শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতা আপনি কেন পড়বেন ?
শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতা আপনি কেন পড়বেন ?
========================
The philosopher Arthur Schopenhauer once said that, “talent hits
a target no one else can hit; Genius hits a target no one else can see.”
শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতা কে অনুধাবন করতে পারলে সে জিনিয়াস হবে।
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার
জনক ম্যাকেয়াভেলী
বলছেন “ end justifies the means “ উদ্দেশ্যই উপায়কে ন্যায় সংগত করে। গীতা অনেক আগেই এই কথা বলেছে । যুধ্য চ। অর্জুন যুদ্ধ কর। You Have To Win . তোমাকে জিততে হবে। জিতলে সব স্বাভাবিক মনে হবে। জয় একমাত্র সন্মান নিশ্চিত করে ।
দ্যুতং ছলয়তামস্মি
তেজস্তেজস্বিনামহম্ ।
জয়োহস্মি ব্যবসায়োহস্মি
সত্ত্বং সত্ত্ববতামহম্
॥১০/৩৬
সমস্ত বঞ্চনাকারীদের
মধ্যে আমি দ্যূতক্রীড়া এবং তেজস্বীদের মধ্যে আমি তেজ। আমি বিজয়, আমি উদ্যম এবং বলবানদের মধ্যে আমি বল। ১০/৩৬
আর ম্যাকেয়াভেলী
কি বলেছেন ???
Machiavelli believed that a successful Prince should appear to
display the characteristics exhibited by both a ‘lion’ and a ‘fox’ because a
combination of the characteristics from these paradigms is seen by Machiavelli
as the most effective way for a ruler to acquire and maintain power. Acquiring
and maintaining power has been described Machiavelli as “the only real concern
of the political ruler” and therefore can be typified as the essential
characteristic for a ‘successful Prince’.
এক কথায় বলি , শাসককে কখনও শৃগালের মত ধুর্ত আবার কখনও সিংহের মত শক্তিশালী হতে হবে।
উপরের শ্লোকে তা আমরা স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাই , এমনকি পুরো বিভূতি যোগ পড়ুন , আপনি শ্রী গীতার প্রতিধ্বনি দেখতে পাবেন । তবে কি আমরা বলতে পারিনা - আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদের জনক কোন না কোন ভাবে শ্রী গীতা দ্বারা উদ্বুদ্ধ । যদি না ও হয় , তারপরেও আমরা বলতে পারি কয়েক হাজার বছর আগে গীতাতে যা লিপিবদ্ধ হয়েছে তা বর্তমানের জন্য প্রযোজ্য ।
ভাষায় ভাষা নেই , ভাষা আছে ভাবে,বস্তু জগতে স্বর্গ নেই . স্বর্গ আছে ভাবে,অর্থাৎ ভাষায় যদি ঈশ্বর থাকেন তবে ঈশ্বর আছেন ভাবে । শ্রী গীতা আপনার মধ্যে এই ভাববোধটা জাগাবে। তারপর তা ভাষায় নিয়ে গিয়ে আপনাকে প্রত্যক্ষ করাবে।
মানুষ পারেনা এমন কিছু নেই । তাই মাঝে মাঝে বলা হয় মানুষ স্বপ্নের সমান । আবার কখনও কখনও বলা হয় মানুষ স্বপ্নের চেয়েও বড় । শুধু তার ভিতরের শক্তিকে জাগিয়ে দিতে হবে। শ্রী গীতা আমাদের জন্য সেই কাজটি করেন । অর্জুন শোকসন্তপ্ত হয়ে যখন গাণ্ডীব ফেলে দিলেন এবং যুদ্ধ করতে অস্বীকার করলেন তখন ভগবানের আবির্ভাব । তিনি অর্জুনের ভিতরের শক্তিকে জাগিয়ে দিলেন । মহাভারতের সব কিছু অর্জুন সহ পঞ্চ পাণ্ডব করেছে। এখানে শ্রী কৃ্ষ্ণ অনুঘটকের কাজ করেছেন । গীতা আমাদের ভিতরের শক্তি জাগিয়ে দেওয়ার মুল শক্তি ।
১) গীতা মহাভারতের অংশ । ভীষ্ম পর্বের ২৫ থেকে ৪২ এই ১৮ অধ্যায়ে ৭০০ টি শ্লোকে ভগবান শ্রী কৃষ্ণের সংগে অর্জুনের যে কথোপথন তাই গীতা । এখানে আরও দুটি চরিত্র আছে , তাঁরা হলেন ধৃতরাষ্ট্র ও সঞ্জয় । এখানে , ধৃতরাষ্টের ১ টি , সঞ্জয়ের ৪০ টি , অর্জুনের ৮৫ টি ও শ্রী কৃষ্ণের ৫৭৪ টি শ্লোক আছে। শ্রী গীতার মোট অধ্যায় ১৮ যা তিনটি ষটকে বিভক্ত। ১) কর্ম ষটক ২) ভক্তি ষটক ৩) জ্ঞান ষটক । পুরো গীতায় ৯৫৮০ টি সংস্কৃত শব্দ আছে ।
গীতা মহাভারতের অংশ , আবার গীতা সমগ্র বৈদিক ও প্রাক বৈদিক ধর্মের সারাংশ । গীতাকে বলা হয় সনাতন ধর্ম জানার প্রবেশ দ্বার । বর্তমান গীতাকে প্রক্ষিপ্ত থেকে শৃংখলাবদ্ধ করেছেন শংকরাচার্য মহাশয় ।
আমরা আম খাই , কাঠাল খাই , বেল খাই । আমের গঠনে কিন্তু তার বহিরাংশ থাকে , তারপর থাকে আঁশ , তারপর আটি । আমরা গ্রহণ করি শুধু আঁশ টুকু । এই আঁশটাই হলো আমের সারাংশ । গীতা নিজেই বলছেন
সর্বোউপনিষদো গাবো , দোগ্ধা গোপালনন্দনঃ ।
পার্থো বৎসঃ , সুধীর্ভোক্তা দুগ্ধং গীতা মৃতং মহৎ ।।
অর্থ - সমস্ত উপনিষদ গাভীস্বরুপ , গোপালনন্দন ভগবান কৃষ্ণ হচ্ছেন দোহন কর্ত্তা , অর্জুন বৎসতুল্য , পণ্ডিত ব্যাক্তি পানকর্ত্তা , গীতার অমৃতবানী উৎকৃষ্ট দুগ্ধসাদৃশ ।
আমি পূর্বেই বলেছি গীতা হলো বৈদিক ও প্রাকবৈদিক সনাতন ধর্মের সংযোগ স্থল । যেমন শ্রী গীতার দশম অধ্যায়ের ২৩ তম শ্লোকে ভগবান বলছেন , রুদ্রাণাং শঙ্করশ্চষ্মি বিত্তেশো যক্ষরক্ষসাম্ । আমি রুদ্রগণের মধ্যে শংকর। শংকর যার অপর নাম শিব। আমরা সবাই জানি শিব হলেন প্রাক বৈদিক দেবতা । তা হলে আপনাকে শিব সম্পর্কে জানতে হবে। আর শিব আসলে ই মা দুর্গা সম্পর্কে জানতে হবে। এবার আসুন একই অধ্যায়ে ২৭ তম শ্লোক । সেখানে ভগবান বলছেন গজেন্দ্রগণের
