সাধক বামাক্ষ্যাপা

 সাধক বামাক্ষ্যাপা

” মন চল নিজ নিকেতন “
“বাতি যেমন তেল ছাড়া জ্বলে না , তেমন মানুষ ঈশ্বর ছাড়া বাঁচতে পারে না “. তিনি ছিলেন উনিশ শতকের অপার প্রসিদ্ধ কালীভক্ত বামাক্ষ্যাপা ।
ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষদের চারটি অবস্থা বালকবৎ, জড়বৎ, উন্মাদবৎ এবং পিশাচবৎ। এই চারটি অবস্থাই ব্যামাক্ষ্যাপার মধ্যে দেখা যেত। কিন্তু ঠাকুর রামকৃষ্ণের মধ্যে পিশাচবৎ ভাবটি অনুপস্থিত ছিল। তাই বামাক্ষ্যাপাকে দেখার জন্য নরেন্দ্রনাথ আকুল হয়ে ওঠেন। শেষে শরৎচন্দ্রকে নিয়ে নরেন্দ্রনাথ চলে এলেন তারাপীঠে। সেখানে বামাক্ষ্যাপা ও নরেন্দ্রনাথ দেখা হয়। আর তার সম্পর্কে বামাক্ষ্যাপা তার বন্ধু শরৎচন্দ্রকে বললেন, এই যুবক একদিন ধর্মের মুখ উজ্জ্বল করবে।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্ম হলেও তিনি বামাক্ষ্যাপাকে দেখার জন্য তারাপীঠে গিয়েছিলেন। সেখানে দুজনার কিছুক্ষণ কথা হয়। কথিত আছে, ফেরার সময় বামাক্ষ্যাপা মহর্ষিকে বললেন,
“ ফেরার পথে ট্রেন থেকেই দেখতে পাবে একটা বিশাল মাঠ। সেই মাঠের মাঝখানে আছে একটা ছাতিম গাছ আছে। তার নিচে বসে ধ্যান করবে। দেখবে মনের ভিতরে আনন্দের জ্যোতি জ্বলে উঠছে। ওখানে একটা আশ্রম বানাও দেখি। আহা, শান্তি শান্তি! ”
ফেরার পথে সেই মাঠ এবং ছাতিম গাছ দেখে তিনি চমৎকৃৎ হলেন। সেখানে বসে ধ্যানে মগ্নও হলেন। তিনি ঠিক করেন সেখানে তিনি আশ্রম স্থাপন করবেন। পরবর্তী কালে ওখানেই শান্তিনিকেতনপ্রতিষ্ঠিত হয়।
একবার নৈবেদ্য নিবেদনের পূর্বে খেয়ে ফেলে তিনি পুরোহিতদের রোষ দৃষ্টিতে পড়েছিলেন। শোনা যায়, এরপর তারাদেবী নাটোরের মহারানিকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে দেবীর পুত্র বামাক্ষ্যাপাকে প্রথমে ভোজন করাতে আদেশ দেন। এরপর থেকে মন্দিরে দেবীকে নৈবেদ্য নিবেদনের পূর্বে বামাক্ষ্যাপাকে ভোজন করানো হত এবং কেউ তাঁকে বাধা দিতেন না। কথিত আছে, তারাদেবী শ্মশানক্ষেত্রে ভীষণা বেশে বামাক্ষ্যাপাকে দর্শন দিয়ে তাঁকে স্তন্যপান করিয়েছিলেন।
দেবতা ও মানুষে, মানুষ ও পশুতে, জাত ও বেজাতে এবং ধনী ও দরিদ্রে বামদেবের কোনও ভেদজ্ঞান ছিল না। তিনি ছিলেন বাকসিদ্ধ—তাঁর মুখের কথাই ছিল সত্য। ফলে তিনি কখনও কখনও এমন কথা বলে ফেলতেন, যেটা অন্যের পক্ষে ভয়ের বা আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠত। এখানে সেরকমই একটা ঘটনার কথা বলছি।
