী নাম নিয়ে ছদ্মবেশে থাকা দ্রৌপদী কুমার উত্তরকে এই আক্রমণ প্রতিহত করতে সতর্ক করেন এবং বৃহন্নলাকে রথের সারথী হিসেবে পাঠিয়ে দেন। সেইদিনই পান্ডবদের অজ্ঞাতবাস তথা অর্জুনের অভিশাপের শেষ দিন ছিল। যুদ্ধস্থলে গিয়ে বৃহন্নলা পুনরায় অর্জুনের রূপ ফিরে পান। তিনি তখন উত্তরকে পান্ডবদের কথা বলেন এবং প্রত্যেকটি অর্থের সাথে নিজের দশটা নাম বলে (বিজয়, ধনঞ্জয়, সব্যসাচী, গুঢ়াকেশ, শ্বেতবাহন, বীভৎসু, কীরিতি, পার্থ, ফাল্গুণ এবং জিষ্ণু) বিশ্বাস জন্মান। তার পর অর্জুন গান্ডীব ধারণ করে কৌরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ করেন। উত্তরকে সারথী হিসেবে নিয়ে তিনি কৌরবদের পরাস্ত করেন এবং গোগুলিকে মৎস্য রাজ্যে ফিরিয়ে আনেন।
এই যুদ্ধে অর্জুন ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য, কর্ণ, অশ্বত্থামা ইত্যাদি সবার সাথেই যুদ্ধ করেন। তিনি সম্মোহন অস্ত্র মেরে সবাইকে নিদ্রিত করে ফেলেছিলেন। প্রাণ নাশ না করে নিদ্রাতে কিভাবে ফেললেন বলে উত্তর অর্জুনকে প্রশ্ন করে। অর্জুন বলেন যে মৃত লোকের বস্ত্র অপবিত্র হয়ে পড়ে। উত্তরা পুতল সাজানোর জন্য কৌরবদের বস্ত্রগুলি পেতেছিল। সেইমত উত্তর দুর্যোধন-এর রন্হা বস্ত্র, কর্ণ-এর গোলাপী বস্ত্র এবং দুঃশাসন-এর নীল বস্ত্র গুটিয়ে আনে।
পান্ডবদের পরিচয় পেয়ে রাজা বিরাট আশ্চর্য হন। তিনি কুমারী উত্তরাকে বিয়ে করতে অর্জুনকে অনুরোধ জানান। কিন্তু উত্তরাকে শিক্ষক হিসেবে কন্যাজ্ঞান করার জন্য অর্জুন এই অনুরোধ নাকচ করেন। বিপরীতে তিনি পুত্র অভিমন্যু-এর সাথে উত্তরার বিবাহের প্রস্তাব দেন। রাজা এবং রাজকুমারী এই কথায় সম্মত হন।
যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিবসে বালক অভিমন্যু ছয় রথী দ্বারা অন্যায় যুদ্ধে নিহত হন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষে অশ্বত্থামা পাণ্ডব নিধনের উদ্দেশ্যে ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগ করেন। কৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুনও প্রতিষেধক হিসাবে একই অস্ত্র প্রয়োগ করলে, উভয় অস্ত্রের কারণে পৃথিবী ধ্বংসের উপক্রম হয়। সে কারণে দেবর্ষি নারদ ও মহর্ষি কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন এই দুই অস্ত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উভয়ের অস্ত্র সংবরণ করতে বলেন। অর্জুন ব্রহ্মচর্য পালনের কারণে তাঁর অস্ত্র প্রতিহারে সমর্থ হলেও, অশ্বত্থামা সদা সৎপথে না থাকায় তিনি তাঁর অস্ত্র প্রত্যাহার করতে ব্যর্থ হন। ফলে উক্ত অস্ত্র উত্তরার গর্ভস্থ পরীক্ষিৎকে হত্যা করে। কিন্তু কৃষ্ণ তাকে পুনর্জীবিত করেন এবং ভরতবংশ পরীক্ষণ হওয়ার পর জন্ম বলে অভিমন্যুর পুত্রের নামকরণ করা হয় পরীক্ষিৎ। তিনি পাণ্ডবগণের প্রাণস্বরূপ ছিলেন।
উত্তরা জানতেন অভিমুন্য চক্রব্যূহ তে প্রবেশ করতে জানতেন , তবে বের হতে জানতেন না । কারণ টা যে তার শ্বাশুড়ী মাতা সুভদ্রা কাছে শুনেছিলেন । অভিমুন্য যখন সুভদ্রার গর্ভে তখন একরাত্রিতে অর্জুন , সুভদ্রাকে চক্রব্যূহ তে কি ভাবে প্রবেশ ও বের হতে হয় তা বলছিলেন কিন্তু সুভদ্রা চক্রব্যূহ তে প্রবেশ করার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন , তাই বের হওয়ার কথা আর শোনা হযনি ফলে অভিমুন্যও আর শুনতে পাননি । তাই উত্তরা , অভিমুন্যকে চক্রব্যূহ তে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছিলেন ।
বিরাট রাজার দুই সন্তান উত্তর ও উত্তরা । তাদের সম্পর্কে খুব বেশী জানা না গেলেও ঐতিহাসিক ভাবে জানা যায় , তারা আমাদের বংগদেশের তথা গাইবান্ধার সন্তান । সেই সুত্রে আমাদের সংগেও হস্তিনাপুরের রাজপরিবাররের একটা সম্পর্ক ছিল ।
অসম্পুর্ণ প্রেমের প্রতীক হিসাবে উত্তরা ও অভিমুন্য কে ধরা হয়ে থাকে।
Comments
Post a Comment