মধ্যে আমি ঐরাবত । গজানন গণেশ । গনপতিও বলা হয়ে থাকে। তিনি প্রাক বৈদিক দেবতা । তা হলে আমরাতো বলতেই পারি , শ্রী গীতা বৈদিক ও প্রাক বৈদিক যুগের মিলন ক্ষেত্র।
আপনি গীতা পড়তে গেলে আপনাকে জানতে হবে মহাভারত। তা ছাড়া প্রথম অধ্যায় আপনি ভাল মত আয়ত্তে আনতে পারবেন না । আপনি যদি দশম অধ্যায় বিভূতি যোগ পড়তে জান তবে আপনাকে বেদ, রামায়ন , মহাভারত , উপনিষদ সম্পর্কে ধারণা আনতে হবে। তার অর্থ গীতা পড়তে গেলে বিভিন্ন চরিত্র সম্পর্কে জানতে গেলে বা জানলে আপনার জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত হবে।
জাগতিক করুণা, শোক ও চোখের জল হচ্ছে প্রকৃত সত্তার অজ্ঞানতার বহিঃপ্রকাশ।
শাশ্বত আত্মার জন্য করুনার উপলব্ধি হচ্ছে আত্ম-উপলব্ধি।
গীতা পাঠের মাধ্যমে এই আত্ম উপলব্ধি অর্জন করা সম্ভব ।
২) আমার দৃষ্টিতে গীতার সর্বাপেক্ষা
উৎকৃষ্ট অধ্যায় দ্বিতীয় অধ্যায় , সাংখ্য যোগঃ । যেখানে যু্ক্তির প্রাধান্য । এই অধ্যায় কেউ পুরোপুরি আয়ত্ব করতে পারলে সে ধর্মঅবতারের
সংস্পর্শ পাবে। এখানে কোন আবেগ নেই এখানে আছে শুধু যুক্তি যা আপনার সামনের চলার পথ নির্ভুল করে তুলবে।
৩) শ্রী গীতা আপনাকে মোটিভেট করবে। আপনার সমস্যা নির্ধারণে সহায়তা করবে। যাকে আমরা ইংরেজিতে বলি নিড ( Need )। জীবন চলার পথে সামনের দিকে আমার প্রয়োজন টা কি , তা প্রথমে ইনডিকেট করতে হয়। তারপর তা বাস্তবায়নের জন্য ড্রাইভ দিতে হয় । আমরা যদি SWOT এনালাইসিস করে ধাপ ফেলি তবে সফলতা আসবেই । আর সফলতা আসলে কি হবে আপনার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি আসবে যাবে ইংরেজিতে বলা হয় সাটিসফেকশান।
গীতার আধুনিক বিজ্ঞানের মত তাত্ত্বিক দিক আছে , প্রয়োগিক দিক আছে এবং ব্যবহারিক দিক আছে ।
৪) শ্রী গীতা কর্মের উপর বেশী জ্বোর দিয়েছে । কর্মই ধর্ম । সময় নষ্ট করতেও বলা হয় নাই । ভগবান নিজেই বলছেন , মামুণশ্মর যুধ্য চ । আমাকে স্মরণ করে যুদ্ধ কর। একে আমরা বলতে পারি Run And Prey . তুমি তোমার কর্মের মধ্যেই ঈশ্বরকে স্মরণ কর এর জন্য নিয়ম করে সময় বের করে প্রার্থনা করার দরকার নেই । তুমি যৌক্তিক কর্ম কর , আমি তোমার সংগে থাকব। পৃথিবীর অন্যান্য ধর্ম যেখানে পূর্ণের নম্বর দিচ্ছেন , সেখানে গীতা নিষ্কাম কর্ম করতে বলছেন। ফলের আশা ত্যাগ করে তুমি কর্ম কর। এটাকে বলা যেতে পারে গীতার টার্ণিং পয়েন্ট । নিষ্কাম কর্ম ।
৫) প্রত্যেক মানুষের ভিতরে এক দৈব বা ঐশ্বরিক শক্তি বিরাজ করে । গীতা আমাদের সেই শক্তিকে চিনিয়ে দিতে সহায়তা করে । যদি সেই শক্তির সন্ধান আমরা বের করতে পারি , তবে যে কোন ভাল কাজ আমি করতে পারব ।
৬) গীতা আপনাকে প্ররোচিত করবে “Simply Living ,
Highly Thinking”
৭) আজকের যুগ হলো কানেকশানের যুগ । আপনার সংগে অন্যের যোগাযোগ , নিজের সংগে নিজের যোগাযোগ , আত্মার সংগে পরমাত্মার যোগাযোগ , এই কাজ গুলোতে গীতা আপনাকে সহায়তা করবে। .
৮) গীতা আপনাকে ঈশ্বর কেন্দ্রিক চিন্তা ভাবনা করতে সহায়তা করবে। একটি ছোট ছেলে যেমন একটি খুঁটি কে ধরে চারিদিকে ঘোড়ে , যখনি সে খুঁটিটি ছেড়ে দেবে , তখনি যে ছিটকে যাবে। গীতা আপনাকে এই খুঁটি তথা ঈশ্বর কেন্দ্রীক হতে সহায়তা করবে। গীতার ঈশ্বর অলৌকিক কিছু নয় , গীতার ঈশ্বর হলে যুক্তি সম্পন্ন ঈশ্বর । যাকে আমরা যৌক্তিক ঈশ্বর বা যৌক্তিক ধর্ম ও বলতে পারে । ঈশ্বরের এক নাম ধর্ম , তাই তাঁকে ধর্মাবতার বলা হয় ।
৯) গীতা আপনার মধ্যে দেশ প্রেম জাগায়। অধ্যায় ২, ৩৮ তম শ্লোক
সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ ।
ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাপ্স্যাসি।।
সুখ ও দুঃখ , লাভ ,অলাভ জয় ,পরাজয় সমভাব করিয়া কর্তব্য যুদ্ধ করিতে প্রস্তুত হও , তাহাতে পাপভাক্ হইবে না ।
দেশ মাতাকে স্বাধিন সার্বভৌম রাখতে , অন্যের হাত থেকে দেশ মাতাকে বাঁচাতে , দেশের মানুষকে ভাল রাখতে যা করার করতে হবে ,সব বৈধ । অনেকে এই শ্লোককে যুদ্ধা দেহি বলতে চান । এখানে কর্তব্য কথাটি যুক্ত আছে , তারা সেটা লক্ষ্য করেন না । আর একটা কথা জানতে হবে শুধু অস্ত্রবিদ হলে সনাতন ধর্মে সৈনিক বলেনা , তার শাস্ত্র জ্ঞান থাকতে হবে। তাই সনাতন ধর্মে শস্ত্রানী বলা হয়ে থাকে।
১০) অধ্যায় ২ , শ্লোক নং ৪৭
কর্মফলের পরিসমাপ্তি জ্ঞান অন্বেষণেঃ
--------------------------------------
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা র
দ্বিতীয় অধ্যায়
৪৭
নং
শ্লোক
ভগবান
শ্রী
কৃষ্ণের সেই
অসামান্য উক্তি
, “ কর্ম্মাণ্যেবাধিকারস্তে মা
ফলেষু
কদাচন
।
“ কেবল
মাত্র
কর্মতেই তোমার
অধিকার
।
কর্মফলে তোমার
কোন
অধিকার
নেই।
তা
হলে
স্বাভাবিক প্রশ্ন
মনুষ্যমাত্রই কর্মফলের যে
আকাংখা
তার
পরিসমাপ্তি ঘটবে
কোথায়
?