তারাপীঠের নগেন পাণ্ডা সে-সময়ে খুবই খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরই খুব পরিচিত স্থানীয় একজন জমিদার—নাম পূর্ণচন্দ্র সরকার হঠাৎই খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সবরকম ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়েও রোগীর কিছুমাত্র উন্নতি হল না। এবার নগেন পাণ্ডা এসে ধরলেন বামদেবকে। তাঁর অনুরোধ, ওই জমিদারকে রোগমুক্ত করে দিতেই হবে। একবার যদি ক্ষেপা মুখ ফুটে বলেন সে কথা, তাহলেই রোগী সুস্থ হয়ে যাবে। কারণ, ক্ষেপা হচ্ছেন বাকসিদ্ধ।
খুব আদর করে পাল্কিতে চাপিয়ে নগেন পাণ্ডা বামদেবকে নিয়ে গেলেন জমিদার বাড়িতে। যাওয়ার পথে নগেন পাণ্ডা ক্ষেপাকে বোঝাতে লাগলেন, ‘বাবা, আপনাকে বিশেষ কিছু করতে হবে না - শুধু রোগীর কাছে গিয়ে জোর গলায় বলবেন, এই উঠে বোস্, তোর রোগ ভাল হয়ে গেছে। আপনি মুখ দিয়ে ওইটুকু বললেই কেল্লা ফতে।’
বামাক্ষেপা সরল শিশুর মতোই বললেন, ‘তুমি যখন বলছ, তখন তা-ই বলব। যদি ভুলে যাই, তুমি আমাকে একটু মনে করিয়ে দিও নগেন কাকা।’ ক্ষেপার কথা শুনে নগেনের আনন্দ আর ধরে না।
তারপর একসময় পাল্কি গিয়ে ঢুকল জমিদার বাড়িতে। সবাই মিলে দারুণ খাতির করে ক্ষেপাকে নিয়ে গেলেন রোগশয্যায় শায়িত জমিদারের কাছে। কিন্তু রোগীর ঘরে ঢুকেই ক্ষেপা যা বললে তাতে সকলের আক্কেল গুড়ুম। রোগীকে দেখে ক্ষেপা বললেন, ‘ও নগেন কাকা, এ শাল তো এখনি ফট।’ ফট মানে শেষ। অর্থাৎ, এ রোগীর আর আশা নেই, এখনই প্রাণান্ত হবে একথা বলেই ক্ষেপা, এসে পাল্কিতে উঠে বসলেন। ওদিকে রোগীও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। এতে নগেন পাণ্ডা রাগতস্বরে ক্ষেপাকে বললেন, ‘এ আপনি কি করলেন। এরকম করবেন জানলে, আমি আপনাকে এখানে নিয়েই আসতাম না।’
সরল বালকের মতোই ক্ষেপা উত্তর দিলেন, ‘আমি তো তোমার শেখানো কথাই বলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু মা তারা যে বাধা দিলেন, বললেন, ওকথা বলিস না, বলে দে ফট। আমি তো তাই বললাম। এই হলেন সাধক বামক্ষেপা।’
কালীঘাটের সেবক হালদারদের সংবাদ পাঠালেন মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর । তারাপীঠের বামাক্ষ্যাপাকে নিয়ে তিনি যাচ্ছেন কালীঘাটে। এক ঘণ্টা মন্দিরে কোনও যাত্রী প্রবেশ করতে না পারে তার ব্যবস্থা করলেন। সেই জন্য টাকাও দিলেন পালাদারকে।
ভোরের গাড়ি করে কালীঘাটে আনা হল বামাকে। হালদাররা সপরিবারে উপস্থিত। প্রণাম করলেন শ্রদ্ধাভরে। উপস্থিত ভক্তপ্রাণ যাত্রীরাও বামাদর্শনে উদগ্রীব। বামা দেখলেন গর্ভমন্দির শূন্য। একটি লোকও নেই তাঁর দর্শনের কারণে। যে কোনও তীর্থে সকলেরই সমান অধিকার। তাই আর সকলের সঙ্গেই ছোটমাকে দর্শনের কথা জানালেন ক্ষ্যাপাবাবা। অতএব দ্বার অবারিত হল সকলের জন্য।