সেটাও
ভগাবন
শ্রীকৃষ্ণ গীতাতে
বলে
দিয়েছেন।
চতুর্থ
অধ্যায়
জ্ঞানযোগ ৩৩
তম
শ্লোক
দ্বিতীয় লাইন
।
”সর্ব্বং কর্ম্মাখিলং পার্থ জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে।। “
ফলসহিত
সমুদয়
কর্ম্মই জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত ।
তাইতো
ভগবান
এই
শ্লোকের প্রথম
লাইনে
বলছেন
,
” শ্রেয়ান্ দ্রব্যময়াদ্ যজ্ঞাজ্ জ্ঞানযজ্ঞঃ পরন্তপ । ”
হে
পরন্তপ
, দ্রব্যময়াদ যজ্ঞ
অপেক্ষা জ্ঞানযজ্ঞ শ্রেষ্ঠ।
এই
অধ্যায়ের ৩৭
তম
শ্লোকের দ্বিতীয় লাইনে
ভগবানের আরও
অমৃতবাণী “ জ্ঞানাগ্নিঃ সর্ব্বকর্ম্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে
তথা
।।
“ জ্ঞানরুপ অগ্নি
সমুদয়
কর্মরাশিকে ভস্মাৎ করিয়া থাকে।
ভগবান
আরও
বলছেন
, ৩৮
তম
শ্লোকের প্রথম
লাইনে
,
ন
হি
জ্ঞানেন সদৃশং
পবিত্রমিহ বিদ্যতে।
ইহলোকে
জ্ঞানের মত
পবিত্র
আর
কিছু
নেই
।
শ্রী
গীতার
এই
শ্লোকটি তাৎপর্য্যপুর্ণ ।
শ্রী
গীতা
দ্বিতীয় অধ্যায়
৪৯
তম
শ্লোক-
”দূরেণ হবরং কর্ম্ম
বুদ্ধিযোগাদ্ ধনঞ্জয়।
বুদ্ধৌ
শরণমন্বিচ্ছ কৃপণাঃ
ফলহেতবঃ।।
হে
ধনঞ্জয়
, বুদ্ধিযোগ হইতে
কর্ম্ম
অনেক
অধম
।
অতএব
তুমি
বুদ্ধির শরণ
লও
; যে
ব্যাক্তি ফলাকাঙ্খী সে
অতি
কৃপণ
।
কর্ম
অপেক্ষা বুদ্ধি
বড়
।
বুদ্ধি
অপেক্ষা জ্ঞান
বড়
।
"বুদ্ধি" হল কোন কিছু
দ্রুত
আয়ত্ব/বিশ্লেষণের ক্ষমতা। আর, "জ্ঞান" হল অভিজ্ঞতা আর
বুদ্ধির সঠিক
প্রয়োগ। জ্ঞানী
ব্যক্তি মাত্র
বুদ্ধিমান, কিন্তু
বুদ্ধিমান হলেই
সবাই
জ্ঞানী
হতে
পারে
না।
১১) অধ্যায় ৩ শ্লোক নং ৩৫ - স্বধর্মে নিধনং শ্রেয় , পরধর্ম ভয়াবহ ।
বলুন পৃথিবীর কোন ধর্মগ্রন্থে এরকম কথা বলেছে। এ কথা এত আধুনিক যে আজকে যুগে তা কঠিন ভাবে প্রযোজ্য। গীতা অসাম্প্রদায়িকতার
কথা বলে । আর অন্যান্য ধর্ম নিজ ধর্মে কথা বলে এবং সে ধর্মে দিক্ষীত হওয়ার আহবান জানায় । স্বধর্ম শুধু হিন্দু , বৌদ্ধ বা জৈণ ধর্ম নয় , স্বধর্ম অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত , জন্মগত ধর্ম । যেমন সৈনিকের ধর্ম দেশ মাতৃকাকে রক্ষা করা , এরকম প্রত্যেকের পেশাগত ধর্ম আছে , সেখান থেকে সরে আসা ঠিক নয় । যার যার কর্মের মধ্যেও ঈশ্বরকে পাওয়া সম্ভব। গীতায় কর্মের প্রাধান্য অনেক অনেক বেশী ।গীতাই বলা হয়েছে ৩/১৪ - কর্ম হতে যজ্ঞ , যজ্ঞ হতে মেঘ , মেঘ থেকে বৃষ্টি , বৃষ্টি থেকে অন্ন , সেই অন্ন খেয়ে আমরা জীবন ধারণ করি। পুরো গীতা যেন কর্মময় ।
৩/৮ - নিয়তং কুরু কর্ম্ম ত্বং কর্ম্ম জ্যায়ো হ্যকর্ম্মণঃ
শরীর যাত্রাপি চ তে ন প্রসিধ্যেদকর্ম্মণঃ ।।
তুমি নিত্য ও নৈমত্তিক কর্ম করিতে থাকো। কেননা কর্ম্ম না করা অপেক্ষা কর্ম্ম করাই শ্রেষ্ঠ । কর্ম্ম না করিলে তোমার জীবিকা নির্বাহ হইবেনা ।
১২) ফুটবল কিংবদন্তী ম্যারাদোনা , যিনি আর আমাদের মাঝে নেই । একদা তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন , যার কারণে পেলে দুঃখ করে বলেছিলেন , ম্যারাদোনা ভুলেই গেছে , সে কোটি কোটি যুবকের আইকন । তিনি যা করবেন , তারা সে কাজটি করতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন । গীতা সে কথাই বলছে , ৩/২১ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যাহা যাহা করেন , সাধারণ লোকও তাহাই করিয়া থাকে । শ্রেষ্ঠগন যাহাকে প্রামানিক বলিয়া স্বীকার করেন , অন্যান্য লোক তাহারই অনু্বর্ত্তন
করে ।
১৩) খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায় ? বললেন সাঁইজি
আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে. তাই হেরি তায় সকল খানে॥ বললেন কবিগুরু।
আর গীতা কি বলছে - ৩/৪২ - স্থুল শরীর অপেক্ষা ইন্দ্রিয়গণ শ্রেষ্ঠ । তদপেক্ষা মন শ্রেষ্ঠ , মন অপেক্ষা বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ । বুদ্ধি অপেক্ষাও যিনি শ্রেষ্ঠ তিনি আত্মা ।
গীতা আপনাকে আত্মাকে চেনাবে। এমন কি গীতা এ কথাও বলছে আত্মার পরিশুদ্ধতা দরকার । তা না হলে পরজন্মে চরিত্র আগের মতই হবে। কয়লার ময়লা যায় না ধুলে , স্বভাব যায়না মলে । দেখুন ২/২০,২২,২৩ ও ১৫/৮ ।
আবার গীতা একথাও বলছে , জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুধ্রুবং
জন্ম মৃতস্য চ । ২/২৭ । জন্মিলে মরিতে হইবে। গীতা আপনাকে মৃত্যুচিন্তা করতে বলে । কারণ মৃত্যু চিন্তা করলে মানুষ খারাপ কাজ করতে পারেনা ।
১৪) প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের নাগরিকেরা বিভক্ত থাকবে তিনটি শ্রেণীতে: জনসাধারণ, সৈন্যবাহিনী
ও অভিভাবকমণ্ডলী।
এমন বিশ্বাস সৃষ্টি করা হবে যে ঈশ্বর তিন প্রকারের মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম তারা সোনার তৈরি, দ্বিতীয় সারির লোকেরা রুপার, আর সাধারণ জনতা পিতল ও লোহার তৈরি। সোনার তৈরি লোকেরা হবে অভিভাবক, রুপার তৈরি লোকেরা হবে সৈনিক আর অবশিষ্টদের করতে হবে কায়িক পরিশ্রম। জাস্টিস বা ন্যায়পরায়ণতা বলতে বোঝাবে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ নিজ কাজ সম্পাদন করা। কার কী কাজ বা পেশা, তা নির্ধারণ করে দেবে সরকার।
এরিষ্টটল দাস প্রথাকে সমর্থন করেছেন । বেদ বর্ণ বৈষম্য বা বর্ণ বাদ সৃষ্টি করেছে। চতুবর্ণ ও চতুরাশ্রমের
উপর বেদ প্রতিষ্ঠিত । গীতা এটা অস্বিকার করে নাই । তবে গীতা বলছে , তুমি কর্মের মাধ্যমে একে অগ্যাহ্য ইংরেজিতে বলে ইগনোর করতে পারো ।
৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহান আলেকজান্ডারের
মৃত্যুর পরে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য তার সাম্রাজ্যের উত্তর পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত ম্যাসিডনীয়
সত্রপ রাজ্যগুলির দিকে নজর দেন। তিনি পশ্চিম পাঞ্জাব ও সিন্ধু নদ উপত্যকা অঞ্চলের শাসক ইউদেমোস ও পাইথনের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন বলে মনে করা হয়। আলেকজান্ডারের
মৃত্যুর পর ব্যাক্ট্রিয়া ও সিন্ধু নদ পর্যন্ত তার সাম্রাজ্যের পূর্বদিকের অংশ সেনাপতি প্রথম সেলেউকোস নিকাতোরের অধিকারে আসে। ৩০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। এই সংঘর্ষের সঠিক বর্ণনা পাওয়া যায় না, কিন্তু যুদ্ধে পরাজিত হয়ে প্রথম সেলেউকোস নিকাতোর তাকে আরাকোশিয়া, গেদ্রোসিয়া ও পারোপামিসাদাই ইত্যাদি সিন্ধু নদের পশ্চিমদিকের বিশাল অঞ্চল সমর্পণ করতে এবং নিজ কন্যাকে তার সাথে বিবাহ দিতে বাধ্য হন।এর পর ভারত বর্ষের সংগে গ্রীসের যোগাযোগ স্থাপন হয়েছিলো । এবং তাদের সাহিত্য দর্শনের সংগে ভারতীয় দর্শন ও সাহিত্যের মিলন ঘটে । দেখা যায় বেদের চতুবর্ণবাদ তাদের প্রভাবিত করে । যা তাদের সৃষ্ট সাহিত্য ও দর্শনে প্রতীয়মান হয় ।