বামাকে এনে দাঁড় করানো হল মাতৃমূর্তির সামনে। অপলক দৃষ্টিতে বামা চেয়ে রইলেন ছোটমার দিকে। হৃদয়সমুদ্র উথলে উঠল ভক্তিলহরিতে। দু’চোখ বেয়ে দরদর করে নেমে এল পরমানন্দের মন্দাকিনী ধারা। ‘জয় তারা’ নাদ নেই মুখে। আত্মহারা হয়ে উঠলেন বামা। ধীরে ধীরে চোখদুটি হয়ে এল অর্ধনিমীলিত। মন চলে যায় এক অজানা অজ্ঞাতলোকের অতল তলে। অবয়ব ক্রমে হয়ে ওঠে ধীরস্থির অচঞ্চল। মাতৃপ্রেমিক ক্ষ্যাপা বিবশভাবে বলে ওঠেন, ‘এই যে আমার কালী মা। রূপের কি ছটা, মাথায় আবার মোহিনী জটা, যেমনি লকলকে জিভ, তেমনি টানা টানা চোখ, যেন জ্বলজ্বল করছে। তুই কাদের মেয়ে রে? চল না মা, তোকে তারা মা’র কাছে কোলে করে নিয়ে যাই। তুই যাবি তো, বেশ বেশ – তবে আয় আমার কোলে।’
আত্মবিস্মৃত উন্মত্ত সন্তান ক্ষ্যাপাবাবা মা মা বলে স্নেহ বাৎসল্যে পাষাণময়ী বিগ্রহকে কোলে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করতে বাধা দিলেন পূজারি পাণ্ডারা। স্পর্শ করতে দিলেন না নিত্যশুদ্ধ চৈতন্যরূপিণী দেবী কালিকার বিগ্রহ। বামের অন্তরের ভাব তারা কেউ বোঝেননি। সেবাইত ছাড়া আর কেউ বিগ্রহ স্পর্শ করতে পারেন না, এটাই ছিল সেকালের নিয়ম। সে নিয়ম তখন রক্ষাও হল বটে। ক্ষ্যাপার দিব্যদৃষ্টিতে জননীর সেই স্নেহময়ী রূপ ও ভাব মিলিয়ে গেল মুহুর্তে। বহির্নয়নে ভেসে উঠল পাষাণময়ীর বিকট রূপ ও কঠিন মুখমণ্ডল। বিচ্ছেদ হল দিব্যভাবের। এবার শ্মশানচারী ঘোর তান্ত্রিক ঊর্ধ্বরেতা ক্ষ্যাপাবাবা রুদ্রমূর্তি ধারণ করে বললেন, ‘চাই না তোদের রাক্ষসী কালীকে, যেমন কেলে রূপ, তেমনি লকলকে, মস্ত জিভ, যেন গিলতে আসছে। আহা, আমার তারা মা’র যেমন ছোট্ট জিভ তেমন রূপের ছটা, মাথায় জটা, পা দু’খানি খুরখুরে। চাই না তোদের কেলে কালী, আমার আকাশ তারাই ভালো’।
মুহুর্তে মন্দিরের পরিবেশ হয়ে উঠল গম্ভীর, নীরব। দর্শনার্থী যাত্রীরা ভীত, বিহ্বল। সেই সময় হালদারমশাইরা উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তাঁরা ভর্ৎসনা করলেন পুরোহিতদের। অপরাধ স্খলনের জন্য অনুরোধ করলেন নিরভিমান বামকে, ‘না বাবা, আপনি স্পর্শ করতে পারেন মাকে।’
ক্রোধ উপশম করলেন ক্ষ্যাপাবাবা। কোনও অভিশাপ বর্ষিত হল না সেবাইত পূজারিদের উপরে। অন্তর্যামী জানেন মা-ই বাধা দিয়েছেন ওদের মাধ্যমে। তাই নিরভিমানের অভিমান হল মায়েরই উপর। তিনি আর স্পর্শ করলেন না মায়ের পাষাণ বিগ্রহ। ধীর স্থির শান্ত অচঞ্চল পদক্ষেপে বেরিয়ে এলেন মন্দির থেকে। এই ভাবেই সেদিন সাঙ্গ হয়েছিল নিরহংকার ক্ষ্যাপাবাবার কালীঘাটের কালীদর্শন।
কৃতজ্ঞতায়ঃ
শিবশংকর ভারতী
পৃথ্বীশ ঘোষ

Comments