১৫) গীতা কোন কিছু কারো উপর চাপিয়ে দেয় নাই । গীতা প্রত্যেকের সামনে সত্ত্বঃ তমঃ রজঃ তিন টি দিক উপস্থাপন করছে । এর তাত্বিক দিক , প্রয়োগিক দিক ও ব্যবহারিক দিক আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। সিদ্ধান্ত আপনার ।
১৬) গীতা জ্ঞানার্জনের উপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন । ৪/৩৩ দ্রব্যময় যজ্ঞ অপেক্ষা জ্ঞানযজ্ঞ শ্রেষ্ঠ। গীতা বলছে জ্ঞানরুপ অগ্নি সমুদয় কর্মরাশিকে ভষ্মাৎ করিয়া থাকে। ৪/৩৮ ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে । জ্ঞানের চেয়ে পবিত্র আর কিছু নেই ।
১৭) রেগেছেন তো হেরেছেন , এই বিজ্ঞান সম্মত যুক্তি গীতা আবিষ্কার করেছে । দেখুন দ্বিতীয় অধ্যায় ৬২,৬৩ ।
১৮) গীতা শুধু মাত্র ভদ্রলোকের ভগবান হয়ে থাকতে চাননি । তাইতো গীতা বলছে যে আমাকে ভক্তিসহকারে পত্র পুষ্প ফল ও চোখের জল নিবেদন করবে আমি তারটাই গ্রহণ করব। ৯/২৬ আবার গীতা পূজা বা যজ্ঞের সংগাও দিয়েছে , দেখুন ১৭/১৩ - যে যজ্ঞ শাস্ত্রবিধি শূন্য ও অন্নদানহীন , মন্ত্রহীন দক্ষিনাহীন এবং শ্রদ্ধাবর্জ্জিত
তাহা তামস যজ্ঞ ।
১৯) বেদোহখিলধর্মমূলম
। বেদ’ই হলো অখিলধর্মের মূল । বেদ একেশ্বরবাদ নিরাকার ব্রক্ষ্ম এর উপর প্রতিষ্ঠিত । সর্বং খল্বিদং ব্রক্ষ্ম ।
বেদের মুর্তী পূজা নেই । কিন্তু প্রাক বৈদিক যুগের মাতৃকা দেবী , শিব , ভগবতী , গণেশ ইত্যাদী দেব দেবী থেকে প্রাক বৈদিকরা বের হতে পারেনি । কিন্তু বেদে স্বীকৃতিও ছিলোনা । কিন্তু গীতা এই নিরাকার ও আকার মেনে নিয়েছে । সনাতন ধর্মের বহুত্ববাদকে
গীতা স্বীকার করে নিয়ে বহুদিনের দ্বন্দ থেকে সনাতন ধর্মকে মুক্তি দিয়েছে। গীতা নিজেই বলছে ভক্তি যোগে , নিরাকার সাকার যেভাবেই আমাকে আরাধনা করো আমি সবটাতেই সারা দেব যদি সেখানে ভক্তি ও শ্রদ্ধবোধ থাকে।
আবার গীতা বলছে
৪/১১
যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম ।
মম বর্ত্মানুবর্ত্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্ব্বশঃ ।।
৯/২৩
যেহপ্যন্যদেবতা ভক্তা যজন্তে শ্রদ্ধায়ান্বিতাঃ।
তেহপি মামেব কৌন্তেয় যজন্ত্যবিধিপূর্ব্বকাম্।।
২০) বিচারিক কার্য পরিচালনায় শ্রী গীতা শ্রেষ্ঠ মডেল । বিচার কার্য পরিচালনায় অন্যতম বৈশিষ্ট হলো তাকে স্থির তথা শান্ত হতে হবে। গীতা বলছে ,
দুখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধাঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে ।। ২/৫৬
যাঁহার চিত্ত দুঃখে উদ্বিগ্ন হয় না , সুখে স্পৃহা জাগে না , যিনি ভয় ও ক্রোধশূন্য হইয়াছেন , এততদৃশ্য মননশীল ব্যক্তি স্থিতপ্রজ্ঞা বলিয়া কথিত হন ।
১৮/৫৪ ব্রক্ষ্মভুতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি ।
ব্রক্ষ্মভাবপ্রাপ্ত প্রসন্নচিত্ত
ব্যক্তি শোক করেন না আকাঙ্ক্ষা করেন না ।
অশোচ্যানম্বশোচস্ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ
ভাষস্যে ।
গতাসুনগতাসূংশ্চ নানুশোচন্তি
পণ্ডিতাঃ ।। ২/১১
যাহাদের জন্য শোক করিবার প্রয়োজন নাই , তুমি তাহাদের জন্য শোক করিতেছ , আবার পণ্ডিতের ন্যায় কথা বলিতেছ । পণ্ডিতগণ মৃত বা জীবিতদের জন্য শোক করেন না ।
বিচার কার্য পরিচালনা করার সময় উপরের যু্ক্তি তথা উপদেশ গুলো খুব প্রয়োজন ।
২১) “বিশ্বাসে মিলায় বস্তূ, তর্কে বহুদূর” – আদিকাল থেকে এই কথাটির প্রচলন রয়েছে। মানুষ নিজের ওপর থেকে যদি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে তাহলে তার পতন ঘটতে বাধ্য । তাই যেটা একবার ঠিক করবেন (গীতার উপদেশ), সেটাই করার চেষ্টা করুন, কখনোই নিজের প্রতি বিশ্বাস হারানো উচিত নয়. “আমি জানি আমি পারবো” – এই কথাটি সব সময় নিজেকে বলুন, দেখবেন নিজের লক্ষ্যে ঠিক পৌঁছে যাবেন।
২২) আপনার প্রতিটি কাজ সততার সাথে করুন। গোটা বিশ্বে প্রতিটি প্রাণী কিছু না কিছু কাজ করতে এসেছে। সেরকম আপনারও নির্দিষ্ট কিছু কর্তব্য রয়েছে। সেই কর্তব্যের পালন পূর্ণ সততার সাথে করা উচিত। প্রতিটি মানুষ যদি নিজের নিজের কর্তব্য সততার সাথে পালন করেন, তাহলে আর কোনো ঘাটতি থাকবে না। পৃথিবী একটি সুন্দর স্থানে পরিণত হবে।
২৩) গীতা পাঠের মাধ্যমে সরাসরি ভগবানের সংগে কথা বলা যায় । আর ঈশ্বরের সংগে কথা বলাটাই প্রার্থনা । তাই গীতা পাঠ এক ধরনের প্রার্থনা ।
২৪) সন্দেহ একটি মানসিক রোগ, যা শুধু আপনাকেই না, আপনার চারপাশের মানুষজনকেও একটা অস্বস্তিকর পরিবেশে ঠেলে দেয়। অহেতুক সন্দেহ সম্পর্কে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে। গীতায় বলা আছে , যে ব্যক্তি সন্দেহপ্রবন
হয়, সে ইহলোক কিংবা পরলোক কোথাও গিয়েই শান্তি পায়না, সন্দেহ শুধু অশান্তি ডেকে আনে জীবনে।
২৫) গীতার একটা বড় বৈশিষ্ট্য , ভক্তিযোগ সংযোগ করা। বেদে কর্ম কাণ্ড ও জ্ঞান কান্ড ছিলো । কর্মই ধর্ম । আমার কর্ম সম্পন্ন হওয়ার পর তা জ্ঞানে পর্যবেসিত হয় । যেটাকে আমরা অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান বলি। আবার আজকে যুগেও দেখবেন মানুষ অসংখ্য কাজের মধ্যেও একটু পেপার পড়ে . ইন্টানেট ঘাটে , কেউ লেখালেখি করে। মানে কর্মের পর একটু জ্ঞান। কিন্তু এতেও মানুষের শান্তি হচ্ছিলোনা । বরং ঈশ্বর জানতে গিয়ে তার আরও জিঘাংসা বেড়ে গেছে । আরও প্রশ্ন আরও উত্তর । অশান্তি । ভক্তিই পারে তাকে শান্তি দিতে।
ময়্যেব মন আধত্স্ব ময়ি বুদ্ধিং নিবেশয় ।
নিবসিষ্যসি ময়্যেব অত ঊর্ধ্বং ন সংশয়ঃ ॥ ১২-৮॥
২৬) গোপন কথা গোপন রাখতে হয় । তা কখনও প্রকাশ করা উচিত নয় । অনেক সময় শ্রদ্ধাবান ব্যাক্তি ভালবেসে প্রিয় মানুষটিকে অনেক সময় তার মঙ্গলার্থে গোপন কথা বলেন । এটা প্রকাশ করা বিশ্বাস ভংগের সামিল ।
২৭) শ্রী গীতা আমাদের শেখায় এই জীবনে কিছুই হারায় না এবং কোনো অভিজ্ঞতাই বৃথা যায়না। প্রতিটি ছোট বিষয়েও কিছু না কিছু শিক্ষা লুকিয়ে আছে। সবার কাছ থেকেই কিছু না কিছু শেখার আছে, সে আপনার চারপাশের মানুষজন হোক, গাছপালা হোক, পশু-পাখি হোক কিংবা প্রকৃতি নিজেই। আমাদের সার্বিক বিকাশের জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি।
২৮) গীতা বলছে মনের কথা শোনা উচিত, কিন্তু তার মানে এটা নয় যে যা মন চাইবে তাই করবেন। যার নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই, তার মনই তার জন্য সবচেয়ে বড়ো শত্রূ । আপনার মন যদি আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তার থেকে বড়ো শত্রূ আর কেউ হতে পারেনা। চেষ্টা করুন যাতে আপনি আপনার মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, উল্টোটা হলে আপনারই বিপদ!
২৯) কাম, ক্রোধ আর লোভ – এই তিনটি জিনিস পাঁকের মতো যা সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এতে একবার আটকে গেলে বেরোনো অসম্ভব! আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যাতে এই তিনটি বিষয় আমাদের ওপর চেপে বসতে না পারে । যতটা সম্ভব নিজেকে কাম, ক্রোধ আর লোভের মায়াজাল থেকে সরিয়ে রাখাতে হবে ।
৩০)সন্ন্যাসযোগের
শুরুতেই অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রশ্ন করেছেন, কর্ম ও সন্ন্যাসযোগের মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নির্দ্ধিধায় বলেছেন দু’টি যোগই মোক্ষপ্রদ হলেও সন্ন্যাসযোগ অপেক্ষা কর্মযোগই শ্রেষ্ঠ।
মানুষ মুক্তি পাবার জন্য সন্ন্যাসী হয়ে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তারা প্রকৃত সন্ন্যাসের মর্ম জানেনা। কর্ম বন্ধনের কারণ নয়। কর্মফলের প্রতি আসক্তিই বন্ধনের কারণ। গীতায় আসক্তি ত্যাগের জন্য বারবার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কর্মেই তোমার অধিকার, কর্মফলে কখনও নয়। আসক্তি যেন কর্মপ্রবৃত্তির
কারণ না হয়ে দাড়ায়। এভাবে আসক্তিহীন হতে পারলে সন্ন্যাসের ফল পাওয়া যায়। তাকে আর বনে জঙ্গলে ঈশ্বর খুঁজে বেড়াবার দরকার হয়না।
৩১) গীতার বহুল আলোচিত শ্লোক ১৮/৬৬ আসুন আমরা আলোচনা করি।
”সর্ব্বধর্ম্মান্ পরিত্যজ্য “ ১৮/৬৬ শ্রী গীতা ।
এখানে কোন ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলা হয়েছে ?
ধর্ম কি ?
শ্রীমদ্ভগবতগীতা আমাদের জীবন চলার জন্য একটি পরিপূর্ণ বিধান । এখানে ধর্ম শব্দটি ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের প্রথমে জানতে হবে।
এক ধর্ম অর্থ বিশ্বাস ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে পরমেশ্বরের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা ।
আবার ধর্ম অর্থে গুন বা স্বভাব । মানুষের ধর্ম কি ? প্রথমত জীবকে ভালবাসা।
জলের ধর্ম নীচে প্রবাহিত হওয়া । বাতাসের ধর্ম বয়ে যাওয়া । আগুনের ধর্ম ধ্বংস করা ।
আবার দর্প , দম্ভ , অভিমান , ক্রোধ , নিষ্ঠুরতা , অজ্ঞান এগুলোও তো মানুষের ধর্ম।
আবার দান ,দয়া , ক্ষমা , ধৈর্য্য , যজ্ঞ , বেদপাঠ , তপস্যা , অহিংসা , সত্যবাদিতা , নিরভিমানতা , ত্যাগ . শান্তি , লোভশূন্যতা এগুলোও তো মানুষের ধর্ম ।
ঈশ্বরকেও তো ধর্ম্ম বলা হয়েছে । তাই আমরা তাঁকে ধর্মাঅবতারও বলি।
’মামেকং শরণং ব্রজ ’ তুমি সর্ব্ব ধর্ম্মাধর্ম্ম পরিত্যাগ করে একমাত্র আমাতে স্মরণ কর। এই আমাতে অর্থ তো ঈশ্বর । সেওতো ধর্ম। তাহলে অনেকগুলি ধর্ম বাদ দিয়ে আমাদের একটি ধর্ম গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। সেই ধর্মটা হলো যৌক্তিক ধর্ম। যাকে ইংরেজীতে বলা হয় Reasonism .
শ্রী গীতাতে অনেক শ্লোক আছে , যা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।
শ্রী কৃষ্ণ শুরুই করেছিলেন যুক্তি খন্ডন দিয়ে ।
অশোচ্যানম্বশোচস্ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ
ভাষস্যে ।
গতাসুনগতাসূংশ্চ নানুশোচন্তি
পণ্ডিতাঃ ।। ২/১১
যাহাদের জন্য শোক করিবার প্রয়োজন নাই , তুমি তাহাদের জন্য শোক করিতেছ , আবার পণ্ডিতের ন্যায় কথা বলিতেছ । পণ্ডিতগণ মৃত বা জীবিতদের জন্য শোক করেন না ।
আবার এই অধ্যায়ের ১৫ নং শ্লোকেই ভগবান বলছেন ,
যং হি ন ব্যতয়ান্ত্যেত পুরুষং পুরুষর্ষভ ।
সমদুঃখসুখং ধীরং সোহমৃতত্বায় কল্পতে।। ২/১৫
যে ধীর ব্যাক্তি দুঃখ সুখে সমভাবাপন্ন তিনি ধর্মজ্ঞাণ দ্বারা মোক্ষলাভের উপযুক্ত অধিকারী ।
তাহলে এই ধীর/স্থিত ব্যাক্তি কে ? তাও বলা হলো এই অধ্যায়ের ৫৬ নং শ্লোকে ।
দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে। ২/৫৬
যাহার চিত্ত দুঃখে উদ্বিগ্ন হয়না , সুখে স্পৃহা জাগেনা , যিনি ভয় ও ক্রোধশূন্য হইয়াছেন , এতাদৃশ মননশীল ব্যাক্তি স্থিতপ্রজ্ঞা
বলিয়া কথিত হোন ।
কারণ অর্জুন প্রথম অধ্যায়ে অনেকগুলি যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন সে গুলোকে কিন্তু আমরা অস্বীকার করতে পারিনা ।
অর্জুন বলছেন , রাজ্যে কি ফল ? ভোগ ও জীবনধারনই বা কেন ? কেননা যাহাদের জন্য রাজ্য , ভোগ ও সুখের কামনা করা যায় , তাঁহারাই রণক্ষেত্রে উপস্থিত।
’স্বজনং হি কথং হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধব ‘১/৩৬
আত্মিয়গণকে/ কুলকে বধ করিয়া আমাদের কি সুখ হইবে ?
কুলক্ষয় হইলে কুলপরম্পরাগত সনাতন ধর্ম্ম বিনষ্ট হয় । ধর্ম্ম নষ্ট হইলে অধর্ম্ম অবশিষ্ট সকলের মধ্যে ব্যাপ্ত হয় ।
আবার কুলক্ষয় হইলে কুলস্ত্রীগণ ভ্রষ্টাচারিণী
হয় । স্ত্রীগণ ভ্রষ্টা হইলে বর্ণসংকর উৎপন্ন হয়। বর্ণসঙ্কর দোষ দ্বারা জাতিধর্ম্ম ও কুলধর্ম্মসমুহ
উৎসন্ন হয় ।
অর্জুন যে কথা গুলো বলেছেন বা বললেন , তা কি আমরা অস্বীকার করতে পারি । আমাদের মত সাধারণ গৃহী মানুষের ক্ষেত্রে সব সময় এই কথাগুলো ঘুরপাক খায়। আমরাই বলি গুরুহত্যা মহাপাপ । তা হলে অর্জুন কি ভাবে তাঁর গুরু দ্রোণকে হত্যা করবে ?
কিন্তু হত্যা অবশ্বাম্ভী হয়ে পড়েছে। পরিবার , সমাজ , রাষ্ট্র। পরিবারের চেয়ে সমাজ বড় । সমাজের চেয়ে রাষ্ট্র বড় । অর্জুন যে কথাগুলো বলছেন সেগুলো পরিবারে শোভা পায় । বড়জোড় সমাজে শোভা পেতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রে ক্ষেত্রে তা ভিন্ন ভাবে প্রয়োগ হবে।
যেখানে ব্যাভিচ্যারে
দেশ ভরে গেছে। অন্যায়তে ভারতবর্ষ ছেয়ে গেছে। যেখানে নারীর সন্মান ভুলুন্ঠিত , সম্পত্তির ন্যায্য পাওনা থেকে মানুষ বঞ্চিত। অনৈতিক জুয়া/পাশা খেলায় দেশ ভরে গেছে। মহান মানুষেরা চেয়ে চেয়ে দেখছে , কিন্তু কিছু বলছেনা । তার অর্থ তারা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছে । তখন সেখান থেকে মুক্তির একটাই পথ । আর তা হলো কর্তব্য। যুক্তিসম্পন্ন যুদ্ধ ।
তাইতো ভগবান বলছেন ,
’সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ ।
ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাপ্সসি।।
২/৩৮
সুখ ও দুঃখ , লাভ ,অলাভ ,জয় ,পরাজয় সমভাবে করিয়া কর্তব্য যুদ্ধ করিতে প্রস্তুত হও। তাহাতে পাপভাক্ হইবেনা ।
তাই ভগবান শ্রী কৃষ্ণ বলছেন , সকল আবেগ , ব্যাক্তিগত স্বার্থ এগুলো বাদ দিয়ে আমাকে তথা যুক্তিসংগত ( Reason ) ধর্ম গ্রহণ কর। আমিও যুক্তি দিয়েই তোমার মনের গ্লানি দুর করব ।
গীতার শেষ শ্লোক এ কথায় বলে । যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জ্জুন অবস্থান করেন , সেখানে যুক্তি কথা বলে । নীতি যদি ঠিক থাকে । উদ্দেশ্য যদি মহৎ হয় , জয় হবেই । যেমন আমাদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ
।
শ্রী গীতা নিয়ে মহাপুরুষগন বলছেন ঃ
মহাত্মা গান্ধী লিখেছেন , ” যখন সংশয় আমাকে তাড়া করে ফেরে, যখন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে হতাশা, আমি দিগন্তে আশার কোনো আলো দেখতে পাই না, তখন আমি ভগবদ্গীতার দিকে মুখ ফেরাই। এমন একটি শ্লোক পেয়ে যাই, যা আমাকে শান্তি দেয়। তখন ঘনায়মান দুঃখের মধ্যেও আমার মুখে হাসি ফোটে। আমার জীবন বাহ্যিক ব্যর্থতায় পরিপূর্ণ। আমার জীবনে যদি তাদের কোনো দৃশ্য বা অদৃশ্য প্রভাব না থাকে, তার জন্য আমি ভগবদ্গীতার শিক্ষার প্রতি কৃতজ্ঞ। “
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ভগবদ্গীতা প্রসঙ্গে বলেছেন:
ভগবদগীতা মানব অস্তিত্বের আধ্যাত্মিক ভিত্তিটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জীবনের দায়দায়িত্ব ও কর্তব্যকর্মের জন্য কর্মের ডাক দেওয়া হয়েছে গীতায়। সেই সঙ্গেই আধ্যাত্মিক প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের বৃহত্তর উদ্দেশ্যটির দিকেও দৃষ্টি রাখা হয়েছে।
বিশিষ্ট কবি জয়ন্তানুজ বন্দোপাধ্যায় মনে করেন যে, কাব্যগ্রন্থ
হিসেবে ভগবদ্গীতা ভারতীয় সাহিত্যের এবং বিশ্ব সাহিত্যের এক অমূল্য ধ্রুপদি সম্পদ। তিনি বলেন যে, কাব্যগ্রন্থ হিসেবে ভগবদ্গীতা যে বিশ্বমানের সাহিত্য সৃষ্টি সে বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
গীতার প্রশংসা করতে গিয়ে Will Durant Zuvi History of Civilization,
vol-1, page -৫৬৪-৫৬৭’ এ বলেছেন ‘মহাযুদ্ধ বর্ণনার মধ্যে বিধৃত বিশ্ব সাহিত্যের সর্বোচ্চ দার্শনিক সংগীত হলো এই ভগবদ্গীতা।
পদ্মনাভ-মুখপদ্ম বিনিঃসৃত এক মাত্র ভগবদগীতা পাঠ করিলে অন্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করিবার আর আবশ্যক থাকে না, শ্রীধর স্বামী এ কথা বলিয়া গিয়াছেন। হিন্দু মাত্রেই এ কথা মুক্ত কণ্ঠে অনুমোদন করেন। ভারতবাসী আর্য্যসন্তানই
কেবল গীতার গুণে মুগ্ধ নয়; ম্লেচ্ছ কুলোদ্ভব ডেলি-নিউসের (Daily News) ভূতপূর্ব্ব ইংরাজ সম্পাদক বলেন যে, ধর্ম্মপদ, বাইবেল এবং গীতা, এই তিন খানিই জগতের মধ্যে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম্মপুস্তক। তাহাদের মধ্যে গীতাই আবার সর্ব্বোৎকৃষ্ট। গীতার সহিত তুলনা করিলে ইউরোপের রাজত্ব এবং সমস্ত পৃথিবীর ঐশ্বর্য্য তুচ্ছ বলিয়া বোধ হয়। নিত্য এবং অনিত্য পদার্থের পার্থক্য, স্বর্গ এবং পরলোকের কথা, কেবল মাত্র গীতা পাঠেই অবগত হওয়া যায়
ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে এ ধর্মগ্রন্থকে অবলম্বন করে স্বদেশীরা অনুপ্রাণিত হতেন। বিখ্যাত স্বাধীনতার সৈনিক সুভাষ চন্দ্র বসু সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর কিছুক্ষণ গীতা পড়তেন। তারপর জপ করতেন তুলসী মালা হাতে নিয়ে।
বঙ্কিম বাবু বলছেনঃ
আত্মতত্ত্ব বিষয়ক এই স্থূল কথাটা খ্রীষ্টিয়াদি সকল ধর্ম্মেই আছে। কিন্তু তাহার উপর আর একটা অতি সূক্ষ্ম, অতি চমৎকার কথা কেবল হিন্দুধর্ম্মেই আছে। সেই তত্ত্ব অতি উন্নত, উদার, বিশুদ্ধ, বিশ্বাসমাত্রে
মনুষ্যজন্ম সার্থক হয়, হিন্দু ভিন্ন আর কোন জাতিই সেই অতি মহত্তত্ত্ব অনুভূত করিতে পারে নাই। যে সকল কারণে হিন্দুধর্ম্ম অন্য সকল ধর্ম্মের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, ইহা তাহার মধ্যে একটি অতি গুরুতর কারণ। সেই তত্ত্ব এখন বুঝাইতেছি।
আত্মা সকলেরই আছে। তুমি যখন আমা হইতে ভিন্ন, তখন তোমার আত্মা আমা হইতে কাজেই ভিন্ন। কিন্তু ভিন্ন হইয়াও প্রকৃতরূপে ভিন্ন নহে। মনে কর, বহুসংখ্যক শূন্য পাত্র আছে; তাহার সকলগুলির ভিতর আকাশ আছে। এক পাত্রাভ্যন্তরস্থ আকাশ পাত্রান্তরস্থ আকাশ হইতে ভিন্ন। কিন্তু পৃথক্ হইলেও সকল পাত্রস্থ আকাশ জাগতিক আকাশের অংশ। পাত্রগুলি ভগ্ন করিলেই আর কিছুমাত্র পার্থক্য থাকে না। সকল পাত্রস্থ আকাশ সেই জাগতিক আকাশ হইতে অভিন্ন হয়। এইরূপ ভিন্ন ভিন্ন জীবগত আত্মা পরস্পর পৃথক্ হইলেও জাগতিক আত্মার অংশ, কেহ বন্ধন হইতে বিমুক্ত হইলে সেই জাগতিক আত্মায় বিলীন হয়। এই জগদাত্মাকে হিন্দু-দার্শনিকেরা পরমাত্মা বলেন। জীবদেহস্থায়ী আত্মা যত দিন সেই পরমাত্মায় বিলীন না হয়, তত দিন তাহাকে জীবাত্মা বলেন।
এখন এই জীবাত্মা কি নশ্বর? দেহের ধ্বংস হইলেই কি তাহার ধ্বংস হইল? ইহার সহজ উত্তর এই যে, যাহা অবিনশ্বরের অংশ, তাহা কখন নশ্বর হইতে পারে না। যদি জাগতিক আকাশ অবিনশ্বর হয়, তবে ভাণ্ডস্থ আকাশও অবিনশ্বর। যদি পরমাত্মা অবিনশ্বর হয়েন, তবে তদংশ জীবাত্মাও অবিনশ্বর।
এই হইল হিন্দুধর্ম্মের কথা। অন্য কোন ধর্ম্ম এই অত্যুন্নত তত্ত্বের নিকটেও আসিতে পারেন নাই। আমরা পরে দেখাইব যে, ইহার অপেক্ষা উন্নত তত্ত্ব মনুষ্যজ্ঞাত
তত্ত্বের ভিতর আর নাই বলিলেও হয়। প্রাচীন ঋষিরা বলিতে পারেন, “আমরা যদি আর কিছু না করিতাম, কেবল এই কথাটা পৃথিবীতে প্রচার করিয়া যাইতাম, তাহা হইলেও আমরা সকল মনুষ্যের উপরে আসন পাইবার যোগ্য হইতাম৷”3 বাস্তবিক এই সকল তত্ত্বের আলোচনা করিলে তাঁহাদিগকে মনুষ্যমধ্যে
গণনা করা যাইতে পারে না; দেবতা বলিতে ইচ্ছা করে।
শ্রী গীতা সত্যিকারের গুরু আমাদের চিনিয়ে দিয়েছে ।
সিলেবল "গু" মানে অন্ধকার, সিলেবল "রু", যিনি তাদের দূর করেন,
অন্ধকার দূর করার শক্তির কারণে, এইভাবে গুরুর নামকরণ করা হয়েছে।
— অদ্বয়তারক উপনিষদ, শ্লোক ১৬
(Syllable শব্দটির বংলা অর্থ হচ্ছে শব্দাংশ। কোন Word এর যতটুকু অংশ একবারে উচ্চারণ করা যায় তাকে Syllable বা শব্দাংশ বলে।)
শ্রীগীতাতে ‘গুরু’ শব্দটি ২য় অধ্যায়ের ৫ম শ্লোকে, ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের ২২শ শ্লোকে এবং ১৭শ অধ্যায়ের ১৪শ শ্লোকে ব্যবহৃত হইয়াছে। প্রথমটিতে ‘জ্যেষ্ঠ’ অর্থে, দ্বিতীয়টিতে ‘অধিক’ এবং তৃতীয়টিতে ‘আত্মাবৈ গরুরেকঃ’ অর্থেই ‘গুরু’ শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়।
শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে . জগতে জীবের মধ্যে মানব আত্মারই বিবেক জাগ্রত । ভালমন্দ বুঝতে সক্ষম । তাই মানব চাইলে নিজেই নিজের গুরু হতে পারে । নিজেই নিজেকে পথ দেখাতে পারে । শুধু আত্মবিশ্বাস , নিষ্ঠা ও একাগ্রতা প্রয়োজন ।
শ্রী গীতাতে ভগবা্ন শ্রী কৃষ্ণ কি বলছেন দেখুন – ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৫ ও ৬ নং শ্লোক
আত্মা দ্বারা আত্মাকে উদ্ধার করিবে । আত্মাকে কদাচিৎ অধঃপতিত করিবে না । কেননা আত্মাকেই আত্মার উপকারী বন্ধু , আত্মাই আত্মার শত্রু ।
যিনি আত্মাকে বশীভূত করিয়াছেন , আত্মা তাহার বন্ধু । পরন্তু আত্মাকে জয় করিতে অসমর্থ সেই আত্মাই আবার শত্রুবৎ প্রবর্তিত হইয়া থাকে ।
‘আত্মাবৈগুরুরেক’ (আত্মাই একমাত্র গুরু।) ব্যাসদেবও অখিল গুরু বলিয়া ভগবানকেই নির্দ্দেশ করিয়াছেন।
প্রাণের বান্ধব রে দাও দেখা দয়া করে..!
গুরু না ভজি মুই সন্ধ্যা সকালে মন প্রাণ দিয়া রে।
জীবের উদ্দেশ্য হচ্ছে জড়-জাগতিক বন্ধন থেকে মানুষের মুক্তি লাভ এবং পরম পুরুষোত্তম ভগবানরূপে কৃষ্ণকে উপলব্ধি করা। যে মানুষ কৃষ্ণের পরম স্বরূপ উপলব্ধি করে, সে তার কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং ভক্তিমূলক সেবায় আত্মনিয়োগ করে। শ্রী গীতা আমাদের সেই মুক্তি লাভের পথ দেখায় ।
এই জড় জগতে প্রত্যেককেই কোনও ধরনের কাজে নিযুক্ত থাকতে হয়। কিন্তু কর্ম সকল মানুষকে এই জগতের বন্ধনে আবদ্ধ করতেও পারে, আবার তা থেকে মুক্ত করে দিতেও পারে। স্বার্থচিন্তা ব্যতিরেকে, পরমেশ্বরের সন্তুষ্টি বিধানের উদ্দেশ্যে কাজের মাধ্যমে, মানুষ তার কাজের প্রতিক্রিয়া জনিত কর্মফলের বিধিনিয়ম থেকে মুক্তি পেতে পারে এবং আত্মতত্ত্ব ও পরমতত্ত্ব দিব্যজ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয়। শ্রী গীতার কর্মোযোগে আমরা তা দেখতে পাই ।
দেহ, আত্মা এবং উভয়েরও ঊর্ধ্বে পরমাত্মার পার্থক্য শ্রী গীতা আমাদের উপলব্ধি করাতে পারে , শ্রী গীতার জ্ঞান আমাদের এই জড় জগৎ থেকে মুক্তি লাভে সহায়তা করে ।
ভারতীয় ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক খুশবন্ত সিংয়ের মতে নোবেল বিজয়ী রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের বিখ্যাত কবিতা "ইফ—" হল ইংরেজিতে ভগবদ্গীতা-র বাণীর সারমর্ম।
If—
BY RUDYARD KIPLING
(‘Brother Square-Toes’—Rewards and Fairies)
If you can keep your head when all about you
Are losing theirs and blaming it on you,
If you can trust yourself when all men doubt you,
But make allowance for their doubting too;
If you can wait and not be tired by waiting,
Or being lied about, don’t deal in lies,
Or being hated, don’t give way to hating,
And yet don’t look too good, nor talk too wise:
If you can dream—and not make dreams your master;
If you can think—and not make thoughts your aim;
If you can meet with Triumph and Disaster
And treat those two impostors just the same;
If you can bear to hear the truth you’ve spoken
Twisted by knaves to make a trap for fools,
Or watch the things you gave your life to, broken,
And stoop and build ’em up with worn-out tools:
If you can make one heap of all your winnings
And risk it on one turn of pitch-and-toss,
And lose, and start again at your beginnings
And never breathe a word about your loss;
If you can force your heart and nerve and sinew
To serve your turn long after they are gone,
And so hold on when there is nothing in you
Except the Will which says to them: ‘Hold on!’
If you can talk with crowds and keep your virtue,
Or walk with Kings—nor lose the common touch,
If neither foes nor loving friends can hurt you,
If all men count with you, but none too much;
If you can fill the unforgiving minute
With sixty seconds’ worth of distance run,
Yours is the Earth and everything that’s in it,
And—which is more—you’ll be a Man, my son!
বংগানুবাদ
------------
যদি
যদি তুমি মাথা ঠান্ডা রাখতে পারো তখন
যখন সবাই মাথা গরম করে দোষারোপ করছে তোমাকেই,
যদি তুমি নিজের ওপরে আস্থা রাখতে পারো তখন, যখন সবাই তোমার ব্যাপারে সন্দিহান, আবার অন্যদের সন্দেহ করার জায়গাটাও দাও;
যদি তুমি অপেক্ষা করতে পারো, আর অপেক্ষা করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে না পড়ো;
যদি তোমাকে নিয়ে যখন মিথ্যা কথা বলা হচ্ছে, তখন নিজে মিথ্যা কথা না বলো,
যখন তোমাকে ঘৃণা করা হচ্ছে, তখনো তুমি ঘৃণার পথ বেছে না নাও;
অবশ্য তখনো তোমাকে অতিরিক্ত ভালো সাজতে হবে না, খুব জ্ঞানীর মতো কথা বলতে হবে না:
যদি তুমি স্বপ্ন দেখতে পারো, কিন্তু স্বপ্নকে তোমার প্রভু বানিয়ে না ফেলো,
যদি তুমি চিন্তা করতে পারো, কিন্তু চিন্তাকেই তোমার লক্ষ্য বানিয়ে না ফেলো,
যদি তুমি ‘বিজয়’ আর ‘বিপর্যয়’—এই দুইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারো,
আর যদি তুমি এই দুই প্রতারককেই একইভাবে গ্রহণ করতে পারো;
যদি তুমি সহ্য করতে পারো তখন, যখন তোমার বলা সত্য কথাকে বিকৃত করে অসাধু লোকেরা বোকা মানুষদের জন্য ফাঁদ বানায়;
অথবা তুমি যে জিনিসগুলোর জন্য জীবন দিয়ে দিয়েছ, সেগুলোকে যদি তুমি ভেঙে যেতে দেখো, আর যদি তুমি সামনে-পেছনে ঝুঁকে পড়ে ক্ষয়ে যাওয়া হাতিয়ার দিয়ে আবার সেগুলোকে গড়ে তুলতে পারো:
যদি তুমি তোমার বিজয়গুলোকে এলোমেলো করে রাখতে পারো
আর সেসব নিয়ে বাজি খেলে সব হারিয়ে আবারও নতুন করে শুরু করতে পারো,
আর হারটা নিয়ে একটা কথাও ব্যয় না করো,
যদি তুমি তোমার হৃৎপিণ্ড, স্নায়ু আর পেশিকে তোমার পালা চলে যাওয়ার অনেক পরেও কাজ করতে বাধ্য করতে পারো, তখনো...
যখন তোমার ভেতরে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই কেবল ইচ্ছাশক্তি ছাড়া, যা বলছে ‘লেগে থাকো’:
যদি তুমি সাধারণ মানুষের সঙ্গে চলার সময়ও তোমার বিনয় ধরে রাখতে পারো
আর রাজাধিরাজের
সঙ্গে চলার সময়ও সাদাসিধে ভাবটা হারিয়ে না ফেলো,
যদি শত্রু কিংবা সহৃদয় বন্ধুও তোমাকে আঘাত দিতে না পারে,
যদি সব মানুষ তোমার ওপরে নির্ভর করে, কিন্তু কেউই খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে,
যদি তুমি ক্ষমাহীন একটা মিনিটকে ভরে তুলতে পারো ষাট সেকেন্ডের দৌড়ের সমান মর্যাদায়,
তাহলে
তাহলে এই পৃথিবী তোমার, এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব তোমার;
এবং তারও চেয়ে বড় কথা, তুমি হয়ে উঠবে একজন মানুষ, পুত্র আমার।
লেখক: রুডইয়ার্ড কিপলিং
রুডইয়ার্ড কিপলিং এর কবিতা "যদি-" একজন আদর্শ মানুষ হওয়ার জন্য স্পিকারের ছেলেকে অনুসরণ করার জন্য শর্তাবলীর একটি সেট তালিকাভুক্ত করে. স্পিকার তার ছেলেকে কীভাবে বিশ্ব এবং জীবনের চ্যালেঞ্জগুলি উপলব্ধি করতে হয় সে সম্পর্কে পরামর্শ দেন যাতে সে তার অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারে এবং দৃঢ়ভাবে বাধাগুলি অতিক্রম করতে পারে। যেমন করে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ , অর্জুনকে
পরামর্শ দিয়েছিলেন ।
তাহলে কবিতাটির বার্তা কী?
রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের কবিতা "যদি—" সম্পর্কে একটি চিন্তাশীল বার্তা রয়েছে একজন অনিবার্যভাবে
মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও কীভাবে একটি সফল, নীতিগত এবং সুখী জীবনযাপন করা যায়.
আপনি গীতা পড়ুন . দেখবেন এই কবিতার প্রত্যেকটি কথা মিলে যাবে ।
শ্রীমদ্ভগবদগীতায় মুক্তির জন্য চারটি পথ দেখানো আছে –
জ্ঞানের পথ,
কর্মের পথ,
ধ্যানের পথ,
ভক্তির পথ।
হিন্দু দর্শনে এই চারটি পথকে মুক্তির পথ ভাবা হয়।
বিশ্বের সমস্ত ধার্মিক উপদেশের মধ্যে সম্ভবত ভগবদ গীতার উপদেশ ই একমাত্র উপদেশ যা আমাদের মুক্তির পথ বলে দিয়ে উপরোক্ত চারটির মধ্যে যেকোনো একটি পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেয়।
দর্শন
মানে
দেখা,
দেখলে
দার্শনিক
হয়
না।
কোপালের
চোখ
দিয়ে
দেখার
নাম
দর্শন
নয়,
অন্তরের
চোখ
দিয়ে
দেখলে
দার্শনিক
হয়।
মুসলিম
সেরা
দার্শনিক
আল্লামা
ইমাম
গায়যালী
(রাঃ)
লিখেছেন,
‘মানুষের
পঞ্চ
ইন্দ্রিয়ের
একটি
গুরুত্বপূ
র্ণ
ইন্দ্রিয়ের
নাম
‘চোখ’। চোখের ও কয়েকটি দোষ আছে। যেমন চোখ দূরে দেখে না, এক ইঞ্চি পরিমাণ চোখের কাছে কিছু বস্তু নিয়ে আসলে তাও দেখে না, চোখ কোন বস্তুর বাইরে দেখে, ভিতরে দেখে না, চোখ অনেক কিছু দেখে কিছু চোখ-চোখকে নিজে দেখে না। চোখ যা দেখে তা সত্য দেখে না। চোখে কাছে মনে হয় সূর্য আঁকার থালার সমান, কিন্তু অন্তরের চোখ বলে, পৃথিবী হতে সূর্য্যরে আঁকার তের লক্ষ গুণ বড়। তাই তিনি বলেছেন, সব কিছু অন্তরের চোখ দিয়ে দেখতে। অন্তরের চোখ দিয়ে যারা দেখেন তারাই দার্শনিক। শ্রী গীতা আপনাকে এই দার্শনিক হতে সহায়তা করবে ।
আজ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে শ্রী গীতা বলছে , ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে । এই
জগতে চিন্ময় জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছুই নেই। ৪/৩৮ ।
জ্ঞানার্জনের অন্যতম মাধ্যম বই পড়া । যা আমাদের
সুশিক্ষা দানে সক্ষম । সুশিক্ষা আমাদের ভেতরের মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করে ।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘মানুষের মৃত্যুতে আমি দুঃখ পাইনা, মনুষ্যত্বের মৃত্যুতে দুঃখ পাই।’ আজ অনেক মানুষ প্রাণে বেঁচে থাকলেও তাদের কাছে মনুষ্যত্বের লেশমাত্র নেই। তারা মানুষ নয় পশু। কথায় বলা হয়, ‘মানুষ জন্মে শিশু, শিক্ষায় যিশু না হলে পশু। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘গুনতে আমরা বৃদ্ধি পাচ্ছি গরু ছাগলের মত’। মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য সুশিক্ষা দরকার, সুশিক্ষার জন্য প্রয়োজন সুপাঠ্য বই।
একটি তরুলতা সহজে তরুলতা, এক পশু সহজেই পশু কিন্তু একটি মানুষ সহজেই মানুষ নয়, মানুষকে মানুষ হতে দ্বিতীয় জন্ম হতে হয়। বই পাঠের মধ্যদিয়েই একটা মানুষের দ্বিতীয় জন্ম হয়ে যায়।
জন কীর্টস বলেছেন, ‘মানুষের মনের মধ্যে হাজার চোখ আছে, আমার একটি একটি বই পড়ে একটি একটি অন্তরের চোখ খুলে যায়।’
শ্রী গীতা আপনাকে কর্তব্য শেখাবে আপনাকে মনুষ্যত্ব সম্পর্কে সম্মুখ ধারণা দিবে।
গীতা
আত্মাকে
জাগিয়ে
তোলে।
প্রমথ
চৌধুরী
বলেছেন,
দেহের
মৃত্যুর
চেয়ে
আত্মার
মৃত্যু
অনেক
বড়,
তা
আমরা
বুঝি
না।
দেহের
মৃত্যুর
রেজিস্ট্রারি রাখা
হয়,
আত্মার
হয়তো
আমরা
আত্মার
অপমৃত্যুতে
ভীত
হওয়া
দূরে
যাক,
উৎফুল্ল
হয়ে
উঠি।
কথা
সাহিত্যিক
হুমায়ুন
আহমদের
কাছে
এক
সাংবাদিক
জানতে
চাইলেন,
কেমন
আছেন
? তিনি
জানালেন,
বেঁচে
আছি।
এমন
উত্তর
কেন
জানতে
চাইলে,
তিনি
বললেন,
অনেক
মৃত্যু
মানুষ
জীবিত
ভঙ্গিতে
ঘুরে
বেড়াতে
দেখেছি
অথচ
তাদের
আত্মা
মরে
গেছে।
তাই
বলছি,
বেঁচে
আছি’। শ্রী গীতা আপনার আত্মাকে চেনাবে , তাকে জাগ্রত রাখতে সহায়তা করবে। আত্মার বিশুদ্ধতা কি ভাবে করতে হয় , তাও আপনাকে শেখাবে।
এরকম অসংখ্য কারণ দেখানো যায় , কেন আপনি গীতা পড়বেন । গীতা পড়ুন , ছেলেমেয়েদের পড়ান , অন্যকে উৎসাহিত করুন , দয়া করে গীতা লাল কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে শুধু তাকে রেখে দিবেন না । ছোট বেলা যেমন আমাদের কর্ত্তামারা
রামায়ণ মহাভারত সামনে নিয়ে আমাদের গল্প শোনাতেন , সেই ভাবে ।
ঘরে ঘরে গীতার বাণী ছড়িয়ে পড়ুক ।
এই আশায় -- প্রণাম ।
নারায়ন চন্দ্র সাহা া


Comments
Post a Comment